উত্তরঃ
ভূমিকা:
ছাত্রসমাজ একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাতা এবং পরিবর্তনের ধারক ও বাহক। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বাংলাদেশে সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলন, অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং স্বাধিকার অর্জনে ছাত্রসমাজের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। রাজনীতি হলো একটি দেশের শাসনব্যবস্থা পরিচালনা এবং জনকল্যাণ নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া। যখন এই দুটি শক্তি সম্মিলিত হয়, তখন তা দেশের গতিপথ পরিবর্তনে এক অসামান্য ক্ষমতা ধারণ করে। তবে, ছাত্ররাজনীতির গতিপথ সর্বদা মসৃণ ছিল না; এর রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস যেমন, তেমনি রয়েছে কলঙ্কিত অধ্যায়ও।
ছাত্রসমাজের পরিচয়:
ছাত্রসমাজ বলতে একটি নির্দিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আওতাভুক্ত অথবা বৃহত্তর অর্থে শিক্ষাজীবনে অবস্থানরত তরুণ প্রজন্মকে বোঝায়। জ্ঞানার্জন, মেধার বিকাশ, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখা তাদের প্রধান কাজ। তারুণ্যের উচ্ছলতা, আদর্শবাদিতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মনোভাব এবং আপসহীনতা ছাত্রসমাজের মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
রাজনীতির পরিচয়:
রাজনীতি হলো রাষ্ট্রের ক্ষমতা গ্রহণ, সংরক্ষণ ও প্রয়োগের বিজ্ঞান ও শিল্প। এটি জনগণের কল্যাণ সাধন, সমাজের শৃঙ্খলা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের অবস্থান দৃঢ় করার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়। গণতন্ত্রে রাজনীতি জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণের ওপর নির্ভরশীল।
ছাত্র ও রাজনীতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রতিটি পরতে ছাত্রসমাজের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ অবিস্মরণীয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রসমাজের আত্মত্যাগ ও নেতৃত্ব ছিল অনবদ্য। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও ছাত্রসমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। এসব আন্দোলন প্রমাণ করে, ছাত্রসমাজ কেবল বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে থাকা প্রজন্ম নয়, বরং তারা প্রয়োজনে রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি হিসেবেও আবির্ভূত হতে পারে।
ছাত্ররাজনীতির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা:
- গণতন্ত্রের প্রহরী: ছাত্ররাজনীতি গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে এবং জনস্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
- নেতৃত্ব তৈরি: ভবিষ্যৎ জাতীয় নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রে ছাত্ররাজনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।
- সমাজসচেতনতা বৃদ্ধি: সামাজিক অসঙ্গতি, অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ জনমত গঠনে সাহায্য করে।
- অধিকার প্রতিষ্ঠা: শিক্ষাক্ষেত্রে ও বৃহত্তর সমাজের বিভিন্ন ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় ছাত্ররাজনীতি কার্যকর ভূমিকা রাখে।
- দেশপ্রেম জাগ্রতকরণ: ছাত্ররাজনীতি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগিয়ে তোলে।
ছাত্ররাজনীতির নেতিবাচক দিক:
গৌরবময় ইতিহাসের পাশাপাশি ছাত্ররাজনীতির কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে, যা এর ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করেছে।
- সহিংসতা ও হানাহানি: ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দলীয় কোন্দলের কারণে শিক্ষাঙ্গনে প্রায়শই সহিংসতা দেখা যায়, যা শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করে।
- সেশন জট: রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘর্ষের কারণে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকা এবং পরীক্ষা বিঘ্নিত হওয়ায় সেশন জট সৃষ্টি হয়।
- অরাজনৈতিক উদ্দেশ্য: কিছু ছাত্রনেতা ব্যক্তিগত বা দলীয় সংকীর্ণ স্বার্থে রাজনীতিকে ব্যবহার করে, যা সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে অনীহা তৈরি করে।
- অস্ত্রের ব্যবহার: শিক্ষাঙ্গনে অস্ত্রের ব্যবহার ছাত্ররাজনীতিকে কলুষিত করেছে এবং ছাত্রদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করেছে।
- মূল্যবোধের অবক্ষয়: আদর্শভিত্তিক রাজনীতির পরিবর্তে সুবিধাবাদী ও পেশিশক্তির রাজনীতির কারণে ছাত্রসমাজের মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটেছে।
ছাত্ররাজনীতির বর্তমান অবস্থা:
বর্তমানে বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি তার গৌরবময় ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে বলে অনেকে মনে করেন। দলতন্ত্র, পেশিশক্তি ও অর্থায়নের প্রভাবে ছাত্ররাজনীতি এখন অনেকটাই মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি করছে। শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার ও একাডেমিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখার পরিবর্তে কতিপয় ছাত্রনেতার ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছাত্ররাজনীতি থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখছে।
ছাত্ররাজনীতির ইতিবাচক ভূমিকা ফিরিয়ে আনার উপায়:
ছাত্ররাজনীতির হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে হলে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি:
- নৈতিকতা ও আদর্শের পুনরুত্থান: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মাওলানা ভাসানী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মতো নেতৃত্বের আদর্শ ও নীতিকে অনুসরণ করতে হবে।
- শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সমস্যা সমাধানে গুরুত্ব দিতে হবে।
- সহিংসতা দমন: ক্যাম্পাসে যেকোনো ধরনের সহিংসতা কঠোর হাতে দমন করতে হবে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
- স্বচ্ছ নির্বাচন: ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়া চালু করতে হবে।
- রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা: মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোকে ছাত্ররাজনীতিকে লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্ত করে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
উপসংহার:
ছাত্রসমাজ ও রাজনীতি একে অপরের পরিপূরক হতে পারে, যদি রাজনীতি দেশ ও দশের কল্যাণের জন্য পরিচালিত হয়। ছাত্ররাজনীতিকে আবারও তার স্বমহিমায় ফিরিয়ে আনতে হলে ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাবক, সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। একটি সুস্থ ও গঠনমূলক ছাত্ররাজনীতিই পারে দেশকে সুনাগরিক উপহার দিতে এবং জাতির ভবিষ্যৎ পথকে সুগম করতে। শিক্ষা ও প্রজ্ঞা নির্ভর ছাত্ররাজনীতিই একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে সার্থক করতে পারে।