বলশেভিক বিপ্লব (অধ্যায়-৪)

ইতিহাস ২য় পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.7k

ফ্রেডারিক এঙ্গেলস (Friedrich Engels 1820-1895) (১৮২০-১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দ): তিনি জার্মান দার্শনিক, সমাজবিজ্ঞানী, লেখক, সাংবাদিক ও ব্যবসায়ী ছিলেন। তার পিতা ছিলেন জার্মানের একজন বড় শিল্পপতি। ১৮৪২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন এবং এক বছর সেখানে চাকরি করেন। সেনাবাহিনীতে থাকাকালীন তিনি সমকালীন বিশ্বের রাজনৈতিক ও সামরিক নীতি সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেন। তাকে ও তার বন্ধু কার্ল মার্ক্সকে আধুনিক সমাজতন্ত্র বা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা ও সংগঠক বলা হয়। পুঁজিবাদ ও এর বিকল্প ব্যবস্থা সম্পর্কে তার এবং মার্ক্স-এর ধ্যানধারণা সম্পূর্ণ একই রকম। এজন্য তারা উভয়ে এ বিষয়ের উপর কাজ করতে মনস্থ করেন এবং তাদের বন্ধুত্ব আমৃত্যু টিকে ছিল।

ম্যানচেস্টার শহরের শ্রমিক শ্রেণির ব্যাপক দারিদ্র্য প্রত্যক্ষ করে মর্মাহত হন এবং ১৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দে রচনা করেন The Condition of the Working Class in England'। কার্ল মার্ক্স ও তার যৌথ প্রচেষ্টায় ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে 'The Communist Manifesto' প্রকাশিত হয়। তারা প্রথম ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা হাজির করেন। তিনি কার্ল মার্ক্সকে The Das Capital নিয়ে গবেষণা ও লেখার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা দেন। মার্ক্সের মৃত্যুর পর তিনি মার্ক্সের অনেকগুলো লেখা সম্পাদনা করেন। তাদের এ নতুন মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিভিন্ন দেশে সাম্যবাদী দল গঠিত হতে থাকে।'

কার্ল মার্ক্স (Karl Marx 1818-1883) (১৮১৮-১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দ) প্রভাবশালী জার্মান সমাজবিজ্ঞানী, দার্শনিক ও মার্ক্সবাদের প্রবক্তা। এই মহান ব্যক্তি ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে জার্মানির ট্রায়ার শহরে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম জীবনে হেগেলীয় দর্শনের মেধাবী ছাত্র ও গবেষক, পরবর্তীকালে সামাজিক ও আর্থিক দ্বন্দ্বমূলক সমস্যাগুলোর বিচার সম্পর্কে এক বিপ্লবাত্মক চিন্তাধারার উদ্ভাবক। বিংশ শতাব্দীতে সমগ্র মানবসভ্যতা মার্ক্সের তত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত হয়। তার লেখনী রাশিয়ার শোষিত, নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের মাঝে সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করে শ্রেণিবৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। ফ্রেডারিক এঙ্গেলস ও কার্ল মার্ক্সের উদ্যোগে ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে 'কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো' প্রকাশিত হয়।

১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দে তার শ্রেষ্ঠ পুস্তক 'Das Capital' প্রকাশিত হয়। তার লেখনী পুঁজিপতিদের স্বার্থে প্রচণ্ড আঘাত হানে এবং শ্রমিকদের মনোজগতে এক বিরাট পরিবর্তনের সৃষ্টি করে। স্বৈরাচারী জারতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বলশেভিকদের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ শ্রমিকরা আন্দোলন করে লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় বলশেভিক সরকার প্রতিষ্ঠা করে। ফলে তার প্রবর্তিত সমাজতন্ত্র মতবাদ রাষ্ট্রীয় মতবাদে পরিণত হয়। বলশেভিক বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে অনেক দেশই এই মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। যদিও সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্রের পতনের পর এ তত্ত্বের জনপ্রিয়তা কমে গেলেও তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে মার্ক্সবাদ এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার অন্যান্য বিখ্যাত গ্রন্থ German Ideology. The Economic and Phillosophical Theory। বিখ্যাত এই ব্যক্তি ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। তার সমাধি ফলকে লেখা আছে কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোর শেষ লাইন দুনিয়ার মজদুর এক হও'।'

ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর ইউরোপ ছিল বিপ্লবের জন্মভূমি। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকে শিল্পবিপ্লব সৃষ্টি হয় ইংল্যান্ডে, ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। আবার অষ্টাদশ শতকে ফরাসি বিপ্লব শুরু হয় ফ্রান্সে। এর প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয় সমগ্র ইউরোপসহ সারা বিশ্ব। বিপ্লবের আবহ কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে আবদ্ধ করে রাখা যায় না। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে সৃষ্ট রাশিয়ার বিপ্লব ইউরোপের অন্য দুই বিপ্লবের মতো সৃষ্ট নয়। এ বিপ্লবের নির্দিষ্ট মতবাদ ছিল, লক্ষ্যও ছিল। ধনতন্ত্রের বিপরীতধর্মী লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে এক নির্দিষ্ট আদর্শ বাস্তবায়ন করেছিল এ বিপ্লব। বলশেভিকদের (সংখ্যাগরিষ্ঠ) নেতৃত্বে এ বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল বলে এ বিপ্লবের নাম বলশেভিক বিপ্লব।। কেশদের দ্বারা এ বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল বলে এর আরেক নাম রুশ, বিপ্লবী কৃষক-শ্রমিক ছিল-এ-বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি। সাম্যবাদ বা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে এ বিপ্লব শুরু হয়, যা পরবর্তীকালে বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আদর্শ ও দর্শন হিসেবে আদৃত হয়। এ বিপ্লবের সুদূরপ্রসারী প্রভাবে বিশ্ব দুটি রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র, আরেকটি রাশিয়ার নেতৃত্বে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রসমূহ। লেনিন বিপ্লবের নেতৃত্ব গ্রহণ করে বলশেভিক বিপ্লবকে একটি আদর্শিক ও অনুকরণীয় বিপ্লবে রূপ দেন। বলশেভিক বিপ্লব বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। তাই এ বিপ্লবের গুরুত্ব অপরিসীম। বিষয়টি সম্পর্কে ইতিহাসের শিক্ষার্থীর জ্ঞান থাকা জরুরি। কেননা, বিষয়টির সঙ্গে পরবর্তী আন্তর্জাতিক ইতিই শমষ্টতা রয়েছে।

বলশেভিক বিপ্লব -মোঃ গোলাম মোস্তফা স্যারে এর লেখা বই

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নের উত্তর দাও:

রিমা কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ঘরে বসেই সুতা বুনে এবং নিজের পরিধেয় পোশাক নিজেই তৈরি করে। কিন্তু বৃহৎ কারখানার উদ্ভব তার কাজের ক্ষেত্র বিনষ্ট করে দেয় এবং সে অন্যের শ্রমিকে পরিণত হয়।

পুঁজিবাদের বিকাশ
সামন্ততন্ত্রের বিকাশ
সমাজতন্ত্রের বিকাশ
আমলাতন্ত্রের বিকাশ
উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নের উত্তর দাও:

রিমা কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ঘরে বসেই সুতা বুনে এবং নিজের পরিধেয় পোশাক নিজেই তৈরি করে। কিন্তু বৃহৎ কারখানার উদ্ভব তার কাজের ক্ষেত্র বিনষ্ট করে দেয় এবং সে অন্যের শ্রমিকে পরিণত হয়।

পুঁজিবাদের বিকাশ
সামন্ততন্ত্রের বিকাশ
সমাজতন্ত্রের বিকাশ
আমলাতন্ত্রের বিকাশ
নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নের উত্তর দাও:

শফিক একজন সাহসী ও উদ্যোমী তরুণ। সে নির্বাচনে অংশ্রহণ করে গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দুর্নীতির কথা ফাঁস করে দেয়। ফলে সাধারণ মানুষ বিপুল ভোটে তাকেই জয়যুক্ত করে।

১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই নভেম্বর পুরাতন ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২৫শে অক্টোবর রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির বলশেভিক অংশের নেতৃত্বে সংঘটিত বিপ্লব মানবসভ্যতার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী ঘটনা। ক্ষয়িষ্ণু জারতন্ত্রের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অব্যবস্থা এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদান রাশিয়ার জাতীয় জীবনে যে গভীর সংকটের সৃষ্টি করে তার চূড়ান্ত পরিণতি হচ্ছে এই বিপ্লব, যা সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এককথায় রাশিয়ার সামগ্রিক জীবনে গুণগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এক নতুন যুগের সূচনা করে। এই বিপ্লব রাশিয়ায় সংঘটিত হয়েছিল বলে একে যেমন রুশ বিপ্লব বলা হয়, তেমনি লক্ষ্য ও আদর্শে সমাজতান্ত্রিক ছিল বলে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী অক্টোবর মাসে সংঘটিত হয়েছিল বলে অক্টোবর বিপ্লব এবং বিলশেভিক অংশের নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছিল বলে একে বলশেভিক বিপ্লর নামেও অভিহিত করা হয়। রাশিয়ার শ্রমিক শ্রেণি, কৃষকসমাজ এবং সাধারণ মানুষ বিপ্লবী মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছিল রাশিয়ান কমিউনিস্ট পার্টি তথা বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে, যার মূল নায়ক ছিলেন ভ. ই. লেনিন বা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন। উনিশ শতকে কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলসের বৈজ্ঞানিক সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার প্রথম দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োগ ঘটে রাশিয়ায়। বলশেভিক পার্টির প্রধান নেতা লেনিন মার্ক্সীয় তত্ত্বের অধিকতর বিকাশ ঘটিয়েই বিপ্লবের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন, একইভাবে বিপ্লবের রণকৌশলও নির্ধারণ করেন। রুশ বিপ্লব শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে শুরু হলেও রাষ্ট্রশক্তি দ্বারা বিপ্লব বাধাগ্রস্ত হওয়ার পর সশস্ত্র সংগ্রামের রূপ ধারণ করে। এই বিপ্লব মানবসভ্যতার ইতিহাসে মানুষকে প্রথম সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়, যা সারা পৃথিবীর মুক্তিকামী, শোষিত, বঞ্চিত, অবহেলিত, নিপীড়িত মানুষকে পুরো বিশ শতক ধরে মুক্তির দিকনির্দেশনা দান করেছে।

রদেনটিন নামক ঐতিহাসিকের মতে, ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে রাশিয়ায় প্রকৃতপক্ষে তিনটি বিপ্লব ঘটে। তিনটি বিপ্লবের শেষ পর্যায়ে বলশেভিক দল লেনিনের নেতৃত্বে ক্ষমতা দখল করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে ভূমি ও স্বাধীনতার দাবিতে প্রথম বিপ্লব সংঘটিত হয়। এর ফলে জারতন্ত্রের পতন সূচিত হয়। ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসের বিপ্লবে ডুমা বা রুশ পার্লামেন্টের মাধ্যমে মধ্যবিত্ত ও বুর্জোয়া শ্রেণি ক্ষমতা অধিকার করে। রাশিয়ায় প্রজাতন্ত্র স্থাপিত হয়। এটি ছিল বিপ্লবের দ্বিতীয় ধাপ। ১৯১৭খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে বলশেভিক দল বুর্জোয়াদের বিতাড়িত করে শ্রমিক শ্রেণির সাহায্যে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে, যা ছিল বিপ্লবের শেষ ধাপ।

সামাজিক অবস্থা

আঠারো শতক থেকে ইউরোপের বিশেষত পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে বহুমুখী পরিবর্তন সাধিত হয়। পশ্চিম ইউরোপ হয়ে দাঁড়ায় আধুনিক শিক্ষা, সংস্কৃতি, জীবনধারা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিকাশের কেন্দ্রস্থল। ইউরোপের এই সমাজ বিকাশের গতি থেকে রাশিয়া ছিল অনেক দূরে। বিপ্লবের পূর্বেও রাশিয়াকে আধুনিক ইউরোপ থেকে বিছিন্ন করে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা চালু ছিল। পুঁজিবাদের বিকাশের যুগেও রাশিয়ার গ্রামগুলোকে বর্বরদের আস্তানার সাথে তুলনা করা যেত। রাশিয়ার সকল ভূমিই ছিল রাজপরিবার ও অভিজাতদের দখলে। বিংশ শতকের শুরুতে রাশিয়ার মোট জনসংখ্যার ৭৭% ছিল কৃষক। অথচ জমির উপর কৃষকের মালিকানা ছিল না। পশ্চিম ইউরোপে ফরাসি বিপ্লবের পর সামন্ততন্ত্রের পতন ঘটলে ভূমিদাসরা স্বাধীন কৃষকে পরিণত হয়। রাশিয়ার জার আলেকজান্ডার ভূমিদাসপ্রথার l

বিলোপ সাধন করলেও কৃষকরা ভূমিদাস থেকে ভূমিহীন শ্রেণিতে পরিণত হয়। ভাগ্যের পরিবর্তন না হওয়ায় শিল্পবিপ্লবের পর এ ভূমিহীন শ্রেণিই আবার শহুরে শিল্প শ্রমিকে পরিণত হয়। শ্রমিকদের ১১-১৩ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হলেও তাদের পারিশ্রমিক ছিল খুব কম। শ্রমিকরা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। ফলে তাদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে শ্রমিক ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে। ১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দে যেখানে শ্রমিক ধর্মঘটের সংখ্যা ছিল মাত্র ৯৬, সেখানে ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দে তা ৯,৪৩৩টিতে দাঁড়ায়। এর পরের বছরই ১৯ লাখ ৫ হাজার ১৭৬টি শ্রমিক ধর্মঘট পালিত হয়।

বিপ্লবের পক্ষে রাশিয়ার জনগণের মানসিক প্রস্তুতি সৃষ্টি করেন রুশ সাহিত্যিক গোর্কি, টলস্টয়, দস্তোয়েভস্কি, তুগের্নিভ, আইভান প্যাভলব প্রমুখ। এ সমস্ত সাহিত্যসেবীর লেখায় জনগণের মানসিক চেতনা বেড়ে যায়। ফলে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার প্রতি তাদের দারুণ অবজ্ঞার সৃষ্টি হয়। বুকানন ও কার্ল মার্ক্সের লেখার প্রভাবেও রাশিয়ার অভিজাত ও মালিক শ্রেণির মধ্যে অত্যাচারী জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।

অর্থনৈতিক অবস্থা

বিপ্লবপূর্ব রাশিয়ার অর্থনীতি ছিল শোচনীয় ও পশ্চাৎপদ। কৃষিতে ভূমিদাসপ্রথা ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দে জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার রহিত করলেও সামন্ততান্ত্রিক 'ব্যবস্থার সম্পূর্ণ উচ্ছেদ হয়নি। সংস্কারের পরও গ্রামাঞ্চলে ভূস্বামীদের প্রাধান্য থেকে যায়। ১৯০৬-১৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত জার সরকারের কৃষি অর্থনীতিতে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। বিভিন্ন প্রদেশে বসতি ও চাষাবাদের জন্য যে সকল কৃষককে জোর করে পাঠানো হয়েছিল, ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে তাদের শতকরা ৬০ ভাগ নিজ নিজ স্থানে ফিরে আসে। কৃষকদের মুক্তির পরও তাদের অবস্থা রাশিয়ায় সবচেয়ে শোচনীয় থেকে যায়। একটি সজীব কৃষি অর্থনীতি গড়ে ওঠেনি রাশিয়ায়। সোভিয়েত লেখক ওফর লাইয়ের মতো অন্য অনেক পশ্চিমা বিশেষজ্ঞ এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, জার শাসিত রাশিয়া তার কৃষি সমস্যার সমাধান করতে পারেনি।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দশক থেকে রাশিয়ায় শিল্পের বিকাশ শুরু হয়। রাশিয়ায় রেলপথের দৈর্ঘ্য বাড়ে। দেশি-বিদেশি প্রচুর বিনিয়োগ ঘটে। ভারী শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় রপ্তানি বৃদ্ধির সাথে সাথে দেশে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটে। মস্কো, সেন্ট পিটার্সবার্গ, দানবাস, সোতফ, উরাল, দানিয়েস্ক প্রভৃতি শহর শিল্পসমৃদ্ধ হয়ে উঠতে থাকে। তবু রাশিয়ায় মাথাপিছু শিল্প উৎপাদন জার্মানি থেকে ১৩, ইংল্যান্ড থেকে ১৪ ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২১.৪ গুণ কম ছিল। রুশ শিল্পপণ্যের বৈদেশিক বাজার খুব সীমিত হওয়ায় বিংশ শতাব্দীর শুরুতে অর্থনীতিতে পুনরায় মন্দা শুরু হয়, যা রুশ জনজীবনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পূর্বে রুশ জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন বা অবনমন যা-ই হোক না কেন দেশের অধিকাংশ মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল, যা ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের বলশেভিক বিপ্লবের অন্যতম কারণ।

রাজনৈতিক অবস্থা

(ক) শ্রমিক অসন্তোষ ও শ্রমিক আন্দোলন: ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দের মহাসংস্কারগুলো রাশিয়ায় শিল্পায়নের পথ প্রশস্ত
করেছিল। ফলে রাশিয়ায় একটি শ্রমিক শ্রেণি গড়ে উঠেছিল। কিন্তু বিভিন্ন শ্রম আইন সত্ত্বেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে রুশ শ্রমিকদের দুর্দশা ছিল সীমাহীন। তাদের মজুরি ছিল সামান্য, তাদের শিক্ষা ছিল না, বাসগৃহের অভাব ছিল, অন্য কোনো সুযোগ-সুবিধাও ছিল না। ফলে রাশিয়ায় ক্রমাগত শ্রমিক ধর্মঘট হতে থাকে। ধর্মঘটের আন্দোলন বিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকেই ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এ আন্দোলন ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে বিপ্লবে পরিণত হয়। কিছুকাল এ আন্দোলন স্তিমিত হলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে তা পুনরুজ্জীবিত হয়। ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে ৭,২৫,০০০ শ্রমিক এবং ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে ৮,৮৭,০০০ শ্রমিক বিভিন্ন দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য ধর্মঘট করে। বলশেভিক (সংখ্যাগরিষ্ঠ) ও মেনশেভিকরা (সংখ্যালঘিষ্ঠ) শ্রমিক অন্দোলনে অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। কিন্তু ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে রোমানভ বংশের পতনের পর গঠিত অস্থায়ী সরকার শ্রমিক শ্রেণির অসন্তোষ দমনের কোনো চেষ্টা করেনি, যার সুযোগ গ্রহণ করে বলশেভিকরা শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে বিপ্লব সংঘটিত করে।

(খ) সমাজতান্ত্রিক মতবাদের উদ্ভব ও বিকাশ ইউরোপে শিল্পোন্নয়নের ফলে সমাজে নানামুখী সমস্যার সৃষ্টি হয়। শ্রমিক শোষণ, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, শ্রমিকের বাসস্থানের সমস্যা, শ্রমিক শ্রেণির কাজের সময়, বেতন, ভাতা, ছুটি প্রভৃতি সমস্যার কারণে শিল্পায়িত সমাজে অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে, যার পরিপ্রেক্ষিতে উৎপত্তি হয় সমাজতান্ত্রিক মতবাদের। ব্রিটিশ সমাজতন্ত্রী চার্লস ওয়েন, ফরাসি সমাজতন্ত্রী সেন্ট সাইমন, রাশিয়ার সমাজতন্ত্রী মিখাইল বুকানন সামাজিক অসংগতি ও দুর্গতি অবসানের পথনির্দেশ করেন। তারা ইউরোপের সমাজ ও রাজনীতিতে সমাজতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করলেও কীভাবে সমাজতন্ত্র আসবে সে সম্পর্কে কোনো দিকনির্দেশনা দিতে পারেননি। এজন্য তাদের কাল্পনিক সমাজতন্ত্রী বলা হতো। সমাজতান্ত্রিক মতবাদের বাস্তব রূপরেখা, যৌক্তিক প্রয়োগ ও সমাজতন্ত্র অর্জনের রূপরেখা তুলে ধরেন কার্ল মার্ক্স। কার্ল মার্ক্সের আদর্শ ও নির্দেশিত পথকে সামনে রেখে উনিশ শতকের শেষ দিকে ইউরোপের দেশে দেশে বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি ও সমাজতান্ত্রিক পার্টি গড়ে ওঠে। রাশিয়ার বলশেভিক পার্টি কার্ল মার্ক্সের নির্দেশিত আদর্শের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক দল। লেনিন মার্ক্সের নির্দেশিত পথ ও আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যান এবং রাশিয়ার বিপ্লব সম্পন্ন করেন।

(গ) জারতন্ত্রের অযোগ্যতা: রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লবের পথকে এগিয়ে দিয়েছিল জারতন্ত্রের অযোগ্যতা। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে রাশিয়ায় স্বেচ্ছাচারী জারতন্ত্র নির্যাতন, নিপীড়ন চালিয়েও দেশকে সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছিল না। ১৯০৪-০৫ খ্রিষ্টাব্দের যুদ্ধে জাপানের কাছে পরাজয়ে দেশে জারতন্ত্রের মিথ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। অন্যান্য কারণের সাথে যুক্ত হয়ে ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে রাশিয়ায় বিপ্লব শুরু হয়, লেনিন যাকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের রিহার্সেল বলেছেন। বিপ্লবী শক্তির উত্থান, রাজনৈতিক শক্তির উন্মেষ ও বিকাশ জারতন্ত্রকে সংকটে নিক্ষেপ করে, যা থেকে উত্তরণ সম্ভব হয়নি। ফলে সৃষ্টি হয়েছিল বলশেভিক বিপ্লবের।

(ঘ) সাংবিধানিক ত্রুটি: রাশিয়ার সাংবিধানিক ব্যবস্থা ছিল আসলে মেকি নিয়মতান্ত্রিকতা। কারণ মৌলিক
আইন অনুযায়ী সরকারি প্রশাসন ও মন্ত্রীরা ডুমার কাছে দায়িত্বশীল ছিলেন না। তাছাড়া প্রাথমিক অবস্থায় প্রকৃত চরিত্র যা হোক না কেন ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দের স্বৈরাচারী নির্বাচনি আইন তাকে বিনষ্ট করেছিল। দ্বিতীয় নিকোলাসের কর্তৃত্বপরায়ণ নীতি তাকে অর্থহীন করে দেয়। দ্বিতীয় নিকোলাসের সিংহাসনে আরোহণের ফলে অনেকে মনে করেছিলেন, প্রতিক্রিয়া কমবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। তিনি স্বৈরাচারের নীতিকে রক্ষা করতে দৃঢ়সংকল্প ছিলেন। আর এ ব্যবস্থার স্বাভাবিক পরিণতি গোরেমেকিন ও সুখোমলিনডের মতো ব্যক্তিত্বহীন মন্ত্রী ও রাসপুতিনের মতো উদ্ভট মানুষ। এ ধরনের শাসনব্যবস্থায় অপ্রচুর ভূমি পুনর্বণ্টন ও কয়েকটি বৃহৎ কারখানা তৈরি করে মৌলিক অসাম্য ও ব্যাপক দুর্গতির অবসান করা সম্ভব ছিল না। পুরাতন রাশিয়া তাই বিপ্লবের দিকে এগিয়ে যায়

(ঙ) নাহালজম ও নারোদনিক আন্দোলনের প্রভাব উনিশ শতকের রাশিয়ায় সমাজ পরিবর্তনের জন্য জারবিরোধী অনেক গুপ্ত আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল, গড়ে উঠেছিল গুপ্ত সংগঠন। এই সংগঠনসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নিহিলিজম ও নারোদনিক আন্দোলন। রুশ শব্দ নারোদ অর্থ জনগণ। এ দুটি আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল জার শাসনের অত্যাচার ও শোষণ থেকে দেশাকে মুক্ত করা এবং সাধারণ মানুষের মুক্তিসাধন। এসব 'আন্দোলন ব্যর্থ হলেও তাদের সংগ্রাম ভবিষ্যতের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে দিকনির্দেশনা দিয়েছিল।

(চ) রাজনৈতিক শক্তির উত্থান: রাশিয়ায় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটতে
থাকে। ১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টি (RSDLP) গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল। ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে লন্ডনে উক্ত পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে আন্দোলনের রণকৌশল নিয়ে পার্টি দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের নেতৃত্ব প্রদান করেন লেনিন। এটাকে বলশেভিক পার্টি বলা হয়।
মার্তন্ড ও প্লেখানভের নেতৃত্বাধীন সংখ্যালঘু অংশটিকে মেনশেভিক পার্টি; বলা হয়। এই দল ছিল রাশিয়ার শ্রমিক শ্রেণির দল, যার কর্মসূচির মধ্যে ছিল জারতন্ত্রের পতন, শ্রমিকরাজ প্রতিষ্ঠা ও সমাজ পরিবর্তন। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকেই রাশিয়ার শ্রমিক ও কৃষক শ্রেণির এক সংগঠনে পরিণত হয় বলশেভিক পার্টি। বলশেভিক পার্টিকে গোপন অবস্থায় দেশে ও বিদেশে জারতন্ত্র উৎখাতের জন্য আন্দোলন করতে হয়। বলশেভিক পার্টি ইন্দ্রা, ক্রদ, প্রলেতারি, প্রাভদা প্রভৃতি পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে ব্যাপক মানুষকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলে।

(ছ) প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদান অনেক ঐতিহাসিক মনে মনে করেন, করেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ রাশিয়ার সামগ্রিক সর্বনাশ ডেকে এনেছিল এবং বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করেছিল। রুশ সাম্রাজ্যের কাঠামোকে শেষ ধাক্কা দিয়েছিল এ যুদ্ধ, যাতে দেশের আর্থসামাজিক কাঠামো মুখ থুবড়ে পড়েছিল। এর কারণ যুদ্ধ গোটা রুশ জাতির উপর অসহনীয় বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিল। অসংখ্য মানুষ হতাহত হয়েছিল। সম্পত্তি ও বেসামরিক মানুষের ক্ষতির পরিমাণ ছিল ব্যাপক। পরিবহনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। প্রচণ্ড মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিয়েছিল। ফলে চরম অশান্তি, বিশৃঙ্খলা ও দুর্ভিক্ষের দায় গিয়ে পড়ে জারতন্ত্র ও মিত্রদেশগুলোর উপর। বলশেভিকরা এই যুদ্ধকে সাম্রাজ্যবাদী, আগ্রাসী, আদর্শবিহীন ও জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়া বলে অভিহিত করে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানায়। যুদ্ধ যতই দীয়স্থায়ী হতে লাগল, বলশেভিক পার্টির বক্তব্যের যথার্থতা ততই প্রমাণিত হতে লাগল এবং জনগণের অসন্তোষও বাড়তে লাগল্প; যার ফল হচ্ছে ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসের বিপ্লব।

ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন ও প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ঘটনাপ্রবাহ

১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের মার্চের বুর্জোয়া বিপ্লব রাশিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি পাল্টে দেয়। ডুমা'র সদস্যদের দ্বারা অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়। কেরোনেস্কির মতো মধ্যপন্থি থেকে রক্ষণশীল নেতারা এতে যোগ দেন। কিন্তু বলশেভিকদের এই সরকারের প্রতি বিন্দুমাত্র আস্থা ছিল না। ফলে তারা শ্রমিক শ্রেণির প্রতিনিধি নিয়ে সোভিয়েত (পরামর্শসভা) গঠন করে। সেভিয়েতগুলো রুশ সমাজতন্ত্রের পার্লামেন্টে পরিণত হতে থাকে। দেশে কার্যত একটি দ্বৈত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। বলশেভিক পার্টি সোভিয়েতগুলোকে অধিকতর ক্ষমতাদানের দাবি জানাতে থাকে। তারা মনে করত, বুর্জোয়া শ্রেণির 'দ্বারা গঠিত সরকার বুর্জোয়াদের স্বার্থ রক্ষা করবে, শ্রমিকদের নয়। শ্রমিক শ্রেণির দ্বারা সরকার গঠিত না হলে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে না। এদিকে, বলশেভিক l

নেতা লেনিন ৩রা এপ্রিল সুইজারল্যান্ডের নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে এসে তার বিখ্যাত 'এপ্রিল থিসিস' ঘোষণা করে বলেন-

১। মার্চ বিপ্লবে বুর্জোয়া শ্রেণির বিজয় হয়েছে। এতে শ্রমিকদের সন্তুষ্ট হওয়ার কিছু নেই।
২। বুর্জোয়া বিপ্লব ও শ্রমিক বিপ্লব একসাথে চলতে থাকবে এবং শেষ পর্যন্ত শ্রমিকরা ক্ষমতা দখল করবে।
৩। শ্রমিকদের স্বার্থে এখনই ক্ষমতা দখল করতে হবে।
৪। যুদ্ধে রুশ জনগণ কোনো সাহায্য করবে না। সৈনিকরা সোভিয়েত সরকারের সাথে সহযোগিতা না করলে তাদের ফল ভোগ করতে হবে।

এদিকে, এপ্রিল থেকে নভেম্বরের মধ্যে দ্রুত রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে থাকে। অস্থায়ী সরকার জনগণকে আস্থায় না নিয়ে একের পর এক গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নিতে থাকে, যার সুযোগ গ্রহণ করেন লেনিন ও তার দল। বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে রাশিয়ার সংকট বাড়তে থাকে। মে মাসে কেরোনেস্কিকে সমরবিষয়ক মন্ত্রী নিযুক্ত করেও যুদ্ধে রুশ বাহিনীর বিশৃঙ্খলা দূর করা সম্ভব হয়নি। দেশে গণবিক্ষোভ বাড়তে থাকে। জুলাই মাসে কঠোর বিক্ষোভের মুখে চরম দমননীতি পরিচালিত হয়। কেরোনেস্কিকে ২১শে জুলাই প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করা হয়। রাশিয়ার বিভিন্ন প্রদেশে কৃষক বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। কৃষকরা জমিদারদের ভূসম্পত্তি দখল করতে শুরু করে। পেট্রোগ্রাডে নতুনভাবে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। লেনিন শ্রমিক-কৃষকদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। কেরোনেস্কি ১লা আগস্ট কার্নিলভকে সেনাধ্যক্ষ নিযুক্ত করেন। প্রথম দিকে উভয়ের মধ্যে সহযোগিতামূলক মনোভাব থাকলেও কার্নিলভের বেসামরিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করার নীতি উভয়ের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত করে। কেরোনেস্কি কার্নিলভকে দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়ে 'বলশেভিক' ও 'সোভিয়েতদের' দেশরক্ষার জন্য আহ্বান করেন। এতে কার্নিলভকে প্রতিরোধ করার নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পায় বলশেভিকরা। বলশেভিকদের প্রভাব ছিল সেনাবাহিনীতে। পেট্রোগ্রাডের কাছাকাছি কার্নিলভের বাহিনী সোভিয়েতের বিপ্লবী প্রতিনিধিদের মুখোমুখি হয়। এই বাহিনীর একদিকে যেমন বিশেষ মনোবল ছিল না, তেমনি নিজেদের দেশের মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার স্পৃহাও ছিল না। সুতরাং তারা অস্থায়ী সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করে। কার্নিলভকে বন্দি করা হয়। ১৪ই সেপ্টেম্বর কেরোনেস্কি রাশিয়াকে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেন। লেনিন এই পরিস্থিতিতে কেরোনেস্কির সরকারকে যথার্থ বলে মনে করেননি। তার কোনো সন্দেহ ছিল না যে, তার একমাত্র কর্তব্য হলো সব বিরোধিতা চূর্ণ করে পার্টিকে বিজয়ের পথে নিয়ে যাওয়া। কার্নিলভের পরাজয় ও অস্থায়ী সরকারের নিঃশেষ অবস্থা তাকে সেই সুযোগ এনে দেয়। তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, ক্ষমতা দখলের সময় এসেছে। ফিনল্যান্ড থেকে চিঠি লিখে পার্টিকে বিদ্রোহের জন্য প্রস্তুত হওয়ার জরুরি নির্দেশ দেন। কিন্তু পার্টির নেতাদের মধ্যে এ বিষয়ে ঐকমত্য ছিল না। ট্রটস্কি লেনিনকে সমর্থন করেন এবং বিদ্রোহের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেন। বলশেভিক পার্টি গোপনে সশস্ত্র পন্থায় ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। অক্টোবর মাসে ৬২টি শহরে প্রায় দুই লাখ 'লালফৌজ' প্রস্তুত হতে থাকে। পেট্রোগ্রাডে মূলশক্তির সমাবেশ ঘটানো হয়। অস্থায়ী সরকার বলশেভিকদের সামরিক প্রস্তুতির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা অবলম্বন করতে পারেনি। ২৪শে অক্টোবর সরকার বলশেভিক পার্টির অফিস আক্রমণ করবে- এ খবরে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে।

বলশেভিকদের ব্রিগেডগুলো সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহ দখল করে নেয়। কিন্তু তাদের বিশেষ কোনো প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়নি। ২৫শে অক্টোবর সকালে রাশিয়ার ক্ষমতা সোভিয়েতদের হাতে চলে আসে। বলশেভিক পার্টি ক্ষমতা গ্রহণ করে। লেনিনের নেতৃত্বে গঠিত হয় সমাজতান্ত্রিক সরকার। মার্ক্সীয় সমাজতন্ত্রের ভিত্তিতে ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে অস্থায়ী সোভিয়েত সংবিধান রচিত ও গৃহীত হয়। ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে অস্থায়ী সংবিধান বাতিল করে একটি স্থায়ী সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। স্থায়ী ও নতুন সংবিধানে দেশের শাসনক্ষমতা ৪টি সংস্থার উপর ন্যস্ত করা হয়। নতুন সংবিধানে রাশিয়ার নামকরণ করা হয় USSR (ইউনিয়ন অব সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক)। সাম্রাজ্যের পরিবর্তে সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্রে পরিণত হয়।

সমাজতন্ত্র ও বলশেভিক বিপ্লব

ঊনবিংশ শতাব্দীতে গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের ন্যায় সমাজতন্ত্রের আন্দোলন শুরু হয়। রুশ বিপ্লব বা বলশেভিক ছিল প্রথম সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিপ্লব। রাশিয়ায় অর্থনৈতিক অসাম্য দূর করে শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষা ও অবহেলিত জনগণের উন্নতিসাধনের ইচ্ছা থেকে সমাজতন্ত্রের উদ্ভব। শিল্পবিপ্লবের ফলে নানা রকম শিল্পকারখানা নির্মিত হওয়ার সাথে সাথে প্রত্যেক দেশের জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধি পেতে থাকে। বণ্টনব্যবস্থার ত্রুটিজনিত কারণে সমাজে পুঁজিপতি তথা পুঁজিবাদের উদ্ভব হয়। পুঁজিপতিরা ক্রমেই বিত্তশালী হতে থাকলে সমাজে পুঁজিপতি ও শ্রমিকের মধ্যে শ্রেণিবৈষম্য দেখা দেয়।

শ্রমিকরা কঠোর পরিশ্রম করেও দরিদ্রভাবে জীবন যাপন করত। তাদের ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করা হতো। ফলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পুঁজিপতি ও শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে বিরাট অর্থনৈতিক বৈষম্য দেখা দেয়। মুষ্টিমেয় ধনী ও সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক-শ্রমিকদের মধ্যে অর্থনৈতিক সামঞ্জস্যবিধানের প্রচেষ্টা থেকেই সমাজতন্ত্রের উদ্ভব। সমাজতন্ত্রবাদের অর্থ হলো গণতন্ত্রের ভিত্তিতে স্থাপিত সমাজ কর্তৃক উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ ও সুষ্ঠুভাবে আয় বণ্টনব্যবস্থা। অর্থাৎ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই সমাজতন্ত্রের উদ্ভব। সমাজতন্ত্র বলতে এমন এক ধরনের শাসনব্যবস্থা বোঝায় যেখানে সব জনসাধারণ ভূমি ও অন্যান্য উৎপাদনশীল সম্পত্তির মালিক থাকে এবং তাদের পক্ষ থেকেই রাষ্ট্র সেসব সম্পত্তি পরিচালনা করে। উৎপাদন ও বিনিময়মাধ্যমগুলোর সমষ্টিগত মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণই সমাজতন্ত্রের মূলকথা।

সমাজতন্ত্রের প্রসার

সমাজতন্ত্রের নানা জটিলতা ও অনিশ্চয়তা মার্ক্স অনেকখানি পরিষ্কার করে তাকে ইউরোপে সমাদৃত করে তুলেছিলেন। মার্ক্সবাদ ইউরোপে একটি শক্তিশালী প্রভাবে পরিণত হয়। ইংল্যান্ডে সমাজতন্ত্র শান্তিপূর্ণভাবে গড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছিল। তাই মার্ক্সবাদের বৈপ্লবিক স্বরূপ ইংল্যান্ডে জনপ্রিয় হতে পারেনি। ফ্যাবিয়ান সোসাইটি ও ইনডিপেনডেন্ট লেবার পার্টির মাধ্যমে ইংল্যান্ডে নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

ফ্রান্সে সিন্ডিকেলিস্টরাই ছিল শক্তিশালী। তারা মার্ক্সবাদের বিরোধিতা করে, কারণ 'প্রোলেতারিয়েত ডিক্টেটরশিপ' গণতন্ত্রবিরোধী ছিল। বেবেউফ-এর নেতৃত্বে ফ্রান্সে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলতে থাকে। সমাজতন্ত্র জার্মানিতে সর্বপ্রথম জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির মতো ইউরোপীয় অন্যান্য রাষ্ট্রেও মার্ক্সবাদ প্রচার করার জন্য ক্রমশ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। বিসমার্কের মতো প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিবিদ সমাজতন্ত্রের প্রসার রোধে জার্মানিতে কয়েকটি আইন বিধিবদ্ধ করেন।

মোটকথা, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বেই ৪০ বছরব্যাপী শ্রমিক আন্দোলন ইউরোপের মূল ঘটনা ছিল এবং সমাজতন্ত্র প্রসারের ফলে সর্বত্র শ্রমিককল্যাণমূলক বহু আইনও রচিত হয়েছিল। পররাষ্ট্র ব্যাপারে অবশ্য সমাজতন্ত্র বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। উগ্র জাতীয়তাবাদের দ্বারা সমাজতন্ত্র বহুলাংশে ক্ষুণ্ণ হয়েছিল। ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত সমাজতন্ত্র সকলের কাছে আদর্শস্বরূপ ছিল। কিন্তু রাশিয়ায় ১৯১৭খ্রিষ্টাব্দের পূর্বেই শ্রেণিসংগ্রাম অনিবার্য হয়ে উঠলে সাম্যবাদ বলশেভিকদের দ্বারা বিপ্লবের আকার ধারণ করে। ফলে সমাজতন্ত্রবাদের কার্যকারিতা সম্পর্কে আর কোনো সন্দেহ থাকল না।

সমাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য

প্রধান সমাজতান্ত্রিকদের মতে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য হলো:

  • ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে সামাজিক স্বার্থের প্রাধান্য;
  • পুঁজিবাদের বিলোপ;
  • সকল ক্ষেত্রে সম-অধিকার;
  • ব্যক্তিমালিকানার উচ্ছেদ;
  • উৎপাদনব্যবস্থা দ্রুত রাষ্ট্রীয়করণ এবং
  • সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন।

প্রতিফলন ঘটেনি বলশেভিক বিপ্লবের ফলে এসব বৈশিষ্ট্যের মার্ক্সীয় মতবাদের দ্বারা লেনিনের মাধ্যমে।

মার্ক্স ও এঙ্গেলসের সমাজতান্ত্রিক মতবাদ

আধুনিক সমাজতন্ত্রের প্রধান উদ্যোক্তা হলেন কার্ল মার্ক্স। জার্মানির এক মধ্যবিত্ত ইহুদি পরিবারে ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই মে জার্মানির টিয়েরে কার্ল মার্ক্সের জন্ম হয়। জার্মানির বন ও বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভের সময় তিনি হেগেলের চিন্তাধারার দ্বারা প্রভাবিত হন। যৌবনে তিনি জার্মানির গণতান্ত্রিক বিপ্লবে যোগ দিয়েছিলেন। ১৮৪২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি একটি উগ্রপন্থি সংবাদপত্রের সম্পাদনা করলে প্রুশিয়ার সরকারের বিরাগভাজন হন। ফলে তিনি জার্মানি ত্যাগ করে প্যারিসে বসবাস শুরু করেন। সেখানেই তার ভবিষ্যৎ সহকর্মী ফ্রেডারিক এঙ্গেলসের সাথে পরিচয় ঘটে। আধুনিক সমাজতন্ত্র বা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা ও সংগঠক বলা হয় তাদের। তারা উভয়েই ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো প্রকাশ করলে পুঁজিপতিদের স্বার্থে প্রচণ্ড আঘাত লাগে এবং শ্রমিকদের মনোজগতে এক বিরাট পরিবর্তনের সৃষ্টি হয়। মেনিফেস্টোতে (ইশতেহারে) বলা হয়, "শৃঙ্খল ছাড়া প্রলেতারিয়েতের হারানোর কিছু নেই। জয় করার জন্য তাদের রয়েছে একটি বিশ্ব।" ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দে তারা পৃথিবীর সকল সমাজতন্ত্রীকে একত্রিক করার উদ্দেশ্যে একটি আন্তর্জাতিক সমিতি গঠন করেন। এটিকে পৃথিবীর প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন বলা হয়। এ সম্মেলন ছিল সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে বেগবান ও শক্তিশালী করার এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ।

১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দে মার্ক্স তার শ্রেষ্ঠ পুস্তক 'Das Capital' প্রকাশ করেন। সমাজতন্ত্রের নতুন রূপ অর্থাৎ সাম্যবাদ এ পুস্তিকায় সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়। এর প্রথম কথাই হলো, "মনুষ্যসমাজের ইতিহাস শ্রেণি সংগ্রামের নামান্তর মাত্র।"" তিনি এ পুস্তকে সমাজতন্ত্রের (Socialism) পরিবর্তে Communism নামটি ব্যবহার করেন। এ পুস্তক অর্থনীতি ও রাজনীতির ক্ষেত্রে এক নতুন মতবাদ ও দিকনির্দেশনা দিলে এর প্রভাবে বিভিন্ন দেশে সাম্যবাদী দল গঠিত হতে থাকে।

তার প্রবর্তিত সমাজতন্ত্রের বা সমাজতন্ত্রবাদের মূল সূত্র চারটি-

প্রথমত: তার মতে, প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বর্তমান যুগ পর্যন্ত মানুষের জীবনের মূলভিত্তি হলো অর্থনীতি এবং ইতিহাস হলো মানুষের অর্থনৈতিক জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতের বিবরণমাত্র।
দ্বিতীয়ত: মার্ক্স সমাজকে বিত্তশালী পুঁজিবাদী শ্রেণি ও বিত্তহীন শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। এ দুই শ্রেণির মধ্যে সংঘর্ষ অনিবার্য এবং সংঘর্ষের ফলে শ্রেণিহীন সমাজের অভ্যুদয় ঘটবে।
তৃতীয়ত: তিনি রিকার্ডোসহ ইংরেজ অর্থনীতিবিদদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে 'উদ্বৃত্ত অর্থনীতি' নামক মতবাদ প্রচার করেন। এ মতবাদের মূলকথা হলো, অর্থ শ্রমিকের পরিশ্রম থেকে উদ্ভূত। কোনো দ্রব্যের মূল্য নির্ধারণের প্রকৃত মাপকাঠি হলো শ্রম। সুতরাং শ্রমের মাপকাঠি দ্বারাই অর্থের বণ্টন হওয়া উচিত।
চতুর্থত: তার মতবাদ অনুসারে শ্রমিকের কোনো দেশ নেই। সকল দেশের শ্রমিকরাই বঞ্চিত ও নির্যাতিত। সুতরাং দেশ ও জাতি-নির্বিশেষে সকল শ্রমিকই সম্মিলিতভাবে শ্রেণি সংগ্রাম চালাবে।
নানা সমালোচনা থাকলেও মার্ক্স ও এঙ্গেলসের আধুনিক সমাজতান্ত্রিক মতবাদের একটি আন্তর্জাতিক আবেদন আছে।

বলশেভিক বিপ্লব-মোঃ গোলাম মোস্তফা স্যারে এর লেখা বই

Content added By

ফরাসি বিপ্লবে যে রকম দার্শনিকদের একটা ভূমিকা ছিল, বলশেভিক বিপ্লবেও রুশ সাহিত্যিকদের অবদান ছিল। তবে বলশেভিক বিপ্লবের দার্শনিক মূলত কার্ল মার্ক্স, এঙ্গেলস, বুকানন প্রমুখ। তাদের লেখনী রাশিয়ার অবহেলিত ও বঞ্চিত শ্রমিকদের মধ্যে সকল ক্ষেত্রে অসাম্য দূর করে সাম্য প্রতিষ্ঠার প্রেরণা দেয়। সকল দিক দিয়ে বঞ্চিত, অবহেলিত শ্রমিকরা সুসংগঠিত হয়ে ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় আন্দোলনমুখী হয়। তবে শ্রমিকদের মধ্যে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে অসন্তুষ্ট ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পেছনে মার্ক্সের Das Capital-এর ভূমিকা খুব অল্প পরিমাণে ছিল। কেননা রাশিয়ার শ্রমিকরা ছিল অশিক্ষিত। তাই Das Capital-এর মর্মবাণী বোধগম্য করে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনমুখী হয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মতো ধী-শক্তি বা সৃজনী শক্তি তাদের ছিল না।

টমাস ম্যুর (১৪৭৮-১৫৩৫ খ্রিষ্টাব্দ) [Thomas More (1478-1535)]: সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার কাল্পনিক ধারণা প্রথম দেন ব্রিটিশ লেখক টমাস ম্যুর (১৪৭৮-১৫৩৫ খ্রিষ্টাব্দ) তার লেখা 'Utopia' গ্রন্থে। ১৫১৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত 'ইউটোপিয়া' গ্রন্থে টমাস ম্যুর দুজন ব্যক্তির একটি কাল্পনিক দ্বীপে বসবাসের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন, যে দ্বীপের সবকিছুর মালিক দ্বীপের অধিবাসীরা। ম্যুর একটি কাল্পনিক সমাজের বর্ণনা দেন, যেখানে সবাই শ্রম দেয় এবং কারও কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নেই। এ দ্বীপে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী নেই, শ্রমশোষক ব্যক্তি নেই। এখানে সব মানুষের সুখ-শান্তির দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তার বিখ্যাত উক্তি "The King's good servant, but God's first." তার সমাজতান্ত্রিক চিন্তা আলোর মুখ না দেখলেও তার চিন্তাধারার উপর ভিত্তি করেই পৃথিবীতে সমাজতন্ত্র মতবাদের সৃষ্টি হয়েছে। তাই তাকে কাল্পনিক বা আদি সমাজতন্ত্রের জনক বলা হয়। ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে মার্ক্স ও এঙ্গেলসের যৌথ প্রচেষ্টায় ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ প্রকাশিত হলে সমাজতন্ত্রের ইউটোপীয় অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে।

মিখাইল বুকানন (১৮১৪-১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দ) [Mikhail Bakunin (1814-1876)]: মিখাইল বুকানন ১৮১৪ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে রাশিয়ায় এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কিশোর বয়সেই তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৮৪২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি The Reaction in Germany' নামের একটি প্রবন্ধ লিখে সমাজতান্ত্রিক যুবসমাজ ও আন্ডারগ্রাউন্ড কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেন। এ রচনার মূল বক্তব্য ছিল- 'ধ্বংসের মাধ্যমেই নতুন সৃষ্টির উদ্ভব।' দীর্ঘদিন তিনি ইউরোপের দেশগুলোতে সমাজতন্ত্রের জন্য বৈপ্লবিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। তাকে স্যাক্সনিতে গ্রেফতার করা হয় এবং মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। অস্ট্রিয়ার অনুরোধে তার মৃত্যুদণ্ড যাবজ্জীবনে রূপান্তর করে অস্ট্রিয়ায় হস্তান্তর করা হয়। দীর্ঘ কারাভোগের পর তিনি সাইবেরিয়া হয়ে লন্ডনে আসেন। বুকানন ছিলেন নৈরাজ্যবাদী। তার মতে, ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মুষ্টিমেয় লোক বৃহত্তর জনগণকে শোষণ করে, যা একটি বৈষম্যমূলক অন্যায়। গির্জা সম্পর্কে তার ধারণা হলো- গির্জা মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ করে। গির্জা হলো একটি শোষণমূলক সংস্থা। তার ধারণা হলো, মানুষ মৌলিকভাবে সৎ হলেও বিভিন্ন সংস্থা দ্বারা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়েছে। Official Power সর্বদাই দুর্নীতিপরায়ণ, এমনকি মহত্তম ব্যক্তিদের অফিসার পদে নিয়োগ করা হলেও। এজন্য তিনি সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থার বিলুপ্তি কামনা করেন। রাষ্ট্রের হাতে ক্ষমতা না রেখে একটি গোপন আন্তর্জাতিক সংস্থা গড়ে তোলার উপর মত দেন, যে সংস্থার জাতীয় শাখা থাকবে এবং জাতীয় সব বিষয় দেখভাল করবে। এটি আন্তর্জাতিক সংস্থার অধস্তন হিসেবে কাজ করবে। তার নৈরাজ্যবাদী মতবাদ সেকালে তরুণসমাজের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

কার্ল মার্ক্স (১৮১৮-১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দ) [Karl Marx (1818-1883)] ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলস (১৮২০-১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দ) (Friedrich Engels (1820-1895)]: সমাজতন্ত্র সম্পর্কে মানুষ যাদের অনুসরণ করে তাদের মধ্যে কার্ল মার্ক্স ও এঙ্গেলসের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কার্ল মার্ক্স ও এঙ্গেলস একই সাথে ইতিহাস, অর্থনীতি ও দর্শনের উপর পর্যালোচনা করেন। তারা উভয়েই ইউরোপের বিপ্লবী উত্থানের ফলে সর্বহারা শ্রেণির নেতৃত্বে বিপ্লব সংঘটিত করার মধ্য দিয়েই সংগ্রাম নিষ্পত্তি হতে পারে বলে অভিমত দেন। মার্ক্স ছিলেন জটিল তাত্ত্বিক বিষয়াবলির সমাধান সহজভাবে করতে পারদর্শী আর এঙ্গেলস ছিলেন ব্যাপক মানুষের নিকট তা উপযোগী করে লিখতে সিদ্ধহস্ত। পুঁজিবাদের বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তাদের ধ্যানধারণা একই রকম হওয়ায় তাদের বন্ধুত্ব আমৃত্যু টিকে ছিল। তারা পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার শোষণ থেকে মুক্তির জন্য শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম একদিন বিপ্লবের মাধ্যমে চূড়ান্ত পরিণতি অর্জন করবে বলে ধারণা প্রদান করেন। মার্ক্স তার 'Das Capital' সহ অসংখ্য গ্রন্থে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার শোষণ থেকে মুক্তির জন্য শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণে বিপ্লব অনিবার্য বলে মত দেন। এঙ্গেলস তার চিন্তাধারাকে আরও বিস্তৃত করেন। মার্ক্সের শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার বিপ্লবী তত্ত্ব সমগ্র ইউরোপের বুদ্ধিজীবী মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে। তাদের সমাজতন্ত্র সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক মতবাদের অনুপ্রেরণা রুশ বিপ্লব সংঘটনের অন্যতম কারণ।

১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে তারা সম্মিলিতভাবে বিখ্যাত পুস্তক 'কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো' (Communist Menifesto) প্রকাশ করেন। এ গ্রন্থে তারা এই প্রথম ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা হাজির করেন। তারা এ গ্রন্থে বলেন, শ্রেণিসংগ্রামের মাধ্যমে বুর্জোয়াতন্ত্রকে খতম করে সর্বহারার একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করাই কমিউনিস্ট আন্দোলনের লক্ষ্য। তাদের উদ্দেশ্য হলো এমন এক শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে সম্পদের উপর ব্যক্তিগত মালিকানা থাকবে না।

তবে শ্রমিকরা ফরাসি বিপ্লবের মূল বাণী সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে বলশেভিক বিপ্লব সৃষ্টি করেনি। মূলত শ্রমিকরা প্রেরণা পেয়েছিল কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো থেকে। মার্ক্সের আধুনিক সমাজতন্ত্রের মূলবাণী তাদের মনোজগতে বিপ্লবের মানসিক প্রস্তুতির ক্ষেত্র তৈরি করতে সহায়ক হয়েছিল। আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংঘ প্রতিষ্ঠিত হলে বঞ্চিত ও ক্ষুব্ধ শ্রমিক পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা
পেয়েছিল। শ্রমিকরা মূলত সমাজতান্ত্রিক নেতৃবৃন্দের বক্তৃতামালা, গণসংযোগ দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে সংঘবদ্ধ হয়। ফলে স্বৈরাচারী জারতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থাৎ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বলশেভিকদের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ শ্রমিকরা আন্দোলন শুরু করে। কাজেই মার্ক্সের লেখনীর প্রভাব শ্রমিকদের মধ্যে তেমন একটা ছিল না। মার্ক্সের লেখনীর প্রভাব শিক্ষিত শ্রেণির একাংশ ও অভিজাত-মালিক শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। শিক্ষিত শ্রেণির একাংশ মার্ক্সবাদের প্রভাবে সমাজতন্ত্রের দীক্ষা নিলেও রাশিয়ার জনগোষ্ঠীর বৃহৎ অংশ নেয়নি।
'ঊনবিংশ শতকের তৃতীয় দশকে ইউরোপে কতিপয় সমাজতন্ত্রী বুদ্ধিজীবীর আবির্ভাব হয়। যেমন- রবার্ট ওয়েন, টমাস হজস্কিন, ফেবিয়ার প্রমুখ সমাজতন্ত্রীর আদর্শ ছিল এমন এক সমাজ স্থাপন করা, যে সমাজে সকলেই যোগ্যতানুসারে কাজ করবে এবং সকলের শ্রম দ্বারা লব্ধ আয় সকলের মধ্যে ন্যায্যভাবে বণ্টন করা হবে। এ সকল সমাজতন্ত্রী ফরাসি বিপ্লবের দার্শনিকদের দ্বারা প্রভাবান্বিত ছিলেন। কিন্তু তাদের দর্শন বা আদর্শগত চিন্তাধারা রুশ বিপ্লবের শ্রমিকদের তেমন একটা প্রভাবিত করেনি। কেননা রুশ বিপ্লবের পূর্ববর্তী সময়ে অর্থাৎ জার আমলে রাশিয়ায় বাইরের লেখনীর অনুপ্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। তবে সমাজতন্ত্রকে রাজনৈতিক আদর্শে পরিণত করতে তাদের লেখনীর ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ সাহিত্যিকদের বিপ্লব সৃষ্টিতে উল্লেখ করার মতো অবদান ছিল। মেক্সিম গোর্কি, টলস্টয়, বুকানন, তুর্গেনিভ, পেভলভ, দস্তোয়েভস্কি প্রমুখের সাহিত্যকর্ম শিক্ষিত রাশিয়ানদের মধ্যে বিপ্লবপূর্ব সময়ে মানসিক প্রস্তুতির পটভূমি সৃষ্টিতে সহায়ক হয়েছিল, যা পরবর্তীকালে শ্রমিকদের মধ্যে সংক্রামিত হয়। তাদের লেখার প্রভাবে স্বৈরাচারী জারতন্ত্রের অসংগতিগুলো শিক্ষিত সমাজের মাধ্যমে সাধারণ শ্রমিকদের দৃষ্টিগোচর হয় এবং জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে অসন্তোষের উদ্ভব হয়। মার্ক্সের প্রতিষ্ঠিত শ্রমিক সংঘের প্রভাবে সংক্ষুব্ধ ও ঐক্যবদ্ধ শ্রমিকরা জারতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলন শুরু করে, যার চূড়ান্ত প্রতিফলন বলশেভিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। কাজেই বলশেভিক বিপ্লবের দার্শনিক বলতে মার্ক্স, বুকানন এবং রাশিয়ার সেই সাহিত্যিকদের বোঝায় যাদের লেখনী অনাচারপূর্ণ সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিপীড়িত জনগণের মনে জারবিরোধী ক্ষোভের সঞ্চার করতে সহায়ক হয়েছিল।

বলশেভিক বিপ্লব-মোঃ গোলাম মোস্তফা স্যারে এর লেখা বই

Content added By

সমাজতন্ত্রের ইতিহাসে যেসব মনীষী মার্ক্স ও এঙ্গেলসের চিন্তাধারাকে ধর্মীয় বিশ্বাসের মর্যাদা দিয়ে বরণ করে নিয়েছেন এবং যারা তাদের প্রতিটি চিন্তায় ও কর্মে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে মার্ক্সবাদের আদর্শকে বাস্তবে রূপায়িত করার প্রয়াস পেয়েছেন, লেনিন তাদের অন্যতম। রুশ বিপ্লবের এ মহানায়ক ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে ২২শে এপ্রিল কাজান প্রদেশের ভলগা নদীতীরবর্তী সিমবিস্ক নামক স্থানে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। লেনিনের পরিবার বিপ্লবী হিসেবেই খ্যাত। তার ভাই আলেকজান্ডার রুশ জারকে হত্যা করার অপরাধে ফাঁসিমঞ্চে প্রাণ দিয়েছিলেন। তার অপর ভাই ও দুই বোন রাজনৈতিক কারণে পুলিশের নজরবন্দি ছিলেন। লেনিন ছাত্রাবস্থায় ছাত্র আন্দোলনে জড়িয়ে পড়লে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হন। পরবর্তীকালে বিপ্লবী দলে যোগ দেওয়ার অপরাধে সাইবেরিয়ায় নির্বাসন দণ্ড ভোগ করেন। কাজেই সমসাময়িক রাজনীতি ও সমাজের নানা ঘটনা তার কিশোর মনকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। মার্ক্স ঐতিহাসিক বস্তুবাদের নিরিখে শ্রেণিহীন ও শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার যে তত্ত্ব দিয়েছিলেন, তাকে ধারণ করে লেনিন বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে একটি শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করেন। ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে বলশেভিক বিপ্লবের মাধ্যমে তার দল সোশ্যাল ডেমোক্রেটিকের চূড়ান্ত বিজয় সূচিত হয় এবং তিনি নব উদ্যমে সোভিয়েত রাষ্ট্র গঠন করে সমাজতন্ত্র বাস্তবায়নের কাজে অগ্রসর হন। ধনতন্ত্র পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা সর্বনাশা ব্যবস্থা বলে তার নিকট মনে হতো। বিপ্লবের দ্বারা ধনতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই ছিল তার স্বপ্ন। বলশেভিক বিপ্লবের মাধ্যমে পূর্বতন শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে তিনি বলশেভিক শাসনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।

বলশেভিক শাসনে লেনিনের কৃতিত্ব

ক্ষমতা দখলের পর লেনিন ও তার সহযোগীরা রাশিয়াকে একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করার কাজে হাত দেন। লেনিন শ্রমিকদের রুটি, কৃষকদের জমি ও সেনাদলের শান্তিদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতা নিয়েছিলেন এবং তা পূরণের জন্য তার সরকার আত্মনিয়োগ করে। তিনি সর্বপ্রথম জার্মানির সাথে যুদ্ধ বন্ধ করে শান্তি স্থাপনের কাজে হাত দেন। ট্রটস্কির প্রচেষ্টায় কাইজারের জার্মানির সাথে ব্রেস্ট-লিটভস্ক সন্ধি দ্বারা শান্তি স্থাপন করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, রুশ বিপ্লবকে স্থায়ী করতে হলে যুদ্ধ বন্ধ করে অবিলম্বে শাস্তি স্থাপন করা দরকার। এজন্য তিনি জার্মানির প্রস্তাবিত সন্ধির শর্তাবলি স্বীকার করেন। এ সন্ধি স্বাক্ষর ছিল লেনিনের দূরদর্শিতার পরিচায়ক। অতঃপর তিনি সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে পুরাতন তন্ত্রের প্রশাসনিক কাঠামোগুলো ভেঙে ফেলেন। সরকারের সকল গুরুত্বপূর্ণ পদে বিশ্বস্ত বলশেভিকদের নিয়োগ দেওয়া হয়।
রাশিয়ার জাতীয় গির্জাকে রাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণ পৃথক করে গির্জার ভূসম্পত্তিগুলো জাতীয়করণ করা হয়।
ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

এদিকে বলশেভিক বিপ্লবকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় ধনতান্ত্রিক দেশগুলো রুশ সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করে। রাশিয়ার কেরোনেস্কিও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে ধ্বংসের চক্রান্ত শুরু করেন। "ইউরোপে সাম্যবাদ প্রসারিত হওয়ার বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা আমি দেখতে পাচ্ছি"- লেনিনের এ উক্তিটি ইউরোপীয় ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকে শঙ্কিত করে তোলে। রুশ বিপ্লবের বিশ্বজনীন আবেদন বুর্জোয়া রাষ্ট্রগুলোর বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিবিপ্লবী শক্তিগুলোর বলশেভিকদের রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বিতাড়নের চেষ্টা লেনিন অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে প্রতিহত করতে পেরেছিলেন, যা ছিল নবপ্রতিষ্ঠিত বলশেভিক সরকারের অর্থাৎ লেনিনের শ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব। সাম্যবাদী পরিভাষায় প্রতিবিপ্লবীদের শ্বেত প্রতিবিপ্লবী বলা হয়। এভাবে অভ্যন্তরীণ কার্যকলাপ ও বৈদেশিক আক্রমণের আশঙ্কার ফলে বলশেভিক সরকার দারুণ সমস্যায় পড়ে। কিন্তু লেনিনের সুযোগ্য নেতৃত্ব ও তার দুই সহযোগীর কর্মদক্ষতার ফলে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বিপদমুক্ত হয়।

লেনিনের আমলে রাশিয়ার সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বহু পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল। বলশেভিক সরকারের (১৯১৮-২১ খ্রিষ্টাব্দ) গৃহীত অর্থনীতিকে যুদ্ধকালীন জরুরি সমাজতন্ত্র বলা হয়। কেননা এই সময়ে কৃষি উৎপাদন ছিল খুবই কম এবং দেশের উন্নয়নের গতি ছিল ধীর ও মন্থর। ফলে তিনি শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও কৃষি খামারগুলো রাষ্ট্র কর্তৃক অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। জনসাধারণের আর্থিক অবস্থার উন্নতিবিধানের জন্য তার সম্পত্তি জাতীয়করণ নীতি সমৃদ্ধির মূলে কাজ করেছিল। যদিও তার আর্থিক ও শিক্ষাসংক্রান্ত সংস্কারগুলো বিরোধীদের দ্বারা নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল, তবে তার 'নতুন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা' সাফল্যের মুখ দেখতে পেরেছিল। এ নতুন অর্থ পরিকল্পনায় (ক) কৃষকদের কাছ থেকে খাদ্যশস্যের পরিবর্তে তাদের উপর একটি নির্দিষ্ট কর ধার্য করা হয়, (খ) খুচরা ও ব্যক্তি ব্যবসা চালনার সমস্যা দূর করা হয়, (গ) ব্যাংক ও অর্থসংক্রান্ত ব্যবস্থার উন্নতি বিধান করা হয়, (ঘ) সরকারি সমিতি গঠন করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, (ঙ) শ্রমিকদের ক্রমবর্ধিত হারে মজুরি বেঁধে দেওয়া হয়, (চ) শিল্পপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হয়, (ছ) শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে দেওয়া হয়।

তার এ পরিকল্পিত নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ফলে দেশের কৃষি, শিল্প প্রভৃতির উন্নয়ন ত্বরান্বিত হতে থাকে। সরকার জাতীয় উন্নয়নে জনসাধারণকে উৎসাহিত করে। করভার পুনর্বণ্টন করে সরকার কৃষকদের আর্থিক উন্নতি সাধন করে। ফলে দেশের উন্নয়নের গতি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকল। এরই ধারাবাহিকতায় লেনিন পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। লেনিনের উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব হলো সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের জন্য একটি সংবিধান রচনা। এ সংবিধানে সোভিয়েতগুলোই শাসনব্যবস্থার বৈধ সংস্থা ছিল। কার্যত লেনিনের কমিউনিস্ট দলই ছিল প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী, যার কেন্দ্রে ছিলেন তিনি। তার সর্বশেষ কৃতিত্ব ছিল বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছ থেকে বলশেভিক সরকারের স্বীকৃতি লাভ। লেনিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী চিকেরিনের কূটনীতির ফলে ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ড সর্বপ্রথম রাশিয়াকে স্বীকৃতি দেয়। এরপর পর্যায়ক্রমে ফ্রান্স, ইতালি প্রভৃতি দেশ সোভিয়েত রাশিয়াকে স্বীকৃতি দেয়। পুঁজিবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনেক পরে সোভিয়েত রাশিয়াকে স্বীকৃতি দেয়।

দেশের জনগণকে অগ্রগতির ছোঁয়া দিয়ে কালজয়ী লেনিন ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুমুখে পতিত হন। অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী লেনিন পুরনো ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে এক নতুন অধ্যায় সংযোজন করেন। বলশেভিক বিপ্লবের দ্বারা সমাজতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন ও রাশিয়ার উন্নতিসাধনে তার কৃতিত্ব ছিল অতুলনীয়। লেনিন তাই বিংশ শতাব্দীর স্মরণীয় মহাপুরুষ। তার মৃত্যুর পর বলশেভিক ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব নিয়ে ট্রটস্কি ও স্ট্যালিনের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে ট্রটস্কি রাশিয়া থেকে নির্বাসিত হলে স্ট্যালিন লেনিনের সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে ধারণ করে রাশিয়াকে আরও উচ্চ শিখরে নিয়ে যান।

বলশেভিক বিপ্লব-মোঃ গোলাম মোস্তফা স্যারে এর লেখা বই

Content added By

বলশেভিক বিপ্লব শুধু রাশিয়ার আর্থসামাজিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে সংঘটিত হয়নি, বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদের অবসান ঘটিয়ে শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংকল্পও ব্যক্ত করেছিল। তাই এ বিপ্লব রাশিয়াসহ সারা পৃথিবীর রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছিল। বিংশ শতাব্দীতে সারা পৃথিবীর নির্যাতিত, অবহেলিত ও নিপীড়িত মানুষের মুক্তিসংগ্রামে নিরন্তর প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছিল।

বলশেভিক বিপ্লবের ফলাফল ছিল নিম্নরূপ-

প্রথমত: বলশেভিক বিপ্লব রাশিয়ার দীর্ঘদিনের সামন্ততান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে দ্রুত উচ্ছেদ করে। জমি ও শিল্পকারখানা রাষ্ট্রীয় মালিকানায় এনে আধা-পুঁজিবাদী, আধা-সামন্ততান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করে।

দ্বিতীয়ত: বলশেভিক বিপ্লবের ফলে রাশিয়া থেকে জারতন্ত্র ও বুর্জোয়া গণতন্ত্র উচ্ছেদ হয়। রাশিয়ার কৃষক ও শ্রমিকের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত সোভিয়েত শাসনব্যবস্থা কার্যকর করা হয়। নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় শ্রেণিভিত্তিক সমাজের পরিবর্তে শ্রেণিহীন, শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা শুরু হয়'। প্রতিষ্ঠিত হয় সর্বহারার একনায়কতন্ত্র।

তৃতীয়ত: বলশেভিক বিপ্লবের পূর্বে রাশিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বিকাশের পরও রাশিয়া ছিল ইউরোপের অন্যতম পিছিয়ে পড়া দেশ। বলশেভিক বিপ্লব শোষণব্যবস্থা উচ্ছেদ করার লক্ষ্যে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান ঘুচিয়ে আনে। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হওয়ার সামান্য কয়েক বছরের মধ্যে রাশিয়ায় ধনী ও গরিবের পার্থক্য কমে আসে। সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষগুলো রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা লাভ করে ক্রমেই উন্নত জীবনে প্রবেশ করে।

চতুর্থত: বলশেভিক বিপ্লবের পূর্বে রাশিয়ার প্রশাসন ছিল সম্পূর্ণভাবে কেন্দ্রীভূত ও একনায়কতান্ত্রিক। বিপ্লবের ফলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যাপক বিকেন্দ্রীকরণ এবং প্রশাসনে কৃষক ও শ্রমিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। স্থানীয় প্রশাসন পরিকল্পনার দায়িত্ব অর্পিত হয় আঞ্চলিক সোভিয়েতের উপর।

পঞ্চমত: বিপ্লবের প্রাক্কালে রাশিয়ায় প্রায় ১৩০টির মতো ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ছিল, যাদের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের কোনো সুযোগ ছিল না। শিক্ষার হার এদের মধ্যে প্রায় অনুপস্থিত ছিল। বিপ্লবের পর দেশের সকল নাগরিক ও জাতিসত্তার শিক্ষা-সংস্কৃতির মানোন্নয়নের লক্ষ্যে গণশিক্ষার ব্যবস্থা চালু করা হয়। খুব অল্প সময়ের মধ্যে রুশ জাতি ছাড়াও অন্য জাতিগুলোও শিক্ষিত হয়ে ওঠে। জাতিগত বৈষম্য দূর হওয়ায় বিভিন্ন জাতির মধ্যে সম্প্রীতি গড়ে ওঠে, যা উন্নত রুশ রাষ্ট্রব্যবস্থা বিনির্মাণে সাহায্য করে।

ষষ্ঠত: বিপ্লবের পর রাষ্ট্র তার প্রত্যেক নাগরিকের শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও বাসস্থানের দায়িত্ব গ্রহণ করে। ফলে মানুষের ন্যূনতম মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

সপ্তমত: বলশেভিক বিপ্লব পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি সমাজতন্ত্রের ভাবধারায় আলোড়িত হয়। পূর্ব ইউরোপ, চীন, মঙ্গোলিয়া, উত্তর কোরিয়া ও কিউবায় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। পৃথিবীব্যাপী সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন একটি প্রধান রাজনৈতিক মতাদর্শে পরিণত হয়।

অষ্টমত: বলশেভিক বিপ্লব এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার পরাধীন দেশগুলোতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এই বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে উপনিবেশের জনগণ স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য সংগ্রাম শুরু করে। ক্রমে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম। সমাজতন্ত্রের বেশকিছু মর্মবাণী ধারণ করে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায়ও কল্যাণকামী রাষ্ট্রচিন্তার বিস্তার ঘটে।
বস্তুত জারশাসিত রাশিয়ার সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতিসহ সর্বত্র যে পচনের সূত্রপাত হয়েছিল, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ ধাক্কায় তা মুখ থুবড়ে পড়েছিল। বলশেভিকদের কৃষক-শ্রমিকবাদী নীতি, যুদ্ধের বিরোধিতা ও দক্ষ সাংগঠনিক তৎপরতা মানুষের মনে বিকাশ, প্রগতি ও উচ্চ আকাঙ্ক্ষার বাণী নিয়ে এসেছিল, যার ফল হচ্ছে ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের বলশেভিক বিপ্লব।

Explanation of Key Words

  • বলশেভিক রুশ শব্দ 'বলশেভিনস্টভো' বা সংখ্যাগরিষ্ঠ থেকে বলশেভিক শব্দের উৎপত্তি। ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির কংগ্রেসে বিপ্লবপন্থি ও আপসকামীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করে। লেনিনের নেতৃত্বে বিপ্লবপন্থিরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এবং বলশেভিক নামে পরিচিত হয়। অন্য পক্ষ মেনশেভিক (সংখ্যালঘু বা 'মেনশিনস্টভো' শব্দ থেকে উদ্ভূত) নামে অভিহিত হয় এবং আলাদাভাবে সাংগঠনিক কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। এই বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বেই ১৯১৭খ্রিষ্টাব্দে রুশ বিপ্লব সংঘটিত হয়। এই পার্টি পরবর্তীকালে 'রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি' থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি নামে রূপান্তরিত হয়।
  • ডুমা: জার শাসনামলে রাশিয়ার সংবিধানসভা অর্থাৎ আইনসভার নাম ছিল 'ডুমা'। ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে লেনিনের আহ্বানে বলশেভিকরা তৃতীয় ডুমার নির্বাচনে প্রথম অংশ নেয়। ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে লেনিনের মনোনীত রোমান মিলনভাস্কি ডুমার সদস্য নির্বাচিত হলে বলশেভিক আন্দোলনে গতিশীলতা আসে। ২৬শে ফেব্রুয়ারি জার নিকোলাস ডুমা বন্ধের নির্দেশ দিলে ডুমার সদস্যবৃন্দ তা অমান্য করেন। ১৫ই মার্চ ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে ডুমার সদস্যবৃন্দ প্রিন্স লভেভের নেতৃত্বে অস্থায়ী সরকার গঠন করলে জারতন্ত্রের অবসান হয়। রুশ বিপ্লবের পর ডুমা ভেঙে দেওয়া হয়।
  • মেনশেভিক রুশ মেনশেভিক শব্দের অর্থ সংখ্যালঘিষ্ঠ। রুশ বিপ্লবের প্রাক্কালে ১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দে Russian Social Democratic Party গঠিত হয়। এ পার্টির নেতৃত্বের সবাই মার্ক্সবাদে বিশ্বাসী ছিল। ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে লন্ডনে পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের রণকৌশল নিয়ে দলটি দুভাগে ভাগ হয়ে যায়। সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন লেনিন আর সংখ্যালঘিষ্ঠ (মেনশেভিক) অংশের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন মার্তন্ড ও প্লেখানভ।
  • নিহিলিজম ও নারোদনিক আন্দোলন উনিশ শতকের রাশিয়ায় সমাজ পরিবর্তনের জন্য জারবিরোধী
    অনেক গুপ্ত আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল। গড়ে উঠেছিল গুপ্ত সংগঠন। এই সংগঠনসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নিহিলিজম ও নারোদনিক আন্দোলন। এই দুটি আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল জার শাসনের অত্যাচার ও শোষণ থেকে দেশকে মুক্ত করা এবং সাধারণ মানুষের মুক্তিসাধন। কিন্তু এসর আন্দোলন ব্যর্থ হলেও তাদের সংগ্রাম ভবিষ্যতের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে দিকনির্দেশনা দিয়েছিল।
  • লালফৌজ: ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই সেপ্টেম্বর রাশিয়াকে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়। কেরোনেস্কির প্রজাতান্ত্রিক সরকারকে লেনিন বিপ্লবের জন্য যথার্থ মনে করেননি। তাই তিনি পেট্রোগ্রাডে প্রত্যাবর্তন করে সশস্ত্র পন্থায় ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করেন। বলশেভিক পার্টির সশস্ত্র সমাজতন্ত্রীদের Red Gurd বা লালফৌজ বলা হতো। অক্টোবর মাসে রাশিয়ার ৬২টি শহরে প্রায় ২ লাখ লালফৌজ ক্ষমতা দখলের জন্য প্রস্তুত হয়।
  • এপ্রিল থিসিস: ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩রা এপ্রিল লেনিন প্রবাস থেকে পেট্রোগ্রাডে ফিরে আসেন এবং ৪ঠা এপ্রিল নিখিল রুশ সোভিয়েত কনফারেন্সে যেসব প্রস্তাবনা বা থিসিস হাজির করেন, সেগুলোই 'এপ্রিল থিসিস' নামে খ্যাত। এই থিসিসের মূল প্রতিপাদ্য ছিল নিম্নরূপ: ১. বুর্জোয়া ও সাম্রাজ্যবাদী অস্থায়ী রুশ সরকারের বিরোধিতা, ২. আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধের (তখন প্রথম মহাযুদ্ধ চলমান) ধারণা প্রত্যাহার, ৩. সর্বহারা ও গরিব কৃষকদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর, ৪. সোভিয়েত সরকার গঠন, ৫. পুলিশ, সেনাবাহিনী ও আমলাতন্ত্রের নির্মূলীকরণ, ৬. জমি জাতীয়করণ, ৭. সমস্ত ব্যাংককে একত্রীকরণের মাধ্যমে, সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণাধীনে একটি ব্যাংক গঠন, ৮. উৎপাদন ও বণ্টনের উপর সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, ৯. পার্টির নাম পরিবর্তন করে কমিউনিস্ট পার্টি নামকরণ (তখন পর্যন্ত পার্টির নাম ছিল রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টি) এবং ১০. আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট গঠন।
  • সিন্ডিকালিজম: এটি হলো ট্রেড ইউনিয়ন বা বাণিজ্য ও পেশাসংঘভিত্তিক সমাজবাদী মতবাদ। ফরাসি 'সিন্ডিকেট' শব্দ থেকে সিন্ডিকালিজমের উৎপত্তি। সিন্ডিকেট-এর অর্থ ট্রেড ইউনিয়ন বা বাণিজ্যসংঘ। এটি বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলনের একটি মতবাদ। এই মতবাদ অনুযায়ী সমাজবিপ্লব ও ভবিষ্যৎ সমাজ গঠনের ভিত্তি হলো ট্রেড ইউনিয়ন। নৈরাজ্যবাদের সঙ্গে এর মিল আছে বলে অনেকে একে নৈরাজ্যবাদী সিন্ডিকালিজম নামেও অভিহিত করেন। মাইকেল বাকুনিন, জর্জ সোরেল প্রমুখ ছিলেন এই মতবাদের প্রবক্তা। এই মতবাদ শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক দল বা তার রাজনৈতিক ভূমিকার কথা অস্বীকার করে এবং পুঁজিবাদী শাসক-শোষকের বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের পরিবর্তে শিল্পকেন্দ্রিক কার্যকলাপ বা ধর্মঘট ইত্যাদিকে সমর্থন করে।
  • ফ্যাবিয়ান সোসাইটি রোমান জেনারেল কুইনটাস ফ্যাবিয়াস ম্যাক্সিমাসের নামানুসারে ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দে লন্ডনে ফ্যাবিয়ান সোসাইটির জন্ম। বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী, বিজ্ঞানী, লেখক ও রাজনীতিবিদদের সমন্বয়ে এই সোসাইটি গড়ে ওঠে। ফ্যাবিয়ানরা মনে করে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংস্কার এবং সামাজিক ক্রমবিবর্তনের প্রক্রিয়াতেই পুঁজিবাদী সমাজের সমাজতান্ত্রিক সমাজে রূপান্তর ঘটবে। এর জন্য বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তাকে তারা অস্বীকার করে।
  • মার্ক্সবাদ: কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলসের সম্মিলিত মতবাদই মার্ক্সবাদ। মার্ক্সবাদের মূল উৎস তিনটি, যথা- ১। জার্মান দর্শন, ২। ব্রিটিশ অর্থনীতি ৩। ফরাসি সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ মার্ক্সবাদের ভিত্তি। মার্ক্সবাদ অনুযায়ী অর্থনৈতিক কাঠামো বা উৎপাদন পদ্ধতি অনুযায়ীই সমাজকাঠামো গড়ে ওঠে। তারা দেখান যে, পুঁজিবাদী সমাজই শোষণমূলক সমাজের শেষ রূপ। পুঁজিবাদী সমাজের দ্বন্দ্ব অর্থাৎ পুঁজিপতি ও সর্বহারা শ্রেণির দ্বন্দ্বের ফলে সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা কায়েম হতে বাধ্য।
  • কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলস প্রণীত কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো বা কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার প্রকাশিত হয় ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে। এটিই ছিল বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের প্রথম কর্মসূচিভিত্তিক দলিল। এতে সমাজ বিকাশের অব্যর্থ নিয়ামকসমূহ, পুঁজিবাদ ধ্বংস করে সাম্যবাদের প্রতিষ্ঠা, সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্বের তত্ত্ব ও কমিউনিস্টদের আন্দোলন কৌশল প্রভৃতি আলোচিত হয়। এই ইশতেহারেই ঘোষণা করা হয়, সর্বহারা শ্রেণির শৃঙ্খলা ছাড়া হারানোর কিছু নেই। এই ইশতেহারেই দুনিয়ার মজদুরদের এক হওয়ার কথা বলা হয়। আর এজন্যই একে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের শ্রেষ্ঠ দলিল বলে বিবেচনা করা হয়।
  • সাম্যবাদ কমিউনিজম সাম্যবাদ সমাজতন্ত্রের উচ্চতর পর্যায়। সমাজতন্ত্রের সঙ্গে সাম্যবাদের পার্থক্য প্রকারগত নয় বরং মাত্রাগত। সমাজতান্ত্রিক পর্যায়ে যৌথ খামার এবং সমবায়ী মালিকানা উভয়েরই অস্তিত্ব থাকে, কিন্তু সাম্যবাদী পর্যায়ে থাকে এক ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা- রাষ্ট্র বা সমগ্র জনগণের মালিকানা। সাম্যবাদী সমাজে জাতিতে জাতিতে তারতম্যেরও কোনো অস্তিত্ব থাকে না। উল্লেখ্য, সাম্যবাদী সমাজের উপরিউক্ত চিত্র এখনো তত্ত্বেই সীমাবদ্ধ। বিশ্বের কোনো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাম্যবাদে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব হয়নি।
  • শ্বেত প্রতিবিপ্লবী: ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের বিপ্লব রাশিয়ার সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন সাধন করে। বিপ্লবকে স্তিমিত করে দিতে এবং পার্শ্ববর্তী অন্য ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহকে বিপ্লবের হাত থেকে রক্ষায় শ্বেত বিপ্লবীরা বিপ্লবের বিরোধিতা করে। এজন্য তাদের শ্বেত প্রতিবিপ্লবী বলা হয়। শ্বেত প্রতিবিপ্লবীদের ইন্ধন দেয় যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স প্রভৃতি রাষ্ট্র। এর ফলে সমাজতান্ত্রিক সরকার দারুণ সমস্যায় পড়ে। কিন্তু লেনিনের সুযোগ্য নেতৃত্বের ফলে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বিপদমুক্ত হয়।
  • সর্বহারার একনায়কত্ব বুর্জোয়া রাষ্ট্রশক্তিকে হটিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব। শোষকগোষ্ঠীর বাধা প্রতিহত করার জন্য, বিপ্লবের বিজয় সুসংহত করার জন্য এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার চক্রান্ত বানচাল করার জন্য সর্বহারা শ্রেণি তাদের একনায়কত্বকে ব্যবহার করে। সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্বের প্রধান কাজ সৃষ্টিশীল ও গঠনমূলক আর সেটি হলো ব্যাপক শ্রমজীবী জনগণকে সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা এবং সমাজতান্ত্রিক আদর্শ ও মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করা।
  • জারতন্ত্র: আঠারো-উনিশ শতকে গোটা ইউরোপে কয়েকটি রাজবংশ দ্বারা স্বৈরশাসন প্রচলিত ছিল। রাশিয়ার রোমানভ বংশের রাজাদের জার (Czar বা Tsar) উপাধি ছিল। জারদের শাসনকে বলা হতো জারতন্ত্র (Czarist)। জারতন্ত্রের উদ্দেশ্য ছিল- কোনো পরিবর্তন নয়, স্থিতিশীল শাসন। জারদের নীতি ছিল- এক জার, এক চার্চ ও এক রাশিয়া। এরূপ প্রতিক্রিয়াশীল মতবাদের বিরুদ্ধে জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের সময় (১৮৫৫-১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দ) থেকেই রাশিয়ায় বৈপ্লবিক চিন্তার জাগরণ ঘটে। ১৯১৭
    খ্রিষ্টাব্দে জার নিকোলাসের পতনের মধ্য দিয়ে রোমানভ রাজবংশের ও জারতন্ত্রের অবসান ঘটে, প্রতিষ্ঠিত হয় রাশিয়ার প্রথম সমাজতান্ত্রিক সরকার।
  • প্রলেতারিয়েত প্রলেতারিয়েত শব্দের অর্থ ভূমিহীন বা সর্বহারা। রুশ বিপ্লবের প্রাক্কালে রাশিয়ার সমাজব্যবস্থায় কৃষকরা ছিল শোষণের শিকার। বিশেষ করে 'স্ট্রোলিপিন' ভূমি সংস্কার আইনের দ্বারা জোতদার শ্রেণির আবির্ভাব ঘটে। দারিদ্র্য ও অভাব-অনটনের কারণে কৃষকদের ভূমি জোতদাররা ঋণের দায়বদ্ধতার অজুহাতে কুক্ষিগত করতে থাকে। ফলে কৃষকরা ভূমিহীন কৃষক অর্থাৎ সর্বহারা শ্রেণিতে পরিণত হয়। ভূমিহীন সর্বহারা কৃষকরাই প্রলেতারিয়েত।
  • শ্বেত সন্ত্রাস: লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা রাশিয়ার ক্ষমতা গ্রহণ করলেও প্রতিবিপ্লবী শক্তিগুলো তা সহজে মেনে নেয়নি। জার শাসনামলের কতিপয় সেনাপতির নেতৃত্বে ও পশ্চিমা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের ইন্ধনে প্রতিবিপ্লবীরা লেনিনের সরকারকে উৎখাত করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের চেষ্টা চালায়। তাদের রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমই 'শ্বেত সন্ত্রাস'। লেনিন ট্রটস্কি ও স্ট্যালিনের সহযোগিতায় 'লাল সন্ত্রাসের' মাধ্যমে প্রতিবিপ্লবীদের চক্রান্ত থেকে দেশকে নিরাপদ করতে সক্ষম হন।
  • ব্রেস্ট-লিটডস্ক সন্ধি: রুশ বিপ্লবের পরপরই জার্মানি ও রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত সন্ধির নাম ব্রেস্ট-লিটভস্ক সন্ধি। রুশ বিপ্লবের পূর্বে লেনিন শ্রমিকদের রুটি, কৃষকদের জমি ও সৈনিকদের যুদ্ধের পরিবর্তে শাস্তির প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ার অংশগ্রহণ ও যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতা ছিল তার প্রতিশ্রুতির সাথে সাংঘর্ষিক। তাই রাশিয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতিপক্ষ জার্মানির সাথে উক্ত সন্ধি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে রাশিয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে সরে আসে। উক্ত সন্ধির দ্বারা রাশিয়া তার লৌহ ও কয়লাশিল্পের অংশ হারায়। জার্মানিকে প্রচুর ক্ষতিপূরণ দিলেও রাশিয়া অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে বেশি মনোযোগী হওয়ার সুযোগ লাভ করে।

বলশেভিক বিপ্লব-মোঃ গোলাম মোস্তফা স্যারে এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...