লখার আবেগের মধ্যে রাফিদের দেশপ্রেম, ভাষা আন্দোলনের শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং জাতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে নিজেকে শরিক করার ব্যাকুলতা ফুটে উঠেছে। ভৌগোলিকভাবে ভিন্ন অবস্থানে থাকলেও, একুশের প্রতি তাদের মানসিক আবেগ এবং দেশাত্মবোধ একই তারে বাঁধা।
উদ্দীপকের রাফিদ একজন প্রবাসী। মহান একুশে ফেব্রুয়ারির এই দিনে দূরদেশে বসেও তার মাতৃভূমি, দেশের শহিদ মিনারে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর দৃশ্য এবং সেই অনুষ্ঠানে অর্ণবদের অংশগ্রহণের কথা বারবার মনে পড়ছে। সে নিজে এই মহৎ কাজে শামিল হতে না পারার জন্য কষ্ট পাচ্ছে এবং আগামী বছর যেন সেও অংশ নিতে পারে তার জন্য দোয়া চাইছে। এটি তার গভীর দেশপ্রেম, জাতীয় চেতনা এবং ভাষা আন্দোলনের শহিদদের প্রতি অবিচল শ্রদ্ধারই পরিচায়ক।
অন্যদিকে, পাঠ্যবইয়ের ‘একুশের গল্প’ বা ‘একুশের গান’ (ধারণা করা হচ্ছে পাঠ্যবইয়ে লখা চরিত্রটি একুশে ফেব্রুয়ারির প্রেক্ষাপটে আছে) গল্পের লখা প্রতিকূল পরিবেশ, শীতের তীব্রতা উপেক্ষা করে খালি পায়ে বরফশীতল ভোরে ফুল কুড়িয়ে শহিদ মিনারে যায় শ্রদ্ধা জানাতে। তার এই আত্মত্যাগ ও গভীর অনুরাগ রাফিদের দেশের প্রতি টান এবং একুশের চেতনায় শরিক হওয়ার আকুলতারই প্রতিচ্ছবি। উভয়ের আবেগের মূল সুর একই – মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা এবং শহিদদের প্রতি অপরিমেয় মমতা।
বাপকে লখা দেখেনি। চেনে না। মা তার ত্যানাখানি পরে দিনভর কেঁদে-কেঁদে ভিখ মেঙে ফেরে। লখার দিন কাটে গুলি খেলে, ছেঁড়া কাগজ কুড়িয়ে, বন্ধুদের সঙ্গে মারামারি করে আর খাবারের দোকানের এঁটোপাতা চেটে। রাতে মায়ের পাশে লখা খিদের কষ্ট ভুলে যায়।
এই লখা, ছায়া দেখলে বুক কাঁপে যার, সে আজ ভোররাতে মায়ের পাশ থেকে উঠে পড়ল। মা মুখ হাঁ করে ঘুমুচ্ছে। লখা চুপি চুপি পা ফেলে হারিয়ে গেল ধোঁয়া-ধোঁয়া কুয়াশার মধ্যে।
খানিকটা এগিয়ে উঁচু রেললাইন যেন দুটো মরা সাপ। পাশাপাশি শুয়ে আছে চুপচাপ। লখা ইটের টুকরো দিয়ে ইস্পাতের লাইনে ঠুক-ঠুক ঠুকে তার উপর কান পাতল। হ্যাঁ, শব্দ শোনা যাচ্ছে। যেন গানের সুরলহরি বয়ে যাচ্ছে কানের ভিতর দিয়ে। লখা ভারি মজার দুষ্টু ছেলে। গানের মজা ফুরিয়ে গেলে পর এক লাফে লাইন পেরিয়ে ওপারে পৌঁছে গেল। সেখানে মস্ত নিচু খাদ। তার ভিতর গড়িয়ে পড়লে হাত-পা ভাঙবে নির্ঘাত। খুব সাবধানে খাদ পেরিয়ে ওপারের ডাঙায় উঠে এলো সে। ডাঙাটা আসলে বনজঙ্গলে অন্ধকার। ঝিঁঝি পোকা ডাকছে আর ধেড়ে ধেড়ে গাছের ঝাঁকড়া ছায়া মাথা নেড়ে নেড়ে ভয় দেখাচ্ছে লখাকে।
খচ করে কাঁটা ঢুকে গেল বাঁ পায়ে। কীসের কাঁটা? হবে হয়তো বাবলা-টাবলার। লখা উবু হয়ে বসে কাঁটাটা খসিয়ে দূরে ছুড়ে ফেলে দিলো। কিন্তু বিষ তো যায় না। কী অসহ্য যন্ত্রণা! আঁ আঁ বলে কেঁদে দিল লখা। কিন্তু কাঁদলে তো চলবে না। সময় নেই আর। তাকে যে যেতেই হবে। আবছা অন্ধকার। ফিনফিনে ঠান্ডা।
একটা খেঁকশেয়াল বুঝি তাকিয়ে দেখছিল তাকে। দেখুক গে। এখন ভয় ভয় করলে দেরি হয়ে যাবে। কাজেই এবার চোখ-কান বুজে দৌড় শুরু করতে হলো তাকে। আর শেষটায় সেই অদ্ভুত গাছটার নিচে পৌঁছে গেল লখা, যার ডালে ডালে রক্তের মতো টুকটুকে লাল ফুল। দিনের বেলায় রেললাইনের উপর দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে থোকা থোকা ফুলের লাল ঝুঁটির পানে তাকিয়ে থাকে সে। এখন ওই উপরের এক থোকা ফুল তার পেড়ে আনা চাই।
হাতের মুঠো পাকিয়ে মনটাকে শক্ত করে নিল লখা। তারপর চড় চড় করে গাছে উঠে গেল। একেবারে কাঠবেড়ালির বাচ্চা যেন। মগডালের কাছাকাছি এসে কয়েকটা তুলোমিঠের মতো বড়ো বড়ো থোকা পেয়ে গেল সে। শিশিরে ভেজা তুলতুলে। তা হোক, তোমরা এখন আমার। নাও সব টুপটাপ নেমে এসো তো আমার মুঠোর মধ্যে। কষ্ট লাগছে। আহা! কীসের কষ্ট? এই তো একটু পরে আমি তোমাদের এমন একটা উঁচু জায়গায় নিয়ে রেখে দেবো, যেখান অবধি তোমরা এই গাছের মগডালে কোনোদিন উঠতে পারবে না। এসো, এসো, লক্ষ্মীসোনারা সব নেমে এসো তো।
ফুল নিয়ে যখন মাটিতে নেমে এলো লখা, তখন সারা শরীর জ্বলে যাচ্ছে তার। কনুই ও বুকে চটচটে ঠান্ডা। হাত দিয়ে টের পায়, টাটকা রক্ত। গাছের ডালপালা কাঁটায় ভর্তি। গা-হাত-পা ছিঁড়ে গেছে আঁচড় লেগে। তাতে কী! জিতে গেছি আমি। গর্বে বুক ফুলে ওঠে লখার।
সেদিন সকাল ছিল বড় আশ্চর্য সুন্দর। আকাশে হালকা কুয়াশা। অল্প অল্প শীত। আর দক্ষিণের সামান্য বাতাস। পথে পথে মিছিলের ঢল নেমেছে। শত শত মানুষ। হাতে ফুলের গুচ্ছ। ঠোঁটে প্রভাতফেরির গান। ধীর পায়ে শহিদ মিনারের দিকে এগিয়ে চলেছে। এই ভিড়ের মধ্যে ক্ষুদে টোকাই লখাকে ঠিকই দেখা যাচ্ছে। তাকে চিনতে কষ্ট হয় না। কারণ মিছিলের সবার গায়ে চাদর, কোট, সোয়েটার। শুধু তার গা খোলা উদাম, গাঢ় কালো। হাত উপচে পড়ছে রক্তলাল ফুলের গুচ্ছ। মিছিলে পা মিলিয়ে সেও চলেছে শহিদ মিনারে ফুল দিতে। সবার সঙ্গে গলা মিলিয়ে গেয়ে চলছে আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি? কিন্তু তার গলা দিয়ে কথা তো ফোটে না, শুধু শব্দ হয় আঁ আঁ আঁ আঁ। আসলে কথা ফুটবে কী করে! লখা যে জন্মবোবা। বাংলা বুলি তার মুখে ফুটতে পায় না। সে মনে মনে বলে অআকখ। বাইরে শব্দ হয় - আঁ আঁ আঁ আঁ।
ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য ফুল সংগ্রহ করতে পেরে লখা অন্তঃকরণে গর্ব অনুভব করে।
ফুটপাতে ঘুমানো এক প্রতিবন্ধী কিশোর লখা। ভাষা শহিদদের প্রতি তার বুকে রয়েছে অপরিমেয় শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা। তাই সে একুশে ফেব্রুয়ারির ভোর রাতে অনেক কষ্টে গাছের মগডাল থেকে থোকা থোকা লাল ফুল সংগ্রহ করে। ফুলগুলো হাতে নিয়ে আত্মতৃপ্তিতে লখা ভাবে, তার জয় হয়েছে।
উদ্দীপকের ইশতিয়াক আর 'লখার একুশে' গল্পের লখার কাছে শহিদ দিবস ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে হাজির হয়েছে।
'লখার একুশে' গল্পে লখা নামের এক পথশিশুকে কেন্দ্র করে গল্পকার একুশের অবিনাশী চেতনার দিকটি তুলে ধরেছেন। শারীরিক সমস্যা সত্ত্বেও লখা একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহিদ বেদিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদানের জন্য অন্য সবার মতো আগ্রহী হয়ে ওঠে।
পরিবেশ ও পরিস্থিতি বদলে গেলে মানুষের আবেগ প্রকাশের ধরনও বদলে যায়। বদলে যায় মানুষের কাজের কৌশল। লখার মতো ইশতিয়াকও শহিদ দিবসে প্রভাতফেরিতে অংশগ্রহণ করত। তাছাড়া সে বক্তৃতা ও আবৃত্তি শুনত। কিন্তু জাপানে পড়াশোনা করতে চলে যাওয়ায় ইশতিয়াক শহিদ দিবস উদ্যাপন করতে পারবে না ভেবে কষ্ট পায়। তাই সে শহিদ দিবস উদ্যাপন করার পরিকল্পনা করে ভিন্ন আঙ্গিকে। সহপাঠীদের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ইতিহাস শোনানোর পরিকল্পনা করে সে। অন্যদিকে, ফুটপাতে বড়ো হওয়া লখার বাস্তবতা ভিন্ন। সে অনেক কষ্ট করে লাল ফুল সংগ্রহ করে শহিদদের প্রতি সম্মান জানায়। কথা বলতে পারে না বলে 'আঁ আঁ' করে প্রভাতফেরির গান গায়। তাই বলা যায়, লখা এবং ইশতিয়াক দুজনের কাছে শহিদ দিবস ভিন্ন আঙ্গিকে এসেছে।
ইশতিয়াক জাপানে গিয়ে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শহিদ দিবস উদ্যাপন করতে চায়। তার এই আকাঙ্ক্ষাকে লখার আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যায়।
'লখার একুশে' গল্পে বাষ্প্রতিবন্ধী লখা ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য একুশের প্রথম প্রহরে কাঁটাওয়ালা উঁচু গাছের মগডাল থেকে লাল ফুল পেড়ে আনে। ফুল পাড়তে গিয়ে গা-হাত-পা ছিঁড়ে রক্ত ঝরতে থাকে তার। তবুও সে দমে না গিয়ে ফুল নিয়ে আসে শহিদ মিনারে অর্পণের জন্য।
উদ্দীপকের ইশতিয়াক প্রতি বছর প্রভাতফেরিতে অংশগ্রহণ করত। আলোচনা, আবৃত্তি এসব শুনত। এবার পড়াশোনার জন্য জাপানে গিয়ে সেসব দিনের কথা মনে করে চোখে পানি আসে তার। এ কারণে সে তার বিদেশি সহপাঠীদের নিয়ে অন্যভাবে দিনটি উদ্যাপন করতে চায়।
ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর অভিপ্রায়ে লখা অনেক কাঁটার আঘাত সহ্য করে ফুল সংগ্রহ করে শহিদ মিনারে ছুটে যায়। তার এমন ইচ্ছার প্রতিফলন ইশতিয়াকের চিন্তাতেও লক্ষণীয়। জাপানে অবস্থান করেও একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে খুব মনে পড়ে তার। এজন্য সহপাঠীদের ভাষা সংগ্রামের ইতিহাস শুনিয়ে দিনটি উদ্যাপন করতে চায় সে। যা মূলত লখার শহিদ দিবস উদ্যাপনের আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন। সে বিবেচনায় প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথাযথ।
লখার জীবনের একমাত্র আপনজন তার মা। তাই সে সারাদিন পর রাতে মাকে পাশে পেয়ে খেতে না পাওয়ার কষ্ট ভুলে যায়।
লখার মা ছাড়া আর কেউ নেই। সে তার বাবাকে কখনো দেখেনি, চেনে না। লখা সারাদিন রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ায়, দোকানের এঁটোপাত চেটে খায়। কিন্তু সারাদিনের এত দুঃখ, এত খিদের কষ্ট সে ভুলে যায় রাতের বেলা তার স্নেহময়ী মাকে কাছে পেয়ে।