লোক সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ প্রবাদ-প্রবচন। 'প্রবাদ' ও 'প্রবচন' মূলত একই অর্থ বহন করে। স্ববাদ হচ্ছে পরম্পরাগত বাক্য, জনশ্রুতি এবং 'প্রবচন' হচ্ছে প্রকৃষ্ট বচন, অর্থাৎ বহু প্রচলিত উক্তি। মানুষের দীর্ঘদিনের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে ঐ সমাজের কোনো সৃষ্টিশীল ব্যক্তি যে চৌকস অভিব্যক্তি বাণীবদ্ধ করে, তাই কালে কালে প্রবাদে পরিণত হয়। যেমন- অতি চালাকের গলায় দড়ি, কয়লা ধুলে ময়লা যায় না ইত্যাদি।
প্রবাদের বৈশিষ্ট্য:
ক. প্রবাদে জাতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, পরিণত বুদ্ধি এবং লোকমনে প্রচলিত সত্য কথন প্রকাশিত হয়।
খ. প্রবাদের অবয়ব হলো একটি সংক্ষিপ্ত বাক্য।
গ. উপমা, বক্রোক্তি, বিরোধাভাস প্রভৃতি অলংকারযোগে তা গঠিত হয়।
প্রবাদের শ্রেণিবিভাগ: অর্থ বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে প্রবাদকে নানাভাবে ভাগ করা যায়। যেমন-
১. সাধারণ অভিজ্ঞতাবাচক : চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে।
২. নীতিকথামূলক : ধর্মের কল বাতাসে নড়ে।
৩. ইতিকথামূলক : ধান ভানতে শিবের গীত।
৪. মানবচরিত্র সমালোচনামূলক : গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল।
৫. সামাজিক রীতিনীতিজ্ঞাপক: মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত।
৬. প্রসিদ্ধ ঘটনামূলক : লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন।
গুরুত্বপূর্ণ প্রবাদ-প্রবচন:
প্রবাদ
অর্থ
প্রবাদ
অর্থ
অতি লোভে তাঁতি নষ্ট
বেশি লোভে ক্ষতি
ধর্মের ঢাক আপনি বাজে
পাপ কখনো চাপা থাকে না
অতি দর্পে হত লঙ্কা
অহংকার পতনের মূল
ধর্মের কল বাতাসে নড়ে
অপকর্ম প্রকাশিত হয়ে পড়েই
অতি মেঘে অনাবৃষ্টি
অতি আড়ম্বরে কাজ হয় না
ধরাকে সরা জ্ঞান করা
সকলকে তুচ্ছ ভাবা
অল্পজলের মাছ
নিতান্তই বোকা
ধরি মাছ না ছুঁই পানি
কৌশলে কার্যোদ্ধার
অন্ধকে দর্পণ দেখানো
নির্বোধকে জ্ঞান দান
নাকে তেল দিয়ে ঘুমানো
নিশ্চিত কার্যোদ্ধার
অসারের তর্জন গর্জন সার
গুণহীনের বৃথা আস্ফালন
পাকা ধানে মই দেয়া
বিপুল ক্ষতি করা
ওঝার ব্যাটা বনগরু
পণ্ডিতের মূর্খ পুত্র
পাপের ধন প্রায়শ্চিত্তে যায়
অসদুপায়ে অর্জিত ধন নষ্ট হয়
কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ
কারো সুদিন, কারো দুর্দিন
পর্বতের মুষিক প্রসব
বিপুল উদ্যোগে তুচ্ছ অর্জন
কপাল গুণে গোপাল ঠাকুর
অযোগ্যের ভাগ্যগুণে বড় হওয়া
বামন হয়ে চাঁদে হাত
অসম্ভব কিছু পাওয়ার চেষ্টা
কাঁচা বাঁশে ঘুন
অল্প বয়সেই স্বভাব নষ্ট হওয়া
বারো মাস ত্রিশ দিন
প্রতিদিন
কত ধানে কত চাল
টের পাওয়ানো
বারো মাসে তেরো পার্বণ
উৎসবের আধিক্য
খাস তালুকের প্রজা
খুব অনুগত ব্যক্তি
বরের ঘরে পিসী কনের ঘরে মাসী
কুল রক্ষা করে চলা
খিচুড়ি পাকানো
বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা
বজ্র আটুনি ফস্কা গেরো
বাহিরে আড়ম্বর ভিতরে শূন্য
গন্ধমাদন বয়ে আনা
প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু আনা
বোঝার উপর শাকের আঁটি
অতিরিক্তের অতিরিক্ত
গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল
পাওয়ার আগে ভোগের আয়োজন
বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খাওয়া
ক্ষমতা প্রদর্শন
ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসে
অন্যের কষ্ট দেখে আনন্দ প্রকাশ
বিনা মেঘে বজ্রপাত
আকস্মিক বিপদ
চাল না চুলো ঢেঁকি না কুলো
নিতান্ত নিঃস্ব
বানরের গলায় মুক্তার হার
অপাত্রে উৎকৃষ্ট সামগ্রী দান
জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ
ছোট বড় যাবতীয় কাজ করা
বাজারে কাটা
বিক্রি হওয়া
ঝোপ বুঝে কোপ মারা
সুযোগমত কাজ করা
ভদ্রতার বালাই
সাধারণ সৌজন্যবোধ
টো টো কোম্পানির ম্যানেজার
ভবঘুরে
মেঘের ছায়া
অশুভ লক্ষণ
ঢাক ঢাক গুড় গুড়
গোপন রাখার প্রয়াস
যত দোষ নন্দ ঘোষ
দুর্বলের প্রতি সর্বদা দোষারোপ
তেলে মাথায় তেল দেয়া
যার আছে তাকে আরো
শিখণ্ডী খাড়া করা
যার আড়ালে থেকে অন্যায় কাজ করা
দুধ কলা দিয়ে সাপ পোষা
শত্রুকে সযত্নে লালন পালন করা
সাপও মরে, লাঠিও না ভাঙ্গে
উভয় কুল রক্ষা
ধান ভানতে শিবের গীত
অপ্রাসঙ্গিক কথার অবতারণা
হরি ঘোষের গোয়াল
অনেক লোকের কোলাহল
প্রবাদ
অর্থ
অজার যুদ্ধে আটুনি সার
লঘু ফলাফলযুক্ত আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন
অতি দানে বলির পাতালে হলো ঠাঁই
অন্যের কৌশলে ভোগান্তির শিকার
অতি মন্থনে বিষ ওঠে
কোনো বিষয়ে মাত্রাতিরিক্ত আলোড়ন ক্ষতিকর
অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট
বেশি লোক কাজের বিশৃঙ্খলা ঘটায়
অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী
স্বল্পজ্ঞান নিয়ে বাড়াবাড়ি মূর্খতার পরিচয়
অন্ধের হাতি দেখা
অল্পজ্ঞান লাভ করে বিজ্ঞের মতো অভিমত
অশ্বত্থামা হত ইতি গজ
কোনো কথা সম্পূর্ণ পরিষ্কার না করে সত্য গোপন
আগ নাংলা যে দিকে যায়, পাছ নাংলা সে দিকে যায়
অন্যের দৃষ্টান্ত অনুসরণ
আসলে মুষল নাই ঢেঁকি ঘরে চাঁদোয়া
বাইরে বাবুগিরি অথচ ভিতরে সারশূন্য
ইটটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয়
যেমন কর্ম তেমন ফল
ইল্লত যায়না ধুলে খাসলত যায়না মলে
স্বভাবদোষ হাজার সংশোধনের চেষ্টাতেও দূর হয়না
উনো বর্ষায় দুনো শীত
যে বছর কম বৃষ্টি হয়, সে বছরে শীত বেশি পড়ে
কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ, পাকলে করে ঠাস ঠাস
সময়ে কাজে না লাগালে অসময়ে পথে ফেরানো কঠিন
চকচক করলেই সোনা হয় না
চেহারাতে আসল গুণ ধরা পড়ে না
চেনা বামুনের পৈতা লাগে না
মানী ব্যক্তির পরিচয়ের প্রয়োজন পড়ে না
চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনী
অসাধুকে উপদেশ দিয়ে সৎ করা যায় না
ঝিকে মেরে বৌকে শেখানো
একজনকে বকা দিয়ে অপরকে শিক্ষা দেয়া
ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার
যোগ্যতা বা ক্ষমতাহীনের আড়ম্বর
দশচক্রে ভগবান ভূত (ভগবান অর্থ- ঈশ্বর)
দশ জনের চক্রান্তে ন্যায়কে অন্যায় করা
দেবতার বেলা লীলাখেলা, পাপ লিখেছে মানুষের বেলা
সামাজিক বিধি-বিধানের নিষ্ঠুর প্রয়োগ
নাচতে না জানলে উঠোন ভাঙা (বাঁকা)
অকর্মণ্য ব্যক্তি কাজে অসফলতার পর অন্যের দোষ দেয়
নিজের চরকায় তেল দেয়া
অন্যের কাজে মাথা না ঘামিয়ে নিজের কাজে মনোযোগ দেয়া
পরের ধনে পোদ্দারি / পরের মাথায় কাঁঠাল ভাঙ্গা
অন্যের টাকায় বাহাদুরি / পরকে কষ্ট দিয়ে নিজের স্বার্থোদ্ধার
পড়েছি মোগলের হাতে খানা খেতে হবে সাথে
বিপদে পড়ে কাজ করা
পুরানো চাল ভাতে বাড়ে
অভিজ্ঞতা বা প্রবীণত্বের মূল্য বেশি
পান্তা ভাতে ঘি নষ্ট, বাপের বাড়ি ঝি নষ্ট
দরিদ্রের বড়লোক ভাব দেখানো/অপব্যবহার
বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে
জীবমাত্রই স্বাভাবিক অবস্থানে সুন্দর
বিড়ালের ভাগ্যে শিকা ছেঁড়া
ভাগ্যক্রমে বিনা চেষ্টাতে বাঞ্ছিত বস্তু লাভ
বড়র পিরিতি বালির বাঁধ ক্ষণে হাতে দড়ি, ক্ষণেকে চাঁদ
উচ্চস্তরের সঙ্গে সম্বন্ধ ক্ষণস্থায়ী
মারের ওপর ওষুধ নাই
সহজভাবে কোনো চেষ্টা ব্যর্থ হলে তার উপর নিষ্ঠুর আচরণ
যদি হয় সুজন, তেঁতুল পাতায় ন জন
মিলেমিশে কাজ করলে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়
যে দামে কেনা সেই দামে বিক্রি
যা কিনতে অর্থ খরচ হয়নি, তা নষ্ট হলে লাভ ক্ষতির হিসাব চলে না
সমাজে বসবাস করতে হলে মানুষকে একে অপরের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে হয় এবং সমাজে শত্রু-মিত্র উভয়ের সাথেই কোন না কোনভাবে মেলামেশা হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয় সেটি হল শিক্ষা। মানুষের বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে শিক্ষার মানদণ্ডটি অতীব জরুরি। কেননা, অশিক্ষিত বন্ধুর যত আন্তরিকতাই থাক না কেন, সে যে কোন মুহূর্তে নিজের অজ্ঞতাবশত অনেক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বলা হয়, মূর্খ ব্যক্তি পশুর সমান। ভালোমন্দ বিচার করার যথাযথ ক্ষমতা তার নেই। অনেক সময় বন্ধুর ভালোর জন্য কিছু করলেও তার অজ্ঞতার কারণে তা বন্ধুর ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। এজন্য তাকে দোষও দেওয়া যায় না। অন্যদিকে, শত্রুকে আমরা সাধারণত অনিষ্টের কারণ হিসেবেই বিবেচনা করি। কিন্তু তুলনামূলক বিচারে দেখা যায়, একজন মুর্খ বন্ধু অজ্ঞতাবশত যা করতে পারে, একজন শিক্ষিত শত্রু সজ্ঞানে তেমনটি করতে পারে না। জ্ঞানের নির্মল পরশ অন্তত তাকে এ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারে। যদি অনিষ্ট সে করে তবে সেটা হবে তার দুরাচার। আর মানুষ সব সময়ই শত্রুর দুরাচার সম্পর্কে সজাগ থাকে। ফলে শত্রুর এ চেষ্টা সফল নাও হতে পারে। কিন্তু বন্ধুর ব্যাপারে কোন সন্দেহ না থাকায় মানুষ এতটা সতর্ক থাকে না। অথচ এ অসতর্কতার ফাঁকে মূর্খ বন্ধুর অজ্ঞতাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তাই বন্ধু নির্বাচনে জ্ঞান, প্রজ্ঞা আর শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা, জ্ঞান আলো এবং মূর্খতা অন্ধকারের সমতুল্য। আলোতে অনেক বিপদেও নিরাপদ থাকা যায়, অন্যদিকে অন্ধকারে সর্বদাই বিপদের আশঙ্কা থাকে
"ভাবের ললিত ক্রোড়ে না রাখি নিলীন, কর্মক্ষেত্রে করি দাও সক্ষম স্বাধীন।"
এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "যতদিন ছিলে" কবিতার একটি অংশ।
**ভাব-সম্প্রসারণ:**
এই উদ্ধৃতিটি একটি গভীর জীবনদর্শনের প্রতিফলন। এখানে 'ভাবের ললিত ক্রোড়ে না রাখি নিলীন' বলতে বোঝানো হচ্ছে যে, ব্যক্তিগত চিন্তা, অনুভূতি বা ভাবনাগুলোকে শুধুমাত্র মনস্তাত্ত্বিক বা আবেগগতভাবে না রেখে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে হবে। 'নিলীন' শব্দের মাধ্যমে এখানে অভ্যন্তরীণ চিন্তা বা অনুভূতির গভীরতা প্রকাশ করা হয়েছে, যা শুধুমাত্র অন্তরেও লুকিয়ে থাকলে চলবে না। অন্যদিকে, 'কর্মক্ষেত্রে করি দাও সক্ষম স্বাধীন' বাক্যে বলা হচ্ছে যে, আমাদের দক্ষতা, কর্মক্ষমতা ও স্বাধীনতা কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করা উচিত। কর্মক্ষেত্রে আমরা যে সিদ্ধান্ত নিতে পারি এবং যে কাজ করতে পারি, তা যেন আমাদের স্বাধীনতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে হয়। এখানে স্বাধীনতার সাথে সক্ষমতার সম্মিলন প্রস্ফুটিত হচ্ছে, যেখানে ব্যক্তি নিজের দক্ষতা অনুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজ করার স্বাধীনতা পায়। সংক্ষেপে, এই উদ্ধৃতিটি আমাদেরকে উৎসাহিত করে যে, আমাদের অভ্যন্তরীণ ভাবনা বা চিন্তাকে শুধু মনে সীমাবদ্ধ না রেখে, বাস্তব জীবনের কাজে লাগিয়ে কার্যকরীভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে নিজের সক্ষমতা ও স্বাধীনতা প্রমাণ করতে হবে।
উত্তরঃ
আমরা সবসময় ভাবের গহনায়, অনুভূতির গভীরতায় হারিয়ে থাকি, যেখানে কোনো এক নিস্তব্ধতা বা মাধুর্য লুকিয়ে থাকে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে, বাস্তব জীবনে সেই ভাবনার পরিবর্তে আমাদের প্রমাণিত করতে হয় আমাদের ক্ষমতা এবং স্বাধীনতার। সেখানে ভাবের বন্দি হয়ে থাকার সুযোগ নেই। আমরা যদি শুধু ভাবনায় নিমজ্জিত থাকি, তবে বাস্তবতার চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারব না।
এখানে "ভাবের ললিত ক্রোড়ে" বলতে বোঝানো হচ্ছে যে আমরা আমাদের ভাবনাগুলোকে এতটাই গুরুত্ব দিই যে সেগুলো আমাদের কর্মক্ষমতা বা স্বাধীনতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু বাস্তবিকভাবে আমাদের শক্তি এবং স্বাধীনতা আমাদের কাজের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়। আমাদের উচিত আমাদের ভাবনার সাথে সাথে কর্মক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে কাজ করা, যাতে আমাদের সক্ষমতা এবং স্বাধীনতা স্বতন্ত্রভাবে প্রকাশ পায়।
এইভাবে, কবি আমাদের শেখাতে চাইছেন যে ভাবনা ও কর্মের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। ভাবনার সৌন্দর্য বা গভীরতা তার স্থানেই মূল্যবান, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা ও স্বাধীনতার প্রয়োগই আসল বিষয়।
“যত মত তত পথ” – এই প্রবাদটি মানব সমাজের বৈচিত্র্য, চিন্তার স্বাধীনতা এবং সত্য উপলব্ধির বহুবিধ পন্থাকে নির্দেশ করে। জগৎ ও জীবনের জটিলতা এত গভীর যে, একটি মাত্র দৃষ্টিকোণ থেকে এর সম্পূর্ণতা অনুধাবন করা অসম্ভব। মানুষ যেহেতু স্বতন্ত্র সত্তা, তাদের চিন্তাভাবনা, অভিজ্ঞতা, বিশ্বাস এবং মূল্যবোধ ভিন্ন হওয়া স্বাভাবিক। এই ভিন্নতা থেকেই জন্ম নেয় বহুমুখী মতাদর্শ।
সৃষ্টির প্রতিটি বস্তুর মধ্যেই রয়েছে বৈচিত্র্য। জীবজগৎ থেকে শুরু করে সামাজিক রীতিনীতি, ধর্ম, দর্শন – সবকিছুতেই এই বৈচিত্র্যের প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। মানুষ নিজেদের পারিপার্শ্বিকতা, শিক্ষা ও রুচি অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন পথ বেছে নেয় তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য। আধ্যাত্মিক সাধনার ক্ষেত্রে যেমন বিভিন্ন ধর্ম ও মতবাদ ঈশ্বর বা পরম সত্যে পৌঁছানোর ভিন্ন ভিন্ন পথ নির্দেশ করে, তেমনই সামাজিক বা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় একটি সমস্যার সমাধানে একাধিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়।
একক মতবাদ বা পথকে সর্বশ্রেষ্ঠ মনে করে অন্য সব মত ও পথকে অস্বীকার করা এক সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচায়ক। বস্তুত, যত বেশি মত থাকবে, ততই চিন্তার ক্ষেত্র প্রসারিত হবে, নতুন নতুন ধারণার উন্মোচন হবে এবং সমাজের প্রগতি ত্বরান্বিত হবে। সুস্থ সমাজ ও উন্নত রাষ্ট্র গঠনে পরমতসহিষ্ণুতা এবং ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ অত্যন্ত জরুরি। ভিন্ন মতের অস্তিত্বকে স্বীকার করে নিলেই কেবল মানবিক মূল্যবোধ ও সহাবস্থান সম্ভব। এই প্রবাদটি মূলত সহনশীলতা, উদারতা এবং বহুত্ববাদের মহিমাকে তুলে ধরে।
গতিময়তাই জীবনের ধর্ম। যে ব্যক্তি বা জাতি গতিহীন ও নিষ্ক্রিয়, সে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে পারে না। কর্মহীন জীবন যেমন অর্থহীন, তেমনি গতিহীন জাতিও একসময় স্থবির হয়ে পড়ে। পঙ্কিলতা ও শৈবাল যেমন নদীর স্রোতধারাকে রুদ্ধ করে দেয়, তেমনি প্রাচীন ও জীর্ণ লোকাচার বা অন্ধ বিশ্বাস একটি জাতির অগ্রগতিকে পদে পদে ব্যাহত করে।
নদী তার স্বাভাবিক ধর্মেই বহমান থাকে। কিন্তু যখন তার স্রোত কমে যায়, তখন চারপাশ থেকে আসা শৈবাল ও আবর্জনা জমে তার গতিকে সম্পূর্ণ থামিয়ে দেয়। এর ফলে নদী তার নিজস্বতা হারায় এবং একসময় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। একইভাবে, যে জাতি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না, নতুন জ্ঞান ও প্রগতিকে গ্রহণ করতে অনীহা দেখায়, তারাই ধীরে ধীরে জীবনশক্তি হারিয়ে ফেলে। জীর্ণ ও অপ্রয়োজনীয় লোকাচার, কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাস তখন সেই জাতির অগ্রগতির পথে বিশাল বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
সমাজ ও জীবনের জন্য কল্যাণকর নয় এমন প্রথা বা বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে থাকলে কোনো জাতিই উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারে না। জাতির প্রাণশক্তি ও মননশীলতা সচল না থাকলে তা স্থবির হয়ে পড়ে এবং কালের বিবর্তনে পিছিয়ে যায়। তাই জাতীয় জীবনে গতিশীলতা বজায় রাখা এবং কুসংস্কার ও জীর্ণ লোকাচারকে পরিহার করা অপরিহার্য। এর মাধ্যমেই একটি জাতি প্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারে।