খেলাধুলা শিশুর শারীরিক ও সামাজিক দক্ষতা অর্জনের সহজ মাধ্যম যা তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে খাপ খাওয়াতে সহায়তা করে। খেলা শিশুদের অভিজ্ঞতা বাড়ায়, আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করে এবং ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুত করে তোলে। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার চর্চা শিশুর বিনোদনের মাধ্যম।
শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সঞ্চালনের মাধ্যমে শিশুরা যে খেলাগুলো খেলে থাকে তাই অঙ্গ সঞ্চালনমূলক খেলা। যেমন-দৌড়াদৌড়ি, বল খেলা, সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা, গাছে চড়া, দোলা, দৌড়ঝাঁপ, ফুটবল, বৌছি, গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা ইত্যাদি।
আবিষ্কারমূলক খেলায় খেলনা ভেঙে যায়। অনেক সময় শিশু খেলনাকে দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে খেলনার গঠন রহস্য আবিষ্কার করতে চেষ্টা করে। এতে খেলনাটি ভেঙে যায় ঠিকই কিন্তু খেলনার ভিতরে যন্ত্রপাতি দেখে শিশু আনন্দ পায়। এ থেকে শিশু কীভাবে এগুলো তৈরি হয়েছে, কীভাবেই বা কাজ করে ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা লাভ করে।
সাধারণত দুই ও তিন বছর বয়সের শিশুরা বাস্তবজীবনের অনুকরণে অভিনয় করে খেলে। যেমন- শিশু মা সেজে খেলে, ডাক্তার ও রোগীর ভূমিকায় অভিনয় করে, গাড়িচালক, ফেরিওয়ালা, পাইলট ইত্যাদি চরিত্র অনুকরণ করে খেলে। একে কাল্পনিক বা নাটকীয় খেলা বলে। এই খেলা শিশুর কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি করে, সমাজে কার কী ভূমিকা বা দায়িত্ব সে সম্পর্কে ধারণা লাভ করে।
অনেক সময় শিশুরা নিজে অংশগ্রহণ না করে অন্যের খেলা দেখেও আনন্দ পায়। টিভি দেখা, গল্প শোনা ইত্যাদি এক ধরনের খেলা, যা থেকে শিশুরা আনন্দ লাভ করে। এতে ভাষার বিকাশ হয়, চিন্তা ও কল্পনাশক্তির বিকাশ ঘটে এবং সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায়।
যে খেলা গৃহের বাইরে খোলা মাঠ বা জায়গায় খেলা হয় তাকে বহিরাঙ্গন খেলা বলে। যেমন- ফুটবল, কাবাডি, ক্রিকেট, গোল্লাছুট, কানামাছি ইত্যাদি। এ ধরনের খেলায় অঙ্গ সঞ্চালন হয়, যা শারীরিক সুস্থতার জন্য প্রয়োজন।
অভ্যন্তরীণ খেলায় বুদ্ধিমত্তা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটে। গৃহ পরিবেশ অথবা আবদ্ধ স্থানে অনুষ্ঠানযোগ্য খেলাকে অভ্যন্তরীণ খেলা বলে। যেমন- দাবা, বাগাডুলি, ব্লক দিয়ে খেলা, ছবি আঁকা ইত্যাদি।
খেলাধুলার ফলে শিশুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নাড়াচাড়ার ফলে ব্যায়াম হয় এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুগঠিত হয়। রক্ত চলাচল ভালো হয়। দূষিত পদার্থ ঘামের মাধ্যমে দেহ থেকে বের হয়ে যায়। মাংস পেশি সতেজ ও সবল করে। পেশি চালনার নৈপুণ্য অর্জিত হয়। হজম শক্তি বৃদ্ধি পায়, ঘুম ভালো হয়।
শহরকেন্দ্রিক নাগরিক জীবনে পর্যাপ্ত খেলার মাঠের অভাবে শিশুরা গৃহের ভিতরের খেলা খেলতে বাধ্য হয়। এর মধ্যে কম্পিউটার গেইম অন্যতম। কম্পিউটারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেলায় কোনো অঙ্গ সঞ্চালন হয় না, অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সুগঠিত হয় না, দেহের ওজন বেড়ে যেতে পারে, ঘাড়ে, পিঠ ও কোমরে ব্যথা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। চোখের নানা রকম সমস্যা হতে পারে।
খেলাধুলা আমাদের সামাজিক গুণাবলি অর্জনে সাহায্য করে। দলগত খেলার মাধ্যমেই সাধারণত শিশু সামাজিক গুণগুলো অর্জন করে। যেমন- খেলার মাধ্যমে শিশু যখন অন্যের সাথে মেলামেশা করে, কথা বলে, দল গঠন করে, দলে নেতৃত্বে দেয় তখন থেকেই শিশুর মধ্যে সামাজিকতার বিকাশ ঘটে।
শিশু জন্মের প্রথম বছরে একা একা নিজের হাত-পা নিয়ে খেলে, একে বলে একাকী খেলা। কোনো জিনিস নেড়েচেড়ে দেখে, চুষে ও বাজিয়ে শব্দ করে সে আনন্দ পায়। এখানে বস্তুর ব্যবহার থাকতে পারে আবার নাও পারে। এ বয়সে তার সামাজিক বিকাশ হয় না বলেই সে একা একা খেলে।
পাশাপাশি খেলা সামাজিকতার প্রথম ধাপ। একে অন্যের সাথে না খেলে পাশাপাশি বসে একই সরঞ্জাম দিয়ে খেলে। তাদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ থাকে না। এটাই সামাজিকতার প্রথম ধাপ। দেড় থেকে তিন বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা এই ধরনের খেলা খেলে।
সমবায় খেলা শিশুরা দল গঠন করে খেলে। যেমন- ক্রিকেট, ফুটবল, হাডুডু ইত্যাদি। শৈশবে নিজেরাই খেলার নিয়মকানুন তৈরি করে খেলে। ফলে তাদের মধ্যে দলীয় নিয়মকানুন মেনে চলা, সচেতনতা, সহযোগিতা করার প্রবণতা ইত্যাদি সামাজিক গুণাগুণ বৃদ্ধি পায়।
সৃজনশীলতা অর্থ হচ্ছে নিজের উদ্ভাবনী ক্ষমতার প্রকাশ বা নতুন কিছু সৃষ্টি করার ক্ষমতা। কাগজ, কাঠের টুকরা, কাদা, বালু, ব্লক, ফুল, ডাল, পাতা, ফেলে দেওয়া বিভিন্ন ধরনের জিনিস যেমন-কাগজের বাক্স, ডিসপোজেবল বল, কৌটা ইত্যাদি দিয়ে শিশু যখন নতুন কিছু তৈরি করে তখনই সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটে।
বুদ্ধিমত্তা ও সৃজনশীলতা বিকাশে চিন্তার সহজ ব্যবহার ও স্বকীয়তা বা নিজ স্বত্তা প্রয়োজন। চিন্তার সহজ ব্যবহার সৃজনশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিশুরা ছবি এঁকে, রং করে, গল্প ও কবিতা লিখে নিজের চিন্তাকে প্রকাশ করতে পারে। আর সৃজনশীল আচরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সবসময় স্মৃতিকে ব্যবহার না করে নতুন কিছু সৃষ্টির চিন্তা করা।
শিশুদের খেলার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া গঠনমূলক, আবিষ্কারমূলক ও সৃজনশীল খেলায় শিশুকে উৎসাহিত করা। খেলা যাতে শিশুর কৌতূহল বাড়াতে পারে, সেদিকে লক্ষ্য রেখে খেলার উপকরণের ব্যবস্থা করা। শিশুদের খেলার সরঞ্জাম নিরাপদ ও আকর্ষণীয় হওয়া, খেলার স্থান পর্যাপ্ত আলো ও বাতাস, পূর্ণ, খোলামেলা ও নিরাপদ হওয়া।
শখ শব্দের অর্থ হচ্ছে মনের ঝোঁক বা আগ্রহ। আর বিনোদন হচ্ছে তাই যা মনকে প্রফুল্ল রাখে। শিশুদের মধ্যে বিচিত্র ধরনের শখ লক্ষ করা যায়। শখ ও বিনোদন অনেকটা নির্ভর করে নিজের ইচ্ছা শক্তি ও পরিবেশের ওপর।
হ্যাঁ, আছে। যেমন- ডাকটিকিট সংগ্রহ করে দেশ ও বিদেশ সম্পর্কে জানা যায়। ছড়া, রম্যরচনা, মুক্তিযুদ্ধের বই পড়ে জ্ঞানভান্ডার, কল্পনা ও চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি পায়। ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণ করে জ্ঞান ভান্ডার সমৃদ্ধ করা যায়। বিভিন্ন দেশের মুদ্রা থেকে দেশের কৃষ্টি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জ্ঞান লাভ হয়। বাগান করা ও পশুপাখি পালনের মাধ্যমে শিশুর সার্বিক বিকাশ ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায়।
শিশুর খেলা
শিশুরা খেলে, কারণ খেলা তাদের আনন্দ দেয়। খেলা শুধু আনন্দই দেয় না, খেলার মাধ্যমে শিশুর দৈহিক, মানসিক, সামাজিক দক্ষতার বিকাশ ঘটে। লাধুলা বুদ্ধিমত্তা বাড়ায়, সহনশীলতা ও সহমর্মিতা শেখায় এবং ভাগাভাগি করে নেওয়ার মনোভাব তৈরিতে সাহায্য করে। খেলাধুলার মধ্য দিয়ে শিশু-সঙ্গী সাথিদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। শিশুরা নিজেকে অন্যের কাছে প্রকাশ করতে পারে, অন্যকে বুঝতে শেখে, অন্যের অনুভূতিকে মূল্য দিতে শেখে। খেলাধুলা তাদের মধ্যে ন্যায় ও অন্যায় বোধ জাগ্রত করে। খেলার মধ্য দিয়ে শিশুরা কল্পনা ও নতুন কিছু সৃষ্টির চর্চা করে।
শৈশবের প্রথম বছরগুলোতে যখন শিশুর মস্তিষ্ক পড়াশোনার জন্য প্রস্তুত থাকে না, তখন খেলার মধ্য দিয়ে শিশুরা অনেক কিছু শিখতে পারে। যেমন- শব্দ, অক্ষর, সংখ্যা মুখস্থ করার চেয়ে খেলার মাধ্যমে শিশুকে শেখানো সহজ হয়। আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত যে, খেলা শিশুর সার্বিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকেরা দেখেছেন যে, খেলাধুলা শিশুর শারীরিক ও সামাজিক দক্ষতা অর্জনের সহজ মাধ্যম যা তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে খাপ খাওয়াতে সহায়তা করে। খেলা শিশুদের অভিজ্ঞতা বাড়ায়, আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করে এবং ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুত করে তোলে। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার চর্চা শিশুর বিনোদনের মাধ্যম। খেলাধুলা শিশুকে অপরাধ প্রবণতা থেকে রক্ষা করে। যেসব শিশুর কোনো ধরনের প্রতিবন্ধিতা আছে খেলাধুলা তাদের জন্য উদ্দীপনা হিসেবে কাজ করে।
Related Question
View Allবিভিন্ন দেশের মুদ্রা ভিন্ন ভিন্ন রকম হয়ে থাকে। এদের নামও ভিন্ন।
মুদ্রায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, স্থান ও প্রতীকের ছাপ থাকে। যেমন- বাংলাদেশের মুদ্রার উপর শাপলা, যমুনা সেতু, পরিবার ইত্যাদির ছবি আছে। এসব ছবি থেকে বাংলাদেশের কৃষ্টি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়। তাই মুদ্রা সংগ্রহ বিনোদনের পাশাপাশি জ্ঞান বৃদ্ধিতেও সহায়ক।
ফারাজের অবসর সময় কাটানোর উপায়টি বুদ্ধিমত্তা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটায়।
সে অবসর সময়ে কাগজ কেটে বিভিন্ন রকম ফুল, পাখি ও নকশা তৈরি করে, যা তার সৃজনশীল গুণাবলিকে বিকশিত করে। এর মাধ্যমে ফারাজ
নিজের উদ্ভাবনী ক্ষমতার প্রকাশ বা নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারবে। এছাড়া ডাকটিকিট সংগ্রহের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের নাম, প্রতীক, ঐতিহ্য সম্পর্কে সে জানতে পারবে। আবার ছড়া, রম্য রচনা, মুক্তিযুদ্ধের বই, কার্টুন, রহস্যমূলক বই, গল্প, বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের জীবনী পড়ে ফারাজের জ্ঞান ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে এবং কল্পনা ও চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটবে। এভাবেই অবসর সময় কাটানোর উপায়গুলো ফারাজের বুদ্ধি ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাবে।
খেলাধুলা আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দলগত খেলার মাধ্যমে আমরা সামাজিক গুণাগুণ অর্জন করি।
খেলাধুলার মাধ্যমে আমরা যখন অন্যের সাথে মেলামেশা করি, কথা বলি, দল গঠন করি তখন আমাদের মধ্যে সামাজিক বিকাশ ঘটে। এছাড়া খেলাধুলার মাধ্যমে আমাদের দলীয় নিয়মকানুন মেনে চলা, সচেতনতা ও একে অপরকে সহযোগিতা করার প্রবণতা গড়ে ওঠে। যেমন- ফুটবল, হা-ডু-ডু, ক্রিকেট, কানামাছি ইত্যাদি দলগত খেলা সামাজিক বিকাশ ঘটায়।
ফারাজ ফুটবল টিমের নির্ভরযোগ্য একজন গোলকিপার। যেহেতু ফুটবল খেলা সামাজিক বিকাশ ঘটায় সেহেতু আমরা বলতে পারি, ফারাজকে অনুসরণ করার মাধ্যমে সামাজিক গুণাবলি অর্জন সহজেই সম্ভব। এছাড়া ফারাজ প্রতিবেশির বিপদে আপদে সহযোগিতা করার চেষ্টা করে, যার মাধ্যমেও সামাজিক গুণ অর্জন সম্ভব।
প্রতিটি সুস্থ শিশু দিনের অধিকাংশ সময় খেলাধুলা করে কাটায়।
শিশু জন্মের প্রথম বছরে একা একা নিজের হাত-পা নিয়ে খেলে।
দেড় থেকে তিন বছর বয়সী শিশুরা সাধারণত একে অন্যের সাথে না খেলে পাশাপাশি বসে একই খেলনা দিয়ে খেলে। তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুরা পরস্পরের মধ্যে খেলার সামগ্রী বিনিময় করে খেলে। পাঁচ-ছয় বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে দল গঠন করে খেলার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এভাবেই বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে খেলার প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!