সর্বজনীন দ্রাবক (পাঠ ৮-৯)

মিশ্রণ - বিজ্ঞান - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

602

দ্রবণে দ্রাবক সম্পর্কে তোমরা আগেই জেনেছ। সর্বজনীন দ্রাবক বলতে কী বুঝায়? এটি হবে এমন দ্রাবক, যা সব রকমের পদার্থকে দ্রবীভূত করতে পারবে। এরকম কোন দ্রাবক কি বাস্তবে পাওয়া সম্ভব? সম্ভবত নয়। তবে অনেক রকমের পদার্থকে দ্রবীভূত করতে পারে এমন একমাত্র দ্রাবক হচ্ছে আমাদের অতি পরিচিত পানি। অর্থাৎ পানিই হচ্ছে এখন পর্যন্ত পাওয়া একমাত্র সর্বজনীন দ্রাবক। পানি একদিকে যেমন অসংখ্য অজৈব পদার্থকে (ক্যালসিয়াম কার্বনেট, সিলিকা ইত্যাদি ছাড়া) দ্রবীভূত করতে পারে, তেমনি অন্যদিকে অনেক জৈব যৌগ (যেমন স্পিরিট, এসিটোন, এসিটিক অ্যাসিড) ও গ্যাসীয় পদার্থকেও দ্রবীভূত করতে পারে।
হাতের কাছে পাওয়া যায় এমন নানারকম জৈব ও অজৈব পদার্থ নিয়ে তোমরা পানিতে এদের দ্রবণীয়তা পরীক্ষা করে দেখ।

সমসত্ব মিশ্রণ প্রস্তুত ও পৃথকীকরণ
এই অধ্যায়ের শুরুতে আমরা সমসত্ব মিশ্রণের কিছু উদাহরণ দেখেছি। এখন দেখব কীভাবে এ সকল মিশ্রণ প্রস্তুত ও তাদের উপাদানসমূহকে পৃথক করা যায়।

কাজ: সমসত্ব মিশ্রণ প্রস্তুতকরণ।
প্রয়োজনীয় উপকরণ: একটি বিকার, চামচ, নাড়ানি, গ্লুকোজ ও পানি, চারটি ওয়াচ গ্লাস বা কাচের ছোটো পাত্র পদ্ধতি: বিকারটি ভালো করে পরিষ্কার করে তাতে ২০০ মিলিলিটার (ভিন্ন পরিমাণও নেওয়া যেতে পারে) পানি মাপচোঙ দিয়ে মেপে নাও। এবার ৪-৫ চামচ গ্লুকোজ বিকারের পানিতে যোগ করে ভালোভাবে নাড়া দাও। গ্লুকোজ ও পানির মিশ্রণটি সমসত্ব হয়েছে কি না সেটি পরীক্ষা করে দেখা যাক। পুরো মিশ্রণটিকে সমান চার ভাগে ভাগ কর ও চারটি ওয়াচ গ্লাসে রাখ। প্রতিটি ওয়াচ গ্লাসের আলাদা আলাদা ভর মেপে নাও ও লিখে রাখ। এবার প্রতিটি ওয়াচ গ্লাস ত্রিপদি স্ট্যান্ডের উপর রাখা তারজালির উপর বসিয়ে স্পিরিট ল্যাম্পের সাহায্যে তাপ দিয়ে পানি পুরোপুরি শুকিয়ে ফেল। ওয়াচ গ্লাসগুলোকে ঠান্ডা করে প্রতিটির ভর মেপে নাও। প্রতিটি ওয়াচ গ্লাসের পরের ভর ও আগের ভরের পার্থক্য থেকে প্রাপ্ত গ্লুকোজের ভর হিসেব কর।

দ্রবণে গ্লুকোজের কণাগুলোকে আর দেখতে পাচ্ছ কি? না, মোটেও না। কারণ গ্লুকোজের দানাগুলো সম্পূর্ণরূপে পানিতে দ্রবীভূত হয়ে গেছে। এবার পানি শুকানোর পর তোমরা প্রতিটি পাত্রে সমান পরিমাণ গ্লুকোজ পেয়েছ কি? হ্যাঁ, প্রতিটি পাত্রে পাওয়া গ্লুকোজের পরিমাণ সমান। অতএব বলা যায় যে পানি ও গ্লুকোজের মিশ্রণটি সমসত্ব ছিল। তা না হলে কোনো ভাগে গ্লুকোজ বেশি আবার কোনোটাতে কম পাওয়া যেত।
যে প্রক্রিয়ায় তাপ দিয়ে পানি শুকিয়ে ফেললে তার নাম জান কি? এটি হলো বাষ্পীভবন। অর্থাৎ তাপ দিয়ে তরল পদার্থকে বাষ্পে পরিণত করার প্রক্রিয়াকেই বাষ্পীভবন বলে। তোমাদের কি মনে হয় বাষ্পীভবন ছাড়া আর কোনো সহজ পদ্ধতিতে গ্লুকোজকে পানি থেকে আলাদা করা যাবে? না, এটিই একমাত্র উপায়, যা বেশ কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ।

অসমসত্ব মিশ্রণ প্রস্তুত ও পৃথকীকরণ

কাজ: অপরিষ্কার লবণ ও পানির অসমসত্ব মিশ্রণ প্রস্তুতকরণ।
প্রয়োজনীয় উপকরণ: একটি বিকার বা কাচের গ্লাস, চামচ, নাড়ানি, অপরিষ্কার লবণ ও পানি।
পদ্ধতি: বিকার বা কাচের গ্লাসটি ভালো করে পরিষ্কার করে তাতে ২০০ মিলিলিটার (ভিন্ন পরিমাণও নেওয়া যেতে পারে) পানি নাও। এবার ১-২ চামচ অপরিষ্কার লবণ বিকারের পানিতে যোগ করে ভালোভাবে নাড়া দাও। মিশ্রণটিকে কিছুক্ষণ রেখে দাও।

কী দেখতে পাচ্ছ? লবণের কণাগুলো পানিতে দ্রবীভূত হয়ে গেছে আর ময়লার ভারি কণাগুলো বিকারের তলায় জমতে শুরু করেছে। অন্যদিকে ময়লার হালকা ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণাগুলো পানিতে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। ময়লার কণাগুলো পানিতে সুষমভাবে বিন্যস্ত হচ্ছে না অর্থাৎ এটি নিশ্চিত যে মিশ্রণটি লবণ-পানি- ময়লার একটি অসমসত্ব মিশ্রণ।
ময়লার কণাগুলো যে সুষমভাবে বিন্যস্ত নয় সেটি কীভাবে পরীক্ষা করে প্রমাণ করা যায়? আগের কাজের মতো সমান কয়েক ভাগে ভাগ করে প্রতিটি ভাগ থেকে পানি পুরোপরি বাষ্পায়িত করে প্রতি ভাগে অবশিষ্ট বস্তুর ভর পরিমাপ করলেই দেখা যাবে একেক ভাগে একেক পরিমাণ বস্তু রয়েছে।

বলতো এই মিশ্রণ থেকে আমরা কি কোনোভাবে অদ্রবণীয় মরলার কণা দূর করতে পারি? ছাঁকুনি দিয়ে চাপাতা যেভাবে লিকার থেকে আলাদা করা হয়, ঠিক একইভাবে আমরা অদ্রবণীয় বস্তুর কণাগুলোকেও মিশ্রণ থেকে আলাদা করতে পারি। এবার দেখে নিই কীভাবে ফিল্টার কাগজ দিয়ে ময়লার কণাগুলো লবণ পানি থেকে আলাদা করে পরিষ্কার লবণ পাওয়া যায়।

কাজ: অপরিষ্কার লবণ হতে পরিষ্কার লবণ প্রস্তুতকরণ।
প্রয়োজনীয় উপকরণ: অপরিষ্কার লবণের অসমসত্ত্ব মিশ্রণ, নাড়ানি, ত্রিপদি স্ট্যান্ড, তারজালি, ফানেল, ফিল্টার কাগজ, রিংযুক্ত স্ট্যান্ড ও পানি।
পদ্ধতি: একটি ফিল্টার কাগজ নিয়ে প্রথমে সমান চার ভাঁজ কর। এরপর চিত্রের মতো করে একদিকে তিন ভাঁজ ও অন্যদিকে এক ভাঁজ রেখে ফানেলের ভিতরে বসিয়ে দাও। ফিল্টার কাগজটিকে পরিষ্কার পানি দিয়ে অল্প করে ভিজিয়ে নাও যাতে এটি সরে না যায়। ফানেলটি চিত্র অনুযায়ী স্ট্যান্ডের সাথে যুক্ত রিংয়ের উপর বসাও। ফানেলের নিচে একটি বিকার রাখ। অতঃপর আগের কাজের অপরিষ্কার লবণের অসমসত্ব মিশ্রণটি ফিল্টার পেপারের উপর আস্তে আস্তে ঢেলে দাও। যতক্ষণ পর্যন্ত ফানেল থেকে পরিষ্কার পানি পড়া শেষ না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা কর। এবার পরিষ্কার লবণ-পানির বিকারটিকে ত্রিপদি স্ট্যান্ডের উপর রাখা তারজালির উপর বসিয়ে স্পিরিট ল্যাম্পের সাহায্যে তাপ দিয়ে সম্পূর্ণ পানি শুকিয়ে ফেল।

মিশ্রণটি ফানেলে ঢালার পর কী ঘটল? মাটির কণামুক্ত পরিষ্কার লবণ-পানি ধীরে ধীরে ফিল্টার কাগজের মধ্য দিয়ে নিচে রাখা বিকারে জমা হলো আর মাটির কণাগুলো ফিল্টার কাগজের উপরে আটকে রইল। মাটির কণাগুলোকে ফিল্টার কাগজ দিয়ে মাটি ও পানির মিশ্রণ থেকে আলাদা করার এই প্রক্রিয়ার নাম হলো পরিস্রাবণ অর্থাৎ পরিস্রাবণ হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে তরল ও কঠিন পদার্থের মিশ্রণ থেকে কঠিন পদার্থকে আলাদা করা যায়।
বিকারের পানি পুরোপুরি শুকিয়ে যাওয়ার পর তোমরা কী পেলে? সাদা ধবধবে ও পরিষ্কার লবণের স্তর পেয়েছ। কারণ শুরুতে নেওয়া ময়লাযুক্ত লবণ থেকে সকল ময়লা ফিল্টার কাগজ দিয়ে পরিস্রাবণের মাধ্যমে সম্পূর্ণরূপে দূর করা হয়েছে। মনে রেখো ময়লার মধ্যে যদি পানিতে দ্রবণীয় কোন অংশ থাকে তাহলে উপরোক্ত পদ্ধতিতে সেই অংশকে লবণ থেকে আলাদা করা যাবে না।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...