ফ্রেডারিক উইলিয়াম দ্য ক্লার্ক (১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দ) (Frederik Willem de Klerk 1936): ফ্রেডারিক উইলিয়াম ডি ক্লার্ক দক্ষিণ আফ্রিকার বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিত্ব। দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ শাসনের সমর্থক রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল পার্টির নেতা। তিনি ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বর্ণবাদের সমর্থক সরকারের সর্বশেষ শ্বেতাঙ্গ রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্য দূরীকরণে সহায়তা করেন। সব বৈষম্য দূর করে রাষ্ট্রের সব নাগরিকের সমান অধিকার ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ তিনিই প্রথম গ্রহণ করেন। শ্বেতাঙ্গ শাসনের সমর্থক রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল পার্টির দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকাকে বর্ণবৈষম্যহীন দেশরূপে গঠনের ঘোষণা দেন। তিনি ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের African National Congress (ANC) এবং The Communist Party of South Africa-এর উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেন।

নেলসন ম্যান্ডেলাসহ অন্য রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্ত করে দেন। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্য আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত করে দেন। তার সময়কালকে বলা হয় ন্যাশনাল পার্টি ও আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের মধ্যে আলোচনার যুগ। ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে তার উদ্যোগে গণভোটের মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বর্ণবৈষম্যের অবসান হয়। বর্ণবৈষম্য দূরীকরণের জন্য তিনি ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে নেলসন ম্যান্ডেলার সাথে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। দক্ষিণ আফ্রিকায় গণতন্ত্রের নতুন যুগের সূচনা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রেক্ষাপটে তারা এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে নেলসন ম্যান্ডেলা রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তিনি উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেন। তিনি বিশ্বমানবতার কল্যাণের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সভা, সমিতি ও সেমিনারে বক্তৃতা দেন। শ্বেতাঙ্গ হয়েও কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ে তার অবদান চিরস্মরণীয়।'
মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র (১৯২৯-১৯৬৮) (Martin Luther King Jr. (1929-1968): ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৮শে আগস্ট ওয়াশিংটনে লাখ লাখ মানুষের মিছিলে মার্টিন লুথার কিং-এর দেওয়া বক্তৃতা 'I have a dream...' কখনো ভোলার নয়। সেই বক্তৃতায় মার্টিন লুথার আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণায় সব মানুষের সমান অধিকারের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, "স্বাধীনতার শতবর্ষ পরেও মর্মান্তিক সত্য হচ্ছে, নিগ্রোরা আজও মুক্ত নয়। নিজ বাসভূমেই নিগ্রো মানুষেরা নির্জীব দশায় পড়ে আছে....।"
মার্টিন লুথার বলেন, "বন্ধুরা, বর্তমানের প্রতিকূলতা ও বাধা সত্ত্বেও আমি আজও স্বপ্ন দেখি। আমার এ স্বপ্নের শেকড় পাতা আমেরিকান স্বপ্নের গভীরে। আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন এ জাতি জাগবে এবং বাঁচিয়ে রাখবে এ বিশ্বাস: আমার এ সত্যকে স্বতঃসিদ্ধভাবে গ্রহণ করেছি; সব মানুষ সমান।

আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন জর্জিয়ার লাল পাহাড়ে সাবেক দাস আর সাবেক দাস মালিকের সন্তানরা ভ্রাতৃত্বের এক টেবিলে বসতে সক্ষম হবে। আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন মরুময় মিসিসিপি রাজ্য, অবিচার আর নিপীড়নের উত্তাপে দম বন্ধ করা মিসিসিপি হয়ে উঠবে মুক্তি আর সুবিচারের মরূদ্যান। আমি স্বপ্ন দেখি, আমার চার সন্তান একদিন এমন এক জাতির মধ্যে বাস করবে, যেখানে তাদের চামড়ার রং দিয়ে নয় তাদের চরিত্রের গুণ দিয়ে তারা মূল্যায়িত হবে। আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন আলাবামা রাজ্যে সেখানকার গভর্নরের ঠোঁট থেকে কেবলই বিধিনিষেধ আর গঞ্জনার বাণী ঝরে সেখানকার পরিস্থিতি এমনভাবে বদলে যাবে যে, কালো বালক আর বালিকারা সাদা বালক আর বালিকাদের সঙ্গে ভাই-বোনের মতো হাত ধরাধরি করবে। আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন সব উপত্যকা উত্তীর্ণ হবে, সব পাহাড়-পর্বত হবে আনত, এবড়োখেবড়ো জমিন মসৃণ হবে, আঁকাবাঁকা জায়গাগুলো সমান হবে এবং ঈশ্বরের জয় উদ্ভাসিত হবে এবং একসঙ্গে সব মানব তা চাক্ষুষ করবে।
.... এ-ই আমার স্বপ্ন।"২
বিশ্বসভ্যতার এক নিন্দনীয় ও সমালোচনার বিষয় বর্ণবাদ, যা মানব ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। আফ্রিকার কালো মানুষেরাই বেশি বর্ণবৈষম্যের শিকার। শ্বেতকায় মানুষগুলো অশ্বেতকায় মানুষের প্রতি যে বৈষম্যমূলক ঘৃণ্য আচরণ করে তা-ই বর্ণবাদ। মানুষের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের একটি হচ্ছে তার ত্বক। চামড়ার বর্ণগত তারতম্যের কারণে কেউ সাদা, কেউ কালো, আবার কেউ বর্ণসংকর। নৃতাত্ত্বিকভাবে নরগোষ্ঠীকে প্রধানত চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ককেশয়েড, অস্ট্রালয়েড, মঙ্গোলয়েড এবং নিগ্রোয়েড। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের ককেশয়েড অর্থাৎ শ্বেতাঙ্গরা অন্য বর্ণের বিশেষ করে নিগ্রোদের বা কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি যে বৈষম্যমূলক আচরণ করে তা-ই বর্ণবাদ। এটি মনোচৈতন্যের একটি বিষয়। আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ জনগণের উপর সাম্রাজ্যবাদী শক্তির জঘন্যতম নিষ্ঠুর প্রথাই বর্ণবাদ। একবিংশ শতাব্দীতে এসে মানবতাবিরোধী এ প্রথা থেকে মুক্তির আন্দোলনের অগ্রদূত ছিলেন মহাত্মা গান্ধী, যাকে অনুসরণ করেন বিশ্বমানবতার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা এবং আরেক জীবন্ত কিংবদন্তি ডেসমন্ড টুটু। এ মনীষীদের আন্দোলনে বর্ণবাদ আজ ইতিহাসের পাতায় আবদ্ধ। এ অধ্যায়ের বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের পথিকৃৎদের জানা শিক্ষার্থীদের জন্য অতি জরুরি। এতে তাদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি জাগ্রত হবে। শিক্ষার্থীদের মানবিক মূল্যবোধ ও ইতিবাচক আচরণ সৃষ্টিতে এ অধ্যায়ের পাঠগুলো সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন-ড. সৈয়দ মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী স্যারে এর লেখা বই
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
Concept of Racism
কোনো নরগোষ্ঠীর প্রতি ভিন্ন গাত্রবর্ণের অন্য নরগোষ্ঠী বা জনগোষ্ঠী গাত্রবর্ণের ভিন্নতার কারণে যে অসাম্যমূলক আচরণ করে তা-ই বর্ণবাদ। গাত্রবর্ণের ভিন্নতার জন্য রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বৈষম্যমূলক আচরণের নীতি বর্ণবাদ। ইংরেজি Race শব্দ থেকে Racism বা Racialism শব্দের উৎপত্তি, যার বাংলা প্রতিশব্দ বর্ণবাদ। সাধারণত বর্ণবাদ বলতে বোঝায় মানুষের দৈহিক গঠন, গায়ের রং, ধর্ম, বংশপরিচয়, আবাসস্থল প্রভৃতির বিচারে মানুষকে বিভক্ত করে কাউকে উচ্চ শ্রেণির আবার কাউকে নিম্ন শ্রেণির মানুষ হিসেবে শ্রেণিকরণের মাধ্যমে সামাজিক সুযোগ-সুবিধা বণ্টনের তারতম্য করা।
সংখ্যালঘিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গ দ্বারা শাসিত দক্ষিণ আফ্রিকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষ্ণকায়দের প্রতি যে অমানবিক বৈষম্যমূলক আচরণ ও নীতি অনুসৃত হয় তা-ই বর্ণবাদ; দক্ষিণ আফ্রিকার স্থানীয় ভাষায় যাকে বলে Apartheid- অর্থাৎ আলাদাকরণ। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ সরকার ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে যে বর্ণবৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করে তাকে Apartheid বলা হয়। অর্থাৎ বর্ণ-বর্ণ পৃথকীকরণ।
বর্ণবাদ প্রত্যয়টি বর্ণবাদে বিশ্বাসী নৃবিজ্ঞানীদের ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত। তাদের মতে, বিভিন্ন নরগোষ্ঠী (ককেশয়েড, অস্ট্রালয়েড, মঙ্গোলয়েড, নিগ্রোয়েড) বিভিন্ন জৈব বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এবং জৈব বৈশিষ্ট্যের কারণে এক নরগোষ্ঠী থেকে অন্য নরগোষ্ঠী উৎকৃষ্ট বা নিকৃষ্ট হয়। উৎকৃষ্ট নরগোষ্ঠী জ্ঞান-বিজ্ঞান, সংস্কৃতি-
সভ্যতায় অভাবনীয় উন্নতি সাধন করেছে। নিকৃষ্ট বা নীচ জনগোষ্ঠী নিষ্কর্মা, অসভ্য, অমার্জিত, দাস ও পশ্চাদগামী প্রজা। যেহেতু উৎকৃষ্টরা সভ্যতার ধারক-বাহক, তাই তাদের রক্তের পবিত্রতা ও বিশুদ্ধতা রক্ষা করা প্রয়োজন। অন্যথায় প্রগতি ব্যাহত হবে। উৎকৃষ্ট ও নিকৃষ্টের মধ্যে অবাধ রক্ত সংমিশ্রণ হলে সভ্যতার ধ্বংস অনিবার্য। ফলে দেখা যাচ্ছে বর্ণবাদী নৃবিজ্ঞানীরাই বর্ণবৈষম্য সৃষ্টির ইন্ধনদাতা। তাদের এ ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা উপযুক্ত পরিবেশে যেকোনো নরগোষ্ঠীই প্রগতির ধারায় অবদান রাখতে সক্ষম। উদাহরণ হিসেবে মঙ্গোলিয়ান নরগোষ্ঠীর দেশ চীন ও জাপানের নাম নেওয়া যায়।
কাজেই নরগোষ্ঠীর উৎকৃষ্ট ও নিকৃষ্টের ধারণা, বিশ্বাস ও মনোভাবই বর্ণবৈষম্যবাদ। সমাজবিজ্ঞানী জেরি অ্যান্ড জেরি সমাজবিজ্ঞান অভিধানে বলেন, "বর্ণবৈষম্যবাদ হলো এরূপ বিশ্বাস, আদর্শ ও সামাজিক প্রক্রিয়ার এক ধারণাগুচ্ছ, যা একটি নরগোষ্ঠীকে ধারণাকৃত সদস্যতার ভিত্তিতে অন্যদের থেকে বৈষম্যমূলক বলে জ্ঞান করে।"
জন এম. সেপার্ড তার সমাজবিজ্ঞান গ্রন্থে বলেন, "বর্ণবাদ হলো একটি আদর্শ, যা একটি জনগোষ্ঠীর দৈহিক বৈশিষ্ট্যকে তাদের মনস্তাত্ত্বিক তথা বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকৃষ্টতা-নিকৃষ্টতার সাথে সম্পর্কিত করে।"
বর্ণবাদ উদ্ভবের পটভূমি
আফ্রিকায় বর্ণবাদের সূচনা ঔপনিবেশিক শাসনের মাধ্যমে। আর আমেরিকায় বর্ণবাদের সূচনা সপ্তদশ শতকে দাসপ্রথার প্রসারের ফলে। আফ্রিকা কালোদের আবাসভূমি। ইউরোপীয়রা আফ্রিকা আবিষ্কারের পর পনেরো শতক থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত মাত্র ১০% আফ্রিকায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। সপ্তদশ শতকে সেখানে তারা উপনিবেশ গড়ে তোলে। দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গরা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় স্থায়ী আবাস গড়ে তোলে এবং উনিশ শতকে তারা আফ্রিকার ৯০% অঞ্চল দখল করে নেয়। পর্তুগিজ, ওলন্দাজ এবং সর্বশেষ ফরাসিরা আফ্রিকায় প্রথমে দাসব্যবসা শুরু করে এবং পরে খামার গড়ে তুলতে শুরু করে। তাদের খামারে স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গরা শ্রমিক হিসেবে কাজ পায়। ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটতে থাকলে তারা শ্বেতাঙ্গ জনসংখ্যা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়। ডাচ কোম্পানি স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে বিয়ের জন্য অভিভাবকহীন শ্বেতাঙ্গ নারী বা বালিকাদের ইউরোপ থেকে আমদানি করে। এভাবেই আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। আরব ও তুর্কি দাসব্যবসায়ীরা কৃষ্ণাঙ্গদের আফ্রিকা থেকে আমদানি করে আমেরিকায় চালান করতে থাকে। এ জঘন্য ব্যবসা দাসপ্রথার জন্ম দেয়। দাসপ্রথা ঔপনিবেশিক যুগের উত্তরাধিকার। দাসপ্রথা সামাজিক স্তরবিন্যাসের অন্যতম প্রধান কারণ। এটি অসম সামাজিক সম্পর্কের চরম নিদর্শন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হলো একটি অভিবাসী রাষ্ট্র। আমেরিকা আবিষ্কারের পরই ঔপনিবেশিক শাসনের সুযোগ নিয়ে ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গরা আমেরিকায় পাড়ি জমায়। সংখ্যালঘিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও তারা সংখ্যাগরিষ্ঠদের শাসন-শোষণ করার জন্য নানা বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করে। বর্ণবাদে বিশ্বাসী নৃবিজ্ঞানীরা শ্বেতাঙ্গদের উৎকৃষ্ট ও অশ্বেতাঙ্গদের নিকৃষ্ট বলে নরগোষ্ঠী বিভাজন করেন। এ বিভাজন ও পৃথকীকরণই সমাজব্যবস্থায় বর্ণবাদের জন্ম দেয়। শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে এ রকম একটা মিথ তৈরি হয় যে, তারাই সভ্য। তারাই শ্রেষ্ঠ রক্তের অধিকারী। অশ্বেতাঙ্গরা অসভ্য, বর্বর; এরা দেখতে বিশ্রী। এ অহংবোধ তাদের মধ্যে এক ধরনের নীচ মানসিকতার জন্ম দেয়। শ্বেতাঙ্গরা দেখতে সুন্দর ও সুঠাম দেহের অধিকারী বলে অপেক্ষাকৃত উন্নত কাজগুলো তারা করবে বলে স্থির করে। কৃষ্ণাঙ্গরা দেখতে বিশ্রী বলে নিম্নমানের কাজ তাদেরই মানায়। এ শ্রমবিভাজনই বর্ণবাদের রূপ নেয়। আমেরিকার শ্বেতাঙ্গদের ধারণা, কৃষ্ণাঙ্গরা সবাই ক্রীতদাস। তাই দাসত্বসুলভ ও অমর্যাদাকর আচরণই তাদের প্রাপ্য। ইউরোপীয়দের সংখ্যা আফ্রিকায় বাড়তে থাকলে তারা নিজেদের সুবিধার্থে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ইত্যাদি এবং শ্বেতাঙ্গ সমাজ গড়ে তোলে। বিভাজন অতিমাত্রায় প্রকাশ পেলে সৃষ্টি হয় চাপা সংঘাতের। উৎকৃষ্ট ও নিকৃষ্টতার জটিল দ্বন্দ্বে অসম বর্ণের মধ্যে যে সংঘাতের পরিবেশ সৃষ্টি হয় তা-ই বর্ণবাদ।
১৯১০ খ্রিষ্টাব্দের ৩১শে মে কেপ কলোলি, নাটাল, ট্রান্সভাল ও অরেঞ্জ ফ্রি স্টেট- এ চারটি ব্রিটিশ উপনিবেশের মিলনে গঠন করা হয় দক্ষিণ আফ্রিকা ইউনিয়ন। প্রথম গভর্নর জেনারেল হন ভাইকাউন্ট গ্লাডস্টোন এবং প্রধানমন্ত্রী হন জেনারেল বোথা। ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে ইউনিয়নটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ইউনিয়ন থাকাকালীন অর্থাৎ ১৯১০-৬০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যেই বর্ণবাদের চরম রূপ লক্ষ করা যায়, যা উনবিংশ শতকের নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকা ইউনিয়ন শুরু থেকে পৃথকীকরণ ও সমন্বয়করণ নীতি অনুসরণ করে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত বর্ণবাদ প্রকট রূপ না নিলেও ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে ন্যাশনালিস্ট পার্টি দেশের ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে বর্ণবাদ আফ্রিকার সরকারি নীতিতে পরিণত হয়। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার ৭টি বর্ণবাদসংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করে, যা ছিল মূলত বর্ণবাদের ৭টি স্তম্ভ। এ আইনগুলো মানুষে মানুষে বিভেদ বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আইনগুলো নিম্নরূপ:
১। জনসংখ্যা নিবন্ধীকরণ আইন (১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ) এ আইনে আফ্রিকার সকল নবজাতকের বর্ণ ও গোত্র অনুযায়ী নিবন্ধীকরণ বাধ্যতামূলক করা হয়।
২। আবাসভূমি পৃথকীকরণ আইন (১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ): এ আইনের দ্বারা কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গদের আবাসভূমি পৃথক করা হয়।
৩।ভূমি আইন: এ আইনের দ্বারা দক্ষিণ আফ্রিকার ১৩% অনুর্বর ভূমি ২০.৬ মিলিয়ন কৃষ্ণাঙ্গের জন্য নির্ধারণ করা হয়। অথচ মোট জনসংখ্যার ভাগ ছিল কৃষ্ণাঙ্গ।
৪। পাস আইন: ১৬ বছরের উপরে প্রত্যেক কৃষ্ণাঙ্গ নরনারীকে পুলিশকে পরিচয়পত্র প্রদর্শন করা এ আইনে বাধ্যতামূলক করা হয়।
৫। নাগরিক আইন: এ আইনে দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়।
৬। পৃথক সুবিধা আইন: কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গদের জন্য পৃথক পৃথক নাগরিক সুবিধা এ আইনের মাধ্যমে করা হয়।
৭। অনৈতিক আইন: এ আইনের মাধ্যমে কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে। করা হয়। বাহিক বা যৌন সম্পর্ক নিষিদ্ধ
বর্ণবাদের কারণ
বর্ণবাদ সৃষ্টির কারণকে রাজনৈতিক, ধর্মীয়, জাতিগত, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক- এ পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়। যেগুলোর একটির সাথে অন্যটির সম্পৃক্ততা আছে।
রাজনৈতিক কারণ
শ্বেতাঙ্গরা কালোদের রাজনৈতিক সচেতনতাকে ভীতির নজরে দেখত। তাদের ধারণা ছিল, কৃষ্ণাঙ্গরা নেতৃত্বদানে অযোগ্য। তারা মনে করত, কালোরা রাজনৈতিকভাবে সচেতন হলে শ্বেতাঙ্গদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় হুমকি আসবে। তাই তারা বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করে কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকারবঞ্চিত করার প্রয়াস নেয়। শ্বেতাঙ্গদের এ দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণবাদের একটি কারণ।
ধর্মীয় কারণ
ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গরা বিশেষ করে ক্যালভিন খ্রিষ্টানরা এ রকম ধারণা পোষণ করত যে, সকল অখ্রিষ্টীয় ব্যক্তিই অসভ্য, নীচ জাতির সন্তান এবং তারা সকলেই স্বর্গীয় অনুগ্রহ লাভে বঞ্চিত। অর্থাৎ সাদা-কালোর মধ্যে একটা বৈষম্যমূলক রেখা টানতে ক্যালভিনের মতবাদ সাহায্য করে। কাজেই ধর্মীয় ক্ষেত্রে বৈষম্য সৃষ্টি বর্ণবাদের জন্ম দেয়।
জাতিগত কারণ
বিশ্বে শ্বেতাঙ্গদের দ্বারাই বর্ণবাদের বিকাশ ঘটেছে; বিশেষ করে আফ্রিকায়। অশ্বেতাঙ্গরা জাতি হিসেবে শ্রেষ্ঠ নয় বলে শ্বেতাঙ্গরা সর্বক্ষেত্রেই নিজেদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে। ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা আফ্রিকায় কাজের সন্ধানে পাড়ি জমায়। জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের মিথকে কাজে লাগিয়ে শ্বেতাঙ্গরা আফ্রিকায় নিগ্রো ও ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের শোষণ করে, যা বর্ণবাদ সৃষ্টিকে ত্বরান্বিত করে।
অর্থনৈতিক কারণ
আফ্রিকায় বর্ণবাদ সৃষ্টির অন্যতম কারণ অর্থনৈতিক। আফ্রিকা খনিজ সম্পদে ভরপুর। উনবিংশ শতাব্দীতে খনিজ সম্পদ আবিষ্কৃত হতে থাকলে ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গরা খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিতে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি আরও বেশি বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু করে। নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থে কালোদের সম্পদ থেকে বঞ্চিত করার নীতি গ্রহণ করে। এ লক্ষ্যে তারা আইনও প্রণয়ন করে, যা বর্ণবাদ ও বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরিতে সহায়ক হয়।
সাংস্কৃতিক কারণ
শ্বেতাঙ্গরা সাংস্কৃতিক কারণেও বর্ণবাদনীতি গ্রহণ করে। রেনেসাঁ-পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয়রা সমগ্র বিশ্বের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে। কৃষ্ণাঙ্গরা ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে। তাই শ্বেতাঙ্গরা বর্ণবাদনীতির মাধ্যমে নিজেদের সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার বর্ণবাদী নীতি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হয়।
বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন-ড. সৈয়দ মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী স্যারে এর লেখা বই
বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের পথিকৃৎদের কর্মপন্থায় ভিন্নতা থাকলেও সবার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল সমাজ ও রাষ্ট্রীয় শোষণ থেকে বর্ণবিদ্বেষী আইন দূর করা। নরগোষ্ঠীগত বিভেদ দূর করে সাম্য প্রতিষ্ঠা করা। মহাত্মা গান্ধী, ডেসমন্ড টুটু ও নেলসন ম্যান্ডেলা আফ্রিকাকেন্দ্রিক বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা। মার্টিন লুথার কিং-এর আন্দোলনের ক্ষেত্র ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কর্মের দ্বারা আজ তারা বিশ্বের শ্রদ্ধেয় ও বরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাদের কর্ম ও দর্শন তাদেরকে এক-একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে।
মহাত্মা গান্ধী (১৮৬৯-১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দ।
Mahatma Gandhi 1869-1948
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ২রা অক্টোবর বর্তমান গুজরাটের অন্তর্গত সমুদ্রতীরবর্তী কাথিয়াবাড় উপদ্বীপের পোরবন্দরে জন্মগ্রহণ করেন। আত্মার উদারতার জন্যই তিনি 'মহাত্মা' নামে খ্যাতি লাভ করেন। তার পিতার নাম করমচাঁদ গান্ধী এবং মায়ের নাম পুতলি বাঈ। তিনি পিতামাতার সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। তার পিতামাতা উভয়েই ছিলেন আচারনিষ্ঠ হিন্দু; মা ছিলেন পাপনাথী সম্প্রদায়ের অনুগামী। তারা সর্বধর্মের সংমিশ্রণে বিশ্বাসী ছিল।
পোরবন্দরের পাঠশালায় তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। মোহনদাসের সাত বছর বয়সে পিতা স্থানান্তরিত হয়ে সপরিবারে রাজকোটে চলে আসেন।' এখানের প্রাথমিক স্কুল শেষ করে রাজকোটের তালুক বিদ্যালয়ে এবং পরে কাথিয়াবাড় উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। প্রবেশিকা পাস করে তিনি সমলদাস কলেজে কিছুদিন পড়ালেখা করেন। এ সময় উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য তিনি লন্ডন যেতে আগ্রহী হয়ে উঠলে তাকে লন্ডন পাঠানো হয়। ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর মাত্র ১৮ বছর বয়সে ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দের ৪ঠা সেপ্টেম্বর তিনি ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য লন্ডনে যান এবং ইনার টেম্পল কলেজ থেকে ব্যারিস্টারি পাস করেন। ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ১৩ বছর বয়সে তার পিতা তাকে কস্তুরী 'বাঈয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে দেন। তিনি চার ছেলেসন্তানের জনক হন। তারা হলেন- হরিলাল, মনিলাল, রামদাস ও দেবদাস।
তার কর্মজীবন
দেশে ফিরে এসে তিনি বোম্বাই হাইকোর্টে ব্যারিস্টার হিসেবে আইন ব্যবসা শুরু করেন। মৃদুভাষী ও লাজুক প্রকৃতির হওয়ায় এবং দৃঢ় নৈতিক মনোভাবের জন্য আইন পেশায় তিনি জমাতে পারেননি। 'দাদা আব্দুল্লাহ কোম্পানি'র এক মামলা লড়ার জন্য ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ উপনিবেশ দক্ষিণ আফ্রিকায় যান।" দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যই তাকে রাজনীতিতে জড়িয়ে ফেলে। দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতকায় ব্রিটিশ সরকারের অশ্বেতকায়দের প্রতি বর্ণবৈষম্যমূলক নীতি তার বিবেককে পীড়া দেয়। উল্লেখ্য, আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকরা ১৮৬০-৬৫ খ্রিষ্টাব্দে রেলপথ নির্মাণে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে ঔপনিবেশিক শাসকরা ভারত থেকে শ্রমিক আমদানি করে। সে সূত্রেই ভারতীয়রা আফ্রিকায় অভিবাসী হয়। সেখানে অবস্থানরত ভারতীয় অভিবাসীরা এবং তিনি নিজেও বর্ণবৈষম্যের শিকার হন। বর্ণবৈষম্য এত প্রকট ছিল যে, তাকে তারা কুলি ব্যারিস্টার বলে ডাকত। ভারতীয় ব্যবসায়ীদের তারা কুলি বেপারী বলত। কৃষ্ণাঙ্গ ও ভারতীয়দের প্রতি পশুর মতো আচরণ করত। তারা রাস্তায় ফুটপাতে হাঁটতে পারত না, রেলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভ্রমণ করতে হতো, হোটেলে ঢুকে খাবার খেতে পারত না। স্বদেশি এবং কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি এ আচরণ দেখে, মহাত্মা গান্ধী প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন।

আব্দুল্লাহ শেঠের মামলার কাজে একবার তিনি প্রিটোরিয়া যাওয়ার জন্য রেলের প্রথম শ্রেণির যাত্রী হিসেবে যাত্রা করেন। রাত ৯টায় ট্রেন ম্যারিজবুর্গ স্টেশনে এসে থামলে এক শ্বেতাঙ্গ যাত্রী গাত্রবর্ণ শ্যামলা দেখে তাকে তৃতীয় শ্রেণিতে যেতে বললে তিনি প্রতিবাদ করেন। পরে পুলিশের সহায়তায় তাকে স্টেশনে মালপত্রসহ গলাধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেওয়া হয়। এ অপমান তাকে খুব বিচলিত করে। পরে রেল . ম্যানেজারের সহায়তায় প্রিটোরিয়া পৌছেন। বর্ণবাদী বৈষম্যের শিকার হয়ে সিদ্ধান্ত নেন, দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি আন্দোলন করবেন। তিনি ভারতীয় ও কৃষ্ণাঙ্গদের বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। নাটালের বৃহৎ সভায় নাটাল ইন্ডিয়ান কংগ্রেস নামে ভারতীয়দের জাতীয় সমিতি গঠিত হয়। গান্ধী হন এ সমিতির সভাপতি। মহাত্মা গান্ধী পেশা ও আন্দোলন-সংগ্রামের পাশাপাশি কিছু লেখালেখি করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ 'সত্যের সঙ্গে আমার অভিজ্ঞতার গল্প' (The Story of My Experiments With Truth)। তাছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার সংগ্রাম নিয়ে লেখা 'দক্ষিণ আফ্রিকায় সত্যাগ্রহ' (Satyagraha in South Africa), স্বাধিকার বিষয়ে ম্যানিফেস্টো 'হিন্দি স্বরাজ' (Hind Swaraj or Indian Home Rule) ইত্যাদি। ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে ভারত সরকার গান্ধীর রচনাবলি একত্রিত করে (The Collected Works of Mahatma Gandhi) প্রকাশ করে। এই রচনাবলি প্রায় শতাধিক খণ্ডে প্রকাশিত হয় এবং প্রায় ৫০,০০০ পাতা আছে। এই রচনাবলি ভারতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
আন্দোলনের সূত্রপাত
১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ সরকার 'এশিয়াটিক ল অ্যামেন্ডমেন্ট অর্ডিন্যান্স', যা ভারতীয়দের কাছে The Black Act' বা কালো আইন নামে পরিচিত, পাস করলে এ ঘৃণ্য আইন বাতিলের জন্য তিনি দৃঢ় সংকল্প নেন। এ আইনে বলা ছিল, ট্রান্সভালের ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা ঐ দেশে বাস করতে হলে নাম রেজিস্ট্রি করে সনদ নিতে হবে। পুলিশকে রেজিস্ট্রেশন সনদ দেখাতে না পারলে জরিমানা ও জেল হবে। গান্ধী এ ঘৃণ্য আইন রদ করার জন্য ব্রিটেনে গিয়ে ব্রিটিশ সরকারের কাছে আপত্তি জানান। কাজ না হওয়ায় আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ ও বর্ণবাদের শিকার ভারতীয়দের পাশে দাঁড়ানোর জন্য নতুন করে অহিংস আন্দোলনের ডাক দেন। আফ্রিকায় বসবাসকারী আড়াই লক্ষ ভারতীয়কে সুসংগঠিত করে আন্দোলনের নতুন নাম দেন 'সত্যাগ্রহ আন্দোলন'। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার আগ্রহ থেকে এ আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল বিধায় এর নাম সত্যাগ্রহ আন্দোলন। শ্বেতাঙ্গ সরকারের বর্ণবাদী নীতি ও স্বতন্ত্র সহাবস্থাননীতির বিরুদ্ধে সত্যাগ্রহ আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ছিল, সত্যাগ্রহীরা অন্যায্য, অগ্রহণযোগ্য আইন না মানার সংকল্প নেয়। আন্দোলন হবে অহিংস, প্রতিশোধের নয়। বর্ণবাদবিরোধী এ সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সূত্রে গান্ধী সর্বপ্রথম বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বিশ্ববাসীর নিকট সমাদৃত হন। ভারতীয়দের সম-অধিকারের জন্য আইন অমান্য আন্দোলনের সূত্রপাত করেন। ব্রিটিশ 'সরকার তাকে কয়েকবার কারারুদ্ধ করলেও তার সংগ্রামের ফলে বর্ণবাদী সরকার ভারতীয়দের অধিকার সংরক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সাধন করে। দীর্ঘ আট বছর পর তার আন্দোলনের সফলতা আসে। রাজনৈতিক বিদ্রোহ হিসেবে সত্যাগ্রহ আন্দোলন ছিল অপরিসীম শক্তিশালী ও কার্যকর।
গান্ধীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন
দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ভারতে ফেরেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের তীব্রতায় তখন ভারতের আবহাওয়া উত্তপ্ত, তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে সর্বভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে এসে তিনি দারিদ্র্য দূরীকরণ, নারী অধিকার রক্ষা, অস্পৃশ্যতা দূরীকরণে দেশব্যাপী জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে অভিযান শুরু করেন। একখানা কমদামি ছোট ধুতি ও ছোট শার্ট পরে রেলের তৃতীয় শ্রেণিতে চড়ে সারা ভারত চষে বেড়ান। তিনি জাতীয়তাবাদকে গণমানুষের জন্য একটি বাস্তব ও বোধগম্য মতবাদে পরিণত করেন। তার জীবন যে শুধু ঘটনাবহুল তা নয়, বহু রাজনৈতিক আন্দোলনে তিনি সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার সত্যাগ্রহ আন্দোলন, ভারতে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন, লবণ করের বিরুদ্ধে আন্দোলন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া লন্ডনে
অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠক, হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ও ইংরেজ শাসনের উচ্ছেদের ব্যাপারে তার ভূমিকা অনন্য। ভারতে 'রাওলাট বিল-১৯১৯'-কে কেন্দ্র করে গান্ধী নির্যাতনমূলক এ আইনের বিরুদ্ধে হরতালের ডাক দেন। এ আইনে যেকোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে রুদ্ধদ্বার আদালতে বিচার ও বিনা বিচারে আটকের ব্যবস্থা ছিল। ব্রিটিশ সরকার বর্বরোচিত জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে এ আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করে। তিনি অহিংস সাধনা করলেও প্রাণ দিতে হয়েছিল হিংস্র প্রকৃতির আরএসএস (রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ)-এর এক উগ্রপন্থি শিখ নথুরাম গডসের হাতে। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ৩০শে জানুয়ারি তার জীবনাবসানে পৃথিবী হারায় মানবতার মুক্তির এক বিশ্বনেতাকে। তিনি ছিলেন ভারতবাসীর বাপু ও জাতির পিতা। মানুষ শ্রদ্ধাভরে তাকে ডাকত 'বাপুজি'।
মার্টিন লুথার কিং (১৯২৯-১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দ)
Martin Luther King 1929-1968
মার্টিন লুথার কিং ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই জানুয়ারি আমেরিকার মন্টগোমারি আটলান্টা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার ধর্মযাজক বাবার নাম ছিল মাইকেল কিং এবং ধর্মযাজক দাদার নাম ছিল রেভারেন্ড ডেনিয়েল; যিনি বর্ণবৈষম্যের প্রতিবাদ জানাতে NAACP (National Association for the Advancement for Coloured People) গঠন করেছিলেন। পরবর্তীকালে এ সংগঠনের মাধ্যমেই মার্টিন লুথার কিং বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তার বাবা তার ছয় বছর বয়সে প্রকৃত নাম মাইকেল কিং পরিবর্তন করে জার্মানির ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের সংস্কারক মার্টিন লুথার কিং-এর সম্মানে এরূপ নামকরণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন শান্ত, ধীর এবং অনুভূতিপ্রবণ। স্বাভাবিক চেতনা জন্ম নিতেই বুঝতে পারেন চারপাশের প্রতিবেশে কালোদের প্রতি শুধু ঘৃণা আর বৈষম্য। ট্রামে-বাসে, পথে-ঘাটে, স্কুলে, চাকরিতে সর্বত্র শ্বেতাঙ্গদের আধিপত্য; কালোদের বঞ্চনা।” নিগ্রো হওয়ায় তিনি সাদাদের স্কুলে পড়তে পারেননি। অত্যন্ত মেধাবী কিং দার্শনিক থেরোর লেখায় প্রভাবান্বিত হন। ১৫ বছর বয়সেই গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি অর্জন করার পর ধারাবাহিকভাবে ব্যাচেলর ও ধর্মতত্ত্বের উপর পিএইচডি ডিগ্রি নেন।

১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ডেক্সটার ব্যাপটিস্ট চার্চের ধর্মযাজক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এ পদে বহাল ছিলেন। যাজক জীবনে বাবার বন্ধু 'হাওয়ার্ড থারম্যানের' সান্নিধ্যে আসেন। তার সাহচর্যে এসেই তিনি জানতে পারেন বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের পথিকৃৎ মহাত্মা গান্ধী সম্পর্কে। দার্শনিক থেরো, বাবার বন্ধু থারম্যান এবং গান্ধীর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে তিনি নিগ্রোদের প্রতি শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। দাদার প্রতিষ্ঠিত NAACP-এর সভাপতি এবং খ্রিষ্টান ধর্মযাজকদের সংগঠন AIM-এর সভাপতি হলে তার প্রতিবাদী কণ্ঠ আরও জোরালো হয়। তার প্রতিবাদ ও আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল নিগ্রোদের সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, কালোদের সর্বত্র প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে মন্টগোমারিতে বাস ভ্রমণকেন্দ্রিক যে আন্দোলন গড়ে ওঠে তাতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা নেন। যাস ধর্মঘটকারীদের দাবি ছিল-১২ (১) বাসে নিগ্রো ও শ্বেতাঙ্গদের বৈষম্য দূর করতে হবে। (২) বাসে যে আগে
উঠবে সে আগে বসবে। (৩) নিগ্রোদের সাথে ভদ্র ব্যবহার করতে হবে। (৪) নিগ্রো এলাকা দিয়ে চলাচলকারী বাসে নিগ্রো ড্রাইভার নিয়োগ করতে হবে l
কর্তৃপক্ষ দমননীতি চালিয়েও আন্দোলন দমাতে পারেনি। এক বছর (১৯৫৫-৫৬ খ্রিষ্টাব্দ) বাস ধর্মঘট চলার. পর কর্তৃপক্ষ আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়; সুপ্রিম কোর্ট বাসের বর্ণবৈষম্যকে সংবিধানবিরোধী বলে ঘোষণা করেন। এ জয়ের পেছনে কিং-এর অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। কৃষ্ণাঙ্গদের দাবির পক্ষে ধীরে ধীরে আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে। সরকার (প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার) তাকে ও অন্য কৃষ্ণাঙ্গ নেতাদের হোয়াইট হাউসে আলোচনায় ডাকে। আলোচনা ফলপ্রসূ হলো না। দেশের শ্বেতাঙ্গদের বর্ণবিদ্বেষী আচরণ 'ক্রমশ প্রকট হয়ে ওঠে। কিং দেশময় চষে বেড়ালেন। তার বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিগ্রোরা সংঘবদ্ধ হতে শুরু করল। নিগ্রো খ্রিষ্টান ধর্মযাজকরা তার সমর্থনে এগিয়ে এলেন। তিনি আমেরিকার কালো মানুষের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হলেন। শ্বেতাঙ্গরা নিগ্রোদের অহিংস আন্দোলনে হিংস্র আচরণ করতে শুরু করল। সরকারের কঠোর দমননীতি দেখে কিছু কিছু কৃষ্ণাঙ্গ নেতা তাকে অহিংস আন্দোলনের পথ পরিহার করে সহিংস আন্দোলন পরিচালনার পরামর্শ দেন। তিনি তাতে সাড়া দেননি। এ পর্যায়ে তিনি ধর্মযাজকের কাজে বেশি মনোযোগী হন। তার কাছে ধর্ম ছিল মানবমুক্তির একটা পথ। আন্দোলন আবার চাঙ্গা হয় আটলান্টা প্রদেশের একটি বিখ্যাত ক্যান্টিনে খাবার খাওয়াকে কেন্দ্র করে। ঐ ক্যান্টিনে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রবেশাধিকার ছিল না। যদিও ইতিমধ্যে কিং-এর আন্দোলনের ফলে প্রায় সব প্রদেশেই কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্ররা শ্বেতাঙ্গদের সাথে একসাথে খাবার খাওয়ার অধিকার পেয়েছিল। কিং ৭৫ জন ছাত্রকে সাথে নিয়ে ঐ ক্যান্টিনে প্রবেশ করে খাবার চাইলে তার অনুরোধ রক্ষা করা হয়নি। বরং শান্তিভঙ্গের অভিযোগে তাকেসহ কিছু ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়। কেনেডির অনুরোধে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কৃষ্ণাঙ্গদের সামগ্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি গান্ধীর ন্যায় অহিংস সত্যাগ্রহ আন্দোলনের ডাক দেন। কিংকে সাধারণ - নাগরিকদের খেপিয়ে তোলার অভিযোগে বন্দি করা হয়। এতে কৃষ্ণাঙ্গরা আরও সংঘবদ্ধ হয় এবং বিভিন্ন স্থানে হিংসাত্মক কার্যক্রম শুরু করে। স্কুলে বর্ণবৈষম্য প্রথা তুলে নিতে সরকার বাধ্য হয়। প্রতিবাদে শ্বেতাঙ্গরা কৃষ্ণাঙ্গদের স্কুল ফেডারেলে বোমা ফাটালে বহু হতাহত হয়।
শান্তি আর সত্যের পথে অবিচলিত কিং দেশজুড়ে ফ্রিডম মার্চ শুরু করেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ ওয়াশিংটনের দিকে পদযাত্রা শুরু করে। ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৭শে আগস্ট ওয়াশিংটনের লিংকন মেমোরিয়ালে সমবেত হয় প্রায় আড়াই লক্ষ কালো মানুষ। এদিন ছিল আমেরিকা থেকে দাসপ্রথা বিলুপ্তির শতবর্ষ পূর্তি। এটা ছিল এক শান্তি প্রতিবাদ সমাবেশ। এদিন মার্টিন লুথার কিং তার ঐতিহাসিক ভাষণ 'I have a dream' প্রদান করেন। সাদা-কালো ভেদাভেদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল তার প্রতিবাদী কণ্ঠ। তার ভাষণে তিনি বলেন, "আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন এ জাতি জাগবে। আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন জর্জিয়ার লাল পাহাড়ে সাবেক দাস আর সাবেক দাস মালিকের সন্তানেরা- ভ্রাতৃত্বের এক টেবিলে বসবে। আমি স্বপ্ন দেখি, আমার চার সন্তান একদিন এমন এক জাতির মধ্যে বাস করবে, যেখানে তাদের চামড়ার রং দিয়ে নয়, তাদের চরিত্রের গুণ দিয়ে তারা গ্রহণযোগ্যতা পাবে।" এ ভাষণের পর টাইম পত্রিকা তাকে বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে পুরস্কৃত করে। শুধু আমেরিকায় নয়, বিশ্বে তিনি মানবতাবাদী আন্দোলনের অন্যতম নেতা হিসেবে স্বীকৃতি পান। জার্মানি তাকে ডক্টরেট ডিগ্রি দিয়ে সম্মানিত করে। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে সর্বকনিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে তিনি শান্তিতে নোবেলজয়ী হন। তার নেতৃত্বে নিগ্রোদের মানবাধিকার আন্দোলন বিশ্বের সমস্ত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রেসিডেন্ট জনসন কৃষ্ণাঙ্গদের বহু দাবি স্বীকার করে নেন। ভিয়েতনাম। যুদ্ধে মানবতা বিপর্যস্ত হতে দেখে তিনি যুদ্ধবিরোধী পদযাত্রার আহ্বান জানান। দারিদ্র্য নির্মূলের দাবিতে আবার ওয়াশিংটন অভিমুখে পদযাত্রার সিদ্ধান্ত নেন। ইতিমধ্যে মেমপিস রাজ্যে নিগ্রো পৌর কর্মীরা শ্বেতাঙ্গদের মতো সমান সুযোগ-সুবিধার জন্য আন্দোলন শুরু করলে তিনি সেখানে ছুটে যান। কর্তৃপক্ষ দাবি না মানায় শহরজুড়ে দাঙ্গা-লুটপাট শুরু হয়। অনেকে হতাহত হয়। ৩রা এপ্রিল ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। সহকর্মীরা তাকে অন্যত্র চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। অকুতোভয় লুথার কিং তা অগ্রাহ্য করেন। সকলকে হিংসা ত্যাগের আহ্বান জানান। পরদিন ৪ঠা এপ্রিল লরেইন হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকাবস্থায় শ্বেতাঙ্গ উগ্রপন্থি যুবক জেমস আর্ল রে'র গুলিতে তিনি মারা যান। তখন তার বয়স মাত্র ৩৯ বছর। গান্ধীর মতো অহিংসতায় বিশ্বাসী হলেও গান্ধীর মতোই তাঁকে হিংস্রতার বলি হতে হয়
নেলসন ম্যান্ডেলা (১৯১৮-২০১৩ খ্রিষ্টাব্দ)
Nelson Mandela 1918-2013
দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষের মুক্তির অগ্রদূত, বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা নেলসন রোলিহালালা ম্যান্ডেলা ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রান্সকিতে মভেজো গ্রামে থেদু রাজবংশের ক্যাডেট শাখায় জন্মগ্রহণ করেন। তার দাদা ছিলেন মভেজো গ্রামের থেমু জাতিগোষ্ঠীর রাজা। ম্যান্ডেলার বাবা গাডলা হেনরি মাপকাইনসা মভেজো গ্রামের মোড়ল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে ঔপনিবেশিক শাসকদের (শ্বেতাঙ্গদের) বিরাগভাজন হওয়ায় ম্যান্ডেলার পিতা মোড়লের পদ থেকে পদচ্যুত হন। তখন তিনি পরিবারসহ কুনু গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। ম্যান্ডেলার পিতার ছিল ৪ জন স্ত্রী ও ১৩টি সন্তান। তার মা নোসেকিনি ফ্যানি (Nosekeni Fanny) ছিলেন প্রভাবশালী জোসা গোত্রের মেয়ে এবং তার বাবার তৃতীয় স্ত্রী। ম্যান্ডেলার শৈশব কাটে নানাবাড়িতে।
রোলিহালালা (যে গাছের ডাল ভাঙে) তার ডাক নাম। তার পরিবারে তিনিই প্রথম পড়ালেখার জন্য স্কুলে ভর্তি হন। ভর্তির পর শিক্ষিকা মাদিঙ্গানে তার ইংরেজি নাম দেন নেলসন।১০

ম্যান্ডেলার ৯ বছর বয়সে তার পিতা যক্ষ্মায় মারা যান। তখন তার অভিভাবক হন পিতার বন্ধু থেম্বুর শাসনকর্তা জোঙ্গিস্তাবা। ম্যান্ডেলার স্কুল ছিল খেদু রাজপ্রাসাদের কাছে একটি মিশনারি স্কুল। খেমু রীতি অনুযায়ী ১৬ বছর বয়সে তার গোত্র তাকে বরণ করে নেয়। ম্যান্ডেলা অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। ক্লার্কবুরি বোর্ডিং স্কুল থেকে ৩ বছরের জায়গায় ২ বছরেই তিনি জুনিয়র সার্টিফিকেট পরীক্ষা পাস করেন। বোফেট শহরের হেল্ডটাউন থেকে স্কুল সিনিয়র সার্টিফিকেট পরীক্ষা পাসের পর ফোর্ট হেয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএ-তে ভর্তি হন। এখানেই অলিভার টাম্বো ও কাইজারের সাথে তার পরিচয় হয়। এ দু'বন্ধুর সাথে বন্ধুত্বের সুবাদেই তিনি বান্টুস্থানের রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (ANC) একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে যোগদান করেন। পরের বছর বন্ধুদের সাথে মিলে এএনসির যুবদল গঠন করেন। তিনি ঔপনিবেশিক শাসন ও বর্ণবাদী শাসননীতির বিরুদ্ধে ক্রমেই শক্তিশালী কণ্ঠস্বররূপে নিজেকে ও তার দলকে প্রতিষ্ঠা করতে থাকেন। মহাত্মা গান্ধী ছিলেন তার আদর্শ। ম্যান্ডেলা বিদ্যমান বর্ণবিদ্বেষী আইনের বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলন শুরু করেন। শ্বেতাঙ্গ ন্যাশনালিস্ট পার্টি দমননীতির আশ্রয় নেয়, মামলা করে। রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে ১৫৬ জন কর্মীসহ ম্যান্ডেলাকে গ্রেফতার করা হয়। পাঁচ বছর মামলা চলার পর সব আসামি নির্দোষ প্রমাণিত হন। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মুক্তি পান। এএনসি অহিংস আন্দোলনের পথ পরিত্যাগ করে সহিংস আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নিলে সরকার আন্দোলকারীদের 'সন্ত্রাসী' আখ্যা দেয়। এএনসির সশস্ত্র অঙ্গসংগঠনের স্থানীয় নাম এমকে, যার অর্থ 'দেশের বল্লম'। ১ বছর ৫ মাস ফেরারি থাকার পর ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই আগস্ট সরকারি লক্ষ্যবস্তুতে বোমাবাজির অভিযোগে তাকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয়। বহুল আলোচিত 'রিভোনিয়া ট্রায়াল' মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে রোবেন দ্বীপে তার কারাবাস শুরু হয়।
তার ২৭ বছরের কারাগার জীবনের ১৮ বছরই এ দ্বীপের কারাগারে কাটে। এ কারাগারটিকে তিনি বলতেন 'রোবেন বিশ্ববিদ্যালয়'। কারাগার থেকেই তিনি দূরশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে আইনের উপর উচ্চতর ডিগ্রি নেন। ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে তাকেসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ বন্দিকে 'রোবেন কারাগার' থেকে 'পোলসমুর' কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তী সময়ে এ স্থানান্তরের ফলে ম্যান্ডেলাসহ এএনসির শীর্ষ নেতাদের সাথে শ্বেতাঙ্গ সরকারের আলোচনার সুযোগ হয়। ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে শ্বেতাঙ্গ 'বোথা' সরকার সশস্ত্র সংগ্রাম পরিত্যাগের শর্তে তাকে মুক্তির প্রস্তাব দেয়। তিনি রাজি হননি। এএনসির নেতৃত্বে কখনো তীব্র মাত্রায় আবার কখনো কম মাত্রায় আন্দোলন চলতে থাকে। এ বছরই সরকারের একজন মন্ত্রীর সাথে হাসপাতালে আলোচনা হয়। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বোথা সরকার দেশে-বিদেশে ব্যাপক চাপের মুখে পড়ে। এ সময় বিশ্বের দুই পরাশক্তি আমেরিকা ও ব্রিটেন এবং আফ্রিকার কিছু রাষ্ট্র লন্ডনে এক ঘরোয়া বৈঠকে মিলিত হয়। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট (সিনিয়র) বুশ ঘোষণা দেন যে, ম্যান্ডেলাকে ৬ মাসের মধ্যে মুক্তি না দিলে মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধের সময়সীমা বৃদ্ধি করা হবে। এরূপ পরিস্থিতিতে আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট ডি ক্লার্ক এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন যে, ২রা ফেব্রুয়ারি ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে ম্যান্ডেলাকে মুক্তি দেওয়া হবে। এএনসিসহ ৩৩টি দল ও সংস্থার উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে। দেশের সকল নাগরিকের সমানাধিকার নিশ্চিতকল্পে সকলের সাথে আলোচনার মাধ্যমে একটি সংবিধান প্রণয়ন করা হবে। অবশেষে দীর্ঘ ২৭ বছর কারাভোগের পর ১১ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মুক্তি পান। তার 'মুক্তির মাধ্যমে আফ্রিকার ইতিহাস নতুনভাবে রচিত হয়। একের পর এক বর্ণবাদী বৈষম্যমূলক আইনগুলো বাতিল হতে থাকে। দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই নভেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার অন্তর্বর্তী সংবিধান রচনা সম্পন্ন হয়। ২২শে ডিসেম্বর তা অনুমোদিত হয়। স্থির হয়, ২৭শে এপ্রিল ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকলের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ১৯টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেয়। এএনসি ৬৪% ভোট পেয়ে ৪০০ আসনের মধ্যে ২৫২টি আসন লাভ করে। ১০ই মে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী ব্যক্তিরূপে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান ম্যান্ডেলা। ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। প্রায় এক শতক মানবতার মুক্তির সংগ্রামে লড়াই করে ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার জোহানেসবার্গের নিজ বাড়িতে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১০ দিন রাষ্ট্রীয় শোক পালনের পর বিশ্ব নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে জন্মস্থান কুনু গ্রামেই তাকে সমাহিত করা হয়। প্রতিবাদ দিয়ে তার জীবন শুরু, ঐক্য ও শান্তি স্থাপনের মধ্য দিয়ে তার পূর্ণতা। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বিশ্বমানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দক্ষিণ আফ্রিকার আপামর মানুষের কাছে তিনি ছিলেন 'মাদিবা'। বর্ণবাদবিরোধী এ মহান নেতা বিশ্বকে বেঁধে গেছেন ঐক্যের সুতোয়। শ্বেতাঙ্গদের বৈষম্য থেকে মুক্তি আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করায় দক্ষিণ আফ্রিকানদের কাছে 'টাটা' অর্থাৎ বাবা নামে তিনি পরিচিত ছিলেন।
ডেসমন্ড টুটু
Desmond Tutu
ডেসমন্ড টুটু ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই অক্টোবর দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রান্সভালের ক্লার্কসড্রপে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম জেচারিয়া জিলিলু টুটু এবং মাতার নাম আলেট্টা। তিন সন্তানের মধ্যে ডেসমন্ড টুটু ছিলেন দ্বিতীয়। তার বয়স যখন বারো বছর তখন তার পিতা সপরিবারে জোহানেসবার্গে গমন করেন। তার পিতা ছিলেন একজন শিক্ষক এবং মাতা ছিলেন একটি অন্ধ-বধির স্কুলের রাঁধুনি ও আয়া। যদিও টুটু ডাক্তার হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পিতার আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকায় তার ডাক্তারি পড়া আর হয়নি। ফলে শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে বেছে নেন। তার স্কুলের শিক্ষকজীবন শুরু হয় ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে। কিন্তু বান্টু স্কুলে কৃষ্ণাঙ্গদের পড়ালেখার সুযোগ না থাকায় তিনি প্রতিবাদ করে পদত্যাগ করেন। বান্টু শিক্ষা আইন ছিল একটি কালো আইন। তারপর তিনি ধর্মবিদ্যা নিয়ে জোহানেসবার্গের সেন্ট পিটার্সবার্গ কলেজে পুনরায় পড়ালেখা শুরু করেন। ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি Anglican Priest- 'ধর্মযাজক' হিসেবে মনোনীত হন। এরপর তিনি লন্ডনের কিং কলেজ থেকে ধর্মবিদ্যায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। অতঃপর আফ্রিকায় ফিরে গিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৬৭-৭২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত আফ্রিকার জনগণ বিষয়ে লেকচার দিয়ে সরকারের বিভিন্ন নিপীড়নমূলক নীতি সম্পর্কে বক্তব্য তুলে ধরেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী বি. জে. ভোস্টারকে চিঠি লেখেন যে, বর্তমান পরিস্থিতি বালতিভর্তি বারুদের মতো। জনরোষ যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে। কিন্তু তার চিঠির কোনো জবাব প্রধানমন্ত্রী দেননি। তিনি বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে বর্ণবাদবিরোধী লেকচার দিয়ে বেড়ান।

১৯৭৬-৭৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়ে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার ধর্মযাজকদের মহাসচিব নির্বাচিত হন। এ পর্যায়েও তিনি বর্ণবাদবিরোধী লড়াই চালিয়ে যান। তিনি অহিংস নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তাই এএনসি'র সশস্ত্র পন্থার আন্দোলনকে তিনি কখনো সমর্থন করেননি। নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে বাইবেল পড়া সকলের জন্য উচিত বলে তিনি মনে করতেন। তার দৃষ্টিতে ধর্মীয় গ্রন্থ মানুষের আত্মাকে জাগ্রত করে।
১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে সুয়েটোতে দাঙ্গা হলে সেখানে তিনি কৃষ্ণাঙ্গদের সমর্থন দেন এবং জনগণকে বিদেশি বিনিয়োগের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে অনুপ্রাণিত করেন। ফলে আমেরিকার রিগান সরকার ও ব্রিটিশ সরকার দক্ষিণ আফ্রিকায় বিনিয়োগ বন্ধ করে দেয়। ফলে আফ্রিকার মুদ্রার ৩৫% দরপতন হয় এবং বহু কৃষ্ণাঙ্গl
চাকরি হারায়। শ্রমিকদের কষ্ট লাঘবে তিনি তাদের বোঝান যে, এ কষ্ট মহৎ কষ্ট। একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে এ আন্দোলন করা হচ্ছে। তিনি আন্দোলনে ছিলেন বরাবরই অহিংস। সরকার তার পাসপোর্ট দু'বার জব্দ করলেও তার বিরুদ্ধে বড় কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তিনি বর্ণবাদকে নাৎসিবাদ ও কমিউনিজমের সাথে তুলনা করেন। তিনি বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেন। তিনিই দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ, যিনি কেপটাউন এবং সাউদার্ন প্রভিন্সের ধর্মযাজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। টুটুর মূল্যায়নকারীরা বর্ণবৈষম্য প্রথা বিলোপের পর থেকে তাকে একজন ইসরাইল ও. আমেরিকাবিরোধী হিসেবে দেখে থাকেন। মানবাধিকার অর্জনের জন্য তিনি তার জীবনের খ্যাতিকে কাজে লাগিয়ে সর্বদা নিপীড়িত ও নির্যাতিতদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তার আন্দোলন শুধু বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ নয়; তিনি আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন এইডসের বিরুদ্ধে, দরিদ্রতার বিরুদ্ধে, যক্ষ্মার বিরুদ্ধে, যৌনতার বিরুদ্ধে। শুধু তা-ই নয়, বন্দিত্বের বিরুদ্ধে, মানবভীতি ও দেশান্তরভীতির বিরুদ্ধে তার দৃঢ় অবস্থান।
১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার নতুন সংবিধানে Anti-apartheid বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে, যা তার জন্য ছিল বিরাট এক বিজয়। তার বক্তব্য একটাই- "We will be free! All of us; Black & White ' together." বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের জীবন্ত কিংবদন্তি ডেসমন্ড টুটু ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তিনি শিক্ষা বিস্তারেও অগ্রণী ভূমিকা রেখে চলেছেন। তিনি মানবতাবিরোধী বিভিন্ন আইনের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে বিশ্ববাসীর নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছেন। বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত বিভিন্ন সেমিনার ও র্যালিতে অংশগ্রহণ করে জলবায়ু পরিবর্তনে প্রকৃতির উপর প্রভাব এবং এর প্রতিকার সম্পর্কে বিভিন্ন স্থানে বক্তব্য দিয়ে একজন আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী হিসেবে নিজের অবস্থানকে সুসংহত করেছেন। নারী অধিকার রক্ষায় তার প্রচেষ্টা অব্যাহত। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি এবং ওয়েস্টার্ন কেপ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য জেক গারওয়েল টুটুর নামে একটি শিক্ষা ট্রাস্ট গঠন করেন। ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে নভেম্বর বর্ণবাদমুক্ত দক্ষিণ আফ্রিকায় তিনি নেলসন ম্যান্ডেলার আমন্ত্রণে বক্তৃতা দিয়ে সম্মানিত হন। আণবিক সমরাস্ত্র নিরস্ত্রীকরণে তার ভূমিকা প্রশংসনীয়। কাজেই দেখা যায়, তিনি শুধুই একজন বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা নন, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন মানবাধিকারকর্মী ও সমাজকর্মীও বটে। জীবন্ত কিংবদন্তি এ মহৎ মানবাধিকারকর্মী বক্তব্য, বিবৃতি ও লেখনীর মাধ্যমে নির্যাতিত মানুষের পক্ষে অদ্যাবধি কাজ করে যাচ্ছেন।
বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন-ড. সৈয়দ মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী স্যারে এর লেখা বই
শ্বেতকায় ঔপনিবেশিক শাসকরা অশ্বেতকায়দের দমন-পীড়নের জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে। অশ্বেতকায়রা অর্থাৎ কৃষ্ণাঙ্গরা বিভিন্ন প্রভাবকের প্রভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র কর্তৃক প্রবর্তিত ও অনুসৃত নীতির বিরুদ্ধে, সচেতন হয়। তাদের মনোচৈতন্য থেকে পূর্ববর্তী সময়ে লালন করা ধারণা দূরীভূত হয়। কৃষ্ণকায় দাসদের মনে এরূপ ধারণা কার্যকর ছিল যে, তারা দাস, তাই উন্নত কাজগুলোর জন্য তারা উপযুক্ত নয়। রাষ্ট্রযন্ত্র ও বর্ণবাদবিশ্বাসী নৃবিজ্ঞানীদের তত্ত্বগুলো কৃষ্ণকায়দের ভাবতে শেখায় যে, তারা শ্বেতকায়দের চেয়ে নিকৃষ্ট। তাদের মনোচৈতন্য থেকে এ ধারণা দূর করতে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের পথিকৃৎত্রা ভূমিকা নিলে তারা ধীরে ধীরে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। তারা সমানাধিকার অর্থাৎ মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিবাদ করতে শেখে। অশ্বেতকায়রা বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্বে সংগঠিত হয়ে আন্দোলন শুরু করলে
শ্বেতকায় শাসক ও শ্বেতকায় নাগরিকদের সাথে তাদের দূরত্ব ও প্রভেদ আরও বৃদ্ধি পায়। বর্ণবাদ ও বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন তীব্র হলে ঔপনিবেশিক শ্বেতাঙ্গ সরকারের অনুসৃত নীতি প্রথম দিকে আরও কঠোর হয়। জনমত বিশেষত আন্তর্জাতিক জনমত নিপীড়িত অশ্বেতকায়দের পক্ষে অবস্থান নিলে শ্বেতকায় ঔপনিবেশিক সরকারের অনুসৃত নীতিতে নমনীয়তা আসে। কাজেই ধারাবাহিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন কখনো তীব্র হয়েছে, আবার কখনো এর তীব্রতা হ্রাস পেয়েছে।
বর্ণবাদ সমর্থন করে- এমন অনেক আইন আফ্রিকায় অনেক আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে 'অ্যাপার্থাইড' নীতি গ্রহণ করলে বর্ণবাদ আইনগত ভিত্তি পায়। ঔপনিবেশিক আফ্রিকায় নিগ্রোদের দমনের জন্য এগুলো প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা হয়। আমেরিকায়ও আফ্রো-আমেরিকানদের দমনের জন্য অর্থাৎ নিগ্রোদের বিরুদ্ধে প্রয়োগের জন্য আফ্রিকায় প্রণয়নকৃত আইনগুলো ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। বর্ণবাদী আইনগুলোই বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের জন্ম দেয়। এগুলোর প্রয়োগই আন্দোলনের বিকাশ ঘটায়। সংক্ষিপ্তভাবে এ আইনগুলো নিচে বর্ণনা করা হলো-১৭
১৯১১ খ্রিষ্টাব্দের 'শ্রম ও খনি আইন'। এ আইনে অশ্বেতকায়দের খনি ও প্রকৌশলবিদ্যার মতো বিষয়ে দক্ষতার সনদ নেওয়ার বিধান ছিল। 'কালার বার অ্যাক্ট' দ্বারা (১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দ) খনি ও শিল্পে অশ্বেতকায়দের কিছু কিছু পদে চাকরি করা নিষিদ্ধ করা হয়। অনৈতিক আইন (১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দ)-এ শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের শারীরিক সম্পর্ক নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীকালে (১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দ) এ আইন আরও কঠোর করে শ্বেতাঙ্গ-অশ্বেতাঙ্গ বিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়। ভূমি আইন (১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দ) দ্বারা কৃষ্ণাঙ্গদের নির্দিষ্ট সংরক্ষিত এলাকা ছাড়া অন্যত্র জমির মালিক হওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। গ্রুপ এলাকা আইন (১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ) দ্বারা দক্ষিণ আফ্রিকার জনগোষ্ঠীকে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গে বিভক্ত করে প্রত্যেক কৃষ্ণাঙ্গকে কোনো না কোনো গ্রুপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গ্রুপভিত্তিক ভাগ করে তাদের নির্দিষ্ট এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা বানানো হয়। জায়গা-জমি ক্রয়-বিক্রয়ে শ্বেতাঙ্গ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ব্যবস্থা রাখা হয়। গ্রুপভিত্তিক এলাকাই স্বতন্ত্র নির্বাচনি এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনকে বিধিবদ্ধ করা হয়।
১৯১১ খ্রিষ্টাব্দের 'শ্রম ও খনি আইন'। এ আইনে অশ্বেতকায়দের খনি ও প্রকৌশলবিদ্যার মতো বিষয়ে দক্ষতার সনদ নেওয়ার বিধান ছিল। 'কালার বার অ্যাক্ট' দ্বারা (১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দ) খনি ও শিল্পে অশ্বেতকায়দের কিছু কিছু পদে চাকরি করা নিষিদ্ধ করা হয়। অনৈতিক আইন (১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দ)-এ শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের শারীরিক সম্পর্ক নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীকালে (১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দ) এ আইন আরও কঠোর করে শ্বেতাঙ্গ-অশ্বেতাঙ্গ বিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়। ভূমি আইন (১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দ) দ্বারা কৃষ্ণাঙ্গদের নির্দিষ্ট সংরক্ষিত এলাকা ছাড়া অন্যত্র জমির মালিক হওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। গ্রুপ এলাকা আইন (১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ) দ্বারা দক্ষিণ আফ্রিকার জনগোষ্ঠীকে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গে বিভক্ত করে প্রত্যেক কৃষ্ণাঙ্গকে কোনো না কোনো গ্রুপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গ্রুপভিত্তিক ভাগ করে তাদের নির্দিষ্ট এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা বানানো হয়। জায়গা-জমি ক্রয়-বিক্রয়ে শ্বেতাঙ্গ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ব্যবস্থা রাখা হয়। গ্রুপভিত্তিক এলাকাই স্বতন্ত্র নির্বাচনি এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনকে বিধিবদ্ধ করা হয়।
চামড়া এবং বর্ণসংকরদের জন্য পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। ভাষার ক্ষেত্রেও বৈষম্য রাখা হয়। তাছাড়া শ্বেতাঙ্গদের শিক্ষা ছিল অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক, অথচ অশ্বেতাঙ্গদের শিক্ষা ছিল বৈতনিক ও স্বেচ্ছামূলক। আইন প্রণয়ন দ্বারা বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন কর্মসূচি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। এভাবে দেখা যায়, আফ্রিকার জনসংখ্যার ৭৩% কৃষ্ণাঙ্গ হলেও জমির মালিক ছিল মাত্র ১৩%। সর্বক্ষেত্রেই তারা ছিল অধিকারবঞ্চিত। উপরিউক্ত আইনগুলোই বর্ণবিদ্বেষের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে বর্ণবাদকে প্রতিষ্ঠিত করে। ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রণীত 'দি ব্ল্যাক অ্যাক্ট'-এর বিরুদ্ধে যে আন্দোলন সত্যাগ্রহী শিষ্যদের দ্বারা গড়ে তুলেছিলেন তা সভ্যাগ্রহ আন্দোলন নামে পরিচিত। এ আইনে বলা হয়, দক্ষিণ ট্রান্সভালে অবস্থানরত প্রত্যেক ভারতীয়কে এমনকি সাত বছরের বেশি বয়সের শিশুদের ঐ দেশে বাস করতে হলে নাম নিবন্ধনপূর্বক সনদ নিতে হবে। পুলিশ চাইলেই সনদ দেখাতে হবে। গান্ধী এ অবমাননাকর বৈষম্যমূলক আইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হওয়ার আহ্বান জানান। নির্যাতিত ভারতীয় ও নিগ্রোরা তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাদের বিক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটায় সত্যাগ্রহ আন্দোলনের মাধ্যমে। সত্যাগ্রহ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল শ্বেতাঙ্গ সরকারের বর্ণবাদী ও স্বতন্ত্র অবস্থাননীতির অবসান করা। এ আন্দোলন দীর্ঘ আট বছর চলার পর শ্বেতাঙ্গ সরকার ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে এ আইন বাতিল করতে বাধ্য হয়। ফলে সত্যাগ্রহ আন্দোলনের লক্ষ্য পূরণ হয়।
মার্টিন লুথার কিং-এর আন্দোলন
নিগ্রোদের প্রতি নানা বৈষম্য ও বর্ণবিদ্বেষ দেখে লুথার কিং প্রথম জীবন থেকে আন্দোলনমুখী ছিলেন। বর্ণবিদ্বেষের শিকার দাদা রেভারেন্ড ড্যানিয়েলের নিগ্রোদের অধিকার রক্ষায় প্রতিষ্ঠিত NAACP-এর সভাপতি হয়ে কালো মানুষদের অধিকার আদায়ে সংকল্পবদ্ধ হন। বলা যায়, কিং-এর আন্দোলনে শামিল হওয়া উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। তার আন্দোলনের মধ্যে মন্টগোমারি বাস ধর্মঘট ও আটলান্টার খাবার হোটেলে নিগ্রোদের প্রবেশাধিকার প্রতিষ্ঠা করা উল্লেখযোগ্য। ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে মন্টগোমারিতে সমস্ত নিগ্রোর পক্ষ থেকে বাস ধর্মঘটের ডাক দিয়ে দাবি তোলা হয়- ০১. বাসে শ্বেতাঙ্গ ও অশ্বেতাঙ্গদের বসার আসনে বৈষম্য দূর করে সমতা আনতে হবে। ০২. বাসে যে আগে উঠবে সে আগে বসবে। ০৩. নিগ্রোদের সাথে ভালো আচরণ করতে হবে। ০৪. নিগ্রো এলাকা দিয়ে চলাচলকারী বাসে নিগ্রো ড্রাইভার নিয়োগ করতে হবে। এ সমস্ত দাবিদাওয়ার পক্ষে ধর্মযাজকরা অংশ নেন। তার ডাকে সকল নিগ্রো বাসে ওঠা বন্ধ করে দেয়। দীর্ঘ এক বছর বাস ধর্মঘট চলার পর সুপ্রিম কোর্ট বর্ণবিদ্বেষী এ ব্যবস্থা সংবিধানবিরোধী বলে রায় দেন। সমস্ত দাবি মেনে নেওয়া হয়। ফলে কিং-এর জয় হয়। যেকোনো বাসে বসার অধিকার নিগ্রোরা পায়।
আমেরিকার বিভিন্ন প্রদেশে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ক্যান্টিনে কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্ররা শ্বেতাঙ্গ ছাত্রদের সাথে বসে খাবার খেতে পারত না। এর বিরুদ্ধে নিগ্রো ছাত্ররা আন্দোলন গড়ে তুললে কিং ছাত্রদের দাবি সমর্থন করে পাশে দাঁড়ান। কয়েক মাস এ আন্দোলন চলার পর প্রতিটি প্রদেশে এ ঘৃণ্য প্রথা বিলুপ্ত করা হয়। কিন্তু তখনো আটলান্টা প্রদেশে একটি বিখ্যাত দোকানে এ বর্ণবিদ্বেষী প্রথা চালু ছিল। সেখানকার ক্যান্টিনে কৃষ্ণাঙ্গদের খাবার খাওয়ার অধিকার ছিল না। কিং ৭৫ জন ছাত্রকে নিয়ে ঐ ক্যান্টিনে গিয়ে খাবার চাইলে খাবার দেওয়া হয়নি। এর প্রতিবাদে নিগ্রোদের বিক্ষোভ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। শান্তিভঙ্গের অভিযোগে তাকেসহ কিছু ছাত্রকে বন্দি করা হয়। কেনেডির হস্তক্ষেপে তিনি মুক্ত হন। এবার নিগ্রো স্কুলের ছাত্ররা বিদ্রোহে অংশ নিতে শুরু করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল স্কুলে প্রচলিত শ্বেতাঙ্গ ও অশ্বেতাঙ্গ বিভেদ দূর করা।। বর্ণবৈষম্যমূলক ব্যবস্থা কর্তৃপক্ষ তুলে নিতে বাধ্য হয়।
নেলসন ম্যান্ডেলার আন্দোলন
কালো মানুষের ও বিশ্বমানবতার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার কারাগারজীবন ২৭ বছর। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে ন্যাশনালিস্ট দল ক্ষমতায় এসে বর্ণবিদ্বেষী কিছু নীতি প্রণয়ন করলে ম্যান্ডেলা রাজনীতিতে সক্রিয় হন। কাজেই তার কারাগারমুক্ত আন্দোলনের আয়ু ছিল মাত্র ১৪ বছর। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে আফ্রিকার ন্যাশনাল কংগ্রেসের অসহযোগ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা হিসেবে পরিচিতি পান। মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতি গ্রহণ করে বর্ণবাদের বিরোধিতা করতে থাকেন। শ্বেতাঙ্গ সরকারের দমননীতি তাকে অহিংস নীতির পরিবর্তে সহিংস আন্দোলনের নীতি গ্রহণে বাধ্য করে। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে বর্ণবাদবিরোধী সশস্ত্র সংগঠন (MK) গঠন করেন, যা ছিল এএনসি'র সামরিক সহযোগী সংগঠন। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলনকে নিতান্তই শেষ চেষ্টা বলে তিনি অভিহিত করেন। দক্ষিণ আফ্রিকান শ্বেতাঙ্গ সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন থেকে চলতে থাকা নিপীড়ন ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে অহিংসার মাধ্যমে সাফল্য পাওয়া সম্ভব নয় বিধায় সশস্ত্র আন্দোলনের পথ বেছে নেন। তার প্রদর্শিত পথ ধরেই তার অনুসারীরা আন্দোলন চালিয়ে যায় এবং অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। তিনি বীরের বেশে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন।
ডেসমন্ড টুটুর আন্দোলন
ডেসমন্ড টুটু বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লেখনি ধারণ করেন। তিনি বর্ণবাদকে ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে পাপাচার এবং ঈশ্বরের সৃষ্ট মানুষের প্রতি এক ধরনের জঘন্য পাপ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার জন্য এবং বর্ণবাদ নির্মূলের জন্য বিশ্বের বিবেকবান মানুষের নিকট আহ্বান জানান। নেলসন ম্যান্ডেলার মুক্তির পূর্ব পর্যন্ত তিনি ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের শক্তির ও প্রেরণার উৎস। তিনি রক্তপাতহীন আন্দোলনের পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে বর্ণবৈষম্যের অবসান ঘটাতে দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের সুয়েটা দাঙ্গার বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার রাজধানী কেপটাউনে শান্তিপূর্ণ মিছিলের নেতৃত্ব দেন। এই মিছিলে ত্রিশ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করেন। তিনি বর্ণবাদ বিরোধী সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বর্ণবাদী সরকার কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য এক দশমাংশ অর্থ ব্যয় করতে থাকলে তিনি এর বিরোধিতা করেন। ফলে কৃষ্ণাঙ্গদের শিক্ষার উন্নয়নের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গৃহীত হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার অভ্যন্তরে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি যে বৈষম্যনীতি চালু ছিল তা অবসানের লক্ষ্যে তিনি আন্তর্জাতিক সাহায্য কামনা করেন। তার প্রচারের ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বৈষম্যের বিষয়ে অবগত হয়। আন্দোলনের পক্ষে বৈশ্বিক প্রচার প্রচারণার ফলে আন্দোলন আরো জনপ্রিয় হতে থাকে। এই সময় সরকার কঠোর নীতি অবলম্বন করে অনেককে গ্রেপ্তার করেন। তিনি রাজবন্দী ও তাদের পরিবারকে সাহায্যের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। দক্ষিণ আফ্রিকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি সরকারের উপর অর্থনৈতিক অবরোধের পক্ষে যুক্তি দেন। যদিও এই অবরোধ তাদের জন্য অভিশাপ কিন্তু মুক্তির জন্য কাম্য। দেশের অভ্যন্তরীণ আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক চাপে বর্ণবাদী সরকার বর্ণবৈষম্যের অবসান ঘটাতে বাধ্য হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসন উচ্ছেদ, দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন শ্রেণি ও ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টিতে অসামান্য অবদান রাখেন। তার আন্দোলন ছিল বহুমাত্রিক। তিনি শুধু বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন না; বরং তিনি সর্বক্ষেত্রেই সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে একজন অগ্রসরমান সৈনিক। । তার কার্যক্রম এখনো থেমে নেই।
বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন-ড. সৈয়দ মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী স্যারে এর লেখা বই
বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন একটি তীব্র প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠে। আন্দোলনের সাফল্যও পর্যায়ক্রমিকভাবেই হয়। আন্দোলনের পথিকৃৎদের অগ্রদূত ছিলেন মহাত্মা গান্ধী। তার দেখানো পথ অনুসরণ করে বাকিরা আন্দোলন করেন। মহাত্মা গান্ধী ও মার্টিন লুথার কিং জীবদ্দশায় সামগ্রিক সাফল্যের অর্জন দেখে যেতে পারেননি। ম্যান্ডেলা ও টুটু মোটামুটিভাবে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সামগ্রিক সাফল্য দেখার সুযোগ পেয়েছেন। মহৎ উদ্দেশ্যে পরিচালিত কোনো আন্দোলন ব্যর্থ হয় না। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সাফল্য ও অর্জন নিচে তুলে
ধরা হলো:
প্রথমত: বর্ণবাদ যে মানবতাবিরোধী তা বিশ্বকে জানাতে আন্দোলনকারীরা সমর্থ হয়। ফলে বিশ্বজনমত মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিকে যৌক্তিক বলে মেনে নিয়ে তা রোধে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রকে চাপ প্রয়োগ করে। ফলে বর্ণবাদে বিশ্বাসী শ্বেতাঙ্গ সরকার নমনীয় হতে বাধ্য হয়।
দ্বিতীয়ত: শ্বেতাঙ্গ-অশ্বেতাঙ্গ সমানাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। সংবিধান থেকে নিগ্রোদের বঞ্চিত করে রাখার জন্য যেসব বর্ণবৈষম্যমূলক নীতি ছিল তা রহিত করা হয়।
তৃতীয়ত: বর্ণবাদের ফলে দক্ষিণ আফ্রিকায় যে অর্থনৈতিক অবরোধ চলছিল, তা প্রত্যাহার করা হয়। ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়নে গতি আসে।
চতুর্থত: সর্বজনীন ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দের সংবিধানে কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটাধিকার দিয়ে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। আমেরিকায়ও শ্বেতকায়-অশ্বেতকায় সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্ণবিদ্বেষ সৃষ্টিকারী ও মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী আইনগুলো বাতিল করা হয়, যা মানুষে মানুষে সাম্য সৃষ্টি করে। এটাই বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
পঞ্চমত: মার্টিন লুথার কিং-এর স্বপ্ন পূরণ হয়। সাদা-কালোর ভেদাভেদ বর্তমানে এত প্রকট নয়, যা আছে তা হলো মানুষের মনোচৈতন্যগত পার্থক্য। এখন আইনগত আর কোনো পার্থক্য নেই। আজ তথাকথিত দাস এবং দাস মালিকদের সন্তানরা সমান। একত্রে বসেই খাওয়াদাওয়া করে। নিপীড়নমূলক আইন দ্বারা দীর্ঘদিন বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে অধিকারবঞ্চিত করে রাখা যায় না তা আন্দোলনের দ্বারা প্রমাণিত। দৃশ্যমান সাফল্য হলো-
কালো গাত্রবর্ণের বারাক ওবামা আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। কৃষ্ণবর্ণের অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট হতে পেরেছিলেন। এগুলোই এ আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য সাফল্য।
তবে এখনো বর্ণবিদ্বেষ পুরোপুরি দূর হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রে প্রচ্ছন্নভাবে বর্ণবাদ বিরাজমান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে, চাকরিতে বা যেকোনো প্রতিষ্ঠানে পরিসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে যে ফরম পূরণ করতে হয় তাতে বর্ণ পরিচয়ের উল্লেখ করতে হয়। প্রাক-পরিচিতিতে এশিয়ান আমেরিকান, আফ্রিকান আমেরিকান ইত্যাদি উল্লেখ করে এটাই বোঝানো হয় যে, আপনি আমেরিকান নাগরিক হলেও মর্যাদাশীল মার্কিনি নন। সদ্য সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে মার্কিন মিডিয়া Black প্রেসিডেন্ট হিসেবেই অভিহিত করে।
প্রধান শব্দসমূহের ব্যাখ্যা
Explanation of Key Words
- বর্ণবাদ: বর্ণবাদ হলো কোনো জনগোষ্ঠীর প্রতি ভিন্ন গাত্রবর্ণের কারণে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বৈষম্যমূলক আচরণনীতি। সংখ্যালঘিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গশাসিত দক্ষিণ আফ্রিকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষ্ণকায়দের প্রতি অমানবিক বৈষম্যমূলক আচরণনীতি বর্ণবাদের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। স্থানীয় ভাষায় এই বর্ণবাদকে Apartheid বলা হতো।
- এএনসি (ANC): আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসকে সংক্ষেপে এএনসি African National Congress (ANC) বলা হয়। এই পার্টির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ব্যক্তিস্বাধীনতা, বহুজাতীয়তা ও অহিংসা। প্রয়াত নেলসন ম্যান্ডেলা তার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে এএনসির সামনের সারির নেতা ছিলেন। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন এবং কালো মানুষদের রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘ সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয় 'এএমসি। ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে দক্ষিণ আফ্রিকায় এএনসির বিজয়ের ফলে নেলসন ম্যান্ডেলা রাষ্ট্রপতি পদে অভিষিক্ত হন। এতে দক্ষিণ আফ্রিকার কালো মানুষের জাতীয় মুক্তি অর্জিত হয়, বর্ণবাদের বিলুপ্তি ঘটে।
- দক্ষিণ আফ্রিকা ইউনিয়ন ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দের ৩১শে মে কেপ কলোলি, নাটাল, ট্রান্সভাল ও অরেঞ্জ ফ্রি স্টেট- এ চারটি ব্রিটিশ উপনিবেশের মিলনে গঠন করা হয় দক্ষিণ আফ্রিকা ইউনিয়ন। দক্ষিণ আফ্রিকা ইউনিয়নের প্রথম গভর্নর জেনারেল হন ভাইকাউন্ট ব্লাডস্টোন এবং প্রধানমন্ত্রী হন জেনারেল বোথা। ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে ইউনিয়নটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
- সত্যাগ্রহ আন্দোলন সত্যাগ্রহ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর প্রতিষ্ঠিত একটি দর্শন এবং অহিংস প্রতিরোধের অনুশীলন। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী সত্যাগ্রহের চর্চা করেছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয়দের অধিকার প্রতিষ্ঠায়। তার এই তত্ত্ব নেলসন ম্যান্ডেলার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন, মার্টিন লুথার কিংয়ের আন্দোলন প্রভৃতিতে প্রভাব ফেলে। যারা সত্যাগ্রহের চর্চা করেন তাদের সত্যাগ্রহী বলা হয়।
- রাওলাট আইন: ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই মার্চ সিডিশন কমিশনের সুপারিশ মোতাবেক ব্রিটিশ সরকার সন্ত্রাসবাদ দমনমূলক এই কুখ্যাত আইন প্রণয়ন করে। এই আইনে জনগণের স্বাধীনতা ও অধিকার হরণ করা হয়। সরকারবিরোধী যেকোনো প্রচারকার্যকে দণ্ডনীয় অপরাধ বলে চিহ্নিত করা হয় এবং কোনো রকম সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়াই যেকোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে বিনা পরোয়ানা ও বিনা বিচারে গ্রেপ্তার ও যত দিন খুশি আটক রাখার অবাধ ক্ষমতা এবং ঘরবাড়ি তল্লাশির অধিকার সরকারকে দেওয়া হয়। এ আইনের মাধ্যমে ভারতীয়দের ন্যায়বিচার লাভের অধিকার সম্পূর্ণভাবে কেড়ে নেওয়া হয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করা হয়। মহাত্মা গান্ধী এই কুখ্যাত আইন বাতিলের দাবিতে সর্বভারতীয় আন্দোলনের ডাক দেন। গান্ধীজির ডাকে দেশব্যাপী বিক্ষোভ-হরতাল পালিত হয়।
- আরএসএস রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘকে সংক্ষেপে আরএসএস বলা হয়। আরএসএস-এর উগ্রপন্থি শিখ নথুরাম গডসের হাতে ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ৩০শে জানুয়ারি গান্ধীজি নিহত হন। হত্যার সময় গান্ধীজি বিরলা ভবন মাঝে রাত্রিকালীন পথসভা করছিলেন। সাথে ছিলেন একজন মৌলবাদী হিন্দু, যার সাথে চরমপন্থি হিন্দু মহাসভার যোগাযোগ ছিল। হিন্দু মহাসভা পাকিস্তানিদের অর্থ সাহায্য দেওয়ার প্রস্তাব করে ভারতকে দুর্বল করার জন্য গান্ধীজীকে দোষারোপ করে। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে গান্ধীর হত্যাকারীদের ফাঁসি দেওয়া হয়।
- ফ্রিডম মার্চ: চাকরি, স্বাধীনতা প্রভৃতির দাবিতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় একটি র্যালি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে, যা বিখ্যাত ফ্রিডম মার্চ নামে পরিচিত। এই র্যালি ওয়াশিংটন মনুমেন্ট থেকে শুরু হয়ে লিংকন মেমোরিয়াল হলে গিয়ে শেষ হয়। ফ্রিডম মার্চের এই সমাবেশে মার্টিন লুথার কিং 'I have a dream' নামক বিখ্যাত ভাষণ দেন। এ সমাবেশে প্রায় ৩ লক্ষ লোক অংশগ্রহণ করে।
- রিভোনিয়া ট্রায়াল বহুল আলোচিত রিভোনিয়া ট্রায়াল মামলায় নেলসন ম্যান্ডেলাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই আগস্ট সরকারি লক্ষ্যবস্তুতে বোমাবাজির অভিযোগে ম্যান্ডেলার বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করা হয়। রিভোনিয়া ট্রায়ালের রায়ে ম্যান্ডেলাকে রোবেন দ্বীপে অন্তরীণ করা হয়।
- রোবেন কারাগার দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের
জন্য জীবনের ২৭ বছর কারাবরণ করেন। এ কারাভোগের ১৮ বছরই ছিলেন রোবেন দ্বীপের কারাগারে। রোবেন কারাগারে তিনি ৪৬৬ নং কয়েদি ছিলেন। এ কারাগারে থেকেই তিনি আইন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং 'A Long Walk to Freedom' এবং 'Conversations Myself' নামক দুটি বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি জ্ঞানচর্চার জন্য রোবেন দ্বীপকে কারাগার না বলে 'রোবেন বিশ্ববিদ্যালয়' বলতেন। - কুলি: কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত দক্ষিণ আফ্রিকায় উনিশ শতকে শ্বেতাঙ্গদের ঔপনিবেশিক শাসন ছিল। এ সময় রেলপথ নির্মাণসহ নতুন উপনিবেশে বিভিন্ন ধরনের ছোট কাজের জন্য ঔপনিবেশিক শাসকরা ভারতবর্ষ থেকে শ্রমিক আমদানি করত। সে সূত্র ধরেই ভারতের কিছু মানুষ আফ্রিকায় অভিবাসী হয়। শ্বেতাঙ্গ ইংরেজরা ভারতীয়দের অবজ্ঞা করে 'কুলি' ডাকত। এমনকি মহাত্যা গান্ধী ব্যারিস্টার হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় গেলে তাকেও কুলি ব্যারিস্টার বলে সম্বোধন করত, যা ছিল শ্বেতাঙ্গদের বর্ণবাদী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ।
- নাটাল ইন্ডিয়ান কংগ্রেস দক্ষিণ আফ্রিকার নাটালে মহাত্মা গান্ধীর কর্মস্থল ছিল। নাটালের অধিবাসীদের অধিকাংশই ছিল কৃষ্ণাঙ্গ অধিবাসী। সেখানে প্রায় ৪ হাজার গুজরাটি মুসলমান ও কয়েকগুণ ভারতীয় অন্যান্য জাতি বসবাস করত। ভারতীয় নাগরিক ও কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের অত্যাচার, অবিচার ও বর্ণবৈষম্য দেখে তিনি আন্দোলন শুরু করেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসী ভারতীয়দের এবং কৃষ্ণাঙ্গদের বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ উদ্যোগকে কার্যকরী ও সাংগঠনিক রূপ দিতে তিনি ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে নাটালের এক বৃহৎ সভায় 'নাটাল ইন্ডিয়ান কংগ্রেস' নামে একটি জাতীয় সমিতি গঠন করেন। তিনি হন এ সমিতির সভাপতি।
হরতাল: হরতাল গুজরাটি শব্দ, যার অর্থ প্রতি দরজায় তালা। সবকিছু বন্ধ বোঝাতে হরতাল শব্দটি প্রয়োগ করা হয়। যানবাহন, হাট-বাজার, দোকানপাট, অফিস-আদালত নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ করার নাম হরতাল। ধর্মঘট বা হরতাল কার্যকারণের ক্ষেত্রে প্রায় সমার্থক। দাবি আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে মহাত্মা গান্ধী সর্বপ্রথম ভারতবর্ষে হরতাল প্রবর্তন করেন। মূলত ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের 'ভারত ছাড়' আন্দোলনের সময় থেকেই হরতালের বহুল ব্যবহার হয়ে আসছে।
বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন-ড. সৈয়দ মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী স্যারে এর লেখা বই
Read more