যে গ্রন্থে ধর্মের কথা থাকে তাকে ধর্মগ্রন্থ বলে। প্রত্যেক ধর্মের নিজস্ব ধর্মগ্রন্থ রয়েছে। তেমনি হিন্দুধর্মের রয়েছে অনেক ধর্মগ্রন্থ। বেদ হিন্দুদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ। এছাড়াও রয়েছে উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, পুরাণ, শ্রীশ্রী চণ্ডী ইত্যাদি। ধর্মগ্রন্থে ঈশ্বরের কথা থাকে। দেব-দেবীর উপাখ্যান থাকে। জ্ঞানের কথা থাকে। কল্যাণের কথা থাকে। জীবকে সেবা করার কথা থাকে। শান্তির কথা থাকে। সমাজ ও জীবনের কথা থাকে। নানা উপদেশমূলক কাহিনি ও নীতিকথা থাকে।
সংক্ষিপ্ত রামায়ণ-কবিতা থেকে নিচে চার লাইন লেখা হলো-
আদি-কাণ্ডে রাম-জন্ম সীতা-পরিণয়।
অযোধ্যা-কাণ্ডেতে রাম-বনবাস হয়।
অরণ্য-কাণ্ডেতে হয় জানকী-হরণ।
কিষ্কিন্ধ্যা-কাণ্ডেতে হয় সুগ্রীব-মিলন ॥
মহাভারত থেকে আমরা যে শিক্ষা পাই তা হলো-
১. নিজ নিজ দায়িত্ব পালন সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারব।
২. কামনা-বাসনা ত্যাগ করে কাজ করতে পারব।
৩. জ্ঞানার্জন করতে পারব।
৪. সর্বদা সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকতে পারব।
মহাভারতের কথা অমৃতের মতো। তা শুনলে পুণ্য হয়।
বড় ভাই রামের বনে যাওয়ার কথা শুনে ভরত মামাবাড়ি থেকে অযোধ্যায় চলে আসেন। তারপর রামকে ফিরিয়ে আনতে যান। কিন্তু রাম আসলেন না। ভরত তখন রামের পাদুকা নিয়ে এসে সিংহাসনে রেখে রাজ্য পরিচালনা করেন। ভরতের এ ভ্রাতৃপ্রেমের দৃষ্টান্ত থেকে আমরা যে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি তা হলো-
১. সবসময় বড় ভাইকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করা।
২. বড় ভাইয়ের আদেশ-নির্দেশ পালন করা
৩. সর্বক্ষেত্রে বড় ভাইয়ের সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা।
নিরাকার ঈশ্বরের সকার রূপকে দেব-দেবী বলে। অন্যভাবে বলা যায়, ঈশ্বরের কোনো গুণ বা শক্তি যখন আকার পায়, তখন সেই আকার পাওয়াকে দেব-দেবী বলে। মানুষ অনেক কিছু করতে পারে না। কিন্তু দেব-দেবীরা সবকিছুই করতে পারেন। তাই বলা যায়, দেব-দেবীর শক্তি মূলত ঈশ্বরেরই শক্তি। ঈশ্বর যে রূপে সৃষ্টি করেন, তাঁর নাম ব্রহ্মা। যে রূপে পালন করেন তাঁর নাম বিষ্ণু। যে রূপে ধ্বংস করেন, তাঁর নাম শিব। দুর্গা শক্তির দেবী। সরস্বতী বিদ্যার দেবী। লক্ষ্মী ধন-সম্পদের দেবী।
দেবী দুর্গার রূপের বর্ণনা নিচে দেওয়া হলো-
১. দেবী দুর্গার গায়ের রং অতসী ফুলের মতো।
২. পূর্ণিমার চাঁদের মতো সুন্দর তাঁর মুখ।
৩. শিবের মতো দেবী দুর্গারও তিনটি চোখ রয়েছে। এজন্য তাঁকে ত্রিনয়না বলা হয়। তাঁর একটি চোখ কপালের মাঝখানে অবস্থিত। এই চোখ জ্ঞান বা অগ্নিকে নির্দেশ করে। তাঁর বাম চোখ চন্দ্র এবং ডান চোখ সূর্যকে নির্দেশ করে।
৪. দেবী দুর্গার দশ হাত। এজন্য তাঁর আরেক নাম দশভুজা। দশ হাত দিয়ে দশ দিক থেকে সকল অকল্যাণ দূর করে তিনি আমাদের কল্যাণ করেন। তাঁর দশ হাতে দশটি অস্ত্র থাকে, যা শক্তির প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
৫. সিংহ তাঁর বাহন। সিংহ শক্তির ধারক।
ঈশ্বর যে দেবতারূপে সংহার বা ধ্বংস করেন, তাঁর নাম শিব। নিচে তাঁর রূপের বর্ণনা দেওয়া হলো-
১. শিবের গায়ের রং তুষারের মতো সাদা।
২. তাঁর মাথায় জটা।
৩. তাঁর তিনটি চোখ।
৪. ডমরু ও শিঙ্গা তাঁর দুটি বাদ্যযন্ত্র।
৫. ত্রিশূল তাঁর প্রধান অস্ত্র।
৬. তাঁর বাহন হচ্ছে ষাঁড়।
ঈশ্বরের কোনো গুণ বা ক্ষমতা আকার পেলে তাঁকে দেব-দেবী বলে। দেব-দেবী ঈশ্বরের সাকার রূপ। তাঁরা মূলত ঈশ্বরেরই শক্তি।
আমরা যেসব কারণে দেব-দেবীর পূজা করব তা হলো-
১. দেব-দেবীরা হলেন ঈশ্বরের সাকার শক্তির বিভিন্ন রূপ বা শক্তি।
২. পূজা করলে দেবতারা সন্তুষ্ট হন।
৩. দেবতারা সন্তুষ্ট হলে ঈশ্বর সন্তুষ্ট হন।
৪. দেব-দেবীর পূজার মাধ্যমে আমাদের মঙ্গল হয় ও অভীষ্ট পূরণ হয়।
পার্বণ শব্দের অর্থ হলো পর্ব বা উৎসব। এখানে উৎসব বলতে আনন্দপূর্ণ অনুষ্ঠানকে বোঝানো হয়েছে। আর যে উৎসবগুলো পূজাকে আনন্দময় করে তোলে তাকে পার্বণ বলে।
আনন্দের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন পার্বণ পালিত হয়ে থাকে। এটি ধর্মীয়, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সাথেও সম্পর্কিত। তবে আমাদের দেশে 'পার্বণ' শব্দটি প্রধানত পূজা-পার্বণ বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আমাদের পালিত পার্বণগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- নববর্ষ, পৌষসংক্রান্তি, চৈত্রসংক্রান্তি, নবান্ন, দোলযাত্রা, বিজয়া দশমী প্রভৃতি।
পূজা-পার্বণের অঙ্গগুলো হলো-
১. দেব-দেবীর প্রতিমা নির্মাণ।
২. মন্দির বা ঘর সাজানো।
৩. বিভিন্ন ধরনের বাদ্যের আয়োজন করা। যেমন- ঢাক, ঢোল, ঘণ্টা, করতাল, কাঁসি, শঙ্খ ইত্যাদি।
৪. সকলের সাথে ভাব বিনিময়।
৫. নানা ধরনের খাওয়া-দাওয়া।
৬. বিভিন্ন ধরনের আনন্দমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা।
৭. পরিচ্ছন্ন পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান করা।
পূজা শব্দের অর্থ প্রশংসা করা বা শ্রদ্ধা করা। পূজা অর্থে আরাধনা এবং অর্চনা করাও বোঝায়। আমরা যেসব কারণে পূজা করি তা হলো-
১. আমরা দেব-দেবীর কৃপা লাভ করার জন্য পূজা করি।
২. দেব-দেবীর পূজা করলে ঈশ্বরেরই পূজা করা হয়।
৩. দেব-দেবী সন্তুষ্ট হলে ঈশ্বর সন্তুষ্ট হন।
নানা উপকরণ দিয়ে দেব-দেবীর পূজা করা হয়। উপকরণগুলো হলো- ফুল-ফল, দূর্বা, তুলসীপাতা, বেলপাতা, চন্দন, আতপচাল, ধূপ-দীপ ইত্যাদি।
রথযাত্রার গুরুত্ব সম্পর্কে নিচে লেখা হলো-
১. হিন্দুদের ধর্মানুষ্ঠান বা পূজা-পার্বণের মধ্যে রথযাত্রা একটি অন্যতম পর্ব।
২. রথের সময় ভগবান ভক্তের কাছে নেমে আসেন।
৩. এ সময় ভগবান তাঁর ভক্তদের দুঃখ-দুর্দশা দূর করে কল্যাণ সাধন করেন।
৪. সবাই একত্রে রথের রশি ধরে টানেন। ফলে এখানে জাতি-বর্ণের বিভেদ থাকে না।
৫. রথযাত্রা আমাদের সাম্যের শিক্ষা দেয়।
সকল ধর্মগ্রন্থের প্রতি সম্মান জানানো আমাদের কর্তব্য। কারণ-
১. সকল ধর্মগ্রন্থই পবিত্র।
২. প্রতিটি ধর্মগ্রন্থে স্রষ্টার মহিমার কথা বলা হয়েছে।
৩. সকল সৃষ্টিকে ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে।
৪. ধর্মগ্রন্থে থাকে জ্ঞানের কথা, কল্যাণের কথা।
৫. জীবকে সেবা করার কথা, শান্তির কথা, সমাজ ও জীবনের কথা।
৬. নানা উপদেশমূলক কাহিনি ও নীতিকথা।
বৌদ্ধদের প্রধান ধর্মগ্রন্থের নাম ত্রিপিটক। ত্রিপিটক পালি ভাষায় রচিত গৌতম বুদ্ধের ধর্মবাণী তিনটি পিটক বা গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। পিটক তিনটি হলো-
সূত্র পিটক: এই পিটকে বুদ্ধ সূত্র আকারে অনেক উপদেশ দান করেছেন। সূত্রগুলো পাঠ করে মানবিক গুণাবলি অর্জন করা যায় এবং আদর্শ জীবন গঠন করা যায়।
বিনয় পিটক: এই পিটকে ভিক্ষু ও ভিক্ষুণী সংঘের সুশৃঙ্খল ও পরিশুদ্ধ জীবন যাপনের জন্য বুদ্ধ অনেকগুলো নিয়ম নির্দেশ করেছেন।
অভিধর্ম পিটক : এই পিটকে চিত্ত, চৈতসিক, রূপ ও নির্বাণ-এই চারটি বিষয় বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।
আমাদের দেশে চারটি প্রধান ধর্ম রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি ধর্মাবলম্বীদের ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো-
ইসলাম ধর্ম : ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ কুরআন। কুরআন প্রথম আরবি ভাষায় লেখা হয়।
বৌদ্ধধর্ম : বৌদ্ধদের প্রধান ধর্মগ্রন্থের নাম ত্রিপিটক। ত্রিপিটক পালি ভাষায় রচিত।
খ্রীষ্টধর্ম : খ্রীষ্ট ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ বাইবেল। বাইবেল শব্দের অর্থ বই বা গ্রন্থ। বাইবেলের প্রথম বইটি হিব্রু ভাষায় লেখা।
ঈদ উপলক্ষে মুসলমানেরা যা করে তা হলো-
১. দলবেঁধে মসজিদ ও ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করে।
২. একজন আর একজনকে 'ঈদ মোবারক' বলে শুভেচ্ছা জানায়।
৩. আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধু, শিশু সবাই মিলে নতুন জামা-কাপড় পরে ঘুরে বেড়ায়।
৪. সকলে মিলে আনন্দ উপভোগ করে।
৫. খাওয়া-দাওয়া করে।
৬. ধনী-গরিব সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সকলে একসাথে ঈদের খুশি ভাগ করে নেয়।
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রধান কয়েকটি ধর্মীয় উৎসব হলো বৈশাখী পূর্ণিমা বা বুদ্ধপূর্ণিমা, আষাঢ়ী পূর্ণিমা, ভাদ্র পূর্ণিমা বা মধু পূর্ণিমা, আশ্বিনী পূর্ণিমা বা প্রবারণা, মাঘীপূর্ণিমা এবং কঠিন চীবর দানোৎসব। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলো বৈশাখী পূর্ণিমা বা বুদ্ধপূর্ণিমা। এই উৎসবটি সাধারণত গৌতম বুদ্ধের জন্মদিন উপলক্ষে পালন করা হয়ে থাকে। বৌদ্ধরা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে পূর্ণিমা উৎসব পালন করে থাকে। সেদিন তারা নতুন বা পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করে পূজার নানা উপকরণ নিয়ে বিহারে যায়। সাধ্যমতো দান করে এবং ধর্মীয় নানা আচার-অনুষ্ঠান পালন করে।
সকল ধর্মের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে মানবকল্যাণ ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান প্রতিষ্ঠা করা। বিভিন্ন ধর্মের শিক্ষা, দর্শন ও নীতিমালার গভীরে গেলে দেখা যায়, সেগুলো মানুষের মধ্যে নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও শান্তি বজায় রাখার জন্যই গঠিত। প্রতিটি ধর্মই মানুষের উন্নত জীবনযাত্রা ও পরোপকারে উদ্বুদ্ধ করে। এছাড়াও সহিষ্ণুতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং ঐক্যের গুরুত্বকে প্রাধান্য দেয়। যদিও সকল ধর্মের মানুষের আচার-অনুষ্ঠান বা উপাসনা পদ্ধতিতে পার্থক্য রয়েছে। তবে মূল আদর্শ হলো মানব জাতিকে ভালোবাসা, একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং পৃথিবীতে শান্তি বজায় রাখা।
বড়দিন ছাড়াও খ্রীষ্ট ধর্মাবলম্বীদের দুটি উৎসব হলো-গুড ফ্রাইডে ও ইস্টার সানডে।
বড়দিন উপলক্ষে খ্রীষ্টধর্মের অনুসারীরা যা করে তা হলো-
১. ঘর সাজায়।
২. গির্জায় প্রার্থনা করে।
৩. একে অপরকে উপহার দেয়।
৪. সবাই মিলে আনন্দ উপভোগ ও খাওয়া-দাওয়া করে।
৫. দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের সাহায্য করে।
৬. বিশেষ নাটক ও সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করে।
Related Question
View Allহিন্দুধর্মে রয়েছে অনেক ধর্মগ্রন্থ
খান্ডবপ্রস্থ হয় পাণ্ডবদের রাজ্য।
মহাভারতের কথা অমৃতের মতো
ধর্মগ্রন্থে ধর্মের কথা থাকে।
প্রত্যেক ধর্মের নিজস্ব ধর্মগ্রন্থ রয়েছে।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ বেদ
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!