লোকশিল্পের মতো বাংলাদেশের কারুশিল্পও আমাদের দেশের মানুষের সাথে গভীরভাবে মিশে আছে। আমাদের প্রকৃতিতে পাওয়া যায় এমন কারুশিল্পের উপাদান দিয়ে তৈরি সামগ্রী দেশে-বিদেশে অনেক সুনাম অর্জন করতে সমর্থ্য হয়েছে। মাটির তৈরি বিভিন্ন বাসনপত্র এবং তামা, কাঁসা ও পিতলের তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্র আমাদের কারুশিল্পের উজ্জ্বল নিদর্শন। বাঙালি মেয়েদের অলঙ্কার, শাড়ি ও ফুল, লতা, পাতা কারুকাজপূর্ণ সব জিনিসই আমাদের কারুশিল্পের অন্যতম নিদর্শন। আমাদের প্রতিদিনের জীবনে চারপাশেই কারুশিল্পের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। বাংলাদেশের যানবাহনের জন্য ব্যবহার করা নৌকা, পালকি, রিকশা সবকিছুই আমাদের কারুশিল্পের নমুনা।
আদিম মানুষেরা লোকশিল্পের প্রবর্তক। তাদের দেখিয়ে দেওয়া পথে প্রাচীনকাল থেকেই গ্রামে-গঞ্জে মানুষদের কেউ কেউ ভালো ছবি আঁকতে বা পুতুল বানাতে পারত। যে সহজ রীতিতে তারা ছবি আঁকত বা পুতুল বানাত তা শিখে নিয়েছিল তাদের সন্তানেরা। তাদের পরিবারের ছেলেমেয়েরা আবার বড়দের কাছে বসে শিখেছে কীভাবে আঁকতে হয়। এভাবে একই রীতি-নীতিতে হাজার হাজার বছর ধরে লোকশিল্প তৈরি হয়ে আসছে। এ শিল্পে সাধারণ মানুষের মনে আনন্দ যোগায়। তাই বলা হয় লোকশিল্প সাধারণ লোকের জন্য সাধারণ লোকের সৃষ্টি। পৃথিবীর সবখানেই লোকশিল্পের উপকরণ সাধারণ। মাটি, কাঠ, কাপড়, সুতা, পাতা, বাঁশ, বেত সবকিছু দিয়ে সবদেশেই অভিন্ন লোকশিল্প তৈরি হয়। সেগুলো হচ্ছে পোশাক, আসবাবপত্র, অলঙ্কার, বাদ্যযন্ত্র, সুচিকর্ম, পুতুল, বাসন-কোসন ইত্যাদি।
লক্ষ্মীসরা, নকশি পিঠা, নকশি খাট, নকশি পাখা, নকশা করা কাঠের বেড়া, রিকশা, নকশিকাঁথা, গয়না, নৌকা, সাজি, ডালা, মাটির পুতুল। উত্তর: নিচে সামগ্রীগুলো থেকে লোকশিল্প ও কারুশিল্পকে আলাদা
করে দেখানো হল-
| লোকশিল্প | কারুশিল্প |
| লক্ষ্মীসরা, নকশি পিঠা, নকশি খাট, নকশি পাখা, নকশিকাঁথা, মাটির পুতুল। | নকশা করা কাঠের বেড়া, রিকশা, গয়না, নৌকা, সাজি, ডালা। |
বাংলার গ্রামীণ মেলা লোকশিল্পের সমারোহের একটি বড় মাধ্যম। মেলাগুলোতে নানা ধরনের খেলনা যেমন- মাটির পুতুল, ঘোড়া, হাতি বিভিন্ন প্রকার খেলনা ইত্যাদি দেখতে পাওয়া যায়,. অন্যান্য সামগ্রীর সাথে আকর্ষণীয় উজ্জ্বল রঙের বিভিন্ন পুতুল, বাঁশ, বেত ও কাঠের তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী দেখতে পাওয়া যায়। বাংলার গ্রামের মেয়েরা তাদের অবসরে খুব যত্ন করে রঙিন সুতার সেলাই দিয়ে মনোরম নকশা করে কাঁথা তৈরি করে যা নকশিকাঁথা নামে পরিচিত। গ্রামীণ মেলাতে এ নকশিকাঁথা ছাড়াও নকশি পিঠা, নকশি পাখা, শখের হাঁড়ি, পুঁথিচিত্র, পিঁড়িচিত্র দেয়ালচিত্র ইত্যাদি দেখা যায়।
প্রতিটি দেশেই সেই দেশের নিজস্ব কিছু লোকশিল্প থাকে। যার মাধ্যমে সেই দেশের সভ্যতা ও সংস্কৃতির স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠে। তবে পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই কিছু অভিন্ন লোক শিল্প রয়েছে। সেসব লোকশিল্প তৈরির কাঁচামালগুলো অভিন্ন। সেগুলো হলো- মাটি, কাঠ, কাপড়, সুতা, ধাতব দ্রব্য, পাথর, পাতা, বাঁশ, বেত ইত্যাদি। প্রতিটি দেশেই এ উপকরণগুলো ব্যবহার করে লোকশিল্প তৈরি করা হয়। বাংলাদেশের তৈরি লোকশিল্প বর্তমানে সারাবিশ্বে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
সাধারণ উপকরণ বলতে এমন উপকরণকে বোঝায় যা কেনার প্রয়োজন হয় না। বাড়ির চারপাশে পাওয়া যায়। যেমন- মাটি, পুরনো কাপড়, কাঠ, বাঁশ, বেত, শোলা, তাল ও খেজুর পাতা প্রভৃতি। সাধারণ উপকরণে তৈরি হয় লোকশিল্প আর তাতে অতি সাধারণ হলুদ, খড়িমাটি, নীল আবীর, সিন্দুর, কাঠ কয়লা প্রভৃতি রং দিয়েই সাজানো হয়। উপকরণ এবং তৈরির কৌশল অনেক সাদামাটা হলেও এটাই বাংলার আসল ঐতিহ্য। এ সাধারণ উপকরণে তৈরি লোকশিল্পের মাঝেই নিহিত বাংলার হাজার বছরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য।
দৈনন্দিন ব্যবহার করা দ্রব্যের গায়ে অথবা ঘর সাজানোর জন্য কোনো দ্রব্যের গায়ে রং এর আচড় দেওয়া হয়। এসব দ্রব্যকে বলা হয় কারুশিল্প। সুপ্রাচীনকাল থেকে মানুষ কারুশিল্পের ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন ছিল। তাঁরা গুহায় বাস করলেও গুহার দেয়ালে সুন্দর সুন্দর দৃশ্য অঙ্কন করতো এবং তাদের ব্যবহার্য দ্রব্যাদিতেও এ শিল্প ব্যবহার করতো। প্রাচীনকালের পানির পাত্রে, পরিধেয় বস্ত্রে কারুশিল্পের ব্যবহার পাওয়া যায়।
পশু শিকার করার জন্য তারা আজকের মতো আধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করতো না। আদিম মানুষের জীবিকা ছিল শিকার। শিকার করার অস্ত্র হিসেবে তারা হরিণের শিং ও হাতির দাঁত ব্যবহার করতো। মাছের মেরুদণ্ডের হাড়, ঝিনুক, হরিণের দাঁত ইত্যাদি গেথে গলার হাড় তৈরি করতো। পাথরের তৈরি এক ধরনের পিরিচের মতো প্রদীপ ব্যবহার করতো। খাবার পানি সংগ্রহের জন্য তারা পশুর চামড়ার ব্যাগ ব্যবহার করতো। এছাড়াও তারা মাটির তৈরির বিভিন্ন দ্রব্য ব্যবহার করতো।
আমাদের প্রতিদিনের জীবনের চারপাশেই কারুশিল্পের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। যানবাহনের জন্য ব্যবহৃত নৌকা, পালকি, রিকশাতেও সুন্দর কারুকাজ থাকে। কেবল কাজের উপর ভিত্তি করে নামকরণ করা হয়। যেমন- গয়না নৌকা, সাম্পান নৌকা, বজরা, পানসি, কোশ্য ইত্যাদি। কাঠের কারুকার্য করা খাট, পালঙ্ক, সিংহদার, সিন্ধুক, পালকি ইত্যাদি। এছাড়াও বাঁশ ও বেতের তৈরি বিভিন্ন আসবাব, চেয়ার, টেবিল, মোড়া, খাট, সাজি, ডালা, কুলা, মাছ ধরার চাঁই, পলো, ওচা, কোঁচ ইত্যাদি।
মূলত ব্যবহার্য বস্তুতে অলংকরণের সূত্রপাত সেই আদিম শিকারি মানুষেরাই শুরু করেছিল। তারা মাছের মেরুদণ্ডের হাড়, ঝিনুক, হরিণের দাঁত ইত্যাদি গেঁথে গলার হার তৈরি করত। তখন থেকেই ধীরে ধীরে অলংকারের ব্যবহার শুরু হয়।

সোনারগাঁ লোকশিল্প ও কারুশিল্প জাদুঘর ১৯৭৫ সালের ১২ই মার্চ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন প্রতিষ্ঠা করেন
এ অধ্যায় পড়া শেষ করলে আমরা-
- লোকশিল্প কী তা উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করতে পারব।
- কারুশিল্প কী তা উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করতে পারব।
- বাংলাদেশের লোকশিল্পের বর্ণনা করতে পারব।
- বাংলাদেশের কারুশিল্প সম্পর্কে উদাহরণসহ ব্যাখ্যা দিতে পারব।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!