ভাদ্র মাসের পূর্ণিমা তিথিকে মধু পূর্ণিমা বলা হয়।
বুদ্ধপূর্ণিমা বৈশাখ মাসে অনুষ্ঠিত হয়। এ অনুষ্ঠানের দিন সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সূত্র পাঠ ও বুদ্ধকীর্তনের মাধ্যমে প্রভাতফেরি করে উৎসবের সূচনা হয়। সকালে পূজা, সমবেত প্রার্থনা, পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ করা হয়। দুপুর বারোটার আগে আহার সম্পন্ন করে বৌদ্ধবিহারে ধ্যান সমাধি করে। বিকাশে ধর্মসভা হয়।
প্রবারণা পূর্ণিমার দিনই ফানুস উত্তোলন উৎসব হয়। সন্ধ্যায় প্রার্থনা ও প্রদীপ পূজার পর বৌদ্ধ বিহারে কিংবা বাড়ির উঠানে ফানুস উড়ানোর উৎসব শুরু হয়। নানারকম বাদ্য-বাজনার তালে তালে, সংকীর্তনের ঝংকারে নেচে গেয়ে বর্ণিল ফানুস আকাশে উড়ানো হয়।
প্রবারণা পূর্ণিমার দিন বুদ্ধ ভিক্ষুদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, "ভিক্ষুগণ! বহুজনের মঙ্গলের জন্য হিতের জন্য তোমরা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়। প্রচার কর সেই ধর্ম, যে ধর্মের আদিতে কল্যাণ, মধ্যে কল্যাণ এবং অন্তে কল্যাণ।"
বৌদ্ধ আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসবসমূহ চান্দ্রবছরের নিয়মে অনুষ্ঠিত হয়, সেগুলো ধর্মীয় তিথি বা পর্ব। যেমন- বুদ্ধপূর্ণিমা, মধু পূর্ণিমা, প্রবারণা পূর্ণিমা প্রভৃতি। আর যে অনুষ্ঠানগুলো বছরের যে কোনো সময় করা যায়, সেগুলোকে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বলা হয়।
যেমন- সঙ্ঘ দান, প্রব্রজ্যা, উপসম্পদা প্রভৃতি।
বৌদ্ধ ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো প্রধানত পূর্ণিমাকেন্দ্রিক। প্রতিটি পূর্ণিমার সঙ্গে গৌতম বুদ্ধের জীবনের কোনো না কোনো স্মরণীয় ঘটনা রয়েছে। বুদ্ধের জীবনাদর্শ স্মরণ ও অনুশীলন করা এবং আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঐতিহাসিক স্মরণীয় ঘটনাগুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়।
ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো সর্বজনীন। ফলে এসব অনুষ্ঠানে যোগদানের ফলে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় হয়, ধর্মকথা শ্রবণে মন শান্ত, প্রসন্ন ও উদার হয়। ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হয়। নৈতিক ও দয়া-পরায়ণ হওয়া যায় এবং পুণ্যফল অর্জনের মাধ্যমে স্বর্গ লাভ হয়।
বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তিথিই 'বুদ্ধপূর্ণিমা' নামে খ্যাত। এই তিথিতে সিদ্ধার্থ গৌতম হিমালয়ের পাদদেশে জন্মগ্রহণ করেন। একই তিথিতে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে বুদ্ধগয়ায় বোধিলাভ করেন। আশি বছর বয়সে একই তিথিতে কুশীনগরে মৃত্যুবরণ করেন। তাই বুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত এ তিথিকেই বুদ্ধপূর্ণিমা বলা হয়।
বুদ্ধপূর্ণিমায় সংঘটিত বুদ্ধের জীবনের তিনটি ঘটনাই প্রকৃতির সাথে সম্পর্কিত। তার জন্ম হয়েছিল গাছ তরুলতায় ভরা লুম্বিনী কাননে। তিনি বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন গয়ার উন্মুক্ত বোধিবৃক্ষমূলে। এবং মহাপরিনির্বাণ লাভ করেছিলেন কুশীনগর জোড়া শালবৃক্ষের মূলে। যা প্রকৃতির সাথে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক নির্দেশ করে।
আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা তিথিই আষাঢ়ী পূর্ণিমা নামে খ্যাত। গৌতম বুদ্ধের জীবনের তিনটি ঐতিহাসিক ঘটনা এই তিথিতে সংঘটিত হয়েছিল। এ পূর্ণিমা তিথিতে সিদ্ধার্থ মাতৃজঠরে প্রতিসন্ধি গ্রহণ করেন। একই পূর্ণিমা তিথিতে তিনি গৃহত্যাগ করেন এবং এই তিথিতেই প্রথম ধর্ম প্রচার করেন সারনাথে।
বুদ্ধত্ব লাভের পর এক আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে বুদ্ধ সারনাথে পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদের মাঝে প্রথম ধর্ম প্রচার করেন। পঞ্চবর্গীয় শিষ্যরা হলেন- কোন্ডন্য, বপ্প, ভদ্রিয়, মহানাম ও অশ্বজিত। জীবজগতের কল্যাণে তিনি সূত্র দেশনা করেছিলেন। তাঁর এই প্রথম প্রচারিত ধর্মকে বলা হয় 'ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্র'।
ভাদ্র মাসের পূর্ণিমাকে মধু পূর্ণিমা বলা হয়। মধু দান এ পূর্ণিমার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এ তিথিতে বৌদ্ধরা বুদ্ধ ও ভিক্ষুদের উদ্দেশ্যে মধু দান করে ও অন্যান্য পূর্ণিমার মতো আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালন করে। দান ও'সেবার ঐতিহ্য পালন করে মধুপূর্ণিমা মধুময় সম্পর্ক স্থাপনে সহায়তা করে।
'প্রবারণা' শব্দের অর্থ হলো সন্তুষ্টি বা ইচ্ছার পূর্ণতা, উৎসব, বরণ করা, বারণ করা ইত্যাদি। কুশলসমূহ প্রকৃষ্টরূপে বরণ করা এবং অকুশলসমূহ বারণ করাই হচ্ছে প্রবারণা। এর মাধ্যমে ভুল-ত্রুটি ক্ষমা প্রার্থনা করে পরিশুদ্ধতা অর্জন করা যায় বলে আশ্বিন মাসের এ পূর্ণিমাকে প্রবারণা পূর্ণিমা বলা হয়েছে।
প্রবারণা পূর্ণিমা উদযাপনের মাধ্যমে পরস্পরের কাছে দোষ-ত্রুটি, ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এটি হলো আত্মশুদ্ধির প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে নিজের মন পবিত্র হয়, আত্মশক্তি বৃদ্ধি পায়। মনের রাগ ও হিংসা দূর হয়। ফলে পরস্পরের সাথে সুসম্পর্কের বন্ধন সুদৃঢ় হয়।
মাঘ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে গৌতম বুদ্ধ নিজের আয়ু সংস্কার বিসর্জন বা মহাপরিনির্বাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। যা মাঘী পূর্ণিমা নামে পরিচিত। এভাবে নিজের জীবনের অবসানের দিনক্ষণ ঘোষণা করার ঘটনা জগতে দ্বিতীয়টি নেই। মাঘী পূর্ণিমা বৌদ্ধদের নিকট পবিত্র দিন।
বৌদ্ধরা নানা রকম আচার-অনুষ্ঠান পালন করে। যেমন বুদ্ধপূর্ণিমা, আষাঢ়ী পূর্ণিমা, প্রবারণা পূর্ণিমা, কঠিন চীবরদান ইত্যাদি। বৌদ্ধবিহার এবং পারিবারিক অঙ্গনে এসব আচার-অনুষ্ঠান উদ্যাপন করা হয়। ধর্মীয় বিধি-বিধানমতে আচরণীয় ও পালনীয় অনুষ্ঠানসমূহকে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বলে। কিছু কিছু বৌদ্ধ আচার- অনুষ্ঠান ধর্মীয় ভাবধারায় জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদ্যাপন করা হয়। সেই আচার-অনুষ্ঠানগুলো ধর্মীয় উৎসব নামে পরিচিত। বাংলাদেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায় বছরের বিভিন্ন সময়ে এরূপ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। এ অনুষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণ করে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি। এ অধ্যায়ে বৌদ্ধদের কয়েকটি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে পড়ব।
এ অধ্যায় শেষে আমরা-
- বৌদ্ধ ধর্মীয় বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের বর্ণনা দিতে পারব;
- বৌদ্ধ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সামাজিক গুরুত্ব মূল্যায়ন করতে পারব।
Related Question
View Allভাদ্র মাসের পূর্ণিমা তিথিকে মধু পূর্ণিমা বলা হয়।
বুদ্ধপূর্ণিমা বৈশাখ মাসে অনুষ্ঠিত হয়। এ অনুষ্ঠানের দিন সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সূত্র পাঠ ও বুদ্ধকীর্তনের মাধ্যমে প্রভাতফেরি করে উৎসবের সূচনা হয়। সকালে পূজা, সমবেত প্রার্থনা, পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ করা হয়। দুপুর বারোটার আগে আহার সম্পন্ন করে বৌদ্ধবিহারে ধ্যান সমাধি করে। বিকাশে ধর্মসভা হয়।
প্রবারণা পূর্ণিমার দিনই ফানুস উত্তোলন উৎসব হয়। সন্ধ্যায় প্রার্থনা ও প্রদীপ পূজার পর বৌদ্ধ বিহারে কিংবা বাড়ির উঠানে ফানুস উড়ানোর উৎসব শুরু হয়। নানারকম বাদ্য-বাজনার তালে তালে, সংকীর্তনের ঝংকারে নেচে গেয়ে বর্ণিল ফানুস আকাশে উড়ানো হয়।
প্রবারণা পূর্ণিমার দিন বুদ্ধ ভিক্ষুদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, "ভিক্ষুগণ! বহুজনের মঙ্গলের জন্য হিতের জন্য তোমরা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়। প্রচার কর সেই ধর্ম, যে ধর্মের আদিতে কল্যাণ, মধ্যে কল্যাণ এবং অন্তে কল্যাণ।"
বৌদ্ধ আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসবসমূহ চান্দ্রবছরের নিয়মে অনুষ্ঠিত হয়, সেগুলো ধর্মীয় তিথি বা পর্ব। যেমন- বুদ্ধপূর্ণিমা, মধু পূর্ণিমা, প্রবারণা পূর্ণিমা প্রভৃতি। আর যে অনুষ্ঠানগুলো বছরের যে কোনো সময় করা যায়, সেগুলোকে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বলা হয়।
যেমন- সঙ্ঘ দান, প্রব্রজ্যা, উপসম্পদা প্রভৃতি।
বৌদ্ধ ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো প্রধানত পূর্ণিমাকেন্দ্রিক। প্রতিটি পূর্ণিমার সঙ্গে গৌতম বুদ্ধের জীবনের কোনো না কোনো স্মরণীয় ঘটনা রয়েছে। বুদ্ধের জীবনাদর্শ স্মরণ ও অনুশীলন করা এবং আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঐতিহাসিক স্মরণীয় ঘটনাগুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!