উত্তরঃ
উদ্দীপকের চেতনা ও 'জীবন ও বৃক্ষ' প্রবন্ধের চেতনাকে সামগ্রিক দৃষ্টিতে এক মনে না হওয়ার যুক্তি অত্যন্ত সুচিন্তিত এবং এটি যথার্থ। যদিও উভয়ই পরোপকার ও আত্মত্যাগের মহিমা তুলে ধরে, তাদের মূল দর্শন ও ব্যাখ্যার গভীরতায় ভিন্নতা রয়েছে, যা তাদের সামগ্রিক চেতনাকে পৃথক করে তোলে।
উদ্দীপকের মূল চেতনা হলো নিঃশর্ত আত্মদান। এখানে নদী, বৃক্ষ, গাভী, কাষ্ঠ, স্বর্ণ, বংশী – প্রত্যেকেই নিজের সবকিছু উজাড় করে অন্যের উপকারে আসে, বিনিময়ে কোনো প্রতিদান আশা করে না। এটি একটি প্রত্যক্ষ ও স্বতঃস্ফূর্ত ত্যাগের চিত্র। নদী তার জল পান করে না, গাছ তার ফল খায় না, গাভী তার দুধ পান করে না – এই উদাহরণগুলো প্রাকৃতিক বস্তুর সহজাত পরোপকারী গুণকে নির্দেশ করে, যেখানে কোনো ব্যক্তিগত বৃদ্ধি বা বিকাশের প্রক্রিয়াকে মুখ্য করা হয়নি, বরং তাদের অস্তিত্বই অপরের জন্য উৎসর্গীকৃত। কাষ্ঠ দগ্ধ হয়ে যেমন অন্নদান করে, স্বর্ণ যেমন অপরকে শোভিত করে, বংশী যেমন স্বর দিয়ে মোহিত করে, এর সবগুলোই ব্যক্তিগত ক্ষয় বা রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অন্যের উপকারে আসার বার্তা দেয়।
অন্যদিকে, সৈয়দ মুজতবা আলীর 'জীবন ও বৃক্ষ' প্রবন্ধের চেতনা আরও গভীর ও জীবনমুখী। এই প্রবন্ধে বৃক্ষের জীবনকে মানবজীবনের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে আত্মত্যাগের আগে আত্মবিকাশ ও পরিপূর্ণতা অর্জনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। বৃক্ষ ধীরে ধীরে শেকড় গেড়ে, মাটি থেকে রস সংগ্রহ করে, সূর্যের আলো গ্রহণ করে, ঝড়-বৃষ্টির সাথে সংগ্রাম করে পূর্ণতা লাভ করে। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এটি কেবল ফল, ছায়া বা কাঠই দেয় না, বরং নিজের অস্তিত্বের প্রতিটি ধাপে বৃদ্ধি ও বিকাশের মাধ্যমে সে প্রকৃত সেবক হয়ে ওঠে। এখানে আত্মদান কেবল একটি ফল নয়, বরং একটি সুদীর্ঘ সাধনা ও পরিপূর্ণতার ফল। বৃক্ষ তার নিজের জীবনকে সমৃদ্ধ করে বলেই অন্যকে সমৃদ্ধ করতে পারে। মানবজীবনেও জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও আত্মোপলব্ধির মধ্য দিয়ে পরিপূর্ণতা লাভের পরই সমাজের প্রতি প্রকৃত অবদান রাখা সম্ভব – এই হলো প্রবন্ধের মূল বার্তা।
সুতরাং, যদিও উদ্দীপক এবং 'জীবন ও বৃক্ষ' উভয়ই পরোপকার ও আত্মত্যাগের মহত্ত্ব তুলে ধরে, তাদের দৃষ্টিকোণ ভিন্ন। উদ্দীপক যেখানে প্রাকৃতিক বস্তুর স্বতঃস্ফূর্ত ও নিঃশর্ত আত্মদানকে উপস্থাপন করে, সেখানে 'জীবন ও বৃক্ষ' প্রবন্ধ আত্মবিকাশ, সংগ্রাম ও পরিপূর্ণতা অর্জনের মাধ্যমে অর্জিত আত্মদানের এক গভীর দার্শনিক ব্যাখ্যা প্রদান করে। প্রথমটি মূলত নিষ্ক্রিয় আত্মদানকে বোঝায়, দ্বিতীয়টি সক্রিয় ও সার্থক আত্মদানের প্রক্রিয়াকে বোঝায়। এই পার্থক্যগুলোর কারণেই উক্তিটি যথার্থ যে, তাদের সামগ্রিক চেতনা এক নয়, বরং পরিপূরক হলেও ভিন্নমাত্রিক।