গৌতম বুদ্ধের অতীত জন্মের কাহিনিগুলো জাতক নামে পরিচিত। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে জাতকের গল্প ও উপদেশগুলোর প্রভাব অপরিসীম। জাতকের গল্পের শেষে যে উপদেশ থাকে, তা থেকে আমরা নৈতিক ও মানবিক গুণাবলি অর্জন করতে পারি। এছাড়া জাতক পাঠে প্রাচীন ভারতের মানুষের জীবনযাত্রা, ধর্ম, সমাজ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, ভূগোল, পরিবেশ, পুরাতত্ত্ব প্রভৃতি সম্পর্কেও জানা যায়। তাই জাতক পাঠের গুরুত্ব অপরিসীম। এ অধ্যায়ে আমরা জাতক সম্পর্কে পড়ব।
এ অধ্যায় শেষে আমরা-
- জাতক সম্পর্কে বর্ণনা দিতে পারব;
- জাতক কাহিনী বর্ণনা করতে পারব;
- জাতকের উপদেশ ব্যাখ্যা করতে পারব।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
মাধবন একটি জাতক পড়ে শীলবন ব্যক্তির সর্বত্র পূজিত হওয়ার ঘটনাটি জানতে পারে। জাতকটি মাধবনকে দান দেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহী করে।
জাতক শব্দটি 'জাত' শব্দ হতে উদ্ভূত হয়েছে। 'জাত' শব্দের অর্থ হলো উৎপন্ন, উদ্ভূত, জন্ম ইত্যাদি।
সুতরাং জাতক শব্দের অর্থ যিনি উৎপন্ন বা জন্ম লাভ করেছেন। বুদ্ধ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ঘটনা উপলক্ষে শিষ্যদের তাঁর অতীত জন্মের কাহিনি বর্ণনা করতেন। গৌতম বুদ্ধের পূর্বজন্মের ঐ কাহিনিগুলোকে জাতক বলা হয়। এক জন্মের কর্মফলে কেউ বুদ্ধ হতে পারেন না। বুদ্ধ হওয়ার জন্য জন্ম-জন্মান্তরে পারমী পূর্ণ করে পরিশুদ্ধিতা অর্জন করতে হয়। জাতক পাঠে জানা যায়, জন্ম-জন্মান্তরে গৌতম বুদ্ধ নানা কুলে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মানবকুলে রাজা, মন্ত্রি, ব্রাহ্মণ, বণিক, এবং দেবকুলসহ বিভিন্ন পশু-পাখি হয়ে জন্ম নিয়েছিলেন। প্রতিটি জন্মে তিনি 'বোধিসত্ত্ব' নামে অভিহিত হন। বোধিসত্ত্ব প্রতিটি জন্মে কুশলকর্ম সম্পাদন করতেন। এক কথায় বলা যায়, গৌতম বুদ্ধের বোধিসত্ত্বরূপে অতীত জন্মবৃত্তান্ত ও ঘটনাবলিসমূহ 'জাতক কাহিনী' নামে খ্যাত।
মূলত জাতকের সংখ্যা ৫৫০টি। গৌতম বুদ্ধ ৫৫০তম জন্মে বোধিজ্ঞান লাভ করে 'বুদ্ধ' নামে অভিহিত হন। শ্রী ঈশানচন্দ্র ঘোষ সম্পাদিত জাতক গ্রন্থে মোট ৪৪৭টি জাতক কাহিনরি উল্লেখ পাওয়া যায়। কথিত আছে, ৩টি জাতক কাহিনি কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে।
অনুশীলনমূলক কাজ |
সৎ এবং সুন্দর পথে পরিচালিত জীবনই হলো আদর্শ জীবন। আদর্শবান ব্যক্তি সকলের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র। মৃত্যুর পরও নীতিবান এবং আদর্শবান ব্যক্তির কথা মানুষ যুগে যুগে স্মরণ করে থাকে। তাই আমাদের সকলের উচিত অনৈতিক কাজকর্ম থেকে বিরত থাকা। কেননা নীতি-আদর্শহীন ব্যক্তি পশুর সমান। আদর্শ ও নৈতিক জীবন কীভাবে গঠন করতে হয়, তা জাতক পাঠে জানা যায়।
জাতকের গল্পগুলো হিতোপদেশমূলক। এগুলো রূপকথার গল্প নয়। ভগবান বুদ্ধ ভালো কাজের সুফল এবং খারাপ কাজের কুফল বোঝানোর জন্য জাতক কাহিনিগুলো বলতেন। তাই সুন্দর মানবজীবন গঠনে জাতকের গুরুত্ব অপরিসীম। জাতক কাহিনিগুলো ধর্মের গভীর তত্ত্বগুলো বুঝতে সাহায্য করে। ভালো কাজে উৎসাহ জোগায়। উদার চিত্তে দান দিতে শিক্ষা দেয়। শীলবান বা চরিত্রবান, দয়াবান, নীতিবান, সত্যবাদী, ক্ষমাপরায়ণ, মৈত্রীপরায়ণ এবং পরোপকারী হতে শিক্ষা দেয়। প্রানী হত্যা, মিথ্যা বলা, চুরি, ব্যভিচার, মাদকদ্রব্য গ্রহণ থেকে বিরত রাখে। কায়, বাক্য এবং মন সংযত করে। সম্যক জীবিকা অবলম্বন করতে উৎসাহ জোগায়। সমাজ থেকে জাতিভেদ প্রথা দূর করতে সহায়তা করে। ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করে। পরমতসহিষ্ণু এবং পরধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিক্ষা দেয়। সকল জীবের প্রতি মৈত্রীভাবাপন্ন করে তোলে। বলা যায়, নৈতিক এবং আদর্শ জীবন গঠনে জাতকের প্রভাব অপরিসীম। তাই প্রত্যেকের জাতকের শিক্ষা অনুসরণ করা উচিত।
অনুশীলনমূলক কাজ |
পুরাকালে বারাণসিরাজ ব্রহ্মদত্তের রাজত্বকালে বোধিসত্ত্ব পায়রারূপে জন্মগ্রহণ করেন। তখন বারাণসির লোকেরা পুণ্য কামনায় পাখিদের সেবা করত। পাখিদের জন্য ঘরের বাইরে ও ভিতরে নানা জায়গায় ঝুড়ি ঝুলিয়ে রাখত। পায়রারূপী বোধিসত্ত্ব সে রকম একটি ঝুড়িতে রাতে থাকতেন। সেখান থেকে প্রতিদিন সকালে খাবার খুঁজতে বেরিয়ে পড়তেন। খাবার খেয়ে সন্ধ্যার সময় সেই ঝুড়িতে এসে শয়ন করতেন।
একদিন এক কাক সেই ঘরের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় রান্নার চমৎকার গন্ধ পেল। সে উঁকি দিয়ে দেখল ভিতরে মাছ-মাংস রান্না হচ্ছে। লোভী কাক বাইরে বসে ভাবতে লাগল, কেমন করে ঐ মাছ-মাংস খাওয়া যায়। সন্ধ্যার সময় পায়রাকে রান্নাঘরে ঢুকতে দেখে ভাবল, পায়রাটার সঙ্গে ভাব করেই উদ্দেশ্য সফল করতে হবে।
পরদিন ভোরে বোধিসত্ত্ব ঘুম থেকে উঠে খাবার খুঁজতে বেরিয়ে পড়লেন। কাকও তাঁর পেছন পেছন ছুটল। বোধিসত্ত্ব বললেন, 'তুমি আমার সঙ্গে চললে কেন?' কাক বলল, 'আপনার চালচলন আমার খুব ভালো - লাগছে। আমি এখন থেকে আপনার অনুচর হয়ে থাকব।'

তারপর থেকে কাকটি বোধিসত্ত্বের সঙ্গে থাকতে লাগল। পাচক দেখল, পায়রার সঙ্গে একটি কাক এসে থাকছে। তাই সে কাকের জন্যও একটি ঝুড়ি ঝুলিয়ে দিল। সেই থেকে কাকটিও সেই বাড়িতে থাকতে লাগল। একদিন শ্রেষ্ঠীর বাড়িতে প্রচুর মাছ-মাংস রান্না হচ্ছিল। তা দেখে কাকের খুব লোভ হলো। সে ঠিক করল পরদিন সে খাবার খুঁজতে বাইরে যাবে না। এই ভেবে সে সারা রাত অসুস্থতার ভান করে পড়ে রইল। সকালে সে ঠিক করল, পায়রার সঙ্গে খাবার খেতে বাইরে যাবে না। বোধিসত্ত্বের মনে সন্দেহ হলো। তাই তিনি কাককে বললেন, 'বেশ, তুমি থাকো। তবে সাবধান লোভে পড়ে কোনো কিছু করে বসো না।' কাককে উপদেশ দিয়ে বোধিসত্ত্ব নিজের খাবার খুঁজতে চলে গেলেন।
এদিকে পাচক রান্না শুরু করল। রান্নার হাঁড়ি থেকে বাষ্প বেরোনোর জন্য হাঁড়ির মুখ একটু খোলা রাখল। একটা হাঁড়ির মুখ ঝাঁঝরি দিয়ে ঢেকে দিল। রান্নার সুগন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। এ সময় পাচক গায়ের ঘাম শুকানোর জন্য রান্নাঘরের বাইরে বারান্দায় গেল। কাক ঠিক সে সময় ঝুড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁড়ির ওপর ঝাঁঝরিতে গিয়ে বসল। তখনই ঝাঁঝরিটা মাটিতে পড়ে ঝন্ঝন্ শব্দ হলো। পাচক সেই শব্দ শুনে রান্নাঘরে ছুটে এল।
এসে দেখল, কাক মাংস খাওয়ার চেষ্টা করছে। পাচক সঙ্গে সঙ্গে ধূর্ত কাকের উদ্দেশ্য বুঝতে পারল। সে তাড়াতাড়ি রান্নাঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে কাকটিকে ধরে ফেলল। এরপর সারা শরীরের পালক তুলে নিয়ে গায়ে আদা ও নুন মেখে দিল। তারপর তাকে ঝুড়ির মধ্যে ফেলে রাখল। যন্ত্রণায় কাক ছটফট করতে লাগল।
বোধিসত্ত্ব সন্ধ্যায় ফিরে এসে কাককে দেখে সব বুঝতে পারলেন। তখন তিনি ভাবলেন, লোভী কাক আমার কথা না শোনায় এই ফল পেয়েছে। তারপর তিনি একটি গাথা বললেন। গাথাটির অর্থ হলো:
'উপকারী বন্ধুর কথা স্বেচ্ছাচারীরা শোনে না। এ জন্য তার ওপর বিপদ নেমে আসে। কাক তার প্রমাণ।'
বোধিসত্ত্ব এই গাথা আবৃত্তি করে নিজে নিজে বললেন, আমি আর এখানে থাকতে পারি না। তারপর তিনি সেখান থেকে অন্য জায়গায় চলে গেলেন।
কাক সঙ্গে সঙ্গে মরে গেল। পাচক ঝুড়িসহ কাকটি ফেলে দিল।
উপদেশ: লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।
অনুশীলনমূলক কাজ |
অতীতকালে বারাণসি রাজ্যের রাজা ছিলেন ব্রহ্মদত্ত। তাঁর রাজত্বকালে বোধিসত্ত্ব শশককূলে জন্মগ্রহণ করে এক বনে বাস করতেন। ঐ বনের একদিকে পর্বত, একদিকে নদী এবং একদিকে গ্রাম। শশকরূপী বোধিসত্ত্বের তিন বন্ধু ছিল। শিয়াল, বানর ও উদ্বিড়াল। চার বন্ধু বাস করত গঙ্গা নদীর তীরে। শশক ছিলেন খুব পণ্ডিত। প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিন বন্ধুকে 'দান করা উচিত', 'শীল রক্ষা করা উচিত', 'উপোসথ পালন করা উচিত'- এরূপ ধর্মোপদেশ দিতেন। বন্ধুরা উপদেশসমূহ গ্রহণ করত। এভাবে অনেক দিন কেটে গেল।
একদিন শশক চাঁদ দেখে বুঝলেন, পরদিন পূর্ণিমা। বন্ধুদের বললেন, 'আগামীকাল পূর্ণিমা। তোমরা শীল গ্রহণ করে উপোসথ পালন করো। শীলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে দান করো। শীলবান ব্যক্তির দান মহাফলদায়ক। কোনো যাচক উপস্থিত হলে তোমরা নিজের খাবারের অংশ হতে তাকে খাবার দেবে।'
উপদেশ শুনে বন্ধুরা খাবারের খোঁজে বের হলো।
শিয়াল এক বাড়িতে ঢুকল। সে দেখল এক হাঁড়ি মাংস, মিষ্টি ও এক ভার দই বারান্দায় পড়ে আছে। সে উচ্চ স্বরে তিনবার হাঁক দিল- এগুলো কার? এগুলো কার? এগুলো কার? কেউ সাড়া দিল না। তখন সে ঐ সব দ্রব্য নিয়ে গর্তে ফিরে এল এবং 'বেলা হলে আহার করব' এরূপ সংকল্প করে শীলভাবনা করতে থাকল।
ওদিকে উদ্বিড়াল সমুদ্রের তীরে গিয়ে মাছের গন্ধ পেল। বালি খুঁড়ে সে চারটি মাছ বের করল। সে-ও তিনবার বলল- এগুলো কার? এগুলো কার? এগুলো কার? কেউ সাড়া দিল না। তখন সে মাছগুলো গর্তে নিয়ে এল এবং 'বেলা হলে আহার করব'-এরূপ সংকল্প করে শীলভাবনা করতে থাকল। বানরও বন থেকে একগুচ্ছ আম পেড়ে নিয়ে এল এবং 'বেলা হলে আহার করব'-এরূপ সংকল্প করে শীলভাবনা করতে থাকল।

এদিকে বোধিসত্ত্ব তৃণ ভক্ষণ করবেন বলে স্থির করলেন এবং চিন্তা করতে লাগলেন, 'আমার খাবার তো ঘাস। মানুষ ঘাস খায় না। আমার কাছে কোনো যাচক উপস্থিত হলে তাকে কী দিয়ে আপ্যায়ন করব'।
তারপর সিদ্ধান্ত নিলেন, নিজের শরীরের মাংস আগুনে পুড়িয়ে তা দিয়ে আপ্যায়ন করবেন।
দেবরাজ ইন্দ্র শশকের মহাসংকল্পের কথা জানতে পারলেন। দান পরীক্ষার জন্য ইন্দ্র এক ব্রাহ্মণের বেশে সেখানে উপস্থিত হলেন। তিনি একে একে সবার দান গ্রহণ করলেন। অবশেষে শশকের কাছে এলেন। শশক তাঁকে দেখে খুব খুশি। ব্রাহ্মণরূপী ইন্দ্রকে বললেন, 'আপনি আহারের জন্য আমার কাছে এসে উত্তম কাজ করেছেন। আমি আপনাকে এমন দান দেব, যা আগে কেউ কখনো দান করেনি। আপনি আগুন জ্বালুন। আমি তাতে ঝাঁপ দেব। আগুনে আমার শরীর সিদ্ধ হলে আপনি সেই মাংস খেয়ে শ্রামণ্য ধর্ম পালন করবেন।' ইন্দ্র খড়কুটো দিয়ে আগুন জ্বালালেন। শশকরূপী বোধিসত্ত্ব তিনবার গা ঝাড়া দিলেন। পোকা -মাকড় থাকলে যাতে শরীর থেকে পড়ে যায়। তারপর নির্ভয়ে আগুনে ঝাঁপ দিলেন। কিন্তু আশ্চর্য আগুন তাঁর একটি কেশও স্পর্শ করল না। শশক ব্রাহ্মণকে বললেন, ব্রাহ্মণ! তোমার আগুন এত শীতল কেন?
ইন্দ্র নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, হে শশক! আমি ইন্দ্র। তোমার দান পরীক্ষার জন্য এরূপ করেছি।
শশক বললেন, হে দেবরাজ! বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবাই আমার দান পরীক্ষা করুক। আমাকে কখনো দানবিমুখ দেখবে না।
ইন্দ্র বললেন, 'শশক, তোমার খ্যাতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ুক।' দেবরাজ ইন্দ্র চন্দ্রমহলে একটি শশকচিহ্ন এঁকে দিলেন। সে কারণে আজও আমরা চাঁদে একটি শশকের চিহ্ন দেখি।
উপদেশ: শীলবান ব্যক্তিরা সর্বত্র পূজিত হয়।
অনুশীলনমূলক কাজ |
পুরাকালে বারাণসি রাজ্যে ব্রহ্মদত্ত নামে এক রাজা ছিলেন। তার রাজত্বকালে উদীচ্য ব্রাহ্মণকূলে বোধিসত্ত্ব জন্মগ্রহণ করেন। বয়োঃপ্রাপ্তির পর বোধিসত্ত্ব ঋষি প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন। তিনি পাঁচশত ভিক্ষু সঙ্গে নিয়ে হিমালয়ের পাদদেশে বাস করতেন।
একবার হিমালয়ে ভয়ানক অনাবৃষ্টি দেখা দিল। সব জলাশয় শুকিয়ে গেল। চারদিকে পানীয় জলের বড় অভাব। তৃষ্ণায় পশুপাখি সব কাতর হয়ে পড়ল। কোথাও এক ফোঁটা জল নেই। পশুপাখিদের এই যন্ত্রণা দেখে এক ভিক্ষুর মায়া হলো।
ভিক্ষু একটা গাছ কাটলেন। সেই গাছের ডাল দিয়ে একটা ডোঙ্গা তৈরি করলেন। ডোঙ্গাটি জলপূর্ণ করে তিনি পশুপাখিদের জলপানের ব্যবস্থা করে দিলেন। বনের সব পশুপাখি এসে সেই ডোঙ্গা থেকে জলপান করতে লাগল। এতে অসংখ্য জীবের প্রাণ রক্ষা পেল।
প্রতিদিন অসংখ্য প্রাণী জলপান করতে আসতে লাগল। ফলে ভিক্ষু আহারের জন্য ফলমূল সংগ্রহ করার সময় পেতেন না। ভিক্ষু তার নিজের আহারের কথা ভুলে গিয়ে দিনরাত প্রাণীদের তৃষ্ণা মেটাতে লাগলেন। এটা দেখে পশুপাখিরা চিন্তিত হয়ে পড়ল। তাদের তৃষ্ণা মেটানোর কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে ভিক্ষু অনাহারে থেকে কষ্ট ভোগ করছেন। তারা ঠিক করল, এবার থেকে যে প্রাণী যখন জলপান করতে আসবে, তখন তার সাধ্য অনুসারে ভিক্ষুর জন্য কিছু ফল নিয়ে আসবে।

এরপর থেকে প্রতিটি পশুপাখি নিজের সাধ্যমতো আম, জাম, কাঁঠাল, মধুর, অমধুর প্রভৃতি ফল নিয়ে জলপান করতে আসতে লাগল। এভাবে প্রতিদিন এত ফল আসতে লাগল যে, আশ্রমের পাঁচশ ভিক্ষুও খেয়ে শেষ করতে পারতেন না।
সৎ কাজে ভিক্ষুটির এই আত্মোৎসর্গ দেখে বোধিসত্ত্ব বললেন, ‘দেখো, সৎ কাজের কী অদ্ভুত মহিমা! একজনের ব্রতের ফল কতজন ভিক্ষু ভোগ করছে। তাদের কাউকে আর ফল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে কষ্ট করে বনে যেতে হচ্ছে না।’ উপদেশ: কুশলকর্ম সম্পাদনে সকলেরই উদ্যমশীল হওয়া উচিত।
অনুশীলনমূলক কাজ |
পুরাকালে বারণসিরাজ ব্রহ্মদত্তের সময়ে বোধিসত্ত্ব বাণিজ্য করে জীবন ধারণ করতেন। তখন কাশী রাজ্যের এক গ্রামে অনেক সূত্রধর বাস করত। তারা কাঠ দিয়ে নানারকম আসবাব তৈরি করত। সেখানে একদিন এক বৃদ্ধ সূত্রধর কাঠ কেটে আসবাবপত্র তৈরির কাজ করছিল। পাশে তার পুত্র ব সে ছিল। এমন সময় এক মশক তার মাথায় বসে সুঁচালো হুল ফুটিয়ে দিল। সে পুত্রকে ডেকে বলল, 'বৎস, আমার মাথায় মশক হুল ফুটিয়ে রক্ত পান করছে। তুমি মশকটি তাড়িয়ে দাও।' পুত্র বলল, 'বাবা, আপনি স্থির থাকুন। আমি এক আঘাতেই মশকটি মেরে ফেলব।' ঐ সময় বোধিসত্ত্ব পণ্যসম্ভার নিয়ে বৃদ্ধ সূত্রধরের বাড়ির সামনে এসে হাজির হলেন। তিনি বাড়ির সামনে বসলেন। তিনি বসলে সূত্রধর আবার বলল, 'বৎস, মশকটি তাড়িয়ে দাও।' তখন তার ছেলে 'তাড়াচ্ছি' বলে এক প্রকাণ্ড তীক্ষ্ণধার কুঠার উত্তোলন করল এবং পিতার পেছন দিক থেকে 'মশা মারি', 'মশা মারি' বলতে বলতে বৃদ্ধের মাথায় জোরে আঘাত করল। সাথে সাথে বৃদ্ধের

মাথা ফেটে রক্ত বের হতে লাগল এবং বৃদ্ধ মৃত্যুমুখে পতিত হলো। বোধিসত্ত্ব এই কাণ্ড দেখে হতবাক হয়ে গেলেন। তিনি ভাবলেন, এত নির্বোধ লোক কোথাও দেখিনি। এরূপ মূর্খের চেয়ে পণ্ডিত শত্রুও অনেক ভালো। কারণ যিনি বুদ্ধিমান তিনি শাস্তির ভয়ে মানুষ হত্যা থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু ছেলেটি এতই মূর্খ যে মশা মারতে গিয়ে নিজের বাবাকে মেরে ফেলল।
মূর্খ ছেলের এই কাজ দেখে বোধিসত্ত্ব একটি গাথা আবৃত্তি করে সে স্থান ত্যাগ করলেন। গাথাটি হলো:
বুদ্ধিমান শত্রু সেও মোর ভালো
নির্বোধ মিত্রে কী কাজ?
মশক মারিতে বধিল পিতারে
মহামূর্খ পুত্র আজ।
উপদেশ: মূর্খ বন্ধুর চেয়ে বুদ্ধিমান শত্রু ভালো।
অনুশীলনমূলক কাজ সূত্রধর কী কাজ করছিল? |
'জাতক' হলো গৌতম বুদ্ধের অতীত জন্মবৃত্তান্ত। কিন্তু জাতকগুলোতে অনুসরণীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ পাওয়া যায়। এসব উপদেশ মানবিক ও নৈতিক গুণাবলির উৎকর্ষসাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই এসব উপদেশ অনুসরণ করা একান্ত উচিত। নিচে জাতকের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও অনুসরণীয় উপদেশ তুলে ধরা হলো। যেমন: কপোত জাতক পাঠে আমরা লোভের পরিণতি সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করতে পারি। এ শিক্ষামতে, অতিরিক্ত লোভ মানুষকে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করে। তাই সকলের লোভ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। এভাবে শশক জাতকে শীল পালনের উপকারিতা সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করতে পারি। এ জাতকের উপদেশ মতে, শীলবান ব্যক্তি সর্বত্র পূজিত হন। আমজাতক কুশলকর্ম সম্পাদনে উদ্যমশীল হওয়ার শিক্ষা দেয়। মশক ও রোহিণী জাতকে মূর্খ বন্ধুর চেয়ে বুদ্ধিমান শত্রু ভালো বলে নির্দেশনা রয়েছে।
জাতকগুলোতে এরূপ অনেক উপদেশ পাওয়া যায়, যা নির্বুদ্ধিতা, কৃপণতা, অলসতা, অহংবোধ, ধূর্ততা ইত্যাদি বর্জনের নির্দেশনা রয়েছে। এছাড়া এসব উপদেশ আমাদের অকুশলকর্ম পরিত্যাগ করে কুশলকর্ম সম্পাদনের প্রেরণা যোগায়। নৈতিক জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করে। হিংসা ত্যাগ করে মৈত্রীপরায়ণ হতে শিক্ষা দেয়। তাই শান্তিময় বিশ্ব গড়ে তুলতে জাতকের উপদেশ অনুসরণ অপরিহার্য।
Read more