শিষ্টাচার
শিষ্টাচার:
আভিধানিক অর্থে রুচিপূর্ণ ভদ্র ব্যবহারকে শিষ্টাচার বলে। শিষ্টাচার' শব্দটির মধ্যেই এর সম্পূর্ণ তাৎপর্য লুক্কায়িত। শিষ্টাচার শব্দটিকে ভাঙলে যে দুটি অংশ পাওয়া যায় তা হলো: শিষ্ট আচার শিষ্টাচার; এর অর্থ বিনীত, সংযত ও শশাভন আচার-ব্যবহার। অর্থাৎ, ভদ্রতা ও বিনম্র আচরণের যৌক্তিক মিলনের নামই শিষ্টাচার বা সৌজন্যতা। আত্মীয়-অনাত্মীয়, পরিচিত-অপরিচিত সকলের সঙ্গে প্রীতিপূর্ণ, রুচিসম্মত ব্যবহারই শিষ্টাচার। শিষ্টাচারে সকলেই মুগ্ধ হয়। শিষ্টাচার শুধু বাইরের মার্জিত ব্যবহারই নয়, এর সাথে মিশে আছে ভদ্রতার সামাজিক রীতি অনুসরণ এবং সুজনের মহৎ হৃদয়ের গভীর উষ্ণ স্পর্শ। আরও আছে নিবিড়ভাবে উৎসারিত অন্তর সৌন্দর্যের বিকশিত মহিমা।
মানবজীবনে শিষ্টাচারের গুরুত্ব:
দেহের সৌন্দর্য পোশাক-আশাক-অলংকারে, কিন্তু আত্মার সৌন্দর্য সৌজন্য-শিষ্টাচারে। মানুষ। যতদিন অরণ্যচারী ছিল, ততদিন শিষ্টাচার বা সৌজন্যবোধ প্রকাশের প্রয়োজনবোধ করেনি। যখন থেকে মানুষ সমাজবদ্ধ হলো, তখন থেকে শিষ্টাচার ও ভদ্রতাবোধের প্রয়োজন অনুভূত হলো। শিষ্টাচার কেবল আমাদের ব্যক্তিজীবনের সৌন্দর্যই নয়, আমাদের সমাজজীবনেরও গৌরবজনক প্রভাবমুকুট। শিষ্টাচারের গুণেই মানুষের সঙ্গে মানুষের যেকোনো সম্পর্ক রাখা সম্ভবপর হয়। বড়ো ও বয়স্কদের সম্মান করা, সকলকে আচরণে তুষ্ট করা, ঔদ্ধত্যকে পরিহার করা এবং সবার সঙ্গে প্রীতিময় সম্পর্ক গড়ে তোলাই হলো। মানবিক বৈশিষ্ট্য। মার্জিত রুচি ও সুন্দর মনের পরিচয় দিতে হলে কথাবার্তায় ও আচার-আচরণে আমাদের নম্র ও বিনয়ী হতে হবে। শিষ্টাচার ও সৌজন্য সামাজিক মানুষের এক দুর্লভ ঐশ্বর্য। যে সমাজ শিষ্টাচারকে যতটা সাদরে গ্রহণ করে সে সমাজ ততটা সভ্য। উন্নত জাতি তথা উন্নত সভ্যতা শিষ্টাচারেরই অবদানপুষ্ট। ফুল যেমন বাতাসে তার সুবাস ছড়ায় তেমনি মহৎ ব্যক্তির শিষ্টাচার প্রকাশ। পায় তার ব্যবহারে। সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে শিষ্টাচার অনন্য ভূমিকা পালন করে।
শিক্ষাজীবনে শিষ্টাচারের তাৎপর্য:
ছাত্রজীবন মানবজীবনের সর্বোৎকৃষ্ট সময় এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার প্রস্তুতিপর্ব বা ভিত্তি স্থাপনকাল। ভূমিকা পালন করে। এরই ওপর নির্ভর করে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জীবনের সফলতা ও ব্যর্থতা। পরবর্তী জীবনের গতি-প্রকৃতি ছাত্রজীবনের চরিত্র-গঠন ও পরিকল্পনা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হয়। এ সময় শুধু পুথিগত শিক্ষা নয়, শিষ্টাচার ও সৌজন্য শিক্ষারও যথার্থ কাল। শিষ্টাচার ও সৌজন্যের ছোঁয়াতেই ছাত্র হয় বিনীত, ভদ্র ও সংযত। ছাত্রজীবনে যে গুরুজনদের শ্রদ্ধা করতে শিখল না, যার উদ্ধত ব্যবহারে শিক্ষক বিরক্ত, যার রূঢ় অমার্জিত আচরণে সহ-শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ-বেদনাহত, পরবর্তী কর্মজীবনে তার একই আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটে। তখন সমাজ ও দেশের জন্য সে হয় অশুভ শক্তি, অকল্যাণের মূর্ত প্রতীক। হতাশা, ব্যর্থতার তিল তিল দংশন-জ্বালায় সে নিজেকে নিঃশেষ করে। ছাত্রজীবনই মানুষের সুকুমারবৃত্তি লালনের শুভক্ষণ। আর শিষ্টাচার ও সৌজন্য হলো তার মনুষ্যত্ব অর্জনের সোপান। এরই মধ্যে রয়েছে নিজেকে সুন্দর ও সার্থকতায় পরিপূর্ণ করে তোলার মহাশক্তি। ছাত্রজীবনে শিষ্টাচারের প্রকাশ ঘটে পোশাক-পরিচ্ছদে। তাই পোশাক-পরিচ্ছদে সুরুচির পরিচয় থাকতে হবে। শিষ্টাচার-সৌজন্য প্রকাশের জন্য ছাত্রদের কিছু হারাতে হয় না, কোনো অর্থ ব্যয় করতে হয় না, এতে কায়িক শ্রমও দিতে হয় না। শুধু দরকার হয় অভ্যাস আর সুশিক্ষা। সে অভ্যাস নৈতিক শিক্ষার আদর্শে জীবন গঠনের পরিশীলিত অনুশীলন। যার ফলে মহৎ ও সমৃদ্ধ জীবন বিকাশের পথ প্রশস্ত হয়। বিনয়ী ভদ ছাত্র শুধু শিক্ষকের স্নেহই কেড়ে নেয় না, সে পায় শিক্ষকের আশীর্বাদ, পায় তার সাহায্য। আর সেজন্য মনীষীদের পথ অনসরণ করে শিক্ষার্থীদের মহৎ অঙ্গীকারে জীবনকে কুসুমের মতো বিকশিত করে তুলতে হবে। এমন জীবনকসম বিকাশে শিষ্টাচার। পুষ্পদণ্ড ও সৌজন্য পাপড়ির ভূমিকা পালন করে। শিষ্টাচারহীন শিক্ষা সুশিক্ষা নয়, কেননা শিক্ষার চড়ান্ত ফল বা পরিণতি হলো। সহনশীলতা- যা একমাত্র শিষ্টাচার চর্চার মাধ্যমেই আত্মস্থ করা সম্ভব।
সামাজিক দৃষ্টিতে শিষ্টাচার :
ক্রমাগত বিবর্তনের ধারায় জ্ঞান-বিজ্ঞানে চরম উৎকর্ষ সাধিত একুশ শতকে এসে আমরা একটু মানব। সভ্যতার দিকে ফিরে তাকাতে চাই। সভ্যতার দেনা-পাওনার হিসাবে করলে আমরা দেখতে পাই, সভ্যতা আমাদের উন্নত জীবন। ব্যবস্থার সাথে অমূল্য ধন শিষ্টাচার উপহার দিয়েছে এবং সভ্যতা টিকিয়ে রাখতে শিষ্টাচারই হলো মানুষের শ্রেষ্ঠতম সম্পদ। কেবল এর জন্যই আমরা সুসভ্য মানুষ হিসেবে তথা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে গর্ববোধ করতে পারি। সমীক্ষায় দেখা গেছে, যে সমাজ যত সভ্য, তার লোক-ব্যবহার তত মার্জিত, সম্ভাবমূলক এবং সুরুচিব্যঞ্জক। কিন্তু সেই লোক-ব্যবহার কেবল রীতিনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক অনুষ্ঠানে সৌভ্রাতৃত্ব ও সৌষ্ঠব রক্ষার্থে কতকগুলো নিয়ম অনুসরণ করতে হয় তাকে রীতি বলে। কিন্তু ভদ্রতা বা শিষ্টাচার রীতিমাত্র নয়; রীতি কেবল বাইরের অভ্যাস, তাতে অন্তরের স্পর্শ থাকে না। আর হৃদয়ানুভূতিহীন অভ্যাস ভণ্ডামির নামান্তর। শিষ্টাচার আত্মা থেকে উৎসারিত মাধুর্য, শোভন হৃদয়ের অকৃত্রিম সৌন্দর্য। সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে শিষ্টাচারের গুরুত্ব ব্যাপক। দলবদ্ধ সমাজব্যবস্থায় রীতি বা সংস্কারের শৃঙ্খলে আমাদের জীবন যাপিত হলেও মৌলিক শিষ্টাচার আমাদের পালন করতেই হয়। আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখতে সৌহার্দ ও সম্প্রীতির বলয় সৃষ্টিতে শিষ্টাচারের তাৎপর্য অপরিসীম।
শিষ্টাচার অর্জনের উপায়:
ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে 'Courtesy costs nothing but buys everything.' কিন্তু এই শিষ্টাচার কীভাবে অর্জন করা যায়? হ্যা, আশৈশব আত্মসংযম ও মার্জিত প্রকাশভঙ্গির অনুশীলনের দ্বারা শিষ্টাচার অর্জন করা সম্ভব। তারপরও আত্যন্তিক স্পষ্টবাদিতার সঙ্গে শিষ্টাচারের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। স্পষ্টবাদিতার দোহাই দিয়ে ইতরতা বা রূঢ়তার অস্ত্র-প্রয়োগ সামাজিক শালীনতাবোধকে পীড়িত করে। তথাকথিত স্পষ্টবাদীর দল লোক-সমক্ষে নিজেদের অসাধারণরূপে জাহির করার ঘৃণ্য লোভ সংবরণ করতে না পেরে সামাজিক শিষ্টাচারকে পদদলিত করে অত্যন্ত রূঢ় কথা বলে ফেলে। অথচ সেই অপ্রিয় সত্য বাক্যটি রূঢ়-স্বরে না বলে মার্জিত ভঙ্গিতে প্রকাশ করতে পারলে আত্মিক সমুন্নতি প্রকাশ পায়। আর তার জন্য প্রয়োজন শিষ্টাচার। শিষ্টাচারের গুণে মানুষের হৃদয়ে অতি সহজেই জায়গা করে নেওয়া যায়।
শিষ্টাচার ও খোশামোদ-বৃত্তি:
দ্রতা হলো সব মানুষের প্রতি সমান দৃষ্টি, আর খোশামুদির দৃষ্টি কেবল নিজের প্রতি নিবদ্ধ। সৌজন্যবোধ নিজেকে অপেক্ষমাণ রেখে পরের সুবিধা আগে করে দিতে তৎপর; অন্যদিকে, খোশামোদ বা তৈল বৃত্তি বোঝে শুধু। নিজের সুবিধা। তৈলবাজের উদ্দেশ্যই থাকে আত্মসুখ ও আত্মসমৃদ্ধি। কিন্তু শিষ্টাচার বা সৌজন্যবোধ সৌষ্ঠবমণ্ডিত, সরল ও সুন্দর। তৈল-বৃত্তি সৌষ্ঠবহীন, কুটিল ও কুৎসিত। শিষ্টাচার বিশ্বমুখীনতায় উজ্জ্বল আর খোশামোদ-বৃত্তি আত্মমুখীনতায় অন্ধ।
চক্ষুলজ্জা ও শিষ্টাচার
চক্ষুলজ্জা নামে একটি সামাজিক উপসর্গ শিষ্টাচারের বেনামিতে লোক-সমাজে প্রচলিত আছে। চক্ষুলজ্জার খাতিরে অসত্যকে সত্য বলে স্বীকার করা একটি গুরুতর সামাজিক ব্যাধি। শিষ্টাচারের সঙ্গে দৃঢ়তার মিশ্রণই এই ব্যাধির সঠিক চিকিৎসা। এদেশে অমায়িক এবং লোকপ্রিয় মানুষের খুবই অভাব। তাই আমাদের সমাজে এখনও শিষ্টাচার নামক স্বভাবটি যথার্থভাবে গড়ে ওঠেনি। তাছাড়া দারিদ্র্য, অশিক্ষা, স্বেচ্ছাচারিতা ও অপরিকল্পিত জীবন-যাপনের ফলে আমাদের সমাজব্যবস্থায় শিষ্টাচার বা সৌজন্যবোধের সংস্কৃতি খুব একটা প্রসারতা লাভ করেনি। শুনতে আপত্তিকর হলেও সত্য যে, শিষ্টাচার-সংস্কৃতি তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে এবং তার সর্বজনীন সুফলতা অর্জন করতে বাঙালিকে আরও অনেক সাধনা করতে হবে।
শিষ্টাচার ও রাষ্ট্র:
পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে শিষ্টাচারের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। শিষ্টাচারের অভাবে মানুষে-মানুষে, জাতিতেজাতিতে বিরোধ ও দ্বন্দ্বযুদ্ধ লেগেই থাকে। সাম্প্রতিককালে দেশের অভ্যন্তরে রাজনীতিক দলগুলোর পারস্পরিক সাংঘর্ষিক সম্পর্ক শিষ্টাচার বর্জনের সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ। শিষ্টাচার না থাকার ফলে রাজনীতিক সংস্কৃতি যেমন বিপর্যস্ত হয় তেমনি গণতন্ত্র হয় ভুলুণ্ঠিত। তাই জনসাধারণের আচার-ব্যবহারে যেমন শিষ্টতা বজায় রাখতে হবে তেমনি রাষ্ট্র পরিচালনায় এবং নেতৃত্ব প্রদানে মন্ত্রীএমপি-নেতা-নেত্রীদের যথার্থ শিষ্টতার পরিচয় দেওয়া অপরিহার্য। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিটি মানুষ তার নিজ নিজ কর্মে শিষ্টতা বজায় রাখলে সমাজে সুশৃঙ্খল পরিবেশ বিরাজ করবে। সামাজিক সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শিষ্টাচারের কোনো বিকল্প নেই। যে জাতি যত বেশি সভ্য, সে জাতি তত বেশি শিষ্টাচারী। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড আর শিষ্টাচার জাতির সভ্যতার ভিত।
শিষ্টাচার না থাকার কুফল:
আজ সমাজের ও রাষ্ট্রের নানা ক্ষেত্রেই অশিষ্টাচার ও সৌজন্যহীনতার নিষ্ঠুর চিত্র পরিলক্ষিত হয়। দিন দিনই মানুষের উচ্ছঙ্খলতা বাড়ছে। বাড়ছে সীমাহীন ঔদ্ধত্য। আজকাল তো বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করার রীতি প্রায় উঠেই গেছে। অতি আধুনিকতার নামে এবং পাশ্চাত্য অনুকরণে গা ভাসিয়ে আমরা যেমন আমাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে ভুলতে বসেছি তেমনি ভুলেছি শিষ্টাচার-সৌজন্যবোধ। তাই তো গুণীজনদের অবজ্ঞা করি আর নমস্যদের করি অশ্রদ্ধা। মানুষের ভিতরের সুকুমারবৃত্তিগুলো কেমন যেন নেতিয়ে পড়ছে দিন দিন। প্রকট হয়ে উঠছে শুধু জনে জনে দ্বন্দ্ব আর সংঘাত। শিষ্টাচারের অভাবে সমাজ অন্তঃসারশূন্য ও জাতি বিবেকহীন হয়ে পড়ছে। চারদিকে আজ নিষ্ঠুর বিত্তবানের নির্লজ্জ ঔদ্ধত্য; সবলের সীমাহীন নির্মম অত্যাচার। আজকাল ভদতাই যেন ভীরুতার প্রকাশ; সৌজন্যই যেন দুর্বলতার পরিচয়; শিষ্টাচার প্রদর্শন করাই যেন অসহায়ত্বকে তুলে ধরা; নম্রভাব দেখালে মানুষ যেন তাকেই আজ মনে করে হাঁদা-বুদ্ধ! তাই জীবনানন্দ দাশ যথার্থই বলেছেন-
অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা
যাদের হৃদয়ে কোন প্রেম নেই- প্রীতি নেই
করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
মানুষকে অপমান করতে পারলে, হেনস্তা করতে পারলেই যেন মানুষের পৈশাচিক তৃপ্তি। দুর্ব্যবহার, মিথ্যাচার, দুর্নীতি, লাম্পট্য এবং যাবতীয় বিবেকবর্জিত কু-কাজের কলুষতায় মানুষ আজ নিমজ্জিত। শিষ্টাচার ও সৌজন্যবোধের সৌন্দর্য হারিয়ে মানুষ আজ নিঃস্ব, হৃদয়হীন। অন্তরের প্রস্ফুটিত শতদল আজ ছিন্নভিন্ন। আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে শিষ্টাচারের বিকল্প কিছু নেই।
উপসংহার:
শিষ্টাচারের মাধ্যমে মানবিক সত্তার বিকাশ ঘটে বলে ঔদ্ধত্য আর উচ্ছঙ্খলতা এখানে পরাজিত হয়। দূর হয় কদর্য ও অশীলতা। শিষ্টাচারের গুণেই মানুষ হয়ে ওঠে সহজ-সরল, স্পষ্ট, সৎ ও মার্জিত। মোটকথা, দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় সংসার চক্রের অনিবার্য ঘর্ষণে যে শ্বাসরোধকারী ধূম্রজাল উত্থিত হতে থাকে, শিষ্টাচারের স্নিগ্ধ শান্তি-বারি সিঞ্চনেই তা নিবারিত হতে পারে। শিষ্টাচার ধলি-মান পৃথিবীর রুক্ষতাকে কোমলতা দান করে প্রাত্যহিক জীবনযাত্রাকে শোভামণ্ডিত করে তোলে। শিষ্টাচার সভ্যতার। আতিক সম্পদ যুগ-যুগান্তরের চিপ্রকর্ষের অনবদ্য যোগফল। তাই সমাজ হতে শিষ্টাচারের দুর্ভিক্ষ দূর হোক এটাই আমাদের সনির্বন্ধ প্রার্থনা।
Related Question
View Allএকজন লেখক তিনিই যিনি লেখেন। তবে সব লেখা লিখেই লেখক হওয়া যায় না। লেখক সব ধরনের হতে পারে। তবে সৃজনশীল লেখকই হচ্ছে আমাদের মূল কেন্দ্রবিন্দু। লেখক হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম একটি স্বাধীন সত্ত্বা।
একজন লেখক পুরোপুরি তার নিজের সত্ত্বার ওপরে বেঁচে থাকে। অনেকেই লেখক হবার সহজ উপায় খোঁজ করে। কিন্তু পড়তে পড়তে আর লিখতে লিখতেই শুধুমাত্র লেখক হওয়া যায়। এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। লেখক অনেক ধরনের হতে পারে।
একজন সাংবাদিকও একজন লেখক। উপন্যাস, গল্প, কবিতা, ছড়া, সাহিত্য, প্রবন্ধ, রম্য, ব্লগ সব ধরনের লেখা যারা লেখে তারাই লেখক। অনেকেই মস্তিষ্কের মধ্যে ওকটা লেখার শক্তি পেয়ে যায় আর অনেকে হয়ত শিখে শিখে লেখক হয়।
সমাজ সভ্যতা কখনোই পুরোপুরি একজন লেখকের পক্ষে থাকে না। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিপক্ষে চলে যায়। স্বাভাবিকভাবেই একজন লেখক তার কলমের আঘাতে জর্জরিত করতে চায় সকল অন্যায়, অপবাদ। তাই হয়ত বেঁধে যেতে পারে সংঘাত। কলমই হচ্ছে একজন লেখকের দাঁড়ানোর জায়গা। কলম ছাড়া লেখকের অস্তিত্ব বিলীন। তবে সবাইকে যে প্রতিবাদ লিখতে হবে এমন কোনো কথা। কেউ কেউ মনোরঞ্জনের জন্যও লেখে। অনেকে আবার চাটুকারিতা করতে লেখে। কেউ আবার কীভাবে পুরষ্কার তুলে নেওয়া যায় সেই ধান্দা করার জন্য লেখে।
একজন লেখক হয়ে উঠতে পারে ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্যকারী। সে কলমের ছোঁয়ায় প্রতিবাদ করতে অন্যায়ের আর ফুটিয়ে তুলবে ন্যায়ের কথা। লেখকের কলমের কালি প্রেরণার সুর হয়ে গান গাইবে। আর অশ্রুসিক্ত নয়নে হাসির ঝলক আনবে লেখকের কলম। একজন লেখকের প্রাণ তার লেখা, তার লেখার ভঙ্গি। সে তার লেখা দিয়ে বাঁচিয়ে তুলতে পারবে অসুস্থ কোনো সভ্যতাকে। লেখক তার কলম দিয়ে জাগ্রত করতে পারবে মানুষের ভীতরে লুকিয়ে থাকা অদম্য সাহস।
একজন লেখক কল্পনাকে নিয়ে আসতে পারে বাস্তবে। আমাদের নিয়ে যেতে পারে কল্পনার গহীন বনে। লেখক আমাদের সবাক যুগ থেকে অবাক যুগে নিয়ে যেতে পারে মুহূর্তের মাঝেই। লেখক জাগাতে পারে প্রেম, লেখক জাগাতে পারে নতুন কাজের স্পৃহা।
অনেকেই মনে করে লেখকের সকল বিষয়ে দ্বায় আছে। কিন্তু লেখকের মূলত কারো কাছেই কোনো দ্বায় নেই। তার দ্বায় থাকে শুধু নিজের মনের কাছে, নিজের বিবেকের কাছে, নিজের সুপ্ত চেতনার কাছে। সমাজ কি ভাববে তা নিয়ে লেখক মাথা ঘামাবে না। লেখক ভয়ে নাথা নোয়াবে না। লেখক যতদিন বাঁচবে বীরের মতোই বাঁচবে।
সারা বিশ্বেই লেখকরা নির্যাতনের শিকার হয়। অনেকেই বলে থাকে লিখে কিছুই হয় না। তাই যদি হতো তাহলে লেখার জন্য লেখকের শাস্তি হতো না। লেখকের ফাঁসি হতো না।
লেখকের কলমে অনেক জোর। সেই জোর ভেঙে চুরে গুড়িয়ে দিতে পারে যেকোনো কিছু। বিশেষ করে সাংবাদিকরা বিশ্বজুড়ে নির্যাতিত হয় অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে। শাস্তি, সাজা বহু কিছু তাদের সহ্য করতে হয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখলে হুমকি আসে, হামলা মামলা বহু ঘটনাই ঘটে। কারণ শাসক, শোষক আর অন্যায়কারীদের অনেক ক্ষমতা। লেখকের সমাজের দায়মুক্তির জন্য জীবনও দিতে হয়। তাইতো একজন লেখক সমাজের শক্তি, সমাজের সম্পদ।
সাহিত্য হচ্ছে মানুষের চিন্তা-ভাবনা, অনুভূতি তথা মানব-অভিজ্ঞতার কথা বা শব্দের বাঁধনে নির্মিত নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ। এই অর্থে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ইত্যাদি উচ্চতর গুণাবলি সমন্বিত বিশেষ ধরনের সৃজনশীল মহত্তম শিল্পকর্ম। সাহিত্য-শিল্পীগণ যখন ‘অন্তর হতে বচন আহরণ’ করে আত্মপ্রকাশ কলায় ‘গীতরস ধারা’য় সিঞ্চন করে ‘আনন্দলোকে’ নিজের কথা- পরের কথা- বাইরের জগতের কথা আত্মগত উপলব্ধির রসে প্রকাশ করেন- তখনই তা হয়ে ওঠে সাহিত্য। রবীন্দ্রনাথের কথায় “বহিঃপ্রকৃতি এবং মানব-চরিত্র মানুষের মধ্যে অনুক্ষণ যে আকার ধারণ করিতেছে, যে-সঙ্গীত ধ্বনিত করিয়া তুলিতেছে, ভাষা-রচিত সেই চিত্র এবং সেই গানই সাহিত্য।…সাধারণের জিনিসকে বিশেষভাবে নিজের করিয়া – সেই উপায়ে তাহাকে পুনরায় বিশেষভাবে সাধারণের করিয়া তোলাই হচ্ছে সাহিত্যের কাজ।” [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সাহিত্য] সাহিত্য সত্য-সুন্দরের প্রকাশ হিসেবে প্রবহমাণ সময়ে যা ঘটে – সে-সবের মধ্য থেকে যা মহৎ, যা বস্তুসীমাকে ছাড়িয়ে বাস্তবাতীত প্রকাশ করে, যা জীবনের জন্য কল্যাণময় এবং মহৎ আদর্শের দ্যোতক তাকেই প্রকাশ করে। আসলে মহৎ সাহিত্য তাই- যা একাধারে সমসাময়িক-শাশ্বত-যুগধর্মী-যুগোপযোগী-যুগোত্তীর্ণ। সাহিত্য কেবল পাঠককে আনন্দ দেয় না- সমানভাবে প্রভাবিত করে পাঠক এবং সমাজকে।
আভিধানিকভাবে ‘সহিতের ভাব’ বা ‘মিলন’ অর্থে ‘সাহিত্য’ হলো কাব্য, নাটক, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি সৃজনশিল্পের মাধ্যমে এক হৃদয়ের সঙ্গে অন্য হৃদয়ের সংযোগ স্থাপন; সাহিত্য¯্রষ্টা-সাহিত্যের সাথে পাঠকের এক সানুরাগ বিনিময়। কিন্তু আভিধানিক অর্থের নির্দিষ্ট সীমায় সাহিত্যের স্বরূপ-গতি-প্রকৃতি-বৈচিত্র্য ও বিস্তৃতির সম্যক ধারণা দেওয়া যেমন অসম্ভব, কোনো বিশেষ সংজ্ঞায় তাকে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়াও তেমন দুঃসাধ্য। বাচ্যার্থ ও ব্যঞ্জনার্থর সীমাকে অতিক্রম করে নানা রূপে, রসে, প্রকরণ ও শৈলীতে সাহিত্যের নিরন্তর যাত্রা সীমা থেকে অসীমে। প্রত্যক্ষ সমাজপরিবেশ তথা সমকালীন বাস্তব পারিপার্শ্বিক, নিসর্গপ্রীতি ও মহাবিশ্বলোকের বৃহৎ-উদার পরিসরে ব্যক্তিচৈতন্য ও কল্পনার অন্বেষণ ও মুক্তি- আর এইভাবেই শ্রেণিবিভাজন, নামকরণ ও স্বরূপমীমাংসার প্রচেষ্টাকে ছাপিয়ে উঠে সাহিত্যের যাত্রা সীমাহীনতায়। প্রকৃত সাহিত্য তাই যেমন তার সমসময় যা যুগমুহূর্তের, তেমনই তা সর্বকালের সর্বজনের। মার্কসবাদী সাহিত্যতত্ত্বে বাস্তব সমাজজীবনকে ‘ভিত্তি’ আর শিল্প-সাহিত্যকে সমাজের উপরিকাঠামোর [ঝঁঢ়বৎংঃৎঁপঃঁৎব] অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। সাহিত্যের মৌল উপকরণসামগ্রী আহৃত হয় জীবনের ভা-ার থেকে- সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বৈরিতার বিচিত্র-অনিঃশেষ ভা-ার থেকে। সাহিত্যসৃষ্টির মূলে সক্রিয় যে সৃজনী-ব্যক্তিত্ব তা নিছক বিমূর্ত কোনো সত্তা নয়; আত্মপ্রকাশ ও মানবিক সংযোগ ও বিনিময়ের বাসনায় অনুপ্রাণিত সে সত্তা তার ভাব-ভাবনা, বোধ ও বিশ্বাসকে এক আশ্চর্য কৌশলে প্রকাশ করে জনসমক্ষে কোনো একটি বিশেষ রূপ-রীতি-নীতির আশ্রয়ে। ব্যক্তিক অনুুভূতি-যাপিতজীবন-মিশ্রকল্পনার জগৎ থেকেই সৃষ্টি হয় সাহিত্যের; যুগান্তরের আলোকবর্তিকা হিসেবে সাহিত্য সত্যের পথে সবসময় মাথা উঁচু করে থেকেছে- সত্যকে সন্ধান করেছে। আসলে সাহিত্য এমনি এক দর্পণ- যাতে প্রতিবিম্বিত হয় মানবজীবন, জীবনের চলচ্ছবি, পরিবেশ-প্রতিবেশ, সমাজজীবনে ঘটমান ইতিহাস- ইতিহাসের চোরাস্রােত নানাবিধ কৌণিক সূক্ষ্মতায়।
সাধারণত আত্মপ্রকাশের বাসনা, সমাজ-সত্তার সঙ্গে সংযোগ কামনা, অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পলোক নির্মাণ এবং রূপপ্রিয়তা- এই চতুর্মাত্রিক প্রবণতাই মানুষের সাহিত্য-সাধনার মৌল-উৎস। চতুর্মাত্রিক প্রবণতার [আত্মপ্রকাশের কামনা, পারিপার্শ্বিকের সাথে যোগাযোগ বা মিলনের কামনা, কল্প-জগতের প্রয়োজনীয়তা এবং সৌন্দর্য-সৃষ্টির আকাক্সক্ষা বা রূপমুগ্ধতা] মধ্যে সমাজসত্তার সঙ্গে সংযোগ-কামনা এবং অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পলোক নির্মাণ- এই উৎসদ্বয়ের মধ্যে নিহিত রয়েছে সাহিত্য ও সমাজের মধ্যে আন্তর-সম্পর্কের প্রাণ-বীজ। সমাজ শিল্পীকে সাহিত্য-সাধনায় প্রণোদিত করে। ‘সহৃদয়-হৃদয় সংবাদ’এর মাধ্যমে সাহিত্যিকগণ লেখক-পাঠকের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করেন- উভয়ের হৃদয়বীণার তারগুলোকে একই সুতায় গেঁথে দেন। এর কারণে সাহিত্য দেশ-কাল-সমাজের সীমা অতিক্রম করে সর্বসাধারণের হৃদয়কে আকর্ষণ করে। এর ফলে সাহিত্য হয়ে ওঠে সার্বজনীন-সর্বকালের মানুষের হৃদয়ের সামগ্রী এবং সাহিত্য¯্রষ্টাও হয়ে ওঠেন অনেক বড়। কিন্তু বর্তমান বাংলা সাহিত্যচর্চার গতি-প্রকৃতি, সমস্যা-সংকট-সমাধান কোন দিকে? এসব বিষয়ের সন্ধান- এ প্রবন্ধের অন্বিষ্ট।
আমাদের লোকশিল্প প্রবন্ধটি আমাদের লোককৃষ্টি গ্রন্থ থেকে গৃহীত হয়েছে। লেখক এ প্রবন্ধে বাংলাদেশের লোকশিল্প ও লোক-ঐতিহ্যের বর্ণনা দিয়েছেন । এ বর্ণনায় লোকশিল্পের প্রতি তার গভীর মমত্ববোধের পরিচয় রয়েছে।
আমাদের নিত্যব্যবহার্য অধিকাংশ জিনিসই এ কুটিরশিল্পের ওপর নির্ভরশীল ।
শিল্পগুণ বিচারে এ ধরনের শিল্পকে লোকশিল্পের মধ্যে গণ্য করা যেতে পারে । পূর্বে আমাদের দেশে যে সমস্ত লোকশিল্পের দ্রব্য তৈরি হতো তার অনেকগুলোই অত্যন্ত উচ্চমানের ছিল। ঢাকাই মসলিন তার অন্যতম। ঢাকাই মসলিন অধুনা বিলুপ্ত হলেও ঢাকাই জামদানি শাড়ি অনেকাংশে সে স্থান অধিকার করেছে।
বর্তমানে জামদানি শাড়ি দেশে-বিদেশে পরিচিত এবং আমাদের গর্বের বস্তু। নকশি কাথা আমাদের একটি গ্রামীণ লোকশিল্প। এ শিল্প আজ বিলুপ্তপ্রায় হলেও এর কিছু কিছু নমুনা পাওয়া যায়। আপন পরিবেশ থেকেই মেয়েরা তাদের মনের মতো করে কীথা সেলাইয়ের অনুপ্রেরণা পেতেন । কাঁথার প্রতিটি সুচের ফোঁড়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক-একটি পরিবারের কাহিনী, তাদের পরিবেশ, তাদের জীবনগাঁথা ।
আমাদের দেশের কুমোরপাড়ার শিল্পীরা বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র ছাড়াও পোড়ামাটি দিয়ে নানা প্রকার শৌখিন দ্রব্য তৈরি করে থাকে। নানা প্রকার পুতুল, মূর্তি ও আধুনিক রুচির ফুলদানি, ছাইদানি, চায়ের সেট ইত্যাদি তারা গড়ে থাকে।
খুলনার মাদুর ও সিলেটের শীতলপাটি সকলের কাছে পরিচিত। আমাদের দেশের এই যে লোকশিল্প তা সংরক্ষণের দায়িত আমাদের সকলের । লোকশিল্পের মাধ্যমে আমরা আমাদের ঐতিহ্যকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারি।
আমাদের অর্থনৈতিক সম্পদ
বাংলাদেশ, একটি দ্রুত উন্নতি লক্ষ্য নির্ধারণ করা দেশ, যা প্রচুর অর্থনৈতিক সম্পদের বেশিরভাগ সম্পদ নিয়ে এগিয়ে চলেছে। এই দেশের অর্থনৈতিক সম্পদ মৌলিকভাবে চারটি প্রধান উৎস থেকে আসে: জমি, কাজ, উদ্যোগ, এবং মানুষের কাজের দক্ষতা। এই সম্পদের বিকাশে বিভিন্ন রাজনৈতিক, আর্থিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের ভূমিকা রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদের মূল স্তম্ভ হল কৃষি। দেশটি একটি প্রধানত কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির মূল হিসেবে প্রধানত শস্য ও ফসল চাষ প্রসঙ্গে বিকাশ হয়েছে। বাংলাদেশে প্রধানত ধান, পাট, মশুর ডাল, আখ, পটল, পেঁপে, তেল সহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা হয়। অত্যন্ত উচ্চ মানের খাদ্য সামগ্রী উৎপাদনের ফলে এই খাদ্য পণ্য রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক সম্পদের গড়াতে সাহায্য করে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উৎস হল প্রবৃদ্ধি ও শিক্ষাগত উন্নতি। বাংলাদেশে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাব কমে আসছে এবং মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি করছে। বিশেষত, প্রযুক্তির আগমন এবং বিনিয়োগে বৃদ্ধি নেওয়া হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক সম্পদের উন্নতির পথে সাহায্য করছে।
অন্যান্য উৎস হিসেবে প্রযুক্তিবিদ্যা এবং সেবা অংশ গুলির অগ্রগতি আছে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সম্পদ হল তার মানুষের চাকরিভার্থী শ্রমিকেরা। তাদের দক্ষতা, উদ্যোগ, ও সামর্থ্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যদিও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদ উন্নতির পথে অনেক উত্সাহজনক প্রগতি হয়েছে, তবে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ র
য়েছে। প্রধানতঃ গরিব মানুষের জন্য আর্থিক সম্পদের অগ্রগতি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনও বেশিরভাগ লোকের মধ্যে বৃদ্ধির অভাব আছে। তাছাড়া, পরিবেশের সম্পদ সংরক্ষণের জন্য সঠিক প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন।
পুনর্নির্মাণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পদের বিস্তার ও উন্নতি নিশ্চিত করতে পারে। সঠিক নীতি নির্ধারণ, উদ্যোগের বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত প্রবর্তন এবং শিক্ষাগত উন্নতি এমন পরিবর্তন নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে পারে।
শেষ কথায়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা দেশটির সমৃদ্ধি ও উন্নতির সাথে অবিভাজ্যভাবে সংযোগিত। একটি দ্রুত বৃদ্ধির উপায় হল সঠিক পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা এবং উদ্যোগের বৃদ্ধি করা। এই প্রস্তুতি নেওয়ার মাধ্যমে, বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক সম্পদ উন্নতির পথে আরও এগিয়ে যেতে পারে এবং তার মানুষের জন্য আরো উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।
"বিক্ষুব্ধ পূর্ব ইউরোপ" বলতে পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ১৯৮৯ সালের পর সাম্যবাদী শাসনের পতন এবং এর ফলে উদ্ভূত রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতাকে বোঝায়। এই সময়কালে, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো গণতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতির দিকে ধাবিত হয়, যার ফলে নতুন জাতীয়তাবাদ, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সামাজিক পরিবর্তন দেখা যায়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও কারণ:
সাম্যবাদের পতন:
১৯৮৯ সালের ঐতিহাসিক বছরটি পূর্ব ইউরোপে সাম্যবাদী ব্যবস্থার পতন ঘটায়, যা ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এই পরিবর্তনের ফলে দেশগুলো তাদের সাম্যবাদী অতীত থেকে মুক্তি পেতে শুরু করে।
গণতন্ত্রের পথে যাত্রা:
সাম্যবাদের পতনের পর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও মুক্ত বাজার অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে।
বিক্ষোভ ও অস্থিতিশীলতার কারণসমূহ:
অর্থনৈতিক সংকট:
সাম্যবাদী অর্থনীতি থেকে বাজার অর্থনীতিতে উত্তরণ অনেক দেশে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি, এবং ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য বাড়ে, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে।
জাতীয়তাবাদের উত্থান:
অনেক দেশে সাম্যবাদী শাসনের অবসানের পর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে জাতীয়তাবোধ তীব্র হয়, যা নতুন করে জাতিগত সংঘাতের জন্ম দেয়।
রাজনৈতিক অস্থিরতা:
নতুন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুসংহত হতে সময় লাগে, ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। অনেক দেশে ক্ষমতা ও আদর্শের লড়াইয়ের কারণে সহিংসতাও ঘটে।
সামাজিক পরিবর্তন:
পুরনো সাম্যবাদী নীতি ও ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন সামাজিক কাঠামো ও মূল্যবোধের জন্ম হতে থাকে, যা সমাজের বিভিন্ন স্তরে অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
গুরুত্বপূর্ণ দিক:
- এই বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে এক নতুন যুগের সূচনা করে, যেখানে তারা তাদের নিজস্ব পথে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ পায়।
- যদিও এই পরিবর্তন প্রক্রিয়াটি কঠিন ছিল, এটি এই অঞ্চলে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এইভাবে, "বিক্ষুব্ধ পূর্ব ইউরোপ" মূলত সেই সময়ের পরিবর্তন, অস্থিরতা এবং নতুন করে গড়ে ওঠার জটিল প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে, যা সাম্যবাদের পতন ও গণতান্ত্রিক যাত্রার ফলস্বরূপ ঘটেছিল।
পররাষ্ট্রনীতি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতির সম্প্রসারণ। পররাষ্ট্রনীতি হলো কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের গৃহীত সেসব নীতি যা রাষ্ট্র তার রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে সম্পাদন করে থাকে। অন্য রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাকে তুলে ধরে।
১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। স্বাধীনতা লাভের পরবর্তী সময়ে ভৌগোলিক অবস্থান, স্বল্প পরিসরের ভূখন্ড এবং সীমিত অর্থনৈতিক সম্পদ ইত্যাদি বিভিন্ন নিয়ামক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের সুযোগকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত বহিঃশক্তির প্রভাব থেকে দেশের সাবভৌমত্ব ও ভূখন্ডকে রক্ষা করার মতো বিষয়েই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।
পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কীয় সাংবিধনিক বিধান বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নির্দেশনা রয়েছে। এই নির্দেশনাসমূহ বাংলাদেশ সংবিধানের ২৫ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে। এগুলি হলো:
জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অপর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা, এ সকল নীতিই হবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং এ সকল নীতির ভিত্তিতে-
১. রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকা এবং সাধারণ ও পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য চেষ্টা করবে; প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার সমর্থন করবে; এবং সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ বা বর্ণ্যবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করবে।
২. রাষ্ট্র ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার করতে সচেষ্ট হবে। সংবিধানের ৬৩ অনুচ্ছেদে যুদ্ধ-ঘোষণা সংক্রান্ত নীতি উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে সংসদের সম্মতি ব্যতিত যুদ্ধ ঘোষণা করা যাবে না, কিংবা প্রজাতন্ত্র কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে না। অনুচ্ছেদ ১৪৫(ক)তে বৈদেশিক চুক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে: ‘বিদেশের সাথে সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হবে, এবং রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পেশ করার ব্যবস্থা করবেন। তবে শর্ত হচ্ছে যে, জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট অনুরূপ কোন চুক্তি কেবলমাত্র সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করা হবে।’
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতিসমূহ পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছু মূলনীতি অনুসরণ করে থাকে। জাতিসংঘ এবং ন্যামের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ এসব সংগঠনের মূলনীতিসমূহ মেনে চলে, এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান নীতিসমূহ এসব সংগঠনের নীতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান চারটি মূলনীতি হলো:
সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয় একটি দরিদ্র রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীল হবার কারণে বাংলাদেশকে বিভিন্ন মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হতে হয়। এ কারণেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি হিসেবে বলেছিলেন, ‘আমাদের একটি ক্ষুদ্র দেশ, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়, আমরা চাই সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব’।
অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখন্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য। জাতিসংঘ সনদের ২(৪) ধারায় বলা হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সকল সদস্য-রাষ্ট্র আঞ্চলিক অখন্ডতার বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের ভীতি প্রদর্শন থেকে এবং জাতিসংঘের উদ্দেশ্যের সংঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কোনো উপায় গ্রহণ করা থেকে নিবৃত্ত থাকবে’।
অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা জাতিসংঘ সনদের ২(৭) ধারায় বলা হয়েছে যে, ‘বর্তমান সনদ জাতিসংঘকে কোনো রাষ্ট্রের নিছক অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার দিচ্ছে না বা সেরূপ বিষয়ের নিষ্পত্তির জন্য কোনো সদস্যকে জাতিসংঘের দারস্থ হতে হবে না; কিন্তু সপ্তম অধ্যায় অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে এই নীতি অন্তরায় হবে না’। জাতিসংঘের একটি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এই মূলনীতির উপর তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করেছে, যা অন্য রাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রকাশিত।
২০০৯ সালে পুনরায় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে, এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনয়নের কথা ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ধারণা বিবেচনায় রেখে প্রায় তিন দশক পর ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা ঘোষণা করা হয়। সম্প্রতি সরকার রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে রাশিয়ার সাহায্যে দেশে পারমাণবিক প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
সময়ের পরিবর্তনের সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যত অর্জনের সম্ভাবনা অনেকটা ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক রাষ্ট্রসমূহের সাথে এবং বিশ্বের আরো কিছু রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়’ একটি সত্তুরের দশকের ধারণা, যা প্রায় ৪০ বছরের পুরনো। বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্ব প্রেক্ষাপটে পুরনো ধারার পরররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত তার অর্জনের সম্ভাবনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সুতরাং পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য নিয়ে নতুন কৌশল-পরিকল্পনা করা উচিত, যার মাধ্যমে পরিবর্তিত বিশ্বে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে। [ঊর্মি হোসেন]
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!