অষ্টশীলকে আদর্শ জীবনের মূল ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এটি মানুষকে সত্যবাদী, সংযমী ও সদাচারী হতে সাহায্য করে। অষ্টশীল পালন করলে মানুষ মিথ্যা, লোভ, হিংসা ও অন্যায় থেকে দূরে থাকে। এতে আত্মসংযম ও নৈতিকতা বৃদ্ধি পায়, মন ও শরীর দুটোই শান্ত থাকে। অষ্টশীল আমাদের পরের প্রতি দয়া, সহানুভূতি ও শ্রদ্ধা করতে শেখায়। এর মাধ্যমে সমাজে শান্তি, সৌহার্দ ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। তাই আদর্শ ও পুণ্যময় জীবন গঠনের জন্য নিয়মিত অষ্টশীল অনুশীলন করা অত্যন্ত জরুরি।
আমি বিভিন্ন পূর্ণিমা ও তিথিতে নিয়মিত অষ্টশীল পালনের চেষ্টা করি। ইতোমধ্যে অষ্টশীল পালনের অনেক সুফল আমার মাঝে পরিলক্ষিত হয়েছে। আমি যেহেতু প্রাণিহত্যা থেকে বিরত থাকি, সেহেতু আমার মন শান্ত থাকে। মিথ্যা বলি না, সদা সত্যনিষ্ঠ থাকায় মানুষ আমাকে বিশ্বাস করে। অদত্ত বস্তু গ্রহণ না করার ফলে আমি সততা ও নৈতিকতা অর্জন করছি। অব্রহ্মচর্য, মাদক ও অতিরিক্ত ভোজন এড়িয়ে চলায় আমার স্বাস্থ্য ও মন ভালো থাকে। নাচ-গান, প্রসাধন ও উচ্চশয্যা থেকে বিরত থাকায় আমি সহজ জীবনযাপনে অভ্যন্ত হয়ে পড়েছি। অষ্টশীল পালন আমাকে আত্মসংযম ও ধৈর্যধারণে সহায়তা করে। অন্যের প্রতি সহমর্মিতা, দয়া ও উদারতা বৃদ্ধি পায়। এটি আমার দৈনন্দিন আচরণকে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ করে। সামাজিকভাবে সবাই ভালোবাসে এবং ভরসা করে।
আমাদের পরিবার একবার আমাদের বাসায় ভিক্ষুদের উদ্দেশ্যে অষ্টপরিষ্কার দান করেছিল। সেদিন পাঁচজন ভিক্ষুসংঘ এবং আমাদের প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজন উপস্থিত ছিলেন। প্রথমে পণ্যশীল দিয়ে প্রার্থনা শুরু হয়, তারপর ভিক্ষুরা ধর্মদেশনা ও সূত্রপাঠ করেন। এরপর ভিক্ষুসংঘের উদ্দেশ্যে আট প্রকার দানীয় দ্রব্য: সংঘাটি, উত্তরাসংঘ, অন্তর্বাস, পিন্ডপাত্র, ক্ষুর-সূচ-সুতা, কটিবন্ধনী ও জল ছাঁকুনি দান করার জন্য প্রার্থনা করা হয়। আমরা ভক্তিচিত্তে ভিক্ষুদের এ দান করি এবং তিনবার সাধু। উচ্চারণ করে পুণ্য কামনা করি। পুরো অনুষ্ঠানে একধরনের শান্তি, ভক্তি ও ত্যাগের আবহ ছিল। আমি অনুভব করেছিলাম এই দানের মাধ্যমে ভিক্ষুসংঘ তাদের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে পারবেন, আর দাতারা পুণ্য ও মানসিক প্রশান্তি অর্জন করবেন। সেই দিনটি আমার মনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে কারণ আমি কাছ থেকে দেখেছি কীভাবে দান মানুষকে উদার, সহমর্মী ও শান্ত করে তোলে।
আমি প্রতিদিনের জীবনে ছোটো ছোটো ভালো কাজের মাধ্যমে কুশল কর্মের চর্চা করব। আমি প্রাণিহত্যা, মিথ্যা কথা বলা ও অন্যের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকব। আমি সবসময় সত্য কথা বলব, বড়োদের সম্মান করব, ছোটোদের ভালোবাসব। কেউ বিপদে পড়লে সহায়তা করব, যেমন: অসহায় বন্ধুকে পড়াশোনায় সহযোগিতা করা বা অসুখ প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো। আমি স্কুলের নিয়মিত পাঠ গ্রহণ করব এবং শিক্ষকদের পরামর্শ মেনে চলব। রাস্তায় ময়লা না ফেলে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখব। আমি আমার ধর্মের নিয়ম-নীতি যথাযথভাবে পালন করব এবং সর্বদা পরোপকারে আনন্দ খুঁজব। এভাবেই আমি কুশল কর্মচর্জা করে নিজের ও সমাজের মঙ্গলসাধন করব।
অশোক ছিলেন সমগ্র ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্রাট। তিনি তখন রাজ্য বিষ্কারের নেশায় মর ছিলেন। তাই তিনি সবসময় রাজ্য দখল ও বিদ্রোহ নির্মূল করতে যুদ্ধ করতেন। তেমনি এক যুদ্ধে (কলিঙ্গ যুন্দ) অসংখ্য মানুষ নিহত ও আহত হন। চারদিকে মৃতদেহ ও রন্দ্রের ছড়াছড়ি দেখে 'তাঁর মনে গভীর অনুশোচনা জন্ম নেয়। তিনি বুঝেছিলেন যে হিংসা, লোভ ও ক্ষমতার সালসায় কোনো সত্যিকারের সুখ বা পান্তি নেই। তিনি উপলব্দি করলেন যুদ্ধ মানুষকে মাংস করে;" কিন্তু ধর্ম ও করুণা মানুষকে পাড়ি দেয়। তাই তিনি গৌতম বুদ্ধের অহিংসা, দয়া ও সত্যের ধর্মে অনুপ্রাণিত হয়ে বৌদ্ধধর্ম
এহণ করেন। এরপর তিনি বাকি জীবন পাত্তি, দয়া, সহানুভূতি ও
মানবকল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করেন।
অষ্টপরিষ্কার দান অতি উত্তম দান। এ দানের মাধ্যমে দায়ক-দায়িকারা মহাপুণ্যফল লাভ করেন। অষ্টপরিষ্কার দানের
ফলে ভিন্ন ভিন্ন আটটি ফল লাভ করা যায়। যেমন-
১. সঙ্ঘাটি, উত্তরাসংঘ এবং অন্তর্বাস ভিক্ষুর পরিধেয় এই তিনটি বস্ত্রকে বলা হয় ত্রিচীবর'। এ চীবর দানের ফলে দাতা জন্ম-জন্মান্তরে কখনো বস্ত্রাভাব বোধ করেন না।
২. পিণ্ডপাত্র দান করলে দাতা জন্মে জন্মে বিত্তশালী হন।
৩. ক্ষুর দানের ফলে দাতা সর্বদা প্রজ্ঞাবান হয়ে জন্ম নেন।
৪. সূচ-সুতা দান করলে দাতা বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান হন।
৫. কটিবন্ধনী দানের ফলে দাতা দীর্ঘায়ু হন।
৬. জলছাঁকুনি দান করে দাতা নির্ভীক, নীরোগ ও সুশ্রী দেহধারী হন।
এছাড়া এই দানের ফলে দায়ক-দায়িকা জন্ম-জন্মান্তরে জ্ঞানী, বহু শাস্ত্রবিদ ও সুঠাম দেহের অধিকারী হয়। এ কারণে প্রত্যেক বৌদ্ধধর্ম অনুসারীর জীবনে অন্তত একবার অষ্টপরিষ্কার দান করা উচিত।
নিম্নে কুশল কর্ম ও অকুশল কর্মের মধ্যে পাঁচটি পার্থক্য দেখানো হলো:
| পার্থক্যের বিষয় | কুশল কর্ম | অকুশল কর্ম |
| অর্থ | কুশল কর্মের অর্থ ভালো, সৎ ও কল্যাণকর কাজ। | অকুশল শব্দের অর্থ মন্দ, অসৎ ও অকল্যাণকর কাজ। |
| মনোভাব | লোভ, হিংসা ও ঘৃণামুক্ত মন থেকে করা কাজ। | লোভ, হিংসা ঘৃণাপূর্ণ মন থেকে করা কাজ। |
| উদ্দেশ্য | নিজের ও অন্যের মঙ্গল কামনায় কাজ করা। | নিজের স্বার্থে বা অন্যের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে কাজ করা। |
| ফলাফল | কুশল কর্মের ফল, সুখ ও শান্তিদায়ক। | অকুশল কর্মের ফল দুঃখ, অশান্তি পীড়াদায়ক। ও |
| উদাহরণ | সত্য বলা, দান করা, প্রাণিহত্যা বর্জন, পরোপকার প্রভৃতি। | মিথ্যা বলা, চুরি করা প্রাণিহত্যা, প্রতারণা প্রভৃতি। |
Contribute high-quality content, help learners grow, and earn for your efforts! 💡💰'
Related Question
View Allআটটি শীলের সমন্বয়ে গঠিত শীলকে অষ্টশীল বলে।
শীলকে সকল কুশল কর্মের ভিত্তি বলা হয়।
অষ্টপরিষ্কার দানের দ্বারা মানুষের হয় মানবিক গুণাবলি অর্জিত!
ভিক্ষুর পরিধেয় সঙ্ঘাটি, উত্তরাসংঘ এবং অন্তর্বাস এই তিনটি বস্ত্রকে একত্রে ত্রিচীবর বলে।
শীল হলো পারমী পূরণের একটি অঙ্গ।
উচ্চশয্যায় ওমহাশয্যায় শয়ন থেকে বিরত থাকব-এ শিক্ষাপদ গ্রহণ করছি।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!