উত্তরঃ
মহান আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে শুধু সৃষ্টিই করেননি বরং তাদের রিজিকের দায়িত্বও নিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর মুমিন বান্দাদের রিজিকের ব্যবস্থা করার জন্য ব্যবসাকে হালাল করেছেন আর সুদকে করেছেন হারাম। কেননা ব্যবসা হলো জীবিকা নির্বাহের অন্যতম হালাল হাতিয়ার আর সুদ হলো শোষণের হাতিয়ার। সুদ মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি করে। সুদ গরিবকে আরও গরিব বানায় এবং ধনীকে বানায় আরো ধনী। পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ২৭৫নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সুদকে হারাম আর ব্যবসাকে হালাল ঘোষণা করে সুদকে পরিত্যাগ করার নির্দেশ দান করেছেন।
সুদের পরিচয় : 'সুদ' শব্দটির আরবি প্রতিশব্দ 'রিবা'। ‘রিবা’ শব্দের অর্থ বেশি হওয়া, বৃদ্ধি পাওয়া, বিকাশ ঘটা, অতিরিক্ত হওয়া, বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি। এখানে বৃদ্ধি দ্বারা সকল প্রকার বৃদ্ধি উদ্দেশ্য নয় বরং বিশেষ বৃদ্ধিকে বোঝানো হয়েছে। সুদ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Interest |
সুদের নিষিদ্ধতা: ইসলাম কুরআনী ঘোষণা ও রসুলের সুন্নাতের মাধ্যমে ব্যবসা করার ওপর খুব বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছে এবং তা করার জন্য বলিষ্ঠ আহ্বান জানিয়েছে। এ উদ্দেশ্যে বিদেশ সফরের জন্যও উৎসাহ দিয়েছে। উপরন্তু ব্যবসায়ের জন্য যারা বিদেশ সফর করে তাদের উল্লেখ করা হয়েছে আল্লাহর পথে জিহাদকারী লোকদের সাথে। বলা হয়েছে "কিছু লোক আল্লাহর অনুগ্রহের সন্ধানে বিদেশ সফর করবে এবং অপর কিছু লোক আল্লাহর পথে জিহাদ করবে।” (মুজাম্মিল: ২০)
রসুলে করীম (স) ব্যবসায়ীদের মুজাহিদ ও আল্লাহর পথে শাহাদতবরণকারীদের সমান মর্যাদায় উল্লেখ করেছেন। জিহাদ শুধু যুদ্ধের ময়দানেই অনুষ্ঠিত হয় না, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এই জিহাদ অবশ্যম্ভাবী। রসুলে করীম (স) ওয়াদা করেছেন, ব্যবসায়ীরা আল্লাহর কাছে এ উচ্চ মর্যাদা লাভ করবে এবং পরকালে তাদের জন্য থাকবে অশেষ সওয়াব। ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে প্রায়ই লোেভ ও লালসার দাসত্ব হতে দেখা যায়। যে-কোনো উপায়ে মুনাফা লুণ্ঠনের প্রবণতা খুবই প্রকট হয়ে থাকে এক্ষেত্রে। কিন্তু যে ব্যবসায়ী সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও বিশ্বস্ততা রক্ষা করে সে জিহাদকারী ব্যক্তি।
ব্যবসায়ের ধর্ম হচ্ছে, তা মানুষকে ধন-দৌলতের স্তূপে ডুবিয়ে দেয়। যে দিন-রাত মূলধন ও মুনাফার হিসাব করতেই নিমগ্ন থাকে। ব্যবসার ব্যাপারে আমাদের পথ-প্রদর্শনের জন্য রসুলে করীম (স)-এর কর্মনীতিই যথেষ্ট। তিনি যেমন আধ্যাত্মিক দিকের প্রতি পূর্ণ মাত্রায় গুরুত্বারোপ করেছেন তেমনি জীবিকা অর্জনের প্রতিও তাগিদ দিয়েছেন। পক্ষান্তরে, ইসলামি আইনে সুদ পুরোপুরি নিষিদ্ধ, কারণ শরীয়াহ অর্থকে পণ্য মনে করে না, যা ব্যবহারের উপর মূল্য ধার্য হতে পারে। কোনো আর্থিক লেনদেন থেকে মুনাফা অর্জনকে ইসলাম অনুমতি দেয় না। ইসলাম মনে করে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের তুলনায় সুদের ভিত্তিতে আহরিত সম্পদ অত্যন্ত স্বার্থপরতার পরিচায়ক। ঋণ প্রদানের শর্তে কোনো উপহার, সেবা, অগ্রিম অর্থ বা মেয়াদান্তে যা কিছু প্রাপ্য তা স্থির হোক বা পরিবর্তনশীল হোক যা কিছু নির্ধারিত করা হবে তাই সুদ হিসেবে গণ্য। 'রিবা' চক্র বৃদ্ধি সুদ, সরল সুদ নয়। এ ধরনের কথা বলে চালিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সুদের নিরঙ্কুশ অবৈধতা ঘোষণার মাধ্যমে কুরআন ও সুন্নাহ এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রচলন করার নির্দেশ দেয় যেখানে সবরকম লোভ তিরোহিত হবে। অর্থ সরবরাহকারী ও উদ্যোক্তার মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্যই সুদকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত সুদের ধারণা ও সংজ্ঞায় কোনো দ্বন্দ্ব সন্দেহের অবকাশ নেই। অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে। 'হে বিশ্বাসীগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের অবশিষ্ট অংশ তোমরা পরিত্যাগ করো যদি তোমরা ঈমানদার হও।' (বাকারা ২: ২৭৮)
অন্যত্র বলা হয়েছে, 'আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন আর সুদকে করেছেন হারাম।' (বাকারা ২: ২৭৫)
পরিশেষে বলা যায়, সুদকে আল্লাহ তায়ালা হারাম ঘোষণা করেছেন। সুদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কুফল অনেক। এসব থেকে বেঁচে থাকার জন্য আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সর্বপ্রকার সুদকে বর্জন করে হালালভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করা ইহকাল এবং পরকালের জন্য অবশ্যই কল্যাণকর।