বাউল মতের প্রতি শিক্ষিত মহলকে উৎসুক করে তোলেন কে ?
-
ক
লালন ফকির
-
খ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
-
গ
মাধব বিবি
-
ঘ
ফরিদা পারভীন
কিছু মানুষের ধারনা হতেই পারে যে লালন শাহের হাতেই বাউল দর্শন ও বাউল গীতির উদ্ভব। কিন্তু বাউল মতের উত্থানের প্রকৃত ইতিহাস আরও অনেক পুরনো।
মানব জীবন প্রকৃতি ও এর প্রকৃত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা দীর্ঘকাল ধরেই চলে এসেছে। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে মানুষের চেয়ে মানুষের ধর্মের, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের, ধর্মগ্রন্থের এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মূল্য অনেক বেরে যায়। এসব মূখ্য হয়ে দেখা দিতে থাকে মানব হয়ে উঠতে থাকে গৌণ। বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন সময়ে এই পরিস্থিতির বিপরীতে সরব হয়েছেন একদল ব্যক্তি। সমাজের স্বাভাবিক ধর্ম কেন্দ্রিক ধারার বাহিরে এই ধরনের ব্যক্তিবর্গ গড়ে তোলেন একটি মানুষ প্রধান দর্শনের ধারা। এটি এমনই একটি ধারা যাতে প্রচলিত ধর্মীয় চিন্তাধারার বাহিরে প্রাধান্য পায়, মানব মন, মানব চেতনা, মানব সত্তা, মানব জনমের কারণ ও উদ্দেশ্য, এক কথায় পুরো মানুষ। সময়ের পরিক্রমায় তাদের একাধিক ধারা সহজিয়া সাধকদের ন্যায় দেহবাদী চেতনায় বিশ্বাসী হয়ে ওঠে। তবে তাদের জীবনধারা সমাজের মূলধারার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় সকল দেশে সকল কালেই তারা ছিলেন একটি সমান্তরাল সমাজ। এরকমই একটি তত্ত্বের ধারা হলো আমাদের বাউল মত।
খ্রিস্টীয় অষ্টম-নবম শতকে পারস্যে এরকম একটি শ্রেণির সন্ধান পাওয়া যায় যারা মূল বসতি ছেড়ে মরুর বুকে ঘুরে বেড়তো এবং নিজেদের আদর্শ প্রচারে গান রচনা ও পরিবেশন করতো। ঐতিহাসিক তথ্যমতে এদের বা'আল বলা হতো। অনেকের মতে এই বা'আল শব্দ থেকেই 'বাউল' শব্দের উৎপত্তি।
আবার অনেকে মনে করে থাকেন, এই শ্রেণির মানুষের জীবন যাপনের ধারা মূলধারার থেকে ভিন্ন হওয়ায় তাদের 'বাতুল' বলা হতো। তাদের মতে এই 'বাতুল' শব্দ থেকেই 'বাউল' শব্দের উৎপত্তি।
এদের এই নামের উৎপত্তি নিয়ে আরও অনেক মতবাদ প্রচলিত রয়েছে৷ কিন্তু নামকরণের কারণ যাই হোক না কেনো, এটি এরা সব সময় সমাজের মূলস্রোতের বাহিরে একটি চোরা স্রোতের মতোই বয়ে চলেছে। এবার প্রশ্ন বাংলায় এই নিভৃতে বিচরণকারী মতের প্রতি মূল ধারার শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে আগ্রহী করে তুলেছিলেন কে?
মনে রাখতে হবে এই ক্ষেত্রে এক নয় অনেকের অবদান রয়েছে। লালন শাহ নিঃসন্দেহে এই ক্ষেত্রে প্রথম প্রভাবশালী ব্যক্তি। তার সময়ে বাউল মতবাদ লালনগীতি রূপে বাউল দর্শন এতোটাই প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয় যে, এই আদর্শের অনুসারীদের পাশাপাশি সাহিত্য ও দর্শন সচেতন অনেক মানুষই এর প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। লালনের গানগুলোর অন্তরালের বার্তা এতোটাই শক্তিশালী ছিলো যে তার টানে ছেউড়িয়ার আখড়ায় ছুটে যান মীর মশাররফ হোসেন ও কাঙাল হরিনাথ। তাকে সাথে সময় কাটান জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। এসব বিষয় থেকে শিক্ষিত সমাজের মধ্যে বাউল মতের প্রতি আগ্রহের বিষয়টির প্রমাণ মিললেও তা ছিলো একেবারেই প্রারম্ভিক পর্যায়। কারণ হিসেবে মনে রাখতে হবে যে, ব্রাহ্মণ্য প্রভাব বলয়ের হিন্দু শিক্ষিত সমাজে এবং মুসলিমদের মাঝেও লালন ফকির অনেকাংশেই ধর্মকে অমান্য করা একজন মানুষ হিসেবেই বিবেচিত হতেন। তাই তিনি তার আদর্শ ও সঙ্গীতের দ্বারা কিছু মানুষকে আগ্রহী করে তুলতে পারলেও তাঁর জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর কিছুকাল পরেও সেটি ব্যাপক রূপ লাভ করেনি।
এরপরে মীর মশাররফ হোসেনের প্রয়াসে, কাঙ্গাল হরিনাথের 'গ্রামবার্তা প্রকাশিকা'র প্রচারে বাউল মত সম্পর্কে শিক্ষিত সমাজ জানার সুযোগ লাভ করে। এরপরেই আসে এক বড় প্রভাব। বেশ কিছুটা পূর্বে বাংলা সাহিত্যে প্রবেশ করলেও বিংশ শতকের শুরুর পর্যায়ে নোবেল পুরস্কার লাভ করলে রবীন্দ্রনাথের গ্রহণযোগ্যতা অত্যুচ্চ পর্যায়ে চলে যায়। সেই রবীন্দ্রনাথ বাউল মত দ্বারা কিছু অংশে প্রভাবিত হয়েছিলেন। এরমধ্যে বাউলগীতিই রবীন্দ্রনাথকে সর্বাধিক টেনেছিলো। এর প্রমাণ আমরা পাই তখন, যখন রবীন্দ্রনাথের অনেক গানের সুর তিনি করেন বাউল গানের আদলে।
যেমন আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের সুর তিনি নিয়েছেন গগন হরকরার 'আমি কোথায় পাবো তারে, আমার মনের মানুষ যে রে' গান থেকে। আপনাদের বোঝার সুবিধার্থে গানটির একটি লিংক কমেনেটে যুক্ত করছি।
রবীন্দ্রভাবনা, চিন্তা ও আলোচনায় বাউল প্রসঙ্গ নানা ভাবে এসেছে। মূলত শিলাইদহের বাউল সম্প্রদায়ের প্রেরণা ও প্রভাবেই তিনি রূপান্তরিত হয়েছেন ‘রবীন্দ্রবাউলে’। তাঁর শিল্পকর্ম পোষাক পরিচ্ছদ, ধর্মদর্শন চিন্তায় বাউল ভাবের পরিচয় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় । অঞ্চল বিশেষে বাউল সম্প্রদায়ের ভাবধারা, তাদের আধার, তাদের গানকে তিনি তার প্রবন্ধে, নাটকে, নৃত্যে ও সর্বোপরি দার্শনিকতায় বার বার বিভিন্নভাবে ধরার চেষ্টা করেছেন।
ধর্মের বিষয়ে 'মানব ধর্ম' গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের যে প্রকাশ তাতেও কিছুকিছু ক্ষেত্রে বাউল দর্শন দ্বারা প্রভাবিত। তাইতো আমরা তাকে বলতে শুনি:
'আমার ধর্ম কী, তা যে আজও আমি সম্পূ্র্ণ এবং স্পষ্ট করে জানি এমন কথা বলতে পারিনে – অনুশাসন আকারে তত্ত্ব আকারে কোন পুঁথিতে লেখা ধর্ম সে তো নয়।'
অন্যভাবে এই কথারই প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় লালনের গানে –
'সব লোকে কয় লালন ফকির হিন্দু কি যবন,
লালন বলে আমার আমি না জানি সন্ধান'
শিলাইদহে বসবাসকালে গুরুদেব বাউল মতের গভীরতা উপলব্ধি করতে পারেন। তাইতো সাধক হিসেবে রবীন্দ্রনাথ নিজেকে বসিয়েছেন বাউলের পাশে –
কবি আমি ওদের দলে
আমি বাত্য আমি মন্ত্রহীন।
এভাবে রবীন্দ্রনাথই বস্তুত পরিশীলিত সাহিত্য – জগতে ও সাহিত্য সচেতন শিক্ষিত সমাজে বাউলকে সশ্রদ্ধ স্বীকৃতি দেন গান সংগ্রহ করে, নিজের সংগীত সষ্টিতে তার ঋণ গ্রহণ করে এবং সর্বোপরি বিশ্বের দরবারে বাউলকে পরিচিত করে।
এর প্রভাব কী হয়? নিজের জীবদ্দশাতেই রবীন্দ্রনাথ বাঙালি শিক্ষিত ও সাহিত্যানুরাগী সমাজে নিজের প্রতি একটি আকর্ষণ ও মনোযোগ সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাই বাউল মত রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ একসময় শিক্ষিত শ্রেণির একটি উল্লেখযোগ্য অংশের আগ্রহে পরিণত হয় এবং বাঙালি শিক্ষিত সমাজ বাউল মতের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে।
সুতরাং এই প্রশ্নের নির্দ্বিধায় 'রবীন্দ্রনাথ' ।
বাংলার পল্লীগীতির একটি বিশেষধারার নাম বাউলগান। পন্ডিতদের মতে, সতেরো শতকে বাংলাদেশে বাউল মতের উদ্ভব হয়েছে। তবে বাউল মত সতেরো শতকে জন্ম নিলেও উনিশ শতকে শ্রেষ্ঠ বাউল সাধক লালন ফকির শিক্ষিত মহলে একে জনপ্রিয় করে তোলেন।
Related Question
View All-
ক
গোলাম মোস্তফা
-
খ
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
-
গ
কাজী নজরুল ইসলাম
-
ঘ
মোতাহের হোসেন চৌধুরী
-
ক
অন্যতন্ত্র
-
খ
অপরতন্ত্র
-
গ
পরতন্ত্র
-
ঘ
অসমতন্ত্র
-
ক
রাত্রিশেষ
-
খ
কোথাও কোন ক্রন্দন নেই
-
গ
বিমুখ প্রান্তর
-
ঘ
মুহূর্তের কবিতা
-
ক
মদনমোহন তর্কালঙ্কার
-
খ
রামনারায়ন তর্করত্ন
-
গ
কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার
-
ঘ
বিহারীলাল চক্রবর্তী
-
ক
অন্ধকে আলো দেখানো
-
খ
অকারণ অনাসৃষ্টি
-
গ
অতি অহংকার
-
ঘ
নির্বোধকে জ্ঞান দান
-
ক
সরল
-
খ
যৌগিক
-
গ
জটিল
-
ঘ
মিশ্র
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!
Related Question
Question Analytics
মোট উত্তরদাতা
জন