বৌদ্ধধর্মে পূর্ণজ্ঞান অর্জন করতে হলে জাতক পাঠের বিকল্প নেই। গৌতম বুদ্ধ জাতকের কাহিনির মাধ্যমে ধর্মের গভীর মর্মবাণী সহজ ভাষায় বর্ণনা করেছেন। এজন্য জাতক শুধুমাত্র কাহিনি নয়। এগুলো ভগবান বুদ্ধের উপদেশ। প্রতিটি জাতকে তিনি একেকটি নৈতিক শিক্ষণীয় বিষয় তুলে ধরেছেন। জাতক পাঠ করে নৈতিক শিক্ষা লাভ করা যায়। জাতকে বুদ্ধের সমকালীন সমাজব্যবস্থা, শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি, ব্যবসায়-বাণিজ্য, রাজনীতি, ধর্ম, দর্শন, পুরাতত্ত্ব, ইতিহাস প্রভৃতি সম্পর্কে প্রচুর তথ্য পাওয়া যায়। তাই প্রাচীন ভারতের ইতিহাস জানতে জাতক পাঠের গুরুত্ব অপরিসীম। জাতক পাঠ করে সৎ ও অসৎ কর্মের পরিণতি সম্পর্কে জানা যায়। জাতক পাঠে কুসংস্কার দূর হয়।
উপরিউক্ত আলোচনার মাধ্যমে বুঝা যায়, জাতক পাঠের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
পদ্ম জাতক কাহিনিতে বোধিসত্ত্ব এক শ্রেষ্ঠীপুত্র রূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বারাণসীরাজে এক উৎসবে বোধিসত্ত্বসহ মোট তিনজন শ্রেষ্ঠীপুত্র পদ্মমালা গলায় দিয়ে এ উৎসবে যাবেন বলে মনস্থির করেছিল। পদ্ম ফুল সংগ্রহের জন্য তাঁরা এক সরোবরের 'পদ্মরক্ষকের প্রশংসা শুরু করেন। পদ্মরক্ষকের নাকটি ছিল কর্তিত। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠীপুত্র পদ্মরক্ষকের নাক ভালো হয়ে যাবে এ প্রলোভন দেখিয়ে পদ্মফুল চাইলে রক্ষক ক্রুদ্ধ হন। তখন বোধিসত্ত্বরূপী তৃতীয় শ্রেষ্ঠীপুত্র বললেন, 'কাটা নাক কখনো নতুন করে গজায় না। ওরা পদ্মের লোভে মূর্খের মতো তোমাকে পদ্ম ফুল দিয়েছিল। মোটকথা চাটুকারিতার ফল কখনও ভালো হয় না। এটিই পদ্ম জাতকের মূল শিক্ষা।
বোধিসত্ত্বের এক শিষ্য একটি হস্তীশাবক পালন করত। কিন্তু গুরু তাকে বারবার হাতির বাচ্চা পোষার জন্য নিষেধ করেছিলেন। কারণ হিংস্র প্রাণীকে বিশ্বাস করতে নেই। সুযোগ পেলেই ছোবল মারে। যেমনটি হয়েছিল ঐ হস্তীপালকের। তাই বুদ্ধের উপদেশ হচ্ছে, মিত্র-অমিত্র নির্বাচনই বুদ্ধিমানের কাজ। বুদ্ধ মিত্র ও শত্রুর ব্যাখ্যা দিয়েছেন, কীভাবে তাদের চিনতে পারবে? বোধিসত্ত্ব বলেন, "যে দেখা করতে এসে হাসে না, অভিনন্দনে সাড়া দেয় না, মুখ ফিরিয়ে রাখে, কথা ও কাজে মিল নেই এমন ব্যক্তিরাই শত্রুভাবাপন্ন। অন্যদিকে যে উপকার করে, মঙ্গল কামনা করে, মিষ্টভাষী হয়, দুর্দিনে সাহায্য করে, সে সুমিত্র নামে কথিত।” যিনি মিত্র ও শত্রুর উক্ত দোষ-গুণগুলো দেখে শুনে কাজ করেন তিনিই বুদ্ধিমান। বোধিসত্ত্ব তার শিষ্যদের আলোচ্য স্বভাব, চরিত্র ব্যাখ্যা করে মিত্র ও শত্রুকে চিনতে সাহায্য করেন।
জাতক সূত্রপিটকের অন্তর্গত খুদ্দকনিকায়ের একটি অনন্য গ্রন্থ। এই গ্রন্থে গৌতম বুদ্ধের অতীত জীবনের বিভিন্ন কাহিনি ও ঘটনা বর্ণিত আছে। জাতকের কাহিনিগুলো নৈতিক শিক্ষায় সমৃদ্ধ। জাতকগুলোতে প্রসঙ্গক্রমে প্রাচীন ভারতের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি, সাহিত্য, পুরাতত্ত্ব প্রভৃতি বিষয় আলোচিত হয়েছে। তাই জাতককে প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উৎস বা আধার হিসেবে গণ্য করা হয়। ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাস রচনায় জাতকের গুরুত্ব অপরিসীম। এশিয়া মহাদেশের সাহিত্যের বিকাশ সাধনেও জাতকের অসীম প্রভাব রয়েছে। এ অধ্যায়ে আমরা জাতকের উৎপত্তি, গঠনশৈলী এবং কয়েকটি জাতক পাঠ করব।
এ অধ্যায় শেষে আমরা -
- জাতকের উৎপত্তি এবং জাতকের গঠনশৈলী ব্যাখ্যা করতে পারব।
- জাতকের বিভিন্ন কাহিনি বর্ণনা করতে পারব।
- জাতক পাঠ করে প্রাচীন সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে বর্ণনা করতে পারব।
Related Question
View Allজাতক প্রধানত তিনটি অংশে বিভক্ত।
জাতক পাঠের প্রয়োজনীয়তা অনেক। জাতকে বর্ণিত হয় নৈতিক শিক্ষা। এটি ইতিহাসের ভান্ডারও বটে। এখানে সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, ধর্ম, দর্শন, পুরাতত্ত্ব সম্পর্কে প্রচুর তথ্যা পাওয়া যায়। সৎও অসৎ কর্মের পরিণতি সম্পর্কে জানা যায়, কুসংস্কার দূর হয়।
দেবধর্ম জাতকের সাথে উদ্দীপকের কাহিনির মিল রয়েছে। এখানে যক্ষের চরিত্রের মধ্যদিয়ে জলরাক্ষসের কর্মকান্ড ফুটে উঠেছে। দেবধর্ম জাতকে তিন রাজকুমার যখন বনে বসবাস করতে গিয়েছিল তখন বোধিসত্ত্ব বা মহিংসায় কুমার তাঁর ছোট ভাই সূর্যকুমারকে এক সরোবরে গিয়ে স্নান করে এবং তাঁদের জন্য জল নিয়ে আসতে বলেছিল। কিন্তু সূর্যকুমারকে ফিরতে দেরি দেখে বোধিসত্ত্ব চন্দ্রকুমারকে ছোট ভাইয়ের খোঁজে পাঠালেন কিন্তু দ্বিতীয় রাজকুমারকেও ফিরে আসতে দেরি দেখে বোধিসত্ত্ব অনুধাবন করলেন নিশ্চয় সরোবরে জলে জলরাক্ষস রয়েছে, যে তাদেরকে আটক করে রেখেছে। বোধিসত্ত্ব সশস্ত্র অবস্থায় সরোবরের পাড়ে গেলেন এবং চিন্তার মিল পেলেন। জলরাক্ষসকে দেবধর্মের উত্তর দিয়ে দুই ভাইকে ছাড়িয়ে এনেছিলেন। বোধিসত্ত্বের কথায় মুগ্ধ হয়ে জলরাক্ষস পাপকর্ম ছেড়ে দিয়েছিল।
আমরা জানি, সত্যের জয় অনিবার্য। সৎভাবে জীবনযাপন করতে হলে প্রয়োজন নিজ নিজ ধর্মজ্ঞান। অন্যথায় এটি সম্ভব নয়। দেবধর্ম জাতকে বোধিসত্ত্ব তাঁর ধর্মজ্ঞনের প্রভাবে সরোবরের জলরাক্ষসের হাত থেকে আটকে পড়া দুই ভাইকে মুক্ত করে আনতে পেরেছিলেন।
বোধিসত্ত্ব এতই সৎ ছিলেন যে, সে তার আপন ভাইকে ছেড়ে দেওয়ার কথা জলরাক্ষসকে বলেননি; বরং তিনি তার সৎভাইকে বাঁচানোর জন্য জলরাক্ষসকে অনুরোধ করেছিলেন। সূর্যকুমার এবং চন্দ্রকুমার রাক্ষসের করা প্রশ্নের উত্তর যথাযথভাবে না দিতে পারায় তাদেরকে আটক থাকতে হয়েছিল। কিন্তু বোধিসত্ত্বরূপী মহিসাংস কুমার তার ধর্মজ্ঞানের কারণেই এবং ধর্মপথে চলার ফলেই শেষ পর্যন্ত দুই ভাইকেই মুক্ত করতে পেরেছিলেন।
দেবধর্ম জাতকে বোধিসত্ত্বের নাম ছিল মহিংসাস কুমার।
রাজার মোট তিনজন রাজপুত্র ছিল। এর মধ্যে রাজকুমার মহিংসাস এবং রাজকুমার চন্দ্রকুমার ছিল আপন ভাই। তাঁদের মা মৃত্যুবরণ করলে রাজা পুনরায় বিবাহ করলে সেই ঘরে রাজকুমার সূর্যকুমারের জন্ম হয়। সূর্যকুমারের মায়ের বর্ণনানুযায়ী সূর্যকুমারকে রাজা করার কথা বললে রাজা তার বড় দুই ছেলে বাদ দিয়ে ছোট ছেলেকে রাজত্ব দিতে চাইলেন না। তাই বড় দুই ছেলেকে সৎমায়ের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বনে যাওয়ার পরামর্শ দেন। যখন বড় দুই ছেলে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে যাওয়ার সময় ছোট ভাই সূর্যকুমারও তাঁদের সাথে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে বনে চলে গিয়েছিলেন।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!