মধ্যযুগ বলতে মূলত মুসলিম শাসন আমলকে বোঝানো হয়। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত বাংলায় প্রাচীন যুগ ছিল। তার বাংলা বিজয়ের মাধ্যমে মধ্যযুগের সূচনা হয় এবং ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে মধ্যযুগ বলে অভিহিত করা হয়। এরপর শুরু হয় আধুনিক যুগ।
বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের পর সুফি সাধকগণ ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য বাংলায় আসতে থাকেন। বাংলার সাধারণ মানুষ এ সময় ধর্মান্তরিত হওয়া শুরু করে। এভাবে বাংলায় একটি রূপান্তরিত! সমাজকাঠামো গড়ে ওঠে। এ যুগে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও আন্যান্য ধর্মের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করায় তাদের মধ্যে চিন্তার মিশ্রণ ঘটতে থাকে।
মূলত ইসলাম ও সনাতন ধর্মকে কেন্দ্র করেই মধ্যযুগে বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতি-নীতি গড়ে ওঠেছিল। এ সময় একই সঙ্গে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধসহ অন্যান্য লোকধর্মানুসারী মানুষেরা বসবাস করতেন। ফলে সমাজ-সংস্কৃতিতে তাদের চিন্তাধারার মিশ্রণ ঘটে।
বাংলায় মুসলমান শাসনামলে সুলতানগণ ছিলেন সমাজ জীবনে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী। জুমা ও ঈদের নামাজে খুতবা পাঠ মুসলমান শাসকের বিশেষ, দায়িত্ব ছিল। মুসলমান সমাজের নেতা হিসেবে শাসককে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হতো।
মুসলমান শাসকরা অভিজাত সম্প্রদায়ভুক্ত এবং জমকালো প্রাসাদে বাস করতেন। তাঁদের রাজধানীও নানারকম মনোমুগ্ধকর অট্টালিকায়, সুসজ্জিত থাকত। ঐশ্বর্য ও আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াও ব্রাজদরবারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জ্ঞানী ও গুণী ব্যক্তিদের সমাবেশ। শাসকগণ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সংস্কৃতির উদার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
মধ্যযুগে বাংলায় মুসলমান সমাজব্যবস্থায় উচ্চ, মধ্যম ও নিম্ন-এই তিনটি পৃথক শ্রেণির অস্তিত্ব ছিল। তবে তাদের মধ্যে কোনো বৈষম্য ছিল না। নিম্নশ্রেণির সরকারি কর্মচারীদের নিয়ে মধ্যবিত্ত এবং কৃষক, তাঁতি ও অন্যান্য শ্রেণি নিয়ে তৃতীয় শ্রেণি গঠিত ছিল।
১৩-১৮ শতকের বাংলার মুসলমান সমাজে একটি অভিজাত সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিল। যোগ্যতা, প্রতিভা ও জ্ঞানের দ্বারা তারা নিজেদের সাধারণ মানুষের তুলনায় একটি আলাদা শ্রেণি হিসেবে গড়ে তুলেছিল। তারা শাসকের পাশাপাশি থাকতেন এবং সমাজে প্রভাব বিস্তারে সক্ষম ছিলেন।
উলেমাগণ ইসলামি শিক্ষায় অভিজ্ঞ ছিলেন। তারা মানুষের ইসলামি চিন্তাধারার ব্যাখ্যা দিতেন এবং তাদের মধ্যে ধর্মীয় চেতনা জাগ্রত করে তুলতেন। তারা মানুষকে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিষয়ে শিক্ষা দিতেন। এভাবে মধ্যযুগে বাংলায় মুসলমান সমাজের অগ্রগতির ক্ষেত্রে উলেমাগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
সুফি ও দরবেশগণ ধর্মশাস্ত্রে সুপণ্ডিত ছিলেন। তারা সবসময় আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন থাকতেন। বাংলায় মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ধর্মীয় ভাব সঞ্চারে তাদের অপরিসীম অবদান ছিল। তাছাড়া সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে শাসকগণও তাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। এ কারণে মুসলমান সমাজে সুফি ও দরবেশদের প্রভাব ছিল।
মধ্যযুগে অভিজাত মুসলমানরা ছিল ভোজনবিলাসী। তাদের খাদ্য তালিকায় বিভিন্ন মাছ-মাংসের সঙ্গে আচারের নামও পাওয়া যায়। এসব খাবারের পাশাপাশি কাবাব, রেজালা, কোর্মা আর ঘিয়ে রান্না করা যাবতীয় মুখরোচক খাবার জায়গা করে নেয়। ভাত, মাছ, শাক-সবজি বাঙালি মুসলমানদের প্রতিদিনের খাদ্য ছিল। খাদ্য হিসেবে রুটির ব্যবহারের কথাও জানা যায়। খিচুড়ি তখনকার সমাজে একটি প্রিয় খাদ্য ছিল।
মধ্যযুগে অভিজাত মুসলমানরা পায়জামা ও গোল গলাবন্ধসহ জামা পরতো। তাদের মাথায় থাকতো পাগড়ি, পায়ে থাকতো রেশম ও সোনার সুতার কাজ করা চামড়ার জুতা। মোল্লা ও মৌলবিরাও পায়জামা, জামা এবং টুপি ব্যবহার করত। গরিব বা নিম্ন শ্রেণির মুসলমানরা লুঙ্গি ও টুপি পরতো। অভিজাত মহিলারা কামিজ ও সালোয়ার ব্যবহার করতো। তারা বাহু-ও কব্জিতে সোনার অলংকার ∎ এবং আঙুলে সোনার আংটি পরতো
হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথায় বিভিন্ন বর্ণের মধ্যে যে বৈষম্য করা হতো তাকে বর্ণবৈষম্য বলা হয়। বিভিন্ন পেশাকে ভিত্তি করেই বর্ণের সৃষ্টি। ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈশ্য ও শূদ্র এ চারটি উল্লেখযোগ্য বর্ণ ছিল সমাজে। এ চারটি বর্ণের মধ্যে সামাজিক মেলামেশা ছিল না।
মধ্যযুগে বাংলার হিন্দু সমাজে নারীদের তেমন অধিকার ছিল না। স্ত্রী স্বামীর, পিতামাতা ও সন্তানের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বহু বিবাহ প্রথা প্রচলিত ছিল। পিতা ও স্বামীর সম্পত্তির ওপর তাদের কোনো অধিকার ছিল না। সতীদাহ প্রথা বিদ্যমান ছিল। তবে শিল্প, সংস্কৃতি ও বাদ্যযন্ত্রে অনেক মহিলা পারদর্শি ছিল।
'সতীদাহ প্রথা' হিন্দু সমাজের একটি প্রথা। এটি বহু আগে হিন্দু সমাজের প্রচলিত ছিল। সতীদাহ প্রথা হলো- মৃত স্বামীর সাথে জীবন্ত স্ত্রীকেও স্বামীর, চিতার আগুনে পুড়িয়ে মারা। এটি একটি অমানবিক প্রথা। ঐ সময়ে এটি ধর্মের আচার হিসেবে স্বীকৃত ছিল।
মধ্যযুগে শাড়ি ছিল হিন্দু মেয়েদের নিত্যদিনের পোশাক। ধনী মহিলারা বক্ষবন্ধনী ও ওড়না ব্যবহার করত। অলঙ্কার হিসেবে মহিলারা আংটি, হার, নাকপাশা, দুল, সোনার ব্রেসলেট সোনার শাখা, কানবালা প্রভৃতি ব্যবহার করত। বিবাহিত মহিলারা সিঁদুর, কাজল, চন্দন মিশ্রিত কস্তুরী প্রভৃতি ব্যবহার করত।
মধ্যযুগে হিন্দু সমাজে কৌলিন্য প্রথা প্রচলিত ছিল। এ প্রথার কারণে সমাজে নানা রকম অনাচার প্রবেশ করে। ব্রাহ্মণ, বৈদ্য কায়স্থদের মধ্যে এ প্রথার বেশি প্রচলন ছিল। কৌলিন্য প্রথার কারণে তাঁরা বংশমর্যাদার দোহাই দিয়ে এক বংশে ছেলে বা মেয়ের সাথে অন্য বংশের ছেলে বা মেয়ের বিয়ে দিত না। এ কারণে তৎকালীন সমাজে বহু বিবাহ প্রথা প্রচলিত হয়।
মধ্যযুগের বাংলায় উৎপন্ন ফসলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ধান, গম, তুলা, ইক্ষু, পাট, আদা, তেল, সিম, ডাল ইত্যাদি। কৃষিজাত দ্রব্যের মধ্যে পিয়াজ, রসুন, হলুদ, শসা প্রভৃতি ছিল উল্লেখযোগ্য। আম, কাঁঠাল, কলা, লিচু, পেঁপে, পেয়ারা, বরই ইত্যাদি ফলসমূহও উৎপন্ন হতো প্রচুর পরিমাণে। এছাড়াও পান, সুপারি ও নারিকেল উৎপন্ন হতো।
জমি বরাদ্দ করা হতো ধর্মপরায়ণ ও শিক্ষিত ব্যক্তিদের জন্য। সমাজে তাদের যথেষ্ট প্রভাব ও শ্রদ্ধা ছিল। শুধু জনসাধারণ নয়, শাসকগণও তাদেরকে বিশেষ শ্রদ্ধা করতেন। ধর্মপরায়ণ ও শিক্ষিত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে তাদের ভাতা ও জমি বরাদ্দ দেওয়া হতো।
মধ্যযুগে বাংলায় কৃষি ফলনের প্রাচুর্য থাকলেও এ সময়ের চাষাবাদ ছিল অনুন্নত। আধুনিক সময়ের মতো পানিসেচ ব্যবস্থা ছিল 'না বলে কৃষকদের অধিকাংশ সময়ই সেচের জন্য বৃষ্টির ওপর নির্ভর করতে হতো। খরার বিরুদ্ধে তাদের করার কিছুই ছিল না।
মধ্যযুগে বাংলার বস্ত্র শিল্প ছিল অনেক উন্নত। এদেশে নির্মিত বস্ত্রগুলো গুণ ও মানের বিচারে যথেষ্ট উন্নত ছিল। তাই বিদেশে এ বস্ত্রের প্রচুর চাহিদা ছিল। বিশ্বখ্যাত মসলিন কাপড় তৈরি হতো এদেশে। 'মসলিন কাপড় এতই সূক্ষ্ম ছিল যে, একটি নস্যের ডিবায় ২০ গজ কাপড় ভরে রাখা যেত। ইউরোপে এ কাপড়ের প্রচুর চাহিদা ছিল।
মধ্যযুগে বাংলার রকমারি ক্ষুদ্রশিল্পের কথা জানা যায়। এ প্রসঙ্গে ধাতব শিল্পের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তখন লৌহ নির্মিত দ্রব্যাদির ব্যাপক প্রচলন ছিল। কর্মকারগণ বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি নির্মাণ করত। এছাড়া দু'ধারী তরবারি, ছুরি, কাঁচি, কোদাল ইত্যাদি নিত্যব্যবহার্য ধাতব দ্রব্য তৈরি হতো। কাগজ, গালিচা, ইস্পাত প্রভৃতি . শিল্পের কথাও জানা যায়।
মধ্যযুগে বাংলার রপ্তানিকৃত পণ্যের মধ্যে সুতি কাপড়, মসলিন, রেশমি বস্ত্র, চাল, গুড়, আদা, তামাক, সুপারি, পান, লবণ, গালা, আফিম, নানা রকম মশলা, ঔষধ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য ছিল। বাংলায় কৃষি ও শিল্প পণ্যের প্রাচুর্য ও বিদেশে এগুলোর ব্যাপক চাহিদা থাকার কারণে বিদেশের সাথে বাংলার বাণিজ্যিক তৎপরতা প্রসার লাড় করেছিল।
প্রাচীন বাংলায় খুব অল্প পরিমাণ দ্রব্য আমদানি করা হতো। বাংলার কাপড়ের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় কাঁচামাল হিসেবে তুলা আমদানি করা হতো। বাঙালি বণিকেরা গুজরাট থেকে আমদানি করত তুলা, চীন থেকে রেশম, ইরান থেকে শৌখিন দ্রব্য। এছাড়া বাংলায় আমদানি করা হতো স্বর্ণ, রৌপ্য ও মূল্যবান পাথর।
মধ্যযুগে বাংলায় বেশ কিছু সমুদ্রবন্দর ও নদীবন্দর গড়ে ওঠেছিল। চট্টগ্রাম ছিল তখনকার বিখ্যাত সমুদ্রবন্দর। উড়িষ্যা, সোনারগাঁ, গৌড়, বাকলা (বরিশাল), মুর্শিদাবাদ, কাশিমবাজার, হুগলি, বিহারের পাটনা ও উড়িষ্যার পিপলী উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যবন্দর ছিল।
মধ্যযুগে বাংলার ব্যবসায় বাণিজ্য বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে দ্রব্য ও টাকা-পয়সার লেনদেন এবং হিসাব-নিকাশ বৃদ্ধি পায়। তাই ক্রমে ব্যাংকিং প্রথার বিকাশ ঘটে। সমগ্র মধ্যযুগ বাংলার ব্যবসায় বাণিজ্যের এরূপ ক্রমশ বৃদ্ধির ফলে অর্থের লেনদেন ও হিসাব-নিকাশের কারণেই বাংলার ব্যাংকিং প্রথার বিকাশ ঘটে।
মধ্যযুগে বাংলায় ব্যবসায় বাণিজ্য ও অন্যান্য অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মুসলমানদের চেয়ে হিন্দুদের প্রাধান্য বেশি ছিল। কারণ মুসলমানরা ব্যবসায় বাণিজ্যের চেয়ে চাকরি এবং উচ্চ রাজপদের প্রতি বেশি আগ্রহী ছিল। এ জন্যই মধ্যযুগে হিন্দুরা ব্যবসায় বাণিজ্যে একচেটিয়া অধিকার বিস্তার করেছিল।
মুসলমান শাসকগণ ইসলামের গৌরবকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে এবং নিজেদের রাজ্য জয় ও শাসনকালকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রাসাদ, মসজিদ, দরগাহ, কবর প্রভৃতি নির্মাণ করেছিলেন। তাছাড়া মুসলমান শাসকগণ মসজিদ নির্মাণকে অতিশয় পুণ্যের কাজ বলে বিবেচনা করতেন।
মধ্যযুগে বাংলার সুলতানদের রাজধানী প্রথমে ছিল গৌড়, পরে পান্ডুয়া এবং এরপর আবার গৌড়। কাজেই এ দুই শহরেই মুসলিম ঐতিহ্যের স্থাপত্য নিদর্শন গড়ে উঠেছিল। ১৩৬৯ সালে সুলতান সিকান্দার শাহ 'আদিনা মসজিদ' নির্মাণ করেন। এ মসজিদের উত্তর পাশে সিকান্দার শাহের কবর নির্মিত হয়েছিল।
বর্তমান ঢাকা থেকে ১৫ মাইল পূর্বে সোনারগাঁয়ে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের একটি কবর আছে। এ কবরের অতি নিকটে পাঁচটি দরগাহ ও পাঁচটি মসজিদ আছে। এগুলো 'পাঁচ পিরের দরগাহ' নামে পরিচিত। সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সমাধি স্থাপত্যকলার একটি সুন্দর নিদর্শন।
একলাখি একটি মসজিদের নাম। প্রবাদ আছে যে তখনকার দিনে এক লাখ টাকা ব্যয় করে এটি নির্মিত হয়েছিল। এর নির্মাণ কাল ১৪১৮-১৪২৩ খ্রিস্টাব্দ তাই এটি একলাখি মসজিদ নামে পরিচিত। মসজিদ নামে পরিচিত হলেও এটি মূলত সুলতান জালালউদ্দিন ও তার স্ত্রী-পুত্রদের কবর।
গৌড় শহরের দক্ষিণ প্রান্তে বর্তমান ফিরোজাবাদ গ্রামে 'ছোট সোনা মসজিদ' নির্মিত হয়েছিল। এ মসজিদটি ছিল আকারে ছোট। তবে এ মসজিদেও সোনালি রঙের গিলটির কারুকার্য ছিল। সম্ভবত এ কারণেই এটি ছোট সোনা মসজিদ নামে পরিচিত। হুসেন শাহের আমলে জনৈক ওয়ালি মুহাম্মদ এটির নির্মাতা ছিলেন।
মহানবি (স.)-এর পদচিহ্নের জন্য কদম রসুল বিখ্যাত। কদম রসুল গৌড়ে অবস্থিত। নসরত শাহ মহানবির পদচিহ্নের প্রতি সম্মান। প্রদর্শনের জন্য ১৬৩১ খ্রিস্টাব্দে এ ভবনটি নির্মাণ করেন। এ ভবনের এক কক্ষে একটি কালো কারুকার্যখচিত মর্মর বেদীর উপরে হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর পদচিহ্ন সংবলিত একখণ্ড প্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল।
ঢাকা জেলার রামপালে 'বাবা আদমের মসজিদ' অবস্থিত। ১৪৮৩ সালে মালিক কাফুর ফতেহ শাহের রাজত্বকালে এটি নির্মিত হয়। এগুলোর বাইরেও বাংলার নানা স্থানে বহু মসজিদ ও সমাধিসৌধ আছে।
কাটরা' বলতে দালানকে বোঝানো হয়েছে। মুঘল যুগে কাটরা নামে বেশ কয়েকটি দালান তৈরি করা হয়েছিল। এ কাটরাগুলো মূলত ছিল অতিথিশালা। ঢাকার 'বড় কাটরা' নির্মাণ করেন শাহ সুজা। যা চক বাজারের দক্ষিণ দিকে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত।
মুঘল আমলে বাংলার শাসকগণ শিল্পকলার ক্ষেত্রে এক বিস্ময়কর অবদান রেখে গেছেন। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বহু মসজিদ, সমাধি ভবন, স্মৃতিসৌধ, মাজার, দুর্গ, স্তম্ভ ও তোরণ নির্মিত হয়েছিল। স্থাপত্যশিল্পের বিকাশের জন্য এ যুগকে বাংলায় মুঘলদের 'স্বর্ণযুগ' হিসেবে অভিহিত করা হয়।
সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সমাধি 'পাঁচ পিরের দরগাহ' নামে পরিচিত। এটি ঢাকা হতে ১৫ মাইল দূরে সোনারগাঁওয়ে অবস্থিত। আজম শাহের কবরের অতি নিকটে পাঁচটি দরগাহ ও পাঁচটি মসজিদ আছে। এগুলো একত্রে 'পাঁচ পিরের দরগাহ' নামে খ্যাত যা স্থাপত্যকলার একটি অনন্য নিদর্শন।
প্রাচীন বাংলায় বৌদ্ধ ধর্ম একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে। আছে। পাল রাজাদের সুদীর্ঘ চারশ বছরের রাজত্বকালে তাদের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা-বিহার ছাড়িয়ে এ ধর্ম আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল।
মধ্যযুগের হিন্দুরা বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করত। এর মধ্যে লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ, শিব, শিবলিঙ্গ, চন্ডী, মনসা, বিষ্ণু, কৃষ্ণ, সূর্য, মদন, নারায়ণ, ব্রহ্ম, অগ্নি, শীতলা, ষষ্ঠী, গঙ্গা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তারা দোলযাত্রা, রথযাত্রা, হোলি ইত্যাদি ধর্মীয় উৎসব পালন করত।
মুসলমানরা বর্তমান সময়ের মতোই মধ্যযুগেও বিভিন্ন ধর্মীয় রীতি-নীতি ও আচার-অনুষ্ঠান পালন করত। ঈদ-উল-ফিতর ও ঈদ-উল-আজহা মুসলমান সমাজের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হিসেবে পালিত হতো। মুসলমানরা রমজান মাসে রোজা রাখতো। এছাড়াও শব-ই-বরাত ও শব-ই-কদর পালন করত।
বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলায় মুসলমান শাসনের শুরু হয়। মুসলমানদের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মের লোক বসবাস করার সময় অনেকে ইসলাম ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। বাংলার হিন্দু ও বৌদ্ধ সমাজের এক বিরাট অংশ ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়। কিন্তু ধর্মান্তরিত ব্যক্তিরা পূর্বের ধর্মের অনেক বিশ্বাস ও সংস্কার ত্যাগ করতে পারে নি। আর এভাবেই হিন্দু সমাজের 'গুরুবাদ' মুসলমান সমাজে প্রবেশ করে।
বাংলার মুসলমান শাসকগণের ভাষা ছিল ফারসি। বাংলা ভাষার প্রতি তাদের উদার মনোভাব থাকলেও ফারসি ভাষাকে তারা অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। এ কারণে ফারসি ভাষা প্রায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদা লাভকরেছিল। নবাব ও অভিজাতগণ ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের - উৎসাহদাতা ছিলেন।
মৃধ্যযুগের কবি কানাহরি দত্ত যিনি 'শূন্য পুরাণ' কাব্য রচনা করেন। তাছাড়া চন্ডিদাস রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলী, কৃত্তিবাস 'বাংলা রামায়ণ' মালাধর বসু 'শ্রীকৃষ্ণ বিজয়' কাব্য রচনা করেন। এ যুগের আরও. বিখ্যাত কবি ও লেখকগণ হলেন- কবিন্দ্র পরমেশ্বর, রূপ গোস্বামী, সনাতন গোস্বামী, বিজয়গুপ্ত বিপ্রদাস, যশোরাজ খাঁন প্রমুখ।
মধ্যযুগে শিক্ষার দ্বার হিন্দু-মুসলমান সকলের জন্য উন্মুক্ত ছিল। শেখদের খানকাহ্ ও উলেমাদের গৃহশিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠেছিল। মুসলমান শাসনের সময় বাংলার বিভিন্ন স্থানে মসজিদের সঙ্গেই মক্তব ও মাদ্রাসা ছিল। মক্তব ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করত। বালক-বালিকারা একত্রে মক্তব ও পাঠশালায় লেখাপড়া করত।
মধ্যযুগে হিন্দুসমাজের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষার ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণদের একচেটিয়া অধিকার ছিল। মধ্যযুগে সমাজের সকল শ্রেণির জন্য শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত হয়। পাঠশালায় হিন্দু বালক-বালিকারা প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করতো। ছয় বছর বয়স পর্যন্ত পাঠশালায় শিক্ষা গ্রহণ করতে হতো।
মধ্যযুগে শিক্ষার দ্বার হিন্দু-মুসলমান সকলের জন্য উন্মুক্ত ছিল। শেখদের খানকাহ্ ও উলেমাদের গৃহশিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল। মুসলমান শাসনের সময় রাংলার বিভিন্ন স্থানে মসজিদের সঙ্গেই মক্তব ও মাদ্রাসা ছিল। মক্তব ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করত। ছয় বছর বয়স পর্যন্ত পাঠশালায় শিক্ষা গ্রহণ করতে হতো
মধ্যযুগ বলতে মুসলিম শাসনামলকে বোঝায়।
এগারো শতক থেকে বাংলায় সুফি-সাধকরা আসতে থাকে।
মধ্যযুগে বাংলার মুসলিম সমাজে সর্বোচ্চ আসনে ছিলেন সুলতান।.
উলেমাগণের মধ্য থেকে কাজি, ইমাম, মুয়াজ্জিন নিয়োগ করা হতো
১৩-১৮ শতকের বাংলার মুসলিম সমাজে অভিজাত সম্প্রদায় গড়ে ওঠে।
অভিজাত সম্প্রদায়রা।
মুসলমান নবজাতক শিশুর নামকরণকে কেন্দ্র করে বিশেষ অনুষ্ঠান পালন করাকে আকিকা বলা হয়।
ভাত, মাছ, শাক-সবজি মধ্যযুগে মুসলমানদের প্রতিদিনের খাঁদ্য ছিল।
মধ্যযুগের বাংলায় মুসলমান সমাজ ব্যবস্থায় তিনটি শ্রেণির অস্তিত্ব ছিল।
উলেমাগণ ইসলামি শিক্ষায় অভিজ্ঞ ছিলেন।
কৃষক, তাঁতি এবং বিভিন্ন শ্রমিকদের নিয়ে তৃতীয় শ্রেণি গঠিত ছিল।
খানা' মুসলমান সমাজের একটি অতি পরিচিত সামাজিক প্রথা।
হিন্দু সমাজের 'পুরুবাদ' মুসলমান সমাজে প্রবেশ করে।
অভিজাত ব্যক্তিগণ চৌগান খেলতে পছন্দ করতেন।
হিন্দু সমাজে প্রচলিত জাতিভেদ প্রথাই হচ্ছে বর্ণ প্রথা।
মধ্যযুগে হিন্দু সমাজে চারটি বর্ণ ছিল। যথা- ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র।
কৌলিন্য প্রথার ফলে সমাজে বহুবিবাহ প্রথা প্রচলিত হয়।
মধ্যযুগে হিন্দুদের নিকট চরম অধর্ম হিসেবে বিবেচিত হতো গো-মাংস ভক্ষণ।
হিন্দু শিশুর কোষ্ঠি গণনা করতেন ব্রাহ্মণ।
ধর্মকর্মের ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণদের একক কর্তৃত্ব ছিল।
সন্তান জন্মের পর তাকে গঙ্গাজল দিয়ে ধৌত করা হতো।
বিত্তশালী পরিবারে নিয়মিত শিল্প ও সংস্কৃতির চর্চা হতো।
ধর্মপ্রাণ হিন্দুদের নিকট গঙ্গার জল অত্যন্ত পবিত্র-।
কৃষি বাংলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল উৎস ছিল।
মুসলমান শাসনের সময় হতেই বাংলায় পাট ও রেশমের চাষ শুরু হয়।
ঢাকা মসলিন নামক বিশ্বখ্যাত সূক্ষ্মা বস্ত্র শিল্পের প্রধান প্রাণকেন্দ্র ছিল।
ঢাকার শাখারিপট্টি আজও শঙ্খ শিল্পের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
আরবীয় ও পারসিক বণিকদের নৌ-বাণিজ্যে একচেটিয়া কর্তৃত্ব ছিল
চৌদ্দ শতকে মরক্কোর বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা বাংলাদেশে ভ্রমণে আসেন
মসজিদ নির্মাণকে মুসলমান শাসকগণ অতিশয় পুণ্যের কাজ - বলে বিবেচনা করতেন।
আদিনা মসজিদ নির্মাণ করেন সুলতান সিকাদ্দার শাহ।
সোনারগাঁওয়ে সুলতান গিয়াসউদ্দিনের কবর আছে
বড় সোনা মসজিদের অপর নাম 'বারদুয়ারী মসজিদ'।
বাগেরহাট জেলায় খানজাহান আলীর সমাধি নির্মিত হয়েছে।
বাগেরহাট জেলায় খানজাহান আলীর সমাধি নির্মিত হয়েছে।
১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দে খানজাহান আলীর মৃত্যু হয়।
ষাট গম্বুজ মসজিদ বাগেরহাট জেলায় অবস্থিত
ষাট গম্বুজ মসজিদ বাগেরহাট জেলায় অবস্থিত।
কদম রসুল গৌড়ে অবস্থিত।
কদম রসুল নসরত শাহ নির্মাণ করেছিলেন।
মহানবি (সা.)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য 'কদম রসুল' ভবনটি নির্মিত হয়। 'কদম রসুল' ভবনটি গৌড়ে অবস্থিত। এ ভবনের এক কক্ষে একটি কালো কারুকার্যখচিত মর্মর বেদির উপর মুহাম্মদ (সা.)-এর পদচিহ্ন সংবলিত একখণ্ড প্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল।
বাবা আদমের মসজিদ ঢাকার রামপালে অবস্থিত।
বাবা আদমের মসজিদ মালিক কাফুর ফতেহ শাহের রাজত্বকালে নির্মিত।
দাখিল দরওয়াজা নির্মাণ করেন রুকনউদ্দিন বরবক শাহ।
মুঘল যুগে 'কাটরা' নামে বেশ কয়েকটি দালান তৈরি করা হয়েছিল।
ঢাকার বড় কাটরা শাহ সুজা নির্মাণ করেন।
হাজিগঞ্জ দুর্গের বর্তমান নাম খিজিরপুর দুর্গ।
সুবাদার শাহজাদা আজমের আমলে লালবাগের শাহী মসজিদ তৈরি হয়।
লালবাগ দুর্গের ভেতর শায়েস্তা খানের কন্যা পরি বিবির সমাধিসৌধ রয়েছে।
১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে শায়েস্তা খান ছোট কাটরা নির্মাণ করেন।
ঢাকার হোসেনী দালান তৈরি করেন শায়েস্তা খান।
১৬৭৬ খ্রিস্টাব্দে শায়েস্তা খান হোসেনী দালান নির্মাণ করেন।
চেহেল সেতুন হলো চল্লিশ খিলানবিশিষ্ট একটি প্রাসাদ।
বেগম বাজার মসজিদ মুর্শিদ কুলী খানের আমলে নির্মিত হয়।
পূর্বের দেব-দেবীর পরিবর্তে পুরাণ ও মহাকাব্য বর্ণিত দেব-দেবীর পুজাকে পৌরাণিক ধর্ম বলা হয়।
হিন্দুরা দেব-দেবীর পূজা করত।
হিন্দুদের নিকট গঙ্গাজল অত্যন্ত পবিত্র ছিল।
ব্রাহ্মণরা প্রাচীন বাংলার হিন্দু সমাজে সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের অধিকারী ছিল।
মুসলিম সমাজের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদ-উল-ফিতর ও ঈদ-উল-আজহা।
: শিয়া সম্প্রদায়ের প্রিয় উৎসব শহরম উৎসব।
বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক ছিলেন গৌতম বুদ্ধ।
বাংলা সাহিত্যের জন্ম চর্যাপদ থেকে হয়েছে।
মুসলমান কবি-সাহিত্যিকগণ বহু আরবি ও ফার্সি শব্দ বাংলা ভাষায় ব্যবহার করেছেন। আল্লাহ, খোদা, নবি, পয়গম্বর, কিতাব প্রভৃতি শব্দ সে সময়ের কবি-লেখকদের ব্যবহারের ফলে বাংলা শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ হয়েছে।
ইউসুফ-জোলেখা' কাব্য রচনা করেন শাহ মুহম্মদ সগীর।
ইলিয়াস শাহী বংশের সুলতান গিয়াসউদ্দিন আযম শাহের শাসনকালে 'ইউসুফ-জোলেখা' কাব্য রচনা করা হয়।
কবিন্দ্র পরমেশ্বর 'মহাভারত' বাংলায় অনুবাদ করেন।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম পদাবলি কাব্যের স্রষ্টা ছিলেন চাঁদ কাজী।
বাংলা সাহিত্যে সংগীতবিদ্যার ওপর রচিত প্রথম গ্রন্থ 'রাগমালা'।
শূন্য পুরাণ' কাব্যের রচয়িতা ছিলেন কানাহরি দত্ত।
পদ্মাবতী' কাব্য গ্রন্থের রচয়িতা আলাওল।
দৌলত কাজী আরাকান রাজসভার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ছিলেন।
মুসলিম শাসনে মধ্যযুগে বাংলায় যেখানে উচ্চ শিক্ষা প্রদানকরা হতো তাকে টোল বলা হয়।
সেন বংশের পতন এবং ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির বঙ্গ বিজয়ের মাধ্যমে বাংলার রাজক্ষমতা মুসলমানদের অধিকারে আসে । ফলে বাংলায় মধ্যযুগের সূচনা ঘটে। মুসলমানদের আগমনের পূর্বে বাংলায় বাস করত হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষ । এগারো শতক থেকে বাংলায় ইসলাম ধর্ম প্রচার করার জন্য সুফি সাধকগণ আসতে থাকেন । বাংলার সাধারণ হিন্দু ও বৌদ্ধদের অনেকে এ সময় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে । এভাবে ধীরে ধীরে বাংলায় একটি মুসলমান সমাজ কাঠামো গড়ে উঠতে থাকে । এ যুগে বাংলায় হিন্দু আর মুসলমান পাশাপাশি বাস করছিল । ফলে একে অন্যের চিন্তা-ভাবনা ও আচার-আচরণের মিশ্রণ ঘটতে থাকে । এভাবে বাংলায় যে সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল, তাকেই বলা হয় বাঙালি সংস্কৃতি ।
এই অধ্যায় শেষে আমরা-
- মধ্যযুগে বাংলার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনে সুলতান ও মুঘল শাসকগণের অবদান ব্যাখ্যা করতে পারব;
- মধ্যযুগে বাংলার ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রসার এবং স্থাপত্য ও চিত্রকলার বিকাশে সুলতান ও মুঘল শাসকগণের অবদান মূল্যায়ন করতে পারব;
- মধ্যযুগে সুলতানি ও মুঘল শাসনামলে বাংলার ধর্মীয় অবস্থা বর্ণনা করতে পারব;
- মধ্যযুগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উদ্ভব ও বিকাশে সুলতান ও মুঘল শাসকগণের অবদান চিহ্নিত করতে পারব;
- মধ্যযুগে বাংলায় মুসলমানদের আগমনের ফলে বাঙালি জীবনপ্রণালি ও চিন্তাধারার ইতিবাচক পরিবর্তনসমূহ উপলব্ধিতে সক্ষম হব;
- সুলতানি ও মুঘল আমলের অবদান ও স্থাপত্য নিদর্শনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন করে পরিদর্শনে আগ্রহী হব।
Related Question
View Allকবীন্দ্র পরমেশ্বর মহাভারত বাংলায় অনুবাদ করেন।
বাংলার মাটিতে কৃষিজাত দ্রব্যের প্রাচুর্য ছিল। বাংলার কৃষিভূমি অস্বাভাবিক উর্বর হওয়ায় এখানে ধান, গম, পাট, আদা, পিঁয়াজ, তেল, সরিষা, পান, সুপারি, রেশম, ডাল, আম, কাঁঠাল ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হতো। ফলে উদ্বৃত্ত বিভিন্ন পণ্য বিদেশে রপ্তানি করা হতো। এর ফলে বাংলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ঘটেছিল।
রেজা সাহেবের বাড়ির খাওয়া-দাওয়ার সঙ্গে বাংলার সুলতানি আমলের মিল রয়েছে।
সুলতানি আমলে বাংলার অভিজাতরা ভোজনবিলাসী ছিলেন। তাদের খাদ্য তালিকায় ছিল মাছ, মাংস, শাক, সবজি, দুধ, দধি, ঘৃত, ক্ষীর ইত্যাদি। এছাড়াও তাদের খাদ্য তালিকায় আচারের নামও পাওয়া যায়। এসব খাবারের পাশাপাশি কাবাব, রেজালা, কোর্মা আর ঘিয়ে রান্না করা যাবতীয় মুখরোচক খাবার জায়গা করে নেয়। খাদ্য হিসেবে রুটির কথাও পাওয়া যায়। খিচুড়ি ছিল তখনকার সমাজের প্রধান খাদ্য।
উদ্দীপকে আমরা লক্ষ করি যে, রেজা সাহেব গত সপ্তাহে তার মেয়ের জন্মদিনে পোলাও, কাবাব, রেজালা ও মিষ্টির আয়োজন করেন। এ খাবারগুলোর সাথে বাংলার সুলতানি আমলের খাওয়া-দাওয়ার মিল বিদ্যমান।
রেজা সাহেবের অর্থনৈতিক অবস্থা সুলতানি আমলের চেয়ে সমৃদ্ধ ছিল না বলে আমি মনে করি।
সুলতানি আমলে বাংলায় অনেক কৃষিপণ্য উৎপন্ন হতো। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ধান, গম, পাট, রেশম, হলুদ, শশা, পিঁয়াজ, তুলা, আদা, জোয়ার, তিল, পান, সুপারি, আম, কাঁঠাল, কলা ইত্যাদি। ফলে উদ্বৃত্ত দ্রব্য বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হতো। এছাড়াও বস্ত্রশিল্পে বাংলার অগ্রগতি ছিল সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। এখানকার নির্মিত বস্ত্রগুলো গুণ ও মানের বিচারে যথেষ্ট উন্নত ছিল বিধায় বিদেশে এগুলোর প্রচুর চাহিদা ছিল। এদেশের মসলিন কাপড়ের প্রচুর চাহিদা ছিল ইউরোপের বাজারে।
এছাড়া সুলতানি আমলে বাংলার রপ্তানি পণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল, সুতি কাপড়, রেশমি বস্ত্র, চিনি, গুড়, আদা, লঙ্কা, লবণ, নানা প্রকার মসলা, আফিম, ঔষধ ইত্যাদি। বাংলায় আমদানি করা হতো স্বর্ণ, রৌপ্য ও মূল্যবান পাথর। ফলে রপ্তানি বেশি হওয়ার কারণে বাংলার অর্থনৈতিক প্রাচুর্য বজায় ছিল সুলতানি আমলে।
উদ্দীপকের রেজা সাহেবের আমদানি ও রপ্তানি দ্রব্যের পরিমাণ খুবই স্বল্প। তাই একথা বলা যায় যে, রেজা সাহেবের অর্থনৈতিক অবস্থার চেয়ে সুলতানি আমলের অর্থনৈতিক অবস্থা আরও সমৃদ্ধ ছিল।
সুবাদার শায়েস্তা খান হোসেনী দালান নির্মাণ করেন।
বাংলার বহু স্থানে আজও মুঘল শাসকদের শিল্প প্রীতির নিদর্শন রয়েছে। তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় বহু সংখ্যক মসজিদ, সমাধি ভবন, স্মৃতিসৌধ, মাজার, দুর্গ, স্তম্ভ ও তোরণ নির্মিত হয়েছিল। ফলে স্থাপত্য শিল্পের বিকাশের জন্য মধ্য যুগকে মুঘলদের 'স্বর্ণযুগ' হিসেবে অভিহিত করা হয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!