# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বর্তমান বাংলাদেশ সরকার শাসনকার্য পরিচালনায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহারের পক্ষে। কারণ এতে সরকারের নিশ্চিত হয়। শাসনকার্যে জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়।
সুমন ২০১৬ সালে একাদশ শ্রেণিতে মানবিক বিভাগে ভর্তি হয়। সে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন বিষয়ে জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী এবং রাষ্ট্র ও সমাজে গণতান্ত্রিক আদর্শ প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে ইচ্ছুক।
(Concept of Civics and Good Governance)

পৌরনীতির ধারণা
পৌরনীতি হল সামাজিক ও নাগরিকতা বিষয়ক বিজ্ঞান। পৌরনীতির ইংরেজি প্রতিশব্দ Civics (সিভিকস্)। Civics শব্দটি ল্যাটিন শব্দ Civis এবং Civitas শব্দ থেকে এসেছে। Civis এবং Civitas শব্দের অর্থ যথাক্রমে নাগরিক (Citizen) ও নগররাষ্ট্র (City State)। সুতরাং শব্দগত বা উৎপত্তিগত অর্থে Civics বা পৌরনীতি হল নগর রাষ্ট্রে বসবাসরত নাগরিকদের আচার-আচরণ, রীতিনীতি ও কার্যাবলি সংক্রান্ত বিজ্ঞান। তবে প্রাচীনকালে ভারতবর্ষে এবং গ্রীসে Civics বা পৌরনীতি বলতে নাগরিকদের অধিকার ও কর্তব্যকে বোঝানো হতো।
সংস্কৃত ভাষায় নগরকে (City) 'পুর' বা 'পুরী' এবং নগরে বসবাসকারীদেরকে 'পুরবাসী' বলা হয়। যার জন্য নাগরিক জীবনের অপর নাম 'পৌর জীবন' একং নাগরিক জীবনের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কিত বিদ্যার নাম পৌরনীতি।
প্রাচীন গ্রিসে এক একটি নগর ছিল এক একটি রাষ্ট্র। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল এথেন্স এবং স্পার্টা। এ নগর রাষ্ট্রগুলোর আয়তন ও জনসংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম। নগর রাষ্ট্রের সকল জনগণকে নাগরিক বলা হতো না। কেবল নগর রাষ্ট্রের যারা রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করতো অর্থাৎ রাষ্ট্রের শাসনকার্য পরিচালনায় যারা অংশগ্রহণ করতো তাদেরকেই 'নাগরিক' হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো। উল্লেখ্য নারী, দাস ও বিদেশীরা এসব নগর রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে বিবেচ্য হতো না। এসব নগর রাষ্ট্রে বসবাসকারী নাগরিকদের অধিকার ও কর্তব্য, আচার-আচরণ, রীতিনীতি নিয়ে আলোচনা করা হতো পৌরনীতিতে। সুতরাং শব্দগত এবং মূলগত অর্থে পৌরনীতির ধারণা ছিল অনেকটা সীমিত ও সংকীর্ণ।
বর্তমানে পৌরনীতিকে কেবল শব্দগত অর্থে আলোচনা করা হয় না। কেননা, বর্তমান আধুনিক রাষ্ট্রগুলো গ্রিসের নগররাষ্ট্র (City State) এর মতো নয়, বরং এগুলো এখন জাতি রাষ্ট্র (Nation State) হিসেবেই পরিগণিত। প্রাচীন গ্রিসের নগররাষ্ট্রগুলোর অপেক্ষা বর্তমান আধুনিক জাতি রাষ্ট্রগুলো আয়তনে বড় এবং জনসংখ্যাও বেশি। এসব জাতি রাষ্ট্রের নাগরিকদের জীবন এবং কার্যাবলি জটিল ও বহুমুখী। আধুনিক জাতি রাষ্ট্রে নাগরিকদের ভূমিকা ও কার্যাবলি, আচার-আচরণ এবং তাদের বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ধারাবাহিক পর্যালোচনার মাধ্যমে যে শাস্ত্র আদর্শ নাগরিক জীবনের জ্ঞান দান করে তাকেই পৌরনীতি বলে।
ই এম হোয়াইট (E.M. White) মনে করেন, "পৌরনীতি হল জ্ঞানের সেই শাখা যা এক জন নাগরিকের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এবং স্থানীয়, জাতীয় ও মানবসত্তার সাথে জড়িত সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করে।" (Civics is that branch of human knowledge which deals with everything relating to a citizen- past, present and future; local, national and human.)
ফ্রেডরিখ জেমস গোল্ড (Frederick James Gould) বলেন, "পৌরনীতি হচ্ছে প্রতিষ্ঠান, আচরণ ও চেতনার অধ্যয়ন শাস্ত্র যার মাধ্যমে একজন পুরুষ বা নারী কোন একটি রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের সদস্য হিসাবে কর্তব্য পালন করতে পারে এবং এর সুযোগ-সুবিধাগুলো গ্রহন করতে পারে।" (Civics is the study of institutions, habits and spirit by means of which a man or women may fulfill the duties and receive the benifit of membership in a political community.)
Webster's International Dictionary তে বলা হয়েছে, "পৌরনীতি হল রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সেই শাখা, যা নাগরিকদের
অধিকার ও কর্তব্য নিয়ে আলোচনা করে"। (Civics is that department of Political Science dealing with rights of citizenship and duties of citizen.)
পৌরনীতির উপরোক্ত সংজ্ঞা ও ধারণা থেকে যেসব অর্থ ও প্রকৃতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তা নিম্নে ছকের মাধ্যমে প্রকাশ করা হল-

সুতরাং পৌরনীতি হল সে শাস্ত্র যা নাগরিক, নাগরিকের কার্যক্রম, অধিকার ও কর্তব্য, নাগরিকের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত দিক এবং নাগরিকের সংগঠনসমূহ, রাষ্ট্র ও বিশ্বমানবতা সংক্রান্ত সকল বিষয়ের সমস্যা ও সমাধান সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করে।
সুশাসনের ধারণা
সুশাসন প্রত্যয়টি পৌরনীতির সাম্প্রতিক সংযোজন। সুশাসনের ইংরেজি প্রতিশব্দ হল 'Good Governance' । সুশাসনকে স্পষ্টভাবে বুঝতে হলে শাসন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। Governance হল একটি বহুমাত্রিক ধারণা যা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ, ক্ষেত্র এবং প্রেক্ষাপট থেকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। Government এর মতই Governance শব্দটি এসেছে 'kubernao' নামক ল্যাটিন শব্দ থেকে, যার অর্থ পরিচালনা করা। সাধারণত Governance বা শাসন এমন একটি পদ্ধতিকে বোঝায়, যেখানে একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোনো সংস্থা, সমাজ বা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নীতি নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।
বর্তমান বিশ্বে একটি জনপ্রিয় ধারণা হল সুশাসন। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে সুশাসন। ১৯৮৯ সালে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন সর্বপ্রথম সুশাসন প্রত্যয়টি ব্যবহার করা হয়। ২০০০ সালে বিশ্বব্যাংক সুশাসনের চারটি স্তম্ভ ঘোষণা করে। এ চারটি স্তম্ভ হল- (i) দায়িত্বশীলতা (ii) স্বচ্ছতা (iii) আইনী কাঠামো ও (iv) অংশগ্রহণ।
ম্যাক করণী (Mac Corney) এ প্রসঙ্গে বলেন, "সুশাসন বলতে রাষ্ট্রের সাথে সুশীল সমাজের, সরকারের সাথে জনগণের এবং শাসকের সাথে শাসিতের সম্পর্ককে বুঝায়"।
মারটিন মিনোগ (Martin Minogue) সুশাসন সম্পর্কে বলেন, "ব্যাপক অর্থে সুশাসন হচ্ছে কতগুলো উদ্যোগের সমষ্টি এবং একটি সংস্কার কৌশল যা সরকারকে অধিকতর গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক করতে সুশীল সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করে তোলে।"
ল্যান্ডেল মিল (Landell Mill) মনে করেন, সুশাসন একটি জাতির রাজনেতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে দিক নির্দেশ করে এবং জন প্রশাসন এবং আইনী কাঠামোর মধ্যে এটি কিভাবে কাজ করে তা জানায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুশাসন সরকার পরিচালনা অপেক্ষা একটি বিস্তৃত ধারণা যা একটি নির্দিষ্ট ভূখন্ডে সামাজিক নিয়ম-শৃঙ্খলা রক্ষায় এবং নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহারের প্রশ্নে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকার সাথে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।"
পরিশেষে বলা যায় যে, সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দায়িত্বশীলতা এবং জনগণের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে জনগণের কল্যাণ শাসনকার্য পরিচালনাই হচ্ছে সুশাসন। সুশাসন সেই শাসনব্যবস্থা যেখানে জনগণের তথা রাষ্ট্রের সার্বিক কল্যাণ সাধিত হয়।

সার-সংক্ষেপ
পৌরনীতি হল নাগরিকতা বিষয়ক বিজ্ঞান। রাষ্ট্র ও নাগরিকতার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলি এখানে বিবৃত হয়। সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দায়িত্বশীলতা এবং জনগণের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে, জনগণের কল্যাণে শাসনকার্য পরিচালনাই হচ্ছে সুশাসন। গণতান্ত্রিক ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং সরকার ও জনগণের মধ্যে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করাই পৌরনীতি ও সুশাসনের প্রধান লক্ষ্য।
পৌরনীতি ও সুশাসন পরিচিতি প্রথম পত্র-উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখকে বই
(Scope of Civics and Good Governance)

পৌরনীতি ও সুশাসনের পরিধি
পৌরনীতি ও সুশাসনের পরিধি ব্যাপক। পৌরনীতি ও সুশাসনের পরিধি সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হল-
১। নাগরিকতা বিষয়ক: পৌরনীতি ও সুশাসন মূলত নাগরিকতা বিষয়ক বিজ্ঞান। নাগরিকের উত্তম ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন প্রতিষ্ঠা করা পৌরনীতি ও সুশাসনের প্রধান লক্ষ্য। পৌরনীতি ও সুশাসন নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য, সচেতনতা, সুনাগরিকতা, নাগরিকতা অর্জন ও বিলোপ, নাগরিকতার অর্থ ও প্রকৃতি, সুনাগরিকের গুণাবলি প্রভৃতি সম্পর্কে আলোচনা করে।
২। মৌলিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত: মানব সভ্যতার ইতিহাসে পরিবার হল আদি ও অকৃত্রিম প্রতিষ্ঠান। কালের বিবর্তন ধারায় পরিবারের সম্প্রসারণ হয়েছে এবং গড়ে উঠেছে রাষ্ট্র ও অন্যান্য বহুবিধ সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। পৌরনীতি ও সুশাসন পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ, রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের উৎপত্তি ও বিকাশ, রাষ্ট্রের কার্যাবলি প্রভৃতি মৌলিক প্রতিষ্ঠান পৌরনীতি ও সুশাসনের অন্তর্ভূক্ত।
৩। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আলোচনা: পৌরনীতি ও সুশাসনের সাথে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের ধারণা, রাষ্ট্রের উৎপত্তি, রাষ্ট্রের কার্যাবলি, রাষ্ট্র সম্পর্কে বিভিন্ন মতবাদ, রাষ্ট্রের উপাদান, সংবিধান, সংবিধানের শ্রেণিবিভাগ, সংবিধানের বৈশিষ্ট্য, সরকার, সরকারের শ্রেণিবিভাগ, সরকারের বিভিন্ন অঙ্গ, জনমত, জনমতের বাহন, নির্বাচকমন্ডলী, রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন প্রভৃতি পৌরনীতি ও সুশাসনের আলোচনার অন্তর্ভূক্ত।
৪। সামাজিক ও রাজনৈতিক বিমূর্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা: পৌরনীতি ও সুশাসন সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন বিমূর্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। আইন, আইনের উৎস ও প্রকৃতি, আইন ও নৈতিকতা, স্বাধীনতা, স্বাধীনতার প্রকৃতি, স্বাধীনতার রক্ষাকবচ, সাম্য ও স্বাধীনতা, সাম্যের প্রকারভেদ প্রভৃতি সম্পর্কে পৌরনীতি ও সুশাসন আলোচনা করে।
৫। রাজনৈতিক ঘটনাবলি: পৌরনীতি ও সুশাসন রাজনৈতিক বিভিন্ন ঘটনাবলি নিয়ে আলোচনা করে। যেমন- বাংলাদেশে পৌরনীতি ও সুশাসন পলাশীর যুদ্ধ, সিপাহী বিদ্রোহ, ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক অভ্যূত্থান ইত্যাদি রাজনৈতিক পর্যায় সম্পর্কে আলোচনা করে।
৬। সুশাসন সম্পর্কে আলোচনা: পৌরনীতি ও সুশাসন রাষ্ট্রের সুশাসনের বহুমাত্রিক ধারণা সম্পর্কে আলোচনা করে। সুশাসনের উপাদান, সুশাসনের সমস্যা, সুশাসনের সমস্যার সমাধান, সুশাসনের সমস্যা সমাধানে সরকার ও জনগণের ভূমিকা সম্পর্কে পৌরনীতি ও সুশাসন আলোচনা করে।
৭। নাগরিকের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা: পৌরনীতি ও সুশাসন নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্যের বর্তমান স্বরূপ সম্পর্কে আলোচনা করে এবং এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ নাগরিক জীবনের আদর্শ ও স্বরূপের ইঙ্গিত প্রদান করে।
৮। নাগরিকের স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিক নিয়ে আলোচনা: পৌরনীতি ও সুশাসন নাগরিকের সামাজিক ও রাজনৈতিক কার্যাবলির সাথে সম্পৃক্ত স্থানীয় সংস্থার (যেমন, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, সিটি কর্পোরেশন ইত্যাদি) গঠন, ক্ষমতা ও কার্যাবলি নিয়ে আলোচনা করে। নাগরিকের জাতীয় বিষয় (যেমন, স্বাধীনতা আন্দোলনের পটভূমি, মুক্তিযুদ্ধ, বিভিন্ন জাতীয় নেতার অবদান, দেশ রক্ষায় নাগরিকের ভূমিকা, জাতীয় রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ) সম্পর্কে আলোচনা করে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন এবং বিভিন্ন ঘটনাবলি সম্পর্কেও পৌরনীতি ও সুশাসন আলোচনা করে।
৯। নাগরিক জীবনের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়াদি: পৌরনীতি ও সুশাসন আধুনিক নাগরিক জীবনের সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন বিষয়াবলি নিয়ে আলোচনা করে। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানও পাওয়া যায় এর মাধ্যমে। যেমন- ইভটিজিং, দুর্নীতি, ইলেকট্রনিক গভর্নেন্স (ই-গভর্নেন্স), দারিদ্র বিমোচনের মত বিষয়গুলির আলোচনা পৌরনীতি ও সুশাসনের পরিধিকে সমৃদ্ধ করেছে।
১০। সুশাসন ও ই-গভর্নেন্স: পৌরনীতি ও সুশাসন বর্তমান সময়ে সুশাসন ও ই-গভর্নেন্স নিয়ে আলোচনা করে। সরকার কিভাবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষ নির্বাচন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তুলতে পারে সে বিষয়ে পৌরনীতি ও সুশাসন আলোচনা করে। পরিশেষে বলা যায় যে, পৌরনীতি ও সুশাসনের পরিধি ও বিষয়বস্তু ব্যাপক ও বিস্তৃত। নাগরিকের জীবন ও কার্যাবলি যতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত পৌরনীতি ও সুশাসনের পরিধিও ততদূর পর্যন্ত বিস্তৃত।

সার-সংক্ষেপ
পৌরনীতি ও সুশাসনের পরিধি ব্যাপক ও বিস্তৃত। নাগরিক জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র ও সরকারের কার্যাবলি যতদূর বিস্তৃত পৌরনীতি ও সুশাসনের পরিধিও ততদূর বিস্তৃত। নাগরিক জীবন, নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য, সংবিধান, ঐতিহাসিক ঘটনা, রাজনৈতিক ঘটনাবলি, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন, সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, নিরপেক্ষ নির্বাচন, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মত বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা পৌরনীতি ও সুশাসনের পরিধিকে আরো বেশি বিস্তৃত করেছে।
পৌরনীতি ও সুশাসন পরিচিতি প্রথম পত্র-উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখকে বই
(Importance of Studying of Civics and Good Governance)

পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠের গুরুত্ব
আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের সার্বিক কল্যাণের নিমিত্তে পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠের বিকল্প নেই। কেননা পৌরনীতি ও সুশাসন নাগরিকতার সাথে জড়িত সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। সুশাসন পাঠের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হল-
১। রাষ্ট্র ও সরকার সম্বন্ধে জানা: রাষ্ট্র ও সরকার ব্যতীত নাগরিক জীবন কল্পনা করা যায় না। আর নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্র ও সরকার সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান থাকা আবশ্যক। রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের উপাদান, সরকার, সরকারের শ্রেণি বিভাগ, রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত মতবাদ, সংবিধান ইত্যাদি সম্পর্কে জানার জন্য পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠের কোন বিকল্প নেই।
২। সুনাগরিক হওয়ার শিক্ষা: রাষ্ট্রের একজন সাধারণ নাগরিক থেকে কিভাবে সুনাগরিক হওয়া যায় সে সম্বন্ধে জ্ঞানলাভকরা যায় পৌরনীতি ও সুশাসন থেকে। একজন সুনাগরিক বুদ্ধিমত্তা, বিবেক ও আত্মসংযমের অধিকারী হওয়ায় রাষ্ট্রের প্রতি তার অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন থাকে। সুনাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করার জন্যও পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
৩। স্বদেশ প্রেম জাগ্রত করার জন্য: দেশের প্রত্যেক নাগরিকের মধ্যে স্বদেশ প্রেম জাগ্রত করার জন্য পৌরনীতি ও সুশাসন সম্পর্কে জ্ঞান থাকা আবশ্যক। একটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন নির্ভর করে প্রকৃত দেশ প্রেমিক জনগণের উপর। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক পল জাঁনে (Paul Janet) বলেন, "স্বদেশ প্রেম জাগ্রত করার জন্য পৌরনীতির জ্ঞান খুবই জরুরি।"
৪। সুস্থ ও সুন্দর সমাজ জীবন গঠনের শিক্ষা: পৌরনীতি ও সুশাসন নাগরিকের সুস্থ ও সুন্দর সমাজ জীবন গঠনে শিক্ষা দিয়ে থাকে। মানুষের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনকে কেন্দ্র করে পৌরনীতি ও সুশাসন গড়ে উঠেছে। পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতার মাধ্যমে কিভাবে সুস্থ ও সুন্দর সমাজ জীবন গঠন করে মানুষের সর্বাধিক কল্যাণ করা যায় তা পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠের মাধ্যমে জানা যায়।
৫। ব্যক্তিত্ব বিকাশের ক্ষেত্রে: নাগরিকের ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত ও প্রদত্ত অধিকারসমূহ পাঠ ও চর্চার মাধ্যমে নাগরিক তার ব্যক্তিত্বের বিকাশ করে থাকে। রাষ্ট্র থেকে নাগরিক যেমন বিভিন্ন অধিকার গ্রহণ করে তেমনি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের কিছু কর্তব্য বা দায়বদ্ধতা রয়েছে যা একজন নাগরিক পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠের মাধ্যমে জানতে পারে।
৬। দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন: পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠ মানব মনের সংকীর্ণতা দূর করে মহৎ জীবন গঠনের অনুপ্রেরণা দেয়। বিশ্ব ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবতাবোধ সৃষ্টিতে পৌরনীতি ও সুশাসন অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। দেশ ও বিশ্বের কল্যাণার্থে এ শাস্ত্র নাগরিকের মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির উন্নতি ঘটায়।
৭। জাতীয় চেতনার উন্মেষ: পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠের মাধ্যমে নাগরিকের মনে জাতীয় চেতনার উন্মেষ হয়। সচেতন নাগরিক রাষ্ট্রের অমূল্য সম্পদ। জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সচেতন নাগরিকেরা দেশ সেবায় আত্মনিয়োগ করে। এর ফলে রাষ্ট্রের সামগ্রিক সমৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়।
৮। সুশাসন সম্পর্কে জ্ঞান লাভ: সুশাসন প্রত্যয়টি সাম্প্রতিক সময়ে পৌরনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে। যার ফলে পৌরনীতি আরো বেশি সমৃদ্ধ হয়েছে। কোন রাষ্ট্র সুশাসনের মাধ্যমে পরিচালিত হলে অতি শীঘ্র ইপ্সিত লক্ষ্যে আরোহন করতে পারে। পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠের মাধ্যমে সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মত বিষয়গুলো সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করা সহজতর হয়।
৯। গণতন্ত্রের বিকাশ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ: বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় শাসনব্যবস্থা হল গণতন্ত্র। গণতন্ত্রের স্বরূপ, ভবিষ্যৎ, কার্যকারিতা এবং বিকাশ সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করার জন্য পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠের বিকল্প নেই।
১০। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য: রাষ্ট্র যেমন নাগরিকের কল্যাণ সাধন করে থাকে তেমনি নাগরিক রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে থাকে। একজন সুনাগরিক রাষ্ট্রের অগ্রগতির জন্য নানাবিধ পরিকল্পনা করে। সে পরিকল্পনার উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র ও বিশ্বের শান্তি ও উন্নয়নের জন্য পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠ অত্যাবশ্যক।
পরিশেষে বলা যায় যে, পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। সুস্থ ও সুন্দর জীবন গঠনে তথা কল্যাণকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তাই প্রত্যেক নাগরিকের নিজের স্বার্থে পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠ করা প্রয়োজন।
সার-সংক্ষেপ
নাগরিক জীবন ও রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সুশৃঙ্খল জ্ঞান লাভ করতে পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠের বিকল্প নেই। পৌরনীতি ও সুশাসন নাগরিক জীবনের সঠিক দিক-নির্দেশনা প্রদান করে বিধায় সভ্য সমাজের প্রত্যেক সদস্যের এ শাস্ত্র পাঠ অপরিহার্য। এর মাধ্যমে নাগরিকের চিন্তাধারায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসে রাষ্ট্র সম্পর্কিত সঠিক ধারণা জাগ্রত হয়।
পৌরনীতি ও সুশাসন পরিচিতি প্রথম পত্র-উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখকে বই
(Importance of Studying Civics and Good Governance in Bangladesh)

বাংলাদেশে পৌরনীতি ও সুশাসন অধ্যয়নের গুরুত্ব
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য পৌরনীতি ও সুশাসন অধ্যয়নের গুরুত্ব অপরিসীম। নিম্নে বাংলাদেশে পৌরনীতি ও সুশাসন অধ্যয়নের গুরুত্ব তুলে ধরা হল-
১। দেশকে ভালোবাসার শিক্ষা: পৌরনীতি ও সুশাসন দেশকে ভালোবাসার শিক্ষা দেয়। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এ কষ্টার্জিত স্বাধীনতাকে রক্ষা করা সকল নাগরিকের কর্তব্য। দেশ, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধকে ভালোবাসতে শেখায় পৌরনীতি ও সুশাসন।
২। জাতীয় ইতিহাস জানা: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। এ ইতিহাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম প্রত্যেকের জানা দরকার। জাতীয় সংগ্রামের ইতিহাস, যেমন- ভাষা আন্দোলন, গণ অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধকে ভুলে গেলে দেশ কখনো উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারবে না।
৩। নাগরিক চেতনা বৃদ্ধি: পৌরনীতি ও সুশাসন নাগরিক চেতনা বৃদ্ধি করে। বাংলাদেশে জনসংখ্যা অত্যন্ত বেশি কিন্তু এর আয়তন ছোট। এ রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বহু সমস্যা বিদ্যমান। পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠ নাগরিকের চেতনা বৃদ্ধি করে এ সব বহুমুখী সমস্যা সমাধানের পথ তৈরি করে দেয়।
৪। নাগরিক গুণাবলির বিকাশ: পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠ নাগরিকের মানসিক গুণাবলির বিকাশ সাধন করে। সুনাগরিক হওয়ার শিক্ষা, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার, রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা, নির্বাচনে যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়া, সময়মত কর পরিশোধ করা ইত্যাদি বিষয়ে নাগরিকের গুণাবলির বিকাশ সাধন করে পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠ।
৫। সুশাসন প্রতিষ্ঠা: বাংলাদেশের মত একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত জরুরি। সুশাসন ব্যতীত এ রাষ্ট্রের গণতন্ত্র ও উন্নয়ন টেকসই হওয়া সম্ভব নয়। কিভাবে বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও স্থায়ী করা যায় তা পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠ করে জানা যায়।
৬। নাগরিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন: পৌরনীতি ও সুশাসন অধ্যয়নের ফলে নাগরিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সাধিত হয়। মনের সংকীর্ণতা ও কুসংস্কার দূরীভূত হয় পৌরনীতি ও সুশাসন অধ্যয়নের ফলে। দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ফলে রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের কর্তব্যবোধ জাগ্রত হয়। এর প্রভাবে নাগরিক জীবনে পূর্ণতা আসে।
৭। গণতন্ত্রের বিকাশ: বাংলাদেশের গণতন্ত্র টেকসই, মজবুত, দীর্ঘস্থায়ী এবং বিশ্ব দরবারে প্রশংসনীয় করার জন্য এদেশের মানুষের পৌরনীতি ও সুশাসন অধ্যয়নের বিকল্প নেই। প্রত্যেক নাগরিকের গণতান্ত্রিক চেতনা বৃদ্ধির জন্য পৌরনীতি ও সুশাসন পাঠ আবশ্যক। কেননা গণতন্ত্রের বিকাশ ব্যতীত বাংলাদেশের সত্যিকারের উন্নয়ন সম্ভব নয়।
৮। সংবিধান সম্পর্কে জানা: সংবিধান রাষ্ট্রের দর্পণ স্বরূপ। ১৯৭২ বাংলাদেশের সালে সংবিধান কার্যকর হয়। রাষ্ট্র পরিচালনার সকল বিধি-বিধান বাংলাদেশ সংবিধানে লিপিবদ্ধ রয়েছে। সংবিধানের মাধ্যমে মানুষ জানতে পারে তাদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে। পৌরনীতি ও সুশাসন অধ্যয়নের মাধ্যমে সংবিধান এবং সংবিধানে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়।
৯। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানা: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু একই সুতোয় গাঁথা। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানা বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য আবশ্যক। বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। পৌরনীতি ও সুশাসন অধ্যয়নের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানা এ দেশের প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য।
পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশে পৌরনীতি ও সুশাসন অধ্যয়নের গুরুত্ব অপরিসীম। উত্তম নাগরিক জীবন ও সুখী সমৃদ্ধ দেশ গড়ার লক্ষ্যে পৌরনীতি ও সুশাসন অধ্যয়নের বিকল্প নেই।

সার-সংক্ষেপ
বাংলাদেশ একটি স্বল্পোন্নত রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রে নানাবিধ আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অনেক সমস্যা বিদ্যমান। এসব সমস্যা সমাধান করে আধুনিক, উন্নত ও কল্যাণকর নাগরিক জীবন প্রতিষ্ঠার জন্য পৌরনীতি ও সুশাসন অধ্যয়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে নাগরিক চেতনা বৃদ্ধি পায়, অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতনতা আসে, সরকার ও জনগণের মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপিত হয়, দেশপ্রেম জাগ্রত হয়, গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়। গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা পেয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।
পৌরনীতি ও সুশাসন পরিচিতি প্রথম পত্র-উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখকে বই
(Relations between Civics and Good Governance and History)

পৌরনীতি ও সুশাসনের সাথে ইতিহাসের সম্পর্ক
পৌরনীতি ও সুশাসন এবং ইতিহাস উভয় শাস্ত্রই সামাজিক বিজ্ঞানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। ইতিহাস ব্যতীত পৌরনীতি ও সুশাসন যেমন পরিপূর্ণ নয়, তেমনি পৌরনীতি ও সুশাসন ছাড়া ইতিহাস স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে না। তাই পৌরনীতি ও সুশাসনের সাথে ইতিহাসের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।
সাদৃশ্য: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং ইতিহাসের মধ্যে বিদ্যমান সাদৃশ্যসমূহ নিম্নরূপ:
১। পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং ইতিহাস শাস্ত্রের মধ্যে পারস্পরিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিরাজমান। ইতিহাসের তথ্য বিনা পৌরনীতি ও সুশাসনের আলোচনা পূর্ণতা পায় না। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক জন সিলি (John Seely) বলেন, "পৌরনীতি ব্যতীত ইতিহাস মূল্যহীন, আর ইতিহাস ব্যতীত পৌরনীতি ভিত্তিহীন।"
২। পারস্পরিক সহযোগিতা: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং ইতিহাসের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বিদ্যমান। ইতিহাস অতীতের ঘটনা প্রবাহ, বিপ্লব, সংগ্রাম, আন্দোলন, যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বিবর্তন ও তত্ত্বসমূহ বিশ্লেষণ করে। পৌরনীতি ও সুশাসনে যখন অতীত ঘটনা প্রবাহ আলোচনা করা হয় তখন সেখানে ঐতিহাসিক বিকাশ ধারা সন্নিবেশিত হয়ে থাকে।
৩। পরস্পরকে পরিপূর্ণতা দান: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং ইতিহাস পরস্পরকে পরিপূর্ণতা দান করে থাকে। পৌরনীতি ও সুশাসনের আলোচনা ও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ইতিহাসের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। ইতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ ব্যতীত পৌরনীতি ও সুশাসনের ব্যাখ্যা পরিপূর্ণতা পায় না।
৪। বিষয়বস্তুগত সাদৃশ্য: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং ইতিহাসের মধ্যে বিষয়বস্তুগত সাদৃশ্য রয়েছে। পৌরনীতি ও সুশাসন এবং ইতিহাস উভয় শাস্ত্রেই মানব জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করে। পৌরনীতি ও সুশাসন নাগরিকের সামাজিক ও রাজনৈতিক কার্যকলাপ সম্বন্ধে ব্যাখ্যা করে থাকে। ইতিহাস মানব সমাজের বিবর্তনের ধারাবাহিকতার সংকলন করে থাকে। তাই উভয় শাস্ত্রের মৌলিক বিষয়বস্তুগত মিল লক্ষণীয়।
৫। এক অপরের পরিপূরক: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং ইতিহাস একে অপরের পরিপূরক হিসেবে বিবেচিত হয়। পৌরনীতি ও সুশাসনের আলোচ্য বিষয়ে ঐতিহাসিক দিক-নির্দেশনা ও তথ্যসমৃদ্ধ না হলে তা গ্রহণযোগ্যতা পায় না। তেমনি ঐতিহাসিক ঘটনা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাপ্ত না করলে তা নিরর্থক হয়ে দাঁড়ায়।
বৈসাদৃশ্যঃ
১। বিষয়বস্তুগত পার্থক্য: ইতিহাসের আলোচ্য বিষয়বস্তু পৌরনীতি ও সুশাসনের আলোচ্য বিষয়বস্তু থেকে ব্যাপক। পৌরনীতি ও সুশাসন কেবল নাগরিকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করে। প্রথাগত ইতিহাস শাস্ত্র কেবল রাজা-রাজত্ব নিয়ে আলোচনা করলেও, আধুনিক কালের জন ইতিহাস চর্চা নাগরিকের সামগ্রিক জীবন ধারা নিয়ে আলোচনা করা হয়। এভাবে দেখলে বিষয়বস্তুগত দিক থেকে ইতিহাস শাস্ত্র অনেকটা বিস্তৃত। পক্ষান্তরে পৌরনীতি ও সুশাসনের আলোচ্য বিষয় অনেকটাই সীমাবদ্ধ।
২। প্রকৃতি ও পদ্ধতিগত পার্থক্য: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং ইতিহাসের মধ্যে প্রকৃতি ও পদ্ধতিগত পার্থক্য বিদ্যমান। পৌরনীতি ও সুশাসনের আলোচনা প্রকৃতপক্ষে তত্ত্ব অনুসন্ধানমূলক। এটি করা হয় তুলনামূলক পদ্ধতিতে। অন্যদিকে ইতিহাসের আলোচনার পদ্ধতি প্রধানত তথ্য ও বর্ণনামূলক।
৩। পরিধিগত পার্থক্য: পরিধিগত দিক দিয়ে ইতিহাসের চেয়ে পৌরনীতি ও সুশাসন কিছুটা সংকুচিত। পৌরনীতি ও সুশাসন রাষ্ট্র ও নাগরিকের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আলোচনা করে। ইতিহাস রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট সময়ের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সভ্যতা, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি, চিকিৎসা শাস্ত্রসহ নানাবিধ বিষয়াবলি নিয়ে আলোচনা করে।
৪। প্রাধান্যগত পার্থক্য: প্রথাগত ইতিহাস শাস্ত্র মূলত অতীতের রাজনৈতিক, কিছু মাত্রায় সামাজিক, অর্থনৈতিক ঘটনাবলি আলোচনা করে। অন্যদিকে, পৌরনীতি ও সুশাসন ঐতিহাসিক ঘটনাবলি আলোচনার মাধ্যমে বর্তমান, ভবিষ্যৎ নাগরিক জীবনের কর্ম-পরিকল্পনার নির্দেশনা দিয়ে থাকে। পরিশেষে বলা যায় যে, পৌরনীতি ও সুশাসন এবং ইতিহাসের মধ্যে কিছু বৈসাদৃশ্য থাকলেও উভয় শাস্ত্রের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।

সার-সংক্ষেপ
পৌরনীতি ও সুশাসন এবং ইতিহাস শাস্ত্র পরস্পরের পরিপূরক ও সহায়ক। এই দুই শাস্ত্র পারস্পরিক সহযোগিতায় পূর্ণতা লাভ করে। একটি ব্যতীত অপরটির আলোচনা অনেকটাই মূল্যহীন হয়ে পড়ে।
পৌরনীতি ও সুশাসন পরিচিতি প্রথম পত্র-উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখকে বই

পৌরনীতি ও সুশাসনের সাথে সমাজবিজ্ঞানের সম্পর্ক
পৌরনীতি ও সুশাসন এবং সমাজবিজ্ঞান উভয়ই সামাজিক বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটি শাখা। সমাজবিজ্ঞানের মূল লক্ষ্যই হল সামাজিক কাঠামোর অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা ও সংহতি সংরক্ষণের নীতিমালা উদঘাটন করা। সমাজবিজ্ঞান সম্পর্কে এল এফ ওয়ার্ড (L.F. Ward) বলেন, "Sociology is the science of society or of social phenomena." অন্যদিকে পৌরনীতি ও সুশাসন সমাজবিজ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে নাগরিকের আচার-আচরণ, রীতি-নীতি, নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য, রাষ্ট্রের শাসন প্রণালীসহ নাগরিকের সামগ্রিক বিষয়াবলি সম্বন্ধে আলোচনা করে। তাই পৌরনীতি ও সুশাসন এবং সমাজবিজ্ঞানের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান।
সাদৃশ্য: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং সমাজবিজ্ঞানের মধ্যে সাদৃশ্যসমূহ নিম্নরূপঃ
১। বিষয়বস্তুগত সাদৃশ্য: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং সমাজবিজ্ঞানের অনেক বিষয়ের মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে। উভয় শাস্ত্রই পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, সংগঠন ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করে। এছাড়াও সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ, সামাজিক পরিবর্তন, মানবাধিকার, নেতৃত্ব, আমলাতন্ত্র, জনমত, নৈতিকতা ইত্যাদি বিষয়াদি পৌরনীতি ও সুশাসন এবং সমাজবিজ্ঞানের আলোচনার অন্তর্ভূক্ত। তাই বিষয়বস্তুগত দিক থেকে উভয় শাস্ত্রের মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে।
২। পারস্পরিক নির্ভরশীলতা: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং সমাজবিজ্ঞান একে অন্যের উপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্র সমাজেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। পৌরনীতি ও সুশাসন রাষ্ট্র নিয়ে আলোচনা করে তেমনি সমাজবিজ্ঞান সমাজ নিয়ে আলোচনা করে। রাষ্ট্র ব্যতীত যেমন সমাজের আলোচনা হয় না তেমনি সমাজ ছাড়া রাষ্ট্রের আলোচনা পূর্ণতা পায় না।
৩।পরস্পর সম্পর্কযুক্ত: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং সমাজবিজ্ঞান পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। সমাজবিজ্ঞানের মূল আলোচ্য বিষয় সমাজ ও সামাজিক বিষয়াবলি এবং পৌরনীতি ও সুশাসনের মূল আলোচ্য বিষয় হচ্ছে রাষ্ট্র ও নাগরিক। রাষ্ট্র ও নাগরিক আবার সমাজের অচ্ছেদ্য অংশ। তাই প্রকৃতপক্ষে পৌরনীতি ও সুশাসন এবং সমাজবিজ্ঞানের গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান।
৪। পরস্পরের সহযোগী: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং সমাজবিজ্ঞান একে অপরের সহযোগী। সমাজবিজ্ঞানের মূল আলোচনার বিষয়বস্তু সমাজ। আবার সমাজ সম্পর্কিত আলোচনায় পৌরনীতি ও সুশাসন সমাজের উৎপত্তি, সমাজের ক্রমবিকাশ, সামাজিক পরিবর্তন, সামাজিক মূল্যবোধ, সামাজিক নীতি ও আদর্শ আলোচনায় সমাজবিজ্ঞানের সাহায্য গ্রহণ করে থাকে। অন্যদিকে, রাষ্ট্র ও নাগরিকতা বিষয়ক আলোচনায় সমাজবিজ্ঞান পৌরনীতি ও সুশাসনের সাহায্য গ্রহণ করে থাকে। কেননা, রাষ্ট্র ও নাগরিক পৌরনীতি ও সুশাসনের মুখ্য আলোচ্য বিষয়।
বৈসাদৃশ্য: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং সমাজবিজ্ঞানে মধ্যে বৈসাদৃশ্যসমূহ নিম্নরূপ:
১। উৎপত্তিগত পার্থক্য: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং সমাজবিজ্ঞানের উৎপত্তিগত পার্থক্য রয়েছে। পৌরনীতিতে বিশেষ করে সুশাসন একটি সাম্প্রতিক কালের ধারণা হলেও জ্ঞানের ক্ষেত্রে সমাজবিজ্ঞান অত্যন্ত পুরনো একটি শাখা। সমাজ জীবনের ঘটনাপ্রবাহ থেকে সমাজবিজ্ঞান এবং সমাজবদ্ধ মানুষের রাজনৈতিক কর্মকান্ড বিশ্লেষণ থেকে পৌরনীতি ও সুশাসনের উৎপত্তি।
২। পরিধিগত পার্থক্য: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং সমাজবিজ্ঞানের মধ্যে পরিধিগত পার্থক্য রয়েছে। সমাজবিজ্ঞানের পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। সমাজের সার্বিক বিষয় সমাজবিজ্ঞানের মাধ্যমে পাওয়া যায়। অন্যদিকে পৌরনীতি ও সুশাসন সমাজেরই একটি অংশ রাষ্ট্র ও নাগরিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। সেক্ষেত্রে পৌরনীতি ও সুশাসনের পরিধি তুলনামূলকভাবে কম।
৩। দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য: পৌরনীতি ও সুশাসন নাগরিকদের রাজনৈতিক দৃষ্টিকোন থেকে বিশ্লেষণ করে থাকে। অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞান সমাজের দৃষ্টিকোণ থেকে নাগরিকের আচার-আচরণ বিশ্লেষণ করে থাকে। পৌরনীতি ও সুশাসন এবং সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্যের মূলে আছে, মানুষের মধ্যে একাধারে সামাজিক ও রাজনৈতিক সত্তার উপস্থিতি।
৪। প্রকৃতিগত পার্থক্য: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং সমাজবিজ্ঞানের মধ্যে প্রকৃতিগত পার্থক্য রয়েছে। পৌরনীতি ও সুশাসনের প্রকৃতি ব্যবহারিক যা মূলত সর্ববৃহৎ সামাজিক সংগঠন অর্থাৎ রাষ্ট্রের কর্মকান্ড নিয়ে ব্যাপৃত থাকে।
৫। জ্ঞানের দুটি পৃথক শাখা: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং সমাজবিজ্ঞান হল জ্ঞানের দুটি পৃথক শাখা। পৌরনীতি ও সুশাসন অধ্যয়নের ফলে রাষ্ট্র ও নাগরিকতা বিষয়ে জ্ঞান লাভ করা যায়। অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞান অধ্যয়নের ফলে সমাজের সার্বিক পরিবেশ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়।
পরিশেষে বলা যায় যে, পৌরনীতি ও সুশাসন এবং সমাজবিজ্ঞানের মধ্যে কিছু বৈসাদৃশ্য থাকলেও উভয় শাস্ত্রের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও নিবিড়। একে অপরের পরিপূরক ও সহযোগী। এদের কোন একটিকে বাদ দিয়ে নাগরিকের সার্বিক কল্যাণ সম্ভব নয়।

সার-সংক্ষেপ
পৌরনীতি ও সুশাসন এবং সমাজবিজ্ঞান উভয়ই সামাজিক বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ দুটি শাখা। বিষয়বস্তুগত ও পরিধিগত কিছু বৈসাদৃশ্য থাকলেও উভয়ের সম্পর্ক অবিছিন্ন। পৌরনীতি ও সুশাসন এবং সমাজবিজ্ঞান একে অপরের কাছ থেকে রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে বিভিন্ন তত্ত্ব, তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ করে থাকে। সেজন্য পৌরনীতি ও সুশাসন এবং সমাজবিজ্ঞান একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং পরিপূরক। সমাজ ও রাষ্ট্রের সার্বিক কল্যানের জন্য একজন নাগরিকের যেমন পৌরনীতি ও সুশাসনের জ্ঞান থাকা আবশ্যক, তেমনি সমাজবিজ্ঞান পাঠেও তার মনযোগ থাকা বাঞ্ছনীয়।
পৌরনীতি ও সুশাসন পরিচিতি প্রথম পত্র-উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখকে বই
(Relations between Civics and Good Governance and Economics)

পৌরনীতি ও সুশাসনের সাথে অর্থনীতির সম্পর্ক
পৌরনীতি ও সুশাসন এবং অর্থনীতির সম্পর্ক অন্যান্য বিষয়ের চেয়ে বেশি সুদৃঢ়। রাষ্ট্রের নাগরিকের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ এবং অর্থনৈতিক জীবনধারা ইতিবাচক হলেই কেবল রাষ্ট্রে স্থিতিশীলতা বিরাজ করে। তাই উভয় শাস্ত্রের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।
সাদৃশ্যঃ পৌরনীতি ও সুশাসন এবং অর্থনীতির মধ্যে সাদৃশ্যসমূহ নিম্নরূপঃ
১। অভিন্ন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং অর্থনীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। বিষয় আলাদা হলেও
উভয়ের লক্ষ্য হল কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠন ও মানবকল্যাণ সাধন করা। পৌরনীতি ও সুশাসন নাগরিকের গুণাবলি, নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য, নাগরিকতা অর্জন পদ্ধতি ইত্যাদি আলোচনার মাধ্যমে রাষ্ট্রের উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। অর্থনীতি নাগরিকদের অসীম চাহিদার মাঝে সীমিত সম্পদকে কাজে লাগিয়ে কিভাবে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করা যায় সে বিষয়ে আলোচনা করে।
২। অভিন্ন বিষয়বস্তু: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং অর্থনীতির বিষয়বস্তুগত অভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। সমাজে বিদ্যমান প্রতিটি অর্থনৈতিক সমস্যার যেমন রাজনৈতিক দিক রয়েছে তেমনি রাজনৈতিক সমস্যারও অর্থনৈতিক দিক রয়েছে। সম্পদ, সম্পদের উৎপাদন ও বন্টন ব্যবসা, বাজেট, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, সমবায় ব্যবস্থা, জাতীয়করণ, বৈদেশিক বাণিজ্য, পররাষ্ট্রনীতি, জনসংখ্যা সমস্যা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে উভয় শাস্ত্রই আলোচনা করে।
৩। পরস্পরের পরিপূরক: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং অর্থনীতি পরস্পর পরস্পরের পরিপূরক। আধুনিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে মানুষের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবন গভীরভাবে সম্পৃক্ত। একটির পরিবর্তনের সাথে অন্যটির পরিবর্তন সাধিত হয়। এ প্রসঙ্গে ম্যাকাইভার বলেন, "প্রত্যেক সরকার ব্যবস্থাই তার অনুরূপ সম্পত্তি ব্যবস্থাকে সংরক্ষণ করে, একটির পরিবর্তন হলে অন্যটিরও পরিবর্তন সাধিত হয়।
৪। পারস্পরিক নির্ভরশীলতা: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং অর্থনীতি পরস্পর নির্ভরশীল। আধুনিক রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থায় অধিকাংশ কার্যপদ্ধতি অর্থনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট। রাষ্ট্র ও সরকারের সাফল্য এবং অগ্রগতি নির্ভর করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর। এ ধরনের পারস্পরিক সম্পর্কের কারণে যেকোন একটির ক্ষেত্রে অস্থিতিশীলতার জন্য রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণেই বলা হয় যে, পৌরনীতি ও সুশাসন এবং অর্থনীতিকে বিচ্ছিন্নভাবে বিবেচনায় নেয়ার সুযোগ নেই।
৫। জনকল্যাণ সাধন: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং অর্থনীতি উভয় শাস্ত্রের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জনগণের কল্যাণ সাধন। আধুনিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্রকে জনগণের কল্যাণার্থে বহুমুখী অর্থনৈতিক কর্মপরিকল্পনা ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হয়। এসব কর্ম-পরিকল্পনা পরিচালিত হয় রাষ্ট্র ও সরকার কর্তৃক। তাই জনগণের সার্বিক কল্যাণ সাধনে উভয় শাস্ত্রের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
বেসাদৃশ্য: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং অর্থনীতির মধ্যে বেসাদৃশ্যসমূহ নিম্নরূপঃ
১। বিষয়বস্তুগত পার্থক্য: পৌরনীতি ও সুশাসন মূলত রাষ্ট্র, সরকার, নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য অর্থাৎ নাগরিকতার
সাথে জড়িত বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। অন্যদিকে, অর্থনীতির প্রধান আলোচ্য বিষয় হচ্ছে মানুষের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যাবলি।
২। পদ্ধতিগত পার্থক্য: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং অর্থনীতির মধ্যে পদ্ধতিগত পার্থক্য দৃশ্যমান। পৌরনীতি ও সুশাসনের অনুশীলন পদ্ধতি ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক। এ পদ্ধতি অনেকটা তাত্ত্বিক ধরনের। কিন্তু অর্থনীতির অনুশীলন পদ্ধতি অনেক ক্ষেত্রেই গাণিতিক সূত্র সংশ্লিষ্ট।
৩। গুরুত্বের ক্ষেত্রে পার্থক্য: পৌরনীতি ও সুশাসন রাষ্ট্র, সরকার, সংবিধান, নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য, আইনের শাসন, জবাবদিহিতার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করে। অন্যদিকে অর্থনীতি মানুষের আয়, সম্পদ, চাহিদা, বন্টন বাজেট, সুদ, লোন, বাজার ব্যবস্থা অর্থাৎ সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপর বেশি গুরুত্ব প্রদান করে।
পরিশেষে বলা যায় যে, পৌরনীতি ও সুশাসন এবং অর্থনীতির মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে পার্থক্য থাকলেও উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত কার্যকরী। উভয়ের সমন্বিত উদ্যোগে রাষ্ট্রের কল্যাণ সাধিত হয়।

সার-সংক্ষেপ
পৌরনীতি ও সুশাসন এবং অর্থনীতি সামাজিক বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ দুটি শাখা। কিছু বৈসাদৃশ্য থাকলেও উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। উভয় শাস্ত্রের মূল লক্ষ্য হল নাগরিকের সার্বিক কল্যাণ সাধন করা। নাগরিকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনের সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় এর মাধ্যমে। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যেমন স্থিতিশীল হয়, তেমনি অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে রাজনৈতিক পরিস্থিতিও স্থিতিশীল হয়।
পৌরনীতি ও সুশাসন পরিচিতি প্রথম পত্র-উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখকে বই
(Relations between Civics and Good Governance and Ethics)

পৌরনীতি ও সুশাসনের সাথে নীতিশাস্ত্রের সম্পর্ক
পৌরনীতি ও সুশাসন রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের নাগরিকের বাহ্যিক আচরণ নিয়ে আলোচনা করে। অন্যদিকে, নীতিশাস্ত্র নাগরিকের নৈতিকতা সম্বন্ধীয় বিষয়াবলি আলোচনা করে থাকে। উভয় শাস্ত্রের উদ্দেশ্য জনগণের কল্যাণ সাধন করা। সেক্ষেত্রে পৌরনীতি ও সুশাসন এবং নীতিশাস্ত্রের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।
সাদৃশ্য: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং নীতিশাস্ত্রের মধ্যে বিরাজমান সাদৃশ্যসমূহ নিম্নরূপ:
১। অভিন্ন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং নীতি শাস্ত্রের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অভিন্ন। পৌরনীতি ও সুশাসনের
মূল উদ্দেশ্য সুনাগরিকতা অর্জন। অন্যদিকে, নীতিশাস্ত্রের মূল উদ্দেশ্য নাগরিকদের নৈতিকভাবে উন্নত মনের মানুষ গড়ে তোলা। নাগরিকদেরকে ন্যায়-অন্যায়, সৎ-অসৎ, ভালো-মন্দ, উচিত-অনুচিত সম্পর্কিত শিক্ষা দেয় নীতিশাস্ত্র। তাই উদ্দেশ্যগত অর্থে উভয়শাস্ত্রের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অভিন্ন।
২। বিষয়বস্তুগত সাদৃশ্য: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং নীতিশাস্ত্রের মধ্যে বিষয়বস্তুগত সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। পৌরনীতি ও সুশাসন নাগরিকের আচার-আচরণ, অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে আলোচনা করে। অন্যদিকে নীতিশাস্ত্র মানুষের আচরণ, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা করে। তাই উভয় শাস্ত্রের মধ্যে বিষয়বস্তুগত সাদৃশ্য রয়েছে।
৩। পরস্পর পরিপূরক: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং নীতিশাস্ত্র পরস্পরের পরিপূরক। যেকোন নৈতিক আদর্শ নাগরিক দ্বারা স্বীকৃত হলে রাষ্ট্র সহজেই সেটাকে আইনে পরিণত করতে পারে। আবার রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত হলেও কোন আইন নৈতিকতা বিরোধী হলে জনগণ তা প্রত্যাখ্যান করে। এ প্রসঙ্গে সি জে ফক্স (C. J. Fox) বলেন, "ন্যায়নীতির দিক থেকে যা অন্যায় তা রাজনৈতিক দিক থেকে ন্যায় হতে পারে না।"
৪। পরস্পর নির্ভরশীল: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং নীতিশাস্ত্র পরস্পর নির্ভরশীল। উভয় শাস্ত্রের মূল লক্ষ্য নৈতিকতা ও সুনাগরিকতার জ্ঞানের মাধ্যমে জনগণের কল্যাণ সাধন। এ প্রসঙ্গে আইভর ব্রাউন (Ivor Brown) বলেন, “নীতিশাস্ত্রের ধারণা রাজনৈতিক মতবাদ ছাড়া অসম্পূর্ণ এবং নীতিশাস্ত্রের ধারণা প্রতিফলিত না হলে রাজনৈতিক মতবাদ অর্থহীন।”
বৈসাদৃশ্য: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং নীতিশাস্ত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বৈসাদৃশ্যসমূহ নিম্নরূপ:
১। পরিধি ও বিষয়বস্তুগত পার্থক্য: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং নীতিশাস্ত্রের মধ্যে বিষয়বস্তুগত পার্থক্য রয়েছে।
পৌরনীতি ও সুশাসনের চেয়ে নীতিশাস্ত্রের বিষয়বস্তু ও পরিধি ব্যাপক। পৌরনীতি ও সুশাসন মানুষের বাহ্যিক আচরণ নিয়ে আলোচনা করে। অন্যদিকে নীতিশাস্ত্র মানুষের বাহ্যিক আচরণের পাশাপাশি চিন্তাগত অবস্থান নিয়েও আলোচনা করে।
২। বাধ্যবাধকতার পার্থক্য: পৌরনীতি ও সুশাসনে আলোচ্য রাষ্ট্রীয় আইন যা মান্য করা বাধ্যতামূলক। এ আইন অমান্য করলে তাকে শাস্তি পেতে হয়। কিন্তু নীতিশাস্ত্রে আলোচ্য নৈতিক বিধানাবলি বাধ্যতামূলক নয়।
৩। স্থানভেদে আইন ও নৈতিকতা: পৌরনীতি ও সুশাসনের অন্তর্ভূক্ত রাষ্ট্রীয় আইন সকল দেশে একই রকম নাও হতে পারে। যেমন- অনেক দেশ মৃত্যুদন্ড বিধান রহিত করেছে। পক্ষান্তরে, অনেক দেশে মৃত্যুদন্ড চালু আছে। নীতিশাস্ত্রের অন্তর্ভুক্ত বিধি-বিধানগুলো পৃথিবীর সকল দেশে প্রায় একই রকম।
৪। ভিত্তির ক্ষেত্রে পার্থক্য: পৌরনীতি ও সুশাসনের আলোচ্য বিষয়ের মূল ভিত্তি হল রাজনৈতিক। নৈতিকতার স্থান এখানে সুদৃঢ় নয়। অন্যদিকে, নীতিশাস্ত্রের অন্তর্ভুক্ত নৈতিকতা ও মূল্যবোধ সামাজিক সমর্থনের উপর প্রতিষ্ঠিত ও স্বীকৃত।
পরিশেষে বলা যায় যে, উভয় শাস্ত্রের মধ্যে কিছু বৈসাদৃশ্য থাকলেও উভয়ের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। উভয় শাস্ত্রেরই লক্ষ্য মানব কল্যাণ করা।
সার-সংক্ষেপ
পৌরনীতি ও সুশাসন এবং নীতি শাস্ত্রের মধ্যে বিষয়গত কিছু পার্থক্য থাকলেও, এদের মধ্যেকার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। পৌরনীতি ও সুশাসনে আলোচিত নাগরিকের আচার-আচরণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের, গঠন ও কার্যাবলি নীতিশাস্ত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত। নীতিশাস্ত্র মানুষের আচার-আচরণ, মূল্যবোধ ও সামাজিক ন্যায়-অন্যায়ের মানদন্ড। উভয় শাস্ত্রের আলোচ্য বিষয় হল মানুষ ও মানুষের আচরণকে ন্যায়বোধের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করা।
পৌরনীতি ও সুশাসন পরিচিতি প্রথম পত্র-উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখকে বই
(Relations between Civics and Good Governance and Public Administration)

পৌরনীতি ও সুশাসনের সাথে লোক প্রশাসনের সম্পর্ক
পৌরনীতি ও সুশাসন এবং লোক প্রশাসন সমাজবিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত দুটি পৃথক শাখা। পৌরনীতি ও সুশাসন নাগরিক ও রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দিক নিয়ে আলোচনা করে থাকে। অন্যদিকে লোক প্রশাসন সরকারের কার্যাবলি ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য জনশক্তি এবং সম্পদের সুষ্ঠু সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা করে থাকে। সেজন্য উভয় শাস্ত্রের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
সাদৃশ্য: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং লোক প্রশাসনের মধ্যে সাদৃশ্যসমূহ নিম্নরূপ:
১। উৎপত্তিগত সাদৃশ্য: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং লোক প্রশাসনের মধ্যে উৎপত্তিগত সাদৃশ্য রয়েছে। উভয় শাস্ত্রই অতীতে সমাজবিজ্ঞানের অন্তর্ভূক্ত ছিল। একপর্যায়ে সমাজবিজ্ঞান থেকে পৌরনীতি ও সুশাসন এবং লোক প্রশাসন পৃথক হয়ে যায়।
২। পরস্পর নির্ভরশীল: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং লোক প্রশাসন পরস্পর নির্ভরশীল। নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা পৌরনীতি ও সুশাসনের মূল লক্ষ্য; তবে লোক প্রশাসন জ্ঞান ছাড়া তা বাস্তবায়ন করা যায় না। আবার লোক প্রশাসন সরকারের বিভিন্ন বিধি-বিধান বাস্তবায়নের মাধ্যমে নাগরিকের জীবনমান উন্নত করে। আর এক্ষেত্রে পৌরনীতি ও সুশাসন শাস্ত্রে পরামর্শ একান্ত আবশ্যক।
৩। আলোচ্য বিষয়ে সাদৃশ্য: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং লোক প্রশাসনের মধ্যে আলোচ্য বিষয়গত সাদৃশ্য বিদ্যমান। পৌরনীতি ও সুশাসন রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের উৎপত্তি, সংগঠন, ব্যবস্থাপনা, আমলাতন্ত্র ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। অন্যদিকে লোক প্রশাসন রাষ্ট্রের এসব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন নিয়ে আলোচনা করে থাকে।
৪। আবশ্যকতায় সাদৃশ্য: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং লোক প্রশাসনের আবশ্যকতায় সাদৃশ্য রয়েছে। আধুনিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের জন্য লোক প্রশাসনের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা যেমন দরকার তেমনি দরকার পৌরনীতি ও সুশাসনের পরামর্শ। তাই পৌরনীতি ও সুশাসন এবং লোক প্রশাসন সুশাসন বাস্তবায়ন ও জনকল্যাণের বিভিন্ন বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে থাকে।
বৈসাদৃশ্য: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং লোক প্রশাসনের মধ্যে বৈসাদৃশ্যসমূহ নিম্নরূপ:
১। উদ্দেশ্যগত পার্থক্য: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং লোক প্রশাসনের মধ্যে উদ্দেশ্যগত পার্থক্য রয়েছে। পৌরনীতি ও সুশাসনের উদ্দেশ্য হচ্ছে নাগরিকতা অর্জনের পদ্ধতি, নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য, সুনাগরিকতা এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। অন্যদিকে লোক প্রশাসনের মূল উদ্দেশ্য হল সরকারি সিদ্ধান্ত ও নীতির বাস্তবায়ন।
২। পরিধিগত পার্থক্য: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং লোক প্রশাসনের মধ্যে পরিধিগত পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। লোক প্রশাসনের পরিধি অপেক্ষা পৌরনীতি ও সুশাসনের পরিধি ব্যাপক। পৌরনীতি ও সুশাসন রাষ্ট্র, সরকার, নাগরিকতা সম্পর্কীয় বিষয়াবলি নিয়ে আলোচনা করে। অন্যদিকে লোক প্রশাসন প্রধানত রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন নীতি সম্পর্কে আলোচনা করে।
৩। ক্ষমতাগত পার্থক্য: পৌরনীতি ও সুশাসন এবং লোক প্রশাসনের মধ্যে ক্ষমতাগত পার্থক্য দৃশ্যমান। পৌরনীতি ও
সুশাসন হচ্ছে অনেকটা চর্চার বিষয়। অন্যদিকে, লোক প্রশাসন হল প্রায়োগিক বিষয়। পৌরনীতি ও সুশাসন ক্ষমতার নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। অন্যদিকে লোক প্রশাসন মূলত: প্রশাসনকেন্দ্রিক আলোচনা করে। পরিশেষে বলা যায় যে, উভয় শাস্ত্রের মধ্যে কিছু বিষয়ে পার্থক্য থাকলেও উভয় শাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। পৌরনীতি ও সুশাসনের দিক নির্দেশনা ও পরামর্শ এবং লোক প্রশাসনের বাস্তবিক প্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রের যথাযথ কল্যাণ সম্ভব।

সার-সংক্ষেপ
পৌরনীতি ও সুশাসন এবং লোক প্রশাসন উভয়ই সামাজিক বিজ্ঞানের দুটি শাখা। সময়ের বিবর্তনে এই দুই শাস্ত্র পৃথক ধারায় প্রবাহিত হয়েছে মাত্র। যে শাস্ত্র নাগরিকতা ও রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দিক নিয়ে বিশ্লেষণ করে তাকে পৌরনীতি ও সুশাসন বলে। অন্যদিকে, সরকারের কার্যাবলি এবং উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য জনশক্তি ও সম্পদের সুষ্ঠু সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা হল লোক প্রশাসন। তাই উভয়ই শাস্ত্র একে অপরের পরিপূরক হয়ে রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করে।
পৌরনীতি ও সুশাসন পরিচিতি প্রথম পত্র-উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখকে বই
Read more