চিত্র ১: ৭০ দশকের প্রশাসনিক কার্যক্রম যোগাযোগের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ ও সরকারের মাঝে বিস্তর দূরত্ব। ফলে জনগণ তাদের দাবি-দাওয়া সরকারের নিকট যথাসময়ে উপস্থাপন করতে পারে না।
চিত্র ২ : একবিংশ শতাব্দীর প্রশাসনিক কার্যক্রম ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সরকার সমস্ত দেশের চিত্র সম্পর্কে অবহিত হচ্ছে মুহূর্তের মধ্যে
ই-গভর্ন্যান্সের প্রধান উদ্দেশ্য হলো জনগণকে তথ্যসেবা দেওয়া। আর এর মাধ্যমে সরকারি কাজের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা যায়। সরকারি কাজের গতিশীলতা আনয়ন, ব্যয় হ্রাস করা এবং সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ই-গভর্ন্যান্স বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। প্রশাসনিক ব্যবস্থার উন্নয়নে ই-গভর্ন্যান্স পদ্ধতি অত্যন্ত কার্যকরী ও ফলপ্রসূ একটি পদ্ধতি।
সুমনের বাবা অবাক হয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে মনে হচ্ছে তিনি আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে পর্যাপ্ত জানেন না। তিনি হয়তবা বয়োজ্যেষ্ঠ লোক যারা আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহারে অভ্যস্ত নন। তিনি এমন এক ব্যবস্থায় অভ্যস্ত যেখানে সরকারি-বেসরকারি যোগাযোগ সবসময় সাধারণভাবে সম্পন্ন হয়। চিঠি, সরাসরি খবর সরবরাহ কিংবা বড়জোর টেলিফোনের মাধ্যমে তথ্য যোগাযোগে যারা পারদর্শী ছিলেন, তাদের নিকট ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা আশ্চর্য হওয়ার মতোই ব্যাপার। আধুনিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো জনমত গঠনের ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করছে। ই-গভর্ন্যান্সের মাধ্যমেই ঘরে বসেই সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করা যায়। সুমন এভাবেই সন্ত্রাসীকে ধরে দিতে সহায়তা করেছে। কিন্তু এ বিষয়ে যার কোনো ধারণা নেই, তিনি এতে আশ্চান্বিত হতেই পারেন। এজন্যই সুমনের বাবা অবাক হয়েছিলেন।
সুমন রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশিক্ষিত ও সচেতন জনগণের কথা উল্লেখ করেছে, যারা বর্তমান রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। আধুনিককালে রাষ্ট্র পরিচালিত হয় সরকার ও জনগণের সহঅংশীদারিত্বের মাধ্যমে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করে। কিন্তু গণতন্ত্রের নির্বাচন ব্যবস্থায় সমাজে শিক্ষিত ও সচেতন জনগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সমাজের সচেতন নাগরিকেরা সরকারের বিভিন্ন দিক নিয়ে পত্রপত্রিকা এবং অনলাইনভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থার নানাবিধ আলোচনা সমালোচনায় অংশ নেয়। ফেসবুক, টুইটার, ব্লগ ইত্যাদিকে এখন বলা হয় নাগরিক সাংবাদিকতার প্লাটফর্ম। এ প্লাটফর্মে জনগণ একত্রিত হয়ে সরকারের প্রশংসা বা সমালোচনা করে সরকারকে সঠিক পথ নির্দেশনা দেয়। এরূপ আন্দোলনের দাবি অনেক সময়ই সরকার অনিচ্ছা সত্ত্বেও মানতে বাধ্য হয়। আর এ কাজটি করে মূলত দেশের সচেতন ও শিক্ষিত জনসাধারণ। গণতন্ত্র এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এ পক্ষের ভূমিকা অনস্বীকার্য। জনসাধারণের এ অংশ যত সক্রিয় ও কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে, গণতন্ত্র তত সংহত হবে। শাসকগোষ্ঠীর জবাবদিহিতা তত বৃদ্ধি পাবে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। চূড়ান্ত বিচারে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। এভাবেই জনসাধারণের সচেতন ও সুশিক্ষিত অংশ সুশাসন প্রতিষ্ঠায় প্রভাব বিস্তার করে থাকেন।
ই-গভর্ন্যান্স একটি উত্তম পদ্ধতি হলেও এর নানাবিধ অসুবিধা রয়েছে। এটি প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি পদ্ধতি, আবার এজন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন জনবলও অপ্রতুল। এছাড়াও রক্ষণাবেক্ষণ, নিয়মিত হালনাগাদ করার বিদ্যুৎ সমস্যা, ইন্টারনেটের ধীরগতি এবং দুর্নীতিবাজদের প্রভাব এক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করে। যেখানে' দেশের সিংহভাগ জনগণের ন্যূনতম ICT জ্ঞান এবং ইন্টারনেট অ্যাকসেস নেই, সেখানে এটি অপ্রয়োজনীয় অপচয়ও বটে
চিত্র ১-এ সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সহজসাধ্য কোনো ব্যাপার নয়। এ সময়কার সামগ্রিক চিত্র হলো জনগণ ও সরকার পরস্পর বিচ্ছিন্ন। সরকার জনমতকে আমলে নেওয়ার মতো যথেষ্ট তথ্য সহজে পেত না। জনগণের দাবি আদায়ের একমাত্র উপায় ছিল সরকারের নিকট 'পদ্ধতিগত' আবেদন-নিবেদন এবং এতে ব্যর্থ হলে আন্দোলন। আর 'পদ্ধতিগত' এ আবেদন প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় সাপেক্ষ আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতিনির্ভর ও সেকেলে ব্যবস্থা- যা জনগণের দাবিকে যথাসময়ে সরকারের নজরে আনতে ব্যর্থ ছিল। এতে সরকারের সরাসরি জবাবদিহিতার সুযোগ ছিল না বললেই চলে। জনগণ যেহেতু সরকারের কর্মকাণ্ডের পর্যাপ্ত তথ্যথেকে বঞ্চিত ছিল, তাই এতে দুর্নীতির সুযোগ ছিল অনেক বেশি। কেননা রাষ্ট্রীয় কাজে যেখানে যত গোপনীয়তা, সেখানে দুর্নীতির সুযোগ তত বেশি থাকে। চিত্র ১-এ দেখানো প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে জনগণ ও সরকারের যোগাযোগ ব্যবস্থা তাদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করছে। এরূপ জনবিচ্ছিন্ন সরকার তুলনামূলকভাবে কম সফলতা লাভ করে।