বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণির মানুষের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তারা বিভিন্ন বাহিনীতে যোগ দিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। যাঁরা সরাসরি অংশ্রগহণ করতে পারেননি, তাঁরা নানাভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছেন। গ্রামের সাধারণ মানুষই মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার, চিকিৎসা, অর্থ ও আশ্রয় দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। অনেকে আবার শত্রুবাহিনীর খবর সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের জানিয়েছেন। নারীরা খাবার রান্না করে, জামা-কাপড় সংগ্রহ করে এবং আহত মুক্তিযোদ্ধাদের, সেবা দিয়ে সহায়তা করেছেন। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাধারণ মানুষও এ যুদ্ধে অবদান রাখেন। মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের অবদান ভুলে যাওয়ার নয়।
আমরা বিদ্যালয়ে প্রতিবছর ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবস উদ্যাপন করি। ১৬ই ডিসেম্বর আমরা বিজয় দিবসে নানা কাজের মাধ্যমে আমাদের শহিদদের স্মরণ করি। আমরা যেভাবে বিদ্যালয়ে বিজয় দিবস উদযাপন করি তা হলো-
১. আমরা সকালে স্কুলে গিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করি।
২. সবাই মিলে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করি।
৩. শহিদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধে আমরা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাই।
৪. সারিবদ্ধভাবে কুচকাওয়াজের মাধ্যমে আমরা শহিদদের
সম্মান জানাই।
৫. শহিদদের স্মরণে আয়োজিত আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করি।
পাকিস্তান তৈরি হওয়ার পর থেকেই তারা আমাদের ওপর বৈষম্যমূলক আচরণ করত। তারা প্রথমে বাংলা ভাষার উপর উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। এর প্রতিবাদে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন হয় এবং এর মধ্য দিয়েই বাঙালিরা নিজেদের জাতি হিসেবে চিনতে শুরু করে। ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানের পর ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতলেও শাসকচক্র ক্ষমতা দিতে চায়নি। তখন শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ঘোষণা করেন, 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।' এভাবেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পথ তৈরি হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধ সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য এবং বিশ্বজুড়ে আমাদের স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন পাওয়ার জন্য ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল এটি শপথ নেয়। এই সরকারের প্রধান ছিলেন রাষ্ট্রপতি-শেখ মুজিবুর রহমান। উপ-রাষ্ট্রপতি ছিলেন-সৈয়দ নজরুল ইসলাম (তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির কাজ করেন) এবং প্রধানমন্ত্রী ছিলেন-তাজউদ্দীন আহমদ। এই সরকার গঠনের ফলে যুদ্ধ পরিচালনার একটি সুসংগঠিত নেতৃত্ব তৈরি হয়।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানকে কবল থেকে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য ছাত্র, যুবক, কৃষক, শ্রমিক, পুলিশ, ইপিআর ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে মুক্তিবাহিনী গঠিত হয়। এই বাহিনীর প্রধান সেনাপ্রতি ছিলেন কর্নেল জেনারেল মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী। যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার জন্য মুক্তিবাহিনীকে ৩টি ব্রিগেড ফোর্সে ভাগ করা হয়েছিল। তাদের প্রধানদের নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে নাম দেওয়া হয়: 'কে' ফোর্স, 'এস' ফোর্স ও 'জেড' ফোর্স। এই বাহিনী, গেরিলা কায়দায় যুদ্ধ করত এবং নৌ-কমান্ডোরা 'অপারেশন জ্যাকপট' চালিয়ে শত্রুদের জাহাজ ও গানরোট ডুবিয়ে দিয়ে 'সফল হয়।
মুক্তিযুদ্ধে সকল শ্রেণির মানুষের অবদান রয়েছে। গ্রামের সাধারণ মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার, চিকিৎসা, অর্থ ও আশ্রয় দিয়ে সাহায্য করতেন। নারীরা অস্ত্র চালনা ও সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে সরাসরি যুদ্ধ করেছেন। আবার তাঁরা আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা দিয়েছেন, খাবার রান্না করে দিয়েছেন এবং গুপ্তচর হিসেবে শত্রুদের খবর আদান-প্রদান করেছেন। সাধারণ মানুষ জামা-কাপড় সংগ্রহ করে দিতেন এবং নিরাপদ আশ্রয় দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জুগিয়েছেন।
প্রতিবেশী দেশ ভারত সরাসরি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন জানায়। ভারত এদেশের প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল। তারা শরণার্থীদের খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা সেবা দেয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করার জন্য মিত্রবাহিনী গঠন করে। এ ছাড়া, বিশ্বজুড়ে সমর্থন পাওয়ার জন্য জনপ্রিয় শিল্পী জর্জ হ্যারিসন ১৯৭১ সালের ১লা আগস্ট নিউইয়র্কে 'কনসাট ফর বাংলাদেশ' আয়োজন করেন। এই কনসার্ট থেকে পাওয়া ২,৫০,০০০ ডলার শরণার্থীদের সাহায্যার্থে দেওয়া হয়েছিল।
৩রা ডিসেম্বর পাকিস্তান বিমানবাহিনী ভারতে হামলা করলে ভারত সরাসরি আমাদের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেয়। এর ফলে দ্রুতই পাকিস্তানি বাহিনী পরাজিত হতে থাকে। অবশেষে, ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) 'পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজী মিত্রবাহিনীর প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার নিকট আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন। এই আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়েই মুক্তিযুদ্ধে আমাদের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয় এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।
মুজিবনগর সরকার ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল গঠিত হয়। এটি মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলায় গঠিত হয়। মুজিবনগর সরকার গঠনের উদ্দেশ্য ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা এবং বিশ্বজনমত গড়ে তোলা। তাই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জনগণের সমর্থন আদায়ের জন্য মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়।
মুজিবনগর সরকারের সদস্যরা হলেন-
রাষ্ট্রপতি - শেখ মুজিবুর রহমান
উপ-রাষ্ট্রপতি - সৈয়দ নজরুল ইসলাম
প্রধানমন্ত্রী - তাজউদ্দীন আহমদ
অর্থমন্ত্রী -এম মনসুর আলী
স্বরাষ্ট্র ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী এইচএম কামারুজ্জামান
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাত। এ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা, রাজারবাগ পুলিশ লাইনসসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বর্বর হামলা করে। তারা সকল শ্রেণির মানুষের ওপর গণহত্যা চালায়। পাকবাহিনী এ আক্রমণের নাম দেয় অপারেশন সার্চলাইট। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে কালরাত নামে পরিচিত। এ রাতে শেখ মুজিবুর রহমানকে বন্দি করা হয়। পাকিস্তানি বাহিনী এ. রাতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পুলিশ, ইপিআরসহ সবার ওপর গণহত্যা চালায়।
মুক্তিযুদ্ধে কিছু সংখ্যক মানুষ পশ্চিম পাকিস্তানিদের পক্ষ নেয়। পাকিস্তান সরকার শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস নামে বিভিন্ন বাহিনী গড়ে তোলে। এসব বাহিনী মুক্তিযুদ্ধে বিপক্ষ শক্তি হিসেবে কাজ করে। তারা হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, লুটপাট, বাড়ি-ঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ করে। এদেশের নারীদের ধরে নিয়ে হানাদার বাহনীর হাতে পৌঁছে দেওয়ার মতো জঘন্য কাজও তাঁরা করেছে। হানাদার বাহিনীর এদের সহায়তায় এ দেশকে মেধাশূন্য করার পরিকল্পনা করে। ১০ থেকে ১৪ই ডিসেম্বরের মধ্যে তারা এদেশের বুদ্ধিজীবীদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালায়।
মুক্তিবাহিনীর বহুমুখী আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে। অক্টোবর-নভেম্বর মাস থেকেই অনেক অঞ্চল মুক্ত হতে শুরু করে। ১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী ভারত বিমান হামলা করে। জবাবে যৌথবাহিনী একযোগে স্থল, নৌ ও বিমান হামলা চালায়। জেনারেল নিয়াজির নেতৃত্বে পাকিস্তানি বাহিনী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার শক্তি হারিয়ে ফেলে। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বেলা ৫টা ১০ মিনিটে জেনারেল নিয়াজি ৯৩ হাজার সৈন্য নিয়ে আত্মসমর্পণ করে। এ আত্মসমর্পণ হয় রেসকোর্স ময়দানে। তিনি জগজিৎ সিং অরোরার নিকট আত্মসমর্পণ করে। এতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন এয়ার কমোডর একে খন্দকার।
স্বাধীনতা দিবস ২৬শে মার্চ তারিখে পালিত হয়।
আমাদের দেশে গুরুত্বের সাথে বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালন করা হয়। এ দিবসগুলোর যথাযথ মর্যাদায় সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সর্বস্তরের জনগণ পালন করে। এই দিবসসমূহ উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে আমাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রকাশ ঘটে। আমরা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হই। ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে ওঠে। জাতি সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠে। আমরা আমাদের ইতিহাসের গুরুত্ব বুঝতে পারি। বিশ্বের সকল মানুষের কাছে বাংলাদেশের পরিচয় তুলে ধরা যায়।
Related Question
View All১৯৬৬ সালে ছয় দফা আন্দোলন সংঘটিত হয়।
পাকিস্তানি বাহিনী ১৯৭১ সালে ২৫শে মার্চ গণহত্যা চালায়।
১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করেও বেশি দিন টিকতে পারেনি।
১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করে।
শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসমাবেশে ভাষণ দেন।
মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!