উত্তরঃ
ভূমিকম্প পৃথিবীর অন্যতম ভয়াবহ ও অনিশ্চিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। অন্যান্য অনেক দুর্যোগের মতো এর সুনির্দিষ্ট পূর্বাভাস এখনো নির্ভরযোগ্যভাবে দেওয়া সম্ভব হয়নি। যেহেতু ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তাই এর ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতি, ঝুঁকি হ্রাসমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, দক্ষ উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী কার্যকর ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। এ লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিম্নোক্ত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করা যেতে পারে-
ভূমিকম্পের প্রভাব মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে করণীয়:
⇒ বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন: ভূমিকম্পে অধিকাংশ প্রাণহানি ঘটে দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ ভবন ধসের কারণে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ভূমিকম্প-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC) মেনে ভবন নির্মাণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। রাজউক ও স্থানীয় পৌরসভার মাধ্যমে নকশা অনুমোদন এবং নির্মাণাধীন ভবনের গুণগত মান কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে।
⇒ ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো ভবন সংস্কার ও অপসারণ: দেশের প্রধান প্রধান শহরের অত্যন্ত পুরোনো, জরাজীর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করার জন্য রাষ্ট্রকে একটি সুনির্দিষ্ট কারিগরি জরিপ পরিচালনা করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ অথচ সংস্কারযোগ্য ভবনগুলোকে আধুনিক প্রকৌশলগত পদ্ধতির মাধ্যমে রেট্রোফিটিং বা শক্তিশালীকরণের আওতায় আনতে হবে। অন্যদিকে, যেসব ভবন কোনোভাবেই সংস্কারযোগ্য নয়, সেগুলোকে জনস্বার্থে দ্রুত অপসারণ বা ভেঙে ফেলার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে ।
⇒ আধুনিক পর্যবেক্ষণ ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থা স্থাপন: ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ ও আবহাওয়া অধিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আধুনিক সিসমিক মনিটরিং স্টেশন স্থাপন এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সাধন করতে হবে। আধুনিক আর্থকোয়েক আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম চালুর মাধ্যমে মূল কম্পন শুরু হওয়ার কয়েক সেকেন্ড আগে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা পাঠানো সম্ভব।
⇒ ঝুঁকিমুক্ত নগর পরিকল্পনা ও অবকাঠামো উন্নয়ন: নগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় ভূমিকম্প ঝুঁকিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। জরুরি উদ্ধারকাজ পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত খোলা স্থান, প্রশস্ত সড়ক এবং নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র সংরক্ষণ করতে হবে। হাসপাতাল, ফায়ার স্টেশন, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও যোগাযোগ অবকাঠামোকে ভূমিকম্প-সহনশীল করে গড়ে তুলতে হবে।
⇒ আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম সংগ্রহ ও লজিস্টিকস ব্যাকআপ: ধসে পড়া কংক্রিটের নিচ থেকে দ্রুত মানুষ উদ্ধারের জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সশস্ত্র বাহিনীকে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক যন্ত্রপাতি দ্বারা সুসজ্জিত করতে হবে। এর মধ্যে লাইফ ডিটেক্টর, কংক্রিট কাটার, ড্রোন, হেভি ক্রেন এবং উদ্ধারকাজে সহায়তাকারী প্রশিক্ষিত কুকুর অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক। একই সঙ্গে আহতদের দ্রুত স্থানান্তরের জন্য পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স, এয়ার অ্যাম্বুলেন্স এবং মাঠ পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে জরুরি ওষুধের আপৎকালীন মজুত নিশ্চিত করতে হবে।
⇒ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ: ভূমিকম্প-পরবর্তী প্রথম কয়েক ঘণ্টা জীবন রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তত্ত্বাবধানে প্রতিটি ওয়ার্ড ও মহল্লায় স্থানীয় যুবসমাজকে নিয়ে প্রশিক্ষিত কমিউনিটি ভলান্টিয়ার বা স্বেচ্ছাসেবক স্কোয়াড গঠন করতে হবে। এ স্বেচ্ছাসেবকরা রাষ্ট্রীয় উদ্ধারকারী বাহিনী পৌঁছানোর আগেই তাৎক্ষণিক উদ্ধার ও প্রাথমিক চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করতে সক্ষম হবে।
⇒ প্রাতিষ্ঠানিক মহড়া ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি: ভূমিকম্পের সময় করণীয় সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষের পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই। ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কিত না হয়ে কীভাবে আত্মরক্ষা করতে হয়, সে বিষয়ে জনগণকে বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস, শিল্পকারখানা ও আবাসিক এলাকায় নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া পরিচালনা করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা এবং গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রেডিও ও টেলিভিশনের মাধ্যমে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সচেতন জনগণ দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
⇒ দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন: ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনের জন্য একটি স্থায়ী দুর্যোগ ঝুঁকি তহবিল গঠন করা প্রয়োজন। এ তহবিল থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আর্থিক সহায়তা, খাদ্য, চিকিৎসা, নিরাপদ আশ্রয় এবং পুনর্বাসন সুবিধা প্রদান করা যাবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো দ্রুত পুনর্নির্মাণের জন্য বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তবে সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং কার্যকর পুনর্বাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।