জাতক গাইড ও নোট (নবম অধ্যায়)

সপ্তম শ্রেণি — মাধ্যমিক - বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা | NCTB BOOK
502

জাতক সূত্রপিটকের অন্তর্গত খুদ্দকনিকায়ের একটি অনন্য গ্রন্থ। এই গ্রন্থে গৌতম বুদ্ধের অতীত জীবনের বিভিন্ন কাহিনি ও ঘটনা বর্ণিত আছে। জাতকের কাহিনিগুলো নৈতিক শিক্ষায় সমৃদ্ধ। জাতকগুলোতে প্রসঙ্গক্রমে প্রাচীন ভারতের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি, সাহিত্য, পুরাতত্ত্ব প্রভৃতি বিষয় আলোচিত হয়েছে। তাই জাতককে প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উৎস বা আধার হিসেবে গণ্য করা হয়। ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাস রচনায় জাতকের গুরুত্ব অপরিসীম। এশিয়া মহাদেশের সাহিত্যের বিকাশ সাধনেও জাতকের অসীম প্রভাব রয়েছে। এ অধ্যায়ে আমরা জাতকের উৎপত্তি, গঠনশৈলী এবং কয়েকটি জাতক পাঠ করব।

এ অধ্যায় শেষে আমরা -

  • জাতকের উৎপত্তি এবং জাতকের গঠনশৈলী ব্যাখ্যা করতে পারব।
  • জাতকের বিভিন্ন কাহিনি বর্ণনা করতে পারব।
  • জাতক পাঠ করে প্রাচীন সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে বর্ণনা করতে পারব।
Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

অনুচ্ছেদটি পড় এবং প্রশ্নের উত্তর দাও

পুরাকালে বারানসিরাজ ব্রহ্মদত্তের রাজত্বকালে বোধিসত্ত্ব এক শ্রেষ্ঠী পুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করেন। তখন নগরের অভ্যন্তরে একটি সরোবরে পদ্ম ফুটত। এক ব্যক্তি ঐ সরোবরের রক্ষণাবেক্ষণ করত।

জাতকের উৎপত্তি ও গঠনশৈলী (পাঠ ১)

179

বৌদ্ধধর্ম অনুসারে এক জন্মের কর্মফলে কেউ বুদ্ধ হতে পারেন না। বোধিসত্ত্ব নানারূপে নানাকূলে জন্মগ্রহণ করে দান, শীল, পারমী ইত্যাদি পালনপূর্বক চরিত্রের উৎকর্ষ সাধন করেছিলেন। প্রত্যেকটি জন্মে তিনি হিতকর কর্ম সম্পাদন করেন এবং নিজেকে ক্রমান্বয়ে উচ্চ থেকে উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত করেছিলেন। বোধিসত্ত্ব পাঁচশ' পঞ্চাশতম জন্মে বোধিজ্ঞান লাভ করে বুদ্ধ হন।

বুদ্ধত্ব লাভ করে তিনি অতীত জন্মসমূহের ঘটনাবলি দেখার সহায়ক জ্ঞানচক্ষু লাভ করেন। তিনি পূর্বজন্মের সব ঘটনা চোখের সামনে দেখতে পেতেন। বুদ্ধত্ব লাভের পর তিনি এই অলৌকিক ক্ষমতা প্রাপ্ত হন। তিনি শিষ্যদের ধর্মদেশনা করার সময় কথা প্রসঙ্গে তাঁর অতীত জীবনের বিভিন্ন কাহিনি ও ঘটনাবলি বলতেন। শিষ্যরা মনোযোগ সহকারে কাহিনিগুলো শুনতেন এবং স্মৃতিতে ধারণ করে রাখতেন। পরবর্তীকালে সঙ্গীতির মাধ্যমে এগুলো সংকলিত হয়। এই কাহিনিগুলোই জাতক নামে পরিচিত।

সাধারণ অর্থে 'জাতক' শব্দের অর্থ 'যে জন্মগ্রহণ করেছে'। কিন্তু বৌদ্ধধর্মে জাতক শব্দটি বিশেষ অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। বৌদ্ধ সাহিত্যে গৌতম বুদ্ধের অতীত জীবনের কাহিনিগুলো জাতক নামে অভিহিত। জাতকের সব কাহিনিই উপদেশমূলক। মানুষকে কুশলকর্ম সম্পাদনে উদ্বুদ্ধ করাই জাতকের উদ্দেশ্য। অতএব বলা যায়, গৌতম বুদ্ধের বোধিসত্ত্বকালীন জন্মকাহিনি থেকে মানুষকে নৈতিক শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করার নিমিত্তে জাতকের উৎপত্তি হয়।

জাতকের গঠনশৈলী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রত্যেকটি জাতক প্রধানত তিনটি অংশে বিভক্ত: ক. প্রত্যুৎপন্নবস্তু, খ. অতীত বস্তু বা মূল আখ্যান এবং গ. সমবধান।

প্রতুৎপন্নবস্তু: জাতকের প্রথম অংশের নাম প্রতুৎপন্নবস্তু। একে বর্তমান কথাও বলা হয়। এই অংশে বুদ্ধ কার উদ্দেশ্যে, কী উপলক্ষে কাহিনিটি বলেছিলেন তার বর্ণনা রয়েছে। এই অংশটিকে জাতকের উপক্রমনিকা বা ভূমিকাও বলা হয়।

অতীতবস্তু: জাতকের দ্বিতীয় অংশ হলো অতীতবস্তু। এই অংশে ভগবান বুদ্ধের অতীত জন্মবৃত্তান্ত এবং সে সময়কার বিভিন্ন ঘটনাবলি বর্ণিত আছে। এই অংশটিই প্রকৃত জাতক কাহিনি। তাই একে মূল আখ্যায়িকাও বলা হয়।

সমবধান: জাতকের তৃতীয় অংশের নাম সমবধান। জাতক কাহিনিতে বর্ণিত পাত্র এবং গৌতম বুদ্ধ যে অভিন্ন তা প্রদর্শন করাই এই অংশের উদ্দেশ্য। এই অংশকে সমাধানও বলা হয়।

অনুশীলনমূলক কাজ
জাতক শব্দের অর্থ কী?
জাতক বলতে কী বুঝায়?

Content added By

জাতক পাঠের প্রয়োজনীয়তা (পাঠ ২)

210

গৌতম বুদ্ধ জাতকের কাহিনির মাধ্যমে ধর্মের গভীর মর্মবাণী সাবলীল ভাষায় বর্ণনা করেছেন। এজন্য জাতক শুধুমাত্র কাহিনি নয়, এগুলো ভগবান বুদ্ধের উপদেশও। প্রতিটি জাতকে তিনি একেকটি নৈতিক শিক্ষণীয় বিষয় তুলে ধরেছেন। তাই জাতক পাঠ করে নৈতিক শিক্ষা লাভ করা যায়।

জাতক প্রাচীন ইতিহাসের এক অফুরন্ত ভান্ডার। জাতকে বুদ্ধের সমকালীন সমাজ ব্যবস্থা, শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি, ধর্ম-দর্শন, পুরাতত্ত্ব, ইতিহাস প্রভৃতি সম্পর্কে প্রচুর তথ্য পাওয়া যায়। তাই প্রাচীন ভারতের ইতিহাস জানার জন্য জাতক পাঠের গুরুত্ব অপরিসীম।

বৌদ্ধরা কর্মফল বিশ্বাস করে। জাতকে কর্মফল সম্পর্কে প্রচুর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। জাতক পাঠ করে সৎ ও অসৎ কর্মের পরিণতি সম্পর্কে জানা যায়। ফলে মানুষ অসৎ কর্ম বর্জন এবং সৎ কর্ম করতে উৎসাহী হয়। জাতক পাঠে কুসংস্কার দূর হয়। নক্ষত্র জাতকে কুসংস্কারের ফলে গ্রামবাসীরা দুরবস্থার সম্মুখীন হয়েছিল। জাতকে কুশলকর্মের দ্বারা কুশল ফল এবং অকুশলকর্মের দ্বারা অকুশল ফল লাভের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। 'কালকর্ণী জাতক' থেকে আমরা বিপদের দিনে বন্ধুকে কীভাবে সাহায্য করতে হয় তা শিক্ষা লাভকরতে পারি। বোধিসত্ত্বের অবর্তমানে তার বাল্যবন্ধু কালকর্ণী ডাকাতদলের হাত থেকে বোধিসত্ত্বের সমস্ত সম্পত্তি রক্ষা করেছিলেন।

জাতকের কাহিনিগুলোতে সদাচরণ, জীবে দয়া, সংযম, দানের মহিমা, নৈতিক জীবনের উৎকর্ষ সাধন ও উপকারিতা প্রভৃতি বিষয়ে হিতোপদেশ রয়েছে। এগুলো বুদ্ধের জন্ম-জন্মান্তরের পারমী পূরণের কথা। এসব গুণাবলি নৈতিক ও আদর্শ জীবন গঠনে সহায়ক। বন্ধু-বান্ধব কেউ বিপথগামী হলে তাকে জাতকের শিক্ষার মাধ্যমে সৎপথে ফিরিয়ে আনা যায়। তাই সুস্থ পারিবারিক ও সমাজজীবন গঠন এবং ব্যক্তি জীবনের উৎকর্ষ সাধনের জন্য জাতকের গল্পগুলো পড়া উচিত।
এখানে কয়েকটি জাতকের কাহিনি বর্ণনা করা হলো।

অনুশীলনমূলক কাজ
জাতক পাঠ করে কী শিক্ষা লাভ করতে পারি?

Content added By

বানরেন্দ্র জাতক (পাঠ ৩)

160

বারানসিরাজ ব্রহ্মদত্তের সময়ে বোধিসত্ত্ব একবার বানররূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পূর্ণ বয়সে তিনি ছিলেন অসাধারণ শক্তির অধিকারী। তিনি একাকী এক নদীর তীরে বিচরণ করতেন। নদীর অপর পারে ছিল একটি আম-কাঁঠালের দ্বীপ। বোধিসত্ত্ব যে নদীর তীরে থাকতেন সে নদীর মাঝখানে একটি শৈল পর্বত ছিল। বোধিসত্ত্ব প্রতিদিন নদী তীর থেকে এক লাফে সেই পর্বতের ওপর এবং সেখান থেকে এক লাফে দ্বীপে গিয়ে পড়তেন। সেই দ্বীপে তিনি পেটভরে আম-কাঁঠাল খেয়ে সন্ধ্যার সময় ঠিক একই ভাবে নদী পার হয়ে ফিরে আসতেন।

ঐ নদীতে বাস করত সস্ত্রীক এক কুমির। বোধিসত্ত্বকে প্রতিদিন নদী পারাপার হতে দেখে কুমিরের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর তাঁর হৃৎপিণ্ড খাওয়ার সাধ হলো। সে তার সাধের কথা কুমিরকে জানাল। স্ত্রীর সাধ পূরণের উদ্দেশ্যে কুমির সন্ধ্যার সময় বোধিসত্ত্বকে ধরার জন্য পর্বতের ওপর উঠে বসে থাকল।

বোধিসত্ত্ব প্রতিদিন সন্ধ্যার সময় ফেরার আগে নদীর জল কতদূর বাড়ল, শৈল কতদূর জেগে থাকল তা মনোযোগ সহকারে দেখে নিতেন। সেদিন সারাদিন বিচরণপূর্বক সন্ধ্যাকালে পর্বতের দিকে তাকিয়ে তিনি বিস্মিত হলেন। তিনি লক্ষ করলেন, নদীর জল বাড়েওনি কমেওনি, অথচ পর্বতের উপরিভাগ উঁচু হয়ে আছে। তাঁর মনে সন্দেহ হলো। নিশ্চয় তাঁকে ধরার জন্য কুমির পর্বতের ওপর উঠে বসে আছে। তিনি বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার লক্ষ্যে চিৎকার করে পর্বতকে ডাকতে থাকলেন, 'ওহে পর্বত'। কোনো উত্তর না পেয়ে আবার ডাকলেন। এতেও কোনো সাড়া না পেয়ে তিনি বললেন, 'ভাই পর্বত! আজ কোনো উত্তর দিচ্ছ না কেন?'

কুমির ভাবল, এই পর্বত নিশ্চয় প্রতিদিন বানরের ডাকে সাড়া দিয়ে থাকে। আজ আমি পর্বতের পরিবর্তে সাড়া দিই। তখন সে উত্তরে বলল, 'কে, বানরেন্দ্র নাকি?'
বোধিসত্ত্ব জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কে?' সে উত্তর দিল, আমি কুমির।
-তুমি পর্বতের ওপর বসে আছ কেন?

-আমার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর তোমার কলিজা খাওয়ার সাধ হয়েছে। তাই তোমাকে ধরতে বসে আছি।
-কুমির ভাই, আমি তোমাকে ধরা দিচ্ছি। তুমি হাঁ কর, আমি তোমার মুখের ভিতর লাফিয়ে পড়ছি। তখন তুমি আমায় ধরতে পারবে।

কুমির ও বানর

কুমির যখন মুখ হাঁ করে তখন তার দুচোখ দিয়ে কিছুই দেখতে পায় না। বোধিসত্ত্ব যে কৌশলে নিজের জীবন রক্ষা করতে চেষ্টা করছিলেন কুমির তা বুঝতে পারেনি। সে বোধিসত্ত্বের কথামতো মুখ হাঁ করে চোখ বন্ধ করে রইলো। এই অবস্থায় বোধিসত্ত্ব এক লাফে তার মাথার ওপর এবং আরেক লাফে খুব দ্রুতগতিতে নদীর ওপারে পৌঁছে গেলেন। কুমির এই কান্ড দেখে অবাক হয়ে বানরের উদ্দেশ্যে বললো, 'বানরেন্দ্র, চারটি গুণ থাকলে সব শত্রু জয় করা যায়। সে চারটি গুণ হলো সত্য, ধৈর্য, ত্যাগ আর বিচক্ষণতা। তোমার মধ্যে এই চারটি গুণই আছে। তোমাকে নমস্কার।'

এভাবে বানররূপী বোধিসত্ত্বের প্রশংসা করে কুমির চলে গেল।

উপদেশ: ধৈর্য ও বুদ্ধি দিয়ে বিপদের মোকাবিলা করতে হয়।

অনুশীলনমূলক কাজ
বানর কেমন করে এপার থেকে ওপারে যেত?
বানর কীভাবে কুমিরের হাত থেকে রক্ষা পেল?
বুদ্ধি দিয়ে তোমরা কোনো বিপদ থেকে রক্ষা পেয়ে থাকলে তা বর্ণনা কর (দলীয় কাজ)।

Content added By

দেবধর্ম জাতক (পাঠ ৪)

175

পুরাকালে বারানসি রাজ্যে ব্রহ্মদত্ত নামে এক রাজা ছিলেন। সে সময় বোধিসত্ত্ব রাজকুমাররূপে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর নাম হলো মহিংসাস কুমার। তাঁর জন্মের দুই-তিন বছর পর এক ছোট ভাই জন্ম গ্রহণ করে। তাঁর নাম হলো চন্দ্রকুমার। চন্দ্রকুমার একটু বড় হলে রানি পরলোক গমন করেন। রাজা ব্রহ্মদত্ত তখন পুনর্বার বিবাহ করেন। কিছুদিন পর ছোট রানির এক ছেলে হলো। সেই ছেলের নাম হলো সূর্যকুমার। রাজা তখন খুব খুশি হয়ে রানিকে বর চাইতে বললেন। রানি তখন কোনো বর নিলেন না। তিনি বললেন, মহারাজ, এখন থাক, পরে আমি এই বর চেয়ে নেব।

সূর্যকুমার বড় হলো। রানি তখন রাজাকে বললেন, 'সূর্যকুমারের জন্মের সময় আপনি আমাকে একটি বর দিতে চেয়েছিলেন। এখন সেই বর আমাকে দিন। আমার ছেলেকে রাজা করে নিন। ব্রহ্মদত্ত বললেন, আমার বড় দুই ছেলে আগুনের মতো তেজস্বী। আমি তাদের রেখে ছোট কুমারকে রাজা করতে পারি না। রানি রাজার কথায় শান্ত হলেন না। তিনি দিনরাত রাজাকে এই নিয়ে বিরক্ত করতে লাগলেন। রাজাও এতে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তিনি আশঙ্কা করলেন, রানির চক্রান্তে বড় দুই কুমারের ক্ষতি হতে পারে।

এই ভেবে রাজা বড় দুই কুমারকে ডেকে বললেন, ছেলেরা আমার, তোমাদের ছোট ভাইয়ের জন্যের সময় ছোট রানিকে আমি একটি বর চাইতে বলেছিলাম। বর স্বরূপ এখন তিনি সূর্যকুমারকে রাজা করতে চান। কিন্তু সে রাজা হোক আমি তা চাই না। আমি আশঙ্কা করছি এজন্য ছোট রানি তোমাদের ক্ষতি করতে পারে। তোমরা এখন বনে গিয়ে আশ্রয় নাও। আমার মৃত্যুর পর নিয়ম অনুযায়ী বড় ছেলে রাজত্ব পাবে। তখন তোমরা সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিও। এই বলে তিনি বড় দুই ছেলেকে বিদায় দিলেন।

দুই কুমার পিতার আদেশে রাজপ্রাসাদ থেকে বেরিয়ে পড়ল। প্রাসাদের বাইরে তখন সূর্যকুমার খেলছিল। দুই ভাইয়ের মুখ থেকে বনে যাওয়ার কথা শুনে সেও ভাইদের সঙ্গে চলল। চলতে চলতে তিন ভাই হিমালয় পর্বতে পৌঁছল। সেখানে বোধিসত্ত্ব এক গাছের তলায় বসে সূর্যকুমারকে বললেন, ওই সরোবরে গিয়ে স্নান করে এসো। জল খেয়ে এসো। আসার সময় পদ্মপাতায় করে আমাদের জন্য জল নিয়ে এসো।

সেই সরোবরে এক জলরাক্ষস বাস করত। জলরাক্ষস সরোবরটি পেয়েছিল এক কুবেরের কাছ থেকে। সরোবরটি দেওয়ার সময় কুবের তাকে বলেছিলেন, দেবধর্ম জ্ঞানহীন কোনো লোক যদি এই সরোবরে নামে একমাত্র তাকেই তুমি খেতে পারবে। কিন্তু জলে না নামলে তাকে তুমি খেতে পারবে না। সূর্যকুমার এসব কিছুই জানত না। সে জলে নামতেই জলরাক্ষস তাকে ধরে বলল, দেবধর্ম কাকে বলে জান? সূর্যকুমার বলল, জানি, লোকে সূর্য ও চাঁদকে দেবতা বলে। রাক্ষস বলল, মিথ্যে কথা। তুমি দেবধর্ম কী জানো না-এই কথা বলে সে সূর্যকুমারকে টেনে নিজের ঘরে নিয়ে বেঁধে রাখল।

তিন রাজকুমার বনের দিকে যাচ্ছে

সূর্যকুমার ফিরে আসতে দেরি করছে দেখে বোধিসত্ত্ব চন্দ্রকুমারকে ছোট ভাইয়ের খোঁজে পাঠালেন। জলরাক্ষস চন্দ্রকুমারকেও প্রশ্ন করল, দেবধর্ম কী? চন্দ্রকুমার যে উত্তর দিল, জলরাক্ষস তাতে সন্তুষ্ট হতে পারল না। তাই চন্দ্রকুমারকেও নিজের ঘরে নিয়ে বেঁধে রাখল।

চন্দ্রকুমার ফিরে আসছে না দেখে বোধিসত্ত্ব বুঝলেন দুই ভাই কোনো বিপদে পড়েছে। তাঁর সন্দেহ হলো নিশ্চয় ওই সরোবরে কোনো জলরাক্ষস আছে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি তীর, ধনুক ও তরবারি নিয়ে সরোবরের কূলে রাক্ষসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। রাক্ষস দেখল, বোধিসত্ত্ব জলে নামছেন না। তখন সে বনবাসী মানুষ সেজে বোধিসত্ত্বের সামনে এসে বলল, 'ভাই, আপনি ক্লান্ত। সামনে চমৎকার সরোবর। ওখানে নেমে স্নান করুন। জলপান করুন। তাতে আপনার ক্লান্তি কেটে যাবে।'

বোধিসত্ত্ব জলরাক্ষসকে চিনতে পারলেন। জলরাক্ষসও উপায় না দেখে বোধিসত্ত্বের কাছে সব কথা স্বীকার করল। তখন বোধিসত্ত্ব বললেন, দেবধর্ম কী তা আমি জানি। তুমি আমার কাছ থেকে তা কী জানতে চাও?

রাক্ষস বলল, হ্যাঁ চাই।

তখন বোধিসত্ত্ব বললেন, 'এখন আমি খুব ক্লান্ত। আগে ক্লান্তি দূর করি। তারপর বলব।' তখন রাক্ষস তাঁকে স্নান করতে দিল। খাদ্য ও পানীয় দিল। বসার জন্য বিচিত্র আসন সাজিয়ে তাতে বসতে দিল। বোধিসত্ত্ব সেই আসনে বসলেন। রাক্ষস তাঁর পায়ের কাছে বসল। তখন বোধিসত্ত্ব বললেন, 'শান্ত, সত্যপরায়ণ ও নির্মল অন্তরে যিনি ধর্মকাজ করেন তিনি দেবধর্ম পরায়ণ। মনে পাপ জাগলে যিনি নিজে লজ্জা পান তিনি দেবধর্ম পরায়ণ।'

এই ব্যাখ্যা শুনে রাক্ষস সন্তুষ্ট হয়ে বলল, আপনি পণ্ডিত। আমি আপনার কথায় সন্তুষ্ট হলাম। আমি আপনাকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। আপনার একজন ভাইকে ফিরিয়ে দিচ্ছি। বলুন, কাকে আনব? বোধিসত্ত্ব বললেন, আমার ছোট ভাইকে।

রাক্ষস বলল, আপনি দেবধর্ম জানেন। অথচ সেই অনুসারে কাজ করছেন না। মেজ ভাইয়ের বদলে ছোট ভাইকে চাইছেন কেন?

বোধিসত্ত্ব উত্তর দিলেন, আমি দেবধর্ম জানি এবং সেই অনুসারে কাজও করি। সবচেয়ে ছোট ভাইটি আমার সৎ ভাই। ওর জন্য আমরা বনবাসী হয়েছি। আমার বিমাতা ওকে রাজা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পিতা তাতে রাজি হননি। আমাদের ছোট ভাইটিও সব শুনে আমাদের সঙ্গে বনবাসী হয়েছে। আমাদের ফেলে সে একদিনও রাজপুরীতে ফেরার কথা ভাবেনি। এখন ফিরে গিয়ে আমি যদি বলি তাকে রাক্ষস খেয়েছে তা কেউ বিশ্বাস করবে না। এজন্য আমি তাকে চাইছি।

রাক্ষস খুশি হয়ে দুই ভাইকে ফিরিয়ে দিল। তখন বোধিসত্ত্ব রাক্ষসকে বললেন, তুমি অতীত জন্মে পাপ করেছিলে বলে রাক্ষস হয়েছ। এতেও তোমার শিক্ষা হয়নি। এ জন্মেও তুমি পাপ করছ। এর ফলে তুমি মৃত্যুর পর নরকে থাকবে। কষ্ট পাবে। সুতরাং এখন থেকে সৎকর্ম কর, সৎপথে চলে এসো। তাহলে তুমি মুক্তি পাবে।

এভাবে জলরাক্ষসকে সৎ পথে এনে বোধিসত্ত্ব বনে বাস করতে লাগলেন। তারপর একদিন পিতার মৃত্যুর খবর পেয়ে রাজ্যে ফিরে গেলেন। তিনি বারানসির রাজা হলেন। চন্দ্রকুমারকে করলেন উপরাজ। সূর্যকুমারকে দিলেন সেনাপতির পদ। রাক্ষসের জন্য সুন্দর ঘর ও সুখের ব্যবস্থা করলেন। এভাবে রাজধর্ম পালন করে তিনি পরলোক গমন করলেন। পুণ্যবলে মৃত্যুর পর তিনি স্বর্গ লাভ করলেন।

উপদেশ: ধর্মপথে চললে জয় অনিবার্য।

অনুশীলনমূলক কাজ
রাজা কেন রানিকে বর দিতে চেয়েছিলেন?
বোধিসত্ত্ব রাক্ষসকে সৎপথে আনার জন্য কী বলেছিলেন?

Content added By

পদ্ম জাতক (পাঠ ৫)

200

পুরাকালে বারানসিরাজ ব্রহ্মদত্তের রাজত্বকালে বোধিসত্ত্ব এক শ্রেষ্ঠীপুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করেন। তখন নগরের অভ্যন্তরে একটি সরোবরে পদ্ম ফুটত। এক ব্যক্তি ঐ সরোবরের রক্ষণাবেক্ষণ করত। তার নাকটি কাটা ছিল।

একদিন বারানসিতে একটা উৎসবের সংবাদ প্রচারিত হলো। বোধিসত্ত্বসহ তিনজন শ্রেষ্ঠীপুত্র পদ্মের মালা গলায় দিয়ে ঐ উৎসবে যাবেন বলে মনস্থির করলেন। তাঁরা পদ্মের লোভে সরোবরে গিয়ে হাজির হলেন। পদ্মরক্ষক তখন সরোবর থেকে পদ্ম তুলছিল। তাঁরা তিনজনে পদ্মরক্ষকের প্রশংসা শুরু করলেন।
প্রথম শ্রেষ্ঠীপুত্র বললেন, 'চুল, দাড়ি যতবার কাটা হয় দুদিন পরে তা আবার আগের মতো বৃদ্ধি পায়। ভাই পদ্মরক্ষক! তোমার খন্ডিত নাকটিও চুল, দাড়ির মতো বৃদ্ধি পেতে পেতে একসময় পূর্নাঙ্গ হয়ে যাবে। দয়া করে আমাকে কয়েকটি পদ্ম দাও না ভাই'। একথা শুনে পদ্মরক্ষক অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলো। সে তাঁকে কোনো পদ্ম দিল না।
দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠীপুত্র বললেন, "শরৎকালে ক্ষেতে বীজ বুনলে সেই বীজ থেকে যেভাবে অঙ্কুর বের হয়, ঠিক সেভাবে তোমার খন্ডিত নাকটিও একসময় পরিপূর্ণতা প্রাপ্ত হবে। ভাই পদ্মরক্ষক! আমাকে কয়েকটি পদ্ম দাও না"। একথা শুনেও পদ্মরক্ষক অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলো এবং তাঁকেও কোনো পদ্ম দিল না।
বোধিসত্ত্বরূপী তৃতীয় শ্রেষ্ঠীপুত্র বললেন, 'এগুলো সব মূর্খের প্রলাপ। ওরা পদ্মের লোভে মিথ্যা তোষামোদ করছে। কাটা নাক কখনো নতুন করে গজাবে না বা বৃদ্ধি পাবে না। তোমাকে আমি সত্য কথাটাই বললাম। ভাই পদ্মরক্ষক আমাকে গোটা কতক পদ্ম দাও'।
তৃতীয় শ্রেষ্ঠীপুত্রের কথা শুনে পদ্মসরোবরের রক্ষক খুশি হয়ে বলল, 'এ দুজন মিথ্যাকথা বলেছে, মিথ্যা তোষামোদ করেছে। তুমি প্রকৃত সত্য কথাই বলেছ। অতএব পদ্ম তোমারই পাওয়া উচিত"।
পদ্মরক্ষক তৃতীয় শ্রেষ্ঠীপুত্রকে একটা বড় পদ্মমালা দিয়ে পুরস্কৃত করলেন।

পদ্মরক্ষক পদ্ম তুলছেন

উপদেশ: চাটুকারিতার ফল কখনো ভালো হয় না।

অনুশীলনমূলক কাজ
পদ্মরক্ষক তৃতীয় শ্রেষ্ঠীপুত্রকে পদ্ম দিয়েছিলেন কেন?
জাতকের গল্পটি পাঠ করে কী শিক্ষা পেলে? বর্ণনা কর।

Content added By

লটুকিক জাতক (পাঠ ৬)

193

পুরাকালে বোধিসত্ত্ব হস্তীকুলে জন্মগ্রহণ করে আশি হাজার হাতির অধিপতি হয়েছিলেন। সে সময় এক লটুকিক পাখি হাতিদের বিচরণের স্থানে ডিম পেড়েছিল। সেই ডিম ফুটে একসময় ছানা বের হলো।

ছানাগুলোর তখনও পাখা গজায়নি, সেজন্য তারা উড়তে পারত না। এমন সময় বোধিসত্ত্ব দলবলসহ সেই পথে এসে উপস্থিত হলেন। তখন মা লটুকিক পাখি তার ছানাদের জীবন বাঁচাবার চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়ল। সে ভাবল, হাতির পায়ের তলে পড়ে এই বুঝি তার ছানাদের প্রাণ যায়।

কাজেই সে তার ছানাদের প্রাণ বাঁচাবার জন্য হস্তীরূপী বোধিসত্ত্বের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সে তার পাখা দুটি জোড় করে তার ছানাদের প্রাণরক্ষার জন্য বোধিসত্ত্বের কাছে মিনতি জানাল। বলল, হে হস্তীরাজ, আপনার বয়স ষাট বছর, আপনি যশস্বী, পর্বতের ওপরের সমতল ভূমিতে বিচরণ করেন। আমার দুটি পাখা জোড় করে আপনাকে বন্দনা করছি। আমার দুর্বল ছানাগুলোকে মারবেন না। বোধিসত্ত্ব বললেন, 'হে লটুকিক পাখির মা! তুমি ভয় পেও না। আমি তোমার ছানাদের রক্ষা করব' এই বলে তিনি ছানাগুলোকে পায়ের ফাঁকে আগলে রাখলেন। একে একে আশি হাজার হাতি চলে গেলে তিনি সরে দাঁড়ালেন। তারপর সেখান থেকে যাওয়ার সময় লটুকিক পাখির মাকে বললেন, আমাদের পিছনে একটি দলছাড়া হাতি আছে। সে একা। সে আমাদের কথা শোনে না, আমার আদেশও মানে না। কাজেই তুমি তার কাছে তোমার বাচ্চাদের বাঁচাবার জন্য প্রার্থনা করো। লটুকিক পাখি বোধিসত্ত্বকে ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় জানাল। তারপর সেই দলছুট হাতিটি এলো। মা লটুকিক পাখি দুটি পাখা জোড় করে তার বাচ্চাদের জীবন রক্ষা করার জন্য বিনীত প্রার্থনা জানাল। বলল, হে একাচারী অরণ্যবাসী, যশস্বী হস্তীরাজ, আপনার বয়স ষাট বছর, পর্বতের ওপরে সমতল ভূমিতে আপনি বিচরণ করেন। আমার দুটি পাখা জোড় করে আপনাকে বন্দনা জানাচ্ছি। আমার দুর্বল ছানাগুলোকে আপনি মারবেন না। তখন সেই একাচারী হাতি বলল, লটুকিক পাখি, আমি তোমার বাচ্চাগুলো পায়ে পিষে মারব। তুমি দুর্বল, তুমি আমার কী করতে পারবে? তোমার মতো শত শত লটুকিক পাখিকে আমার এই বাঁ পা দিয়ে শেষ করে দিতে পারি- এই বলে সে বাচ্চাগুলোকে পায়ে দলে পিষে চিৎকার করতে করতে চলে গেল।

বোধিসত্ত্বরূপী হস্তীরাজ লটুকিক ছানাদের রক্ষা করছে

মা লটুকিক গাছের শাখায় বসে বলল, হে হস্তীরাজ, তুমি আজ চিৎকার করতে করতে যাচ্ছ যাও। কয়দিন পরে আমি তোমার কী করতে পারি তা বুঝবে। শরীরের শক্তি থেকে জ্ঞানের বল যে শ্রেষ্ঠ তা তুমি জানো না। আমি তোমাকে উচিত শিক্ষা দেব।

তারপর লটুকিক পাখি এক কাকের সঙ্গে বন্ধুত্ব করল। কাক তার বন্ধুত্বে খুশি হয়ে বলল, বন্ধু! আমি তোমার কী উপকার করতে পারি? লটুকিক পাখি বলল, বন্ধু! তোমার সরু ঠোঁট দিয়ে একদিন ঐ একাচারী হাতির চোখ তুলে নিতে পারবে? কাক লটুকিক পাখির দুঃখের কাহিনি শুনে বলল, আচ্ছা।

তারপর লটুকিক এক নীল মাছির সঙ্গে বন্ধুত্ব করল। নীল মাছিও কাকের মতো লটুকিক পাখির দুঃখের কথা শুনে খুব কষ্ট পেল। লটুকিক পাখি বলল, ভাই, কাক যখন হাতির চোখ তুলে নেবে, তুমি তখন সেখানে ডিম পাড়বে। এই আমার অনুরোধ। এতে নীল মাছি রাজি হলো। তারপর লটুকিক এক ব্যাঙের কাছে গেল। তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করল। ব্যাঙও লটুকিক পাখির সব কথা শুনল। তখন লটুকিক বলল, ভাই ব্যাঙ! একাচারী হাতি চোখের যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে পানি খাওয়ার জন্য এদিক সেদিক ছোটাছুটি করবে। তখন তুমি পাহাড়ের ওপর গিয়ে শব্দ করবে। হাতিটি তখন পাহাড়ে উঠবে। হাতিটি পাহাড়ে উঠলে তুমি নিচে নেমে শব্দ করবে। তখন হাতিটি পাহাড় থেকে নিচে নামতে চেষ্টা করবে। আর নিচে নামার সময় পা ফসকে গিরিখাতে পড়ে মরবে। এটুকু আমি তোমার কাছে চাই। ব্যাঙ তাতে রাজি হলো।

তারপর কাক হাতির চোখ দুটি তুলে নিল। নীল মাছি তাতে ডিম পাড়ল। হাতি চোখের যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে পানির খোঁজে ছোটাছুটি শুরু করল। ব্যাঙ পাহাড়ের ওপর গিয়ে ডাকতে শুরু করল। অনেক কষ্টে হাতি পাহাড়ের ওপর উঠল। তখন ব্যাঙ পাহাড়ের নিচে খাড়া গিরিখাতে গিয়ে ডাকতে শুরু করল। হাতিও সেখানে ছুটল কিন্তু ওপর থেকে নিচে নামার সময় অন্ধ একাচারী হাতি গিরিখাতে পড়ে প্রাণ হারাল।

এভাবে লটুকিক পাখি বুদ্ধি দ্বারা বিশাল হাতিকে পরাজিত করে।
সেই একাচারী হাতি ছিল দেবদত্ত।

উপদেশ: দেহবলের চেয়ে জ্ঞানবল বড়।

Content added By

মিত্রামিত্র জাতক (পাঠ ৭)

137

পুরাকালে বারানসিতে ব্রহ্মদত্ত রাজত্ব করতেন। সে সময় বোধিসত্ত্ব এক ব্রাহ্মণকুলে জন্মগ্রহণ করেন। ক্রমে তাঁর বয়স বাড়ল। যৌবনে পদার্পন করলে মাতাপিতা তাঁকে সংসারে আবদ্ধ করতে চাইলেন। কিন্তু তাঁর বিবাগী মন আকৃষ্ট হলো না। তিনি ঋষি প্রব্রজ্যা গ্রহণ করলেন। সাধনা করে তিনি পূর্বস্মৃতিজ্ঞান ও ধ্যানমার্গ ফল লাভ করলেন।

তাঁর অনেক শিষ্য ছিল। তিনি তাদের নিয়ে হিমবন্ত প্রদেশে ধ্যান সাধনা করে জীবনযাপন করতেন। তাঁর শিষ্যদের একজন মাতৃহীন এক হস্তীশাবক লালন পালন করত। গুরু তাকে হাতির বাচ্চা না পোষার জন্য বারবার নিষেধ করেছিলেন। কারণ হিংস্র প্রাণীকে বিশ্বাস করতে নেই। সুযোগ পেলেই তারা ছোবল মারে।

হস্তীশাবক ক্রমে বড় হলো। খাদ্য আহরণে বনে বনে ঘুরে বেড়াত। সন্ধ্যায় ফিরে আসত। একদিন ক্রুদ্ধ হয়ে সে পালককে হত্যা করে বনে পালিয়ে গেল। সেই যে গেল আর ফিরে এলো না।
অন্য ঋষিরা হস্তীশাবক পালকের মৃতদেহ দাহ করে বোধিসত্ত্বের নিকট উপস্থিত হন। উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, 'গুরু! মিত্রভাব ও শত্রুভাব নির্ণয় করার উপায় কী?'
বোধিসত্ত্ব উত্তরে বললেন, 'যে দেখা করতে এসে হাসে না। অভিনন্দনের সাড়া দেয় না। মুখ ফিরিয়ে রাখে। বলে এক, করে অন্য। এরূপ ব্যক্তিই শত্রুভাবাপন্ন।'
আর যে উপকার করে। মঙ্গল কামনা করে। মিষ্টভাষী হয়। দুর্দিনে সাহায্য করে। সে সুমিত্র নামে কথিত। যিনি অমিত্রের উক্ত দোষগুলো এবং মিত্রের গুণগুলো দেখে শুনে কাজ করেন তিনিই বুদ্ধিমান।
বোধিসত্ত্ব এরূপে মিত্র ও অমিত্রের স্বভাব সম্পর্কে ব্যাখ্যা করলেন। শিষ্যদের সত্যপথে চলতে উদ্বুদ্ধ করলেন।

উপদেশ: মিত্র-অমিত্র নির্বাচনই বুদ্ধিমানের কাজ।

অনুশীলনমূলক কাজ
মিত্র এবং অমিত্র কীভাবে চেনা যায় লেখ (দলীয় কাজ)।

Content added By

অনুশীলনী

229

শূন্যস্থান পূরণ কর

১. বৌদ্ধধর্ম অনুসারে এক জন্মের ______ কেউ বুদ্ধ হতে পারেন না।

২. প্রত্যেক জাতকের _____ অংশ আছে।

৩. কুমির যখন মুখ হাঁ করে তখন তার _____ কিছুই দেখতে পায় না।

৪. সেই সরোবরে এক ______ থাকত।

৫. হস্তীশাবক ক্রমে _____ হলো।

সংক্ষিপ্ত-উত্তর প্রশ্ন

১. কততম জন্মে বোধিসত্ত্ব বোধিজ্ঞান লাভ করে বুদ্ধ হন?
২. বানরেন্দ্র জাতকে কুমিরের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর সাধ কী ছিল?
৩. মহিংসাস কুমাররা কয় ভাই ছিলেন? তাদের নাম কী ছিল?
৪. মিত্রামিত্র জাতকে বুদ্ধিমান কে?

বর্ণনামূলক প্রশ্ন

১. বৌদ্ধধর্মে জাতক পাঠের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা কর।
২. পদ্ম জাতক কাহিনির মূল শিক্ষা কী? ব্যাখ্যা কর।
৩. 'মিত্রামিত্র জাতক' অবলম্বনে মিত্র ও শত্রুর প্রকৃতি ব্যাখ্যা কর।

বহুনির্বাচনি প্রশ্ন

১. জাতকের কয়টি অংশ?

ক. ২টি
খ. ৩টি
গ. ৪টি
ঘ. ৫টি

২. সত্য, ধৈর্য, ত্যাগ আর বিচক্ষণতা কোন জাতকের মর্মকথা?

ক. দেবধর্ম জাতক
খ. মিত্রামিত্র জাতক
গ. বানরেন্দ্র জাতক
ঘ. লটুকিক জাতক

নিচের উদ্দীপকটি পড় ৩ ও ৪ নম্বর প্রশ্নের উত্তর দাও:

বিনোদ চাকমা এক অত্যাচারী শাসকের বেতনভুক্ত কর্মচারী। উক্ত শাসক গ্রামে যেকোনো ধরনের অপরাধী লোকদের ধরে এনে কঠিন শাস্তি ও অনাহারে রাখার আদেশ দিতেন। কিন্তু বিনোদ চাকমা সত্য ও ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। তাই শাসকের অগোচরে কম শাস্তি দিয়ে আহারের ব্যবস্থা করতেন। এভাবে কর্মজীবন শেষ করে সজ্ঞানে মৃত্যুবরণ করেন।

৩. বিনোদ চাকমা জাতকের দৃষ্টিতে কোন ধরনের লোক ছিলেন?

ক. দেবধর্ম পরায়ণ
খ. রাজ ধর্ম পরায়ণ
গ. ব্রাহ্মণ ধর্ম পরায়ণ
ঘ. লোক ধর্ম পরায়ণ

৪. উক্ত বৈশিষ্ট্যের দ্বারা বিনোদ চাকমা লাভ করতে পারেন
i. স্বর্গকুল
ii. ব্রহ্মকুল
iii. দেবকুল
নিচের কোনটি সঠিক?

ক. i
খ. ii
গ. i ও ii
ঘ. i, ii ও iii

সৃজনশীল প্রশ্ন

১। একদা এক বনে এক যক্ষ বাস করত। সে বিভিন্ন রূপ ধরে মানুষের বুদ্ধির পরীক্ষা করত। একদিন সে বনবাসী মানুষ সেজে বোধিসত্ত্বের সামনে এসে বলল, 'ভাই, আপনি দুর্বল ও ক্লান্ত। সামনে পরিষ্কার টলমলে জলাশয়। ইচ্ছে করলে এই জলাশয়ে নিজেকে ধৌত করে আপনি ক্লান্তি দূর করতে পারেন।' বনবাসীর চালাকি বুঝতে পেরে বোধিসত্ত্ব তার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলেন।

ক. জাতক প্রধানত কয়টি অংশে বিভক্ত?
খ. জাতক পাঠের অন্যতম প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা কর।
গ. উদ্দীপকের কাহিনি কোন্ জাতকের সাথে মিল রয়েছে? ব্যাখ্যা কর।
ঘ. উদ্দীপকে বর্ণিত ঘটনার মর্মার্থ পাঠ্যপুস্তকের আলোকে বিশ্লেষণ কর।

২. ঘটনা: ১

এক চোখ টেরা বৃদ্ধ মহিলা পাকা আমের ঝুঁড়ি নিয়ে বাগানের ধারে বসে ছিল। রীমা, সীমা এবং ঝুমা চাকমারা ঐ পথে যাওয়ার সময় উক্ত বৃদ্ধার সাথে দেখা হলো। বৃদ্ধার আমের ঝুঁড়ি দেখে তাদের আম খাওয়ার লোভ হলো। রীমা ও সীমা বৃদ্ধার চোখের সৌন্দর্য বিভিন্নভাবে বর্ণনা করল। কিন্তু বৃদ্ধা রাগান্বিত হয়ে দুজনকে কোনো আম দিল না। ঝুমা বৃদ্ধার টেরা চোখ সম্পর্কে কর্মফলের আসল কথা বুঝিয়ে বললে বৃদ্ধা খুশি হয় এবং ঝুমাকে আম প্রদান করে।

ঘটনা: ২

জয়ন্ত চাকমা একটি সাপ পুষে বড় করল। সে সাপটিকে বাঁশের চোঙার ভেতর রেখে দুই-একদিনের জন্য বাড়ির বাইরে যায়। বাড়ি ফিরে সাপটিকে খাওয়াতে গেলে সাপটির ছোবলে জয়ন্ত চাকমার মৃত্যু ঘটে।

ক. দেবধর্ম জাতকে বোধিসত্ত্বের নাম কী ছিল?
খ. তিন রাজপুত্র রাজপ্রাসাদ থেকে কেন বেরিয়ে পড়ল? বর্ণনা কর।
গ. ঘটনা-২ এর সাথে কোন জাতকের মিল রয়েছে? ব্যাখ্যা কর।
ঘ. 'চাটুকারিতার ফল কখনো ভালো হয় না'-পদ্ম জাতকের উপদেশ বাণীটি ঘটনা-১ এর সঙ্গে কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ-ব্যাখ্যা কর।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...