ভূ-ত্বক ও মাটি (পাঠ ৯-১০)

পৃথিবীর উৎপত্তি ও গঠন - বিজ্ঞান - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

836

শিলামণ্ডলের উপরের দিকের অংশ ভূত্বক নামে পরিচিত। ভূত্বক হয় পানি নয়ত মাটি দ্বারা আবৃত। ভূত্বকের বেশির ভাগ পানি দ্বারা আবৃত। বাকি অংশটি গুড়ো বা ভাঙা পাথুরে পদার্থ দ্বারা আবৃত। এ মাটি সাধারণত জৈবপদার্থ দ্বারা গঠিত ও নরম হয় তাহলে তাকে মাটি বলা হয়। ভূত্বক মানুষের জন্য পৃথিবীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ অংশের উপরে আমরা বসবাস করি। মাটিতে প্রয়োজনীয় খাদ্য উৎপাদন করি। এছাড়াও এ অংশে রয়েছে খনিজ পদার্থ যা আমরা বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করি।

মাটি গঠন প্রক্রিয়া: সাধারণত পাথর, নুড়ি, কাঁকর, বালি, কাদা ইত্যাদি দ্বারা ভুত্বক গঠিত। এদের সাথে মিশে থাকে মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহের অংশ। ভূত্বক গঠনকারী এসকল কঠিন পদার্থের সাধারণ নাম শিলা। কঠিন শিলা থেকে নরম মাটি তৈরি হয় সাধারণত দু'টি পর্যায়ে:
১. প্রথম পর্যায়: কঠিন শিলা দীর্ঘদিন ধরে রোদ, বৃষ্টি, বঝড়, ভূমিকম্প ইত্যাদি কারণে ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে পরিণত হয়। এছাড়া বায়ু, বরফ বা পানির প্রবাহ ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণে অন্য জায়গা থেকে ক্ষুদ্র শিলাকণা এসে একটি স্থানে জমা হয়।
২. দ্বিতীয় পর্যায়: ক্ষুদ্র শিলাকণার সাথে পানি, বায়ু, ক্ষুদ্র জীব যেমন ব্যাকটেরিয়া, পচা ও মৃত জীবের দেহাবশেষ যোগ হয়।

বিভিন্ন স্থানের মাটি বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় গঠিত হয়েছে। তাই বিভিন্ন স্থানের মাটি দেখতে ভিন্ন ভিন্ন, গঠনেও ভিন্ন। তবে মাটির উপরিভাগ থেকে নিচের দিকে অনুসন্ধান করলে সাধারণভাবে কয়েকটি স্তর দেখা যায়। চিত্রে যেমন দেখা যাচ্ছে, তেমনি মাটির একদম উপরের স্তরটিতে পচা ও মৃত জীবদেহ মিশে থাকে। পচা ও মৃত জীবদেহ মিশে তৈরি কালো বা অনুজ্জ্বল উপাদানকে হিউমাস বলে। মাটির উপরের দিকে হিউমাস বেশি থাকে। এই হিউমাস থেকে উদ্ভিদ তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান পায়। দ্বিতীয় স্তরে হিউমাস কমে আসে, এ জন্য কম কালো বা কিছুটা উজ্জ্বল হয়। তৃতীয় স্তর মূলত ক্ষুদ্র শিলাকণা দ্বারা গঠিত। সবশেষে নিচের স্তরটি কেবল শিলাখণ্ড দ্বারা গঠিত।

বাংলাদেশে নদীর কাছাকাছি স্থানে বন্যা হয়। বন্যার পানি পলিমাটি বয়ে আনে। নদীর কাছাকাছি এসব স্থানের মাটির উপরিভাগ পলিমাটি দ্বারা গঠিত। এসব স্থানের মাটির উপরের স্তর সেজন্য খুব পুরনো হয় না। এ মাটি ফসল চাষের জন্য খুব উপযোগী।

খনিজ পদার্থ
আগেই বলা হয়েছে যে, ভূত্বক বিভিন্ন পদার্থ দ্বারা গঠিত। এর কিছু অংশ জৈবপদার্থ দিয়ে গড়া। আরও আছে অজৈব পদার্থ। অজৈব অংশের মধ্যে অনেক সময় একাধিক পদার্থ মিশ্রিত অবস্থায় থাকে। কখনো একটি অজৈব পদার্থ মিশ্রিত অবস্থায় না থেকে আলাদা থাকে। এরূপ অজৈব পদার্থকে খনিজ পদার্থ বলে। খনিজ পদার্থের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এদেরকে মানুষ তৈরি করে না, এদেরকে প্রকৃতিতেই পাওয়া যার। চুনাপাথর একটি খনিজ পদার্থ। চুনাপাথর আসলে ক্যালসিয়াম কার্বনেট নামের একটি পদার্থ। বাংলাদেশের জয়পুরহাটে ও সিলেটে চুনাপাথর পাওয়া যায়। চুনাপাথর থেকে সিমেন্ট তৈরি হয়। সাধারণত মাটির নিচের দিকে খনিজসম্পদ বেশি পাওয়া যায়। কখনও কখনও এরা উপরের মাটির সাথেও মিশে থাকে। দরকারি অনেক খনিজসম্পদ প্রকৃতিতে পাওয়া যায়। দালান তৈরিতে যে রড ব্যবহার করা হয় তা লোহার তৈরি। গাড়ি, বাস, লঞ্চ এগুলোও তৈরি হয় লোহা থেকে।

টিউবওয়েল, লাঙলের ফলা, পেরেক/তারকাঁটা, যন্ত্রপাতি এগুলোও লোহা থেকে তৈরি। লোহা মাটিতে খনিজ হিসেবে পাওয়া যায়। কিছু হাঁড়ি-পাতিল, চামচ তৈরি হয় অ্যালুমিনিয়াম থেকে। লোহার মতো অলুমিনিয়ামও মাটিতে খনিজ হিসেবে পাওয়া যায়। তামা, রুপা, সোনা, দস্তা এসব দরকারি ও দামি পদার্থও মাটিতে খনিজ হিসেবে পাওয়া যায়। বাংলাদেশে অবশ্য এসব খনিজসম্পদ বেশি পরিমাণে নেই।
কয়লা, পেট্রোলিয়াম বা প্রাকৃতিক গ্যাস মাটির নিচে পাওয়া গেলেও এদেরকে খনিজ পদার্থ বলা হয় না। কারণ এরা জীবদেহ থেকে তৈরি, এরা অজৈব নয়। বড়ো বড়ো গাছ মাটির নিচে চাপা পড়ে দীর্ঘ সময়ে এরা কয়লা, পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসে পরিণত হয়েছে। জীবদেহ থেকে তৈরি এবং জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় বলে এদেরকে জীবাশ্ম জ্বালানি বলা হয়। আমাদের দেশে মাটির নিচে বিভিন্ন স্থানে প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লা পাওয়া যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পেট্রোলিয়াম পাওয়া যায়। প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা ও পেট্রোলিয়াম জ্বালানি হিসেবে বেশ ভালো। এগুলো পুড়িয়ে যে তাপ পাওয়া যায় তাতে কলকারখানা চলে, যানবাহন চলে, বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় এবং রান্না করা হয়। এগুলো থেকে বিভিন্ন প্রকার প্রয়োজনীয় দ্রব্যও তৈরি করা হয়। যেমন: প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে ইউরিয়া সার তৈরি করা হয়। পেট্রোলিয়াম থেকে পলিথিন তৈরি করা হয়।

এই অধ্যায়ে আমরা যা শিখলাম

  • কোটি কোটি বছর আগে একটি মহাবিস্ফোরণ থেকে মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে।
  • সূর্য একটি নক্ষত্র। সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে পৃথিবী ও আরও সাতটি গ্রহ। পৃথিবীর একটি উপগ্রহ হলো চাঁদ।
  • সৃষ্টির সময়ে পৃথিবী খুব গরম ছিল। ধীরে ধীরে এটি ঠাণ্ডা হয়ে জীবের বাসের উপযোগী হয়েছে। পৃথিবীতে পানি ও নানা রকম গ্যাস আছে বলে জীবনের সৃষ্টি হয়েছে।
  • পৃথিবীর তিনটি অংশ- বায়ুমণ্ডল, ভূপৃষ্ঠ ও ভেতরের অংশ। বায়ুমণ্ডলে রয়েছে নানা গ্যাস। ভূপৃষ্ঠ ঢাকা আছে পানি, মাটি ও শিলা দ্বারা।
  • বরফগলা পানি ও বৃষ্টির পানি ঢাল বেয়ে নিচে প্রবাহিত হওয়ায় ফলে নদীর সৃষ্টি হয়েছে।
  • পৃথিবীর ভেতরের অংশ বা অভ্যন্তর আবার তিনটি ভাগে বিভক্ত। পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে আছে কেন্দ্রমণ্ডল, মাঝখানে গুরুমণ্ডল আর উপরের দিকে শিলামণ্ডল।
  • শিলামণ্ডল কতগুলো প্লেটে বিভক্ত। এই প্লেটগুলোর নড়াচড়ার কারণে ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত হয়।
  • কঠিন শিলার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণার সাথে পানি, বায়ু, ব্যাকটেরিয়া, পচা ও মৃত জীবের দেহাবশেষ মিলে মাটি তৈরি হয়।
  • মাটির নিচে রয়েছে অনেক দরকারি পদার্থ। এদের মধ্যে অজৈব পদার্থকে বলে খনিজ পদার্থ। এছাড়া রয়েছে পেট্রোলিয়াম, কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাস, ইত্যাদি জীবাশ্ম জ্বালানি।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...