উদ্দীপকের বিষয়টি আমার পাঠ্যবইয়ের ঐতিহাসিক বুশ বিপ্লবের সাথে সাদৃ্যপূর্ণ। বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে রাশিয়াতে পরপর দুটি বিপ্লব সংঘটিত হয়। এশিয়া-ইউরোপ তথা বিশ্বের বৃহত্তম দেশ রাশিয়ার ভূখন্ডে, রাশিয়ার শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়েছিল বলে এটিকে রুশ বিপ্লব বলা হয়। আবার বলশেভিক (সংখ্যাগরিষ্ঠ) দলের নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছিল বলে একে বলশেভিক বিপ্লবও বলা হয়। এটি ছিল বিশ্বের প্রথম সংঘটিত একটি সফল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। আর তাই সমাজতান্ত্রিক আদর্শের দরুন। বিপ্লবটিকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবও বলা হয়। এ বিপ্লব মানবসভ্যতার ইতিহাসকে প্রথম সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়, যা সারা পৃথিবীর মুক্তিকামী, শোষিত, বঞ্চিত, অবহেলিত, নিপীড়িত মানুষকে পুরো বিশ শতক ধরে মুক্তির দিকনির্দেশনা দান করেছে।
বিপ্লবটি প্রথম রাশিয়ায় শুরু হলেও পরে ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। উদ্দীপকে কারখানার উদাহরণটি টেনে ঐতিহাসিক বুশ সমাজতান্ত্রিক (সাম্যবাদী) বিপ্লবটির প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে।
ফ্রেডারিক এঙ্গেলস (Friedrich Engels 1820-1895) (১৮২০-১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দ): তিনি জার্মান দার্শনিক, সমাজবিজ্ঞানী, লেখক, সাংবাদিক ও ব্যবসায়ী ছিলেন। তার পিতা ছিলেন জার্মানের একজন বড় শিল্পপতি। ১৮৪২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন এবং এক বছর সেখানে চাকরি করেন। সেনাবাহিনীতে থাকাকালীন তিনি সমকালীন বিশ্বের রাজনৈতিক ও সামরিক নীতি সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেন। তাকে ও তার বন্ধু কার্ল মার্ক্সকে আধুনিক সমাজতন্ত্র বা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা ও সংগঠক বলা হয়। পুঁজিবাদ ও এর বিকল্প ব্যবস্থা সম্পর্কে তার এবং মার্ক্স-এর ধ্যানধারণা সম্পূর্ণ একই রকম। এজন্য তারা উভয়ে এ বিষয়ের উপর কাজ করতে মনস্থ করেন এবং তাদের বন্ধুত্ব আমৃত্যু টিকে ছিল।
ম্যানচেস্টার শহরের শ্রমিক শ্রেণির ব্যাপক দারিদ্র্য প্রত্যক্ষ করে মর্মাহত হন এবং ১৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দে রচনা করেন The Condition of the Working Class in England'। কার্ল মার্ক্স ও তার যৌথ প্রচেষ্টায় ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে 'The Communist Manifesto' প্রকাশিত হয়। তারা প্রথম ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা হাজির করেন। তিনি কার্ল মার্ক্সকে The Das Capital নিয়ে গবেষণা ও লেখার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা দেন। মার্ক্সের মৃত্যুর পর তিনি মার্ক্সের অনেকগুলো লেখা সম্পাদনা করেন। তাদের এ নতুন মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিভিন্ন দেশে সাম্যবাদী দল গঠিত হতে থাকে।'
কার্ল মার্ক্স (Karl Marx 1818-1883) (১৮১৮-১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দ) প্রভাবশালী জার্মান সমাজবিজ্ঞানী, দার্শনিক ও মার্ক্সবাদের প্রবক্তা। এই মহান ব্যক্তি ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে জার্মানির ট্রায়ার শহরে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম জীবনে হেগেলীয় দর্শনের মেধাবী ছাত্র ও গবেষক, পরবর্তীকালে সামাজিক ও আর্থিক দ্বন্দ্বমূলক সমস্যাগুলোর বিচার সম্পর্কে এক বিপ্লবাত্মক চিন্তাধারার উদ্ভাবক। বিংশ শতাব্দীতে সমগ্র মানবসভ্যতা মার্ক্সের তত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত হয়। তার লেখনী রাশিয়ার শোষিত, নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের মাঝে সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করে শ্রেণিবৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। ফ্রেডারিক এঙ্গেলস ও কার্ল মার্ক্সের উদ্যোগে ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে 'কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো' প্রকাশিত হয়।
১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দে তার শ্রেষ্ঠ পুস্তক 'Das Capital' প্রকাশিত হয়। তার লেখনী পুঁজিপতিদের স্বার্থে প্রচণ্ড আঘাত হানে এবং শ্রমিকদের মনোজগতে এক বিরাট পরিবর্তনের সৃষ্টি করে। স্বৈরাচারী জারতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বলশেভিকদের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ শ্রমিকরা আন্দোলন করে লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় বলশেভিক সরকার প্রতিষ্ঠা করে। ফলে তার প্রবর্তিত সমাজতন্ত্র মতবাদ রাষ্ট্রীয় মতবাদে পরিণত হয়। বলশেভিক বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে অনেক দেশই এই মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। যদিও সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্রের পতনের পর এ তত্ত্বের জনপ্রিয়তা কমে গেলেও তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে মার্ক্সবাদ এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার অন্যান্য বিখ্যাত গ্রন্থ German Ideology. The Economic and Phillosophical Theory। বিখ্যাত এই ব্যক্তি ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। তার সমাধি ফলকে লেখা আছে কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোর শেষ লাইন দুনিয়ার মজদুর এক হও'।'
ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর ইউরোপ ছিল বিপ্লবের জন্মভূমি। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকে শিল্পবিপ্লব সৃষ্টি হয় ইংল্যান্ডে, ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। আবার অষ্টাদশ শতকে ফরাসি বিপ্লব শুরু হয় ফ্রান্সে। এর প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয় সমগ্র ইউরোপসহ সারা বিশ্ব। বিপ্লবের আবহ কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে আবদ্ধ করে রাখা যায় না। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে সৃষ্ট রাশিয়ার বিপ্লব ইউরোপের অন্য দুই বিপ্লবের মতো সৃষ্ট নয়। এ বিপ্লবের নির্দিষ্ট মতবাদ ছিল, লক্ষ্যও ছিল। ধনতন্ত্রের বিপরীতধর্মী লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে এক নির্দিষ্ট আদর্শ বাস্তবায়ন করেছিল এ বিপ্লব। বলশেভিকদের (সংখ্যাগরিষ্ঠ) নেতৃত্বে এ বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল বলে এ বিপ্লবের নাম বলশেভিক বিপ্লব।। কেশদের দ্বারা এ বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল বলে এর আরেক নাম রুশ, বিপ্লবী কৃষক-শ্রমিক ছিল-এ-বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি। সাম্যবাদ বা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে এ বিপ্লব শুরু হয়, যা পরবর্তীকালে বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আদর্শ ও দর্শন হিসেবে আদৃত হয়। এ বিপ্লবের সুদূরপ্রসারী প্রভাবে বিশ্ব দুটি রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র, আরেকটি রাশিয়ার নেতৃত্বে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রসমূহ। লেনিন বিপ্লবের নেতৃত্ব গ্রহণ করে বলশেভিক বিপ্লবকে একটি আদর্শিক ও অনুকরণীয় বিপ্লবে রূপ দেন। বলশেভিক বিপ্লব বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। তাই এ বিপ্লবের গুরুত্ব অপরিসীম। বিষয়টি সম্পর্কে ইতিহাসের শিক্ষার্থীর জ্ঞান থাকা জরুরি। কেননা, বিষয়টির সঙ্গে পরবর্তী আন্তর্জাতিক ইতিই শমষ্টতা রয়েছে।
বলশেভিক বিপ্লব -মোঃ গোলাম মোস্তফা স্যারে এর লেখা বই
রাশিয়ার সমাজ বরাবরই দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। অভিজাত শ্রেণি ও ভূমিহীন শ্রেণি। আর এ অভিজাত শ্রেণির প্রধান ছিলেন জার। তিনি অনেকটা স্বৈরাচারী শাসকের বেশে আবির্ভূত হন। দেশের সকল জমিই থাকত জারের অধীন। তিনি সকল ক্ষেত্রে অবস্থান অধিপতি হিসেবে পরিগণিত হন।
উদ্দীপকে যে বিপ্লবের কথা বলা হয়েছে তা ইতিহাসে বলশেভিক বিপ্লবের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। বিশ শতকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লব। এ বিপ্লবের আগে রাশিয়ার সাধারণ মানুষ সম্রাট তথা জার ও অভিজাতদের হাতে শোষণের শিকার হয়ে আসছিল। বিশেষ করে শ্রমিক ও কৃষক শ্রেণি এবং সাধারণ সৈনিক শ্রেণির মানুষের ন্যূনতম সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার ছিল না। এই অবস্থা থেকে ১৮৯৮ সালে বিপ্লবী দল সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি গঠন করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে রাজনৈতিক এ সংগঠনকে কাজে লাগিয়ে লেনিন বিপ্লবের জন্য তার দলকে প্রস্তুত করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে সৃষ্ট আর্থিক ও সামরিক দুর্ভোগ রাশিয়ার কৃষক, শ্রমিক ও সৈনিকদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে। এরই ফলশ্রুতিতে লেনিনের নেতৃত্বে শ্রমিক, কৃষক ও সেনাবাহিনীর একটা বড় অংশ বিপ্লবে অংশগ্রহণ করে এবং অবশেষে ১৯১৭ সালে বলশেভিক বা বুশ বিপ্লব সংঘটিত হয়।
উদ্দীপকের 'ক' রাষ্ট্রে দেখা যায়, শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি বিপ্লব সংঘটিত হয়। এ বিপ্লবের পিছনে অনেক মহান নেতার অবদান ছিল। 'ক' রাষ্ট্রের মতো বলশেভিক বিপ্লবেও অনেক মহান নেতা অবদান রেখেছেন। বলশেভিক বিপ্লবের সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিল কার্ল মার্কসের লেখনি। এছাড়া লেনিন ট্রটস্কি, লিও টলস্টয়, দস্তয়ভস্কি প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। সুতরাং বলা যায়, 'ক' রাষ্ট্রের বিপ্লবের সাথে বলশেভিক বিপ্লবের সাদৃশ্য রয়েছে।
হ্যাঁ, উক্ত বিপ্লব তথা বলশেভিক বিপ্লব আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভার বিস্তার করেছিল।
সারা পৃথিবীর নির্যাতিত, অবহেলিত ও নিপীড়িত মানুষের মুক্তি সংগ্রামে বলশেভিক বিপ্লব একটি আদর্শ হিসেবে পরিগণিত। 1 বলশেভিক বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে উপনিবেশের জনগণ স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য লড়াই শুরু করে। এ বিপ্লব এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার পরাধীন দেশগুলোতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। ক্রমান্বয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম। বিশ শতকের সারা পৃথবীর স্বাধীনতার লড়াই আর জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে বলশেভিক বিপ্লব ছিল অফুরন্ত প্রেরণার উৎস। মূলত গোটা পৃথিবীর কৃষক ও শ্রমিক সমাজকে শোষণ ও বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে উৎসাহিত করে বলশেভিক বিপ্লব। এ বিপ্লবের - ধারাবাহিকতায় ১৯৪৯ সালে চীনে সংঘটিত হয় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সারা পৃথিবীতে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন একটি প্রধান রাজনৈতিক স্রোতে পরিণত হয়। পৃথিবীব্যাপী সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের কাছে মডেল হিসেবে বিবেচিত ছিল বলশেভিক বিপ্লব।
সুতরাং বলা যায়, এই বিপ্লব শুরু রাশিয়াতেই নয় সারা পৃথিবীর রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে বিশাল প্রভাব বিস্তার করেছিল।
কার্ল মার্কসকে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের জনক বলা হয়। সমাজতন্ত্রকে একটি বিজ্ঞানসম্মত রাজনৈতিক আদর্শে পরিণত করার জন্য তিনি তার জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। রাষ্ট্রীয় নির্যাতন, চরম দারিদ্র্য কিছুই তাকে তার সংগ্রাম থেকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। কার্ল মার্কসের সর্বাপেক্ষা বিখ্যাত গ্রন্থের নাম Das Kapital. এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। তার লেখনীতে উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯১৭ সালে সংঘটিত হয় রুশ বিপ্লব বা বলশেভিক বিপ্লব। পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। আর এসব কারণেই - কার্ল মার্কস বিশ্ব বিখ্যাত হয়ে আছেন।