ড্যাস (-): যৌগিক ও মিশ্র বাক্য পৃথক ভাবাপন্ন দুই বা তার বেশি বাক্যের সমন্বয় বা সংযোগ বোঝাতে ড্যাস চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। সাধারণত দুটি বাক্যকে এক বাক্যে পরিণত করার কাজে এবং ব্যাখ্যাযোগ্য বাক্যাংশের আগে-পরে ড্যাশ ব্যবহৃত হয়। ড্যাশ চিহ্নটি হাইফেন অপেক্ষা দীর্ঘ। এটি মূলত বাক্যের ভাব প্রকাশের বিস্তৃতি ও ব্যাখ্যার জন্য ব্যবহৃত হয়। যেমন: তোমরা দরিদ্রের উপকার কর এতে তোমাদের সম্মান যাবে না বাড়বে। বাংলাদেশ দল জয়লাভ করেছে বিজয়ের আনন্দে দেশের জনগণ উচ্ছ্বসিত। ঐ লোকটি যিনি গতকাল এসেছিলেন - তিনি আমার মামা।
ব্যবহারের নিয়ম:
বাক্যের অন্তর্গত কোনো পদের ব্যাখ্যা দিতে ড্যাশ ব্যবহৃত হয়। যেমন "দেশের উন্নতিতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন ছাত্র, শিক্ষক ও শ্রমিক।"
বক্তার মনের ভাবের বা প্রসঙ্গের হঠাৎ পরিবর্তন বোঝাতে এটি ব্যবহৃত হয়। যেমন: তিনি অনেক কষ্ট করেছেন কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না।
নাটকের সংলাপে বা কথোপকথনে ড্যাশ ব্যবহৃত হতে পারে।
বাক্যের বিচ্ছিন্ন কোনো ভাবকে সংযুক্ত করতে ড্যাশ ব্যবহৃত হয়।
হাইফেন (-): সমাসবদ্ধ পদের অংশগুলো বিচ্ছিন্ন করে দেখাবার জন্য হাইফেনের ব্যবহার করা হয়। বাক্যের মধ্যকার একাধিক পদকে সংযুক্ত করতে হাইফেন ব্যবহৃত হয়। যেমন: এ আমাদের শ্রদ্ধা-অভিনন্দন, আমাদের প্রীতি-উপহার। মা-বাবার কাছে সন্তানের গৌরব সবচেয়ে বড়ো গৌরব। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকেই দেশের কল্যাণে কাজ করতে হবে।
ব্যবহারের নিয়ম: হাইফেন বা শব্দসংযোগ চিহ্ন ড্যাশের চেয়ে ছোট। এটি মূলত শব্দকে ব্যাকরণগতভাবে যুক্ত করতে ব্যবহৃত হয়।
সমাসবদ্ধ পদের অংশগুলো আলাদা করে দেখাতে হাইফেন বসে। যেমন: মা-বাবা, আজ-কাল, প্রীতি-উপহার।
একই শব্দ দুইবার ব্যবহৃত হলে তাদের মাঝে এটি বসে। যেমন: ছোট-ছোট, ধীরে-ধীরে।
একটি পদের দুটি অংশ ভিন্ন ভিন্ন পঙক্তিতে লিখতে হলে প্রথম পঙক্তির শেষে হাইফেন বসে।
কোলন (:): একটি অপূর্ণ বাক্যের পরে অন্য একটি বাক্যের অবতারণা করতে হলে কোলন ব্যবহৃত হয়। বাক্যের প্রথম অংশের কোনো উক্তিকে দ্বিতীয় অংশে ব্যাখ্যা করা এবং উদাহরণ উপস্থাপনের কাজে কোলন ব্যবহৃত হয়। যেমন: সভায় সাব্যস্ত হলো: এক মাস পরে নতুন সভাপতি নির্বাচিত করা হবে। ভাষার দুটি রূপ: কথ্য ও লেখ্য। সভায় সিদ্ধান্ত হলো: প্রতি মাসে সব সদস্যকে দশ টাকা করে চাঁদা দিতে হবে।
ব্যবহারের নিয়ম:
একটি অপূর্ণ বাক্যের পরে অন্য একটি বাক্যের অবতারণা করতে কোলন ব্যবহৃত হয়।
কোনো বিষয়ের তালিকা বা উদাহরণ প্রদানের আগে কোলন বসে। যেমনড় “নজরুলের বিখ্যাত তিনটি কাব্যগ্রন্থ হলো: অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশি ও দোলনচাঁপা।”
নাটকের চরিত্রের নামের পরে সংলাপের আগে কোলন বসে। যেমন অর্জুন: আমি যুদ্ধ করব।
কোনো বিখ্যাত ব্যক্তির উক্তি সরাসরি উদ্ধৃত করার আগে কোলন বসে।
অনুসর্গ: যেসব অব্যয় বিশেষ্য ও সর্বনামের পরে বসে বিভক্তির কাজ করে, সেগুলোকে অনুসর্গ বলে। অনুসর্গ বাক্যের মধ্যে কখনো স্বাধীন পদরূপে আবার কখনো শব্দবিভক্তির মতো ব্যবহৃত হতে পারে। উপসর্গ কথার সাথে সঙ্গতি রেখে অনুসর্গ কথাটির সৃষ্টি হয়েছে। উপসর্গ যেমন নামশব্দ বা কৃদন্ত শব্দের আগে বসে অর্থকে পরিবর্তন করে, অনুসর্গ তেমনি নামপদের পরে বসে বাক্যের অর্থকে সুস্পষ্ট করে। উপসর্গের কোনো অর্থ নেই। তাই বাক্যে স্বতন্ত্র পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয় না। কিন্তু অনুসর্গের নিজস্ব অর্থ আছে, তাই তাই তা বাক্যে স্বতন্ত্র পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
উদাহরণ:
বিনা: দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহীতে? (প্রাতিপদিকের পরে)
সনে: ময়ূরীর সনে নাচিছে ময়ূর (ষষ্ঠী বিভক্তি শব্দের পরে)
দিয়ে: তোমাকে দিয়ে আমার চলবে না। (দ্বিতীয়ার কে বিভক্তিযুক্ত পদের পরে)
যোজক: যে শব্দশ্রেণি একটি বাক্যের সাথে অন্য একটি বাক্যের অথবা একটি পদের সাথে অন্য একটি পদের সংযোগ, বিয়োজন বা সংকোচন ঘটায়, তাকে যোজক বলে বলে। এটি মূলত বাক্যের বিভিন্ন অংশকে জুড়ে দেয়।
উদাহরণ: তিনি দরিদ্র কিন্তু সৎ। এখানে 'কিন্তু' শব্দটি দুটি গুণের মধ্যে বিরোধমূলক সংযোগ স্থাপন করেছে। যোজক প্রধানত পাঁচ প্রকার, যেমন: সাধারণ যোজক (ও, আর), বৈকল্পিক যোজক (বা, অথবা), বিরোধমূলক যোজক (কিন্তু, তবে) ইত্যাদি।
আবেগ শব্দ: যেসব শব্দ দিয়ে মনের বিশেষ ভাব বা গভীর আবেগ যেমন: আনন্দ, বিস্ময়, ঘৃণা, ভয়, শোক বা বিরক্তি প্রকাশ পায়, তাদের আবেগ শব্দ বলে। এই শব্দগুলো বাক্যের অন্যান্য পদের সাথে ব্যাকরণগতভাবে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত থাকে না, বরং স্বাধীনভাবে মনের ভাব প্রকাশ করে।
উদাহরণ: আহা! কী চমৎকার দৃশ্য। এখানে 'আহা' শব্দটি মনের আনন্দ বা বিস্ময় প্রকাশ করছে। আবেগ শব্দ ব্যবহারের পর সাধারণত একটি বিস্ময়সূচক চিহ্ন (!) ব্যবহার করা হয়। এটি মনের তীব্র অভিব্যক্তি প্রকাশের প্রধান মাধ্যম।
বাক্যের অর্থ সুস্পষ্টভাবে বোঝার জন্য বাক্যের মধ্যে বা বাক্যের সমাপ্তিতে কিংবা বাক্যে আবেগ (হর্ষ, বিষাদ), জিজ্ঞাসা ইত্যাদি প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে বাক্য গঠনে যে ভাবে বিরতি দিতে হয় এবং লেখার সময় বাক্যের মধ্যে তা দেখাবার জন্য যে সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করা হয়, তা-ই যতি বা বিরাম বা ছেদচিহ্ন।
বিরাম চিহ্ন ব্যবহৃত হবার কারণঃ
ক. বাক্যের অর্থ সহজভাবে বোঝাতে, খ. শ্বাস বিরতির জায়গা দেখাতে, গ. বাক্যকে অলংকৃত করতে, ঘ. বাক্যের অর্থ স্পষ্টকরণের জন্য,
বিরাম বা যতি চিহ্ন এর প্রবর্তক
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর । বাংলা সাহিত্যে দাঁড়ি, কমা, কোলন প্রভৃতি বিরাম চিহ্ন তিনি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন। এজন্য তাকে বাংলা যতি চিহ্নের প্রবর্তক বলা হয় ।
বিরাম বা যতি চিহ্ন
বিরাম বা যতি চিহ্ন মোট ১২টি। নিম্নে এদের নাম, আকৃতি এবং তাদের বিরতিকালের পরিমাণ নির্দেশিত হলো-
ক. বাক্য পাঠকালে সুস্পষ্টতা বা অর্থ-বিভাগ দেখাবার জন্য যেখানে স্বল্প বিরতির প্রয়োজন, সেখানে কমা ব্যবহৃত হয়। যেমন- সুখ চাও, সুখ পাবে পরিশ্রমে।
খ. পরস্পর সম্বন্ধযুক্ত একাধিক বিশেষ্য বা বিশেষণ পদ একসঙ্গে বসলে শেষ পদটি ছাড়া বাকি সবগুলোর পরই কমা বসবে। যেমন- সুখ, দুঃখ, আশা, নৈরাশ্য একই মালিকার পুষ্প।
গ. সম্বোধনের পরে কমা বসাতে হয়। যেমন- রশিদ, এখানে আস ।
ঘ. মাসের তারিখ লিখতে বার ও মাসের পর কমা বসবে। যেমন- ১৬ই পৌষ, বুধবার, ১৩৯০ বঙ্গাব্দ ।
ঙ. উদ্ধরণ চিহ্নের পূর্বে (খণ্ড বাক্যের শেষে) কমা বসাতে হবে। যেমন- অধ্যক্ষ বললেন, “ছুটি পাবেন না।”
চ. বাড়ি বা রাস্তার নম্বরের পরে কমা বসে। যেমন- ৬৫, নবাবপুর রোড, ঢাকা।
২. সেমি কোলন (;): কমা অপেক্ষা বেশি বিরতির প্রয়োজন হলে, সেমি কোলন বসে। একাধিক স্বাধীন বাক্যকে একটি বাক্যে লিখলে সেগুলোর মাঝখানে সেমি কোলন বসে। যেমন- সংসারের মায়াজালে আবদ্ধ আমরা; সে মায়ার বাঁধন কি সত্যিই দুশ্ছেদ্য?
৩. দাঁড়ি বা পূর্ণচ্ছেদ (। ): বাক্যের পরিসমাপ্তি বোঝাতে দাঁড়ি বা পূর্ণচ্ছেদ ব্যবহার করতে হয়। যেমন- কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকার দূরত্ব ৩৮০ কিলোমিটার।
৪. প্রশ্নবোধক চিহ্ন (?): বাক্যে কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করা হলে, বাক্যের শেষে প্রশ্নবোধক চিহ্ন বসে। যেমন- তুমি কখন এলে?
৫. বিস্ময় ও সম্বোধন চিহ্ন (!): হৃদয়াবেগ প্রকাশ করতে হলে এবং সম্বোধন পদের পরে বিস্ময় ও সম্বোধন চিহ্ন বসে। যেমন- আহা! কি চমৎকার দৃশ্য।
৬. কোলন ( : ) : একটি অপূর্ণ বাক্যের পরে অন্য একটি বাক্যের অবতারণা করতে হলে কোলন ব্যবহৃত হয়। যেমন- সভায় সাব্যস্ত হলো : এক মাস পরে নতুন সভাপতি নির্বাচিত করা হবে।
৭. ড্যাস চিহ্ন (-): যৌগিক ও মিশ্র বাক্য পৃথক ভাবাপন্ন দুই বা তার বেশি বাক্যের সমন্বয় বা সংযোগ বোঝাতে ড্যাস চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। কোনো কথার দৃষ্টান্ত বা বিস্তার বোঝাতে ড্যাস চিহ্ন বসে। যেমন- তোমরা দরিদ্রের উপকার কর এতে - তোমাদের সম্মান যাবে না - বাড়বে।
৮. কোলন ড্যাস (:-): উদাহরণ বা দৃষ্টান্ত প্রয়োগ করতে হলে কোলন এবং ড্যাস চিহ্ন একসাথে ব্যবহৃত হয়। যেমন- বর্ণ দুই প্রকার। যথা: স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ।
৯. হাইফেন বা সংযোগ চিহ্ন (-): সমাসবদ্ধ পদের অংশগুলো বিচ্ছিন্ন করে দেখাবার জন্য হাইফেনের ব্যবহার করা হয়। দুই শব্দের সংযোগ বোঝাতে হাইফেন ব্যবহৃত হয়। যেমন এ আমাদের শ্রদ্ধা - অভিনন্দন, আমাদের প্রীতি - উপহার।
১০. ইলেক বা লোপ চিহ্ন ('): কোনো বর্ণ বিশেষের লোপ বোঝাতে বিলুপ্ত বর্ণের জন্য লোপচিহ্ন দেয়া হয়। যেমন- মাথার‘পরে জ্বলছে রবি। (‘পরে = ওপরে)
১১. উদ্ধরণ চিহ্ন (“ ”): বক্তার প্রত্যক্ষ উক্তিকে এই চিহ্নের অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। যেমন- শিক্ষক বললেন, “গতকাল ‘অগ্রদূত বাংলা’ বইটি প্রকাশিত হয়েছে।”
১২. ব্রাকেট বা বন্ধনী চিহ্ন : (), {}, [] এই তিনটি চিহ্নই গণিতশাস্ত্রে ব্যবহৃত হয়। তবে প্রথম বন্ধনীটি বিশেষ ব্যাখ্যামূলক অর্থে সাহিত্যে ব্যবহৃত হয়। যেমন- ত্রিপুরায় (বর্তমানে কুমিল্লা) তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
বাক্যের অর্থ সুস্পষ্টভাবে বোঝার জন্য বাক্যের মধ্যে বা বাক্যের সমাপ্তির কিংবা বাক্যে আবেগ (হর্ষ, বিষাদ), জিজ্ঞাসা ইত্যাদি প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে বাক্য গঠনে যে ভাবে বিরতি দিতে হয় এবং লেখার সময় বাক্যের মধ্যে তা দেখবার জন্য যে সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করা হয়, তা-ই যতি বা বিরাম বা ছেদচিহ্ন।
বিরাম চিহ্ন ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তাঃ ( ক) বাক্যের অর্থ যথাযথরূপে প্রকাশ করা। (খ) বাক্যের পদগুলো নির্দিষ্ট ছক বা রীতি অনুযায়ী সাজিয়ে তোলা। (গ) বাক্যের পদ বিন্যাসের সঙ্গে সঙ্গতি স্থাপন করা। (ঘ) বাক্যের পদগুলোর মধ্যে ভাবের সঙ্গতি রক্ষা করা। (ঙ) বক্তার অর্থবহ বাক্য শ্রোতার নিকট নির্দিষ্ট ভাবে পৌঁছে দেওয়া।