জলবায়ুর নিয়ামক (Factors of Climate)

নবম-দশম শ্রেণি (মাধ্যমিক) - ভূগোল ও পরিবেশ - বায়ুমণ্ডল | NCTB BOOK
4.1k
Summary

পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের জলবায়ুর বৈচিত্র্যের কারণসমূহ নিচে উল্লেখ করা হলো:

  1. অক্ষাংশ (Latitude): সূর্যকিরণের তীব্রতা অঞ্চলভেদে পরিবর্তিত হয়। নিরক্ষরেখার নিকটে সূর্য কিরণ লম্বভাবে পড়ে, ফলে উত্তরে ও দক্ষিণে তাপমাত্রা কমতে থাকে।
  2. উচ্চতা (Altitude): উচ্চতার সঙ্গে সঙ্গে বায়ুমণ্ডলীয় তাপমাত্রা হ্রাস পায়। উচ্চতর এলাকায় জলবায়ু এবং তাপমাত্রার পার্থক্য দেখা যায়, যেমন দিনাজপুর ও শিলং।
  3. সমুদ্র থেকে দূরত্ব (Distance from the sea): সমুদ্র নিকটবর্তী এলাকার জলবায়ু মৃদুভাবাপন্ন হয়, যেখানে শীত ও গ্রীষ্মের মধ্যে পার্থক্য কম থাকে।
  4. বায়ুপ্রবাহ (Wind movement): বায়ুপ্রবাহ এলাকায় জলীয়বাষ্প বহন করে এবং বৃষ্টিপাত ঘটায়। বাংলাদেশে মৌসুমি বায়ু প্রচুর বৃষ্টিপাত করে।
  5. সমুদ্রস্রোত (Ocean currents): শীতল বা উষ্ণ সমুদ্রস্রোতের প্রভাব উপকূলের জলবায়ুকে প্রভাবিত করে, যেমন উত্তপ্ত উপসাগরীয় স্রোত।
  6. পর্বতের অবস্থান (Location of the mountains): উচ্চ পর্বতারুবন্ধন বায়ুপ্রবাহকে বাধা দেয়, ফলে বৃষ্টিপাত এবং জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে পারে।
  7. ভূমির ঢাল (Slope of the land): উচ্চ ঢাল বরাবর সূর্যকিরণ পড়লে সেখানের তাপমাত্রা বেশি হয়, অথচ বিপরীত দিকে কম।
  8. মৃত্তিকার গঠন (Composition of the soil): মৃত্তিকার বুনট তাপ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখে, যেমন মরুভূমির দ্রুত তাপমাত্রার পরিবর্তন।
  9. বনভূমির অবস্থান (Location of the forest): গাছপালা বায়ুকে জলীয়বাষ্পযুক্ত করে এবং জলবায়ুকে শীতল করে।

ক্রিয়া: বাংলাদেশের জলবায়ুর ক্ষেত্রে বিভিন্ন নিয়ামকসমূহের প্রভাব নিয়ে দলবদ্ধ আলোচনা করতে হবে, যেখানে প্রত্যেক দলের আলোচনার জন্য ১৫ মিনিট এবং উপস্থাপনার জন্য ১০ মিনিট সময় থাকবে।

পৃথিবীর সব অঞ্চলের জলবায়ু একই রকম নয়। এর কোনো অঞ্চল উষ্ণ এবং কোনো অঞ্চল শীতল। আবার কোনো স্থান বৃষ্টিবহুল এবং কোনো স্থান বৃষ্টিহীন। কিছু ভৌগোলিক বিষয়ের পার্থক্যের কারণে স্থানভেদে জলবায়ুর এরকম পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। এই বিষয়গুলোকে জলবায়ুর নিয়ামক বলে। বিভিন্ন নিয়ামকের বিবরণ ও জলবায়ুর উপাদানের উপর তাদের প্রভাব বর্ণনা করা হলো :
১। অক্ষাংশ (Latitude) : সূর্যকিরণের মাত্রা অক্ষাংশভেদে বিভিন্ন রকম হয়। নিরক্ষরেখার উপর সারাবছর সূর্য লম্বভাবে কিরণ দেয়। আর নিরক্ষরেখা থেকে যতই উত্তর বা দক্ষিণে যাওয়া যায়, সূর্যকিরণ তির্যকভাবে পড়তে থাকে। এর ফলে নিরক্ষরেখা থেকে উত্তর ও দক্ষিণ উভয় মেরুর দিকে তাপমাত্রা ক্রমশ কমতে থাকে।


২। উচ্চতা (Altitude) : সমুদ্র সমতল থেকে যতই উপরে ওঠা যায়, উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বায়ুমণ্ডলীয় তাপমাত্রা ততই হ্রাস পায়। সাধারণত প্রতি ১,০০০ মিটার উচ্চতায় প্রায় ৬° সেলসিয়াস তাপমাত্রা হ্রাস পায়। এ উচ্চতার পার্থক্যের কারণে দুই জায়গা একই অক্ষাংশে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও একটি অপরটির চেয়ে ভিন্ন জলবায়ু সম্পন্ন হয়। যেমন— দিনাজপুর ও শিলং একই অক্ষাংশে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও শুধু উচ্চতার তারতম্যের জন্য এদের জলবায়ু ভিন্ন রকম। উচ্চতা বেশি হওয়াতে শিলং-এ দিনাজপুরের চেয়ে তাপমাত্রা কম হয় ।


৩। সমুদ্র থেকে দূরত্ব (Distance from the sea) : জলভাগের অবস্থান কোনো এলাকার জলবায়ুকে মৃদুভাবাপন্ন করে। যেমন— কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও পটুয়াখালী সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত হওয়ার কারণে এখানকার জলবায়ু রাজশাহীর তুলনায় বেশ মৃদুভাবাপন্ন। সমুদ্র নিকটবর্তী এলাকার তাপমাত্রায় শীত-গ্রীষ্ম তেমন পার্থক্য হয় না। এ ধরনের জলবায়ুকে সমভাবাপন্ন জলবায়ু বলে। কিন্তু সমুদ্র উপকূল থেকে দূরের এলাকায় শীত-গ্রীষ্ম উভয়ই চরম হয়। কারণ স্থলভাগ জলভাগ অপেক্ষা যেমন দ্রুত উষ্ণ হয়, আবার দ্রুত ঠান্ডাও হয়। এজন্য গ্রীষ্মকালে মহাদেশের অভ্যন্তরভাগের এলাকা অত্যন্ত উত্তপ্ত থাকে, আবার শীতকালে প্রচণ্ড শীত অনুভূত হয়। এ ধরনের জলবায়ুকে মহাদেশীয় বা চরমভাবাপন্ন জলবায়ু বলে।


৪। বায়ুপ্রবাহ (Wind movement) : বায়ুপ্রবাহ কোনো এলাকার জলবায়ুর উপরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ু কোনো এলাকার উপর দিয়ে প্রবাহিত হলে সে এলাকায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। যেমন— বাংলাদেশে বর্ষাকালে প্রচুর জলীয়বাষ্পপূর্ণ মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হওয়ায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। আবার শীতকালে বাংলাদেশের উপর দিয়ে শুষ্ক মহাদেশীয় বায়ু প্রবাহিত হওয়ার কারণে বৃষ্টিপাত হয় না বললেই চলে।

৫। সমুদ্রস্রোত (Ocean currents) : শীতল বা উষ্ণ সমুদ্রস্রোতের প্রভাবে উপকূল সংলগ্ন এলাকার বায়ু ঠান্ডা বা উষ্ণ হয়। যেমন— উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের প্রভাবে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলবর্তী এলাকার উষ্ণতা বৃদ্ধি পায়। আবার শীতল ল্যাব্রাডর স্রোত উত্তর আমেরিকার পূর্ব উপকূলকে শীতল রাখে ।


৬। পর্বতের অবস্থান ( Location of the mountains): উচ্চ পার্বত্যময় এলাকা বায়ুপ্রবাহের পথে বাধা হলে এর প্রভাব জলবায়ুর উপর পরিলক্ষিত হয়। যেমন— মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের উত্তরে আড়াআড়িভাবে অবস্থিত হিমালয় পর্বতে বাধা পাওয়ায় বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। অপরদিকে শীতকালে মধ্য এশিয়ার শীতল বায়ু হিমালয় অতিক্রম করতে পারে না। তাই ভারতীয় উপমহাদেশের জলবায়ু ইউরোপের মতো তত শীতল হয় না ।


৭। ভূমির ঢাল (Slope of the land) : সূর্যকিরণ উঁচুভূমির ঢাল বরাবর লম্বভাবে পতিত হলে সেখানকার বায়ু এবং ভূমি বেশি উত্তপ্ত হয়। কিন্তু ঢালের বিপরীত দিকে সূর্যকিরণ কিছুটা তির্যকভাবে পড়ে বা কখনো সূর্যালোক খুব কম পায় ফলে বায়ু শীতল হয়।


৮। মৃত্তিকার গঠন (Composition of the soil) : মৃত্তিকার গঠন বা বুনট সূর্যতাপ সংরক্ষণে বিশেষ ভূমিকা রাখে। প্রস্তর বা বালুকাময় মৃত্তিকার তাপ সংরক্ষণ ক্ষমতা কম। এজন্য তা দ্রুত উত্তপ্ত এবং দ্রুত শীতল হয়। যেমন— মরুভূমিতে দিনে প্রচণ্ড গরম এবং রাতে প্রচন্ড ঠান্ডা।


৯। বনভূমির অবস্থান ( Location of the forest) : গাছপালা থেকে প্রস্বেদন (Transpiration) ও বাষ্পীভবনের (Evaporation) সাহায্যে বায়ু জলীয়বাষ্পপূর্ণ এবং ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়। তাছাড়া বনভূমি ঝড়-তুফান ও সাইক্লোনের গতিপথে বাধা দিয়ে এর শক্তি কমিয়ে দেয়। বনভূমিতে সূর্যালোক মাটিতে পৌঁছতে পারে না, ফলে সেখানকার বায়ু তুলনামূলকভাবে শীতল হয়।
 কাজ : বাংলাদেশের জলবায়ুর ক্ষেত্রে কোন কোন নিয়ামকসমূহ কীভাবে প্রভাব রাখছে? তা দলে মাথা | খাটিয়ে (Brain storming) ব্যাখ্যা কর। প্রত্যেক দল ১৫ মিনিট কাজ করবে এবং দলে কাজ সম্পাদন শেষে সমগ্র দল শ্রেণিকক্ষে উপস্থাপনের জন্য ১০ মিনিট সময় পাবে।

Promotion
NEW SATT AI এখন আপনাকে সাহায্য করতে পারে।

Are you sure to start over?

Loading...