উত্তরঃ
ইসলাম যে পাঁচটি মূল ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত সেগুলোর মধ্যে যাকাত একটি অন্যতম স্তম্ভ। যাকাত একটি আর্থিক ইবাদত। যাকাত দেওয়ার মাধ্যমে সম্পদ বৃদ্ধি পায় এবং পবিত্র হয়। সমাজ ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে, দারিদ্র্য নিরসনে যাকাতের ভূমিকা অপরিসীম। যাকাত সবার ওপর ফরজ নয় বরং শর্ত সাপেক্ষে তা ধনী মুসলমানদের উপর ফরজ হয়ে থাকে। খাতগুলো বর্ণনা করা হলো:
যাকাতের আভিধানিক অর্থ: 'যাকাত' আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ- ১. বৃদ্ধি পাওয়া; ২. পবিত্র করা বা হওয়া; ৩. প্রাচুর্য; ৪. প্রশংসা ইত্যাদি।
যাকাতের পারিভাষিক অর্থ: ইসলামি শরীয়তের পরিভাষায় যাকাত হলো আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বিনা স্বার্থে শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত মালের নির্দিষ্ট অংশ কোনো মুসলিম দরিদ্রকে প্রদান করা।
ইবনে কুদামা বলেন- এটা এমন অধিকার যা সম্পদের ওপর ধার্য করা হয়।
মোটকথা, নিসাব পরিমাণ সম্পদ কোনো ব্যক্তির কাছে পূর্ণ একবছর থাকলে তাকে শরীয়ত কর্তৃক যে নির্ধারিত অংশ গরিব মুসলমানদের প্রদান করতে হয়, তা-ই যাকাত।
যাকাত ব্যয়ের খাতসমূহ: যাকাত ব্যয়ের ৮টি খাত পবিত্র কুরআনের সূরা তাওবায় বর্ণিত হয়েছে। যাকাতের সেই ৮টি খাত নিম্নে তুলে ধরা হলো:
১. ফকির: ফকির বলা হয় এমন ব্যক্তিকে যার সামান্য সম্পদ থাকে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য।
২. মিসকিন: মিসকিন হলো এমন ব্যক্তি যার কোনো সম্পদ নেই, একেবারে নিঃস্ব।
৩. যাকাত আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারী: যারা যাকাত আদায় করার জন্য রাষ্ট্রপ্রধান কর্তৃক নিয়োজিত আছেন তাদেরকেও যাকাত প্রদান করা যাবে।
৪. যাদের মন জয় করা আবশ্যক: এ ধরনের লোকদের মধ্যে নও মুসলিম অন্যতম। তাদের মন জয় করার জন্য যাকাত প্রদান করা যাবে।
৫. দাসমুক্তির জন্য: কোনো ক্রীতদাসকে মুক্ত করার জন্য যাকাত দেওয়া যাবে।
৬. ঋণ মুক্তির জন্য: ঋণী ব্যক্তিকে তার ঋণ পরিশোধের জন্য যাকাতের অর্থ প্রদান করা যাবে।
৭. আল্লাহর রাস্তায়: অর্থাৎ আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধের জন্য মুজাহিদদের সাহায্য-সহযোগিতার জন্য যাকাত প্রদান করা যাবে।
৮. নিঃস্ব মুসাফির: সফরে এসে কোনো মুসাফির নিঃস্ব হলে তাকেও যাকাতের অর্থ প্রদান করা যাবে।
দারিদ্র্য নিরসনে যাকাতের ভূমিকা: সমাজ ও দেশ থেকে দারিদ্র্য নিরসনের লক্ষ্যেই যাকাত ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছে। দারিদ্র্য নিরসনে যাকাতের ভূমিকা নিম্নরূপ:
ক. দারিদ্র্য নিরসন: মহান আল্লাহতায়ালা যাকাত কোন খাতে ব্যয় করা হবে সে সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের সূরা তাওবায় ৬০ নং আয়াতে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন, 'যাকাতের অর্থ কেবল ফকীর, মিসকিন, যাকাত সংগ্রহের কার্যে নিযুক্ত ব্যক্তি, যাদের মন আকৃষ্ট করা প্রয়োজন, দাস মুক্তি, ঋণ থেকে মুক্তি, আল্লাহর পথে এবং নিঃস্ব পথিকদের জন্য। এ আদেশ আল্লাহর পক্ষ থেকে।'
ওপরের আয়াতে যে আটটি খাতের কথা বলা হয়েছে সেগুলোর সবকটি সঠিকভাবে যাকাত প্রাপ্ত হলে সমাজে, দেশে অভাব-অনটন ও দারিদ্র্য থাকতে পারে না। যারা সাধারণত অভাব ও দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে ওপরের বর্ণনায় তাদের সবার কথা বলা হয়েছে। সুতরাং ইসলামের বিধান অনুযায়ী আমরা যদি ফকির, মিসকিনকে যাকাত প্রদান করি তবে তাদের দারিদ্য দূর হবে। ফকির বলা হয় এমন ব্যক্তিকে যার সম্পদ কিছু পরিমাণ কিন্তু তা প্রয়োজন অপেক্ষা অতি নগণ্য। আর মিসকিন বলা হয় এমন ব্যক্তিকে যার কিছুই নেই। এরপর আমরা যদি কর্মচারীদের মধ্যেও যাকাত প্রদান করি তবে গরিবদের আরো একটি অংশ দারিদ্র্যের হাত থেকে মুক্ত হলো। আবার আমরা যদি ক্রীতদাসদের মুক্তির জন্য এবং যারা ঋণগ্রস্ত তাদেরকেও যাকাত প্রদান করি তবে দরিদ্রের সংখ্যা আরো কমে গেল। এরপর আমরা যদি নিঃস্ব পথিকদের যাকাত প্রদান করি তবে তো দরিদ্র ব্যক্তি থাকতে পারে না। সমাজে যে ধরনের দরিদ্র ব্যক্তিই থাকুক না কেন এই আটটি খাতের একটি পর্যায়ে পড়বেই। আর তা হলে তাদের দারিদ্র্য দূর হতে বাধ্য। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসেবে এ বিধান করেছে যাতে সমাজ থেকে দারিদ্র্য নিরসন করা সম্ভব হয়।
খ . অর্থনৈতিক বৈষম্যদূরীকরণ: সমাজে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের মূল কারণ অর্থনৈতিক বৈষম্য। সম্পদ গুটিকয়েক লোকের হাতে পুঞ্জীভূত থাকলে অপর লোকেরা দারিদ্র্যের শিকার হয়। আর তাই ইসলাম সম্পদ পুঞ্জীভূত করতে নিরুৎসাহিত করে যাকাতের ব্যবস্থা করেছে। যাতে সম্পদ সকলের মধ্যে সুষম বণ্টন হতে পারে। যাকাতের ফলে ধনী-গরিব সবার হাতে অর্থ-সম্পদ থাকে। এতে করে সমাজে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হয়।
গ. ভ্রাতৃত্বের বন্ধন : যাকাত দিলে সমাজের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে ওঠে। যাকাত দাতা ও গ্রহীতার। মধ্যে এ সম্পর্ক গাঢ় হয়ে উঠলে সমাজ থেকে দারিদ্র্য দূর হতে বাধ্য। কেননা কোনো ধনী ভাই চাইবে না তার অপর ভাই না খেয়ে থাকুক। সে দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত হোক। এভাবেই পরস্পরের মধ্যে মধুর সম্পর্কের মাধ্যমে যাকাত সমাজ থেকে দারিদ্র্য দূরীকরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
ঘ. জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধি: যাকাত প্রদানের ফলে সম্পদ একজনের কাছে জমা না থেকে বিভিন্ন লোকের মাধ্যমে জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধি করে। যাকাত দেবার ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। উৎপাদন কাজে অনেকেই অংশগ্রহণ করতে পারে। যাকাত দেবার পূর্বে যখন যাকাত দাতারাই সম্পদের মালিক থাকত তখন সম্পদ পুঞ্জীভূত থাকত। কিন্তু যাকাত দেবার ফলে এ সম্পদ অনেক হাতে গেলে ক্রয়-বিক্রয়, লেন-দেন ইত্যাদি বৃদ্ধি পায়। ফলে জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে আয়ও বৃদ্ধি পায়। ফলে সমাজের মধ্যে দারিদ্র্যের অবসান ঘটে।
ঙ. অর্থলিপ্সা দূরীকরণের মাধ্যমে : দুনিয়াবী সম্পদের প্রতি লিপ্সাই মানুষকে আল্লাহর পক্ষ থেকে দূরে সরিয়ে দুনিয়ায় অর্থ মোহে অন্ধ করে রাখে। ফলে মানুষ অর্থের পিছনে ছুটতে থাকে। এতে করে মানুষ তার মৌলিক গুণাবলি থেকে বিচ্যুত হয়ে যেভাবেই হোক সম্পদ পুঞ্জীভূত করে। ফলে কিছু লোক হয়ে ওঠে ধনী আবার কিছু লোক হয়ে পড়ে নিঃস্ব। তাই ইসলাম মানুষকে দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে পরকালের পাথেয় জোগাড় করার প্রতি উৎসাহিত করে। যাকাত দেওয়ার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে অর্থের মোহ কেটে যায়। ফলে সম্পদ কুক্ষিগত না থেকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। যাকাত দাতার আত্মিক পবিত্রতা আসে আবার সম্পদও বৃদ্ধি পায়।
চ. কর্মসংস্থান সৃষ্টি: যাকাতের অর্থ বাইতুল মালে জমা হয়। বাইতুল মাল জনগণের মৌলিক অধিকার পূরণের লক্ষ্যে ও সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের কলকারখানা, শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। ফলে অনেক বেকার লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ফলে সমাজ থেকে দারিদ্র্য দূরীভূত হয়।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি, যাকাত একটি আর্থিক ইবাদত। যাকাত দেবার মাধ্যমে আত্মিক পবিত্রতাসহ সম্পদ বৃদ্ধি পায় এবং যাকাত প্রদানের ফলে সমাজ থেকে দারিদ্রের অবসান ঘটে। তাই আমরা বলব, দারিদ্র্য নিরসনে ইসলামে যাকাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য ও অপরিসীম।