মীম বাবার সাথে চিড়িয়াখানা ঘুরে খুব আনন্দ উপভোগ করে। বাবাকে সে বলল, বাঘ, সিংহ, হরিণ ইত্যাদি প্রাণীগুলো একদিকে আর শালিক, তোতা ও ময়না ইত্যাদি পাখিগুলো অন্যদিকে দেখে ভালো লেগেছে। উত্তরে বাবা বললেন, প্রাণীগুলো ইচ্ছা করলে মেরুদণ্ডী ও অমেরুদণ্ডী এ দু'ভাগেও সাজানো যেতে পারে।
বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্তে জাগতিক বিষয়বস্তুকে তাদের মধ্যকার পারস্পরিক সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের ভিত্তিতে মানসিকভাবে একত্রিত করার প্রক্রিয়াই হচ্ছে শ্রেণিকরণ।
বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্তে জাগতিক বিষয়বস্তুকে তাদের মধ্যকার পারস্পরিক সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের ভিত্তিতে মানসিকভাবে একত্রিত করার প্রক্রিয়াই হচ্ছে শ্রেণিকরণ।
শ্রেণিকরণের স্বরূপ বিশ্লেষণ করলে এর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। যথা : (১) শ্রেণিকরণ এক ধরনের মানসিক প্রক্রিয়া। (২) শ্রেণিকরণের ভিত্তি হলো সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য। (৩) শ্রেণিকরণ হলো শৃঙ্খলাবদ্ধকরণ বা সুবিন্যস্তকরণ। (৪) শ্রেণিকরণে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য নিহিত থাকে। (৫) শ্রেণিকরণ প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যার সাথে জড়িত।
উদ্ভিদবিদ্যার অধ্যাপক রহমান সাহেব সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হাঁটতে এসে বিভিন্ন গাছপালা দেখেন। এর মধ্যে কিছু গাছে ফুল ফোটে, কিছু গাছে ফল ধরে, আবার কিছু গাছ ফুল-ফল ছাড়াই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। প্রকৃতির এ বৈচিত্র্যপূর্ণ গাছপালা দেখেই তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন যে, উদ্যানে দুই শ্রেণির উদ্ভিদ রয়েছে। যার কিছু সপুষ্পক উদ্ভিদ এবং কিছু অপুষ্পক উদ্ভিদ। রহমান সাহেব তার ব্যবহারিক সুবিধা বা বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এই শ্রেণিকরণটি করেছেন।
সাধারণত ব্যবহারিক সুবিধা বা বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য গুরুত্বহীন ও বাহ্যিক সাদৃশ্যের ভিত্তিতে জাগতিক বস্তু বা ঘটনাবলিকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিন্যস্ত করার মানসিক প্রক্রিয়াকে কৃত্রিম শ্রেণিকরণ বলে। বস্তুত কৃত্রিম শ্রেণিকরণে কোনোরূপ প্রাকৃতিক বা বৈজ্ঞানিক নিয়ম অনুসরণ করা হয় না। এ জন্য একে অবৈজ্ঞানিক শ্রেণিকরণ বলা হয়। মূলত ব্যবহারিক বা প্রায়োগিক সুবিধা সৃষ্টি করা হচ্ছে এরূপ শ্রেণিকরণের প্রধান কাজ।
সর্বোপরি সব দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, রহমান সাহেবের শ্রেণিকরণটি কৃত্রিম।
প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম শ্রেণিকরণের মধ্যকার পার্থক্যকে আমি যুক্তিসংগত বলে স্বীকার করি না। কারণ প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম শ্রেণিকরণের পার্থক্যসমূহ গুণগত নয়, উদ্দেশ্যগত। এজন্য এদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কোনো রেখা টানাও ঠিক নয়।
বস্তুত বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে এক অর্থে সব শ্রেণিকরণই প্রাকৃতিক, আবার অন্য অর্থে সব শ্রেণিকরণই কৃত্রিম। সব শ্রেণিকরণই প্রাকৃতিক হওয়ার কারণ হিসেবে বলা যায়, যেকোনো বিষয়ের শ্রেণিকরণ করতে গিয়ে প্রযোজ্য সাদৃশ্যের বিষয়গুলোকে আমরা আমাদের মনের উপর নির্ভরশীল বলে মনে করি। প্রকৃতপক্ষে সেগুলো প্রকৃতিতেই বিদ্যমান থাকে। অর্থাৎ এসব সাদৃশ্য মনবহির্ভূত এবং এগুলো বহির্জগতে স্বাধীন ও স্বতন্ত্রভাবে বিরাজ করে। আমাদের মন কেবল সাদৃশ্যের বিষয়গুলোকে নির্বাচন করে সেগুলোর ভিত্তিতে জাগতিক বস্তুসমষ্টি বা ঘটনাবলিকে শ্রেণিবদ্ধ করে মাত্র। অন্যদিকে সব শ্রেণিকরণকেই কৃত্রিম বলার কারণ হিসেবে বলা যায়, সব শ্রেণিকরণই মানুষ কর্তৃক সৃষ্ট। অর্থাৎ মানুষই নিজেদের প্রযোজন অনুযায়ী প্রকৃতিতে বিদ্যমান বস্তু বা ঘটনাবলিকে নির্বাচন করে সেগুলোকে শ্রেণিবদ্ধ করে। কারণ প্রকৃতির এমন কোনো নিজস্ব শক্তি নেই, যার ফলে প্রকৃতির বস্তুসমষ্টি বা ঘটনাবলি নিজে নিজেই শ্রেণিবদ্ধ হতে পারে। এককথায়, প্রকৃতিতে বস্তু বা ঘটনাবলি যেভাবে থাকার সেভাবেই থাকে। এমনকি মানুষও তাদেরকে বিভিন্ন জায়গা থেকে তুলে এনে পাশাপাশি শ্রেণিবদ্ধ করে না; বরং এগুলোকে মানুষ শ্রেণিবদ্ধ করে মনে মনে। কাজেই শ্রেণিকরণটি ঘটে মানুষের মনে মনে, বাস্তবে নয়। আর এদিক থেকেই বলা যায়, সব শ্রেণিকরণই মানুষ কর্তৃক সৃষ্ট, সুতরাং তা কৃত্রিম।
তাই প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম শ্রেণিকরণের মধ্যে পার্থক্যকে আমি যথার্থ বলে মনে করি না।
শ্রেণিকরণের মাধ্যমে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্তে জাগতিক বস্তু বা ঘটনাবলিকে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিন্যস্ত করা হয়। তবে অনেক সময় কয়েকটি শ্রেণির মধ্যে একই গুণ বিভিন্ন মাত্রায় বিদ্যমান থাকে। এ অবস্থায় সেই শ্রেণিগুলোকে আবার গুণের মাত্রা অনুসারে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। আর এভাবে শ্রেণিবিন্যাস করার প্রক্রিয়াই হচ্ছে ক্রমিক শ্রেণিকরণ।