“সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই” এই বিখ্যাত উক্তিটি মধ্যযুগের বিখ্যাত বাঙালি কবি চণ্ডীদাসের বাণী হিসেবে পরিচিত। এই উক্তিটির মাধ্যমে মানবধর্মকে সর্বোচ্চ স্থান দেওয়া হয়েছে, যেখানে মানুষ এবং মানবতাই সবকিছুর ঊর্ধ্বে বলে বিবেচিত। এটি তৎকালীন সমাজের ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং ভেদাভেদের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ ছিল এবং মানবতাবাদী চিন্তাধারার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। চণ্ডীদাস মূলত বৈষ্ণব পদাবলী রচনার জন্য বিখ্যাত, যেখানে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলার মাধ্যমে মানবপ্রেম ও ঈশ্বরপ্রেমের গভীর সম্পর্ক প্রকাশিত হয়েছে।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ এবং মধ্যযুগের প্রথম নিদর্শন হিসেবে এটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাস। কাব্যটি বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে বাঁকুড়া জেলার কাকিল্যা গ্রাম থেকে আবিষ্কার করেন এবং ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে এটি প্রকাশিত হয়।
কাব্যটির রচনাকাল:
সাধারণত চতুর্দশ শতাব্দীর শেষ ভাগ (আনুমানিক ১৩৫০-১৪০০ খ্রিস্টাব্দ) এর রচনাকাল হিসেবে ধরা হয়। ভাষাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক প্রমাণের ভিত্তিতে এই সময়কালকেই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করা হয়।
কাব্যটির গুরুত্ব:
ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক মূল্য: এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম মানবীয় প্রেমমূলক কাব্য এবং বৈষ্ণব পদাবলীর উৎস। বৈষ্ণব সাহিত্যধারার এক সুস্পষ্ট পথনির্দেশক হিসেবে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
ভাষাতাত্ত্বিক গুরুত্ব: শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের ভাষা প্রাক-চৈতন্য যুগের মধ্য বাংলা ভাষার মূল্যবান নিদর্শন। এই কাব্যের মাধ্যমে প্রাচীন বাংলা ও আধুনিক বাংলার মধ্যবর্তী ভাষার বিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য: কাব্যে বর্ণিত রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা তৎকালীন বাঙালি সমাজের প্রেম-ভাবনা, সামাজিক রীতিনীতি, দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং ধর্মচিন্তার একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। এর মাধ্যমে দেবতাকে মানবীয় রূপে দেখার প্রবণতা প্রকাশ পেয়েছে।
আখ্যানগত বৈশিষ্ট্য: এটি একটি আখ্যানকাব্য যা কাহিনি প্রবাহের মধ্য দিয়ে রাধা, কৃষ্ণ ও বড়াইয়ের চরিত্র অঙ্কন করেছে। রাধা-কৃষ্ণের সম্পর্কের মানবিক দিকগুলি এই কাব্যে গভীর সংবেদনশীলতার সাথে চিত্রিত হয়েছে।
এই কাব্যটি আবিষ্কারের পর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নতুন করে রচিত হয়েছিল এবং এর মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের ধারাবাহিকতা সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করা সম্ভব হয়েছে।
শাহ মুহম্মদ সগীর মধ্যযুগের প্রথম দিকের একজন বাঙালি কবি ছিলেন এবং তাঁর রচিত ইউসুফ-জোলেখা কাব্য বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এটি বাংলা সাহিত্যের মুসলিম কবি কর্তৃক রচিত প্রথম রোমান্টিক প্রণয়কাব্য হিসেবে পরিচিত। এর গুরুত্ব নিম্নরূপ:
এটিই মুসলিম কবি কর্তৃক রচিত প্রথম উল্লেখযোগ্য কাব্য যা প্রণয়মূলক বিষয়বস্তু নিয়ে রচিত। এর আগে দেব-দেবী বা মঙ্গলকাব্যের প্রভাব ছিল বেশি।
কাব্যটি ফার্সি সাহিত্যের প্রভাব থেকে ইউসুফ-জোলেখার জনপ্রিয় আখ্যানকে বাংলায় নিয়ে আসে, যা বাংলা সাহিত্যে নতুন ধারার উন্মোচন করে।
এটি প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় বিষয়বস্তুর পাশাপাশি সেক্যুলার বা আধা-সেক্যুলার প্রেমকাহিনিও কাব্য রচনার বিষয়বস্তু হতে পারে।
এ কাব্যে তৎকালীন বাংলা ভাষার একটি পরিশীলিত রূপ পরিলক্ষিত হয়, যা পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
আখ্যানকাব্য রচনার ধারায় এটি এক মাইলফলক হিসেবে গণ্য এবং এর রচনারীতি ও বিষয়বস্তু পরবর্তী কবিদের প্রভাবিত করেছিল।
বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় রোমান্টিক কাব্য 'লাইলী-মজনু'-এর রচয়িতা হলেন দৌলত উজির বাহরাম খান। তিনি ১৫শ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে ১৬শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে আবির্ভূত একজন কবি ছিলেন।
এই কাব্যটি মৌলিক নয়, বরং ফারসি কবি نظامی গঞ্জভীর (Nizami Ganjavi) বিখ্যাত 'লাইলী ও মজনু' মহাকাব্যের বঙ্গানুবাদ। যদিও এটি একটি অনুবাদকর্ম, তবে বাহরাম খান মূল ফারসি কাহিনীকে অনুসরণ করলেও, তিনি এতে বাঙালি সংস্কৃতি ও সমাজের বিভিন্ন উপাদান যুক্ত করে এটিকে নিজস্ব ঢঙে উপস্থাপন করেছেন, যা এটিকে বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্বতন্ত্র স্থান দিয়েছে। এটি মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক কাব্য হিসেবে পরিচিত।
কৃত্তিবাস ওঝা পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে শ্রীরাম পাঁচালী কাব্যটি রচনা করে বিখ্যাত হন। এটি মূলত সংস্কৃত রামায়ণ অবলম্বনে রচিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা রামায়ণ। কৃত্তিবাসের এই কাব্য বাংলা সাহিত্য ও বাঙালির ধর্মীয় জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এটি শুধু একটি অনুবাদ ছিল না, বরং বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গিয়ে এক নতুন রূপ ধারণ করেছিল। কৃত্তিবাসের পূর্বে বাংলায় রামায়ণ-কেন্দ্রিক কিছু ছোট পাঁচালী কাব্য থাকলেও, তাঁর শ্রীরাম পাঁচালীই প্রথম ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং পরবর্তীকালে বহু কবিকে রামায়ণ রচনায় অনুপ্রাণিত করে। সুলতান রুকুনউদ্দিন বারবক শাহের সভাকবি হিসেবে কৃত্তিবাস ওঝা এই মহাকাব্য রচনা করেন বলে ধারণা করা হয়।
উত্তরঃ
বিজয়গুপ্তর দেশ বরিশাল জেলার গৈলা ইউনিয়নের পদমনাগ গ্রাম। তিনি মনসামঙ্গল উপাখ্যান নিয়ে পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দিকে কাব্য রচনা করেন।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি বিজয়গুপ্ত। তাঁর জন্মস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, ঐতিহাসিকরা মনে করেন তাঁর জন্ম অধুনা বরিশাল জেলার গৈলা ইউনিয়নের পদমনাগ গ্রামে। এটি একটি জনশ্রুতি যা তাঁর কাব্যেও ইঙ্গিত করা হয়েছে।
বিজয়গুপ্ত মূলত মনসামঙ্গল কাব্যের একজন প্রধান কবি হিসেবে পরিচিত। তাঁর রচিত মনসামঙ্গল কাব্য 'পদ্মাপুরাণ' নামেও পরিচিত। এই কাব্যের মূল উপাখ্যান হলো দেবী মনসার মর্ত্যলোকে পূজা প্রচলন এবং চাঁদ সদাগরের সাথে তাঁর সংঘাত। তিনি মনসামঙ্গল কাব্য রচনা করেন পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দিকে (১৪৯৪ খ্রিষ্টাব্দে বা ১৪৮৪ শকাব্দে কাব্য রচনা সমাপ্ত হয় বলে কাব্যে উল্লেখ আছে)।
মনসামঙ্গল কাব্যধারার পঞ্চকবিদের মধ্যে বিজয়গুপ্ত অন্যতম এবং তাঁর কাব্য সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় ও বিস্তারিত বলে বিবেচিত হয়। এই কাব্য মধ্যযুগের বাংলার সমাজ ও ধর্মীয় জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে, যেখানে লৌকিক দেব-দেবী এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্মের মধ্যে সংঘাত ও সমন্বয়ের চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে।
বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণবিদ হলেন পর্তুগিজ ধর্মযাজক ও মিশনারি ম্যানুয়েল দা আসসুম্পসাঁও। তিনি ১৭৪৩ সালে পর্তুগালের লিসবন থেকে পর্তুগিজ ভাষায় একটি ব্যাকরণ গ্রন্থ রচনা করেন, যার পুরো নাম ছিল "Vocabulario em idioma Bengala, e Portuguez" (বাঙালি-পর্তুগিজ অভিধান এবং ব্যাকরণ)।
যদিও এটি পর্তুগিজ ভাষায় রচিত হয়েছিল, তবুও এটিই বাংলা ভাষার প্রথম প্রকাশিত ব্যাকরণ গ্রন্থ। এই গ্রন্থে বাংলা ভাষার ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব এবং বাক্যতত্ত্বের প্রাথমিক আলোচনা স্থান পেয়েছিল। এটি বাংলা ভাষা অধ্যয়নের জন্য একটি ভিত্তি স্থাপন করেছিল এবং ইউরোপীয়দের বাংলা শেখার পথ সুগম করে।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে বাংলা গদ্যের জনক বলা হয় কারণ তিনি বাংলা গদ্যকে একটি সুনির্দিষ্ট রূপ ও শৃঙ্খলা দান করেন। এর আগে বাংলা গদ্যে তেমন কোনো নিয়মশৃঙ্খলা ছিল না এবং এটি সাধু ভাষার কঠোরতা ও সংস্কৃতের প্রভাবযুক্ত ছিল।
তিনি বাংলা গদ্যে যেসব উল্লেখযোগ্য সংযোজন করেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো:
বিরামচিহ্নের প্রবর্তন ও সঠিক ব্যবহার: আধুনিক বাংলা গদ্যে কমা, সেমিকোলন, দাঁড়ি ইত্যাদি বিরামচিহ্নের ব্যবহার তিনিই প্রথম সুসংবদ্ধভাবে চালু করেন, যা গদ্যের অর্থ ও পঠনযোগ্যতা বৃদ্ধি করে।
সরল ও প্রাঞ্জল বাক্যবিন্যাস: বিদ্যাসাগর কঠিন ও জটিল বাক্যকে সহজ-সরল ও সুপাঠ্য বাক্যবিন্যাসে রূপান্তরিত করেন, যা সাধারণ পাঠকের জন্য গদ্যকে সহজলভ্য করে তোলে।
গদ্যের শৈল্পিকতা ও গতিশীলতা: তিনি বাংলা গদ্যকে সংস্কৃতের প্রভাবমুক্ত করে এক নতুন শিল্পরূপ দেন। তাঁর গদ্য ছিল সাবলীল, গতিময় ও সুমধুর।
নির্দিষ্ট কাঠামো ও রূপ: তাঁর হাতেই বাংলা গদ্য প্রথম একটি নির্দিষ্ট কাঠামো ও শৈলী লাভ করে, যা পরবর্তী গদ্য লেখকদের জন্য পথপ্রদর্শক হয়।
তাঁর রচিত 'বেতাল পঞ্চবিংশতি', 'শকুন্তলা', 'সীতার বনবাস' ইত্যাদি গ্রন্থগুলি বাংলা গদ্যের বিকাশে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
কারবালার বিষাদময় ঘটনা অবলম্বনে মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২) ইংরেজ আমলে 'বিষাদ সিন্ধু' মহাকাব্য রচনা করেন। এটি বাংলা সাহিত্যের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ শোকগাথা। গ্রন্থটি মূলত তিনটি খণ্ডে বিভক্ত:
প্রথম খণ্ড: মহরম পর্ব (১৮৮৫)
দ্বিতীয় খণ্ড: উদ্ধার পর্ব (১৮৮৭)
তৃতীয় খণ্ড: এজিদ বধ পর্ব (১৮৯১)
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সাথে কল্পনার মিশ্রণ ঘটিয়ে লেখক কারবালার মর্মান্তিক ঘটনাকে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী রূপে উপস্থাপন করেছেন, যা বাংলা সাহিত্য ও মুসলিম সমাজে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।
উত্তরঃ
মাইকেল মধুসূদন দত্ত। এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ট্র্যাজেডি নাটক।
‘কৃষ্ণকুমারী’ নাটকটি মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত একটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি নাটক। এটি ১৮৬১ সালে প্রকাশিত হয় এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত। এর গুরুত্বগুলি নিম্নরূপ:
প্রথম সার্থক ট্র্যাজেডি: ‘কৃষ্ণকুমারী’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ট্র্যাজেডি নাটক। এর পূর্বে রচিত নাটকগুলোতে ট্র্যাজেডির গভীরতা ও শিল্পসম্মত প্রকাশ ছিল না। মধুসূদনের হাতেই বাংলা সাহিত্যে শেক্সপীয়রীয় ট্র্যাজেডির যথার্থ রূপায়ণ ঘটে।
ঐতিহাসিক পটভূমি: নাটকটি রাজস্থানের ঐতিহাসিক পটভূমিতে রচিত। উদয়পুরের রানা ভীমসিংহের কন্যা কৃষ্ণকুমারীর আত্মাহুতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে এটি আবর্তিত হয়েছে। এটি তৎকালীন রাজস্থানের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ক্ষমতা লিপ্সা এবং সামাজিক রীতিনীতি ফুটিয়ে তুলেছে।
চরিত্র চিত্রণ: নাটকের চরিত্রগুলি, বিশেষ করে কৃষ্ণকুমারী, ভীমসিংহ, জগৎসিংহ, মদনিকা প্রমুখের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও সংঘাতের গভীরতা পাঠককে মুগ্ধ করে। কৃষ্ণকুমারীর আত্মত্যাগ নাটকটিকে মর্মস্পর্শী ট্র্যাজেডিতে পরিণত করেছে।
ভাষাগত উৎকর্ষ: মধুসূদন দত্তের কাব্যিক ভাষা ও প্রখর নাট্যশৈলী এই নাটকের প্রধান বৈশিষ্ট্য। শক্তিশালী সংলাপ এবং নাটকের গতিশীলতা বাংলা নাট্যসাহিত্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সমাজ ও রাজনীতির প্রতিচ্ছবি: নাটকটি শুধু একটি প্রেম বা ট্র্যাজেডির গল্প নয়, এটি তৎকালীন সমাজের রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাজাদের দুর্বলতা এবং সম্মান রক্ষার নামে বলিদানের এক করুণ প্রতিচ্ছবি।
'কুহেলিকা' কাজী নজরুল ইসলাম রচিত একটি বিখ্যাত উপন্যাস, যা ১৯৩১ সালে প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসে প্রেম, বিদ্রোহ, আত্মত্যাগ এবং তৎকালীন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটকে উপজীব্য করা হয়েছে। এটি নজরুলের বিপ্লবী চেতনা ও রোমান্টিক ভাবধারার এক অনবদ্য মিশ্রণ।
কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ এবং দার্শনিক। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ও সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে তার লেখনী ছিল এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর, যে কারণে তিনি 'বিদ্রোহী কবি' হিসেবে সমধিক পরিচিত। তার সাহিত্যে সাম্য, মানবতা এবং বিদ্রোহের বাণী প্রবলভাবে উচ্চারিত হয়েছে।
বাংলাদেশের সাহিত্যে (১৯৪৭-৯৩) প্রথম উল্লেখযােগ্য উপন্যাস হিসেবে আবু ইসহাক রচিত "সূর্য-দীঘল বাড়ী" কে গণ্য করা হয়। এটি ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হয়।
উপন্যাসটি তৎকালীন পূর্ব বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশ) গ্রামীণ সমাজের দরিদ্র মানুষের জীবন সংগ্রাম, দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের যন্ত্রণা, কুসংস্কার এবং ধর্মীয় গোঁড়ামি অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ এবং দেশভাগের ফলে সৃষ্ট আর্থ-সামাজিক বিপর্যয় এর মূল প্রেক্ষাপট।
আবু ইসহাক এই উপন্যাসের মাধ্যমে সমাজের শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের জীবনচিত্র তুলে ধরেছেন, যা তৎকালীন পূর্ব বাংলার সাহিত্যে এক নতুন ধারা উন্মোচন করেছিল। এর বিষয়বস্তু, ভাষা এবং উপস্থাপনা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে এটি বাংলা সাহিত্যের একটি ক্লাসিক হিসেবে বিবেচিত হয় এবং পরবর্তীতে এটি চলচ্চিত্র রূপও লাভ করে, যা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়।
‘কবর’ মুনীর চৌধুরী রচিত একটি বিখ্যাত এক অঙ্কের নাটক। এটি ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রচিত। ভাষা আন্দোলনের সময় মুনীর চৌধুরী কারাগারে বন্দি থাকাকালে নাটকটি রচনা করেন। এতে ৫২-এর ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ এবং বর্বরতার চিত্র রূপকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৫৩ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রাজনৈতিক কর্মীদের দ্বারা নাটকটি প্রথম মঞ্চস্থ হয়। এটি বাংলা সাহিত্যে ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিবেচিত।
একুশের প্রথম সংকলন হলো ভাষা আন্দোলনভিত্তিক সাহিত্য সংকলন 'একুশে ফেব্রুয়ারি', যা ১৯৫৩ সালে হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। এটি ভাষা আন্দোলনের চেতনাসমৃদ্ধ প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সংকলন।
অন্যদিকে, 'বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র' একটি ১৫ খণ্ডের বিশাল সংকলন, যা বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক ১৯৮২ থেকে ১৯৮৯ সালের মধ্যে প্রকাশিত হয়। এই বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের প্রধান সম্পাদক ছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান। এই দলিলপত্রগুলি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত তথ্য, চিঠি, প্রতিবেদন, সাক্ষাৎকার এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক নথি সংরক্ষণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
সর্বজনস্বীকৃত খাঁটি বাংলা ভাষায় রচিত মধ্যযুগের প্রথম কাব্য 'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন'। এটির রচয়িতা মধ্যযুগের আদি বা প্রথম কবি বড়ু চণ্ডীদাস। হাতে লেখা পুঁথিখানির প্রথমে দুটি পাতা, মাঝখানে কয়েকটি পাতা ও শেষের পাতাটি নেই। পুঁথিখানিতে গ্রন্থের নাম, রচনাকাল ও পুঁথি-নকলের দিনক্ষণ কিছুই উল্লেখ নেই। এজন্য কবির পরিচয়, গ্রন্থনাম ও রচনাকাল অংশ পাওয়া যায়নি। তবে পুঁথির সাথে একটি চিরকূট পাওয়া গিয়েছে, তাতে 'শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ব্ব' বলে একটা কথা লিখিত আছে। 'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন' নামটি রাখেন বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ।
১৯০৯ সালে (১৩১৬ বঙ্গাব্দ) পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরের নিকটবর্তী কাকিল্যা (কালিয়া) গ্রামের শ্রীনিবাস আচার্যের দৌহিত্র বংশীয় দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় নামক এক ব্রাহ্মণের বাড়ির গোয়ালঘরের মাচার ওপর থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং পুঁথিশালার অধ্যক্ষ বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ এটি উদ্ধার করেন। বসন্তরঞ্জন রায়ের উপাধি- 'বিদ্বদ্বল্লভ'।
'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন' কাব্যের রচনাকাল-
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহরর মতে
১৪০০ সালে
গোপাল হালদারের মতে
১৪৫০-১৫০০ সালের মধ্যে
বসন্তরঞ্জন রায় ১৯১৬ সালে (১৩২৩ ব.) 'বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ' থেকে এটি প্রকাশ করেন। বর্তমানে এটি ২৪৩/১, আচার্য প্রফুল্ল রায় (কলকাতা) রোডের বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের পুঁথিশালায় সংরক্ষিত আছে। এ কাব্যের মুখবন্ধ লেখেন রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী এবং লিপিকাল বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
চরিত্র: রাধা (জীবাত্মা বা প্রাণিকুল), কৃষ্ণ (পরমাত্মা বা ঈশ্বর) ও বড়ায়ি (রাধাকৃষ্ণের প্রেমের দূতি)।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের অপর নাম 'শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ'। 'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন' নামটি রাখেন বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ।
'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন' কাব্যের কাহিনি সংক্ষেপেঃ
জন্ম খণ্ড: কৃষ্ণ ও রাধা উভয়ে ঈশ্বরের ইচ্ছায় মর্ত্যে মানবরূপে জন্ম নিয়েছে। কৃষ্ণ পাপী কংস রাজাকে বধ করার জন্য দেবকী ও বাসুদেবের সন্তান হিসেবে জন্ম নেয়। জন্মের পরেই বাসুদেব গোপনে কৃষ্ণকে অনেক দুরে বৃন্দাবনে জনৈক নন্দ গোপের কাছে রেখে আসে। সেখানেই দৈব ইচ্ছায় রাধা আরেক গোপ সাগর গোয়ালার স্ত্রী পদ্মার গর্ভে জন্ম নেয়। দৈব নির্দেশেই বালিকা বয়সে নপুংসক আইহন বা আয়ান গোপের সঙ্গে রাধার বিয়ে হয়। আয়ান গোচারণ করতে গেলে রাধাকে বৃদ্ধা পিসি বড়ায়ির তত্ত্বাবধানে রাখা হয়।
তাম্বুল খণ্ড: অন্য গোপ বালিকাদের সাথে রাধা মথুরাতে দই- দুধ বিক্রি করতে যায়। বড়ায়িও যায় তার সাথে। বৃদ্ধা বড়ায়ি পথে রাধাকে হারিয়ে ফেলে এবং রাধার রূপের বর্ণনা দিয়ে কৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করে, এমন রূপসীকে দেখেছে কিনা? রাধার রূপের বর্ণনা শুনে কৃষ্ণ পূর্বরাগ অনুভব করে। সে বড়ায়িকে বুঝিয়ে রাধার জন্য পান ও ফুলের উপহারসহ প্রস্তাব পাঠায়। কিন্তু বিবাহিতা রাধা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
দান খণ্ড: কৃষ্ণ দই-দুধ বিক্রির জন্য মথুরাগামী রাধা ও গোপীদের পথ রোধ করে। তার দাবী নদীর ঘাটে পারাপার-দান বা শুল্ক দিতে হবে, অন্যথায় রাধার সঙ্গে মিলিত হতে দিতে হবে। রাধা কোনভাবেই এ প্রস্তাবে রাজি হয় না। এদিকে তার হাতে কড়িও নেই। রাধা নিজের রূপ কমাবার জন্য চুল কেটে ফেলতে চাইলো; কৃষ্ণের হাত থেকে বাচাঁর জন্য বনে দৌড় দিল। কৃষ্ণ পিছু ছাড়বার পাত্র নয়। অবশেষে কৃষ্ণের ইচ্ছায় কর্ম হয়।
নৌকা খণ্ড: পরবর্তীতে রাধা কৃষ্ণকে এড়িয়ে চলে। কৃষ্ণ নদীর মাঝির ছদ্মবেশ ধারণ করে। একজন পার করা যায় এমন একটি নৌকাতে রাধাকে তুলে সে মাঝ নদীতে নৌকা ডুবিয়ে দেয় এবং রাধার সঙ্গ লাভ করে। নদীতীর উঠে লোকলজ্জার ভয়ে রাধা সখীদের বলে যে, নৌকা ডুবে গিয়েছে, কৃষ্ণ তার জীবন বাঁচিয়েছে, কৃষ্ণ না থাকলে সে ডুবে মারা যেত।
ভার খণ্ড: শরৎকালে শুকনো পথঘাট, তাই হেঁটেই মথুরাতে গিয়ে দুধ-দই বিক্রি করা যায়। কিন্তু রাধা আর বাড়ির বাইরে আসে না। আগের ঘটনাগুলো সে শাশুড়ি বা স্বামীকেও ভয়ে ও লজ্জায় খুলে বলেনি। রাধা অদর্শনে কৃষ্ণ কাতর। সে বড়ায়িকে দিয়ে রাধার শাশুড়িকে বোঝায়, ঘরে বসে থেকে কি হবে, রাধা দই-দুধ বেঁচে কটি পয়সা তো আনতে পারে। শাশুড়ির নির্দেশে রাধা বাইরে বের হয়। কিন্ত প্রচণ্ড রোদে কোমল শরীরে দুধ-দই বহন করতে গিয়ে রাধা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এসময় কৃষ্ণ ছদ্মবেশে মজুরি করতে আসে। পরে ভার বহন অর্থাৎ মজুরির বদলে রাধার আলিঙ্গন কামনা করে। রাধা এই চতুরতা বুঝতে পারে। সে কাজ আদায়ের লক্ষ্যে মিথ্যা আশ্বাস দেয়। তাই কৃষ্ণ আশায় আশায় রাধার পিছু পিছু ভার নিয়ে মথুরা পর্যন্ত আসে।
ছত্র খণ্ড: দুধ-দই বেচে মথুরা থেকে এবার ফেরার পালা। কৃষ্ণ তার প্রাপ্য আলিঙ্গন চাইছে। রাধা চালাকি করে বলে, 'এখনো প্রচণ্ড রোদ। তুমি আমাদের মাথায় ছাতা ধরে বৃন্দাবন পর্যন্ত চলো। পরে দেখা যাবে।' কৃষ্ণ ছাতা ধরতে লজ্জা ও অপমান বোধ করছিল। তবু আশা নিয়েই কৃষ্ণ ছাতা ধরেই চলল। কিন্তু তার আশা পূর্ণ করেনি রাধা।
বৃন্দাবন খণ্ড: রাধার বিরুদ্ধ আচরণ কৃষ্ণের ভাবান্তর ঘটায়। সে অন্য পথ অবলম্বন করে। কৃষ্ণ কটু বাক্য না বলে, দান বা শুল্ক আদায়ের নামে বিড়ম্বনা না করে, বরং বৃন্দাবনকে অপূর্ব শোভায় সাজিয়ে তুলে। রাধা ও গোপীরা সেই শোভা দর্শন করে কৃষ্ণের উপর রাগ ভুলে যায়। কৃষ্ণ সব গোপীকে দেখা দেয়। পরে রাধার সঙ্গে তার দর্শন ও মিলন হয়।
কালিয়দমন খণ্ড: বৃন্দাবনের উপর দিয়ে যমুনা নদী প্রবাহিত। এ যমুনায় কালিয়নাগ বাস করে। কালিয়নাগের বিষে যমুনার জল বিষাক্ত। কৃষ্ণ কালিয়নাগকে তাড়াতে নদীর জলে ঝাঁপ দেয়। দৈব ইচ্ছায় ও কৃষ্ণের বীরত্বে কালিয়নাগ পরাস্ত হয় এবং দক্ষিণ সাগরে বসবাস করতে যায়। কালিয়নাগের সঙ্গে কৃষ্ণ যখন জলযুদ্ধে লিপ্ত তখন রাধার বিশেষ ব্যাকুলতা প্রকাশ পায়।
যমুনা খণ্ড: রাধা ও গোপীরা যমুনাতে জল আনতে যায়। কৃষ্ণ যমুনার জলে নেমে হঠাৎ ডুব দিয়ে আর ওঠে না। সবাই মনে করে কৃষ্ণ ডুবে গেছে। কিন্তু কৃষ্ণ লুকিয়ে কদম গাছে বসে থাকে। রাধা ও সখিরা জলে নেমে কৃষ্ণকে খুঁজতে থাকে। কৃষ্ণ নদীতীরে রাধার খুলে রাখা হার চুরি করে আবার গাছে গিয়ে বসে।
হার খণ্ড: রাধা কৃষ্ণের চালাকি বুঝতে পারে। হার না পেয়ে রাধা কৃষ্ণের পালিতা মা যশোদার কাছে নালিশ করে। কৃষ্ণও মিথ্যে বলে মাকে। কৃষ্ণ বলে, 'আমি হার চুরি করব কেন, রাধাতো পাড়ার সম্পর্কে আমার মামি।' বড়ায়ি সব বুঝতে পারে এবং রাধার স্বামী আয়ান হার হারানোতে যাতে রাগান্বিত না হয় সেজন্য বলে যে, 'বনের কাঁঠায় রাধার গজমতির হার ছিন্ন হয়ে হারিয়ে গেছে।'
বাণ খণ্ড: কৃষ্ণ রাধার উপর ক্রুদ্ধ হয় মায়ের কাছে নালিশ করার জন্য। রাধাও কৃষ্ণের প্রতি প্রসন্ন নয়। বড়ায়ি বুদ্ধি দিলো, কৃষ্ণ যেন শক্তির পথ পরিহার করে মদনবাণ প্রেমে রাধাকে বশীভূত করে। সে মতো কৃষ্ণ পুষ্পধনু নিয়ে কদমতলায় বসে। রাধা কৃষ্ণের প্রেমবাণে মূর্ছিত ও পতিত হয়। এরপর কৃষ্ণ রাধাকে চৈতন্য ফিরিয়ে দেয়। রাধা কৃষ্ণ প্রেমে কাতর হয় এবং কৃষ্ণকে খুঁজে ফেরে।
বংশী খণ্ড: কৃষ্ণ রাধাকে আকৃষ্ট করার জন্য সময়-অসময়ে বাঁশিতে সুর তোলে। কৃষ্ণের বাঁশি শুনে রাধার রান্না এলোমেলো হয়ে যায়, মন কুমারের চুল্লির মতো পুড়তে থাকে, রাত্রে ঘুম আসে না। ভোর বেলা কৃষ্ণ অদর্শনে রাধা মূর্ছা যায়। বড়ায়ি রাধাকে পরামর্শ দেয়, সারারাত বাঁশি বাজিয়ে সকালে কদমতলায় কৃষ্ণ বাঁশি শিয়রে রেখে ঘুমায়। তুমি সেই বাঁশি চুরি করো, তবেই সকল সমস্যার সমাধান হবে। বড়াইয়ের বুদ্ধি শুনে রাধা তাই করে। কিন্তু কৃষ্ণ বুদ্ধিমান, তাই বাঁশি চোর কে তা বুঝতে তার কষ্ট হয় না। রাধা কৃষ্ণকে বলে, বড়ায়িকে স্বাক্ষী রেখে কৃষ্ণের কথা দিতে হবে যে, 'সে কখনো রাধার কথার অবাধ্য হবে না এবং রাধাকে ত্যাগ করে যাবে না, তবেই বাঁশির সন্ধান মিলতে পারে।' কৃষ্ণ কথা দিয়ে বাঁশি ফিরে পায়।
বিরহ খণ্ড: তারপর কৃষ্ণ রাধার উপর উদাসীনতা প্রকাশ করে। মধুমাস সমাগত, তাই রাধা বিরহ অনুভব করে। রাধা বড়ায়িকে বলে, কৃষ্ণকে এনে দিতে। দুধ-দই বিক্রির ছল করে রাধা নিজেও কৃষ্ণকে খোঁজার জন্য বের হয়। অবশেষে বৃন্দাবনে বাঁশি বাজানো অবস্থায় কৃষ্ণকে পাওয়া যায়। কৃষ্ণ রাধাকে বলে, 'তুমি আমাকে নানা সময় লাঞ্ছনা করেছো, ভার বহন করিয়েছো, মায়ের কাছে আমার নামে বিচার দিয়েছো, তাই তোমার উপর আমার মন উঠে গেছে।' রাধা বলে, 'তখন আমি বালিকা ছিলাম, আমাকে ক্ষমা কর। আমি তোমার বিরহে মৃতপ্রায়। তির্যক দৃষ্টি হলেও তুমি আমার দিকে তাঁকাও।' কৃষ্ণ বলে, 'বড়ায়ি যদি আমাকে বলে যে তুমি রাধাকে প্রেম দাও, তাহলে আমি তোমার অনুরোধ রাখতে পারি।' অবশেষে বড়ায়ি রাধাকে সাজিয়ে দেয় এবং রাধাকৃষ্ণের মিলন হয়। রাধা ঘুমিয়ে পড়লে কৃষ্ণ নিদ্রিতা রাধাকে রেখে কংস বধ করার জন্য মথুরাতে চলে য়ায়। ঘুম থেকে উঠে কৃষ্ণকে না দেখে রাধা আবার বিরহকাতর হয়ে পড়ে। রাধার অনুরোধে বড়ায়ি কৃষ্ণের সন্ধানে যায় এবং মধুরাতে কৃষ্ণকে পেয়ে অনুরোধ করে, 'রাধা তোমার বিরহে মৃতপ্রায়। তুমি উন্মাদিনীকে বাঁচাও।' কিন্তু কৃষ্ণ বৃন্দাবনে যেতে চায় না এবং রাধাকে গ্রহণ করতেও চায় না। কৃষ্ণ বলে, 'আমি সব ত্যাগ করতে পারি, কিন্তু কটুকথা সহ্য করতে পারি না। রাধা আমাকে কটুকথা বলেছে।' ('শ্রীকৃষ্ণকীর্তন' কাব্য এখানেই ছিন্ন। পরবর্তী পৃষ্ঠা পাওয়া যায়নি। তাই এ গ্রন্থের সমাপ্তি কেমন তা জানা যায় না।)
“সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই” এই বিখ্যাত উক্তিটি মধ্যযুগের বিখ্যাত বাঙালি কবি চণ্ডীদাসের বাণী হিসেবে পরিচিত। এই উক্তিটির মাধ্যমে মানবধর্মকে সর্বোচ্চ স্থান দেওয়া হয়েছে, যেখানে মানুষ এবং মানবতাই সবকিছুর ঊর্ধ্বে বলে বিবেচিত। এটি তৎকালীন সমাজের ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং ভেদাভেদের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ ছিল এবং মানবতাবাদী চিন্তাধারার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। চণ্ডীদাস মূলত বৈষ্ণব পদাবলী রচনার জন্য বিখ্যাত, যেখানে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলার মাধ্যমে মানবপ্রেম ও ঈশ্বরপ্রেমের গভীর সম্পর্ক প্রকাশিত হয়েছে।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ এবং মধ্যযুগের প্রথম নিদর্শন হিসেবে এটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাস। কাব্যটি বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে বাঁকুড়া জেলার কাকিল্যা গ্রাম থেকে আবিষ্কার করেন এবং ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে এটি প্রকাশিত হয়।
কাব্যটির রচনাকাল:
সাধারণত চতুর্দশ শতাব্দীর শেষ ভাগ (আনুমানিক ১৩৫০-১৪০০ খ্রিস্টাব্দ) এর রচনাকাল হিসেবে ধরা হয়। ভাষাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক প্রমাণের ভিত্তিতে এই সময়কালকেই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করা হয়।
কাব্যটির গুরুত্ব:
ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক মূল্য: এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম মানবীয় প্রেমমূলক কাব্য এবং বৈষ্ণব পদাবলীর উৎস। বৈষ্ণব সাহিত্যধারার এক সুস্পষ্ট পথনির্দেশক হিসেবে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
ভাষাতাত্ত্বিক গুরুত্ব: শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের ভাষা প্রাক-চৈতন্য যুগের মধ্য বাংলা ভাষার মূল্যবান নিদর্শন। এই কাব্যের মাধ্যমে প্রাচীন বাংলা ও আধুনিক বাংলার মধ্যবর্তী ভাষার বিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য: কাব্যে বর্ণিত রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা তৎকালীন বাঙালি সমাজের প্রেম-ভাবনা, সামাজিক রীতিনীতি, দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং ধর্মচিন্তার একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। এর মাধ্যমে দেবতাকে মানবীয় রূপে দেখার প্রবণতা প্রকাশ পেয়েছে।
আখ্যানগত বৈশিষ্ট্য: এটি একটি আখ্যানকাব্য যা কাহিনি প্রবাহের মধ্য দিয়ে রাধা, কৃষ্ণ ও বড়াইয়ের চরিত্র অঙ্কন করেছে। রাধা-কৃষ্ণের সম্পর্কের মানবিক দিকগুলি এই কাব্যে গভীর সংবেদনশীলতার সাথে চিত্রিত হয়েছে।
এই কাব্যটি আবিষ্কারের পর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নতুন করে রচিত হয়েছিল এবং এর মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের ধারাবাহিকতা সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করা সম্ভব হয়েছে।
শাহ মুহম্মদ সগীর মধ্যযুগের প্রথম দিকের একজন বাঙালি কবি ছিলেন এবং তাঁর রচিত ইউসুফ-জোলেখা কাব্য বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এটি বাংলা সাহিত্যের মুসলিম কবি কর্তৃক রচিত প্রথম রোমান্টিক প্রণয়কাব্য হিসেবে পরিচিত। এর গুরুত্ব নিম্নরূপ:
এটিই মুসলিম কবি কর্তৃক রচিত প্রথম উল্লেখযোগ্য কাব্য যা প্রণয়মূলক বিষয়বস্তু নিয়ে রচিত। এর আগে দেব-দেবী বা মঙ্গলকাব্যের প্রভাব ছিল বেশি।
কাব্যটি ফার্সি সাহিত্যের প্রভাব থেকে ইউসুফ-জোলেখার জনপ্রিয় আখ্যানকে বাংলায় নিয়ে আসে, যা বাংলা সাহিত্যে নতুন ধারার উন্মোচন করে।
এটি প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় বিষয়বস্তুর পাশাপাশি সেক্যুলার বা আধা-সেক্যুলার প্রেমকাহিনিও কাব্য রচনার বিষয়বস্তু হতে পারে।
এ কাব্যে তৎকালীন বাংলা ভাষার একটি পরিশীলিত রূপ পরিলক্ষিত হয়, যা পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
আখ্যানকাব্য রচনার ধারায় এটি এক মাইলফলক হিসেবে গণ্য এবং এর রচনারীতি ও বিষয়বস্তু পরবর্তী কবিদের প্রভাবিত করেছিল।
বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় রোমান্টিক কাব্য 'লাইলী-মজনু'-এর রচয়িতা হলেন দৌলত উজির বাহরাম খান। তিনি ১৫শ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে ১৬শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে আবির্ভূত একজন কবি ছিলেন।
এই কাব্যটি মৌলিক নয়, বরং ফারসি কবি نظامی গঞ্জভীর (Nizami Ganjavi) বিখ্যাত 'লাইলী ও মজনু' মহাকাব্যের বঙ্গানুবাদ। যদিও এটি একটি অনুবাদকর্ম, তবে বাহরাম খান মূল ফারসি কাহিনীকে অনুসরণ করলেও, তিনি এতে বাঙালি সংস্কৃতি ও সমাজের বিভিন্ন উপাদান যুক্ত করে এটিকে নিজস্ব ঢঙে উপস্থাপন করেছেন, যা এটিকে বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্বতন্ত্র স্থান দিয়েছে। এটি মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক কাব্য হিসেবে পরিচিত।
কৃত্তিবাস ওঝা পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে শ্রীরাম পাঁচালী কাব্যটি রচনা করে বিখ্যাত হন। এটি মূলত সংস্কৃত রামায়ণ অবলম্বনে রচিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা রামায়ণ। কৃত্তিবাসের এই কাব্য বাংলা সাহিত্য ও বাঙালির ধর্মীয় জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এটি শুধু একটি অনুবাদ ছিল না, বরং বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গিয়ে এক নতুন রূপ ধারণ করেছিল। কৃত্তিবাসের পূর্বে বাংলায় রামায়ণ-কেন্দ্রিক কিছু ছোট পাঁচালী কাব্য থাকলেও, তাঁর শ্রীরাম পাঁচালীই প্রথম ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং পরবর্তীকালে বহু কবিকে রামায়ণ রচনায় অনুপ্রাণিত করে। সুলতান রুকুনউদ্দিন বারবক শাহের সভাকবি হিসেবে কৃত্তিবাস ওঝা এই মহাকাব্য রচনা করেন বলে ধারণা করা হয়।
উত্তরঃ
বিজয়গুপ্তর দেশ বরিশাল জেলার গৈলা ইউনিয়নের পদমনাগ গ্রাম। তিনি মনসামঙ্গল উপাখ্যান নিয়ে পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দিকে কাব্য রচনা করেন।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি বিজয়গুপ্ত। তাঁর জন্মস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, ঐতিহাসিকরা মনে করেন তাঁর জন্ম অধুনা বরিশাল জেলার গৈলা ইউনিয়নের পদমনাগ গ্রামে। এটি একটি জনশ্রুতি যা তাঁর কাব্যেও ইঙ্গিত করা হয়েছে।
বিজয়গুপ্ত মূলত মনসামঙ্গল কাব্যের একজন প্রধান কবি হিসেবে পরিচিত। তাঁর রচিত মনসামঙ্গল কাব্য 'পদ্মাপুরাণ' নামেও পরিচিত। এই কাব্যের মূল উপাখ্যান হলো দেবী মনসার মর্ত্যলোকে পূজা প্রচলন এবং চাঁদ সদাগরের সাথে তাঁর সংঘাত। তিনি মনসামঙ্গল কাব্য রচনা করেন পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দিকে (১৪৯৪ খ্রিষ্টাব্দে বা ১৪৮৪ শকাব্দে কাব্য রচনা সমাপ্ত হয় বলে কাব্যে উল্লেখ আছে)।
মনসামঙ্গল কাব্যধারার পঞ্চকবিদের মধ্যে বিজয়গুপ্ত অন্যতম এবং তাঁর কাব্য সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় ও বিস্তারিত বলে বিবেচিত হয়। এই কাব্য মধ্যযুগের বাংলার সমাজ ও ধর্মীয় জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে, যেখানে লৌকিক দেব-দেবী এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্মের মধ্যে সংঘাত ও সমন্বয়ের চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে।