বৌদ্ধধর্ম অনুসারে এক জন্মের কর্মফলে কেউ বুদ্ধ হতে পারেন না। বোধিসত্ত্ব নানারূপে নানাকুলে জন্মগ্রহণ করে দান, শীল, পারমী ইত্যাদি পালনপূর্বক চরিত্রের উৎকর্ষ সাধন করেছিলেন। বোধিসত্ত্ব পাঁচশ পুঞ্চাশতম জন্মে বোধিজ্ঞান লাভ করে বুদ্ধ হন।
বানরেন্দ্র জাতকে একটি বানরের কাহিনি ফুটে উঠেছে। বোধিসত্ত্ব নিজেই বানররূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আলোচ্য কাহিনিতে কুমিরের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর হৃৎপিন্ড অর্থাৎ কলিজা খাওয়ার সাধ হয়েছিল।
দেবধর্ম জাতক কাহিনির মধ্যে বোধিসত্ত্বরূপী মহিংসাস কুমাররা তিন ভাই ছিলেন। দুই ভাই আপন এবং অপরজন ছিলেন সন্ডাই। তাদের নাম হচ্ছে- ১. মহিংসাস কুমার; ২, চন্দ্রকুমার এবং ৩. সূর্যকুমার।
বোধিসত্ত্ব ব্রাহ্মণকুলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর শিষ্যদের নিয়ে হিমবন্ত প্রদেশে ধ্যান সাধনা করে জীবন যাপন করতেন। তাঁর এক শিষ্যকে হস্তীশাবক মেরে ফেলেছিল। সেখানে বোধিসত্ত্ব বলেছেন, যিনি মিত্র-অমিত্রের দোষগুণ দেখেশুনে কাজ করেন তিনি বুদ্ধিমান।
সাধারণ অর্থে 'জাতক' শব্দের অর্থ 'যে জন্মগ্রহণ করেছে'। কিন্তু বৌদ্ধধর্মে জাতক শব্দটি বিশেষ অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। বৌদ্ধ সাহিত্যে গৌতম বুদ্ধের অতীত জীবনের কাহিনিগুলো জাতক নামে পরিচিত। জাতকের সব কাহিনিই উপদেশমূলক, যা মানুষকে কুশলকর্ম সম্পাদনে উদ্বুদ্ধ করে।
জাতক সূত্রপিটকের অন্তর্গত খুদ্দক নিকায়ের একটি অনন্য গ্রন্থ। জাতকের গঠনশৈলী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রত্যেকটি জাতক তিনটি অংশে বিভক্ত। যথা-
ক. প্রত্যৎপন্নবস্তু,
খ. অতীত 'বস্তু বা মূল আখ্যান ও
গ. সমাধান।
জাতকের দ্বিতীয় অংশ তথা অতীত বস্তুকে মূল আখ্যায়িকাও বলা হয়ে থাকে। এই অংশে ভগবান বুদ্ধের অতীত জন্মবৃত্তান্ত এবং সেন সময়কার সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনাবলি বর্ণিত আছে। আর এই অংশগুলোই হচ্ছে প্রকৃত জাতক কাহিনি। তাই একে মূল আখ্যায়িকা বলা হয়।
জাতকের প্রথম অংশের নাম প্রত্যুপন্নবস্তু। একে বর্তমান কথাও বলা হয়। এই অংশে বুদ্ধ কার উদ্দেশে, কী উপলক্ষে কাহিনিটি বলেছিলেন এবং কোথায় বলেছিলেন তার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। তাই এই অংশটিকে জাতকের উপক্রমণিকা বা ভূমিকাও বলা হয়ে থাকে।
জাতক প্রাচীন ইতিহাসের এক অফুরন্ত ভান্ডার। জাতকে বুদ্ধের সমকালীন সমাজ ব্যবস্থা, শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি, ধর্ম, দর্শন, অর্থনীতি, পুরাতত্ত্ব, ইতিহাস সম্পর্কে প্রচুর তথ্য পাওয়া যায়। তাই প্রাচীন ভারতের ইতিহাস জানার জন্য জাতক পাঠের গুরুত্ব অপরিসীম।
বানররূপী বোধিসত্ত্ব কৌশলে কুমিরের হাত থেকে প্রাণ রক্ষা করলে কুমির অবাক হয়ে বানরের উদ্দেশে বলেন, 'বানরেন্দ্র চারটি গুণ থাকলে সব শত্রু জয় করা যায়। সেই চারটি গুণ হলো- সত্য, ধৈর্য, ত্যাগ আর বিচক্ষণতা। তোমার মধ্যে এই চারটি গুণই আছে। তোমাকে নমস্কার।'
রাজা ব্রহ্মদত্তের দ্বিতীয় রানি পূর্বপ্রাপ্ত এক বরে তাঁর পুত্র সূর্যকুমারকে রাজা বানাতে চান। কিন্তু ব্রহ্মদত্ত বলেন, আমার বড় দুই ছেলে আগুনের মতো তেজস্বী। আমি তাদের রেখে ছোট কুমারকে রাজা করতে, পারি না। আমার মৃত্যুর পর নিয়মানুযায়ী বড় ছেলেই রাজত্ব পাবে। এই ভেবে তাদের বনে যেতে বলেন।
বোধিসত্ত্ব বলেছিলেন, "যে দেখা করতে এসে হাসে না। অভিভন্দনের সাড়া দেয় না, মুখ ফিরিয়ে রাখে। বলে এক, করে অন্য। এরূপ ব্যক্তিই শত্রুভাবাপন্ন।"
"আর যে উপকার করে। মঙ্গল কামন করে। মিষ্টভাষী হয়। দুর্দিনে সাহায্য করে। কারোর ক্ষতি করে না। যে সুমিত্র নামে কথিত হয়।"
মহিংসাস কুমার বলেন, সবচেয়ে ছোট ভাইটি তাঁর সৎ ভাই। আমার বিামাতা ওকে রাজা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পিতা রাজি হননি। আমাদের ছোট ভাই সব শুনে আমাদের সাথে বনবাসী হয়। সে আমাদের ফেলে যায়নি। তাই এখন রাক্ষস তাকে হত্যা করেেেছ একথা কেউ বিশ্বাস করবে না। এ কারণে আমি তাঁর প্রাণ ফেরত চাইছি।
বোধিসত্ত্ব জলরাক্ষুসকে বলেন, "তুমি অতীত জন্মে পাপ করেছিলে বলে রাক্ষস হয়েছো। এতেও তোমার শিক্ষা হয়নি। এ জন্মেও তুমি পাপ করছ। এর ফলে তুমি মৃত্যুর পর নরকে থাকবে। কষ্ট পাবে। সুতরাং এখন থেকে সৎকর্ম কর, সৎপথে চলে আসো। তাহলে মুক্তি পাবে।"
জাতক শুধু কাহিনি নয়, এগুলো ভগবান বুদ্ধের উপদেশও। জাতকের কাহিনিগুলোতে সদাচরণ, জীবে দয়া, সংযম, দানের মহিমা, নৈতিক জীবনের উৎকর্ষ সাধন ও উপকারিতা প্রভৃতি বিষয়ে হিতোপদেশ রয়েছে। এসব গুণাবলি আমাদের নৈতিক ও আদর্শ জীবন গঠন এবং ধর্মানুশীলনের শিক্ষা দেয়।
'জাতক' শব্দের অর্থ যে জন্মগ্রহণ করেছে। কিন্তু বৌদ্ধধর্মে 'জাতক' শব্দটি বিশেষ অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে এবং বৌদ্ধ সাহিত্যে গৌতম বুদ্ধের অতীত জীবনের কাহিনিগুলো জাতক নামে অভিহিত। জাতকের সর কাহিনিই উপদেশমূলক। মানুষকে কুশলকর্ম সম্পাদনে উদ্বুদ্ধ করাই জাতকের উদ্দেশ্য। অতএব বলা যায়, গৌতম বুদ্ধের বোধিসত্ত্বকালীন জন্মকাহিনি থেকে মানুষকে নৈতিক শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করার নিমিত্তে জাতকের উৎপত্তি হয়।
গৌতম বুদ্ধ জাতকের কাহিনির মাধ্যমে ধর্মের গভীর মর্মবাণী সাবলীল ভাষায় বর্ণনা করেছেন। এজন্য জাতক শুধুমাত্র কাহিনি নয়, এগুলো ভগবান বুদ্ধের উপদেশ। প্রতিটি জাতকে তিনি একেকটি নৈতিক শিক্ষণীয় বিষয় তুলে ধরেছেন। তাই জাতক পাঠ করে নৈতিক শিক্ষা লাভ করা যায়।
বানর এক নদীর তীরে বিচরণ করতেন। নদীর অপর পাড়ে ছিল একটি আম-কাঁঠালের দ্বীপ। বানর সে নদীর তীরে থাকতেন। সে নদীর মাঝখানে একটি শৈল পর্বত ছিল। বানর প্রতিদিন নদীর তীর থেকে এক লাফে সেই পর্বতের উপর এবং সেখান থেকে এক লাফে দ্বীপে গিয়ে পড়তেন। এভাবেই বানর লাফিয়ে লাফিয়ে এপার থেকে ওপারে যেত।
বোধিসত্ত্ব রাক্ষসকে সৎপথে আনার জন্য বললেন, তুমি অতীত। জন্মে পাপ করেছিল বলে রাক্ষস হয়েছ। এতেও তোমার শিক্ষা হয়নি। এ জন্মেও তুমি পাপ করেছ। এর ফলে তুমি মৃত্যুর পর নরকে থাকবে, কষ্ট পাবে। সুতরাং এখন থেকে সৎকর্ম কর, সৎপথে চলে এসো, তাহলে তুমি মুক্তি পাবে।
জাতক সূত্রপিটকের অন্তর্গত খুদ্দকনিকায়ের একটি অনন্য গ্রন্থ। এই গ্রন্থে গৌতম বুদ্ধের অতীত জীবনের বিভিন্ন কাহিনি ও ঘটনা বর্ণিত আছে। জাতকের কাহিনিগুলো নৈতিক শিক্ষায় সমৃদ্ধ। জাতকগুলোতে প্রসঙ্গক্রমে প্রাচীন ভারতের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি, সাহিত্য, পুরাতত্ত্ব প্রভৃতি বিষয় আলোচিত হয়েছে। তাই জাতককে প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উৎস বা আধার হিসেবে গণ্য করা হয়। ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাস রচনায় জাতকের গুরুত্ব অপরিসীম। এশিয়া মহাদেশের সাহিত্যের বিকাশ সাধনেও জাতকের অসীম প্রভাব রয়েছে। এ অধ্যায়ে আমরা জাতকের উৎপত্তি, গঠনশৈলী এবং কয়েকটি জাতক পাঠ করব।
এ অধ্যায় শেষে আমরা -
- জাতকের উৎপত্তি এবং জাতকের গঠনশৈলী ব্যাখ্যা করতে পারব।
- জাতকের বিভিন্ন কাহিনি বর্ণনা করতে পারব।
- জাতক পাঠ করে প্রাচীন সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে বর্ণনা করতে পারব।
Related Question
View Allজাতক প্রধানত তিনটি অংশে বিভক্ত।
জাতক পাঠের প্রয়োজনীয়তা অনেক। জাতকে বর্ণিত হয় নৈতিক শিক্ষা। এটি ইতিহাসের ভান্ডারও বটে। এখানে সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, ধর্ম, দর্শন, পুরাতত্ত্ব সম্পর্কে প্রচুর তথ্যা পাওয়া যায়। সৎও অসৎ কর্মের পরিণতি সম্পর্কে জানা যায়, কুসংস্কার দূর হয়।
দেবধর্ম জাতকের সাথে উদ্দীপকের কাহিনির মিল রয়েছে। এখানে যক্ষের চরিত্রের মধ্যদিয়ে জলরাক্ষসের কর্মকান্ড ফুটে উঠেছে। দেবধর্ম জাতকে তিন রাজকুমার যখন বনে বসবাস করতে গিয়েছিল তখন বোধিসত্ত্ব বা মহিংসায় কুমার তাঁর ছোট ভাই সূর্যকুমারকে এক সরোবরে গিয়ে স্নান করে এবং তাঁদের জন্য জল নিয়ে আসতে বলেছিল। কিন্তু সূর্যকুমারকে ফিরতে দেরি দেখে বোধিসত্ত্ব চন্দ্রকুমারকে ছোট ভাইয়ের খোঁজে পাঠালেন কিন্তু দ্বিতীয় রাজকুমারকেও ফিরে আসতে দেরি দেখে বোধিসত্ত্ব অনুধাবন করলেন নিশ্চয় সরোবরে জলে জলরাক্ষস রয়েছে, যে তাদেরকে আটক করে রেখেছে। বোধিসত্ত্ব সশস্ত্র অবস্থায় সরোবরের পাড়ে গেলেন এবং চিন্তার মিল পেলেন। জলরাক্ষসকে দেবধর্মের উত্তর দিয়ে দুই ভাইকে ছাড়িয়ে এনেছিলেন। বোধিসত্ত্বের কথায় মুগ্ধ হয়ে জলরাক্ষস পাপকর্ম ছেড়ে দিয়েছিল।
আমরা জানি, সত্যের জয় অনিবার্য। সৎভাবে জীবনযাপন করতে হলে প্রয়োজন নিজ নিজ ধর্মজ্ঞান। অন্যথায় এটি সম্ভব নয়। দেবধর্ম জাতকে বোধিসত্ত্ব তাঁর ধর্মজ্ঞনের প্রভাবে সরোবরের জলরাক্ষসের হাত থেকে আটকে পড়া দুই ভাইকে মুক্ত করে আনতে পেরেছিলেন।
বোধিসত্ত্ব এতই সৎ ছিলেন যে, সে তার আপন ভাইকে ছেড়ে দেওয়ার কথা জলরাক্ষসকে বলেননি; বরং তিনি তার সৎভাইকে বাঁচানোর জন্য জলরাক্ষসকে অনুরোধ করেছিলেন। সূর্যকুমার এবং চন্দ্রকুমার রাক্ষসের করা প্রশ্নের উত্তর যথাযথভাবে না দিতে পারায় তাদেরকে আটক থাকতে হয়েছিল। কিন্তু বোধিসত্ত্বরূপী মহিসাংস কুমার তার ধর্মজ্ঞানের কারণেই এবং ধর্মপথে চলার ফলেই শেষ পর্যন্ত দুই ভাইকেই মুক্ত করতে পেরেছিলেন।
দেবধর্ম জাতকে বোধিসত্ত্বের নাম ছিল মহিংসাস কুমার।
রাজার মোট তিনজন রাজপুত্র ছিল। এর মধ্যে রাজকুমার মহিংসাস এবং রাজকুমার চন্দ্রকুমার ছিল আপন ভাই। তাঁদের মা মৃত্যুবরণ করলে রাজা পুনরায় বিবাহ করলে সেই ঘরে রাজকুমার সূর্যকুমারের জন্ম হয়। সূর্যকুমারের মায়ের বর্ণনানুযায়ী সূর্যকুমারকে রাজা করার কথা বললে রাজা তার বড় দুই ছেলে বাদ দিয়ে ছোট ছেলেকে রাজত্ব দিতে চাইলেন না। তাই বড় দুই ছেলেকে সৎমায়ের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বনে যাওয়ার পরামর্শ দেন। যখন বড় দুই ছেলে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে যাওয়ার সময় ছোট ভাই সূর্যকুমারও তাঁদের সাথে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে বনে চলে গিয়েছিলেন।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!