বুদ্ধ দুঃখ মুক্তির উপায় অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন যে, কঠোর শারীরিক কষ্ট কিংবা ভোগবিলাসে নিমগ্ন থাকা কোনোটিই দুঃখ হতে মুক্তির উপায় হতে পারে না। আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ এ দুটি চরম পন্থাকে বর্জন করে। তাই আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ বৌদ্ধধর্মে মধ্যমপন্থা হিসেবে পরিচিত।
যথার্থ এবং গ্রহণযোগ্য বাক্যই হচ্ছে সম্যক বাক্য। মিথ্যা, কর্কশ, অসার, পরনিন্দা, সত্য গোপন, বৃথা বাক্য বর্জন করে সংযত, সুমিষ্ট, সুভাষিত সার বাক্যই সম্যক বাক্য। যে বাক্য অপরকে দুঃখ দেয় তা সর্বোতভাবে বর্জন করাকে সম্যক বাক্য বলা যায়।
কুশলকর্ম হলো সম্যক কর্ম। যে কর্ম নিজের ও অপরের মঙ্গল সাধন করে, ক্ষতি সাধন করে না তাই কুশলকর্ম। প্রাণীহত্যা না করা, চুরি না করা, মিথ্যা ভাষণ না দেওয়া, মাদকদ্রব্য গ্রহণ না করা, সৎ কাজ করা প্রভৃতি কুশলকর্ম।
'মার্গ' শব্দের অর্থ পথ। আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ বলতে বোঝায় বুদ্ধ নির্দেশিত আটটি সম্যক বা সঠিক পথ। এগুলো হলো-১. সম্যক দৃষ্টি, ২. সম্যক সংকল্প, ৩. সম্যক কর্ম, ৪. সম্যক বাক্য, ৫. সম্যক জীবিকা, ৬. সম্যক স্মৃতি, ৭. সম্যক ব্যায়াম ও ৮. সম্যক সমাধি।
তৃষ্ণা থেকে দুঃখের জন্ম হয়। তৃষ্ণার কারণেই মানুষ বারবার জন্মগ্রহণ করে। আর জন্ম নিলেই জরা, ব্যাধি, মৃত্যু প্রভৃতি দুঃখ ভোগ করেন। এই তৃষ্ণা থেকে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, দ্বেষ প্রভৃতি জন্মে। যার সবগুলো সংসারের মায়াবন্ধনে আবদ্ধ করে। 'তাই তৃষ্ণাকে দুঃখের কারণ বলা হয়েছে।
এই জগৎ দুঃখময়। জগতের সবকিছু অনিত্য, অসার। এখানে যিনি জন্মগ্রহণ করেন তাকেই জরা, ব্যাধি, মৃত্যুর মতো প্রভৃতি দুঃখ পেতে হয়। মায়ার দ্বারা আবদ্ধ থাকায় কঠোর তপস্যা কিংবা ভোগবিলাস দ্বারা দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ সম্ভব নয়। তাই বুদ্ধ দুঃখ নিরোধের উপায় হিসেবে এই আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ দেশনা করেন।
সম্যক সংকল্পের অর্থ হলো সঠিক বা উত্তম সংকল্প। সঠিক কাজ করার ইচ্ছা। সৎ জীবনযাপনের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়াই সম্যক সংকল্প। এজন্য ভোগবিলাস, লোভ, দ্বেষ, মোহ প্রভৃতি বর্জনের সংকল্প করে মৈত্রী, করুণা, পরোপকার প্রভৃতি কুশলকর্ম করতে হয়। পণ্ডিতগণ সর্বদা সম্যক সংকল্প করে থাকেন।
সম্যক বাক্য দ্বারা মধুর সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। যথার্থ এবং গ্রহণযোগ্য বাক্য হচ্ছে সম্যক বাক্য। মিথ্যা, কর্কশ, অসার, পরনিন্দা, সত্য গোপন বর্জন করে সংযত, সুমিষ্ট, সুভাষিত সার বাক্য ব্যবহারের দ্বারা সকলের মন জয় করা যায়। স্নেহ, ভালোবাসা, সম্মান প্রাপ্তি হয়। পারস্পরিক বন্ধন সুদৃঢ় হয়।
যে কর্ম সঠিক, নিজের ও অপরের মঙ্গল সাধন করে, ক্ষতি সাধন করে না তা-ই সম্যক কর্ম। শিক্ষার্থীদের জন্য নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষা গ্রহণ হলো সম্যক কর্ম। শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে সুশিক্ষিত হয়ে সৎ কাজ করা এবং সততার সাথে নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করা শিক্ষার্থীদের সম্যক কর্ম।
আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুশীলনের মাধ্যমে নৈতিক ও দুঃখমুক্ত জীবন লাভ করা যায়। কেননা, লোভ-দ্বেষ-মোহ সকল প্রকার অকুশল কর্মের মূল ভিত্তি। ভ্রান্ত ধারণার কারণে মানুষের মধ্যে লোভ-দ্বেষ-মোহ উৎপন্ন হয়। আর তখন কেউ কুশল-অকুশল নির্ধারণ করতে না পেরে অনৈতিক কর্ম করে ও দুঃখ লাভ করে।
সম্যক স্মৃতির দ্বারা কুশল চেতনা জাগ্রত হয়। কেননা, কুশলকর্মের চিন্তাই হলো সম্যক স্মৃতি। সম্যক স্মৃতি আমাদের চিত্তকে নিয়ন্ত্রণ করে। কুশল ও অকুশল কর্মের মধ্যে পার্থক্য বুঝিয়ে অকুশলকর্ম বর্জন করে কুশলকর্ম করতে সহায়তা করে সম্যক স্মৃতি।
সম্যক দৃষ্টির অর্থ হলো সত্য বা অভ্রান্ত দৃষ্টি, যথার্থ জ্ঞান এবং চারি আর্য সত্য সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান বা উপলব্ধি। অবিদ্যার কারণে মানুষ জীবজগৎ সম্পর্কে মিথ্যা দৃষ্টি বা ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে এবং দুঃখে পতিত হয়। সম্যক দৃষ্টির দ্বারা কুশলকর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে এ থেকে মুক্তি পায়।
আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ বৌদ্ধধর্মের অন্যতম মূলতত্ত্ব। বুদ্ধ দুঃখমুক্তির উপায় 'হিসেবে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুশীলনের উপদেশ দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তৃষ্ণার ক্ষয় করে জন্ম-মৃত্যুর শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে অর্হত্ব লাভ ও পরম সুখ নির্বাণ লাভ করা সম্ভব হয়। তাই আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের ধর্মীয় গুরুত্ব অপরিসীম বৌদ্ধধর্মে।
কুশলকর্মের চিন্তাই সম্যক স্মৃতি। দৈহিক ও মানসিক সকল অবস্থা সচেতনভাবে পর্যবেক্ষণ করাই সম্যক স্মৃতি। সম্যক স্মৃতি কুশল ও অকুশল কর্মের পার্থক্য বুঝতে সহায়তা করে এবং অকুশলকর্ম বর্জন করে কুশলকর্ম করার চিন্তা করাই সম্যক স্মৃতি। তাই বলা হয়, স্মৃতিহীন মানুষ মাঝিবিহীন নৌকার মতো।
যথার্থ এবং গ্রহণযোগ্য বাক্যই হচ্ছে সম্যক বাক্য। মিথ্যা, কর্কশ, অসার, পরনিন্দা, সত্য গোপন, বৃথা বাক্য বর্জন করে সংগত, সুমিষ্ট, সুভাষিত সার বাক্যই সম্যক বাক্য। যে বাক্য অপরকে দুঃখ দেয় তার সর্বোতভাবে বর্জন করা উচিত। সত্য, শুভ, প্রীতিপদ ও অর্থপূর্ণ বাক্য ব্যবহার করা উচিত। এভাবেই সম্যক বাক্য দ্বারা মধুর সম্পর্ক সৃষ্টি হয়।
সম্যক দৃষ্টির অর্থ হলো সত্য বা অভ্রান্ত দৃষ্টি, যথার্থ জ্ঞান ; চারি আর্যসত্য সম্পর্কে, সম্যক জ্ঞান বা উপলব্ধি। অবিদ্যার কারণে মানুষ জীব জগৎ সম্পর্কে মিথ্যা দৃষ্টি বা ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে তাতে আবদ্ধ থাকেন। সূর্যের আলো যেমন অন্ধকার দূর করে তেমনি সম্যক দৃষ্টি মিথ্যা দৃষ্টি দূর করে। তৃষ্ণার কারণে মানুষ বার বার জন্মগ্রহণ করে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ নানাবিধ দুঃখ ভোগ করে। কিন্তু সম্যক দৃষ্টি না থাকায় আমরা দুঃখ সত্যকে চিনতে পারি না। মিথ্যা দৃষ্টি দিয়ে জগকে দেখে পরিণামে আরও দুঃখ ডেকে আনি। সম্যক দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি কুশলকর্ম নির্ণয় করতে পারেন।
জগৎ দুঃখময়। কঠোর তপস্যা কিংবা ভোগবিলাস দ্বারা দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ সম্ভব নয়। বুদ্ধ দুঃখ নিরোধের উপায় হিসেবে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ দেশনা করেছেন। এটিকে মধ্যম পথ বলা হয়। তৃষ্ণাই দুঃখের কারণ। তৃষ্ণার কারণে মানুষ বার বার জন্মগ্রহণ করে জরা, ব্যাধি, মৃত্যু প্রভৃতি দুঃখ ভোগ করে থাকে। আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুশীলন দ্বারা তৃষ্ণা ক্ষয় করে নির্বাণ লাভ করা যায়। যিনি নির্বাণ লাভ করেন তিনি জন্মগ্রহণ করেন না। যিনি জন্মগ্রহণ করেন না তিনি জরা, ব্যাধি, মৃত্যু প্রভৃতি দুঃখ ভোগ করেন না। তাই সকলের দুঃখ নিরোধের উপায় আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুশীলন করা উচিত। এ অধ্যায়ে আমরা আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ সম্পর্কে পড়ব।
এ অধ্যায় শেষে আমরা -
- আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ বর্ণনা করতে পারব।
- দুঃখ নিরোধের উপায় ব্যাখ্যা করতে পারব।
- আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুশীলনের ধর্মীয় গুরুত্ব মূল্যায়ন করতে পারব।
Related Question
View Allআর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ তিন প্রকার।
চিত্তের একাগ্রতা সাধনই সম্যক সমাধি। চঞ্চল বিত্তকে সংঘত করার প্রচেষ্টাই হচ্ছে সমাধি। চিত্ত সংযত না বলে কোনো কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন সম্ভব নয়। তাই সকলকে সমাধি চর্চা করা উচিত।
উদ্দীপকে সুমনের আচরণে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের সম্যক কর্ম অঙ্গটি লঙ্ঘিত হয়েছে।
সঠিক কুশলকর্মই হলো সম্যক কর্ম। যে কর্ম নিজের ও অন্যের মঙ্গল সাধন করে; ক্ষতি করে না তাই সম্যক কর্ম। প্রাণী হত্যা, চুরি, ব্যভিচার, মিথ্যা ভাষণ, মাদকদ্রব্য সেবন প্রভৃতি সম্যক কর্মের লঙ্ঘন। মিথ্যা কথা বলে মানুষের সাথে প্রতারণা করলে সম্যক কর্মের লঙ্ঘন হয়। এছাড়া নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করলেও সম্যক কর্মের লঙ্ঘন হয়।
উদ্দীপকে লক্ষ করা যায়, সুমন কাজকর্মে মিথ্যার আশ্রয় নেয়। সে মিথ্যা বলে মানুষের সাথে প্রতারণা করে। নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করে। সুতরাং সুমনের কাজকর্ম স্পষ্টই আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের সম্যক কর্মের লঙ্ঘন।
উদ্দীপকে রুমনের কর্মটি আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের সম্যক জীবিকার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ বৌদ্ধধর্মের অন্যতম মূলতত্ত্ব। আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের অন্যতম একটি মার্গ হলো সম্যক জীবিকা। সম্যক জীবিকা বুদ্ধ নির্দেশিত জীবিকা। নৈতিকভাবে জীবিকা নির্বাহ করাই হলো সম্যক জীবিকা। বুদ্ধ অস্ত্র, বিষ, প্রাণী, মাংস এবং মাদকদ্রব্য – এ পঞ্চ বাণিজ্য পরিত্যাগ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। সৎ বাণিজ্য ও কর্মের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতে উপদেশ দিয়েছেন। মানুষ ও প্রাণিকুলের জন্য মঙ্গলকর ও সেবামূলক যেকোনো কাজই সম্যক জীবিকার অন্তর্গত।
উদ্দীপকে রুমন কাজে ফাঁকি দেয় না। সে সৎভাবে পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করে। তাঁর আচরণে গ্রামের লোকজনও তাকে খুব পছন্দ করে।
সুতরাং দেখা যায়, রুমনের জীবিকা নির্বাহের সাথে সম্যক জীবিকার সাদৃশ্য রয়েছে। তাই বলা যায়, রুমনের কথাটি আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের সম্যক জীবিকার প্রতিফলন।
আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ বৌদ্ধধর্মের অন্যতম তত্ত্ব। তথাগত বুদ্ধ জগতের দুঃখ মুক্তির উপায় হিসেবে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ নির্বাণ বা মুক্তি লাভের উপায়। তাই মানুষের জীবনে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের অনুশীলন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!