অভাবের কারণে তাঁতি তার বউয়ের জন্য ভালোমতো একটা মাছ কিনে আনতে পারে না বলে তাঁতির বউ রাগ করে প্রশ্নোক্ত উক্তিটি করেছিল।
'জিদ' গল্পে জসীমউদ্দীন সুনিপুণভাবে তাঁতি সমাজের আর্থিক দুরবস্থা ও অভাবের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। আগেকার দিনে তাঁতিরা বেশ ভালো উপার্জন করলেও বর্তমানে কাপড়ের কল বসানোর কারণে তাদের উপার্জন অনেক কমে গিয়েছে। এ উপার্জন দিয়ে তারা তাদের মৌলিক চাহিদাগুলোও ঠিকমতো পূরণ করতে পারে না। এখন কাপড় বিক্রি করে যে লাভ হয়, তা দিয়ে কোনোরকমে শুধু বেঁচে থাকা যায়। কিন্তু এটা-ওটা কিনে মনের ইচ্ছামতো খাওয়া যায় না। তাঁতি এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারলেও তাঁতির বউ কিছুতেই এসব বুঝতে চায় না। সে তাঁতির কাছে অভিযোগ জানায় যে, তাঁতির সংসারে এসে সে একদিনও ভালোমতো খেতে পারেনি। সে তাঁতিকে হাটে যেতে বলে এবং ভালো দেখে একটি মাছ কিনে আনতে বলে। কিন্তু তাঁতি জানে যে তার কাছে মাছ কেনার মতো টাকা নেই। তাই সে বউয়ের কথা কানে তোলে না। তখন তাঁতির বউ অভিযোগের সুরে স্বামীকে-উক্ত কথাটি বলে।
প্রকৃতপক্ষে অভাবের কারণে তাঁতির বউ দীর্ঘদিন ভালোমন্দ খেতে না পেরে তাঁতিকে মাছ কিনতে বলেছিল এবং তাঁতি তার কথায় গুরুত্ব না দেওয়ায় সে তাঁতিকে উদ্দেশ করে আলোচ্য উক্তিটি করে।
পল্লিকবি জসীমউদ্দীন রচিত একটি শিক্ষামূলক ছোটোগল্প হলো 'জিদ'। এ গল্পে অনাবশ্যক জিদের কারণে মানুষের জীবনে সৃষ্ট জটিলতার স্বরূপ তুলে ধরা হয়েছে। সেই সাথে রূপায়িত হয়েছে তাঁতিদের জীবনে অভাবের চিত্র। আগেকার দিনে তাদের উপার্জন ভালো হলেও বর্তমানে কাপড়ের কল বসানোর কারণে তাদের উপার্জন অনেক কমে গিয়েছে। ফলে তাদেরকে ঘিরে ধরেছে সীমাহীন অভাব।
'জিদ' গল্পে এক তাঁতি ও তার বউয়ের অভাবের সংসারের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তাঁতিদের জীবন আগে বেশ স্বচ্ছলভাবে চললেও বর্তমানে তাদের অভাবের সীমা নেই। আগে তারা নানারকম নকশার নকশি-শাড়ি তৈরি করত। সেসব শাড়িতে ছিল সূক্ষ্ম সুতার বুনন। বিভিন্ন স্থানের বাদশাজাদি ও নবাবজাদিরা এসব শাড়ি কিনত। ফলে তাঁতিদের উপার্জনও হতো অনেক বেশি। কিন্তু বর্তমানে শহরে কাপড়ের কল বসানোর কারণে তাদের উপার্জন কমে গিয়েছে। এখন তারা কোনোমতে দিনাতিপাত করে। ইচ্ছামতো খাবার কিনে খেতে পারে না। তারা শুধু শাকসবজি আর ভাত খেয়ে জীবন কাটায়। তাও সেই শাক-ভাতও পেট পুরে খাওয়া হয় না। তাদের আধ-পেট খেয়ে দিন কাটাতে হয়। কাপড়ের কল চালু হওয়ার পর অভাব তাঁতিদেরকে এমনভাবে ঘিরে ধরল যে তারা পথের ভিখারির মতো জীবনযাপন করতে লাগল। গল্পে তাঁতির বউয়ের মাছ খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশের মাধ্যমে যেন তাদের এ অভাব আরও প্রকট আকারে প্রকাশ পায়। বউয়ের জন্য তাঁতি বহু কষ্টে তিনটি ছোটো মাছ কিনে নিয়ে গেলে বউ তা দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়।
'জিদ' গল্পে জসীমউদ্দীন তাঁতিদের জীবনের অভাবকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে উপস্থাপন করেছেন। মানুষ দারিদ্র্যের চরম পর্যায়ে পৌছালে তাকে ক্ষুধায় কষ্ট পেতে হয়। 'জিদ' গল্পে তাঁতি সম্প্রদায় সেই ক্ষুধার কষ্টই সহ্য করছে। এছাড়া তাদের সার্বিক জীবনাচরণেও অভাবের প্রকট রূপ প্রস্ফুটিত হয়।
সুতরাং, উপরের আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায় যে, তাঁতি ও তার বউয়ের খাওয়ার কষ্ট ও সাংসারিক টানাপোড়েনের মাধ্যমে 'জিদ' গল্পে তাঁতিদের জীবনে অভাবের চিত্র রূপায়িত হয়েছে।

এক তাঁতি আর তার বউ। তারা বড়োই গরিব। কোনোদিন খায়, কোনোদিন খাইতে পায় না। তাঁত খুঁটি চালাইয়া, কাপড় বুনাইয়া, কীই-বা তাহাদের আয়?
আগেকার দিনে তাহারা বেশি উপার্জন করিত। তাহাদের হাতের একখানা শাড়ি পাইবার জন্য কত বাদশাজাদিরা, কত নবাবজাদিরা তাহাদের উঠানে গড়াগড়ি পাড়িত।
তখন একখানা শাড়ি বুননে মাসের পর মাস লাগিত। কোনো কোনো শাড়ি বুনন করতে বৎসরেরও বেশি সময় ব্যয় হইত।
সেইসব শাড়ি বুনাইতে কতই-না যত্ন লইতে হইত। রাত থাকিতে উঠিয়া তাঁতির বউ চরকা লইয়া ঘড়র-ঘড়র করিয়া সুতা কাটিত। খুব ধরিয়া ধরিয়া চোখে নজর আসে না, এমনই সরু করিয়া সে সুতা কাটিত। ভোরবেলায় আলো-আঁধারির মধ্যে সুতা-কাটা শেষ করিতে হইত। সূর্যের আলো যখন চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িত, তখন সুতা কাটিলে সুতা তেমন মুলাম হইত না।
তাঁতি আবার সেই সুতায় নানা রকমের রং মাখাইত। এত সরু সুতা আঙুল দিয়া ধরিলে ছিঁড়িয়া যায়। তাই বাঁশের সরু শলার সঙ্গে আটকাইয়া, সেই সুতা তাঁতে পরাইয়া, কত রকমের নকশা করিয়া তাঁতি কাপড় বুনাইত। সেই শাড়ির ওপর বুনট করা থাকিত কত রাজকন্যার মুখের রঙিন হাসি, কত রূপকথার কাহিনি, কত বেহেশতের আরামবাগের কেচ্ছা। ঘরে ঘরে মেয়েরা সেই শাড়ি পরিয়া যখন হাঁটিত, তখন সেই শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে কত গুল-এ-বকওয়ালি আর কত লুবানকন্যার কাহিনি ছড়াইয়া পড়িত।
শাড়িগুলির নামই-বা ছিল কত সুন্দর। কলমি ফুল, গোলাপ ফুল, মন-খুশি, রাসমণ্ডন, মধুমালা, কাজললতা, বালুচর। শাড়িগুলির নাম শুনিয়াই কান জুড়াইয়া যায়। কিন্তু কীসে কী হইয়া গেল। দেশের রাজা গেল। রাজ্য গেল। দেশবাসী পথের ভিখারি সাজিল।
বিদেশি বণিক আসিয়া শহরে কাপড়ের কল বসাইল। কলের ধোঁয়ার ওপর সোয়ার হইয়া হাজার হাজার কাপড় ছড়াইয়া পড়িতে লাগিল; যেমন সস্তা তেমনই টেকসই। আবার যেখানে-সেখানে পাওয়া যায়। তাঁতির কাপড় কে আর কিনিতে চায়।
হাট হইতে নকশি-শাড়ি ফিরাইয়া আনিয়া তাঁতিরা কাঁদে। শূন্য হাঁড়িতে চাউল না-পাইয়া তাঁতির বউ কাঁদে। ধীরে ধীরে তারা সেই মিহিন শাড়ি বুনন ভুলিয়া গেল। এখনকার লোক নকশা চায় না। তারা চায় টেকসই আর সপ্তা কাপড়। তাই তাঁতি মিলের তৈরি মোটা সুতার কাপড় বুনায়। সেই সুতা আবার যেখানে-সেখানে পাওয়া যায় না। চোরাবাজার হইতে বেশি দামে কিনিতে হয়। এখন কাপড় বেচিয়া যাহা লাভ হয়, তাহাতে কোনোরকমে শুধু বাঁচিয়া থাকাই যায়। এটা-ওটা কিনিয়া মনের ইচ্ছামতো খাওয়া যায় না।
কিন্তু তাঁতির বউ সে কথা কিছুতেই বুঝিতে পারে না। সে তাঁতিকে বলে, ‘তোমার হাতে পড়িয়া আমি একদিনও ভালোমতো খাইতে পারিলাম না। এত করিয়া তোমাকে বলি, হাটে যাও। ভালোমতো একটা মাছ কিনিয়া আনো। সে কথা কানেই তোলো না।’
তাঁতি উত্তর করে, 'এই সামনের হাটে যাইয়া তোমার জন্য ভালোমতো একটা মাছ কিনিয়া আনিব।' সে হাট যায়, পরের হাট যায়, আরও এক হাট যায়, তাঁতি কিন্তু মাছ কিনিয়া আনে না।
সেদিন তাঁতির বউ তাঁতিকে ভালো করিয়াই ধরিল, 'এ হাটে যদি মাছ কিনিয়া না-আনিবে তবে রহিল পড়িয়া তোমার চরকা, রহিল পড়িয়া তোমার নাটাই, আমি আর নলি কাটিব না। রহিল পড়িয়া তোমার শলা, আমি আর তেনা কাড়াইব না। শুধু শাকভাত আর শাকভাত, খাইতে খাইতে পেটে চর পড়িয়া গেল। তাও যদি পেট ভরিয়া খাইতে পাইতাম।'
তাঁতি কী আর করে? একটা ঘষাপয়সা ছিল, তাই লইয়া তাঁতি হাটে গেল। এ-দোকান ও-দোকান ঘুরিয়া অনেক দর-দস্তুর করিয়া সেই ঘষাপয়সাটা দিয়া তাঁতি তিনটি ছোট্ট মাছ কিনিয়া আনিল।
মাছ দেখিয়া তাঁতির বউ কী খুশি! আহ্লাদে আটখানা হইয়া সে মাছ কুটিতে বসিল। এভাবে ঘুরাইয়া, ওভাবে ঘুরাইয়া কত গুমর করিয়াই সে মাছ কুটিল! যেন সত্য সত্যই একটা বড়ো মাছ কুটিতেছে। তারপর পরিপাটি করিয়া সেই মাছ রান্না করিয়া তাঁতিকে খাইতে ডাকিল।
তাঁতি আর তার বউ খাইতে বসিল। তিনটি মাছ। কে দুইটি খাইবে, আর কে একটি খাইবে- কিছুতেই তারা ঠিক করিতে পারে না। তাঁতি বউকে বলে, 'দেখ, রোদে ঘামিয়া, কত দূরের পথ হাঁটিয়া এই মাছ কিনিয়া আনিয়াছি। আমি দুইটি মাছ খাই। তুমি একটা খাও।'
বউ বলে, 'উঁহু। তাহা হইবে না। এতদিন বলিয়া কহিয়া কত মান-অভিমান করিয়া তোমাকে দিয়া মাছ কিনাইয়া আনিলাম। আমিই দুইটি মাছ খাইব।' তাঁতি বলে, 'তাহা কিছুতেই হইবে না।' কথায় কথায় আরও কথা ওঠে! তর্ক বাড়িয়া যায়। সেই সঙ্গে রাতও বাড়ে, কিন্তু কিছুতেই মীমাংসা হয় না, কে দুইটি মাছ খাইবে আর কে একটি মাছ খাইবে! অনেক বাদানুবাদ, অনেক কথা কাটাকাটি, রাতও অর্ধেক হইল। তখন দুইজনে স্থির করিল, তাহারা চুপ করিয়া ঘুমাইয়া থাকিবে। যে আগে কথা বলিবে, সে-ই একটা মাছ খাইবে।
তাঁতি এদিকে মুখ করিয়া, তাঁতির বউ ওদিকে মুখ করিয়া শুইয়া রহিল। থালাভরা ভাত-তরকারি পড়িয়া রহিল। রাত কাটিয়া ভোর হইল, কিন্তু কারো মুখে কোনো কথা নাই। ভোর কাটিয়া দুপুর হইল, কিন্তু কারো মুখে কোনো কথা নাই।
দুপুর কাটিয়া সন্ধ্যা হইল, কিন্তু কারো মুখে কোনো কথা নাই। বেলা যখন পড়-পড়, আকাশের কিনারায় সাঁঝের কলসি ভর-ভর, পাড়ার লোকেরা বলাবলি করে, 'আরে ভাই। আজ তাঁতি আর তাঁতির বউকে দেখিতেছি না কেন? তাদের বাড়িতে তাঁতের খটর-খটরও শুনি না, চরকার ঘড়র-ঘড়রও শুনি না। কোনো অসুখ-বিসুখ করিল নাকি? আহা! তাঁতি বড়ো ভালো মানুষটি। বেচারা গরিব হইলে কী হয়, কারো কোনো ক্ষতি করে নাই কোনোদিন।'
একজন বলিল, 'চলো ভাই! দেখিয়া আসি ওদের কোনো অসুখ-বিসুখ করিল নাকি।'
পাড়ার লোকেরা তাঁতির দরজায় আসিয়া ডাকাডাকি আরম্ভ করিল। কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ নাই। ভিতর হইতে দরজা বন্ধ।
তখন তারা দরজা ভাঙিয়া ঘরে ঢুকিয়া দেখিল, তাঁতি আর তাঁতির বউ শুইয়া আছে। নড়ে না, চড়ে না-ডাকিলেও সাড়া দেয় না। তারপর গাঁয়ের মোল্লা আসিয়া পরীক্ষা করিয়া স্থির করিল, তাহারা মরিয়া গিয়াছে।
আহা কী ভালোবাসা রে! তাঁতি মরিয়াছে, তাহার শোকে তাঁতিবউও মরিয়া গিয়াছে। এমন মরা খুব কমই দেখা যায়। এসো ভাই আতর-গোলাপ মাখাইয়া কাফন পরাইয়া এদের একই কবরে দাফন করি।
গোরস্তান সেখান হইতে এক মাইল দূরে। এই অবেলায় কে সেখানে যাইবে? পাড়ার দুইজন ইমানদার লোক মরা কাঁধে করিয়া লইয়া যাইতে রাজি হইল। মোল্লা সাহেব ঘোড়ায় চড়িয়া সঙ্গে সঙ্গে চলিলেন। কবর দেওয়ার সময় জানাজা পড়িতে হইবে। গোরস্তানে মুরদা আনিয়া নামানো হইল; মোল্লা সাহেব একটি খুঁটার সঙ্গে তাঁর ঘোড়াটা বাঁধিয়া সমস্ত তদারক করিতে লাগিলেন।
তাঁর নির্দেশমতো কবর খোঁড়া হইল। তাঁতি আর তাঁতির বউকে গোসল করাইয়া, কাফন পরাইয়া সেই কবরের মধ্যে শোয়াইয়া দেওয়া হইল। তখনও তাহারা কথা বলে না। তাহাদের বুকের ওপর বাঁশ চাপাইয়া দেওয়া হইল। তখনও তাহারা কথা বলে না। তারপর যখন সেই বাঁশের ওপর কোদাল কোদাল মাটি ফেলানো হইতে লাগিল, তখন বাঁশ-খুঁটি সমেত তাঁতি লাফাইয়া বলিয়া উঠিল, 'তুই দুইটা খা, আমি একটা খাব।'
সঙ্গে ছিল দুইজন লোক আর মোল্লা সাহেব। তারা ভাবিল, নিশ্চয়ই ওরা ভূত হইয়া জাগিয়া উঠিয়াছে। সঙ্গের দুইজন লোক মনে করিল, তাঁতি যে তার বউকে দুইটা খাইতে বলিল, নিশ্চয়ই সে তাহাদের দুইজনকে খাইতে বলিল। তখন তাহারা ঝুড়ি কোদাল ফেলিয়া দে-দৌড়, যে যত আগে পারে! মোল্লা সাহেব মনে করিলেন, তাঁতি নিজেই আমাকে খাইতে আসিতেছে। তখন তিনি তাড়াতাড়ি আসিয়া ঘোড়ার পিঠে সোয়ার হইয়া মারিলেন চাবুক। ভয়ের চোটে খুঁটি হইতে ঘোড়ার দড়ি খুলিয়া লইতে ভুলিয়া গেলেন।
চাবুক খাইয়া ঘোড়া খুঁটি উপড়াইয়া দিল ছুট। ঘোড়া যত চলে সেই দড়িতে বাঁধা খুঁটা আসিয়া মোল্লা সাহেবের পিঠে তত লাগে। তিনি ভাবেন, বুঝি ভূত আসিয়া তাঁর পিঠে দাঁত ঘষিতেছে। তখন তিনি আরও জোরে জোরে ঘোড়ার গায়ে চাবুক মারেন, আর দড়ি সমেত খুঁটা আসিয়া আরও জোরে জোরে তাঁর পিঠে লাগে।
হাসিতে হাসিতে তাঁতি আর তাঁতির বউ বাড়ি আসিয়া ভাত খাইতে বসিল।
Related Question
View Allপাড়ার লোকেরা তাঁতির দরজায় এসে ডাকাডাকি আরম্ভ করল।
তাঁতি ও তাঁতির বউকে না দেখে পাড়ার লোকেরা অস্থির হয়ে উঠল।
'জিদ' গল্পে পাড়ার লোকেরা তাঁতিকে না দেখে বলাবলি করে, 'আরে 'ভাই! আজ তাঁতি আর তাঁতির বউকে দেখিতেছি না কেন? তাদের বাড়িতে তাঁতের খটর-খটরও শুনি না, চরকার ঘড়র-ঘড়রও শুনি না। কোনো অসুখ-বিসুখ করিল নাকি? আহা! তাঁতি বড়ো ভালো মানুষটি। বেচারা গরিব হইলে কী হয়, কারো কোনো ক্ষতি করে নাই কোনোদিন।'
উদ্দীপকটি 'জিদ' গল্পের তাঁতির অভাব-অনটনের দিকটিকে নির্দেশ করে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়। মানুষ অসহায় হয়ে পড়ে। এ সময় মানুষের জীবনে নানা সমস্যা-সংকট নেমে আসে।
উদ্দীপকে দুর্যোগে আটকে পড়া এক চাষির জীবনের করুণ অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। অনেক দিন ধরে চলা দুর্যোগের কারণে চাষি দারুণ অভাবে পড়ে। উপোস করে সে বেশি দিন চলতে পারে না। ফলে একে একে সে তার ভেড়া, ছাগল, ষাঁড় সব জবাই করে খেতে বাধ্য হলো। উদ্দীপকের চাষির এই অভাবের দিকটি 'জিদ' গল্পে তাঁতির অভাবের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। বিদেশি বণিকরা শহরে কাপড়ের কল বসালে তাঁতির জীবনে অভাব নেমে আসে। কলের তৈরি কাপড় সন্তা-টেকসই, যেখানে সেখানে পাওয়া যায়। তাই তাঁতির কাপড় কেউ কিনতে চায় না। তাঁতি নকশি-শাড়ি বিক্রি করতে না পেরে হাট থেকে ফিরিয়ে আনে। তার সংসারে ভীষণ অভাব নেমে আসে।
"মিল থাকলেও উদ্দীপকের মূলভাব এবং 'জিদ' গল্পের মূলভাব এক নয়।”- মন্তব্যটি যথার্থ।
প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা কারণে সংসারে অভাবে দেখা দেয়। অভাবের সংসারে মানুষ ইচ্ছা থাকলেও উপায় করতে পারে না। এমনকি প্রয়োজনীয় খাদ্যও জোগাড় করতে পারে না।
উদ্দীপকে এক চাষির জীবনে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। এখানে চাষি বাড়িতে আটকে পড়ে অভাবের শিকার হয়! উপোস করে চলতে না পেরে সে তার ভেড়া, ছাগল, ষাঁড় জবাই করে ক্ষুধা নিবারণ করেছে। এ দিকটি 'জিদ' গল্পের তাঁতির অভাবের দিকটিকে নির্দেশ করেছে। এ বিষয়টি ছাড়া এই গল্পের অন্যান্য বিষয় উদ্দীপকে নেই। 'জিদ' গল্পে বিদেশি বণিকদের শহরে কাপড়ের কল স্থাপন করার ফলে তাঁতির অভাবে পড়া এবং তা থেকে উত্তরণে তাঁতির চেষ্টার দিকটি উদ্দীপকে নেই।
'জিদ' গল্পে তাঁতি তার বউয়ের আবদার রক্ষা করতে গিয়ে বাজার থেকে তিনটি মাছ কিনে আনলে তাঁতিবউ তা শখ করে রান্না করে। দুটি মাছ কে খাবে তা নিয়ে সিদ্ধান্ত হয় তারা চুপ করে থাকবে, যে আগে কথা বলবে সে-ই একটি খাবে, অন্যজন দুটি খাবে। এটি নিয়ে তারা দুজনে জিদ করে কথা বলা বন্ধ রাখে। এতে না খেয়ে তাদের মরে যাওয়ার জোগাড় হয়। এ বিষয়টি উদ্দীপকে নেই। অনাবশ্যক জেদ যে মানুষের জীবনকে জটিল করে তোলে এবং অন্যকে সমস্যায় ফেলে এ বিষয়টি 'জিদ' গল্পে থাকলেও উদ্দীপকে নেই। এ দিক থেকে প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
ঘোড়ার গায়ে জোরে জোরে চাবুক মারেন মোল্লা সাহেব।
'তুই দুইটা খা, আমি একটা খাব'- তাঁতি এ কথা তার বউকে বলেছিল।
'জিদ' গল্পে দুটি মাছ খাওয়ার জন্য তাঁতি ও তাঁতির বউ জিদ করে কথা বলা বন্ধ করে এবং সব কাজকর্ম ছেড়ে ঘরে পড়ে থাকে। পাড়ার লোকেরা ঘরের দরজা ভেঙে তাদেরকে মড়ার মতো পড়ে থাকতে দেখে। তাঁতি এবং তাঁতিবউ মারা গেছে ভেবে পাড়ার লোকেরা তাদের গোসল করিয়ে কবরে শোয়ায়। তখনও তারা জিদ করে কথা বলে না। এক পর্যায়ে লোকেরা তাদের বুকের ওপর বাঁশ চাপিয়ে দিয়ে তার ওপর কোদাল দিয়ে মাটি ফেলতে শুরু করে। তখন তাঁতি বাঁশ-খুঁটিসহ লাফিয়ে ওঠে এবং তার বউকে প্রশ্নোক্ত কথাটি বলে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!