গৃহীরা পূর্ণিমা, অমাবস্যা এবং অষ্টমী তিথিতে অষ্টশীল পালন করেন।
বুদ্ধ ধর্মময় উন্নত জীবন গঠনের জন্য অষ্টশীলের প্রবর্তন করেছেন। অষ্টশীল পালনকারীকে উপবাসব্রত পালন করতে হয়। তাই অষ্টশীলকে উপোসথ শীলও বলা হয়। উপোসথ শীল বলতে মূলত অষ্টশীলকেই বোঝায়।'
অষ্টশীল পালনকারীর পাঁচটি করণীয় বিষয় নিম্নরূপ-
(ক) কারও অনিষ্ট কামনা করা কিংবা অনিষ্ট করা বা করানো থেকে বিরত থাকতে হবে।
(খ) কোনো প্রাণীকে পীড়া দেওয়া এবং পীড়া দানের কারণ হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
(গ) কোনো প্রকার অন্যায় করা কিংবা অন্যায়ের কারণ হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
(ঘ) লোভ-দ্বেষ-মোহমুক্ত থাকতে হবে।
(ঙ) সর্বপ্রকার মিথ্যাচার থেকে বিরত থাকতে হবে।
আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গসমূহের নামগুলো হলো- সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক জীবিকা, সম্যক প্রচেষ্টা, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি।
নৈতিক জীবন গঠনের দিকনির্দেশনা হলো 'শীল'। শীল শব্দের অর্থ হচ্ছে স্বভাব বা চরিত্র। যা নিয়ম, শৃঙ্খলা, নৈতিকতা, সদাচার অর্থেও ব্যবহৃত হয়। শিল কায়-মন-বাক্য সংযত করে। মনের কলুষতা দূর করে। নৈতিক জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করে। প্রত্যেক বৌদ্ধধর্মের অনুসারীর শীল পালন অপরিহার্য।
'উপোসথ' শব্দটি উপবাস বা উপবাসক শব্দ হতে গৃহীত। কিন্তু বৌদ্ধমতে, উপোসথ অর্থ কেবল উপবাস করা নয়। উপোসথ গ্রহণকারীকে ধ্যান-সমাধি চর্চা করতে হয়। ধর্মালোচনা শ্রবণ করতে হয়। ধর্মীয় বিষয় অধ্যয়ন করতে হয়। লোভ-মোহ-দ্বেষ ও তৃষ্ণা, মুক্ত হয়ে ব্রহ্মচর্য পালন করতে হয়।
অষ্টশীল গ্রহণের পূর্বে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে হয়। ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃকৃত্য 'সম্পন্ন করে পরিষ্কার পোশাক পরিধান করতে হয়। পূজা ও দানসামগ্রী নিয়ে বিহারে গিয়ে বুদ্ধবেদিতে সেগুলো সাজিয়ে রেখে ভিক্ষুর সামনে বসে অষ্টশীল প্রার্থনা করতে হয়।
আটটি শীল পালন করতে হয় বলে একে বলা হয় অষ্টশীল। প্রথম চারটি শীল হলো-
১. আমি প্রাণীহত্যা থেকে বিরত থাকব।
২. আমি অদত্ত বস্তু গ্রহণ থেকে বিরত থাকব।
৩. আমি অব্রহ্মচর্য থেকে বিরত থাকব।
৪. আমি মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকব।
এভাবে আটটি শিক্ষাপদ গ্রহণ করা হয়।
অষ্টশীল গ্রহণের জন্য ভিক্ষুকে বন্দনা করে ভিক্ষুর নিকট। ত্রিশরণসহ অষ্টশীল প্রার্থনা করতে হয়। ভিক্ষু অষ্টশীল প্রার্থনা অনুমোদন করে ত্রিশরণসহ অষ্টশীল প্রদান করেন। ভিক্ষুর নির্দেশনা মতো অষ্টশীল গ্রহণ করতে হয়। তবে গৃহে হলে বুদ্ধাসনের সামনে বসে নিজে প্রার্থনাসহ অষ্টশীল গ্রহণ করতে হয়।
'নীতি' থেকে 'নৈতিকতা' শব্দের উৎপত্তি। আর যা নৈতিকতার পরিপন্থি তাই অনৈতিক। এই অনৈতিক কাজের কারণে মানুষ ইহজগতে যেমন সীমাহীন দুঃখ ভোগ করে, পরকালেও তেমনি নরক যন্ত্রণা ভোগ করে। শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চরিত্র ও মানবিক মূল্যবোধের পতন হয়। ফলে সর্বত্র নিন্দিত হয়।
সংসারে অবস্থান করে সবসময় অষ্টশীল পালন করা সম্ভব নয়। উপোসথ দিবসে অষ্টশীল গ্রহণকারীদের যথাসম্ভব বিহারের অবস্থান করে ধর্ম শ্রবণ, ধর্মালোচনা, সূত্রপাঠ, ধ্যান-সাধনা করতে হয়। ভিক্ষু না থাকলে নিজে নিজে তা পালন করতে হয়। শীল ভঙ্গ হয় এমন কোনো কাজ বা স্থান ত্যাগ করতে হয়।
জগৎ দুঃখময়। তৃষ্ণাই দুঃখের মূল কারণ। নিয়মিত অষ্টশীল পালন তৃষ্ণা দুরীভূত করতে সাহায্য করে। কেননা, এর মাধ্যমে। আমাদের চিত্ত সংযত হয় এবং আত্মসংযমের মাধ্যমে আমরা অকুশলকর্ম হতে বিরত থাকি। ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনযাপন করতে পারি। তাই অষ্টশীল পালন করা গুরুত্বপূর্ণ।
নেশাদ্রব্য আমাদের শারীরিক ও মানসিক উভয় বিকারগ্রস্ত করে। ধন-সম্পদ নষ্ট হয়। চরিত্র ও মানবিক মূল্যবোধের অধঃপতন, ঘটায়। নেশা সেবনকারীরা নানারকম অপরাধে লিপ্ত হয়। অনেক সময় ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত বরণ করে। তাই নেশাদ্রব্য গ্রহণ ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
অষ্টশীল পালনের সুফল বহুবিধ। নিচে পাঁচটি সুফল দেওয়া হলো-
১. আচার-আচরণ সংযত হয়।
২. যশ-খ্যাতি ক্রমশ বৃদ্ধি পায়।
৩. সৎকাজে উৎসাহ বৃদ্ধি পায়।
৪. অশেষ পুণ্য অর্জিত হয়।
৫. নির্বাণের পথে অগ্রসর হওয়া যায়।
'অষ্টশীল' শব্দের অর্থ আট। আটটি শীল পালন করতে হয় বলে একে অষ্টশীল বলা হয়। অষ্টশীল পঞ্চশীলের উচ্চতর স্তর। অষ্টশীল প্রতিদিন পালন করা যায়। তবে, গৃহী বোদ্ধারা সাধারণত পূর্ণিমা, অমাবস্যা এবং অষ্টমী তিথিতে অষ্টশীল পালন করে।
অষ্টশীল গ্রহণের পূর্বে মানসিক প্রস্তুতি নিতে হয় এবং ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃকৃত্য সম্পন্ন করে পরিষ্কার পোশাক পরিধান করতে হয়। পূজা ও দান সামগ্রী নিয়ে বিহার যেতে হয়। শ্রদ্ধাচিত্তে পূজা ও দান সামগ্রী সুন্দরভাবে সাজিয়ে রেখে ভিক্ষুর সামনে বসতে হয়। ভিক্ষু অষ্টশীল প্রার্থনা অনুমোদন করে ত্রিশরণসহ অষ্টশীল প্রদান করেন। ভিক্ষুর নির্দেশনা মতো অষ্টশীল গ্রহণ করতে হয়।
নিচে গৃহী শীল ও শ্রামণ্য শীলের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরা হলো-গৃহী বা উপাসক-উপাসিকারা নিত্য পঞ্চশীল পালন করে থাকে। তারা পূর্ণিমা, অমাবস্যা ও অস্টমী তিথিতে অষ্টশীলও পালন করে। সুতরাং পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গৃহীদের প্রতিপাল্য বিষয়।
পক্ষান্তরে, গৃহীদের মধ্যে যারা প্রব্রজ্যা ধর্মে দীক্ষা নেন তাদের শ্রামণ বলা হয়। শ্রামণ হচ্ছে গৃহী ও ভিক্ষুর মধ্যবর্তী স্তর। শ্রামণদের দশশীল অবশ্য পালনীয়। তাদেরকে বিহারে প্রাত্যহিক কর্মও সম্পন্ন করতে হয়। সকাল-বিকেল ভিক্ষুর নিকট দশশীল গ্রহণ করতে হয়। সুতরাং গৃহী শীলদের থেকে শ্রামণ্য শীলদের বেশি কর্ম পালন করতে হয়।
প্রব্রজ্যা ধর্মে দীক্ষা নিয়ে দশশীল গ্রহণ করতে হয়। দশশীল গ্রহণ করার সময় নতজানু হয়ে হাতজোড় করে বসতে হয়। প্রথমে ত্রিরত্ন বন্দনা করতে হয়। তারপর গুরু ভিক্ষুর নিকট দশশীল প্রার্থনা করতে হয়। আবৃত্তি করার সময় পালি ও বাংলা উচ্চারণ শুদ্ধভাবে করতে হয়।
'শীল' নৈতিক জীবন গঠনের দিক নির্দেশনা। শীল পালন বৌদ্ধদের অপরিহার্য নিত্যকর্ম। গৃহে কিংবা বিহারে যে কোনো আচার-অনুষ্ঠানের প্রারম্ভে শীল গ্রহণ করা হয়। কারণ, শীল সকল কুশলকর্মের উৎস। বৌদ্ধরা বিভিন্ন রকম শীল পালন করেন। যেমন: গৃহীরা পঞ্চশীল ও অষ্টশীল, শ্রমণরা দশশীল এবং ভিক্ষুগণ ২২৭টি শীল পালন করেন। এ অধ্যায়ে আমরা অষ্টশীল সম্পর্কে পড়ব।
এ অধ্যায় শেষে আমরা -
- অষ্টশীল বর্ণনা করতে পারব।
- অষ্টশীল পালনের প্রয়োজনীয়তা ও নিয়মাবলি ব্যাখ্যা করতে পারব।
- অষ্টশীল গ্রহণকারীর করণীয় বর্ণনা করতে পারব।
- বাংলা অর্থসহ অষ্টশীল বলতে পারব।
- অষ্টশীল অনুশীলনের মাধ্যমে অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকার উপায়সমূহ চিহ্নিত করতে পারব।
- অষ্টশীল প্রার্থনার প্রক্রিয়া প্রদর্শন করতে পারব।
Related Question
View Allগৃহীরা পঞ্চশীল ও অষ্টশীল পালন করেন।
'শীল' হচ্ছে নৈতিক জীবন গঠনের দিক নির্দেশনা। গৃহে কিংবা বিহারে যেকোনো আচার-অনুষ্ঠানের আগে শীল গ্রহণ করা হয়। শীল পালন বৌদ্ধদের অপরিহার্য নিত্যকর্ম। কারণ, শীল সব কুশলকর্মের উৎস।
পুষ্পিতা খীসা অষ্টশীল বা উপোসথ শীল পালন করেন।
অষ্টশীল ও পঞ্চশীলের উচ্চতর স্তর। প্রতিনিয়ত অষ্টশীল পালন করা যায়। তবে গৃহী বৌদ্ধরা সাধারণত পূর্ণিমা, অমাবস্যা এবং অষ্টমী তিথিতে অষ্টশীল পালন করে থাকেন। আটটি শীল পালন করতে হয়। এ শীল পালনকারীকে ধর্মীয় বিষয় অধ্যয়ন করে, কুশল ভাবনায় নিমগ্ন থাকতে হয়। লোভ-দ্বেষ-মোহ ও তৃষ্ণামুক্ত হয়ে ব্রহ্মচর্য পালন করতে হয়। অষ্টশীল গ্রহণের পূর্বে মানসিক প্রস্তুতি নিতে হয়। ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃকৃত্য সম্পন্ন করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরতে হয়। পূজা ও দান সামগ্রী নিয়ে বিহারে যেতে হয়। বুদ্ধবেদিতে শ্রদ্ধাচিত্তে পূজা ও দান সামগ্রী সুন্দরভাবে সাজিয়ে বসতে হয়। বিহারে ভিক্ষুকে বর্ণনা করে ভিক্ষুর নিকট ত্রিশরণসহ অষ্টশীল প্রার্থনা করতে হয়। নিজ বাড়িতেও অষ্টশীল গ্রহণ করা যায়। সেক্ষেত্রে বুদ্ধাসনের সামনে বসে অষ্টশীল প্রার্থনাসহ অষ্টশীল গ্রহণ করতে হয়। অষ্টশীল পালনের সুফল অনেক। নিয়মিত অষ্টশীল পালনে চিত্ত সংযত হয়।
অষ্টশীল পালনের দ্বারা পুষ্পিতা খীসার সুখী পারিবারিক জীবন গঠন করতে সক্ষম হবে। বুদ্ধ দুঃখ মুক্তির উপায়স্বরূপ আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন। অষ্টশীল পালনের মধ্যমে দুঃখ নিরোধের উপায় আর্য অষ্টাঙ্গিক অনুসরণ করা যায়। অষ্টশীল গ্রহণকারী অন্তত এক বেলার জন্য হলেও সাংসারিক কর্মকান্ড থেকে মুক্ত হয়ে অনাগরিক জীবনের স্বাদ গ্রহণ করতে পারেন। এভাবে ক্রমান্বয়ে নির্বাণের পথে নিজেকে পরিচালিত করতে পারেন। নিয়মিত অষ্টশীল পালনের দ্বারা পুষ্পিতা খীসার চিত্ত সংযত হয়। এভাবে আত্মসংযমের মাধ্যমে সে অকুশল কর্ম থেকে বিরত থাকতে পারবে। ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনযাপন করতে পারবে। এছাড়াও তার মন থেকে হিংসা-বিদ্বেষ ভাব দূর হয়। আচার-আচরণ সংযত হবে। সৎ কাজে তার উৎসাহ বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ অষ্টশীল পালনের দ্বারা পুষ্পিতা খীসার পারিবারিক জীবনে নৈতিক আচরণের প্রতিফলন ঘটবে।
অদিন্নাদানা শব্দের অর্থ অদত্তবস্তু।
বিহারে ভিক্ষুকে বন্দনা করে ভিক্ষুর নিকট ত্রিশরণসহ অষ্টশীল প্রার্থনা করতে হয়। ভিক্ষু অষ্টশীল প্রার্থনা অনুমোদন করে ত্রিশরণসহ অষ্টশীল প্রদান করেন। ভিক্ষুর নির্দেশনায় অষ্টশীল গ্রহণ করতে হয়। নিজ বাড়িতেও অষ্টশীল গ্রহণ করা যায়। সেক্ষেত্রে বুদ্ধাসনের সামনে বসে নিজে অষ্টশীল প্রার্থনাসহ অষ্টশীল গ্রহণ করতে হয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!