চর্যাপদ হলো বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন এবং প্রাচীনতম বাংলা কাব্য। এটি খ্রিস্টীয় অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের এক ধরণের গান ও কবিতা সংকলন। বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস জানতে এবং প্রাচীন বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় জীবন সম্পর্কে এটি মূল্যবান তথ্য প্রদান করে।
১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজকীয় গ্রন্থাগার থেকে এর পুথি আবিষ্কার করেন। তাঁর সম্পাদনায় ১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে এটি ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা’ নামে প্রকাশিত হয়। চর্যাপদের ভাষা 'সন্ধ্যা ভাষা' নামে পরিচিত, যার অর্থ আংশিক আলো ও আংশিক অন্ধকারময় বা দ্ব্যর্থবোধক ভাষা।
'চণ্ডীমঙ্গল কাব্য' মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের মঙ্গলকাব্য ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় কাব্য। এর রচয়িতা কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী। কাব্যটি আনুমানিক ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে (১৫৪০-১৫৮০ খ্রিষ্টাব্দ) রচিত হয়েছিল।
মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তাঁর কাব্যে দেবী চণ্ডীর মাহাত্ম্য প্রচার করেছেন। এটি দুটি প্রধান খণ্ডে বিভক্ত: আখেটি খণ্ড (বুনো খণ্ড) এবং বণিক খণ্ড (শহুরে খণ্ড)। আখেটি খণ্ডে কালকেতু ও ফুল্লরার উপাখ্যান এবং বণিত খণ্ডে ধনপতি ও শ্রীমন্ত সওদাগরের উপাখ্যান বর্ণিত হয়েছে। এই কাব্যটি তৎকালীন গ্রামীণ বাংলার সমাজচিত্র, জনজীবন, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং মানুষের বিশ্বাস ও সংস্কারের এক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। এর ভাষাশৈলী, চরিত্রায়ণ এবং হাস্যরস কাব্যটিকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছে।
উত্তরঃ
মনসুর বয়াতি ছিলেন একজন বিখ্যাত লোককবি। তার কাব্যের নাম 'মনসুর বয়াতির পালা'।
মনসুর বয়াতি ছিলেন ময়মনসিংহ অঞ্চলের একজন প্রতিভাবান ও জনপ্রিয় লোককবি। তিনি মূলত ময়মনসিংহ গীতিকার অন্যতম রচয়িতা হিসেবে পরিচিত। তার রচিত বিখ্যাত কাব্যের নাম 'মনসুর বয়াতির পালা' যা 'মনসুর বয়াতির ভাসান' নামেও পরিচিত। এটি দীনেশচন্দ্র সেন কর্তৃক সংগৃহীত ও সম্পাদিত 'ময়মনসিংহ গীতিকা'র একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
'মনসুর বয়াতির পালা' লোকসাহিত্যে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে তার মর্মস্পর্শী বর্ণনা, গ্রামীণ জীবন ও প্রেম-বিরহের নিপুণ চিত্রণের জন্য। ময়মনসিংহ গীতিকা বাংলা লোকসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ, যা বিভিন্ন লোককবির রচিত পালাগান ও গাথা নিয়ে গঠিত এবং বিশ্ব দরবারে বাংলার লোকঐতিহ্যকে তুলে ধরেছে। মনসুর বয়াতি এই ঐতিহ্যবাহী লোকসাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে আজও সমাদৃত।
উত্তরঃ
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তকে 'যুগসন্ধির কবি' বলা হয় কারণ তিনি এমন এক সময়ে সাহিত্যচর্চা করেছিলেন যখন বাংলা সাহিত্য মধ্যযুগীয় ধারা থেকে আধুনিক ধারায় উত্তরণের সন্ধিক্ষণে ছিল। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের সেতুবন্ধনকারী। তার কবিতায় একদিকে যেমন মধ্যযুগীয় ঐতিহ্যের প্রভাব দেখা যায়, তেমনই অন্যদিকে আধুনিক মননশীলতা ও সামাজিক চেতনারও প্রতিফলন ঘটে। তিনি পুরাতন রীতি অনুযায়ী কবিদল বেঁধে লড়াই করতেন এবং সামাজিক ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতেন, আবার একই সাথে সমসাময়িক সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে সজাগ থেকে নতুন ধারার সূচনা করেন। তার কাব্য রচনায় ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এই সংমিশ্রণ তাকে 'যুগসন্ধির কবি' হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছে।
উত্তরঃ
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য। কবি দুজন হলেন বড়ু চণ্ডীদাস ও চণ্ডীদাস।
মধ্যযুগের যে কাব্যটি প্রথমে এক কবি শুরু করেন এবং পরে আর এক কবি শেষ করেন বলে মনে করা হয়, সেটি হলো শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য।
কবি দুজনের নাম নিয়ে বাংলা সাহিত্যে একটি দীর্ঘ বিতর্ক আছে, যা 'চণ্ডীদাস সমস্যা' নামে পরিচিত। এই বিতর্ক সত্ত্বেও প্রথাগতভাবে যে দুজন কবির নাম এই প্রেক্ষাপটে আসে, তাঁরা হলেন:
বড়ু চণ্ডীদাস: তিনি শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের মূল এবং প্রধান রচয়িতা হিসেবে চিহ্নিত। কাব্যের বিভিন্ন ভনিতায় তাঁর নাম উল্লিখিত হয়েছে।
চণ্ডীদাস: 'চণ্ডীদাস' নামে একাধিক কবির অস্তিত্ব থাকায় এবং তাঁদের মধ্যেকার রচনার সময়কাল ও বিষয়বস্তুর পার্থক্যজনিত কারণে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন যে অন্য কোনো চণ্ডীদাস (যেমন দ্বিজ চণ্ডীদাস বা দীন চণ্ডীদাস) পরবর্তীকালে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের কিছু অংশ সংযোজন বা পরিমার্জন করেছিলেন, যদিও এই মতের সপক্ষে অকাট্য প্রমাণ নেই। তবে প্রশ্নের প্রেক্ষাপটে এই নামটিও প্রাসঙ্গিক।
১৯০৯ সালে বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ বাঁকুড়ার কাঁকিল্যা গ্রামের এক গোয়ালঘর থেকে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য আবিষ্কার করেন। এটি রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা বিষয়ক একটি আখ্যান কাব্য এবং এটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম আবিষ্কৃত একটি সম্পূর্ণ কাব্যগ্রন্থ। এর মাধ্যমে আদি মধ্যযুগের বাংলা ভাষার এক মূল্যবান নিদর্শন পাওয়া যায়।
‘তােহফা’ কাব্যটি আরাকানের রাজসভার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি সৈয়দ আলাওল কর্তৃক রচিত একটি নীতিশিক্ষামূলক কাব্য। এটি মূলত ফারসি কবি ইউসুফ গদারির ‘তুহফাতুন নাসায়িহ’ নামক কাব্য থেকে অনূদিত। কাব্যটি ১৫০০ শতাব্দীর মধ্যভাগে রচিত হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়। এই কাব্যে নৈতিক উপদেশ, বিভিন্ন নীতি ও সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। সৈয়দ আলাওল মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যিনি বিভিন্ন ভারতীয় ও বিদেশি উৎস থেকে কাব্য অনুবাদ করে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন।
‘প্রাচীন বঙ্গ সাহিত্যে মুসলমানদের অবদান’ গ্রন্থটির রচয়িতা হলেন প্রখ্যাত ভাষাবিদ, সাহিত্যিক ও গবেষক ড. মুহম্মদ এনামুল হক। ১৯৪০ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই গ্রন্থে ড. মুহম্মদ এনামুল হক অত্যন্ত সুচারুভাবে প্রমাণ করেছেন যে, প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দ্বারাই সমৃদ্ধ হয়নি, বরং মুসলিম কবি, সাহিত্যিক ও পৃষ্ঠপোষকদেরও এতে অসামান্য অবদান ছিল। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে মুসলিম কবিরা বাংলা সাহিত্যের নানা ধারায়, যেমন প্রণয়োপাখ্যান, মর্সিয়া সাহিত্য, সুফিবাদ প্রভাবিত কবিতা ইত্যাদিতে অবদান রেখেছেন। এই বইটি তৎকালীন বাংলা সাহিত্য গবেষণার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে এবং বাংলা সাহিত্যের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ড. মুহম্মদ এনামুল হক তার গবেষণার মাধ্যমে মুসলিম সমাজের সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরেছেন, যা আধুনিক বাংলা সাহিত্য গবেষণায় আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
ভানুসিংহ ছিল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি ছদ্মনাম। তিনি এই ছদ্মনামে "ভানুসিংহের পদাবলী" নামক একটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। এই কাব্যগ্রন্থটি মূলত বৈষ্ণব পদাবলীর ঢঙে লেখা একগুচ্ছ কবিতা নিয়ে গঠিত। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কৈশোরকালে বৈষ্ণব সাহিত্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এই কবিতাগুলো লেখেন, যেখানে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা, বিরহ ও মিলনকে নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরা হয়েছে। এটি বাংলা সাহিত্যে তাঁর প্রাথমিক কাব্যপ্রতিভার এক অনন্য নিদর্শন এবং একটি স্বতন্ত্র সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হয়।
ফররুখ আহমদ ছিলেন বাংলা সাহিত্যের একজন প্রথিতযশা কবি, যিনি 'মুসলিম রেনেসাঁর কবি' হিসেবে সমধিক পরিচিত। তাঁর রচিত সনেট সংকলনটির নাম হলো 'মুহূর্তের কবিতা'। এই গ্রন্থটি ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত হয় এবং এটি ফররুখ আহমদের কাব্যপ্রতিভার একটি বিশেষ দিক উন্মোচন করে। তাঁর কবিতায় ইসলামী ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতি গভীরভাবে প্রোথিত ছিল, যা বাঙালি মুসলিম সমাজে এক নতুন জাগরণ সৃষ্টিতে সহায়ক হয়েছিল। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে কাব্যগ্রন্থ 'সাত সাগরের মাঝি', 'সিরাজাম মুনীরা', 'নৌফেল ও হাতেম', 'হাতেম তাই' এবং শিশুতোষ গ্রন্থ 'পাখির বাসা', 'হরফের ছড়া' ইত্যাদি।
প্রাচীন যুগে রচিত বাংলা সাহিত্যের একমাত্র নিশ্চিত নিদর্শন হলো চর্যাপদ। এটি বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত। ড. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপালের রাজকীয় গ্রন্থশালা থেকে এর পুঁথি আবিষ্কার করেন, যা ১৯১৬ সালে 'হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা বৌদ্ধ গান ও দোঁহা' নামে প্রকাশিত হয়।
চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের রচিত কিছু গান বা কবিতা, যা তাদের ধর্মীয় ও দার্শনিক চিন্তাভাবনা প্রকাশ করে। এর ভাষা প্রাচীন বাংলা ভাষারূপের একটি উদাহরণ এবং এটি আধুনিক বাংলা ভাষার উদ্ভবের প্রথম ধাপ নির্দেশ করে। চর্যাপদের রচয়িতাদের মধ্যে লুইপা, কাহ্নপা, ভুসুকুপা, শবরীপা, সরহপা প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। চর্যাপদ শুধুমাত্র বাংলা সাহিত্যেরই নয়, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল।
ইউসুফ-জোলেখা ও লাইলী-মজনু কাব্য দুটির উপাখ্যানসমূহ মূলত ইরান (পারস্য) দেশের। এই দুটি কাব্য মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী।
ইউসুফ-জোলেখা: এই উপাখ্যানটি মূলত কোরআনের ইউসুফ (আ.) এর কাহিনি থেকে অনুপ্রাণিত। এর উৎসস্থল প্রাচীন পারস্য এবং ইসলামিক বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ফারসি সাহিত্যে ফেরদৌসী, জামীসহ অনেক কবি এর বিভিন্ন সংস্করণ রচনা করেছেন। বাংলা সাহিত্যে শাহ মুহম্মদ সগীর পঞ্চদশ শতকে 'ইউসুফ-জোলেখা' কাব্য রচনা করেন, যা বাংলা সাহিত্যের প্রথম দিককার উল্লেখযোগ্য মুসলিম সাহিত্যকর্মের অন্যতম।
লাইলী-মজনু: এটি একটি প্রাচীন আরব্য লোককথা হলেও, পারস্যের বিখ্যাত কবি নিজামী গঞ্জভী দ্বাদশ শতাব্দীতে তাঁর মহাকাব্য 'খমসাহ'-এর অংশ হিসেবে এটিকে চূড়ান্ত রূপ দেন এবং বিশ্বজুড়ে এর জনপ্রিয়তা নিশ্চিত করেন। লাইলী-মজনুর বিয়োগান্তক প্রেম কাহিনি পরে ফারসি থেকে শুরু করে উর্দু, তুর্কি এবং বাংলাসহ বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যে অনূদিত ও অনুলিখিত হয়। বাংলা সাহিত্যে দৌলত উজির বাহরাম খান ষোড়শ শতকে 'লাইলী-মজনু' কাব্য রচনা করেন।
এই দুটি কাব্যই পারস্যের সমৃদ্ধ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে এবং পরবর্তীকালে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে, প্রেম ও ভক্তির প্রতীক হিসেবে অমরত্ব লাভ করেছে।
রামায়ণ: মহাকবি বাল্মীকি কর্তৃক রচিত রামায়ণ ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ মহাকাব্য। এটি হিন্দুধর্মের একটি মৌলিক ধর্মগ্রন্থ এবং ভগবান রামের জীবন, তাঁর স্ত্রী সীতার অপহরণ ও লঙ্কা বিজয়ের ঘটনা বর্ণনা করে। রামায়ণ কেবল একটি কাব্য নয়, এটি ধর্ম, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের এক মহৎ উৎস। এটি প্রায় ২৪,০০০ শ্লোক নিয়ে গঠিত এবং ৭টি কাণ্ডে বিভক্ত।
মহাভারত: বেদব্যাস (যাকে কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসও বলা হয়) রচিত মহাভারত বিশ্বের দীর্ঘতম মহাকাব্যগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ঘটনা, পাণ্ডব ও কৌরবদের ভাগ্য এবং তাদের মধ্যে সংঘটিত দ্বন্দ্বের বিস্তারিত বিবরণ দেয়। মহাভারতের অংশ হিসেবে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা বিদ্যমান, যা ধর্ম, কর্ম ও দর্শনের গভীর শিক্ষা প্রদান করে। এই দুটি মহাকাব্য ভারতীয় সংস্কৃতি, সাহিত্য ও দর্শনে গভীর প্রভাব ফেলেছে এবং আজও তা সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও পঠিত।
উত্তরঃ
বাংলা ও আরবি-ফারসি ভাষার মিশ্রণে লেখা। কয়েকজন রচয়িতা হলেন: সৈয়দ হামজা, শেখ চাঁদ, ফকির গরিবুল্লাহ, মুহম্মদ খাতের, হেয়াত মামুদ।
দোভাষী পুঁথি সাহিত্য হলো মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের একটি স্বতন্ত্র ধারা, যা মূলত বাংলা ভাষার সঙ্গে আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষার শব্দ ও বাক্যরীতির মিশ্রণে রচিত হয়েছিল। এই সাহিত্যধারার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাস, নীতি-নৈতিকতা এবং লোকপ্রিয় আখ্যানসমূহের প্রচার। আরবি-ফারসি লিপিতে লিখিত হলেও এর মূল ভাষা ছিল বাংলা, তবে তাতে প্রচুর পরিমাণে আরবি, ফারসি ও কিছু হিন্দি শব্দ ব্যবহৃত হতো।
এই ধারার অন্যতম রচয়িতারা হলেন:
সৈয়দ হামজা: তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে 'মধুমালতী', 'আমির হামজা', 'হাতেম তাই' প্রধান।
শেখ চাঁদ: 'রসমঞ্জুরী' তাঁর বিখ্যাত রচনা।
ফকির গরিবুল্লাহ: তিনি 'ইউসুফ জুলেখা' ও 'আমির হামজা' কাব্যের রচয়িতা হিসেবে পরিচিত।
মুহম্মদ খাতের: তাঁর 'মধুমালতী' কাব্যও বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
হেয়াত মামুদ: তাঁর রচনার মধ্যে 'জঙ্গনামা', 'সর্বভেদবানী', 'হিতোপদেশ' ইত্যাদি প্রধান।
এই পুঁথি সাহিত্যগুলি শুধু ধর্মীয় অনুপ্রেরণাই যোগায়নি, বরং সমাজিক মূল্যবোধ ও বিনোদনমূলক গল্প বলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, যা তৎকালীন বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
আটচল্লিশ থেকে বায়ান্ন সালের বাংলা ভাষা আন্দোলন ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের এক স্বতঃস্ফূর্ত এবং ঐতিহাসিক আন্দোলন, যা মাতৃভাষা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি নিয়ে গড়ে ওঠে। এটি বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটাতে এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ বপন করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস (১৯৪৮-১৯৫২)
পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই ভাষার প্রশ্নটি জোরালো হয়ে ওঠে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র শুরু করে। এই অপচেষ্টার বিরুদ্ধেই গড়ে ওঠে মহান ভাষা আন্দোলন।
১৯৪৮ সালের সূচনা:
২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮: পাকিস্তান গণপরিষদে কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। তার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়।
২ মার্চ ১৯৪৮: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়।
১১ মার্চ ১৯৪৮: রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ধর্মঘট ও প্রতিবাদ সমাবেশ পালন করে। এদিন শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেক ছাত্রনেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
২১ মার্চ ১৯৪৮: ঢাকার কার্জন হলে এক জনসভায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন, "উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।" উপস্থিত ছাত্ররা তাৎক্ষণিকভাবে এর প্রতিবাদ করে 'না, না' ধ্বনি তোলেন।
১৯৪৯-১৯৫১ সালের স্থবিরতা ও প্রস্তুতি:
১৯৪৮ সালের পর আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হলেও বাঙালি বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক ও ছাত্ররা গোপনে এবং প্রকাশ্যে বাংলা ভাষার পক্ষে জনমত গঠন অব্যাহত রাখেন। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে ভাষার প্রতি ভালোবাসা ও সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।
১৯৫২ সালের চূড়ান্ত পর্যায়:
২৭ জানুয়ারি ১৯৫২: তৎকালীন পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসভায় ঘোষণা করেন যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এই ঘোষণা নতুন করে আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ প্রজ্বলিত করে তোলে।
৩০ জানুয়ারি ১৯৫২: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট পালিত হয় এবং 'সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ' গঠিত হয়।
৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২: ছাত্ররা ঢাকায় ধর্মঘট ও প্রতিবাদ মিছিল করে। কর্মপরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে ধর্মঘট এবং রাষ্ট্রভাষা দিবস পালনের ঘোষণা দেয়।
২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২: সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে ঢাকা শহরে যেকোনো ধরনের সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ করে।
২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২: ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মিছিল বের করে। মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে আবদুস সালাম, রফিকউদ্দিন আহমদ, আবুল বরকত, আব্দুল জব্বার এবং শফিউর রহমানসহ (পরবর্তীকালে আহত হয়ে মারা যান) আরও অনেকে শহীদ হন। এই ঘটনা পুরো পূর্ব পাকিস্তানকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে।
২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২: সারাদেশে হরতাল ও প্রতিবাদ অব্যাহত থাকে। সেদিনও পুলিশের গুলিতে অনেকে নিহত হন। শহীদদের স্মৃতিতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে প্রথম শহীদ মিনার নির্মিত হয়।
ফলাফল: ভাষা আন্দোলনের তীব্রতা ও জনমতের চাপে পাকিস্তান সরকার ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। এটি ছিল বাঙালির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তীকালে স্বাধীনতা সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
ভাষা আন্দোলনের রচয়িতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ
ভাষা আন্দোলনের "রচয়িতা" বলতে শুধু সাহিত্যিকদের বোঝায় না, বরং আন্দোলনকে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সংগঠিত করেছেন এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির মাধ্যমে আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ ও প্রসারিত করেছেন, তাদেরও বোঝায়।
আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ও সংগঠকগণ:
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত: ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান গণপরিষদে প্রথম বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তোলেন।
শেখ মুজিবুর রহমান: ১৯৪৮ সালের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সংগঠক ও নেতৃত্বদানকারী।
আবুল কাশেম: তমদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা এবং ভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক সংগঠকদের অন্যতম।
শামসুল হক: ১৯৪৮ সালের 'সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ'-এর আহ্বায়ক।
অলি আহাদ, গাজীউল হক, আবদুল মতিন: ভাষা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ছাত্রনেতা ও সংগঠক।
অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, আহমদ রফিক: ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ও গবেষক।
ভাষা শহীদগণ:
আবদুস সালাম, রফিকউদ্দিন আহমদ, আবুল বরকত, আব্দুল জব্বার, শফিউর রহমান: ১৯৫২ সালের ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি শাহাদাতবরণকারী।
সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব (আন্দোলনের চেতনা ধারণকারী):
আবদুল গাফফার চৌধুরী: অমর একুশের গান "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি" এর রচয়িতা।
মুনীর চৌধুরী: ভাষা আন্দোলনভিত্তিক নাটক "কবর" এর রচয়িতা।
জহির রায়হান: ভাষা আন্দোলনভিত্তিক উপন্যাস "আরেক ফাল্গুন" এর রচয়িতা এবং চলচ্চিত্র "জীবন থেকে নেয়া" এর নির্মাতা।
আলাউদ্দিন আল আজাদ: ভাষা আন্দোলনভিত্তিক কালজয়ী কবিতা "স্মৃতির মিনার" এবং উপন্যাস "তেইশ নম্বর তৈলচিত্র"-এ আন্দোলনের প্রভাব ছিল।
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ: "কোনো এক মাকে" কবিতায় ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।
সৈয়দ শামসুল হক: তাঁর অনেক রচনায় ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট বিদ্যমান।
প্রাচীন যুগের একমাত্র নিদর্শন চর্যাপদ। এর ভাষা ও বিষয়বস্তু দুর্বোধ্য এবং এর কবিরা ছিলেন বৌদ্ধ সাধক। এতে বিধৃত হয়েছে বৌদ্ধ ধর্মের তত্ত্বকথা। এ সময়ের সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো গোষ্ঠী কেন্দ্রিকতা ও ধর্মনির্ভরতা। ধর্মের বিষয়টি সমাজজীবনের চিন্তাভাবনাকে নিয়ন্ত্রিত করেছে, তাই সাহিত্যে ধর্মের কথা বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
প্রাচীন যুগের সময়কাল-
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর মতে
৬৫০-১২০০ খ্রি.
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এর মতে
৯৫০-১২০০ খ্রি.
ড. সুকুমার সেনের মতে
৯০০-১৩৫০ খ্রি.
চর্যাপদ: বাংলা ভাষার প্রথম কাব্য/কবিতা সংকলন চর্যাপদ। এটি বাংলা সাহিত্যের আদিযুগের একমাত্র লিখিত নিদর্শন। ডক্টর হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজ দরবারের গ্রন্থাগার হতে ১৯০৭ সালে 'চর্যাচর্য বিনিশ্চয়' নামক পুঁথিটি আবিষ্কার করেন। চর্যাপদের সাথে 'ডাকার্ণব' ও 'দোহাকোষ' নামে আরও দুটি বই নেপালের রাজ দরবারের গ্রন্থাগার হতে আবিষ্কৃত হয়। ১৯১৬ সালে সবগুলো বই একসাথে 'হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা' নামে প্রকাশ করেন।
বাংলার পাল বংশের রাজারা ছিলেন বৌদ্ধধর্মালম্বী। তাদের আমলে চর্যাগীতিগুলোর বিকাশ ঘটেছিল। সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে পদগুলো রচিত। পাল বংশের পরে আসে সেন বংশ। সেন বংশ হিন্দুধর্ম এবং ব্রাহ্মণ্যসংস্কার রাজধর্ম হিসাবে গ্রহণ করে। ফলে বৌদ্ধ সিদ্ধচার্যেরা এদেশ হতে বিতাড়িত হয় এবং নেপালে আশ্রয় গ্রহণ করে। তাই বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন বাংলাদেশের বাহিরে নেপালে পাওয়া গেছে।
ড. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী
চর্যাপদের শব্দগুলো অপরিচিত, শব্দ ব্যবহারের রীতি বর্তমানের রীতি থেকে ভিন্ন --এর কবিতাগুলো পড়ে বুঝতে কষ্ট হয়। এজন্য চর্যাপদের ভাষাকে 'সন্ধ্যা ভাষা'ও বলে। চর্যাপদের কবিতাগুলো গাওয়া হত। তাই এগুলো একইসাথে গান ও কবিতা।
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তার 'বাঙলা ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশ' (Origin and Development of Bengali language) নামক গ্রন্থে ধ্বনি তত্ত্ব ব্যাকরণ ও ছন্দ বিচার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, পদসংকলনটি আদি বাংলা ভাষায় রচিত। কেউ কেউ একে মৈথিলি, উড়িয়া বা আসামি ভাষা বলে দাবি করেন। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, সেকালের বাংলা, উড়িয়া বা আসামি ভাষার পার্থক্য ছিল সামান্যই। উল্লেখ্য যে, চর্যাপদ উড়িষ্যা, বিহার, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের নিজ নিজ ভাষা ও সাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসাবে বিবেচিত।
এতে মোট ৫১ টি পদ'রয়েছে। কয়েক পাতা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সর্বমোট সাড়ে ৪৬টি পদ পাওয়া গেছে। ২৩ নং পদটি খণ্ডিত আকারে উদ্ধার করা হয়েছে অর্থাৎ এর শেষাংশ পাওয়া যায়নি। ২৪, ২৫ ও ৪৮ নং পদগুলো পাওয়া যায়নি। চর্যাপদের মোট পদকর্তা ২৪। অনেকের মতে, আদি চর্যাকার লুইপা। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে প্রাচীনতম চর্যাকার শবরপা এবং আধুনিকতম সরহ বা ভুসুকু। কাহ্নপা সর্বাধিক ১৩ টি পদ রচনা করেন।
রাজশাহী কলেজ গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত দুর্লভ চর্যাপদ এর অংশবিশেষ
চর্যাপদের কবি / পদকর্তা-
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর মতে
২৩ জন
ড. সুকুমার সেনের মতে
২৪ জন
পদকর্তা: লুই, শবর, ককুরী, বিরুআ, গুণ্ডারী, চাটিল, ভুসুকু, কাহ্ন, কামলি, ডোম্বী, শান্তি, মহিত্তা, বীণা, সরহ, আজদেব, ঢেণ্টণ, দারিক, ভাদে, তাড়ক, কঙ্কণ, জঅনন্দি, ধাম, তন্ত্রী ও লাড়ীডোম্বী। পদকর্তাদের নামের শেষে সম্মানসূচক 'পা' যোগ করা হয়। যেমন: লুই থেকে লুইপা, শবর থেকে শবরপা।
কাহ্ন : ১৩ টি পদ রচনা করেন।
ভুসুকু : ৮ টি পদ রচনা করেন।
সরহ : ৪ টি পদ রচনা করেন।
লুই, শান্তি ও শবরী: ২ টি করে পদ রচনা করেন।
বাকিরা : ১ টি করে পদ রচনা করেন।
লাড়ীডোম্বী : কোন পদ পাওয়া যায়নি।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর 'Buddhist Mystic Songs' গ্রন্থের মতে, পদ সংখ্যা ৫০টি এবং প্রাপ্ত পদ সাড়ে ছেচল্লিশটি।
ড. সুকুমার সেনের 'বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস' গ্রন্থের মতে, পদ সংখ্যা ৫১টি।
লুইপা। তিনি ২টি পদ রচনা করেন। যথা: ১, ২৯। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, তিনি রাঢ় অঞ্চলের বাঙালি কবি হিসেবে পরিচিত। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, তিনি শবরপার শিষ্য ছিলেন। লুইপাকে আদি চর্যাকার হিসেবে ধরে নেয়া হয়।
চর্যাপদের প্রথম পদটিঃ
কাআ (শরীর) তরুবর পঞ্চ বি ডাল।
চঞ্চল চীএ পইঠো কাল ॥
দিঢ় করিঅ মহাসুহ পরিমাণ।
লুই ভণই (বলে) গুরু পুচ্ছিঅ জাণ ॥
সঅল সহিঅ কাহি করিঅই।
সুখ দুখেতে নিচিত মরিঅই ॥
এড়ি এউ ছান্দক বান্ধ করণক পাটের আস।
সুনুপথ ভিতি লেহু রে পাস ॥
ভণই লুই আমহে ঝাণে দিঠা।
ধমণ চমণ বেণি পিত্তি বইঠা ॥
মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, সন্ধ্যা বা সান্ধ্য ভাষা বা আলো-আঁধারির ভাষা।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, এর ভাষার নাম 'বঙ্গকামরূপী'। এটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ এবং মধ্যযুগের প্রথম নিদর্শন হিসেবে এটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাস। কাব্যটি বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে বাঁকুড়া জেলার কাকিল্যা গ্রাম থেকে আবিষ্কার করেন এবং ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে এটি প্রকাশিত হয়।
কাব্যটির রচনাকাল:
সাধারণত চতুর্দশ শতাব্দীর শেষ ভাগ (আনুমানিক ১৩৫০-১৪০০ খ্রিস্টাব্দ) এর রচনাকাল হিসেবে ধরা হয়। ভাষাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক প্রমাণের ভিত্তিতে এই সময়কালকেই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করা হয়।
কাব্যটির গুরুত্ব:
ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক মূল্য: এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম মানবীয় প্রেমমূলক কাব্য এবং বৈষ্ণব পদাবলীর উৎস। বৈষ্ণব সাহিত্যধারার এক সুস্পষ্ট পথনির্দেশক হিসেবে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
ভাষাতাত্ত্বিক গুরুত্ব: শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের ভাষা প্রাক-চৈতন্য যুগের মধ্য বাংলা ভাষার মূল্যবান নিদর্শন। এই কাব্যের মাধ্যমে প্রাচীন বাংলা ও আধুনিক বাংলার মধ্যবর্তী ভাষার বিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য: কাব্যে বর্ণিত রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা তৎকালীন বাঙালি সমাজের প্রেম-ভাবনা, সামাজিক রীতিনীতি, দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং ধর্মচিন্তার একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। এর মাধ্যমে দেবতাকে মানবীয় রূপে দেখার প্রবণতা প্রকাশ পেয়েছে।
আখ্যানগত বৈশিষ্ট্য: এটি একটি আখ্যানকাব্য যা কাহিনি প্রবাহের মধ্য দিয়ে রাধা, কৃষ্ণ ও বড়াইয়ের চরিত্র অঙ্কন করেছে। রাধা-কৃষ্ণের সম্পর্কের মানবিক দিকগুলি এই কাব্যে গভীর সংবেদনশীলতার সাথে চিত্রিত হয়েছে।
এই কাব্যটি আবিষ্কারের পর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নতুন করে রচিত হয়েছিল এবং এর মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের ধারাবাহিকতা সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করা সম্ভব হয়েছে।
উত্তরঃ
বিজয়গুপ্তর দেশ বরিশাল জেলার গৈলা ইউনিয়নের পদমনাগ গ্রাম। তিনি মনসামঙ্গল উপাখ্যান নিয়ে পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দিকে কাব্য রচনা করেন।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি বিজয়গুপ্ত। তাঁর জন্মস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, ঐতিহাসিকরা মনে করেন তাঁর জন্ম অধুনা বরিশাল জেলার গৈলা ইউনিয়নের পদমনাগ গ্রামে। এটি একটি জনশ্রুতি যা তাঁর কাব্যেও ইঙ্গিত করা হয়েছে।
বিজয়গুপ্ত মূলত মনসামঙ্গল কাব্যের একজন প্রধান কবি হিসেবে পরিচিত। তাঁর রচিত মনসামঙ্গল কাব্য 'পদ্মাপুরাণ' নামেও পরিচিত। এই কাব্যের মূল উপাখ্যান হলো দেবী মনসার মর্ত্যলোকে পূজা প্রচলন এবং চাঁদ সদাগরের সাথে তাঁর সংঘাত। তিনি মনসামঙ্গল কাব্য রচনা করেন পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দিকে (১৪৯৪ খ্রিষ্টাব্দে বা ১৪৮৪ শকাব্দে কাব্য রচনা সমাপ্ত হয় বলে কাব্যে উল্লেখ আছে)।
মনসামঙ্গল কাব্যধারার পঞ্চকবিদের মধ্যে বিজয়গুপ্ত অন্যতম এবং তাঁর কাব্য সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় ও বিস্তারিত বলে বিবেচিত হয়। এই কাব্য মধ্যযুগের বাংলার সমাজ ও ধর্মীয় জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে, যেখানে লৌকিক দেব-দেবী এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্মের মধ্যে সংঘাত ও সমন্বয়ের চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে।
চর্যাপদ হলো বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন এবং প্রাচীনতম বাংলা কাব্য। এটি খ্রিস্টীয় অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের এক ধরণের গান ও কবিতা সংকলন। বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস জানতে এবং প্রাচীন বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় জীবন সম্পর্কে এটি মূল্যবান তথ্য প্রদান করে।
১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজকীয় গ্রন্থাগার থেকে এর পুথি আবিষ্কার করেন। তাঁর সম্পাদনায় ১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে এটি ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা’ নামে প্রকাশিত হয়। চর্যাপদের ভাষা 'সন্ধ্যা ভাষা' নামে পরিচিত, যার অর্থ আংশিক আলো ও আংশিক অন্ধকারময় বা দ্ব্যর্থবোধক ভাষা।
'চণ্ডীমঙ্গল কাব্য' মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের মঙ্গলকাব্য ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় কাব্য। এর রচয়িতা কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী। কাব্যটি আনুমানিক ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে (১৫৪০-১৫৮০ খ্রিষ্টাব্দ) রচিত হয়েছিল।
মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তাঁর কাব্যে দেবী চণ্ডীর মাহাত্ম্য প্রচার করেছেন। এটি দুটি প্রধান খণ্ডে বিভক্ত: আখেটি খণ্ড (বুনো খণ্ড) এবং বণিক খণ্ড (শহুরে খণ্ড)। আখেটি খণ্ডে কালকেতু ও ফুল্লরার উপাখ্যান এবং বণিত খণ্ডে ধনপতি ও শ্রীমন্ত সওদাগরের উপাখ্যান বর্ণিত হয়েছে। এই কাব্যটি তৎকালীন গ্রামীণ বাংলার সমাজচিত্র, জনজীবন, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং মানুষের বিশ্বাস ও সংস্কারের এক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। এর ভাষাশৈলী, চরিত্রায়ণ এবং হাস্যরস কাব্যটিকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছে।
উত্তরঃ
মনসুর বয়াতি ছিলেন একজন বিখ্যাত লোককবি। তার কাব্যের নাম 'মনসুর বয়াতির পালা'।
মনসুর বয়াতি ছিলেন ময়মনসিংহ অঞ্চলের একজন প্রতিভাবান ও জনপ্রিয় লোককবি। তিনি মূলত ময়মনসিংহ গীতিকার অন্যতম রচয়িতা হিসেবে পরিচিত। তার রচিত বিখ্যাত কাব্যের নাম 'মনসুর বয়াতির পালা' যা 'মনসুর বয়াতির ভাসান' নামেও পরিচিত। এটি দীনেশচন্দ্র সেন কর্তৃক সংগৃহীত ও সম্পাদিত 'ময়মনসিংহ গীতিকা'র একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
'মনসুর বয়াতির পালা' লোকসাহিত্যে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে তার মর্মস্পর্শী বর্ণনা, গ্রামীণ জীবন ও প্রেম-বিরহের নিপুণ চিত্রণের জন্য। ময়মনসিংহ গীতিকা বাংলা লোকসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ, যা বিভিন্ন লোককবির রচিত পালাগান ও গাথা নিয়ে গঠিত এবং বিশ্ব দরবারে বাংলার লোকঐতিহ্যকে তুলে ধরেছে। মনসুর বয়াতি এই ঐতিহ্যবাহী লোকসাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে আজও সমাদৃত।
উত্তরঃ
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তকে 'যুগসন্ধির কবি' বলা হয় কারণ তিনি এমন এক সময়ে সাহিত্যচর্চা করেছিলেন যখন বাংলা সাহিত্য মধ্যযুগীয় ধারা থেকে আধুনিক ধারায় উত্তরণের সন্ধিক্ষণে ছিল। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের সেতুবন্ধনকারী। তার কবিতায় একদিকে যেমন মধ্যযুগীয় ঐতিহ্যের প্রভাব দেখা যায়, তেমনই অন্যদিকে আধুনিক মননশীলতা ও সামাজিক চেতনারও প্রতিফলন ঘটে। তিনি পুরাতন রীতি অনুযায়ী কবিদল বেঁধে লড়াই করতেন এবং সামাজিক ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতেন, আবার একই সাথে সমসাময়িক সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে সজাগ থেকে নতুন ধারার সূচনা করেন। তার কাব্য রচনায় ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এই সংমিশ্রণ তাকে 'যুগসন্ধির কবি' হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছে।