পাঠ-৩.৫: আইনের শাসন

পৌরনীতি ও সুশাসন ১ম পত্র - পৌরনীতি ও সুশাসন - এইচএসসি | NCTB BOOK

10

(Rule of Law)

নাগরিক জীবনে আইনের শাসন

আইনের শাসনের মূল কথা হল আইনের দৃষ্টিতে সকলে সমান। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি থেকে সাধারণ নাগরিক পর্যন্ত সকলের জন্য আইন একইভাবে প্রযোজ্য হবে। একটি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা টিকে থাকার জন্য আইনের শাসন অপরিহার্য। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আইনের শাসন একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্র সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। আইনের শাসনের একটি অর্থ হচ্ছে নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজ থেকে অন্যায়, বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য দূর হয়। ফলে সমাজে স্থিতিশীলতা আসে। আইনের শাসন না থাকলে সবল-দুর্বল, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান প্রকট হতে থাকে। আইনের শাসনের অভাবে রাজনৈতিক কারণে বিচার ব্যবস্থাও প্রভাবিত হয়।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার উপায়সমূহ নিম্নরূপ:

আইন মান্য করা: রাষ্ট্রের বিদ্যমান আইন মেনে চলা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য। পৃথিবীর প্রত্যেক সভ্য জাতিই আইন মেনে চলে। আইন মেনে চলা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন উন্নত জাতিরই বহিঃপ্রকাশ।

যথাযথভাবে আইনের প্রয়োগ: আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অপরাধীর সার্বিক অপরাধ বিবেচনায় নিয়ে যে আইনটি তার জন্য প্রযোজ্য তাই প্রয়োগ করা উচিত। আইন প্রয়োগে আবেগের কোন স্থান দেয়া উচিত নয়।

যুক্তিসংগত ও যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন: সেকেলে আইন সংস্কার করা এবং বাস্তবসম্মত ও সুদূরপ্রসারী আইন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উনবিংশ শতাব্দীর সকল আইন একবিংশ শতাব্দীতে প্রযোজ্য নাও হতে পারে। তাই নিয়মিতভাবে আইনের সংস্কার জরুরি।

বিদ্যমান আইন সম্পর্কে নাগরিকদের সচেতন করা: সচেতন নাগরিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রথম শর্ত। আইন সম্পর্কে নাগরিকগণ যদি সচেতন হয় তাহলে অপরাধ প্রবণতা কমে আসে এবং রাষ্ট্রে শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সহজ হয়। তাই রাষ্ট্রে বিদ্যমান আইন এবং নতুন প্রণিতব্য আইন সম্পর্কে নাগরিকদেরকে সচেতন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

যথাসময়ে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা: ইংরেজিতে বলা হয় Justice delayed, justice denied. অর্থাৎ, বিচার বিলম্বিত হওয়া মানে বিচার না হওয়া। যখন যে অপরাধ সংঘটিত তখনই তার বিচার করাই উত্তম। কখনো-কখনো দেখা যায় যে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সুবাদে অপরাধকারী ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো থেকে রেহাই পেয়ে যায়। তাই আইনের শাসন নিশ্চিত করার জন্য যথাসময়ে বিচারকার্য সম্পাদন করা একান্ত প্রয়োজন।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নাগরিক কর্তব্য

আইন রাষ্ট্র কর্তৃক প্রণীত ও বাস্তবায়িত হলেও, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। তাই নাগরিকগণ যদি বিদ্যমান আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে নিজের বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে কাজ করে তবেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। যেমন, রাস্তায় কোন চুরি-ছিনতাই হতে দেখলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যদি তার কাছে কোন তথ্য জানতে চায় তবে তা জানিয়ে দেয়াটা নাগরিক কর্তব্য। প্রত্যেক নাগরিকের মাঝে এ বোধ আসতে হবে যে, আইনের শাসনের মাধ্যমেই তারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে।

আইন মান্য করার কারণ

আইনের শাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত হল আইন মান্য করা। আইনের যথাযথ প্রয়োগ যেমন জরুরি তেমনি আইন মান্য করাটাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক আইনেই কিছু নির্দেশনা এবং তা অমান্য করলে শাস্তির ব্যবস্থা থাকে। তারপরও দেখা যায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে আইন ভঙ্গ হয়। উন্নত দেশগুলোতে অধিকাংশ জনগণই আইন মেনে চলে এবং আইনকে শ্রদ্ধা করে। আইন মান্য করার অনেকগুলো কারণ আছে। তার মধ্যে একটি হল আইনের উপযোগিতা। জনগণ এটি বুঝতে পারে যে, আইন অধিকার রক্ষা করে, দুর্বলকে সবলের অত্যাচার থেকে রক্ষা করে এবং সমাজে শৃঙ্খলা রক্ষা করে। লর্ড ব্রাইস আইন মান্য করার কারণগুলোকে পাঁচ ভাগে ভাগ করেনঃ (ক) যৌক্তিকতার উপলব্ধি (খ) অপরের প্রতি শ্রদ্ধা (গ) নির্লিপ্ততা (ঘ) সহানুভূতি (ঙ) শাস্তির ভয়

সার-সংক্ষেপ
রাষ্ট্র সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। আইনের শাসনের অর্থ হচ্ছে আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিকের সমতা অর্থাৎ সকল নাগরিকের জন্য সমানভাবে আইন প্রয়োগ। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নাগরিক ও রাষ্ট্র উভয়েরই দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। নাগরিক আইনের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করবে। রাষ্ট্র যথাযথ আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করবে, সময়মতো বিচার করবে এবং সময়ে-সময়ে আইন সংস্কার করবে।

মূল্যবোধ, আইন, স্বাধীনতা ও সাম্য-প্রথম পত্র-উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখকে বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...