জাতকের সংখ্যা ৫৫০টি।
একদা হিমালয়ের পাদদেশে অনাবৃষ্টিতে সব জল শুকিয়ে যায়। তৃষ্ণায় পশুপাখি সব কাতর হয়ে পড়লে ভিক্ষুর মায়া হলো। তিনি গাছের ডাল দিয়ে ডোঙ্গা তৈরি করে তা জলপূর্ণ করে দিলেন। বনের পশুপাখিরা সেই ডোঙ্গার জল খেয়ে প্রাণে রক্ষা পায়। এভাবে তিনি তৃষ্ণার্ত প্রাণীদের জন্য জলপানের ব্যবস্থা করেন।
শশক তার বন্ধুদের 'দান করা উচিত', 'উপোসথ পালন করা উচিত', 'শীল রক্ষা করা উচিত' এরূপ ধর্মোপদেশ দিতেন।
মশকটি বৃদ্ধের মাথায় হুল ফুটিয়ে রক্ত পান করছিল।
জাতক শব্দটি 'জাত' শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। 'জাত' শব্দের 'অর্থ হলো উৎপন্ন, উদ্ভূত, জন্ম ইত্যাদি। সুতরাং জাতক শব্দের অর্থ যিনি উৎপন্ন বা জন্ম লাভ করেনে। বৃদ্ধ যে বিভিন্ন জন্ম অতিক্রান্তে মাধ্যমে বুদ্ধ হয়ে ওঠেন সেই কাহিনিগুলোকে বলা হয় জাতক।
জন্ম-জন্মান্তরে গৌতম বুদ্ধ নানা কূলে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মানবকুলে রাজা, মন্ত্রী, ব্রাহ্মণ, বণিক, দেবকুলসহ পশুপাখি হয়ে জন্ম নিয়েছিলেন এবং প্রতিটি জন্মে বোধিসত্ত্ব নামে অভিহিত হন। আর এই বোধিসত্ত্বরূপে গৌতম বুদ্ধের জীবনবৃত্তান্ত ও ঘটনাবলিকে 'জাতক কাহিনি' বলা হয়।
সৎ ও সুন্দর পথে পরিচালিত জীবনই হলো আদর্শ জীবন। আদর্শবান ব্যক্তি সকলের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র। এমনকি মৃত্যুর পরও নীতিবান ও আদর্শবান ব্যক্তির কথা মানুষ যুগে যুগে স্মরণ করে। তাছাড়া নীতি-আদর্শহীন মানুষ পশুর সমান। তাই সকলের অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আদর্শ জীবন গঠন করা প্রয়োজন।
জাতকের গল্পগুলো হিতোপদেশমূলক। এখানে ভগবান বুদ্ধ ভালো কাজের সুফল এবং খারাপ কাজের কুফল বর্ণনা করেছেন। এর কাহিনিগুলো আমাদের শীলবান, দয়াবান, নীতিবান, সত্যবাদী, সংযত, পরোপকারী হতে শিক্ষা দেয়। অসৎ কাজ হতে দূরে রাখে, পরমতসহিষ্ণুতা হতে শিক্ষা দেয়। যা নৈতিক ও আদর্শ জীবন গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লোভে পড়ে কাক রান্নাঘরে মাংস খাওয়ার জন্য ছুটে যায়। যখনি সে হাঁড়ির উপর ঝাঁজরিতে বসে, তখন ঝাঁজরি মাটিতে পড়ে যায়। পাচক বুঝতে পেরে কাকটিকে ধরে ফেলে এবং সারা শরীরের পালক তুলে নিয়ে গায়ে আদা নুন মাখিয়ে দেয়। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে অবশেষে কাকটি মারা যায়।
শশকরূপী বোধিসত্ত্বের তিন বন্ধু ছিল। শিয়াল, বানর ও উদ্বিড়াল। চার বন্ধু গঙ্গার তীরে বাস করত। শশক ছিলেন খুব পণ্ডিত। অন্যরা সবাই তাকে মান্য করত। প্রতিদিন সন্ধ্যায় শশক বন্ধুদের ধর্মোপদেশ দিতেন- 'দান করা উচিত', 'শীল রক্ষা করা উচিত', 'উপোসথ পালন করা উচিত'।
শশকসহ তিন বন্ধু দানের সংকল্প নিলে সবাই দানের বস্তু সংগ্রহ করেন। কিন্তু বোধিসত্ত্ব চিন্তা করলেন, 'আমার খাবার তো ঘাস'। কিন্তু মানুষ তো ঘাস খায় না। তাই তিনি ভাবলেন, তাঁর কাছে কোনো যাচক উপস্থিত হলে তিনি নিজের শরীরের মাংস, পুড়িয়ে তা দিয়ে আপ্যায়ন করবেন এবং তিনি তাই করেছিলেন।
একবার হিমালয়ে ভয়ানক অনাবৃষ্টি দেখা দিলে তৃষ্ণায় পশুপাখি সব কাতর হয়ে পড়ে। পশুপাখির যন্ত্রণা দেখে ভিক্ষু একটা গাছ কেটে ডোঙ্গা তৈরি করে সেটি জলপূর্ণ করে পশুপাখিদের জল পানের ব্যবস্থা করে দিলেন। প্রতিদিন অসংখ্য প্রাণীকে জলদানের মাধ্যমে তিনি তাঁদের প্রাণ রক্ষা করেছিলেন।
মূর্খ ছেলে মশা মারতে গিয়ে নিজের পিতাকেই মেরে ফেলে।
তখন বোধিসত্ত্ব যে গাথা আবৃত্তি করেন-
বুদ্ধিমান শত্রু সেও মোর ভালো
নির্বোধ মিত্রে কী কাজ?
মশক মারিতে বধিল পিতারে
মহামূর্খ পুত্র আজ।
জাতকের উপদেশগুলো হতে নির্বুদ্ধিতা, কৃপণতা, অলসতা, অহংবোধ, ধূর্ততা ইত্যাদি বর্জনের নির্দেশ পাই। যা আমাদের অকুশল কর্ম পরিত্যাগ করে কুশলকর্ম করার প্রেরণা যোগায়। নৈতিক জীবন যাপন ও হিংসা ত্যাগ করে মৈত্রীপরায়ণ হওয়ার শিক্ষা প্রদান করে। আদর্শ মানুষ হতে শিক্ষা দেয়।
'জাত' শব্দের অর্থ হলো উৎপন্ন, উদ্ভূত, জন্ম ইত্যাদি।
জাতক শব্দের অর্থ যিনি উৎপন্ন বা জন্মলাভ করেছেন।
বুদ্ধ হওয়ার জন্য জন্ম-জন্মান্তরে পারমী পূর্ণ করে পরিশুদ্ধি অর্জন করতে হয়।
বোধিসত্ত্ব প্রতিটি জন্মে কুশলকর্ম সম্পাদন করতেন।
সৎ এবং সুন্দর পথে পরিচালিত জীবনই হলো আদর্শ জীবন।
প্রত্যেক জাতক প্রধানত তিনটি অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে বৃদ্ধ কোন প্রসঙ্গে কাহিনীটি বলেছেন তার বর্ণনা পাওয়া যায় এবং একে প্রত্যুৎপন্ন বস্তু বা বর্তমান কথা বলা হয়। দ্বিতীয় অংশ হচ্ছে প্রকৃত জাতক বা মূল আখ্যায়িকা বা গৌতম বুদ্ধের অতীত জন্মের কাহিনী বর্ণিত আছে, তাই এ অংশকে অতীত বস্তু বলা হয়। তৃতীয় অংশ হচ্ছে সমাধান এবং এ অংশে অতীত বস্তুতে বর্ণিত পাত্রপাত্রীর সাথে প্রত্যুৎপন্ন বস্তুতে বর্ণিত পাত্রপাত্রীর সম্পর্ক বা মিল দেখানো হয়।
সৎ ও সুন্দর পথে পরিচালিত জীবনই আদর্শ জীবন। জাতক কাহিনীগুলোর ধর্মের গভীর তত্ত্বগুলো বুঝতে সাহায্য করে। শীলবান বা চরিত্রবান, দয়াবান, নীতিবান, সত্যবাদী, ক্ষমাপরায়ণ, মৈত্রীপরায়ণ এবং পরোপকারী হতে শিক্ষা দেয় এবং প্রাণী হত্যা, মিথ্যা বলা, মাদকদ্রব্য গ্রহণ থেকে বিরত রাখে। কায়, বাক্য এবং মন সংযত করে ও সকল জীবের প্রতি মৈত্রী ভাবাপন্ন করে তোলে। তাই বলা যায়, নৈতিক এবং আদর্শ জীবন গঠনে জাতকের প্রভাব অপরিসীম।
ধূর্ত কাক মাংস খাওয়ার চেষ্টা করলে পাচক কাকের উদ্দেশ্য বুঝতে পারলে তাড়াতাড়ি রান্নাঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে কাকটিকে ধরে ফলে। একে একে সারা শরীরের পালক তুলে নিল। গায়ে আদা ও নুন মেখে দিল। তারপর তাকে ঝুড়ির মধ্যে ফেলে রাখল এবং যন্ত্রণায় কাক ছটফট করতে করতে মারা গেল। পাচক ঝুড়িসহ কাকটি ফেলে দিল। এ থেকে বোঝা যায়, 'লোভ পাপ, পাপে মৃত্যু হয়।'
একদিন এক কাক রান্নাঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রান্নার চমৎকার সুবাস পেল। সে উঁকি মেরে দেখল ভিতরে মাছ-মাংস রান্না হচ্ছে। লোভী কাক বাইরে বসে ভাবতে লাগল, কীভাবে ঐ মাছ-মাংস খাওয়া যায়। সন্ধ্যার সময় পায়রাকে রান্নাঘরে ঢুকতে দেখে ভাবল, পায়রাটির সাথে ভাব করেই উদ্দেশ্য সফল করতে হবে। তাই কাক পায়রার সাথে বন্ধুত্ব করল।
গৌতম বুদ্ধের অতীত জন্মের কাহিনিগুলো জাতক নামে পরিচিত। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে জাতকের গল্প ও উপদেশগুলোর প্রভাব অপরিসীম। জাতকের গল্পের শেষে যে উপদেশ থাকে, তা থেকে আমরা নৈতিক ও মানবিক গুণাবলি অর্জন করতে পারি। এছাড়া জাতক পাঠে প্রাচীন ভারতের মানুষের জীবনযাত্রা, ধর্ম, সমাজ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, ভূগোল, পরিবেশ, পুরাতত্ত্ব প্রভৃতি সম্পর্কেও জানা যায়। তাই জাতক পাঠের গুরুত্ব অপরিসীম। এ অধ্যায়ে আমরা জাতক সম্পর্কে পড়ব।
এ অধ্যায় শেষে আমরা-
- জাতক সম্পর্কে বর্ণনা দিতে পারব;
- জাতক কাহিনী বর্ণনা করতে পারব;
- জাতকের উপদেশ ব্যাখ্যা করতে পারব।
Related Question
View Allএকদা হিমালয়ের পাদদেশে অনাবৃষ্টিতে সব জল শুকিয়ে যায়। তৃষ্ণায় পশুপাখি সব কাতর হয়ে পড়লে ভিক্ষুর মায়া হলো। তিনি গাছের ডাল দিয়ে ডোঙ্গা তৈরি করে তা জলপূর্ণ করে দিলেন। বনের পশুপাখিরা সেই ডোঙ্গার জল খেয়ে প্রাণে রক্ষা পায়। এভাবে তিনি তৃষ্ণার্ত প্রাণীদের জন্য জলপানের ব্যবস্থা করেন।
শশক তার বন্ধুদের 'দান করা উচিত', 'উপোসথ পালন করা উচিত', 'শীল রক্ষা করা উচিত' এরূপ ধর্মোপদেশ দিতেন।
জাতক শব্দটি 'জাত' শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। 'জাত' শব্দের 'অর্থ হলো উৎপন্ন, উদ্ভূত, জন্ম ইত্যাদি। সুতরাং জাতক শব্দের অর্থ যিনি উৎপন্ন বা জন্ম লাভ করেনে। বৃদ্ধ যে বিভিন্ন জন্ম অতিক্রান্তে মাধ্যমে বুদ্ধ হয়ে ওঠেন সেই কাহিনিগুলোকে বলা হয় জাতক।
জন্ম-জন্মান্তরে গৌতম বুদ্ধ নানা কূলে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মানবকুলে রাজা, মন্ত্রী, ব্রাহ্মণ, বণিক, দেবকুলসহ পশুপাখি হয়ে জন্ম নিয়েছিলেন এবং প্রতিটি জন্মে বোধিসত্ত্ব নামে অভিহিত হন। আর এই বোধিসত্ত্বরূপে গৌতম বুদ্ধের জীবনবৃত্তান্ত ও ঘটনাবলিকে 'জাতক কাহিনি' বলা হয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!