সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ প্রকৃতি ও পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে নিজের প্রয়োজন মিটিয়েছে। এক টুকরো পাথর বা একটি গাছের ডাল হয়ে উঠেছিল হিংস্র পশুর হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর হাতিয়ার। প্রকৃতিকে এমনিভাবে কাজে লাগানোর ক্ষমতা মানুষকে দিয়েছে সংস্কৃতি যা অদ্যাবধি চলমান রয়েছে। মানুষ বুঝতে পারল সমাজবদ্ধ হয়ে একত্রে থাকলে টিকে থাকার এই লড়াই আরও সুদৃঢ় হবে। তাই সমাজকে সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে তৈরি হয় নানা নিয়ম-কানুন, যা ধীরে ধীরে অর্থনীতি, রাজনীতি, ধর্ম, শিক্ষা ইত্যাদিতে রূপ নিল। সমাজের মানুষের আনন্দ, বিনোদন ও কল্যাণের জন্য তৈরি হলো নাচ, গান, সাহিত্য আরও কত কী! ফলে রচিত হলো সংস্কৃতির বস্তুগত ও অবস্তুগত রূপ।

এ অধ্যায় শেষে আমরা -
- সংস্কৃতির ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারব;
- বাংলাদেশের সংস্কৃতির উপাদান ব্যাখ্যা করতে পারব;
- বাংলাদেশের সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে পারব;
- বাংলাদেশের সংস্কৃতির ধরন ব্যাখ্যা করতে পারব;
- ব্যক্তি ও গোষ্ঠী জীবনে বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধারণ ও লালন করতে পারব।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
গ্রামের মেয়ে জমিলা 'নকশি কাঁথা' সেলাই করতে খুব পছন্দ করে। তার ফুফাতো বোন ময়না জিন্স ও ফতুয়া পরতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। ময়না নুডলস ও পাস্তা খেতে খুব ভালোবাসে।
বৃষ্টি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াশোনা করে। তাদের স্কুলে পাঠদান মাল্টিমিডিয়া পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। এতে পড়াশোনা তার মনে থাকে সহজে। বাড়ি এসে সে কম্পিউটারে নেট চালায় এবং বিদ্যালয়ের পাঠদান কম্পিউটারেই সম্পাদন করে।
সংস্কৃতি আসলে মানুষের জীবনধারা। সংস্কৃতির মাধ্যমে মানুষের জীবনযাপনের প্রতিচ্ছবি প্রকাশ পায়। মানুষ তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য, সমাজজীবনে কোনো উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে যা কিছু চিন্তা ও কর্ম করে তা-ই তার সংস্কৃতি। যেমন- বেঁচে থাকার জন্য মানুষ খাদ্য গ্রহণ করে। সেই খাদ্যকে যখন বিভিন্ন প্রণালিতে রান্না করে এবং সুন্দরভাবে সাজিয়ে পরিবেশন করে তখন সেটা হয়ে যায় মানুষের সংস্কৃতি। মানুষ যখন লিখতে শিখল তখন প্রথম পাথরে খোদাই করে কিংবা গাছের ছাল বা পাতায় লিখত। তারপর যখন কাগজ আবিষ্কার করল তখন কালিতে পাখির পালক ডুবিয়ে লিখত। ধীরে ধীরে মানুষ কলম তৈরি করে কাগজের উপর লিখল।
এরপর মানুষ টাইপ রাইটার আবিষ্কার করে তার মাধ্যমে লেখা শুরু করল এবং সর্বশেষ মানুষ কম্পিউটার আবিষ্কার করল। এখন পৃথিবীর বহু মানুষই কম্পিউটার লেখে। এই যে লেখার বিভিন্ন মাধ্যমে মানুষ তৈরি করল এর সমষ্টিও সংস্কৃতির একটি অংশ।
| কাজ: "আমাদের জীবনযাত্রার ধরনই হলো আমাদের সংস্কৃতি" ব্যাখ্যা কর। |
বাংলাদেশের সংস্কৃতির কিছু কিছু উপাদান আমরা খালি চোখে দেখতে পারি, ধরতে পারি। আবার এ দেশের সংস্কৃতির অনেক উপাদানই আমরা দেখতে পাই না, ধরতেও পারি না। যেমন- বাংলাদেশের মানুষের তৈরি ঘরবাড়ি আমরা দেখতে পাই; কিন্তু এগুলো তৈরির জ্ঞান ও কৌশল দেখা যায় না। এদিক থেকে বিবেচনা করলে বাংলাদেশের সংস্কৃতির উপাদানসমূহকেও দুইভাগে ভাগ করা যায়। যথা- (১) বস্তুগত বা দৃশ্যমান উপাদানসমূহ ও (২) অবস্তুগত বা অদৃশ্যমান উপাদানসমূহ। এ দেশের সংস্কৃতির বস্তুগত উপাদানসমূহ হচ্ছে- বিভিন্ন ধরনের ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র, পোশাক, যানবাহন, খাবার, চাষাবাদের উপকরণ, বইপত্র ইত্যাদি।
আমাদের সংস্কৃতির অবস্তুগত উপাদানসমূহ হচ্ছে- সামগ্রিক জ্ঞান, মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি, ধর্মীয় বিশ্বাস ও নীতিবোধ, ভাষা, বর্ণমালা, শিল্পকলা, সাহিত্য, সংগীত, আদর্শ ও মূল্যবোধ, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা ইত্যাদি।
আমাদের দেশের মানুষ নিজস্ব প্রয়োজনেই বস্তুগত সংস্কৃতির উপাদানসমূহ সৃষ্টি করেছে। এসব উপাদান শত শত বছর ধরে টিকে থাকতে পারে। যেমন- আমরা জাদুঘরে গেলে এমন অনেক জিনিস দেখতে পাই, যেগুলো শত বছরের পুরানো। সেগুলো দেখে আমরা বাংলাদেশের সে সময়ের মানুষ ও তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা করতে পারি।
বাংলাদেশের সংস্কৃতির বস্তুগত ও অবস্তুগত উপাদানসমূহ কোনোভাবেই পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। কেননা, সংস্কৃতির বস্তুগত উপাদানসমূহের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতির অবস্তুগত উপাদানসমূহের পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন- নকশিকাঁথা বাংলাদেশের সংস্কৃতির একটি বস্তুগত উপাদান। এর মধ্যে যখন ফুল-পাতা, হাতি-ঘোড়া বা অন্য কোনো দৃশ্য সেলাই করা হয়, তখন তা হয়ে ওঠে এদেশের নারী মনের চিন্তার বহিঃপ্রকাশ।
বাংলাদেশের সংস্কৃতির উপাদানগুলোর একটির পরিবর্তনে অন্যগুলোরও পরিবর্তন হয়। যেমন- বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে শাড়ি একটি উপাদান। প্রযুক্তির পরিবর্তনে শাড়ির রং ও ডিজাইনে পরিবর্তন এসেছে। শাড়ি পরার ধরনেও পরিবর্তন এসেছে।
| কাজ: বাংলাদেশের সংস্কৃতির বস্তুগত ও অবস্তুগত উপাদানের তালিকা প্রস্তুত কর। |
সংস্কৃতি নির্মাণে ভৌগোলিক পরিবেশ, আবহাওয়া, উৎপাদন পদ্ধতি ইত্যাদি বিশেষ ভূমিকা রাখে। ফলে একেক দেশের মানুষের সংস্কৃতি একেক রকম। আবার একটি দেশের মধ্যেও নানা ধরনের সংস্কৃতি বিকশিত হতে পারে। তাই সংস্কৃতি কোনো স্থবির বিষয় নয়, বরং পরিবর্তনশীল। সংস্কৃতির সবটাই বদলে যায় তা কিন্তু নয়। সংস্কৃতির কিছু প্রধান দিক দীর্ঘসময় অপরিবর্তনীয় থেকে যায়।
পেশা, লিঙ্গ, বয়স, স্থান, উৎপাদন পদ্ধতি, শিক্ষা, ধর্ম ইত্যাদি নানা বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে একটি দেশের অভ্যন্তরেও বিভিন্ন ধরনের সংস্কৃতির চর্চা হতে পারে। যেমন, গ্রামীণ সংস্কৃতি ও শহুরে সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। গ্রামের ভৌগোলিক পরিবেশে থাকে পুকুর, নদী-নালা, খাল-বিল, পাহাড়-পর্বত, সমুদ্র, দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ ইত্যাদি। কৃষি, মৎস্যচাষ, নৌকাচালানো ইত্যাদি পেশা গ্রামের সংস্কৃতি নির্মাণে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য ভাত-মাছ এখনও গ্রামের খাদ্যাভ্যাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জারি, সারি, বাউল, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, বারমাস্যা, গম্ভীরা ইত্যাদি নানা আঞ্চলিক গানে ফুটে ওঠে গ্রামের মানুষের হাসি-কান্না। গ্রামের মেলায় ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পালাগান, যাত্রাগান, কবিগান, কীর্তনগান, মুর্শিদি গান প্রভৃতির আয়োজন আধুনিক কালেও গ্রামের অনন্যতা বজায় রেখেছে। অন্যদিকে শহরের ভৌগোলিক পরিবেশ, পেশা, যান্ত্রিক জীবন ইত্যাদি গড়ে তুলেছে শহুরে সংস্কৃতি। বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতির পাশাপাশি এখানে প্রবেশ করেছে আধুনিক দালান কোঠা ও প্রচুর যান্ত্রিক গাড়ি। বিশ্বায়নের প্রভাব শহরে বেশি।
একইভাবে বিভিন্ন পেশার মানুষ গড়ে তোলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ধারা। উৎসব-পার্বণ পালনে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্তের মধ্যে পার্থক্য লক্ষ করা যায়। নারী-পুরুষের পোশাক, জীবনাচার, চিন্তা-ভাবনার মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে।
আদিকাল থেকেই বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর শব্দভাণ্ডারের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে আমাদের ভাষিক সংস্কৃতি। অস্ট্রো-এশীয়, দ্রাবিড়ীয়, তিব্বতি-বর্মী, ইন্দো-ইউরোপিয়ান ইত্যাদি নানা ভাষা পরিবার মিলে তৈরি হয়েছে আমাদের ভাষারীতি। পরবর্তীকালে ওলন্দাজ, পর্তুগিজ, ফরাসি, ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসকদের কাছ থেকেও আমাদের ভাষা গ্রহণ করেছে অনেক শব্দ ও রীতি। সামগ্রিক বিচারে বাংলাদেশের সংস্কৃতি অতি প্রাচীনকাল থেকেই মানবতাবাদী- যা আমরা পূর্ববর্তী পাঠে জেনেছি। নানাভাবে এর প্রমাণ আমরা পাই। চৈত্রসংক্রান্তি মেলা যেমন আমাদের চিরায়ত কৃষিসংস্কৃতির পরিচায়ক, একইভাবে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর বিভিন্ন উৎসব যেমন- গারোদের ওয়ানগালা, সাঁওতালদের সোহরাই আমাদের কৃষি সংস্কৃতির সমান অংশীদার। মণিপুরি নৃত্য, উত্তরবঙ্গের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঝুমুর নৃত্য, ত্রিপুরাদের বোতল নৃত্য ইত্যাদি বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে।আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও বুঝুমুর তালে লিখেছেন অনেক গান।
সুতরাং প্রতিনিয়ত অন্য সংস্কৃতির উপাদান গ্রহণ, বর্জন, পরিমার্জন ও পরিবর্ধনের মাধ্যমে আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে চর্চা করব এবং পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আমাদের সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাব।
| কাজ: দলে ভাগ হয়ে বাংলাদেশের সংস্কৃতির ধরন চিহ্নিত কর। |
Read more