হোমিওপ্যাথ ডাক্তার অঘোর ও এ্যালোপ্যাথ ডাক্তার তোরাপের চিকিৎসা পদ্ধতির তুলনামূলক আলোচনা কর। (বর্ণনামূলক প্রশ্ন)

Updated: 10 months ago
উত্তরঃ

হোমিওপ্যাথ ডাক্তার অঘোরকে গাঁয়ের লোকজন বলত হেমাপ্যাথি আর এ্যালোপ্যাথ ডাক্তার তোরাপকে বলত এ্যালাপ্যাথি ডাক্তার। তাঁদের দুজনের চিকিৎসার ধরন ছিল বাঁধা।

হোমিওপ্যাথ অঘোর ডাক্তারের কাছে গেলেই একটুখানি সাদা ময়দার মতো গুঁড়োতে দু-তিন ফোঁটা স্পিরিট টপ টপ ফেলে তিন-চারটি পুরিয়া করে দিতেন। তার এমন ওষুধ খেতে ভালোও লাগত না, মন্দও লাগত না। কখনো কখনো তিনি আবার শুধু টিউবওয়েলের পানিতে দু-তিন ফোঁটা স্পিরিট মিশিয়ে দিয়ে রোগীকে খাওয়ার জন্য আদেশ করতেন। কোনো রোগী যখন রোগ ভালো হবে কি না তা জিজ্ঞেস করতেন, তখন তিনি দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বলে উঠতেন, ভালো তো হবেই, ভালো হয়ে আবার উপচে পড়বে। এভাবেই তিনি নিজের চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে যেকোনো রোগীর চিকিৎসা করতেন। তার মতে বাঘ যেমন ভেড়ার পাল তাড়িয়ে নিয়ে যায় ঠিক তেমনই করে একটি পুরিয়ার তার ওষুধ রোগীর আঙুলের ডগা থেকে জীবাণু বাবাজিদের খেদাতে খেদাতে মাথার চুলের ডগা দিয়ে বের করে দেয়। জ্বর হলে, সর্দি হলে, বেশি খেয়ে বা অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে পেট ছেড়ে দিলে লোকজন অঘোর ডাক্তারের কাছে যেত। আনা দুই পয়সা দিলেই তিনি দিয়ে দিতেন দুই-তিন পুরিয়া ওষুধ। পয়সা দিতে না পারলে ধারেও দিতেন। এমনকি একটা লাউ বা দুটো শশা নিয়ে গেলেও দিতেন।

আর অন্যদিকে এ্যলোপ্যাথ ডাক্তার তোরাপ ছিলেন অঘোর ডাক্তার থেকে কিছুটা জনপ্রিয়। কী করে যে তিনি ডাক্তার হয়েছিলেন কেউ তা জানত না। শোনা যায়, বাল্যকালে তিনি নাকি এক বুড়ো ডাক্তারের হুঁকো সাফ করতেন। তোরাপের একটা ছোট্ট শেয়াল রঙের বেতো ঘোড়া ছিল। সেই ঘোড়াটি নিয়েই তিনি গাঁয়ে ঘুরে বেড়াতেন আর চিকিৎসা করতেন।

তোরাপ ডাক্তার শুধু ডাক্তারিই করতেন না। নিজের হাতে হালচাষও করতেন। তিনি শরৎকাল এলে অবসর পেতেন, আর গাঁয়ের লোকদেরও রোগী হয়ে শুয়ে থাকার একটু-আধটু সুযোগ তৈরি হতো। সেই সময়ে গাঁয়ে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ দেখা দেয়। বিশেষ করে আশ্বিন মাস থেকে। তখন তোরাপ ডাক্তারের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। কেননা ম্যালেরিয়া জ্বরে তোরাপ ডাক্তার ছাড়া অন্য কোনো গতি ছিল না। তিনি হলুদ রঙের বড় বড় বিকট দাঁত বের করে বড় সিরিঞ্জ নিয়ে রোগীদের বাড়ি বাড়ি ঘুরতে থাকেন। দুই পকেট ম্যাপাক্রিন বড়ি দিয়ে ভর্তি থাকে যেগুলো খুবই ভয়ানক বড়ি। রোগী যেখানেই থাক, সে মাটির দাওয়াতেই হোক, আর খোলা আকাশের নিচে উঠোনেই হোক বা ঘরের ভিতরেই হোক, গলায় স্টেখোটি ঝুলিয়ে ইঞ্জেকশনের বাক্সটি হাতে নিয়ে তোরাপ ডাক্তার হাজির হয়ে যান। ঘরে ঢুকেই গোদা গোদা এ্যাকাব্যাকা আঙুল দিয়ে তোরাপ ডাক্তার রোগীর কজি চেপে ধরে কিছুক্ষণ নাড়ি পরীক্ষা করতেন। পরে রোগীর অসুখকে নিশ্চিত ম্যালেরিয়া জ্বর হিসেবে চিহ্নিত করে আশপাশের লোকদের আদেশ দিতেন রোগীকে চেপে ধরতে, তিনি তাকে ইঞ্জেকশন দেবেন। আর পাশে দুটো টাকা রাখতে বলতেন, তার ফি আর ওষুধের দাম হিসেবে। এই বলে তোরাপ ডাক্তার একদিকের পকেটে টাকা দুটো ভরতেন। আরেক পকেট থেকে বের করতেন ইঞ্জেকশন দেওয়ার সিরিঞ্জ। সেই ইঞ্জেকশন লোকের গায়ে ফুঁড়তে ফুঁড়তে সুচের মাথা ভোঁতা হয়ে গেছে যেটা দেখেই রোগী ভয় পেয়ে যেত। সেই ইঞ্জেকশন নিয়ে দু-তিনজন চিরদিনের জন্য খোঁড়া হয়, আর তাঁর ম্যাপাক্রিন বড়ি খেয়ে কয়েকজন চিরকালের জন্য কালা হয়ে যায়।

Najjar Hossain Raju
Najjar Hossain Raju
10 months ago
144

তিরিশ পয়ত্রিশ বছর আগে আমাদের পারে দুজন ডাক্তার ছিলেন। একজন হোমিওপ্যাথ আর একজন এ্যালোপ্যাথ। গাঁয়ের লোক ঠিক ঠিক বলতে পারত না একজনকে বলত হেমাপ্যাথি আর একজনকে বলত এ্যালাপ্যাথি। দুজনের চিকিৎসার ধরন ছিল বাধা। খবর দিতেন একরকম।

 হোমিওপ্যাথ অথোর ডাক্তারের কাছে গেলেই একটুখানি সাদা ময়দার মতো গুঁড়োতে দু-তিন ফোঁটা স্পিরিট টপ টপ করে ফেলে তিন-চারটি পুরিয়া করে দিতেন। খেতে ভালোও লাগত না, মন্দও লাগত না। কখনো কখনো আবার স্রেফ টিউবওয়েলের পানিতে দু-তিন ফোঁটা স্পিরিট মিশিয়ে দিয়ে বলতেন, 'যা, খাপে যা।' ওষুধ হাতে নিয়ে, আমি হয়ত কম করে জিজ্ঞেস করে বসতাম, 'ডাক্তারবাবু ভালো হবে তো? অধোর ডাক্তার দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বলে উঠতেন, 'ভালো হবে না মানে? ভালো হয়ে উপচে পড়বে। যা, ওষুধ খাপে।” আমি বলতাম, 'পেটের ভেতর গরগর করে।' 'ও কিছু না, ব্যাঙ্ক হয়েছে তোর পেটে।"

“ওরে বাবা, ব্যাঙ হয়েছে আমার পেটে! গোঁ গোঁ শব্দ হয় যে ডাক্তারবাবু । “ও কিছু না-ব্যাঙ ডাকে গোঁ গোঁ করে । আমার ওষুধ যেই এক পুরিয়া খাবি, দেখবি তখন ব্যাঙের লাফানি।'
'কী করে দেখব? ব্যাঙ যে পেটের ভেতরে ।

অঘোর ডাক্তার তখন বলতেন, ‘ওরে বাবা, দেখবি মানে বুঝবি। বুঝবি ঠেলা ।' এই হচ্ছে আমাদের গাঁয়ের এক নম্বর ডাক্তার অঘোরবাবুর কথা।
এইবার দুই নম্বর তোরাপ ডাক্তারের কথা বলি। আগেই বলেছি, ইনি ছিলেন এ্যালোপ্যাথ ডাক্তার। কী করে যে তিনি ডাক্তার হয়েছিলেন, কেউ জানে না। শোনা যায়, বাল্যকালে তিনি নাকি এক বড়ো ডাক্তারের হুঁকো সাফ করতেন। সে যাই হোক, তোরাপ ডাক্তারের একটা ছোট্ট শেয়াল-রঙের বেতো ঘোড়া ছিল। তার সামনের পা-দুটি ছাঁদনা দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকত প্রায় সময়। এই বাঁধা পা নিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে গাঁয়ের আশেপাশে চরে বেড়াত ঘোড়াটা। কারো ক্ষতি করতে দেখিনি কোনো দিন ।

তোরাপ ডাক্তার খালি ডাক্তারিই করতেন না কিন্তু। নিজের হাতে হালচাষ করতেন। বর্ষা আর শীতের সময় ডাক্তারির ধার ধারতেন না তিনি। বর্ষাটা হচ্ছে চাষবাসের সময় আর শীতকালটা হচ্ছে ফসল কাটার মরশুম । এই সময় রোগী মরে গেলেও তোরাপ ডাক্তারকে পাওয়া যাবে না । বর্ষা আর শীতে গাঁয়ের লোকদের রোগী হয়ে শুয়ে থাকার কোনো উপায় নেই। এই দুই সময়ে কাজ করতে
না-পারলে পেটে ভাত জুটবে না। কাজেই রোগটোগ সব শিকেয় তুলে রেখে দিতে হতো তাদের বাধ্য হয়ে ।
তারপর শরৎকাল এলে তোরাপ ডাক্তারের মোটামুটি অবসর হতো আর গাঁয়ের লোকদেরও রোগী হয়ে শুয়ে
থাকার একটু-আধটু মওকা মিলত ।

এই সময়ের জন্যেই যেন ওঁৎ পেতে থাকত ম্যালেরিয়া জ্বর। বাঘ যেমন গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ লাফ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকারের টুটি কামড়ে ধরে, ঠিক তেমনি করে ম্যালেরিয়া জ্বর এসে গাঁয়ের গরিব লোকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত । এটা ঘটত আশ্বিন মাস থেকে। ম্যালেরিয়ার মতো বাঘা জ্বর তখন আর কিছু ছিল না । ঘরে ঘরে মানুষ ছেঁড়া কাঁথা, ন্যাকড়া, ত্যানা গায়ে চাপিয়ে কোঁকাত। আর সে কী কাঁপুনি। কাঁপুনি থামাবার জন্যে পাথরের জাঁতা পর্যন্ত গায়ে চাপাতে দেখেছি।

এই সময়টায় ছিল তোরাপ ডাক্তারের মজা। ঘরে ঘরে লোক ম্যালেরিয়া জ্বরে ধুঁকছে। চিকিৎসার জন্যে তোরাপ ডাক্তার ছাড়া গতি নেই । ম্যালেরিয়া পুরোনো হয়ে গেলে কিছুতেই সারতে চায় না। পেটের মধ্যে পিলে উঁচু হয়ে ওঠে, হাত-পা হয়ে যায় প্যাঁকাটির মতো সরু। তোরাপ ডাক্তারের এইরকম অনেক পিলে-ওঠা পুরোনো ম্যালেরিয়া-রোগী ছিল ।

রোগের আর একটা সময় ছিল চোত-বোশেখ মাস। এই সময়টায় কলেরা আর বসন্ত হয়ে গ্রামকে গ্রাম সাফ হয়ে যেত। ম্যালেরিয়া আর কলেরার সব রোগী তোরাপ ডাক্তারের। এখানে অঘোর ডাক্তারের কোনো ভাগ ছিল না । জ্বর হলে, সর্দি হলে, বেশি খেয়ে বা অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে পেট ছেড়ে দিলে লোক অঘোর ডাক্তারের কাছে যেত । আনা দুই পয়সা দিলেই, তিনি দিয়ে দিতেন দুই-তিন পুরিয়া ওষুধ। পয়সা দিতে না-পারলে ধারেও দিতেন। এমনকি একটা লাউ বা দুটো শশা নিয়ে গেলেও তিনি রোগী ফেরাতেন না ।

অঘোর ডাক্তারের চাষবাসও ছিল না, ভিনগাঁয়ে ‘কলে’ যাবার ঘোড়াও ছিল না। হোমিওপ্যাথি ওষুধ রাখার জন্য একটা কাঠের বাক্স ছাড়া চিকিৎসার সরঞ্জাম বলতে আর কিছুই ছিল না তাঁর। তবে ওরকম বাক্যবাগীশ লোক লাখে একটা মিলবে কিনা সন্দেহ।
তিনি বলতেন, ‘বলি, মরতে তোরা আমার কাছে আসিস কেন বল দিকিনি। তোরাপের কাছে যা না। তা তো যাবি না—গেলে যে ব্যাটা কসাই ঘাড়টি মটকে তাজা রক্ত খাবে তোদের। বলি, এ কী ডাক্তারি বল দিকিন তোরা ? তুই বললি, আমার অসুখ করেছে, আর অমনি তোরাপ হয় ছুরি বার করবে, না-হয় কোদাল বার করবে, না-হয় কুড়াল বার করবে....
একজন রোগী হয়ত বাধা দিয়ে বলল, ‘না না ডাক্তারবাবু, তোরাপ ডাক্তার আবার কোদাল কুড়ুল কবে বার করলে!'
‘ওই হলো, , লাঙলের ফালের মতো ছুঁচওয়ালা একটা বোতল বার করল। কী? না ইঞ্জেকশন দেব, গলা কাটব, মারব, ধরব। তারপর ওষুধ চাও, দেবে তোমাকে এক বোতল পিশাচের রক্ত। ওয়াক থু। যেমন দুৰ্গন্ধ, তেমনি বিচ্ছিরি সোয়াদ-ছ্যা ছ্যা ছ্যা! আর আমাদের হোমিওপ্যাথ কী করছে? বাঘ যেমন ভেড়ার পাল তাড়িয়ে নিয়ে যায় ঠিক তেমনি করে একটি পুরিয়ার আমার এই ওষুধ তোমার পায়ের আঙুলের ডগা থেকে জীবাণু বাবাজিদের খেদাতে খেদাতে মাথার চুলের ডগা দিয়ে বার করে দিচ্ছে। অথচ তুমি জানতেও পারছ না ।'
সে বছর শরৎকালে ধান কেবল ডাঁশিয়ে উঠছে, ধানের ভেতর সাদা দুধ জমে চাল বাঁধছে, বেশ ঝরঝরে আবহাওয়া, আকাশভর্তি রোদ, একটু একটু ঠান্ডা হাওয়া বইতে শুরু করেছে—এমনি সময়ে হুড়মুড়িয়ে চলে এল ম্যালেরিয়া জ্বর।
ব্যস, ম্যালেরিয়া জ্বরে লোক দমাদম বিছানা নিতে লাগল । ছেলে-বুড়ো কেউই বাদ যায় না। ম্যালেরিয়া যাদের পুরোনো হয়ে গেছে তাদের তো খুব মজা । ঠিক বেলা দশটার সময় চোখে সূর্যটা একটু হলুদ হলুদ ঠেকে, তারপর গা একটু গরম হয়, চোখ দুটি সামান্য জ্বালা করে তবে তারপর হুড় হুড় করে এসে পড়ে জ্বর। সঙ্গে সঙ্গে কী পিপাসা! ঘটি ঘটি পানি খেয়ে পিপাসা কমে না। পানি পেটে গিয়ে গরম হয়ে যায়, তারপর গা-টা গুলিয়ে ওঠে, তারপরেই বমি। বমি হয়ে গেলেই আবার পিপাসা। আবার ঘটি ঘটি পানি খাওয়া তারপর আবার বমি। জ্বর কমে আসে আস্তে আস্তে । রাত দশটার দিকে একদম জ্বর চলে গিয়ে গা ঠান্ডা
গাঁয়ের অর্ধেকের বেশি লোক ম্যালেরিয়া জ্বরে পড়ল। তোরাপ ডাক্তার হলুদ রঙের বড়ো বড়ো বিকট দাঁত বের করে এ্যাই বড়ো সিরিঞ্জ নিয়ে, রোগীদের বাড়ি বাড়ি ঘুরতে লাগলেন। দুই পকেট ভর্তি ম্যাপাক্রিন বড়ি। সে যে কি ভয়ানক বড়ি ভাবা যায় না। রোগী যেখানেই থাক, সে মাটির দাওয়াতেই হোক আর খোলা আকাশের নিচে উঠোনেই হোক বা ঘরের ভেতরেই হোক, গলায় স্টেথোটি ঝুলিয়ে ইনজেকশনের বাক্সটি হাতে নিয়ে তোরাপ ডাক্তার ঠিক হাজির । লোকেই-বা আর কী করে? কাজেই বাধ্য হয়ে তোরাপ ডাক্তারকে ডাকতেই হয়। বেচারা অঘোর ডাক্তারের গুঁড়োতে যে কোনো কাজই হয় না ।

সে যাই হোক, ঘরে ঘরে ঢুকেই গোদা গোদা এ্যাকাব্যাঁকা আঙুল দিয়ে তোরাপ ডাক্তার রোগীর কব্জি চেপে ধরে কিছুক্ষণ নাড়ি পরীক্ষা করতেন।
রোগীরা সব বলাই সাধু। হয়ত জিজ্ঞেস করল, “তবে কি ‘ম্যালোরি’ জ্বর ডাক্তার সাহেব?” তোরাপ ডাক্তার দাঁত কড়মড়িয়ে বলতেন, ‘তাছাড়া আর কী হবে? এই যে দেখাচ্ছি মজা, একটি ইনজেকশনে ম্যালেরিয়ার ভূত ছাড়াব। এই বলে আশেপাশের লোকদের আদেশ দিতেন, ‘ধর তো এটাকে চেপে, সুঁইটা দিয়ে দিই একবার । আর দুটো টাকা রাখ এখানে আমার সামনে, আমার ফি আর ওষুধের দাম । উঁহু আগে টাকা রাখ, তারপর অন্য কাজ ।
এই বলে তোরাপ ডাক্তার একদিকের পকেটে টাকা দুটো ভরতেন, আরেক পকেট থেকে বের করতেন ইনজেকশন দেবার সিরিঞ্জ । কী প্রচণ্ড সিরিঞ্জ ! আর তার ছুঁচ তো নয়, , ঠিক যেন মোষের লাঙলের ফলা । লোকের গায়ে ফুঁড়তে ফুঁড়তে ছুঁচের মাথা গিয়েছে ভোঁতা হয়ে । সেই ভয়ানক যন্ত্র দেখেই তো রোগী বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে পালাবার চেষ্টা করত। তোরাপ ডাক্তার চিৎকার করতেন, ‘ধর ধর, ঠেসে, চেপে ধর’-সঙ্গে সঙ্গে তিন- চারজন ষণ্ডাগোছের লোক গিয়ে বিছানার সঙ্গে চেপে ধরত রোগীকে। তারপর কোমরের কাপড়ের কষিটা খুলে তোরাপ ডাক্তার মাংসের মধ্যে প্যাট করে ঢুকিয়ে দিতেন সেই মোটা ছুঁচ। সঙ্গে সঙ্গে রোগীর সমস্ত পা-টা যেত অবশ হয়ে ।

 

এইরকম করে ইনজেকশন দিয়ে সে-বছর শরৎকালে তোরাপ ডাক্তার দুহাতে টাকা রোজগার করতে লাগলেন । ম্যালেরিয়ার প্রকোপ যত বাড়ে ততই বাড়ে তাঁর রোজগার। ইনজেকশন দিয়ে তিনি দু-তিনটে লোককে তো চিরদিনের জন্য খোঁড়া করে দিলেন। তাঁর ম্যাপাক্রিন বড়ি খেয়ে কয়েকজন তো চিরকালের জন্য কালা হয়ে গেল। তবু লোকে বাধ্য হয়ে তাঁর কাছেই যেতে লাগল। হোমিওপ্যাথি ওষুধ দিয়ে ম্যালেরিয়ার মতো দুর্দান্ত জ্বর ঠেকানের সাধ্য ছিল না অঘোর ডাক্তারের। তাঁর কাছে আর কেউ যায় না। তাঁর সংসার চলাই দায় হয়ে উঠল। শেষপর্যন্ত কী আর করেন তিনি!

 

একদিন অঘোর ডাক্তার চুপিচুপি জেলা শহরে গিয়ে একটা সিরিঞ্জ আর কিছু কুইনাইন ইনজেকশন কিনে আনলেন । মনে মনে বললেন, তোরাপটার বড্ড বাড় বেড়েছে। খুব দু-পয়সা করে নিচ্ছিস, না? কিন্তু আমি হচ্ছি সব্যসাচী, সে খবরটা তো জানিস না তোরাপ । আমি দুই হাতে তির ছুড়তে পারি। ইচ্ছে হলে হোমোপ্যাথি করব আবার ইচ্ছে হলে এ্যালাপ্যাথি ইনজেকশন দেবো। মনে মনে এইসব কথা ভেবে তিনি সিরিঞ্জের ছুঁচ কিনলেন খুব মিহি দেখে। কাউকে কোনো কথা না-বলে সরঞ্জাম সব কিনে চুপি চুপি বাড়ি ফিরে এলেন সন্ধেবেলা ।

 

পরের দিন সকাল বেলায় মুখটি ধুয়ে দাওয়ায় কাঠের টুল পেতে কেবল বসেছেন তিনি—এমন সময় ইদরিস আলীর বাড়ি থেকে লোক এল । ইদরিস আর তার পুরো পরিবার অনেকদিন থেকে তাঁর রোগী । শত অসুখ-বিসুখে তারা কোনোদিন তোরাপ ডাক্তারের কাছে যায় না, বলে, হেমাপ্যাথির ওপর ওষুধ আছে নাকি ডাক্তারবাবু? মরলে আপনার হেমাপ্যাথি খেয়েই মরব, তবু তোরাপ ডাক্তারের হাতে জান দিতে পারব না।

ইদরিস আলীর বাড়ির লোকের কাছ থেকে অঘোর ডাক্তার শুনলেন যে গত পাঁচ-সাত দিন থেকে ইদরিস নিদারুণ ম্যালেরিয়া জ্বরে বেহুঁশ । কিন্তু তোরাপ ডাক্তারের নাম করলেই তার হুঁশ ফিরে আসছে আর তখন সে বলছে, “আমি অঘোর ডাক্তারের হেমাপ্যাথি খেয়ে মরব, কিছুতেই এ্যালাপ্যাথি চিকিচ্ছে করাব না।'
কথা শুনে অঘোর ডাক্তার মিটিমিট হেসে বললেন, “কেন রে, এ্যালাপ্যাথি চিকিচ্ছেটা খারাপ হলো কোথায়? তোরাপ হলো ডাকাত, ও আবার ডাক্তার হলো কবে? এখন থেকে আমিই এক-আধটু এ্যালাপ্যাথি করব ভাবছি। ইদরিসের বাড়ির লোকটা অবাক হয়ে বলল, 'তুমি এ্যালাপ্যাথি করবে কী গো? তুমি আবার সুঁই দেবে নাকি? অঘোর ডাক্তার রেগে বললেন, ‘কেন, দেব না কেন? সব বিদ্যাই জানা আছে আমার বুঝলি? চিকিচ্ছেটা তোরাপের লাঙল চালানো নয় । কেমন মিহি সুঁই কিনেছি দেখবি । ইদরিসকে আজ ফুঁড়ব। তুই যা, আমি আসছি। আর শোন বাবা, দুটো টাকা আগে জোগাড় করে রাখিস। তোরাপও দু-টাকা করে নেয়, আমাকে দিবি না কেন? অঘোর ডাক্তার কুইনাইন ইনজেকশন দিবেন এই খবর দেখতে দেখতে সারা গাঁয়ে চাউর হয়ে গেল । গাঁয়ের যত সুস্থ মানুষ ছিল, সব ছুটল ইদরিসের বাড়ির দিকে। ইদরিসের মেটেবাড়ির ছোট্ট ঘরে আর তিলধারণের জায়গা নেই—একটা লোক কোমরে চাদর জড়িয়ে হেঁড়ে গলায় চেঁচাতে লাগল, ‘এই, এই সব বাতাস ছেড়ে দাও, বাতাস আসতে দাও।' কিন্তু কে কার কথা শোনে! অঘোর ডাক্তার হেমাপ্যাথি ছেড়ে ইনজেকশন দেবে—এ কী সোজা কথা !

রোগা অঘোর ডাক্তার বহু কষ্টে ঘরে ঢুকে, ট্যাক থেকে সিরিঞ্জ, ওষুধ এইসব বের করলেন। লোকজনের দিকে তাকিয়ে তাঁর দুই হাঁটু থরথর করে কাঁপতে লাগল। মুখে অবশ্য তম্বি করলেন, “ভিড় কমাও, আলো আসতে দাও তোমরা।'

এই কথা বলে বহু কষ্টে সিরিঞ্জের মাথায় সুচ লাগালেন, তারপর ওষুধ ভরে রোগীর দিকে এগিয়ে গেলেন। ঠিক এই সময় জ্বরের ঘোর ভেঙে জবাফুলের মতো গোল দুটো চোখ মেলে ইদরিস বলল, ‘ডাক্তারবাবু শেষে আপনার এই কাজ!' এই বলে ইদরিস চোখ বন্ধ করে মড়ার মতো পড়ে রইল । অঘোর ডাক্তার বললেন, “ধর বাবা তোরা, ইদরিসকে একটু ধর।' চোখ না খুলেই ইদরিস বলল, 'কাউকে ধরতে হবে না ডাক্তারবাবু, আপনি ইনজিশন দ্যান—বরঞ্চ আপনাকে ধরতে হলে ওদেরকে বলুন।'

হঠাৎ কেমন বোকার মতো অঘোর ডাক্তার হাসলেন, তারপর ইদরিসের কোমরের নিচে মাংসে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, ‘হেঁ হেঁ বড়ো মিহি কিনেছি ছুঁচটা, এই তুললাম', এই কথা বলে সকলের দিকে চেয়ে প্রায় কাঁদো-কাঁদো গলায় আবার বললেন, ‘হেঁ হেঁ তোরাপের কম্ম নয়, তোমরা দ্যাখো একবার, এই তুললাম সিরিঞ্জ, এইবার, এইবার'—বলেই প্যাট করে সিরিঞ্জের সুচ ঢুকিয়ে দিলেন ইদরিসের কোমরের মাংসে। হাত কাঁপতে লাগল তাঁর, বারবার বলতে লাগলেন, ‘গভীর করে ফুঁড়তে হবে, গভীর করে ফুঁড়তে, এই যাহ্।' পট করে একটা আওয়াজ উঠল আর হাহাকার করে উঠলেন অঘোর ডাক্তার, ‘হায় হায়, ছুঁচ ভেঙে গেছে, ছুঁচ ভেঙে গেছে, গেল গেল, সর্বোনাশ হল, হায় হায়...।'

সুচটা তখন মাংসের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে। অঘোর ডাক্তারের শীর্ণ দুই হাত আঁতিপাঁতি করে খুঁজে বেড়াচ্ছে সেটাকে । তখন কোথা থেকে একটা জোয়ান ছেলে ছুটে এসে দাঁত দিয়ে কামড়ে তুলে ফেলল সুচটা ইদরিসের কোমর থেকে । সবাই চুপ করে আছে—ছেলেটা দাঁত থেকে খুলে হাতে নিল সুচটা, অঘোর ডাক্তারের দিকে চেয়ে বলল, “এই যে ডাক্তারবাবু পেয়েছি।' অঘোর ডাক্তার দেখতে পেলেন না। ক্ষোভে দুঃখে তখন তাঁর চোখে অশ্রুর ঢল নেমেছে।

Related Question

View All
উত্তরঃ

গ্রামের হোমিওপ্যাথ ডাক্তার ছিলেন অঘোর। তার কাছে কোনো রোগী গেলেই তিনি একটুখানি সাদা ময়দার মতো গুঁড়োতে দু-তিন ফোঁটা স্পিরিট টপ টপ করে ফেলে পুরিয়া করে দিতেন। তবে ম্যালেরিয়া রোগীরা তার কাছে যেত না। তারা ভিড় জমাত এ্যালোপ্যাথ ডাক্তার তোরাপের কাছে। সেবার প্রায় পুরো গ্রাম ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হলে তোরাপ ডাক্তার দুহাতে টাকা আয় করেন কিন্তু অঘোর ডাক্তার হয়ে পড়েন কর্মহীন। তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন এ্যালোপ্যাথি চর্চা করার। তাই তিনি একটা সিরিঞ্জ আর কিছু কুইনাইন ইঞ্জেকশন কেনার জন্য চুপিচুপি জেলা শহরে গিয়েছিলেন।

Najjar Hossain Raju
Najjar Hossain Raju
10 months ago
253
উত্তরঃ

গ্রামীণ হাতুড়ে ডাক্তার বলতে মূলত সেসব ডাক্তারকে বোঝায় যারা প্রথাগত ডাক্তারি শিক্ষার বাইরে থেকে সাধারণ চিকিৎসা দেন। তারা মূলত গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসাসেবার ঘাটতি পূরণের জন্য কাজ করে থাকেন। 'হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি' গল্পে অঘোর ও তোরাপ হচ্ছেন সেই শ্রেণির ব্যক্তি। অঘোর ও তোরাপ ডাক্তারের মতো হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে অনেক সময় মানুষ উপকৃত হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের চিকিৎসায় মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যায়।

'হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি' গল্পে দুজন চিকিৎসক অঘোর ডাক্তার ও তোরাপ ডাক্তার। অঘোর চর্চা করেন হোমিওপ্যাথ আর তোরাপ চর্চা করেন এ্যালোপ্যাথ। গ্রামের মানুষের সংকটকালে তাদের একমাত্র ভরসা এই দুই ডাক্তার। মূলত গ্রামীণ অঞ্চল শহর থেকে দূরে অবস্থিত হওয়ার কারণে অনেক কিছুই মানসম্মত হয়ে ওঠে না। বর্তমান সময়েও লক্ষ করা যায় গ্রামে এখনো আধুনিক মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌছেনি। তাই তাদের ভরসা রাখতে হয় হাতুড়ে ডাক্তারের ওপর। এ গল্পের দুজন ডাক্তারের চিকিৎসা পদ্ধতির দিকে তাকালেই গ্রামীণ হাতুড়ে ডাক্তারের চিকিৎসা পদ্ধতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হোমিওপ্যাথ অঘোর ডাক্তারের কাছে যেকোনো রোগী এলেই সাদা ময়দার মতো গুঁড়োতে দু-তিন ফোঁটা স্পিরিট মিশিয়ে দিয়ে দেয়। সর্বরোগের একই ওষুধ। তোরাপ ডাক্তারও এক সিরিঞ্জ দিয়েই পুরো গ্রামকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তার ইঞ্জেকশনের বর্ণনায় লেখক জানিয়েছেন, ইঞ্জেকশন দিয়ে তিনি দুতিনটে লোককে চিরদিনের জন্য খোঁড়া করে ফেললেন। আর তার ম্যাপাক্রিন বড়ি খেয়ে কয়েকজন তো চিরকালের জন্য কালা হয়ে গেল। তবু মানুষ তার কাছেই যায়। কারণ গ্রামীণ প্রত্যন্ত এলাকায় অন্য কোনো উপায় থাকে না মানুষের কাছে।

তাই বলা যায়, গ্রামীণ অঞ্চলে উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারলে গ্রামের মানুষদের অদক্ষ হাতুড়ে ডাক্তার ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকবে না। তবে অঘোর ডাক্তার ও তোরাপ ডাক্তারের মতো হাতুড়ে ডাক্তাররা কিছু ক্ষেত্রে মানুষের জন্য সহায়ক হলেও তাদের চিকিৎসা বিজ্ঞানসম্মত না হওয়ার কারণে অনেক মানুষের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যায়। যার মূল্য কোনোভাবেই শোধ করা যায় না।

Najjar Hossain Raju
Najjar Hossain Raju
10 months ago
249
উত্তরঃ

'হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি' গল্পটিতে দেখা যায়, কৃষিপ্রধান এই দেশে বর্ষা ও শীত হচ্ছে কাজের মৌসুম। এ সময়ে অসুস্থ হয়ে শুয়ে থাকার সময় মানুষের নেই। কিন্তু তারপরেই শরৎকালে একটু অবসরে থাকে মানুষ। ওই সময়ের জন্যই যেন ওত পেতে বসে থাকে ম্যালেরিয়া জ্বর। আশ্বিন মাসের দিকে ম্যালেরিয়ার প্রকোপে মানুষ ঘরে ঘরে ছেঁড়া কাঁথা, ন্যাকড়া, ত্যানা গায়ে চাপিয়ে কোঁকাত। আর সে কী কাঁপুনি! সে সময়ে ম্যালেরিয়ার মতো বাঘা জ্বর আর কিছু ছিল না। বাঘ যেমন গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ লাফ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকারের টুটি কামড়ে ধরে, ঠিক তেমনই ম্যালেরিয়া জ্বর এসে গ্রামের মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। হঠাৎ করেই অনেক বেশি ম্যালেরিয়া জ্বরের প্রভাব হতো বলে এই জ্বরকে বাঘের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

Najjar Hossain Raju
Najjar Hossain Raju
10 months ago
191
উত্তরঃ

'হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি' গল্পে দেখা যায়, শরৎকালে যখন বেশ ঝরঝরে আবহাওয়া, আকাশ ভর্তি রোদ, একটু একটু ঠান্ডা হাওয়া বইতে শুরু করে ঠিক তখনই হুড়মুড়িয়ে চলে আসে ম্যালেরিয়া জ্বর। জ্বরের প্রভাবে গ্রামের প্রায় অনেক মানুষ আক্রান্ত হয়ে পড়ে। আর তাদের চিকিৎসার জন্য একমাত্র ভরসা ছিলেন এ্যালোপ্যাথ ডাক্তার তোরাপ।

লেখকের গ্রামে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর আগে যে দুজন ডাক্তার ছিলেন তাদের মধ্যে একজন হচ্ছেন তোরাপ ডাক্তার। তিনি এ্যালোপ্যাথ চর্চা করেন। গ্রামের দুই হাতুড়ে ডাক্তার তোরাপ ও অঘোরের মধ্যে প্রতিযোগিতায় সব সময় তোরাপ ডাক্তারই এগিয়ে থাকেন। কারণ গ্রামে প্রধানত প্রার্দুভাব ঘটে ম্যালেরিয়া জ্বরের। ম্যালেরিয়ার মতো বাঘা জ্বর অঘোর ডাক্তারের হোমিওপ্যাথ চিকিৎসায় সারানো সম্ভব নয়। তাই একমাত্র ভরসা তোরাপ ডাক্তার। সেবার শরৎকালে গ্রামের প্রায় অর্ধেক লোক ম্যালেরিয়া জ্বরে পড়লে ব্যস্ততা বাড়ে তোরাপ ডাক্তারের। তোরাপ ডাক্তার হলুদ রঙের বড় বড় বিকট দাঁত বের করে, একটি বড় সিরিঞ্জ নিয়ে রোগীদের বাড়ি বাড়ি ঘুরতেন। তার সঙ্গে থাকত দুই প্যাকেট ভর্তি ম্যাপাক্রিন বড়ি। রোগী যেখানেই থাকুক না কেন, গলায় স্টেথোটি ঝুলিয়ে ইনজেকশনের বাক্সটি হাতে নিয়ে তোরাপ ডাক্তার হাজির হয়ে যেতেন। রোগীর কাছে গিয়েই তিনি তার গোদা গোদা এ্যাকাব্যাকা আঙুল দিয়ে রোগীর কজি চেপে ধরে কিছুক্ষণ নাড়ি পরীক্ষা করতেন। তারপর ইনজেকশন দিয়ে ম্যালেরিয়ার ভূত ছাড়াতে চাইতেন। ডাক্তারি ফি এবং ওষুধের খরচ বাবদ দুই টাকা পকেটে ভরে মহিষের লাঙলের ফলার মতো প্রকাণ্ড সিরিঞ্জ দিয়ে ইঞ্জেকশন করতেন। অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ তোরাপ ডাক্তারের ইঞ্জেকশনে অনেকে চিরদিনের জন্য খোঁড়া হয়ে যায় এবং ম্যাপাক্রিন বড়ি খেয়ে অনেকে চিরদিনের জন্য কালা হয়ে যায়। এই ছিল এ্যালোপ্যাথ ডাক্তার তোরাপের ম্যালেরিয়া চিকিৎসা।

তাই বলা যায়, হাতুড়ে ডাক্তার তোরাপের চিকিৎসা ছিল অনুমাননির্ভর। তার চিকিৎসায় অনেকে সেরে উঠলেও অনেকের জন্য তা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে উঠেছিল।

Najjar Hossain Raju
Najjar Hossain Raju
10 months ago
150
উত্তরঃ

'হেমাপ্যাথি, এ্যালোপ্যাথি' গল্পে লেখকের গ্রামে যে দুজন ডাক্তার আছেন তাদের মধ্যে একজন হচ্ছেন এ্যালোপ্যাথ ডাক্তার তোরাপ। পেশায় তিনি একজন ডাক্তার হলেও মূলত মৌসুম বুঝে ডাক্তারি করেন। বাকি সময় নিজ হাতে হালচাষ করেন। বর্ষাকাল হচ্ছে চাষবাসের সময় এবং শীতকাল হচ্ছে ফসল কাটার মৌসুম। এ সময় গ্রামের সব মানুষ রোগটোগ শিকেয় তুলে রেখে মাঠে নেমে পড়ত। কারণ এই দুই সময়ে কাজ করতে না পারলে পেটে ভাত জুটবে না। এ সময় রোগী হয়ে শুয়ে থাকার উপায় নেই। কাজেই এ সময়টাতে তোরাপ ডাক্তার ডাক্তারি পেশা শিকেয় তুলে রেখে কৃষিকাজে নেমে পড়তেন। এ সময় তিনি ডাক্তারির ধার ধারতেন না। মূলত কৃষিকাজ করার জন্যই কৃষি মৌসুম বর্ষাকাল ও শীতকালে তোরাপ ডাক্তার ডাক্তারি করতে যান না।

Najjar Hossain Raju
Najjar Hossain Raju
10 months ago
154
উত্তরঃ

বাংলায় একটা প্রবাদ আছে- "যার কাজ তারই সাজে, অন্য লোকের লাঠি বাজে।" অর্থাৎ যার যেটা কাজ তার সেটাই করা উচিত। না হলে অন্যের কাজ করতে গেলে অহেতুক উপহাসের পাত্র হয়ে দুঃখ ও অপমান বয়ে বেড়াতে হয়। 'হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি গল্পে হোমিওপ্যাথ ডাক্তার অঘোর এ্যালোপ্যাথ চিকিৎসা করতে গিয়ে দুঃখ ও অপমানকে সঙ্গী করেছেন।

'হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি' গল্পে দেখা যায়, গ্রামের অর্ধেকের বেশি মানুষ ম্যালেরিয়া জ্বরে আক্রান্ত। তাদের চিকিৎসা করে দুহাতে মোটা টাকা রোজগার করে নিচ্ছেন এ্যালোপ্যাথ ডাক্তার তোরাপ। ম্যালেরিয়া জ্বরে হোমিওপ্যাথ কাজ করে না বলে হোমিওপ্যাথ ডাক্তার অঘোরের কাছে কোনো রোগী যায় না। তোরাপ ডাক্তারের যেখানে আঙুল ফুলে কলাগাছ সেখানে অঘোর ডাক্তারের সংসার চালানো দায় হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় অঘোর ডাক্তার সিদ্ধান্ত নেন তিনিও এ্যালোপ্যাথ চিকিৎসা দেবেন। তাই তিনি চুপি চুপি জেলা শহরে গিয়ে একটা সিরিঞ্জ আর কিছু কুইনাইন ইঞ্জেকশন কিনে আনেন। তোরাপের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি এগিয়ে থাকতে চান। এবার থেকে তিনিও এ্যালোপ্যাথ চিকিৎসায় ইঞ্জেকশন দেবেন। তার কাছে প্রথম রোগী আসে ইদরিস। সে ইঞ্জেকশনের ভয়ে অঘোর ডাক্তারের হোমিওপ্যাথ চিকিৎসাতেই ভরসা রেখেছে। অদক্ষ ডাক্তার অঘোর কখনো ইঞ্জেকশন করেননি। কিন্তু তিনি হার মানতে নারাজ। তাই তিনি মনের জোরে কাঁপা কাঁপা হাতে ইদ্রিসের কোমরের মাংসে সুচ ঢুকিয়ে দেন। কিন্তু সুচটা ভেঙে যায় আনাড়ি ডাক্তারের অদক্ষতার কারণে। সেই সময়ে একজন বুদ্ধিমান ছেলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা আন্দাজ করতে পেরে দাঁত দিয়ে সুচটা বের করে নেয়। লজ্জা, দুঃখ ও অপমানে অঘোর ডাক্তারের দুচোখে অশ্রুর ঢল নামলেও শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের ভুল বুঝতে পারেন।

Najjar Hossain Raju
Najjar Hossain Raju
10 months ago
178
শিক্ষকদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি

১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!

শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!

প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
এখনই শুরু করুন ডেমো দেখুন
৫০,০০০+
শিক্ষক
৩০ লক্ষ+
প্রশ্নপত্র
মাত্র ১৫ পয়সায় প্রশ্নপত্র
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন তৈরি করুন আজই

Complete Exam
Preparation

Learn, practice, analyse and improve

1M+ downloads
4.6 · 8k+ Reviews