খাদ্যকে ভাঙলে যে বিভিন্ন ধরনের জৈব রাসায়নিক উপাদান পাওয়া যায় তাদেরকে খাদ্য উপাদান বলে। এই উপাদানগুলো আমাদের শরীরে, পুষ্টি সাধন করে। তাই এদেরকে পুষ্টি উপাদান বলা হয়। আমাদের খাদ্যে প্রধানত ছয় প্রকারের খাদ্য উপাদান বা পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। সেগুলো হলো- প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, স্নেহ পদার্থ, ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানি।
প্রোটিনকে সকল প্রাণের প্রধান উপাদান হিসেবে গণ্য করা হয়। কারণ প্রোটিন ছাড়া কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব কল্পনা করা সম্ভব না। খাদ্যের ছয়টি উপাদানের মধ্যে প্রোটিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সব প্রোটিনই কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন এবং নাইট্রোজেন নিয়ে গঠিত।
প্রোটিনকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ভাঙলে প্রথমে এমাইনো এসিড এবং পরে কার্বন, হাইড্রোজেন ইত্যাদি মৌলিক পদার্থ পাওয়া যায়। অর্থাৎ অনেক এমাইনো এসিড পাশাপাশি যুক্ত হয়ে একটি প্রোটিন অণু গঠিত হয়।
যে প্রোটিনগুলো প্রাণিজগৎ থেকে পাওয়া যায় তাদেরকে প্রাণিজ প্রোটিন বলে। যেমন- মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ইত্যাদি। উদ্ভিদজগৎ থেকে প্রাপ্ত প্রোটিনকে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন বলা হয়। যেমন-ডাল, বাদাম, সয়াবিন, শিমের বিচি ইত্যাদি।
বাড়ন্ত শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। দীর্ঘদিন ধরে. খাদ্যে প্রোটিনের ঘাটতি থাকলে কোয়াশিয়রকর রোগ হয়। দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। মেধা কমে যায়।
আমরা দৈনিক যে খাদ্য গ্রহণ করি তার বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের মধ্যে কার্বোহাইড্রোেটর পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। শরীরে তাপ ও শক্তি সরবরাহের জন্য এদের গুরুত্ব বেশি। সকল কার্বোহাইড্রেটই কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের সমন্বয়ে গঠিত।
কার্বোহাইড্রেটে যে খাদ্যগুলো থাকে সেগুলো হলো- চিনি, গুড়, মিসরি, ক্যান্ডি, চকলেট, মিষ্টি, সাগু, এরারুট, চাল, ভুট্টা, যব, গম, আলু, বিভিন্ন ধরনের শুকনা ফল। যেমন- খেজুর, কিশমিশ ইত্যাদি। বিভিন্ন ধরনের ডাল, সয়াবিন, বাদাম, টাটকা ফল, আঙুর, কলা, আপেল, আম, কাঁঠাল, আনারস ইত্যাদি।
দেহে তাপ বা শক্তি সরবরাহ করাই কার্বোহাইড্রেটের প্রধান কাজ। এজন্য একে জ্বালানি খাদ্য বলে। ১ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট থেকে ৪ কিলো ক্যালরি শক্তি উৎপন্ন হয়। সেলুলোজ জাতীয় কার্বোহাইড্রেট কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। মস্তিষ্কের কাজ সচল রাখার জন্য একমাত্র জ্বালানি হিসেবে গ্লুকোজ জাতীয় কার্বোহাইড্রেটের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ফ্যাট বা স্নেহ পদার্থকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়-
১. কঠিন স্নেহ: যেসব স্নেহ পদার্থ স্বাভাবিক তাপ ও চাপে কঠিন আকৃতির হয়। যেমন- প্রাণীর চর্বি, মাখন ইত্যাদি।
২. তরল স্নেহ: যেসব স্নেহ পদার্থ স্বাভাবিক তাপে ও চাপে তরল অবস্থায় থাকে। যেমন- সয়াবিন তেল, সরিষার তেল ইত্যাদি।
প্রথম শ্রেণির স্নেহ খাদ্য উৎসে স্নেহের পরিমাণ ৯০% থেকে ১০০%। সয়াবিন তেল, ঘি, মাখন, সরিষার তেল, কড মাছের তেল বা হাঙ্গর মাছের তেল ইত্যাদি।
আমাদের খাদ্যে দৈনিক ক্যালরির ২০% থেকে ২৫% স্নেহ পদার্থ থেকে গ্রহণ করা উচিত। ফ্যাট বা স্নেহ জাতীয় খাদ্য প্রয়োজনের চাইতে বেশি খেলে তা শরীরের কোনো কাজে লাগে না এবং দেহে ফ্যাট আকারে জমা থাকে। যার ফলে দেহের ওজন খুব তাড়াতাড়ি বৃদ্ধি পায়। তাই ফ্যাট জাতীয় খাদ্য বেশি খাওয়া উচিত নয়।
স্নেহ পদার্থের প্রধান কাজ হলো তাপ ও শক্তি সরবরাহ করা। দেহে শক্তির উৎস হিসেবে সঞ্চিত থাকে। কোষ প্রাচীরের সাধারণ উপাদান হিসেবে স্নেহ পদার্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভিটামিন এ, ডি, ই এবং কে-কে দ্রবীভূত করে দেহে গ্রহণ উপযোগী করে তোলে। দেহ হতে তাপের অপচয় রোধ করে শরীর গরম রাখে। স্নেহ পদার্থ চর্মরোগের হাত থেকে রক্ষা করে। খাদ্যের স্বাদ বৃদ্ধি করে।
ফ্যাটের অভাবে দেহে প্রয়োজনীয় তাপশক্তির ঘাটতি হয়। চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিনগুলোর ঘাটতি দেখা যায়। চর্মরোগ দেখা দিতে পারে।
দ্রবণীয়তার ওপর ভিত্তি করে ভিটামিনগুলোকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিন। এই ভিটামিন ৪টি। যথা- এ, ডি, ই এবং কে। পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিন, পানিতে দ্রবণীয় দুই ধরনের। যথা- ভিটামিন বি কমপ্লেক্স ও ভিটামিন সি।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে শরীরকে সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম রাখে। স্নায়ু ও মস্তিষ্কের কর্মদক্ষতা ঠিক রাখে। চোখ ও ত্বকসহ বিভিন্ন অংশের সুস্থতা রক্ষা করে। রক্ত গঠনে সাহায্য করে। শরীরে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের যথাযথ ব্যবহার করে স্বাস্থ্য ও কর্মদক্ষতা অটুট রাখে।
ভিটামিন বি কমপ্লেক্সের অভাবে বেরিবেরি, মুখে ঘা, পেলেগ্রা চর্মরোগ হয়। ভিটামিন সি-এর অভাবে স্কার্ভি রোগ হয়। ভিটামিন এ এর অভাবে রাতকানা রোগ হয়। ভিটামিন ডি-এর অভাবে শিশুদের রিকেট হয়। ভিটামিন ই-এর অভাবে প্রজনন ক্ষমতা কমে যায়।
লৌহ, আয়োডিন, ক্লোরিন, জিংক, ম্যাঙ্গানিজ, তাম্র, কোবাল্ট, মলিবডেনাম ইত্যাদি খুব সামান্য পরিমাণে দেহের পুষ্টি কাজে অংশ নেয় বলে এসব মৌলকে লেশ মৌল খনিজ লবণ বলে। কিন্তু এগুলো খুব সামান্য পরিমাণে প্রয়োজন হলেও এদের কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
খনিজ পদার্থ আমাদের দেহে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকে। যেমন কঠিন কোষকলা, হাড় ও দাঁত গঠন করে। রক্ত গঠন করে, হরমোন গঠনে সহায়তা করে এবং অভ্যন্তরীণ কাজসমূহ নিয়ন্ত্রণ করে।
পানির প্রধান উৎস হচ্ছে খাবার পানি, ডাবের পানি, দুধ, ফলের রস, স্যুপ ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের পানীয়। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের রসালো ফল যেমন- লিচু, জামরুল, তরমুজ ইত্যাদিতেও প্রচুর পরিমাণে পানি থাকে।
শরীরে প্রতিটি কোষের স্বাভাবিক কাজ বজায় রাখার জন্য পানি প্রয়োজন হয়। শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ বের করার জন্য পানির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখার জন্য পানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। খাদ্য পরিপাকে সহায়তা করে, ও কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ করে।
অতিরিক্ত গরম আবহাওয়া, আর্দ্রতা, ব্যায়াম অথবা জ্বরের কারণে ঘাম বেশি হওয়া। পর্যাপ্ত, পরিমাণে পানি পান না করা, ডায়রিয়া, হওয়া, অতিরিক্ত বমি হওয়া ইত্যাদি কারণে ডিহাইড্রেশন হয়।
খুব বেশি গরম আবহাওয়ার কারণে অনেক ঘাম হলে, জ্বর হলে, ডায়রিয়া হলে ও বমি হলে, অনেক বেশি পরিশ্রম করলে, খেলাধুলা করলে বা ব্যায়াম করলে, খাবারে আঁশজাতীয় খাদ্য বেশি থাকলে পানি বেশি খেতে হয়। স্তন্যদাত্রী মায়ের পানির চাহিদা বেশি হয়।
শরীরের গ্রহণ উপযোগী হতে হলে প্রথমে খাবার ভেঙে সরল ও শোষণযোগ্য উপাদানে পরিণত হবে। অর্থাৎ এদের মধ্যে অবস্থিত কার্বোহাইড্রেট ভেঙে গ্লুকোজে পরিণত হবে, প্রোটিন ভেঙে এমাইনো এসিডে পরিণত হবে। তারপর এই সরল উপাদানগুলো শোষিত হয়ে শরীরের পুষ্টি সাধন করবে।
খাবার খাওয়ার পর তা ভেঙে গিয়ে জটিল অবস্থা থেকে সরল অবস্থায় পরিণত হওয়াকে পরিপাক বলে এবং পরিপাক হওয়ার পর যে সরল উপাদানগুলো তৈরি হয় সেই উপাদানগুলো যে প্রক্রিয়ার রক্তস্রোতে প্রবেশ করে তাকে শোষণ বলে।
খাদ্য উপাদানের প্রকারভেদ, উৎস ও কাজ
আমরা জানি যে, খাদ্যকে ভাঙলে যে বিভিন্ন ধরনের জৈব রাসায়নিক উপাদান পাওয়া যায় তাদেরকে খাদ্য উপাদান বলে। এই উপাদানগুলো আমাদের শরীরে পুষ্টি সাধন করে, তাই এদেরকে পুষ্টি উপাদানও বলে। আমাদের খাদ্যে প্রধানত ছয় প্রকারের খাদ্য উপাদান বা পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায় যা নিচের ছকে দেখানো হলো।

আমরা এখন উল্লিখিত উপাদানগুলো সম্পর্কে জানব।
Related Question
View Allখাদ্যের মধ্যে বিভিন্ন প্রকার জটিল জৈব রাসায়নিক যৌগ রয়েছে যা জীবদেহে খুব সামান্য পরিমাণে প্রয়োজন হয়, সেগুলোকে ভিটামিন বলে।
মানবদেহের যে অঙ্গগুলো পরিপাক ও শোষণের কাজ করে তাদেরকে পরিপাকতন্ত্র বলে। আমরা যে খাবারগুলো খাই সেগুলোকে পরিপাকের মাধ্যমে শরীরের শোষণ উপযোগী করতে পরিপাকতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
১নং চিত্রের খাদ্যগুলো হলো দুধ, ডিম, মাংস ও ভাত।
দুধ, ডিম ও মাংস প্রোটিন জাতীয় খাদ্য। আর ভাত কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য। এ খাদ্যগুলো আমাদের দেহের জন্য বিশেষভাবে প্রয়োজন। যেমন-
- আমাদের দেহের অস্থি, রক্তকণিকা হতে শুরু করে দাঁত, চুল, নখ তৈরিতে প্রোটিন প্রয়োজন।
- ক্ষয়প্রাপ্ত কোষকলার গঠন ও ক্ষতস্থান সারাতে প্রোটিনের ভূমিকা রয়েছে।
- দেহে ফ্যাট ও কার্বোহাইড্রেটের ঘাটতি থাকলে প্রোটিন তাপ উৎপাদনের কাজ করে থাকে।
- শরীরে অ্যান্টিবডি (antibody) তৈরি করতে প্রোটিন সাহায্য করে।
- মানসিক বিকাশ বা মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য প্রোটিন অপরিহার্য।
- প্রোটিন শিশুদের দেহের বৃদ্ধি ঘটায়।
'২' নং চিত্রের খাদ্যগুলো হলো স্নেহজাতীয় খাদ্য। এ খাদ্যগুলো হলো ঘি, মাখন, সরিষার তেল ও নারকেল। এগুলো প্রয়োজনের তুলনায় কম খেলে মানবদেহে ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে বলে আমি মনে করি। স্নেহ জাতীয় খাদ্য আমাদের শরীরে তাপ ও শক্তি সরবরাহ করে। এ জাতীয় খাদ্য দেহ হতে তাপের অপচয় রোধ, চর্মরোগ থেকে রক্ষা এবং দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোকে সংরক্ষণ করে। এছাড়া এটি চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিনগুলো যেমন- এ, ডি, ই ও কে দ্রবীভূত করে দেহের গ্রহণ উপযোগী করে তোলে। এটি কোষ প্রাচীরের সাধারণ উপাদান হিসেবে ভূমিকা পালন করে। এর অভাব হলে শরীরে প্রয়োজনীয় তাপশক্তির ঘাটতি দেখা দেয়। এছাড়া এর অভাবে চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিনগুলোর ঘাটতি এবং চর্মরোগ দেখা দিতে পারে। এটি স্বল্প পরিমাণে গ্রহণ করলে যেমন শরীরের ক্ষতি হয় তেমনি প্রয়োজনের অধিক গ্রহণ করলে ওজন খুব তাড়াতাড়ি বৃদ্ধি পায়। তাই এটি পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রহণ করা উচিত।
খাবার খাওয়ার পর তা ভেঙে গিয়ে জটিল অবস্থা থেকে সরল অবস্থায় পরিণত হওয়াই হলো পরিপাক।
ডায়রিয়া হলে বার বার পাতলা পায়খানা হয়। তখন এর সাথে শরীর থেকে প্রচুর পানি বের হয়ে যায়। তাছাড়া ডায়রিয়ায় বমি হলেও এর সাথে শরীর থেকে পানি বের হয়ে যায়। এর ফলে ডিহাইড্রেশন দেখা দেয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!