সংস্কৃতি আসলে মানুষের জীবনধারা। সংস্কৃতির মাধ্যমে মানুষের জীবনযাপনের প্রতিচ্ছবি প্রকাশ পায়। মানুষ তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য, সমাজজীবনে কোনো উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে যা কিছু চিন্তা ও কর্ম করে তা-ই তার সংস্কৃতি।
মানুষ যখন লিখতে শিখল তখন প্রথম পাথরে খোদাই করে। কিংবা গাছের ছাল বা পাতায় লিখত। তারপর যখন কাগজ আবিষ্কার করল তখন কালিতে পাখির পালক ডুবিয়ে লিখত। ধীরে ধীরে মানুষ, কলম তৈরি করে কাগজের উপর লিখছে।
বাংলাদেশের সংস্কৃতির উপাদানসমূহকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- ১. বস্তুগত বা দৃশ্যমান উপাদানসমূহ ও ২. অবস্তুগত বা অদৃশ্যমান উপাদানসমূহ।
বাংলাদেশের সংস্কৃতির বস্তুগত উপাদানসমূহ হচ্ছে- বিভিন্ন ধরনের ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র, পোশাক, যানবাহন, খাবার, চাষাবাদের উপকরণ, বইপত্র ইত্যাদি।
বাংলাদেশের সংস্কৃতির অবস্তুগত উপাদানসমূহ হচ্ছে- সামগ্রিক জ্ঞান, ধর্মীয় বিশ্বাস ও নীতিবোধ, ভাষা, বর্ণমালা, শিল্পক্লা, সাহিত্য, সংগীত, আদর্শ ও মূল্যবোধ, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা ইত্যাদি।
বাংলাদেশের সংস্কৃতির বস্তুগত ও অবস্তুগত উপাদানসমূহ কোনোভাবেই পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। কেননা, সংস্কৃতির বস্তুগত উপাদানসমূহের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতির অবস্তুগত উপাদানসমূহের পরিচয় পাওয়া যায়।
নকশিকাঁথা বাংলাদেশের সংস্কৃতির একটি বস্তুগত উপাদান। এর মধ্যে যখন ফুল-পাতা, হাতি-ঘোড়া বা অন্য কোনো দৃশ্য সেলাই করা হয়, তখন তা হয়ে ওঠে এদেশের নারী মনের অবস্তুগত সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ।
বাংলাদেশের সংস্কৃতির উপাদানগুলোর একটি পরিবর্তনে অন্যগুলোরও পরিবর্তন হয়। যেমন- বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে শাড়ি একটি উপাদান। প্রযুক্তির পরিবর্তনে শাড়ি রং ও ডিজাইনে পরিবর্তন এসেছে। শাড়ি পরার ধরনেও পরিবর্তন এসেছে।
আমাদের দেশের মানুষ নিজস্ব প্রয়োজনেই বস্তুগত সংস্কৃতির উপাদানসমূহ সৃষ্টি করেছে। আমরা জাদুঘরে গেলে এমন অনেক জিনিস দেখতে পাই, যেগুলো শত বছরের পুরানো। সেগুলো দেখে আমরা বাংলাদেশের সে সময়ের মানুষ ও তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা করতে পারি।
সংস্কৃতি নির্মাণে ভৌগোলিক পরিবেশ, আবহাওয়া, উৎপাদন পদ্ধতি ইত্যাদি বিশেষ ভূমিকা রাখে। ফলে একেক দেশের মানুষের সংস্কৃতি একে রকম। আবার একটি দেশের মধ্যেও নানা ধরনের সংস্কৃতি বিকশিত হতে পারে। তাই সংস্কৃতি কোনো স্থবির বিষয় নয়, বরং পরিবর্তনশীল।
বাংলার কয়েকটি আঞ্চলিক গান হলো- জারি, সারি, বাউল, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, বারমাস্যা, গম্ভীরা ইত্যাদি।
গ্রামীণ ও শহুরে সংস্কৃতির তিনটি পার্থক্য হলো-
১. ভৌগোলিক পরিবেশগত সংস্কৃতির পার্থক্য।
২. পেশাগত সংস্কৃতির পার্থক্য।
৩. খাদ্যভ্যাসগত সংস্কৃতির পার্থক্য।
ভাওয়াইয়া মূল বাংলাদেশের রংপুর এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার ও আসামের গোয়ালপাড়ায় প্রচলিত এক প্রকার পল্লিগীতি। এসকল গানের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এ গানগুলোতে স্থানীয় সংস্কৃতি, জনপদের জীবনযাত্রা, তাদের কর্মক্ষেত্র, পারিবারিক ঘটনাবলি ইত্যাদির প্রকাশ ঘটেছে।
শহরের ভৌগোলিক পরিবেশ, পেশা, যান্ত্রিক জীবন ইত্যাদি গড়ে তুলেছে শহুরে সংস্কৃতি। বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতির পাশাপাশি এখানে প্রবেশ করেছে আধুনিক দালান কোঠা ও প্রচুর যান্ত্রিক গাড়ি। বিশ্বায়নের প্রভাব শহরে বেশি।
গম্ভীরা গান এক প্রকার জনপ্রিয় লোকসংগীত। সাধারণত বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে এ গান প্রচলিত। দেবদেবীকে সম্বোধন করে মানুষের সুখ ও দুঃখ আদ্যের গম্ভীরার মাধ্যমে প্রকাশ করে থাকে।
আদিকাল থেকেই বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর শব্দভান্ডারের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে বাংলা ভাষিক সংস্কৃতি। অস্টো-এশীয়, দ্রাবিড়ীয়, তিব্বতি-বর্মী, ইন্দো-ইউরোপিয়ান ইত্যাদি নানা ভাষা পরিবার মিলে তৈরি হয়েছে বংলা ভাষারীতি।
গারোদের ধর্মীয় উৎসব ওয়ানগালা। প্রতি বছর সেপ্টেম্বর 'থেকে ডিসেম্বর মাসে গারো পাহাড়ে এই উৎসব পালিত হয়। এই উৎসবে সূর্য দেবতা ও দেবী মিসি এবং সালজং-এর উদ্দেশ্যে 'উৎসর্গ করা হয়।
সোহরাই সাঁওতাল নৃগোষ্ঠীর প্রধান উৎসব। একে গরুর উৎসবও বলা হয়। এটি ফসল কাটার পরে উদ্যাপিত হয় এবং দিওয়ালি উৎসবের সাথে মিলে। এটি অক্টোবর-নভেম্বর মাসে বাংলা মাসের কার্তিকের অমাবস্যায় পালিত হয়।
নৃগোষ্ঠীর বিভিন্ন উৎসব যেমন- গারোদের ওয়ানগালা, সাঁওতালদের সোহরাই বাংলার কৃষি সংস্কৃতির সমান অংশীদার। মণিপুরি নৃত্য উত্তরবঙ্গের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঝুমুর নৃত্য, ত্রিপুরাদের বোতল নৃত্য ইত্যাদি বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধি করেছে।
আমরা প্রতিনিয়ত অন্য সংস্কৃতির উপাদন গ্রহণ, বর্জন, পরিমার্জন ও পরিবর্ধনের মাধ্যমে আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে চর্চা করব এবং পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আমাদের সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাব।
Related Question
View Allমানুষ তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য, সমাজজীবনে কোনো উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে যা কিছু চিন্তা ও কর্ম করে তাই সংস্কৃতি।
সংস্কৃতির উপাদানসমূহকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- (১) বস্তুগত বা দৃশ্যমান উপাদান (বিভিন্ন ধরনের ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র, পোশাক, যানবাহন, বইপত্র ইত্যাদি)। (২) অবস্তুগত বা অদৃশ্যমান উপাদান (সামগ্রিক জ্ঞান, মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি, ধর্মীয় বিশ্বাস ও নীতিবোধ, ভাষা, বর্ণমালা, সাহিত্য, সংগীত ইত্যাদি)।
জুলেখার মাধ্যমে বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতি ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতি বেশ সমৃদ্ধ। বাংলাদেশের সংস্কৃতির প্রধান খাদ্য ভাত-মাছ এখনও গ্রামের মানুষের খাদ্যাভ্যাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জারি, সারি, বাউল, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, বারমাস্যা, গম্ভীরা ইত্যাদি নানা আঞ্চলিক গানে ফুটে ওঠে গ্রামের মানুষের হাসি-কান্না। গ্রামের মেলায় ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পালাগান, যাত্রাগান, কবিগান, কীর্তনগান, মুর্শিদি গান ইত্যাদির আয়োজন আধুনিককালেও গ্রামের অনন্যতা বজায় রেখেছে। উদ্দীপকের জুলেখা সকালের নাস্তায় পান্তাভাত ও মাছ খায় এবং ভাটিয়ালি গান শোনে, যা গ্রামীণ সংস্কৃতি প্রকাশ পায়। উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, জুলেখার মাধ্যমে বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতিই ফুটে উঠেছে।
উদ্দীপকের হাজেরার সংস্কৃতিতে বিশ্বায়নের প্রভাব লক্ষ করা যায়।
শহরের পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস ও যান্ত্রিকতার জীবন বিশ্বায়ন ব্যবস্থার সাথে সংগতিপূর্ণ। শহরে গড়ে উঠেছে যন্ত্রনির্ভর সংস্কৃতি, যা মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ ও গতিময় করেছে। উন্নত যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা মানুষের সময়ের সাশ্রয় করেছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সমস্ত প্রকার উৎপাদন প্রক্রিয়া শহর থেকেই পরিচালিত হয়। সুউচ্চ দালানকোঠা, কলের গাড়ি ইত্যাদি বিশ্বায়নের পথ পরিভ্রমণ করছে। আজকাল আফিস-আদালতের সব কর্মকান্ড কম্পিউটারভিত্তিক পরিচালিত হচ্ছে। উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে শুরু করে সব ব্যবসায়িক, শিক্ষা কিংবা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড কম্পিউটার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যা বিশ্বায়নের নামান্তর। ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে এখন বহির্বিশ্বের সাথে খুব সহজেই যোগাযোগ স্থাপন করা যাচ্ছে। যেকোনো প্রকার সংবাদ, ব্যবসায়িক আলাপ-আলোচনা এখন কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে পরিচালিত ও সম্পাদিত হচ্ছে।
উদ্দীপকে হাজেরাও তার পড়াশোনা শেষে ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে বহির্বিশ্বের সাথে নিজেকে পরিচিত করছে, যা বিশ্বায়ন ধারণার সাথে সংগতিপূর্ণ। উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, হাজেরার খাদ্যাভ্যাস সংস্কৃতিতে বিশ্বায়নের প্রভাব লক্ষ করা যায়।
সংস্কৃতি' শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ Culture.
বাংলাদেশের গ্রামীণ ভৌগোলিক পরিবেশ, পুকুর, খালবিল, নদীনালা, বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ, পাহাড়-পর্বত গ্রামীণ সংস্কৃতিকে করেছে সমৃদ্ধ। এদেশের উর্বর মাটিতে কৃষক ফসল ফলায়, নদীনালা, খালবিল কৃষি উৎপাদনে সহায়তা করে। কৃষি, মৎস্য চাষ, নৌকা চালানো ইত্যাদি পেশা গ্রামের সংস্কৃতি নির্মাণে ভূমিকা রাখে। ভাত ও মাছ গ্রামের প্রধান খাবার। উৎসব-পার্বণে বিভিন্ন গান, মেলার আয়োজন গ্রামীণ সংস্কৃতির সমৃদ্ধ রূপ।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!
