সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই। লিখেছেন মধ্যযুগের কবি চন্ডীদাস।
সংস্কৃতির উপাদানসমূহকেও দুইভাগে ভাগ করা যায়। যথা-১. বস্তুগত বা দৃশ্যমান উপাদানসমূহ ও ২. অবস্তুগত বা অদৃশ্যমান উপাদানসমূহ।
এ দেশের সংস্কৃতির বস্তুগত উপাদানসমূহ হচ্ছে- বিভিন্ন ধরনের ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র, পোশাক, যানবাহন, খাবার, চাষাবাদের উপকরণ, বইপত্র ইত্যাদি। আমাদের সংস্কৃতির অবস্তুগত উপাদানসমূহ হচ্ছে- সামগ্রিক জ্ঞান, মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি, ধর্মীয় বিশ্বাস ও নীতিবোধ, ভাষা, বর্ণমালা, শিল্পকলা, সাহিত্য, সংগীত, আদর্শ ও মূল্যবোধ, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা ইত্যাদি।
ছকে? চিহ্নিত স্থানে বাংলাদেশের সংস্কৃতি বিষয়টি প্রযোজ্য।
নিচে বিষয়টি আলোচনা করা হলো- সংস্কৃতি নির্মাণে ভৌগোলিক পরিবেশ, আবহাওয়া, উৎপাদন পদ্ধতি ইত্যাদি বিশেষ ভূমিকা রাখে। ফলে একেক দেশের মানুষের সংস্কৃতি একেক রকম। আবার একটি দেশের মধ্যেও নানা ধরনের সংস্কৃতি বিকশিত হতে পারে। তাই সংস্কৃতি কোনো স্থবির বিষয় নয়, বরং পরিবর্তনশীল। বাংলাদেশের সংস্কৃতির প্রধান খাদ্য ভাত-মাছ এখনও গ্রামের খাদ্যাভ্যাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জারি, সারি, বাউল, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, বারমাস্যা, গম্ভীরা ইত্যাদি নানা আঞ্চলিক গানে ফুটে ওঠে গ্রামের মানুষের হাসি-কান্না। গ্রামের মেলায় ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পালাগান, যাত্রাগান, কবিগান, কীর্তনগান, মুর্শিদি গানের ইত্যাদি আয়োজন আধুনিককালেও গ্রামের অনন্যতা বজায় রেখেছে। অন্যদিকে শহরের ভৌগোলিক পরিবেশ, পেশা, যান্ত্রিক জীবন ইত্যাদি গড়ে তুলেছে শহুরে সংস্কৃতি।
সামগ্রিক বিচারে বাংলাদেশের সংস্কৃতি অতি প্রাচীনকাল থেকেই মানবতাবাদী- যা আমরা পূর্ববর্তী পাঠে জেনেছি। নানাভাবে এর প্রমাণ আমরা পাই। মণিপুরি নৃত্য, উত্তরবঙ্গের নৃগোষ্ঠীদের ঝুমুর নৃত্য, ত্রিপুরাদের বোতল নৃত্য ইত্যাদি বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে।
ব্যক্তি ও গোষ্ঠী জীবনে সংস্কৃতি বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে বিশ্বাস, ধারণা, আদর্শ ও মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলে এবং ব্যক্তির আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। সংস্কৃতি গোষ্ঠী জীবনের স্বার্থে পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও নির্ভরশীলতা শিক্ষার মাধ্যমে সমাজকে সুসংহত ও সুশৃঙ্খল করে তোলে। সংস্কৃতি ব্যক্তিকে রুচিশীল ও মার্জিত করে। ব্যক্তির বিকাশকে সহজ করে।
শিক্ষা যেহেতু সংস্কৃতির অংশ, তাই সংস্কৃতি ব্যক্তির মধ্যে জ্ঞান অর্জনের স্পৃহা জাগায়। শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে ব্যক্তি নিজের ও নিজ সমাজের কল্যাণ সাধন করে। এদেশের ব্যক্তি ও গোষ্ঠী জীবনে সংস্কৃতির প্রভাব অপরিসীম। যেমন, বাংলাদেশের সংস্কৃতির প্রথা ও রীতি অনুযায়ী সন্তান মা-বাবার প্রতি সম্মান দেখায়, দায়িত্ব পালন করে। না করলে সমাজ নিন্দা জানায়। এটি আমাদের সমাজের প্রত্যাশিত সংস্কৃতি। এভাবেই আমাদের সংস্কৃতি এদেশের মানুষের ব্যক্তিগত আচার-আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে, দিক-নির্দেশনা দেয়। আবার আমাদের বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবের মধ্য দিয়ে সামাজিক ঐক্য সুদৃঢ় হয়। সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও মঙ্গল চিন্তা কাজ করে।
বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে বিয়ে একটি প্রধান পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠান। এর মাধ্যমে দুটি পরিবারের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। বিয়ের অনুষ্ঠানকে ঘিরে যে সামাজিক বন্ধন তৈরি হয় সেখানে সংস্কৃতির প্রভাব সুস্পষ্ট। তবে দেশ ও সমাজ্যভ পার্থক্য রয়েছে।
সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ প্রকৃতি ও পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে নিজের প্রয়োজন মিটিয়েছে। এক টুকরো পাথর বা একটি গাছের ডাল হয়ে উঠেছিল হিংস্র পশুর হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর হাতিয়ার। প্রকৃতিকে এমনিভাবে কাজে লাগানোর ক্ষমতা মানুষকে দিয়েছে সংস্কৃতি যা অদ্যাবধি চলমান রয়েছে। মানুষ বুঝতে পারল সমাজবদ্ধ হয়ে একত্রে থাকলে টিকে থাকার এই লড়াই আরও সুদৃঢ় হবে। তাই সমাজকে সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে তৈরি হয় নানা নিয়ম-কানুন, যা ধীরে ধীরে অর্থনীতি, রাজনীতি, ধর্ম, শিক্ষা ইত্যাদিতে রূপ নিল। সমাজের মানুষের আনন্দ, বিনোদন ও কল্যাণের জন্য তৈরি হলো নাচ, গান, সাহিত্য আরও কত কী! ফলে রচিত হলো সংস্কৃতির বস্তুগত ও অবস্তুগত রূপ।

এ অধ্যায় শেষে আমরা -
- সংস্কৃতির ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারব;
- বাংলাদেশের সংস্কৃতির উপাদান ব্যাখ্যা করতে পারব;
- বাংলাদেশের সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে পারব;
- বাংলাদেশের সংস্কৃতির ধরন ব্যাখ্যা করতে পারব;
- ব্যক্তি ও গোষ্ঠী জীবনে বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধারণ ও লালন করতে পারব।
Related Question
View Allমানুষ তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য, সমাজজীবনে কোনো উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে যা কিছু চিন্তা ও কর্ম করে তাই সংস্কৃতি।
সংস্কৃতির উপাদানসমূহকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- (১) বস্তুগত বা দৃশ্যমান উপাদান (বিভিন্ন ধরনের ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র, পোশাক, যানবাহন, বইপত্র ইত্যাদি)। (২) অবস্তুগত বা অদৃশ্যমান উপাদান (সামগ্রিক জ্ঞান, মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি, ধর্মীয় বিশ্বাস ও নীতিবোধ, ভাষা, বর্ণমালা, সাহিত্য, সংগীত ইত্যাদি)।
জুলেখার মাধ্যমে বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতি ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতি বেশ সমৃদ্ধ। বাংলাদেশের সংস্কৃতির প্রধান খাদ্য ভাত-মাছ এখনও গ্রামের মানুষের খাদ্যাভ্যাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জারি, সারি, বাউল, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, বারমাস্যা, গম্ভীরা ইত্যাদি নানা আঞ্চলিক গানে ফুটে ওঠে গ্রামের মানুষের হাসি-কান্না। গ্রামের মেলায় ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পালাগান, যাত্রাগান, কবিগান, কীর্তনগান, মুর্শিদি গান ইত্যাদির আয়োজন আধুনিককালেও গ্রামের অনন্যতা বজায় রেখেছে। উদ্দীপকের জুলেখা সকালের নাস্তায় পান্তাভাত ও মাছ খায় এবং ভাটিয়ালি গান শোনে, যা গ্রামীণ সংস্কৃতি প্রকাশ পায়। উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, জুলেখার মাধ্যমে বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতিই ফুটে উঠেছে।
উদ্দীপকের হাজেরার সংস্কৃতিতে বিশ্বায়নের প্রভাব লক্ষ করা যায়।
শহরের পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস ও যান্ত্রিকতার জীবন বিশ্বায়ন ব্যবস্থার সাথে সংগতিপূর্ণ। শহরে গড়ে উঠেছে যন্ত্রনির্ভর সংস্কৃতি, যা মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ ও গতিময় করেছে। উন্নত যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা মানুষের সময়ের সাশ্রয় করেছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সমস্ত প্রকার উৎপাদন প্রক্রিয়া শহর থেকেই পরিচালিত হয়। সুউচ্চ দালানকোঠা, কলের গাড়ি ইত্যাদি বিশ্বায়নের পথ পরিভ্রমণ করছে। আজকাল আফিস-আদালতের সব কর্মকান্ড কম্পিউটারভিত্তিক পরিচালিত হচ্ছে। উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে শুরু করে সব ব্যবসায়িক, শিক্ষা কিংবা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড কম্পিউটার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যা বিশ্বায়নের নামান্তর। ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে এখন বহির্বিশ্বের সাথে খুব সহজেই যোগাযোগ স্থাপন করা যাচ্ছে। যেকোনো প্রকার সংবাদ, ব্যবসায়িক আলাপ-আলোচনা এখন কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে পরিচালিত ও সম্পাদিত হচ্ছে।
উদ্দীপকে হাজেরাও তার পড়াশোনা শেষে ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে বহির্বিশ্বের সাথে নিজেকে পরিচিত করছে, যা বিশ্বায়ন ধারণার সাথে সংগতিপূর্ণ। উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, হাজেরার খাদ্যাভ্যাস সংস্কৃতিতে বিশ্বায়নের প্রভাব লক্ষ করা যায়।
সংস্কৃতি' শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ Culture.
বাংলাদেশের গ্রামীণ ভৌগোলিক পরিবেশ, পুকুর, খালবিল, নদীনালা, বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ, পাহাড়-পর্বত গ্রামীণ সংস্কৃতিকে করেছে সমৃদ্ধ। এদেশের উর্বর মাটিতে কৃষক ফসল ফলায়, নদীনালা, খালবিল কৃষি উৎপাদনে সহায়তা করে। কৃষি, মৎস্য চাষ, নৌকা চালানো ইত্যাদি পেশা গ্রামের সংস্কৃতি নির্মাণে ভূমিকা রাখে। ভাত ও মাছ গ্রামের প্রধান খাবার। উৎসব-পার্বণে বিভিন্ন গান, মেলার আয়োজন গ্রামীণ সংস্কৃতির সমৃদ্ধ রূপ।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!