যুদ্ধ নয় শান্তি
ভূমিকা:
"আর যুদ্ধ নয়, নয়।
আর নয় মায়েদের শিশুদের কান্না
রক্ত কি, ধ্বংস কি, যুদ্ধ আর না, আর না।"
না, বিশ্বের শান্তি প্রিয় মানুষ আর যুদ্ধ চায় না। তবু মানুষকে যুদ্ধের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়। বিগত সাড়ে পাঁচ হাজার বছরে মানুষ প্রতাক্ষ করেছে সড়ে চৌদ্দ হাজার যুদ্ধ। বিংশ শতাব্দীর দুটি ভয়াবহ বিশ্বযুদ্ধ বিশ্বের মানুষকে বুঝিয়ে দিয়েছে যুদ্ধ কী? যুদ্ধের ভয়াবহতা কত নির্মম। তাইজে শান্তিকামী মানুষরা প্রতিষ্ঠা করুন জাতিসংঘ নামক আন্তজার্তিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু একাবিংশ শতাব্দীর মানুষ ইরাকের যুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করতেছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পৈশাচিক উল্লাস। শিশুর কান্নায়, নারীর আর্তনাদে, লাশের গন্ধে ইরাকের আকাশ ভারী হয়ে উঠলেও লোভী শৃগালের মতো মার্কিন প্রশাসনের দৃষ্টি এখন তেল সম্পদের দিকে।
প্রাচীন যুদ্ধ: প্রাচীনকালেও পৃথিবীতে যুদ্ধ ছিল। সে সময়কার মহাকাব্যেগুলোও যুদ্ধভিত্তিক। যুদ্ধের মাধ্যমেই এক একটি সভ্যতার জন্ম হয়েছে। আমর হোমারের মহাকাব্য 'ইলিয়াড' ও 'ভডিসির' মধ্যে প্রাচীনকালের যুদ্ধের ভয়াবহ বর্ণনা পাই। বর্তমানেও এরই ধারা অব্যাহত রেখে চলছে যুদ্ধ। সভ্যতার ইতিহাস শ্রেণিদ্বন্দ্ব ও শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাস। মানবসভয়তার সেই প্রত্যুষ মুহূর্ত থেকেই যুদ্ধ, সংঘর্ষ আর রক্তপাত। তারই মধ্য দিয়ে শক্তিশালীর ঘটেছে উত্তরণ। একের বিনাশে অপরের অস্তিত্ব হয়েছে সুরক্ষিত। আজও মানুষ ভুলতে পারে নি সেই রক্তাক্ত দিনের ভয়ংকর স্মৃতি। প্রাচীন বর্বর যুগের অসভ্য মানুষ আজকের সভ্য মানুষ হয়ে যুদ্ধের নির্মম অর্থ জেনে গেছে, যুদ্ধ নিয়ে আর নড় নয়, নয় প্রভুত্বের বিস্তারের বিলাসিতা। যুদ্ধ মানে আজ সপ্ততার বিনাশ, যুদ্ধ মানে এখন মানুষের অস্তিত্বের বিলোপ। তবে আজকের মতো পারমাণবিক যুদ্ধ কিংবা আধুনিক সব সমরাস্ত্র নিয়ে প্রাচীনকালে যুদ্ধ হতো না। মুখের ভেল পল্টানোর সাথে সাথে পাল্টে গেছে মানুষের যুদ্ধ করার উপকরন সমূহের।
যুদ্ধ কেন হয়?ঃ এক সময় মানুষ যুদ্ধ করতো নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জনা। হিংস্র জন্তু জানোয়ারের হাত থেকে বাঁচার জন্য মানুষ যুদ্ধ করত। আর এখন মানুষ যুদ্ধ করে নিজের ক্ষমতা আর অস্তিত্বের অস্তিত্ব এবং নিজের স্বার্থরক্ষার জন্য। পাশাপাশি অন্যকে করংস করার জন্য, অন্যের সম্পদ দখল করার জন্য ও অন্যের উপর আধিপত্য বিস্তারের জন্যে মানুষ যুদ্ধ করছে। এছাড়া সম্প্রসারণশীলতার জন্য ভয়ানক যুদ্ধের উদাহরণ বিশ শতকের দুটি বিশ্বযুদ্ধ। মানুষ হিংসা দ্বেষ, লোভ লালসার বশবর্তী হয়েও এখন যুদ্ধ করছে।
যুদ্ধের ফলাফল: যুদ্ধের ফলাফল কখনো ভালো হয় না। যুদ্ধের ফলে অগণিত মানুষ জনপদ ধধ্বংসের পাশাপাশি দীর্যস্থায়ী প্রভাব ফেলে। বিজ্ঞানের অগ্রগতি আজ যুদ্ধের ভয়াবহতা ও ধবংসলীলা বাড়িয়ে দিয়েছে আধুনিক সমরাস্ত্র নির্মাণ করে। এজন্য বর্তমানে যুদ্ধবিগ্রহের ক্ষয়ক্ষতি মারাত্মক ও সুদুরপ্রসারী। আর আমেরিকা ও রাশিয়া অনবরত মেতে আছে শক্তির মদমত্তায়। নিজের শক্তির প্রকাশ ও আধিপত্য বিস্তারের জন্য আমেরিকা প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছে বিভিন্ন দেশের সাথে। নতুন নতুন মারণাস্ত্র আবিষ্কার ও এর বিস্তারেও নিয়োজিত আছে আমেরিকা। আফগানিস্তানে ও ইরাকে অসংখ্য লেককে মেরে ফেলেছে। জনপদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি স্থাপত্যশিল্প ধ্বংস করেছে আমেরিকা। এখানে মানবতার চরম অবমূল্যায়ন করেছে আমেরিকা। তেমনি ১৯৭১ সালেও পাকিস্তানীরা ৩০ লাখ মানুষকে হত্য করেছিল। যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞে আজ পুরো সভ্যতা বিপর্যস্ত। যুদ্ধের ধ্বংসলীলায় মানুষের যে ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে তা বর্ণনাতীত।
বিশ্ব পরিস্থিতির পরিবর্তন:
"তাই আমি চেয়ে দেখি প্রতিজ্ঞা প্রস্তুত ধরে
ধরে দানবের সাথে আজ সংগ্রামের তরে"
- সুকান্ত ভট্টাচার্য
কিন্তু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী দানবকে রুখবে কে? বর্তমান এককেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্মে পৃথিবী এখন মানুষের হাতের নাগালে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে একসময় সূর্য অস্ত যেত না। কিন্তু আজ সেসবই ইতিহাসমাত্র। বলশেভিক বিপ্লবের দুনিয়া কাঁপানো আওয়াজ একদিন সারা বিশ্বের শোষিত ও নিপীড়িত মানুষকে জাগিয়ে ভুলেছিল মুক্তির আকাঙ্ক্ষায়। কিন্তু অমিত ক্ষমতার অধিকার সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন সে স্বপ্নকে নির্বাসিত করেছে। Time you old Gypsyman-এর মতে, সময় এখন আমেরিকার, বিশ্বের একক ক্ষমতাধর শক্তি, দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, শাসিয়ে বেড়াচ্ছে সারা বিশ্বকে। এ মুহূর্তে বিশ্বের সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা এক বিশ্বকেন্দ্রিক। প্রযুক্তির উৎকর্ষে সামরিক ক্ষেত্রেই এসেছে বিরাট পরিবর্তন। তাই আমেরিকার বেড়লিতে সারাবিশ্ব ভয়ে চুপ, প্রতিবাদ করলেই সাদ্দামের মতো টুটি চেপে ধরবে। কিন্তু সভাতার রঙ্গমঞ্চে এ প্রেতনৃত্য করে বন্ধ হবে তা কী কেউ জানে?
বিগত যুদ্ধের অভিজ্ঞতা: সভ্যতার চলমানতায় মানুষ আপন ধীশক্তি দিয়ে খুঁজে নিল অজ্ঞাত শক্তির উৎস। ক্রমে সে হয়ে উঠল দানবীয় শক্তির অধিকারী। বিশ শতকে পরপর দুটি বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ করল সেই দানবীয় শক্তির তান্ডব। জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকির মানুষ আজে ভুলতে পারে না সেই দুঃস্বপ্নের দিনগুলোকে। চোখের পলকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় জনপদ, কলসে যায় মানবতা, শিহরিত হয় গোটা বিশ্ববিবেক। বেদনায় আর্তনাদ করে ওঠে পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষ।
বিগত যুদ্ধের বিভীষিকা: বিশ শতকেই ঘটেছে দুই ভয়াবহ মহাযুদ্ধ প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৫-১৯৯৯ এবং ১৯৩৯-১৯৪০)। এ যুদ্ধ অভীতের সব যুদ্ধকে ছাপিয়ে গেছে। কারণ এর বিস্তৃতি ঘটে গোটা বিশ্বময়। পৃথিবীর বৃহৎ রাষ্ট্রগুলো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এক মরণ-যজ্ঞে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিল বোমারু বিমান ও আধুনিক সমরাস্ত্র সজ্জিত যুদ্ধ জাহাজ। নিহত হয়েছিল সামরিক ও অসামরিক স্তরের চার কোটি চৌদ্দো লক্ষ পঁয়ত্রিশ হাজার মানুষ। বিকলাঙ্গ হয়েছিল আরো দু কোটি মানুষ। সম্পদ ধ্বংস হয়েছিল তিরিশ বিলিয়ন ডলারের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত মানুষের সংখ্যা সর্বকালের রেকর্ড অতিক্রম করেছে। এ যুদ্ধে পাঁচ কোটি চল্লিশ লক্ষ মানুষের প্রাণ সংহার করে। বিকলাঙ্গ করে নয় কোটি মানুষকে। সম্পদ নষ্ট হয় চারশ বিলিয়ন ডলারের।
এ যুদ্ধে মানবসভ্যতার ইতিহাসে ঘৃণ্যতম আণবিক বোমা ব্যবহৃত হয় ১৯৪৫ সালের ৬ই এবং ৯ই আগস্ট জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে। চোখের পলকে দাউ দাউ আগুনে জ্বলে যায় দুটি সম্পদ সমৃদ্ধ জনপদ। তেজস্ক্রিয় বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে শহরে গ্রামে। ধ্বংসের প্রলয়ঙ্কর রূপ দেখে শিহরিত হয় বিশ্ববিবেক। আর্তনাদ করে ওঠে পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষ।
অশান্ত বিশ্ব পরিস্থিতি: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী ভিয়েতনাম যুদ্ধের দুঃসহ স্মৃতি এখনো মার্কিনীদের মনে কাঁটার মতো বিদ্ধ হয়। পাক-ভারত যুদ্ধ (১৯৬০), ইরান-ইরাক (১৩ বছর ব্যাপী), আফগানিস্তানের ভয়াবহত। আমাদের শান্তিকামী করে তোলে। সোমালিয়ার ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় প্রচন্ডভাবে বিশ্ববিবেককে নাড়া দেয়। ফিলিস্তিনের প্রতিটি শিশুর অসহায় আর্তনাদ বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিলেও শ্যারনের পাষাণ হৃদয় এজিদের মতো রক্তের হোলিখেলায় নেচে ওঠে। সারাবিশ্বে চলছে ভয়াবহ এক অশান্ত পরিস্থিতি, মার্কিনি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি গোট পৃথিবীকে গিলে খাবার মতলবে আছে। সম্প্রতি শেষ হলো ইরাক যুদ্ধ। আফগানিস্তানের মাটি ক্লাষ্টীর বোমার আঘাতে অঙ্গার হয়েছে। লাশের গল্পে শকুনের উল্লাস বেড়েছে। তেমনি ইরাকের জনগনের তথাকথিত মুক্তির স্লোগানে লুটপাট হয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার বছরের সভ্যতা ও সংস্কৃতির নিদর্শন, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে আধুনিক সভ্যতা। আধুনিক প্রযুক্তি মিসাইলের আঘাতে ছিন্ন ভিন্ন হয়েছে অসহায় শিশুর হাত, বুক ও দেহ। লাশের স্তূপে দাড়িয়ে মার্কিনি ট্যাংক মুক্তির পতাকা উড়িয়েছে। সে পতাকা ইরাকের নয়, মার্কিনের। ইরাক আর ইরাক নেই, নব্য আমেরিকা যেন। ইরাক এখন আমেরিকার নতুন উপনিবেশ।
আধুনিক সমরাস্ত্রের ভয়াবহতাঃ মানবসভ্যতা আজ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশংকায় কম্পমান। সারাবিশ্বে যুদ্ধবাজদের যুদ্ধ প্রস্তুতি সাধারন নিরীহ মানুষদের আতংকের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। পৃথিবীর শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর হাতে ভয়ানক সব মারণাস্ত্র সারা বিশ্বে মজুদ আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত বিস্ফোরণের চেয়ে দশ হাজার গুণ বেশি বিস্ফোরক। আণবিক বোমার চেয়ে চার প্রজারগুণ শক্তিশালী বোমার সংখ্যা এখন পঞ্চাশ থেকে ষাট হাজার। যুদ্ধ এখন জল ও স্থলের সীমানা ছাড়িয়ে আকাশে, গ্রহে ও উপগ্রহে। রাডারকে ফাঁকি দিয়ে মানুষ এখন উপগ্রহ, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে গোয়েন্দাগিরি চালায়। দূরপাল্লার মিসাইল, আণবিক যুদ্ধজাহাজ, ভয়ংকর সব যুদ্ধ বিমান প্রস্তুত সভ্যতাকে ধবংসের জন্য। একটি মাত্র সুইচ টিপ দিলে কয়েক হাজার মাইল দূরের একটি সভ্যতা নিমিষেই ধুলিসাৎ হয়ে যেতে পারে।
পারমাণবিক বোমা: আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম ভয়ংকর আবিষ্কার পারমাণবিক অস্ত্র। আর যুদ্ধক্ষেত্রে এই পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার যে কতটা ভয়াবহ, তার প্রমাণ পাওয়া যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিশ বছর পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৪৫ সালের ৬৬৯ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে পরমাণবিক বোমা বীভৎস আকার ধারণ করে। ভাগনিত মানুষের লাশ ও মানুষের অঙ্গহানি থেকে এটা বোঝা যায়, আজও মানুষ এর প্রভাব বহন করে চলেছে। এরপর থেকে শুরু হয় পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির এক মহা প্রতিযোগীতা।
যুদ্ধ নয় শান্তি: যুদ্ধ কোনো সাধারণ মানুষ কামনা করে না। সাধারন মানুষ চায় যুদ্ধমুক্ত একটি সুন্দর ও শান্তির স্থান। শান্তি স্থাপনের জন্য তাই আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগীতা ও অস্ত্রের ব্যবসা প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে। বিজ্ঞানকে যুদ্ধাস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার না করে মানুষের কলয়নে নিয়োজিত করতে হবে। বর্ণবিদ্বেষ ও জাতিগত বিদ্বেষ দূর করে আমাদেরকে উদার মনের অধিকারী হতে হবে। পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এখন জাতিসংঘ কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কথা চিন্তা করে যুদ্ধ পরিহার করা উচিত।
যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান: জাতিসংঘের সহযোগিতায় শান্তিকামী মানুষেরা 'যুদ্ধ নয় শান্তি চাই' স্লোগানে একই পতাকাতলে সমবেত হয়েছে। তাদের সাথে যোগ দিয়ে যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে বিশ্বখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীর, বিজ্ঞানী ও দার্শনিক। বিশ্ব শান্তির জন্য প্রতিবছর বিশেষ বাড়িকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হচ্ছে। দেশে দেশে ইত্তকের বিরুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ জনতার যুদ্ধবিরোধী স্লোগান শান্তির কথা বলে। বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ আবার একই ছায়াতলে, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। বিজ্ঞানী আইনস্টাইন, বৌমারেটলা আরি ককসে, ম্যাক্সিমে গোর্কী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ সোচ্চার নারীঘাতী ও শিশুঘাতী কুৎসিত যুদ্ধের বিরুদ্ধে। শিল্পীর তুলিতে, কবির কবিতায়, গানের সুরে, জীবনের উদ্দামতায় আজ ধ্বনিত হচ্ছে শান্তির বীজমন্ত্র।
বিশ্বশান্তি ও বাংলাদেশ: বাংলাদেশ সবসময়ই মধ্যপন্থী একটি শাস্ত্রকামী দেশ। জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ সবসময়ই চেষ্ট করে ঐক্য ও শান্তি ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করার। যুদ্ধ নয় শান্তির এ আন্দোলনে বাংলাদেশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ নিজেকে জোট নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। বেড়েছে তার কণ্ঠস্বরের মর্যাদা। বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বিবদমান বিশ্বে শান্তি স্থাপনে ছিলেন উৎসাহী। রাষ্ট্রে রাষ্ট্র সহযোগিতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, শান্তি, মৈত্রী ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা, অন্য রাষ্ট্রের বৈদেশিক বা অভ্যন্তরীণ নীতিতে হস্তক্ষেপ না করা ইত্যাদি হচ্ছে বর্তমানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি। তাই বিশ্বের কোথাও যুদ্ধের ক্ষীণতম সম্ভাবনা সৃষ্টি হলে বাংলাদেশ প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে।
১৯৮৬ সালকে বিশ্ব-শান্তিবর্ষ হিসেবে ঘোষণা: পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা আজ এক উদ্বেগজনক অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। বিশ্ব সামরিক খাতে ব্যয়বরাদ্দ বাড়ছে। অস্ত্র নির্মাণে ঢালাওভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি। এ ছাড়া গোটা বিশ্বে নানারকম সংঘাত, যুদ্ধ, দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, অনাহার, রোগভোগ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত মানুষ। তাই জাতিসংঘের মন্ত্রসচিব ১৯৮৬ সালকে ঘোষণা করেছিলেন। আন্তজাতিক শাস্তিবর্ষ'রূপে। এর ফলে রাষ্ট্রসংঘের সব সদস্যরাষ্ট্র ও বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবক সংগঠনগুলো শান্তির সমস্যা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় পথ নির্দেশ করার সুযোগ পেয়েছে বিশ্ববাসীও জাতিসংঘের এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। সম্প্রতি আমেরিকার দ্বিতীয় বারের মতো ইরাক আক্রমণে বিশ্ব শান্তি আবারও সংকটের মুখে। আফগানিস্তান আক্রমণের মধ্যে দিয়ে সাহাজ্যবাদী এ দেশটির ফ্যাসিবাদী কার্যক্রম শুরু হয়েছে। অন্যান্য দেশগুলো প্রতিবাদ করছেই না বরং নানাভাবে ইন্ধন জোগাচ্ছে। সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় খোদ মার্কিনর এ অন্যায় আক্রমণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও খোদ জাতিসংহ এবারও কাঠের পুতুলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এসব প্রেক্ষাপটে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাসী এর বিরুদ্ধে জোর জনমত গড়ে তুলেছে। কেবল 'শান্তি বর্ষ' ঘোষণা দিয়ে প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এজন্য জাতিসংঘকে নিতে হবে সাহসী ভূমিকা। বিশ্বশান্তি রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত এ প্রতিষ্ঠানটির নিকট সবাই এমনটিই প্রত্যাশা করে।
উপসংহার: যুদ্ধ মানেই ধ্বংস। যুদ্ধ মানেই দুর্ভিক্ষ, উপবাস, মৃত্যু। যুদ্ধ মানেই রক্তের হোলিখেলা, লাশের স্তূপ ও সাভার বিনাশ। পৃথিবীবাসী দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ফলে ধ্বংস, মুক্ত, মহামন্বন্তরের রক্তাক্ত আস্বাদ পেয়েছে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হলে তা হবে আরও ভয়াবহ। মানুষ আজ প্রতিবাদমুখর যুদ্ধবাজ অস্ত্র ব্যবসায়ীদের ঘৃণ্য চক্রান্ত রুখতে। যুদ্ধের বিরুদ্ধে গোটা বিশ্ববাসী আজ প্রতিরোধী সৈনিক, শান্তির জাগ্রত প্রহরী। তাই যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিশ্ব আজ সোচ্চার, শান্তির পক্ষে পালন করছে অগ্রণী ভূমিকা। বিশ্বজুড়ে মানুষের সম্মিলিত শুভবুদ্ধির প্রতিরোধমূলক তৎপরতায় যুদ্ধবাজ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আজ প্রতিহত, নিষ্ক্রিয় হতে চলেছে। শেষ বেলায় তাই কবি আহসান হাবিবের কন্ঠে বলতে চাই-
"আমাকে সেই অস্ত্র ফিরিয়ে দাও
সভ্যতার সেই প্রতিশ্রতি
সেই অমোঘ অনন্য
অস্ত্র আমাকে ফিরিয়ে দাও।
চিকিৎসাক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
ভূমিকা: বর্তমান যুগ বিজ্ঞানের যুগ। বিজ্ঞানই বিশ্ব সভ্যতাকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে গেছে। বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে আধুনিক সভ্যতা। সেই আদিম যুগ থেকে শুরু করে বর্তমান যুগ পর্যন্ত জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতির জন্য বিজ্ঞান অমূল্য অবদান রেখেছে। বর্তমান সভ্যতার অগ্রগতির মূলে বিজ্ঞানের দুটি আবিষ্কার সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হলো: মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কার ও বিদ্যুতের আবিষ্কার। বিজ্ঞানের এ সকল বিস্ময়কর অগ্রগতির পথ ধরেই চিকিৎসাক্ষেত্রে এসেছে এক অভাবনীয় পরিবর্তন। চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিজ্ঞান নতুন আশীর্বাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। 'Health is wealth'- স্বাস্থ্যই সম্পদ'-কথাটির সাথে সারা বিশ্বের সকলেই পরিচিত। অঢেল ধন-সম্পদ আর প্রতিপত্তির অধিকারী হলেও যদি স্বাস্থ্য ভালো না থাকে তাহলে জীবনে সুখী। হওয়া যায় না। আর মানুষের মূল্যবান সম্পদ স্বাস্থ্য সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা। যত দিন যাচ্ছে আবিকৃত হচ্ছে নব নব চিকিৎসা পদ্ধতি। আর এসব চিকিৎসা পদ্ধতির আবির্ভাবে মানুষ জটিল ও দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে আরোগ্য লাভ করছে।
বিজ্ঞান শব্দের অর্থ: বিজ্ঞান শব্দের অর্থ হলো বিশেষ জ্ঞান। অনুসন্ধান প্রিয় মানুষের বস্তুগত বিষয় সম্পর্কে ধারণা এবং বিভিন্ন কৌশলে তার ওপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা থেকেই নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কৃত হয়েছে। এরূপ প্রতিটি আবিষ্কারের পেছনে রয়েছে কার্যকারণ সম্পর্ক। আর এ ধরনের যুক্তিযুক্ত আবিষ্কারকেই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার বলা হয়। বিজ্ঞানের নানাবিধ আবিষ্কারের পেছনে কাজ করছে মানুষের প্রয়োজন, মানুষের কল্যাণ ও মানুষের বিকশিত হবার দুর্নিবার ইচ্ছা। বর্তমান সময়ে মানুষের জীবনে সাথে বিজ্ঞান এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, বিজ্ঞানই যেন মানবজীবনের গতি নিয়ন্ত্রণ করছে। মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর জন্য বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত সৃষ্টিমুখর হয়ে উঠছে।
সভ্যতার উৎকর্ষে বিজ্ঞানের যাত্রা : সভ্যতার বিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে বিজ্ঞানের বিস্ময়কর বিকাশ। যেদিন মানুষ আগুন আবিষ্কার করল, ঠিক সেদিন থেকেই বিজ্ঞানের প্রথম অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। বিজ্ঞান মানুষের সীমাবদ্ধতা দূর করে উন্নত জীবনযাপনের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মূলত সহস্র বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে বর্তমানে বিজ্ঞান লাভ করেছে পূর্ণতর সমৃদ্ধি।
প্রাচীন চিকিৎসা ব্যবস্থা: প্রাচীনকালে মানুষ ছিল অসহায়। তখন রোগ নির্ণয়ের কোনো ব্যবস্থা ছিল না বলে সামান্য রোগেও মানুষের করুণ পরিণতি ঘটত। চিকিৎসার জন্য তাদের প্রকৃতির শরণাপন্ন হতে হতো। অসুস্থতার সময় তারা বিভিন্ন গাছ-গাছালি, তাবিজ, কবজ, দোয়া- কালাম, পানি পড়া এবং ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তখন মানুষের জীবনও ছিল খুবই সংকটাপন্ন। মানুষের মতো ইতর প্রাণীরাও ছিল অসহায়।
আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সূচনা: আধুনিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন আবিষ্কারের ফলে চিকিৎসাক্ষেত্রে মানুষের ধ্যান-ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। বিজ্ঞানের বদৌলতে প্রাচীন পদ্ধতির কবিরাজি চিকিৎসার স্থলে হোমিওপ্যাথি ও এলোপ্যাথিক চিকিৎসার উদ্ভাবন করা হয়। পেনিসিলিন, ক্লোরোমাইসিন, স্ট্রেপটোমাইসিন ইত্যাদি ঔষধ আবিষ্কারের ফলে মানুষ তথাকথিত শাস্ত্রীয় চিকিৎসা, তাবিজ-কবজ ও ঝাড়ফুকের মতো কুসংস্কারের ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমিয়ে দিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। এসব। চিকিৎসা ব্যবস্থা আধুনিক বিজ্ঞানেরই বিস্ময়কর অবদান।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিস্ময়কর অবদান: বিজ্ঞান মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। অধ্যাপক রঞ্জনের আবিষ্কৃত রঞ্জন রশি', অধ্যাপক কুরি ও মাদাম কুরি আবিষ্কৃত 'রেডিয়াম' বিজ্ঞান জগতে যুগান্তর এনেছে। পেনিসিলিন, ক্লোরোমাইসিন ও স্ট্রেপটোমাইসিন ইত্যাদি মহৌষধ মানুষকে নানা প্রকার দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে রক্ষা করছে। বসন্তের জীবাণু ধ্বংস করার জন্য জেনর ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করেন। এছাড়া আধুনিক কম্পিউটারের মাধ্যমে রোগ নির্ণয় কৌশল চিকিৎসা বিজ্ঞানে অবিশ্বাস্য সাফল্য এনে দিয়েছে।
রোগ নির্ণয়ে বিজ্ঞান: প্রাচীনকালে মানুষের দেহে কোনো রোগব্যাধি হলে তা নির্ণয়ের ব্যবস্থা ছিল না। চিকিৎসকরা তখন নিজেদের মন গড়া অভিজ্ঞতার সাহায্যে ঔষধপত্র নির্ধারণ করতেন। ফলে অনেক সময় ঠিক চিকিৎসা সম্ভব হয়ে উঠত না। কিন্তু কালক্রমে রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি আবিষ্কারের ফলে চিকিৎসা পদ্ধতি অনেকটা সহজতর হয়েছে। অধ্যাপক রঞ্জনের আবিস্কৃত রঞ্জন রশ্মি, এক্সরে, আলট্রাসনোগ্রাফি এবং অধ্যাপক কুরি ও মাদামকুরি আবিস্কৃত রেডিয়াম চিকিৎসাক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। রঞ্জন রশ্মির সাহায্যে শরীরের অদৃশ্য বস্তু দেখার ব্যবস্থা রয়েছে এবং রেডিয়ামের সাহায্যে ক্যানসারের মতো ভয়ংকর ক্ষতের স্থান নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে। এক্স-রে মেশিন না হলে রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে অসুবিধার সৃষ্টি হতো এবং এর ফলে সুচিকিৎসা কোনোদিনই সম্ভব হতো না। তাছাড়া রোগীর রক্ত, মল-মূত্র ইত্যাদি উপাদান পরীক্ষার জন্য আধুনিক যেসব পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে, তাও বিজ্ঞানেরই অবদান। বর্তমানে কম্পিউটারের মাধ্যমেও রোগ নির্ণয়ের সুন্দর ব্যবস্থ। আবিস্কৃত হয়েছে। ফলে চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।
রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বিজ্ঞান: এমন কিছু রোগব্যাধি আছে, যা প্রতিরোধের জন্য বিজ্ঞান পূর্বেই ব্যবস্থা নির্দেশ করেছে। যেমনশিশুর জন্মের পর বিভিন্ন মেয়াদে ডিপিটি পোলিও, হাম, গুটি বসন্ত, যক্ষ্মা, হুপিংকাশি, ধনুষ্টংকার, ডিপথেরিয়া, হেপাটাইটিস ইত্যাদি টিকা দেওয়া হচ্ছে। ফলে অনেক রোগ দেহে সৃষ্টি হওয়ার আগেই প্রতিরোধক ব্যবহৃত হচ্ছে। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে অগণিত শিশু রক্ষা পাচ্ছে।
রোগ নিরাময়ে বিজ্ঞান: রোগ নির্ণয় এবং রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থাই চিকিৎসাক্ষেত্রে বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড়ো অবদান। এক্ষেত্রে বিজ্ঞানের বড়ো সাফল্য হলো বিভিন্ন রোগ নিরাময়ের জন্য নানা রকম ঔষধপত্রের আবিষ্কার। এক সময় দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। বিজ্ঞান সেসব রোগ নিরাময়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে। যেমন- যক্ষ্মার ব্যাপারে একটি প্রবাদ বাক্য প্রচলিত ছিল যে, যার হয় যক্ষ্মা তার নেই রক্ষা'। এখন আর যক্ষ্মা কোনো দুরারোগ্য ব্যাধি নয়। তাছাড়া ভয়ংকর জলাতংক রোগ, কুষ্ঠরোগ ইত্যাদি নিরাময়ের জন্যও বিজ্ঞান কার্যকর ঔষধ ও ইনজেকশন আবিষ্কার করেছে। বর্তমান বিশ্বে যে দুটি রোগ সবচেয়ে দুরারোগ্য বলে গণ্য হচ্ছে তা হলো ক্যানসার ও এইডস। এই দুই রোগের চিকিৎসার কোনো সুব্যবস্থা করা আজ পর্যন্ত সম্ভব হয়ে। উঠেনি। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এর প্রতিরোধের উপায় নিরূপণের জন্য। এক কালের মহামারি বসন্ত রোগ থেকে মুক্তির জন্য আবিস্কৃত হয়েছে ভ্যাক্সিন। মানবদেহে অন্য মানুষের হৃৎপিণ্ড সংযোজনের মতো অলৌকিক ক্ষমতা বিজ্ঞানেরই এক বিস্ময়কর অবদান। এখন আবার কৃত্রিম হৃৎপিণ্ড তৈরি করা হচ্ছে এবং রোগীর দেহে সংযোজন করে তা দীর্ঘদিন। কর্মক্ষম রাখার কৃতিত্বপূর্ণ দৃষ্টান্তও বিজ্ঞানেরই সৃষ্টি। প্লাস্টিক সার্জারির সাহায্যে আজকাল অসুন্দর ও অমসৃণ চেহারাকে সুন্দর ও মসৃণ করা হয়। তারুণ্যকে কীভাবে স্থায়ী করা যায়, সে বিষয়েও বিজ্ঞান নিরন্তর গবেষণা অব্যাহত রেখেছে। আশা করা যায়, অদূর ভবিষ্যতে অন্যান্য রোগের মতো সমস্ত রোগব্যাধি নিরাময়ের ব্যবস্থাই বিজ্ঞান নিশ্চিত করতে পারবে।
বিজ্ঞান চিকিৎসা ক্ষেত্রের বড়ো আশীর্বাদ: বিজ্ঞান বিশ্বসভ্যতায় বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। বিজ্ঞান অনেক অসাধ্যকে বাস্তব রূপ দান করেছে। বিজ্ঞান অন্যান্য ক্ষেত্রে আশীর্বাদ ও অভিশাপ বয়ে আনলেও চিকিৎসাক্ষেত্রে এনেছে শুধু আশীর্বাদ। এ ব্যাপারে কিপলিং বলেন, বিজ্ঞানের আশীর্বাদে বিশ্বমানবতা কখনো উল্লসিত হয়, আবার কখনো তার বিভীষিকাময় রূপ বিশ্বসভ্যতাকে থামিয়ে দেয়, কিন্তু চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিজ্ঞান এনেছে শুধুই আশীর্বাদ।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের নতুন সংযোজন : সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন গবেষণা চালিয়ে চিকিৎসাক্ষেত্রে বিজ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করেছে যা বিশ্ব সভ্যতায় যুগান্তকারী প্রভাব ফেলেছে। জেনেটিক টেকনোলজির রহস্য উদঘাটনের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধি শনাক্ত করে চিকিৎসা আবিষ্কারের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। ইতোমধ্যে কৃত্রিম হৃৎপিণ্ড সৃষ্টির পথ বিজ্ঞান উন্মোচন করেছে। আবার কৃত্রিম রক্ত, প্রোটিন ইত্যাদি আবিষ্কারের জন্য বিজ্ঞানীরা নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। টেস্টটিউব শিশুর জন্মদান পদ্ধতিও বর্তমানে বাংলাদেশে চালু হয়েছে। মূলত বিজ্ঞানে তথা চিকিৎসা বিজ্ঞানে অসম্ভব বলে কোনোকিছুই আর থাকছে না।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের ব্যর্থতা: চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিজ্ঞান যেমন উন্নতি সাধন করছে পাশাপাশি এর কিছু ব্যর্থতাও রয়েছে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিজ্ঞান যেমন মানবসমাজের জন্য আশীর্বাদ বয়ে আনছে আবার বিজ্ঞান-সৃষ্ট নানা যন্ত্র সভ্যতার অবাধ বিকাশের কারণে অনেক জটিল রোগেরও জন্ম হচ্ছে, যা মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। বর্তমান সময়ে এইডস একটি মারাত্মক ব্যাধি। বিজ্ঞানীরা এখনও এ রোগের কোনো স্থায়ী চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার করতে পারেনি। এক্ষেত্রে বিজ্ঞান ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। সম্প্রতি সার্স, ইবোলা ভাইরাসও বিজ্ঞানকে ফাঁকি দিয়ে মানুষের জীবনের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উপসংহার: বিজ্ঞান বিশ্বসভ্যতার জন্য একাধারে আশীর্বাদ ও অভিশাপ দুটোই। তবে চিকিৎসাক্ষেত্রে বিজ্ঞান কেবল আশীর্বাদই নিয়ে এসেছে। প্রবাদ আছে যে, 'সুস্থ শরীরে সুস্থ মন বিরাজ করে। মানুষের এ সুস্থ শরীরের নিশ্চয়তা বিধানের জন্য বিজ্ঞান নিঃসন্দেহে মুখ্য ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
স্বদেশপ্রেম
ভূমিকা: স্বদেশ মানুষের কাছে পরম সাধনার ধন, পরম নিবাস। স্বদেশের মানুষ, স্বদেশের রূপ-প্রকৃতি, তার পশু-পাখি এমনকী তার প্রতিটি ধূলিকণাও মানুষের কাছে প্রিয় ও পবিত্র। যে দেশ আলো দিল, বাতাস দিল, অন্ন-পানি দিল, বস্ত্র দিল, তার প্রতি যদি সেই শ্যামল স্নেহে প্রতিপালিত সন্তানদের মমতামণ্ডিত আনুগত্যবোধ না থাকে, তবে তারা কেবল অকৃতজ্ঞই নয়, বিশ্বের সকল নিন্দনীয় বিশেষণে বিশেষিত।
স্বদেশপ্রেম: যে ভৌগোলিক ও সামাজিক পরিবেশের মধ্যে মানুষ জন্মগ্রহণ করে এবং বড়ো হয়ে ওঠে, সে পরিবেশের প্রতি, সেখানকার মানুষের প্রতি তার একটি স্বাভাবিক আকর্ষণ গড়ে ওঠে। দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি এ আজন্ম আকর্ষণই স্বদেশপ্রেম। স্বদেশপ্রেম সকলের অন্তরেই থাকে। কখনও এ প্রেম থাকে সুপ্ত অবস্থায়, কখনও থাকে তা সুপ্রকাশিতভাবে। সুখের দিনে স্বদেশপ্রেম থাকে সুপ্তিমগ্ন। কিন্তু দুঃখের দিনে আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে স্বদেশপ্রেম উদ্দীপিত হয়ে ওঠে। পরাধীনতার দুঃখ-বেদনায়, বিদেশিদের অকথ্য নির্যাতনে অন্তরের সুপ্ত স্বদেশপ্রেমের ঘুম ভাঙে। কিংবা দেশ যখন শত্রুর আক্রমণে পর্যুদস্ত হয়, তখন সমগ্র জাতি স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বদেশের ও স্বজাতির মানমর্ষাদা রক্ষাকল্পে রণক্ষেত্রে প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার জন্য দলে দলে ছুটে যায়। তখন মনে হয়- 'নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই, তার ক্ষয় নাই।'
স্বদেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ ও উন্মেষ: প্রকৃতপক্ষে স্বদেশপ্রেমের উদ্ভব আত্মসম্মানবোধ থেকে। যে জাতির আত্মসম্মানবোধ যত প্রখর, সে জাতির স্বদেশপ্রেম তত প্রবল। স্বদেশপ্রেম এক প্রকার পরিশুদ্ধ ভাবাবেগ। নিঃস্বার্থ, হিংসাবিহীন দেশপ্রেমই প্রকৃত স্বদেশপ্রেম। ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র স্বার্থের গণ্ডি উপেক্ষা করে বৃহত্তর স্বার্থের দিকে মন যখন পরিচালিত হয়; যখন আত্মকল্যাণ অপেক্ষা বৃহত্তর কল্যাণবোধ সক্রিয় হয়ে ওঠে, তখন জ্বলে ওঠে স্বদেশের প্রতি ভালোবাসার নিষ্কলুষ প্রদীপ শিখা। দেশপ্রেমিকের দেশ সেবার পথে বাধা অনেক, অত্যাচার সীমাহীন। কিন্তু পথের ঝড়, ঝঞ্ঝা, বজ্রপাত তাদের দৃঢ় বলিষ্ঠ পদক্ষেপের নিকট মিথ্যে প্রমাণিত হয়। ইতিহাসের পানে তাকালে এর ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত মেলে। পরদেশি কিংবা স্বৈরশাসকের রক্তচক্ষু কিংবা উদ্যত অস্ত্র তাদের নিবৃত্ত করতে পারে না। আমাদের বাংলাদেশের ইতিহাসও স্বদেশপ্রেমের গর্বে গর্বিত। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং সর্বশেষে ১৯৯০ সালে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান আমাদের স্বদেশপ্রেমের প্রমাণ দেয়।
অন্ধ স্বদেশপ্রেমের পরিণতি: স্বদেশপ্রেম দেশ ও জাতির গৌরবের বস্তু হলেও অন্ধ স্বদেশপ্রেম বা উগ্র জাতীয়তাবাদ ধারণ করে ভয়ংকর রূপ। জাতিতে জাতিতে সংঘাত ও সংঘর্ষ অনিবার্য করে তোলে অন্ধ স্বদেশপ্রেম। আমরা স্বদেশের জয়গান গাইতে গিয়ে যদি অপরের স্বদেশপ্রেমকে আহত করি, তবে সেই স্বদেশপ্রেম বিভিন্ন দেশ ও জাতির মধ্যে ডেকে আনে ভয়াবহ রক্তাক্ত দ্বন্দ্ব-সংঘাত। হিটলারের তৎকালীন জার্মানি কিংবা মুসোলিনির ইতালি উগ্র-জাতীয়তাবাদের নগ্নরূপ। চলমান বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্র কর্তৃক দুর্বল রাষ্ট্রসমূহের প্রতি আগ্রাসী মনোভাব অন্ধ স্বদেশপ্রেমেরই বহিঃপ্রকাশ।
দেশপ্রেম ও রাজনীতি: বস্তুত রাজনীতিবিদের প্রথম ও প্রধান শর্তই হলো দেশপ্রেম। স্বদেশপ্রেমের পবিত্র বেদিমূলেই রাজনীতির পাঠ। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ রাজনীতিবিদ দেশের সদাজাগ্রত প্রহরী। পরাধীন বাংলাদেশের দিকে দিকে যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল গড়ে উঠেছিল, তাদের সকলেরই মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল পরাধীনতার বন্ধন থেকে দেশজননীর শৃঙ্খল-মোচন। তাদের অবদানেই আজ দেশ স্বাধীন। আজও দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বর্তমান। রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে এখনও কত নতুন দলের আবির্ভাব ও নিষ্ক্রমণ। কিন্তু আজ অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই মহত্তর, বৃহত্তর কল্যাণবোধ থেকে ভ্রষ্ট। রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন ব্যক্তিগত এবং দলীয় স্বার্থ চিন্তাই অনেক ক্ষেত্রে প্রবল। দেশের স্বার্থে, জাতির স্বার্থে, মানুষের প্রয়োজনে সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়ার সাধনা, দেশপ্রেমের অঙ্গীকার ও সার্থকতা এখন প্রায়ই অনুপস্থিত। সংকীর্ণ রাজনীতিসর্বস্ব দেশপ্রেম প্রকৃতপক্ষে ধ্বংস ও সর্বনাশের পথকেই করে প্রশস্ত।
স্বদেশপ্রেম ও বিশ্বভাবনা: যথার্থ দেশপ্রেমের সাথে বিশ্বপ্রেমের কোনো অমিল নেই, নেই কোনো বিরোধ, বরং স্বদেশপ্রেমের ভেতর দিয়ে বিশ্বপ্রেমের এক মহৎ উপলব্ধি, জাগরণ। স্বদেশ তো বিশ্বেরই অন্তর্ভুক্ত। জাতি-ধর্ম-বর্ণ- সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে মানুষ বিশ্বপ্রেমের এ বাণীকে জাতীয় জীবনে গ্রহণ করলেই সংকীর্ণ অন্ধ জাতীয়তাবোধ থেকে আমাদের মুক্তি। বিশ্বপ্রেমের উজ্জ্বল আলোকে আমাদের স্বদেশপ্রেম হবে উদ্ভাসিত। আমরা স্বদেশকে ভালোবেসে বিশ্বদেবতারই বন্দনা করি। আজ যখন বিশ্বের সর্বত্র গণতন্ত্রের প্রবল জোয়ার এসেছে তখন বিশ্ব নাগরিকত্বের চেতনা হবে তাকে যথার্থভাবে গ্রহণ করা। স্বদেশ-চেতনা তো বিশ্ববোধেরই প্রাথমিক শর্ত। দেশের জল-মাটি-অরণ্য- পশুপাখি-মানুষ-সংস্কৃতিকে ভালোবাসতে পারলে পৃথিবীর মানুষকেও ভালোবাসা যায়। তখনই তার মধ্যে জন্ম নেয় বিশ্বাত্মবোধ।
উপসংহার: দেশপ্রেম আমাদের মনের জ্বলন্ত অগ্নিশিখা। সেই অনলে অন্তরের যত কিছু পাপবোধ, যা কিছু ক্ষুদ্র, গ্লানিময় তার আহুতিদানেই আমাদের জীবন পরিশুদ্ধ হয়। এক মহৎ চেতনার বিভায় মানব-জন্ম হয় ভাস্বর। মানুষের জীবনে যদি দেশপ্রেমের চেতনা না থাকে, যদি বৃহত্তর কল্যাণবোধ থাকে অসুন্দরের ছদ্মবেশে আচ্ছন্ন, তাহলে হৃদয়ের কোন ঐশ্বর্য নিয়ে মানুষ মহৎ হবে? বৃহৎ হবে কোন সম্পদ নিয়ে? কোথায় তাহলে জীবনের মহিমা? কোথায় সেই উন্নত উত্তরাধিকার? দেশপ্রেম তো শুধু কতগুলো প্রাণহীন শব্দসমাহার নয়, নয় কোনো নিছক বিমূর্ত আদর্শ। স্বদেশপ্রীতির মধ্যেই মনুষ্যত্বের উদ্বোধন, মহৎ জীবনের সংকল্প, বিশ্বভ্রাতৃত্বের বন্ধন।
পোশাক শিল্প: সমস্যা ও সম্ভাবনা
ভূমিকা: তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত। সম্ভাবনাময় এ খাতকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে কর্মসংস্থানের বিশাল একটি বাজার। এ পোশাক শিল্পই হয়ে উঠেছে দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি। অথচ এ পোশাক শিল্পে দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা চলছে। কখনো শ্রমিকরা তাদের বেতন-ভাতার দাবিতে বিক্ষোভ করছে, আবার কখনো কারখানায় হামলা করছে, আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে এবং মূল্যবান জিনিসপত্র ভাঙচুর করছে। এভাবে তৈরি পোশাক শিল্পে একটা বিশৃঙ্খলা লেগেই আছে। এ অস্থিরতা এবং বিশৃঙ্খলা এদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান এ খাতকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে এসব বিশৃঙ্খলা এবং অস্থিরতা চিরতরে বন্ধ করতে হবে। এর পাশাপাশি মালিক-শ্রমিক সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সমস্যাসমূহ: বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পে নানাধিক সমস্যা বিদ্যমান। নিম্নে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সমস্যাসমূহ আলোচনা করা হলো:
১. ভবন ধস: ভবন ধসে ব্যাপক সংখ্যক শ্রমিকের প্রাণহানি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক বা গার্মেন্টস শিল্পের আলোচিত ও ভয়াবহ সমস্যাগুলোর অন্যতম। ২৪ এপ্রিল ২০১৩ ঢাকার সাভারে 'রানা প্লাজা' নামে নয়তলা একটি ভবন ধসে পড়ে। এ ভবনটিতে পাঁচটি গার্মেন্টস ছিল। এ ভবন ধসের ঘটনায় ১,১২৭ জনের প্রাণহানি ঘটে, জীবিত উদ্ধার করা হয় ২,৪৩৮ জন। এছাড়া ২০০৫ সালে স্পেকট্রাম গার্মেন্টস ভবন ধসে ৬৪ জনের প্রাণহানি ঘটে। ভবন ধসের এ ভয়াবহ ঘটনায় শ্রমিকরা ভয় ও শঙ্কায় আজ অনেকেই গার্মেন্টেসের বিকল্প পথের সন্ধান করছেন। এতে করে গার্মেন্টস শিল্প দিন দিন হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।
২. অগ্নিকাণ্ড: বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প কারখানাগুলোতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা প্রায়শই ঘটে। এতে করে মুহূর্তেই অঙ্গারে পরিণত স্ব স্ব ক্ষেত্রে লালন করা শ্রমিক-মালিকের স্বপ্ন। ১৯৯০ সালে সারকা গার্মেন্টসে ৩০ জন, ২০০৬ সালে কেটিএস গার্মেন্টসে ৫৫ জন, ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনস-এ ১১২ জন এবং ২০১৩ সালে তুং হাই সোয়েটার কারখানায় মালিকসহ ৮ জন আগুনে পুড়ে মারা যায়। অগ্নিকাণ্ডের এ ঘটনায় বাংলাদেশের গার্মেন্টস মালিকরা একদিকে পুঁজিহীন হচ্ছেন, অন্যদিকে বিদেশী ক্রেতারাও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
৩. শ্রমিকদের নিম্ন মজুরি: বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের দ্রুত বিকাশের মূলে রয়েছে শ্রমিক সহজলভ্যতা। শ্রমিক সহজলভ্যতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পোশাক শিল্প মালিকরা শ্রমিকদেরকে তাদের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করছে। আট ঘণ্টার কাজ বার বা ষোল ঘণ্টা করিয়েও ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করছে। সরকার শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির দিক নির্দেশনা দিলেও শিল্প মালিকরা তা মানছে না বা মানতে টালবাহানার আশ্রয় নিচ্ছেন। ফলে পোশাক শিল্পে প্রায়ই অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে। শ্রমিকরা আন্দোলন করছে; জ্বালাও, পোড়াও নীতির আশ্রয় নিচ্ছে। যা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে সাম্প্রতিক কালে বিবেচিত হচ্ছে।
৪. রফতানির সীমাবদ্ধতা: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১১৫ প্রকারের পোশাকের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশসমূহের চাহিদা রয়েছে ৮৫ রকমের পোশাকের। অথচ বাংলাদেশ মাত্র ৩৬ রকমের পোশাক উৎপাদন করতে সক্ষম। উৎপাদনের এ সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের অপর একটি বড় সমস্যা। অথচ হংকং ৬৫টি রকমের, চীন ৯০ রকমের, ভারত ৬০ রকমের পোশাক রপ্তানি করে থাকে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প সবচেয়ে বেশি প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হচ্ছে ভারত ও চীনের সাথে। উৎপাদনের এ সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন করে তুলেছে।
৫. অনুন্নত অবকাঠামো ও অব্যবস্থাপনা: বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের অপর একটি সমস্যা হলো অনুন্নত অবকাঠামো। বাংলাদেশের রাস্তাঘাট, কালভার্ট, হাসপাতাল প্রভৃতির অবস্থা যথেষ্ট নাজুক। তাছাড়া রয়েছে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য প্রয়োজনীয় বন্দরজনিত অব্যবস্থাপনা ও বন্দরের অভাব। পণ্য খালাস করতে বিদেশী জাহাজগুলোকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়। কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করার পর বন্দর থেকে তা খালাস করতে এক শ্রেণীর কাস্টমস্ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়রানির শিকার হতে হয়। এক হিসেবে দেখা যায়, বাংলাদেশের কাস্টমস্ কর্মকর্তা-কর্মচারীর ৮০ ভাগই অনৈতিক কাজে জড়িত। এরূপ অব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করছে।
বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পে বিদ্যমান সমস্যা থেকে উত্তরণে আশু সুপারিশসমূহ: বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শিল্প হচ্ছে তৈরি পোশাক শিল্প। তাই এ শিল্পকে উত্তরোত্তর উন্নতি ও বিকশিত করতে হলে এর সমস্যার সমাধান অতি জরুরি। এ সম্পর্কে কতিপয় সুপারিশ নিম্নে উপস্থাপন করা হলো:
১. অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করা: বাংলাদেশের অবকাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে হলে প্রথমে অবকাঠামোগত উন্নয়ন তথা শিল্পাঞ্চলগুলোর সাথে বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল, সড়ক, আকাশ পথে পরিবহন ব্যবস্থার আরো উন্নয়ন প্রয়োজন। অপরদিকে দ্রুততার সাথে গ্রাস, বিদ্যুৎ সংকট দূরীকরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
২. পশ্চাৎ সংযোগ শিল্পের প্রসার ঘটানো: বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের সুতা, বোতাম, কাপড় বিদেশ থেকে ৮৫ ভাগ আমদানি করতে হয়। কেননা দেশে প্রস্তুতকৃত কাপড়ের পরিমাণ খুবই অপ্রতুল। কাজেই পোশাক শিল্পের সমস্যা সমাধানে পশ্চাৎ সংযোগ শিল্পের প্রসার ঘটাতে হবে।
৩. পোশাক শিল্পকে আয়কর মুক্ত করা : পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে আয়কর মুক্ত করতে হবে। অন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার জন্য রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের আয় সম্পূর্ণভাবে করমুক্ত করে রপ্তানি বাণিজ্যকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
৪. পোশাকের শ্রেণী বৃদ্ধি করা: বিশ্ববাজারের ১১৫ রকমের পোশাকের চাহিদা থাকলেও বাংলাদেশ মাত্র ৩৬ রকমের পোশাক তৈরি করতে পারঙ্গম। কাজেই বিশ্বের চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশের পোশাকের শ্রেণী বৃদ্ধি করা একান্ত প্রয়োজন।
৫. শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা: বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পখাতে নিয়োজিত শ্রমিক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের দক্ষতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। প্রয়োজনে বিদেশে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রেরণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে তৈরি পোশাক শিল্পের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। এ শিল্প খাত থেকে রপ্তানি আয়ের সিংহভাগই অর্জিত হয়। জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন, অধিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্বের চাপ রোধ এবং অধিক বৈষষিক সমৃদ্ধি লাভের মাধ্যমে জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ঘটাতে তৈরি পোশাক শিল্পের অবদান অনস্বীকার্য। এদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মতৎপরতার মেরুদণ্ড এ পোশাক শিল্প আজ নানামুখী সমস্যার জর্জরিত। কর্তামান প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। আর এর জন্য অবশ্যই সুষ্ঠু পরিকল্পনা, নীতিমালা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা অতি জরুরি।
মেট্রোরেল: নগরজীবনের নতুন দিগন্ত
মেট্রোরেল কী:
মেট্রোপলিটন রেল-এর সংক্ষিপ্ত রূপ হলো মেট্রোরেল। মহানগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো স্পর্শ করে গণপরিবহনের জন্য প্রতিষ্ঠিত রেলব্যবস্থাই মেট্রোরেল। এটি একটি বিদ্যুৎচালিত পরিবহন। ঢাকা মেট্রোরেল ব্যবস্থার প্রকল্পটির নাম 'ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট'। এটি একটি দ্রুতগামী, স্বাচ্ছান্দময়, সুবিধাজনক ও নিরাপদ নগরকেন্দ্রিক রেলব্যবস্থা।
মেট্রোরেলের গুরুত্ব:
জনবহুল রাজধানী শহর ঢাকা যানজটের শহর হিসেবেই বিশেষভাবে পরিচিত। এই শহরে সকাল-দুপুর-বিকেল-রাত সবসময়ই যানজট লেগে থাকে। এখানে বাস, ট্রাক, কার, অটোরিকশা, বাইক আর রিকশা মিলিয়ে কয়েক লাখ যান প্রতিদিন চলাচল করে। দুতিন ঘণ্টা আগে রওয়ানা হয়েও সঠিক সময়ে কখনো গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না। রাস্তায় যানজটে রীতিমতো নাকানি-চুবানি খেতে হয় যাত্রীদের। ইতোমধ্যে সরকার বেশ কয়েকটি উড়াল সেতু, ওভারব্রিজ, আন্ডারপাস, লিংকরোড ইত্যাদি নির্মাণ করেছে। কিন্তু যানজট খুব একটা নিরসন হয়নি। এ কারণে যাত্রীদের সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় বাসের অপেক্ষায়। সিএনজি বা রিকশা চালকদের হাতেও জিম্মি হতে হয় কখনো কখনো। ঝড়, বৃষ্টি বা হরতালের সময় মানুষের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। এমতাবস্থায় মেট্রোরেল চালু হলে সময়ের অপচয় যেমন হ্রাস পাবে তেমনই নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো সহজ হয়ে যাবে।
মেট্রোরেলের সুযোগ-সুবিধা:
সাধারণ ট্রেন সার্ভিসের চেয়ে মেট্রোরেলের ট্রেনে অধিকতর আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকবে। এগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো।
- উড়াল সড়ক:
মূল সড়কের মাঝ বরাবর উড়াল সড়ক নির্মিত হবে। উড়াল সড়কের উপর স্থাপিত রেললাইনের উপর দিয়ে চলবে ট্রেন। যানজট যাতে না হয়, সেভাবেই উড়াল সড়ক তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে।
- মেট্রোরেলের দৈর্ঘ্য:
রাজধানীর উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেলের দৈর্ঘ্য হবে ২০ দশমিক ০১ কিলোমিটার। এই দীর্ঘ রুটে ১৬টি স্টেশন থাকবে। এগুলোর মধ্যে প্রথম পর্যায়ে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত থাকবে ৯টি স্টেশন।
এগুলো হচ্ছে উত্তরা নর্থ, উত্তরা সেন্টার, উত্তরা সাউথ, পল্লবী, মিরপুর সাড়ে ১১ নম্বর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া এবং আগারগাঁও। দ্বিতীয় পর্যায়ে আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত থাকবে ৭টি স্টেশন। এগুলো হচ্ছে বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ানবাজার, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (টিএসসি), বাংলাদেশ সচিবালয় এবং মতিঝিল শাপলা চত্বর।
- বগি ও কামরা:
প্রতিটি ট্রেনে ৬টি করে বগি থাকবে। প্রতিটি কামরা হবে সুপরিসর। সেখানে যাত্রীদের জন্য থাকবে আরামদায়ক আসন। এছাড়া প্রতিটি কামরা হবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত।
- ট্রেন সংখ্যা ও সময়:
উত্তরা-মতিঝিল রুটে চলাচল করবে ১৪টি ট্রেন। প্রতিটি ট্রেনে ৯৪২ জন যাত্রী বসে এবং ৭৫৪ জন যাত্রী দাঁড়িয়ে যাতায়াত করতে পারবে। প্রতি ০৪ মিনিট পর পর ট্রেন ছেড়ে যাবে। ট্রেনের গতি হবে ঘণ্টায় ৩২ কিলোমিটার। শেষ গন্তব্যে পৌঁছতে ট্রেনের সময় লাগবে ৩৮ মিনিট। প্রতি স্টেশনে ট্রেন অবস্থান করবে ৪০ সেকেন্ড।উত্তরা-মতিঝিল রুটে চলাচল করবে ১৪টি ট্রেন। প্রতিটি ট্রেনে ৯৪২ জন যাত্রী বসে এবং ৭৫৪ জন যাত্রী দাঁড়িয়ে যাতায়াত করতে পারবে। প্রতি ০৪ মিনিট পর পর ট্রেন ছেড়ে যাবে। ট্রেনের গতি হবে ঘণ্টায় ৩২ কিলোমিটার। শেষ গন্তব্যে পৌঁছতে ট্রেনের সময় লাগবে ৩৮ মিনিট। প্রতি স্টেশনে ট্রেন অবস্থান করবে ৪০ সেকেন্ড।
- যাত্রী বহন ক্ষমতা ও ভাড়া আদায়:
মেট্রোরেলে ২৪টি ট্রেন প্রতি ঘণ্টায় আপ ও ডাউন রুটে দুই প্রান্তের ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহন করতে সক্ষম হবে। মেট্রোরেলের ভাড়া জনপ্রতি নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি কিলোমিটার ৫টাকা। সর্বনিম্ন ভাড়া হবে ২০ টাকা। মেট্রোরেল ব্যবস্থায় যাত্রীদের সুবিধার্থে স্টেশনে প্রবেশের সময় মেশিনে ভাড়া সংগ্রহ করা হবে। স্বয়ংক্রিয় কার্ডের মাধ্যমে ভাড়া পরিশোধ করবেন যাত্রীরা।
প্রকল্প ব্যয় ও অর্থায়ন:
পুরো ২০ দশমিক ০১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের মেট্রোরেল বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে জাইকা প্রকল্পের ৮৫ শতাংশের ব্যয় বাবদ ১৬ হাজার ৫৯৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা দেবে কয়েক ধাপে। বাকি ৫ হাজার ৪ কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে।
মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল প্রকল্পের দৈর্ঘ্য ১.১৬ কি.মি. বাড়ানোর কারণে প্রকল্প ব্যয় ১১ হাজার ৪৮৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা বৃদ্ধি হয়েছে। ফলে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।
নির্মাণকাজের অগ্রগতি:
সালের মধ্যে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্বোধনের পর উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত যাত্রী চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে ২০২৩ সালের মধ্যে আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত এবং ২০২৪ সালের মধ্যে কমলাপুর পর্যন্ত শেষ করার লক্ষমাত্রা নিয়ে দ্রুত কাজ এগিয়ে চলছে।
গতিশীল অর্থনীতি ও সহজ যাতায়াত:
বিপুল জনসংখ্যার রাজধানী শহরে যানজট নিরসনে কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা তথা স্ট্রাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান নিয়েছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। ডিটিসিএ-এর তত্ত্বাবধানেই বাংলাদেশ সরকার ও জাইকার অর্থায়নে মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। যথাসময়ে প্রকল্পের সমাপ্তিতে যাত্রী পরিবহন শুরু হলে মেট্রোরেল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। সরকার এ প্রকল্প থেকে প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে পারবে এবং জিডিপি বৃদ্ধি পাবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এ অভিমত বাস্তবসম্মত ও তাৎপর্যপূর্ণ। তাছাড়া মেট্রোরেলের স্বস্তিদায়ক সেবার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে ও নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবে। বিশেষ করে বৃদ্ধ, শিশু, প্রতিবন্ধী ও নারীরা দুর্বিষহ কষ্ট থেকে মুক্তি পাবে। উল্লেখ্য যে, যাত্রীরা নির্ধারিত স্থান থেকে ওঠানামা করার ফলে গড়ে উঠবে পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর ঢাকা মহানগরী।
উপসংহার:
অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের প্রথম এবং প্রধান শর্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। মেট্রোরেল উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত চালু হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও একধাপ এগিয়ে গেল। ২০২৪ সালের মধ্যে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু হলে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এটি হবে একটি মাইলফলক। এর মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের অর্থ আর সময়ের অপচয় বন্ধ হবে। যানজটমুক্তভাবে মানুষ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে।
Related Question
View All১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!