টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বলতে বিশ্বের সর্বজনীন কল্যাণ সাধনের লক্ষ্যে জাতিসংঘে ঘোষিত একগুচ্ছ লক্ষ্যমাত্রাকে বোঝায়। পরিবর্তনশীল বিশ্বের সমতা ও বৈষম্যহীন উন্নয়ন নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ একগুচ্ছ লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে যা টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট নামে পরিচিত।'
টেকসই উন্নয়নে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা পারস্পরিক অংশীদারিত্বের সূচনা করে। এঁতে যে দেশের যে ধরনের সক্ষমতা আছে সে দেশ সেভাবে নিজেদের ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সামষ্টিক উন্নয়ন, লক্ষ্যসমূহ অর্জনে এগিয়ে আসবে। এর ফলে উন্নয়ন জাতীয় ও বৈশ্বিকভাবে টেকসই হবে। এজন্য টেকসই উন্নয়নে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
টেকসই উন্নয়নের প্রধান একটি অভীষ্ট হচ্ছে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গড়ে তোলা। কাউকে পিছিয়ে রেখে অন্যরা এগিয়ে গেলে সেই উন্নয়ন জাতীয় ও বৈশ্বিকভাবে টেকসই হবে না। তাই যে দেশের যে ধরনের সক্ষমতা রয়েছে সে দেশ সেভাবে নিজেদের ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সামষ্টিক উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ অর্জনে এগিয়ে আসবে। এ বিষয়টিই হলো সার্বিক সক্ষমতা অর্জন।
SDG (এসডিজি) অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সমৃদ্ধশালী হতে পারবে বলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এসডিজি অর্জন করা গুরুত্বপূর্ণ। এসডিজি অর্জনের ফলে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের অবসান ঘটবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। নারী-পুরুষ বৈষম্য দূর হবে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, জ্ঞানচর্চার দ্বার উন্মোচিত হবে। যোগাযোগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নতির ফলে বিশ্বে বাস করার সকল সুযোগ-সুবিধা আমাদের দেবগোড়ায় পৌঁছে যাবে। ফলে আমরা সমৃদ্ধ ও উন্নত জাতিতে পরিণত হবো। এজন্য বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এসডিজি অর্জন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জন করতে পারলে আমাদের দেশের দারিদ্রদ্র্য শূন্যের কাছাকাছি চলে আসবে। মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ হবে। নারী-পুরুষ বৈষম্য দূর হবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। শিক্ষা ও সংস্কৃতির দ্বার উম্মোচিত হবে। অবাধ তথ্য প্রবাহ ও তথ্য অধিকার সংরক্ষিত হবে। যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির ফলে বিশ্বে বাস করার সকল সুযোগ-সুবিধা আমাদের দোরগোড়ায় পৌছে যাবে। ফলে আমরা সুখী ও সমৃদ্ধ জাতিতে পরিণত হতে পারব।
এসডিজি বাস্তবায়ন সমাজে জেন্ডার সমতাবিধান এবং নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে নারী নির্যাতন হ্রাসে ভূমিকা রাখবে। এসডিজি বাস্তবায়িত হলে সমাজে নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর হবে। নারী-পুরুষ উভয়েই দেশের উন্নয়নে অবদান রাখবে। ফলে জেন্ডার সমতা নিশ্চিত হবে এবং নারীর ক্ষমতায়ন ঘটবে। এতে সমাজে নারী নির্যাতন হ্রাস পাবে।
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায়। যেকোনো দেশেই নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী দল থাকতে পারে যারা জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণের পথে বাধার সৃষ্টি করে। ফলে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ যদি শক্তিশালী হয় তাহলে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় এড়ানো সম্ভব। এ কারণে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।
টেকসই উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সম্পদের অসম বণ্টন। পুরো পৃথিবীতে দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সম্পদের বৈষম্য বেড়েই চলেছে। সমাজের একশ্রেণির মানুষ অন্যায়ভাবে, সম্পদ কুক্ষিগত করছে। এতে অন্যরা দারিদ্র্যের কবলে পড়ছে এবং সমাজের তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্য। ধনী-গরিবের ক্রমবর্ধমান ব্যবধান দারিদ্র্যকে আরও প্রকট করে তুলছে। এ অবস্থা টেকসই উন্নয়নের পথে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
বর্তমানে পৃথিবীব্যাপী যে উন্নয়ন ঘটছে তা দেশে দেশে এবং মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টিকারী ও বিভেদ বর্ধনকারী উন্নয়ন। এই উন্নয়নের মাধ্যমে দিনে দিনে বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করছে। এই উন্নয়ন সর্বজনীন ও সুসম নয় বলে এ উন্নয়ন টেকসই হবে না। এজন্য এ উন্নয়নকে ভারসাম্যহীন উন্নয়ন বলা হয়।
আমাদের সমাজে একশ্রেণির মানুষ সম্পদ কুক্ষিগত করায় সম্পদ বৈষম্য বাড়ছে। সমাজের একশ্রেণির মানুষ ভূমি দখল, নদী দখল, বন দখল, এমনকি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান কুক্ষিগত করে অপরিমিত সম্পদশালী হয়েছে। পাশাপাশি তাদের আয়ও দ্রুত বেড়েছে। অন্যদিকে দরিদ্রদের আয় তেমন বাড়েনি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় অতি দরিদ্রদের আয় আরও কমেছে। এজন্য আমাদের সমাজে সম্পদ বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ছে।
আমাদের সমাজে একশ্রেণির মানুষ ভূমি দখল, নদী দখল, বন দখল এমনকি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান কুক্ষিগত করে অপরিমিত সম্পদশালী হয়েছে। এতে সমাজে ধনী ও দরিদ্রের সম্পদ বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে ভারসাম্যহীন সমাজ গড়ে উঠছে।
একটানা বৃষ্টি হলেই এদেশের বড় বড় শহরগুলোতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। তখন যান চলাচল ব্যাহত হয়। রাস্তাঘাটের ক্ষতি হয়। স্বল্প আয়ের লোকদের কাজ বন্ধ থাকে। অনেকেই ঠিকমতো স্কুল, কলেজ বা কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারে না। দোকান-পাট বন্ধ থাকে। রোগ-ব্যাধিরও প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এভাবে শহরের | জলাবদ্ধতা জনজীবনকে বাধাগ্রস্ত করে।
আমরা অনেকেই নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা-আবর্জনা না ফেলে যত্রতন্ত্র পলিথিন ব্যাগ, চিপসের প্যাকেট ইত্যাদি ফেলছি। এতে রাস্তার পাশের ড্রেনগুলো বন্ধ হয়ে পানি নির্গমন ঠিকমতো হচ্ছে না। যা জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে। এভাবে আমরা আমাদের শহরগুলো নষ্ট করে ফেলছি।
সকল ক্ষেত্রে আয় ও ভোগ, ধনী-দরিদ্র এবং জেন্ডার ও অঞ্চল বৈষম্য দূর করা জাতিসংঘের এসডিজি কর্মসূচির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। সম্পদের অসম বণ্টন এবং আয় বৈষম্যের কারণে দিন দিন ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বাড়ছে। জেন্ডার বৈষম্যের কারণে নারীরা তাদের অনেক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং পুরুষদের তুলনায় তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে। আবার আঞ্চলিক বৈষম্যের কারণে একটি দেশ উন্নত হচ্ছে এবং অন্য আরেকটি দেশ পিছিয়ে পড়ছে। তাই বলা যায়, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জন করা সম্ভব হলে সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য কমিয়ে আনা যাবে।
এসডিজি অর্জনে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয়গুলো হলো-
- সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে।
- সরকার ও অন্যান্য সকল অংশীজনকে সাথে নিয়ে সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে সম্পদ আহরণে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশের এসডিজি অর্জনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পথে যে সকল বৈষম্য দেখা যায় তার অন্যতম কারণ দরিদ্র্যতা। অর্থাৎ দারিদ্র্যতার কারণেই এসডিজি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভবপর হচ্ছে না। এজন্য দারিদ্রদ্র্যসীমা শূন্যের কাছাকাছি আনা প্রয়োজন।
Related Question
View Allজলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব দূর করতে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করাই হলো জলবায়ু কার্যক্রম।
জলবায়ু কার্যক্রম হলো 'টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট' এর ১৩তম লক্ষ্যমাত্রা।
সবার অংশীদারিত্ব ছাড়া কোনো উন্নয়ন টেকসই হয় না বলে টেকসই উন্নয়নে অংশীদারিত্ব প্রয়োজন।
অংশীদারিত্ব হলো কোনো উন্নয়ন কার্যক্রমে যার যা দায়িত্ব ও কর্তব্য তা পালন করা। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত, ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সমাজের সর্বস্তরের অংশগ্রহণসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অংশীদারিত্ব প্রয়োজন। কাউকে বাদ দিয়ে বা পিছিয়ে রেখে অন্যরা এগিয়ে গেলে সেই উন্নয়ন জাতীয় ও বৈশ্বিকভাবে টেকসই হবে না।
এজন্য টেকসই উন্নয়নে অংশীদারিত্ব প্রয়োজন
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!