ভারতে পরবর্তী বৈদিক যুগে সমাজে শ্রেণিভেদ প্রথা প্রকট আকার ধারণ করে। ব্রাহ্মণরা উঁচু শ্রেণিভুক্ত হওয়ায় অপর শ্রেণির মানুষদের ভিন্ন চোখে দেখত। বিশেষত বৈশ্য ও শুদ্র শ্রেণির মানুষদের তারা মানুষই মনে করত না। এদের সাথে কোনো সম্পর্ক স্থাপন করত না।
যেকোনো প্রকারের সহিংসতা পরিত্যাগ করে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত আন্দোলনই অহিংস আন্দোলন। এ আন্দোলনের অপর নাম অহিংস সত্যাগ্রহ আন্দোলন। মহাত্মা গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ বিলোপের জন্য এ প্রকারের আন্দোলন প্রবর্তন করেন। পরবর্তীতে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে ব্রিটিশদের বিতাড়নের জন্যও অহিংস অসহযোগ নামে এক প্রকারের আন্দোলনপরিচালিত হয়। অহিংস, সত্যাগ্রহ এবং অসহযোগ এ তিন প্রকারের আন্দোলনে গান্ধী সব প্রকারের সহিংসতা পরিত্যাগের জন্য অনুসারীদের নির্দেশ প্রদান করেছিলেন।
উদ্দীপকে বর্ণিত বিষয়টির সাথে আফ্রিকায় প্রচলিত বর্ণবাদের সাদৃশ্য পাওয়া যায়।
ইউরোপীয় শাসনের মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের সূচনা হয়েছে। আফ্রিকায় উপনিবেশ গড়ে ওঠার সাথে সাথে শ্রমবিভাজন গড়ে ওঠে। উন্নত কাজগুলো শ্বেতাঙ্গ এবং নিম্নমানের কাজগুলো কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য নির্ধারিত হয়। এ শ্রমবিভাজনই কালে কালে বর্ণবাদে রূপ নেয়। ধারণা করা হয় মানুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা থেকে বৈষম্য জন্ম নেয়। সময়ের প্রেক্ষাপটে এ বৈষম্য সমাজে শক্তিশালীরূপে আবির্ভূত হয় এবং মানব সমাজে নেতিবাচক ভূমিকা রাখে। তবে বৈষম্যের চিত্র এক এক স্থানে এক এক রকম। কোথাও উৎপাদন, কোথাও পেশা, কোথাও ভাষা, কোথাও সংস্কৃতি, কোথাও ধর্ম আবার কোথাও বা বর্ণ। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ শুধু আফ্রিকার জন্য নয়, এটি সারা পৃথিবীর জন্য একটি কলঙ্কিত অধ্যায়। আফ্রিকা মহাদেশে নিগ্রোদের আবাসভূমি। সে আফ্রিকায়ই কালোরা নিপীড়িত হয়েছে। তারা এখানে বৈষম্যের শিকার হয়েছে। তাই সংখ্যালঘু সাদা সংখ্যাগুরু কালোদের ওপর যে নিপীড়ন চালিয়েছে তা অবসানের জন্য প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের প্রয়োজন ছিল। মহাত্মা গান্ধী, নেলসন ম্যান্ডেলা, ডেসমন্ড টুটু প্রভৃতি নেতারা বর্ণবাদের অবসানে আন্দোলন পরিচালনা করেন। ফলে ১৯৯০-এর দিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী নীতির অবসান ঘটে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে।
উক্ত ব্যবস্থা অর্থাৎ বর্ণবাদ আফ্রিকার সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম অন্তরায় ছিল।
কেননা একমাত্র বর্ণবাদী নীতির কারণে আফ্রিকার সমাজব্যবস্থায় ব্যাপক বিভাজন লক্ষ করা যেত। নাগরিকগণের মধ্যে সমন্বয়হীনতার জন্য আফ্রিকায় উন্নয়নের লক্ষ্যে কোনো ঐক্য গড়ে ওঠেনি। দক্ষিণ আফ্রিকার সকল অধিবাসীকে তাদের গায়ের বর্ণের পার্থক্যের ভিত্তিতে কৃষ্ণ, শ্বেত, মিশ্র ও ভারতীয় এভাবে বিভক্ত করা হয়েছিল। দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রত্যেক বর্ণের অধিবাসীদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়পত্রও তৈরি করা হয়। কৃষ্ণাঙ্গদের স্থানীয়ভাবে বাসস্থান নির্বাচন করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। বিশেষ অনুমতি ছাড়া দেশের ভিতরে স্বাধীনভাবে চলাচলের ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। কোনো কৃষ্ণাঙ্গ শহর এলাকায় ৭২ ঘণ্টার বেশি অবস্থান করতে পারত না। তাছাড়াও নাগরিক সুবিধার ক্ষেত্রে শ্বেতাঙ্গদের সাথে কৃষ্ণাঙ্গদের পার্থক্য করা হতো। যেমন- ১. একই বাড়িতে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের বসবাস নিষিদ্ধ করা হয়। ২. শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে বিবাহ এবং যৌন সম্পর্ক নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ৩. স্বামী-স্ত্রী একই কারখানায় কাজ না করলে একত্রে বসবাস করতে পারত না। ৪. শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য আলাদা যাত্রীবাহী বাসের ব্যবস্থা ছিল। ৫. হাসপাতাল, সিনেমা হল, চলাচলের রাস্তা, হাট-বাজার ও শৌচাগারের পৃথক ব্যবস্থা ছিল। ৬. শ্বেতাঙ্গ এলাকায় কৃষ্ণাঙ্গরা জমি ক্রয় করতে পারত না। ৭. নিম্নমানের কায়িক পরিশ্রম কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য নির্দিষ্ট ছিল। ৮. জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য কোনো ভোটাধিকার ছিল না। ৯. প্রচলিত বর্ণবাদী আইনের বিরুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গরা ধর্মঘট বা কোনো আন্দোলন করতে পারত না। ফলে দ্বিধাবিভক্ত সমাজব্যবস্থা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে উন্নয়ন ঘটাতে ব্যর্থ হয়। তাই বলা যায়, বর্ণবাদ ব্যবস্থা আফ্রিকার সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম অন্তরায় ছিল।
ফ্রেডারিক উইলিয়াম দ্য ক্লার্ক (১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দ) (Frederik Willem de Klerk 1936): ফ্রেডারিক উইলিয়াম ডি ক্লার্ক দক্ষিণ আফ্রিকার বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিত্ব। দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ শাসনের সমর্থক রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল পার্টির নেতা। তিনি ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বর্ণবাদের সমর্থক সরকারের সর্বশেষ শ্বেতাঙ্গ রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্য দূরীকরণে সহায়তা করেন। সব বৈষম্য দূর করে রাষ্ট্রের সব নাগরিকের সমান অধিকার ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ তিনিই প্রথম গ্রহণ করেন। শ্বেতাঙ্গ শাসনের সমর্থক রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল পার্টির দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকাকে বর্ণবৈষম্যহীন দেশরূপে গঠনের ঘোষণা দেন। তিনি ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের African National Congress (ANC) এবং The Communist Party of South Africa-এর উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেন।
নেলসন ম্যান্ডেলাসহ অন্য রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্ত করে দেন। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্য আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত করে দেন। তার সময়কালকে বলা হয় ন্যাশনাল পার্টি ও আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের মধ্যে আলোচনার যুগ। ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে তার উদ্যোগে গণভোটের মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বর্ণবৈষম্যের অবসান হয়। বর্ণবৈষম্য দূরীকরণের জন্য তিনি ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে নেলসন ম্যান্ডেলার সাথে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। দক্ষিণ আফ্রিকায় গণতন্ত্রের নতুন যুগের সূচনা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রেক্ষাপটে তারা এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে নেলসন ম্যান্ডেলা রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তিনি উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেন। তিনি বিশ্বমানবতার কল্যাণের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সভা, সমিতি ও সেমিনারে বক্তৃতা দেন। শ্বেতাঙ্গ হয়েও কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ে তার অবদান চিরস্মরণীয়।'
মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র (১৯২৯-১৯৬৮) (Martin Luther King Jr. (1929-1968): ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৮শে আগস্ট ওয়াশিংটনে লাখ লাখ মানুষের মিছিলে মার্টিন লুথার কিং-এর দেওয়া বক্তৃতা 'I have a dream...' কখনো ভোলার নয়। সেই বক্তৃতায় মার্টিন লুথার আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণায় সব মানুষের সমান অধিকারের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, "স্বাধীনতার শতবর্ষ পরেও মর্মান্তিক সত্য হচ্ছে, নিগ্রোরা আজও মুক্ত নয়। নিজ বাসভূমেই নিগ্রো মানুষেরা নির্জীব দশায় পড়ে আছে....।" মার্টিন লুথার বলেন, "বন্ধুরা, বর্তমানের প্রতিকূলতা ও বাধা সত্ত্বেও আমি আজও স্বপ্ন দেখি। আমার এ স্বপ্নের শেকড় পাতা আমেরিকান স্বপ্নের গভীরে। আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন এ জাতি জাগবে এবং বাঁচিয়ে রাখবে এ বিশ্বাস: আমার এ সত্যকে স্বতঃসিদ্ধভাবে গ্রহণ করেছি; সব মানুষ সমান।
আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন জর্জিয়ার লাল পাহাড়ে সাবেক দাস আর সাবেক দাস মালিকের সন্তানরা ভ্রাতৃত্বের এক টেবিলে বসতে সক্ষম হবে। আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন মরুময় মিসিসিপি রাজ্য, অবিচার আর নিপীড়নের উত্তাপে দম বন্ধ করা মিসিসিপি হয়ে উঠবে মুক্তি আর সুবিচারের মরূদ্যান। আমি স্বপ্ন দেখি, আমার চার সন্তান একদিন এমন এক জাতির মধ্যে বাস করবে, যেখানে তাদের চামড়ার রং দিয়ে নয় তাদের চরিত্রের গুণ দিয়ে তারা মূল্যায়িত হবে। আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন আলাবামা রাজ্যে সেখানকার গভর্নরের ঠোঁট থেকে কেবলই বিধিনিষেধ আর গঞ্জনার বাণী ঝরে সেখানকার পরিস্থিতি এমনভাবে বদলে যাবে যে, কালো বালক আর বালিকারা সাদা বালক আর বালিকাদের সঙ্গে ভাই-বোনের মতো হাত ধরাধরি করবে। আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন সব উপত্যকা উত্তীর্ণ হবে, সব পাহাড়-পর্বত হবে আনত, এবড়োখেবড়ো জমিন মসৃণ হবে, আঁকাবাঁকা জায়গাগুলো সমান হবে এবং ঈশ্বরের জয় উদ্ভাসিত হবে এবং একসঙ্গে সব মানব তা চাক্ষুষ করবে। .... এ-ই আমার স্বপ্ন।"২
বিশ্বসভ্যতার এক নিন্দনীয় ও সমালোচনার বিষয় বর্ণবাদ, যা মানব ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। আফ্রিকার কালো মানুষেরাই বেশি বর্ণবৈষম্যের শিকার। শ্বেতকায় মানুষগুলো অশ্বেতকায় মানুষের প্রতি যে বৈষম্যমূলক ঘৃণ্য আচরণ করে তা-ই বর্ণবাদ। মানুষের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের একটি হচ্ছে তার ত্বক। চামড়ার বর্ণগত তারতম্যের কারণে কেউ সাদা, কেউ কালো, আবার কেউ বর্ণসংকর। নৃতাত্ত্বিকভাবে নরগোষ্ঠীকে প্রধানত চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ককেশয়েড, অস্ট্রালয়েড, মঙ্গোলয়েড এবং নিগ্রোয়েড। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের ককেশয়েড অর্থাৎ শ্বেতাঙ্গরা অন্য বর্ণের বিশেষ করে নিগ্রোদের বা কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি যে বৈষম্যমূলক আচরণ করে তা-ই বর্ণবাদ। এটি মনোচৈতন্যের একটি বিষয়। আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ জনগণের উপর সাম্রাজ্যবাদী শক্তির জঘন্যতম নিষ্ঠুর প্রথাই বর্ণবাদ। একবিংশ শতাব্দীতে এসে মানবতাবিরোধী এ প্রথা থেকে মুক্তির আন্দোলনের অগ্রদূত ছিলেন মহাত্মা গান্ধী, যাকে অনুসরণ করেন বিশ্বমানবতার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা এবং আরেক জীবন্ত কিংবদন্তি ডেসমন্ড টুটু। এ মনীষীদের আন্দোলনে বর্ণবাদ আজ ইতিহাসের পাতায় আবদ্ধ। এ অধ্যায়ের বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের পথিকৃৎদের জানা শিক্ষার্থীদের জন্য অতি জরুরি। এতে তাদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি জাগ্রত হবে। শিক্ষার্থীদের মানবিক মূল্যবোধ ও ইতিবাচক আচরণ সৃষ্টিতে এ অধ্যায়ের পাঠগুলো সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন-ড. সৈয়দ মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী স্যারে এর লেখা বই
ফ্রান্সের অভিজাতগণ দাবি করেন, অভিজাতরা বহিরাগত বিজেতা জাতি ফ্রাঙ্ক-এর বংশধর। ফ্রাঙ্কিশগণ যেহেতু শ্রেষ্ঠ এবং তাদের দ্বারাই ফ্রান্স প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেহেতু জন্মগতভাবেই তারা তৃতীয় শ্রেণির চেয়ে শ্রেষ্ঠ। এ কারণে সকল প্রকার রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা, নেতৃত্ব অভিজাতদের প্রাপ্য। তৃতীয় শ্রেণির লোকদের তারা বলে, এরা দাসদের সাথে সংকরায়নের ফলে উদ্ধৃত এজন্য তারা নিকৃষ্ট। আর এভাবে ফ্রান্সে বৈষম্য সৃষ্টি হয়।
উদ্দীপকের বিষয়টি আমার পাঠ্যবইয়ের বর্ণবাদ প্রথার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। উদ্দীপকে বর্ণিত জুয়েলের গায়ের রং ফর্সা, তমালের গায়ের রং কালো। এ কারণে জুয়েল তমালকে ঘৃণার চোখে দেখে। জুয়েল মনে করে, তমালদের পূর্বপুরুষ নীচু জাতের। এজন্যই তমালের গায়ের রং কালো। উদ্দীপকের এ ঘটনার সাথে পাঠ্যবইয়ের বর্ণবাদ প্রথার সাদৃশ্য রয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের কারণে বর্ণবাদের ধারণার সৃষ্টি হয়। বর্ণবাদ মানব সমাজে বিদ্যমান একটি ঘৃণ্যপ্রথা। আমেরিকা ও দক্ষিণ আফ্রিকায় এ প্রথা মানবতাকে কলঙ্কিত করেছিল। শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে আধিপত্যের প্রতিযোগিতা উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে জাতিগত দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের বীজ বপন করে দীর্ঘকাল টিকেছিল। বর্ণবাদের মর্মকথা হলো শ্বেতাঙ্গরা জন্মগতভাবে কৃষ্ণাঙ্গদের বা অন্যান্য জাতি অপেক্ষা উৎকৃষ্ট এবং দ্বিতীয় শ্রেণির ওপর কর্তৃত্ব করার অধিকার আছে এবং তাদের প্রতি বৈষম্য আচরণ করা দোষের কিছু নয়।' পরিশেষে বলা যায়, উপনিবেশবাদ ও চরম জাতীয়তাবাদের ধারণা থেকেই বর্ণবাদের সৃষ্টি হয়েছে।
হ্যাঁ, আমি মনে করি উক্ত ধারণার জন্য অর্থাৎ বর্ণবাদ প্রথার জন্য অনেক দেশে সংঘাত সৃষ্টি হয়েছিল। আমেরিকা ও আফ্রিকা মহাদেশে বর্ণবাদের কারণে সংঘাত সৃষ্টি * হয়েছিল। আমেরিকা মহাদেশে কৃষিকাজ ও অন্যান্য শ্রম কাজের জন্য আফ্রিকা থেকে নিগ্রোদের সেখানে নিয়ে যাওয়া হতো। আফ্রিকার কালো মানুষের প্রতি আমেরিকার শ্বেতাঙ্গরা বর্ণবাদ নীতি অনুসরণ করত। আমেরিকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাস, ট্রেন, খাবারের দোকান প্রভৃতি ক্ষেত্রে শ্বেতাঙ্গরা কৃষ্ণাঙ্গদের সাথে বর্ণবাদ নীতি অনুসরণ করত। দক্ষিণ আফ্রিকায় ঔপনিবেশিক শাসনামলে শ্বেতাঙ্গরা কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর কর্তৃত্ব করত। কৃষ্ণাঙ্গরা খনি এবং কঠিন কাজে নিয়োগ পেত; কিন্তু মজুরি পেত কম আর শ্বেতাঙ্গরা কম পরিশ্রমে বেশি বেতন পেত। এমনকি আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের অভিবাসী শ্বেতাঙ্গরাও শ্বেতাঙ্গ শাসকদের কাছে পক্ষপাতমূলক আচরণ পেত। স্থানীয় ভারতীয় বিচারকরা ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গদের বিচার করতে পারত না। বর্ণবাদ প্রথার কারণে আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বহুদেশে সংঘাত হয়েছে।পরিশেষে বলা যায়, বর্ণবাদ প্রথার কারণে আমেরিকা ও আফ্রিকাসহ বহু দেশে সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে।
১৯১২ সালের ৮ জানুয়ারি দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের প্রথম জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক সংগঠন আফ্রিকান জাতীয় কংগ্রেস সংক্ষেপে ANC প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সংগঠন আফ্রিকানদের সংহতি, যাবতীয় ধরনের বর্ণবৈষম্যবাদের বিরোধিতা করে এবং বর্ণবৈষম্যমুক্ত একীভূত ও গণতান্ত্রিক দক্ষিণ আফ্রিকা প্রতিষ্ঠার পক্ষে ঘোষণা দেয়।