ধর্মগ্রন্থের বর্ণনানুযায়ী যা ধারণ করে, তাই ধর্ম। অর্থাৎ যে বিশেষ গুণ, যা আমাদের ধারণ করে, যার অনুশীলন দ্বারা জীবের কল্যাণ হয় এবং নিজের মোক্ষ লাভ হয়, তাই ধর্ম।
নৈতিকতা বলতে বোঝায় ভালো কাজ ও মন্দ কাজের পার্থক্য বুঝে ভালো কাজ করার এবং মন্দ কাজ না করার মানসিকতা। নৈতিকতা একটি চারিত্রিক গুণ। নৈতিকতা একটি মূল্যবোধ।
কর্তব্যনিষ্ঠা মানুষের একটি নৈতিক গুণ। সবাইকেই কিছু না কিছু কর্ম বা কাজ করতে হয়। কৃতকগুলো অবশ্য পালনীয় কর্ম রয়েছে যেটিকে বলা হয় কর্তব্য। এ কর্তব্য পালন করা আমাদের প্রত্যেকের উচিত। এটিই করতে হবে নিষ্ঠার সাথে, শ্রদ্ধার সাথে। তবেই কাজটি সম্পূর্ণভাবে করা সম্ভব হবে, এটিই হলো কর্তব্যনিষ্ঠা; যেমন- বীরবল তার কর্তব্যনিষ্ঠার জন্য নিজের পুত্রকে পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছিলেন।
পূজনীয় শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তির প্রতি আমাদের প্রাণের যে টান বা অনুরাগ তার নাম ভক্তি। এ শব্দটি আমরা বিভিন্ন জায়গায়, কথায় প্রয়োগ করি; যেমন- মায়ের প্রতি যে ভক্তি, তার নাম মাতৃভক্তি। এ রকম পিতৃভক্তি, গুরুভক্তি ঈশ্বরভক্তি ইত্যাদি। ভগবানের প্রতি ঐকান্তিক ভালোবাসাও ভক্তি।
আমরা জানি, যা ধারণ করে, তাকে ধর্ম বলে। অন্যভাবে বলা যায়, যা আমাদের ধারণ করে, যার অনুশীলন দ্বারা জীবের কল্যাণ হয়-এবং নিজের মোক্ষলাভ হয়, তার নাম ধর্ম। মানুষের ধর্ম মনুষ্যত্ব, ঠিক যেভাবে আগুনের ধর্ম দহন করা।
'মনুসংহিতা' নায়ক হিন্দুধর্ম গ্রন্থে বলা হয়েছে-মানুষের ধর্মের বা মনুষ্যত্বের পাঁচটি বিশেষ লক্ষণ রয়েছে। যথা- অহিংসা, চুরি না করা, সংযমী হওয়া, দেহ ও মনে শুচি বা পবিত্র থাকা সৎপথে থাকা।
কোনটা ভালো কাজ আর কোনটা মন্দ কাজ তা বিচার করার জ্ঞানকে বলে 'নীতি'। আর 'নৈতিকতা' বলতে বোঝায় ভালো কাজ ও মন্দ কাজের পার্থক্য বুঝে ভালো কাজ করার এবং মন্দ কাজ না করার মানসিকতা। নৈতিকতা একটি চারিত্রিক গুণ। নৈতিকতা একটি মূল্যবোধ।
হিন্দুধর্মের শিক্ষায়, উপদেশে ও অনুশাসনে নৈতিক মূল্যবোধের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, ঈশ্বর আত্মারূপে জীবের মধ্যে অবস্থান করেন। তাই জীবের সেবা করলে ঈশ্বরের সেবা করা হয়। জীবকে কষ্ট দিলে ঈশ্বরকে কষ্ট দেওয়া হয়। অহিংসা, চুরি না করা, সংযমী হওয়া, শুচিতা বা দেহ-মনের পবিত্রতা এবং সৎপথে থাকা- হিন্দুধর্মের এই পাঁচটি লক্ষণের মধ্য দিয়ে সুস্পষ্টভাবে নৈতিক মূল্যবোধের প্রকাশ ঘটেছে।
হিন্দুধর্মের উপদেশ-অনুশাসন যা রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থে রয়েছে তা মেনে চললে এবং ধর্মীয় উপাখ্যানসমূহের দৃষ্টান্ত থেকে শিক্ষা নিয়ে জীবনে প্রয়োগ করলে জীবন হবে ধর্মীয় চেতনায় দীপ্ত এবং নৈতিক শিক্ষায় উজ্জ্বল। আর সে উজ্জ্বলতায় সমাজ হবে উদ্ভাসিত।
আমরা কিছু কাজ করি, নিজের মঙ্গলের জন্য। আবার আমরা এমন কিছু কাজ করি যাতে অন্যের মঙ্গল হয়, অন্যের আনন্দ হয়। অন্যের মঙ্গল বা অন্যের আনন্দের জন্য যে কাজ করা হয় তার নাম 'সেবা'।
কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তার শ্রশূষা করা, একে বলে রোগীর 'সেবা। বাড়িতে অতিথি আসলে তার যত্ন করলে, একে বলে অতিথি সেবা। সেবার একটি অর্থ উপাসনা করা, একে বলে ঠাকুর সেবা বা ভগবানের সেবা। জীবের মঙ্গলের জন্য জীবসেবা, সমাজের মঙ্গলের জন্য সমাজ সেবা ইত্যাদি।
আমরা ধর্মীয় উপাখ্যান থেকে জেনেছি যে, পুরাকালে রন্তিদেব অযাচক ব্রত পালন করেছিলেন। তিনি ব্রত পালনের সময় আটচল্লিশ দিন অভুক্ত ছিলেন। তারপর যখন খাদ্য পেয়েছিলেন তখন তা নিজে না খেয়ে ক্ষুধার্তদের সেবা করেছিলেন। এভাবেই রন্তিদেব জীবসেবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
কারও কষ্ট দেখলে মন কাঁদে। তার কষ্ট দূর করে দিতে ইচ্ছা হয়। মনের এ ভাবকে বলা হয় দয়া। দয়া একটি নৈতিক গুণ। সমাজের জন্য একটি প্রয়োজনীয় প্রবৃত্তি হচ্ছে দয়া।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ভগবানের নামে রুচি, জীবের প্রতি দয়া এবং বৈষ্ণবরূপে মানুষের সেবা করাকে সনাতন ধর্মের বা হিন্দুধর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে তার শিক্ষা হচ্ছে-
'নামে রুচি জীবে দয়া বৈষ্ণব সেবন।'
ইহা হৈতে ধর্ম-আর নাহি সনাতন।'
বড়দের প্রতি ছোটদের যে শিষ্টাচার তাকে বলে শ্রদ্ধা। শ্রদ্ধা একটি নৈতিক গুণ এবং ধর্মেরও অঙ্গ। শ্রদ্ধা বিভিন্নভাবে প্রদর্শন করা যায়। যেমন- আমরা মা-বাবাকে শ্রদ্ধা করি। শিক্ষকদের শ্রদ্ধা করি। 1
যারা আমাদের গুরুজন তাঁদের আমরা শ্রদ্ধা করি।
শ্রদ্ধা ও ভক্তি সমার্থক। তবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটু পার্থক্য আছে। ভক্তি হচ্ছে ভক্তির পাত্রের প্রতি চরম অনুরাগ। শ্রদ্ধা যখন গভীর হয়, তখন তাকে বলে ভক্তি। আমরা ঈশ্বরকে ভক্তি করি। কারণ তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং পালন করেছেন। নানাভাবে আমাদের মঙ্গল করছেন।
ঈশ্বর যখন ডক্তকে কৃপা করেন, তখন তাঁকে ভগবান বলা হয়।-ভক্ত যেমন ভগবানকে ভক্তি করেন, তেমনি ভগবানও ভক্তকে দেখে রাখেন। তাই বলা হয়, 'ভক্তের ভগবান'। ভক্তের বোঝা ভগবান বহন করেন।'
ভক্তের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হলো- ভক্ত সুখ ও দুঃখকে একইভাবে গ্রহণ করেন। কর্মের ফলের দিকে না তাকিয়ে কেবল কর্তব্যকর্ম করে যান। তিনি সহিষ্ণু, পরদুঃখকাতর। পরের সুখে সুখী হন। অন্যের দুঃখে দুঃখী হন। কেউ তাঁর পর নয়। তিনি নিজে ও তাঁর সকল কাজ ঈশ্বরে সমর্পণ করেন।
কর্তব্যনিষ্ঠার আদর্শ অনুসরণ করে চললে আমাদের প্রত্যেকের জীবন হবে সুন্দর এবং সমাজে থাকবে শৃঙ্খলা ও শান্তি। ফলে জীবন ও সমাজ হবে আনন্দময়। তবে কেউ যদি তার কর্তব্য পালনে অবহেলা করে তাহলে মানবজীবনের পাশাপাশি গোটা সমাজেরই ক্ষতি হবে।
রেল লাইন আর সড়ক যেখানে একে অন্যকে ভেদ করে চলে গেছে, সেই জায়গাটাকে বলে লেভেল ক্রসিং। ট্রেন আসার ঠিক সময় রেল লাইন ভেদ করে যাওয়া সড়কটি দুপাশ থেকে প্রতিবন্ধক দন্ড ফেলে বন্ধ করে দিতে হয়। যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে।
ধৌম্যের শিষ্য আরুণি। তিনি গুরুর আদেশে ক্ষেতের আল বেঁধে বর্ষার জল আটকাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু জল আটকানোর জন্য আল বাঁধতে না পেরে নিজেই আল হয়ে ক্ষেতের পাশে শুয়েছিলেন। আরুণির এ কর্তব্যনিষ্ঠার উপাখ্যান ধর্মগ্রন্থে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।
ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের যে ভালোবাসা বা মমতা একেই বলে ভ্রাতৃপ্রেম। ভ্রাতৃপ্রেমের মাধ্যমে একজনের খুশিতে আরেকজন খুশি হয়। তেমনি একজনের কষ্টেও অপরজন কষ্ট পায়। এটি একটি নৈতিক গুণ, যা আমাদের পরিবার ও সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এই ভ্রাতৃপ্রেমের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবার শান্তিপূর্ণ থাকে। ফলে সমাজও হয় শান্তিপূর্ণ।
ভ্রাতৃপ্রেম আমাদের পরিবার ও. সমাজের খুবই দরকারি একটি নৈতিক গুণ। কেননা, ভাইয়ে ভাইয়ে মিল থাকলে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়া যায়। সকল বাঁধা-বিপত্তি খুব সহজেই দূর করা যায়। কোনো কাজই তখন কঠিন বলে মনে হয় না। এর ফলে পরিবার ও সমাজ হয় শান্তিপূর্ণ।
রামায়ণে রাম-সীতা যখন চৌদ্দ বছরের জন্য বনে যান, তখন লক্ষণও রাজপ্রাসাদের ভোগ-বিলাস ত্যাগ করে রামের সঙ্গে বনে যান। একইভাবে ভরত রাজ্য শাসনের ভার পেয়েও রামকে ফিরিয়ে আনতে যান, কিন্তু রাম ফিরে আসতে না চাইলে ভরত রামের পাদুকা সিংহাসনে রেখে নিচে বসে রাজ্য শাসন করেন। এভাবে ভরত ও লক্ষণের ভ্রাতৃপ্রেম উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।
পারিবারিক জীবনে আমরা পরিবারের সদস্যগণ পরস্পরের সঙ্গে নানাভাবে জড়িত। তাই নিজের অধিকার ভোগ করার সঙ্গে পরিবারের অন্য সদস্যের প্রতি আমাদের কর্তব্য রয়েছে। এ সত্য আমরা যেন ভুলে না যাই। সামাজিক ক্ষেত্রেও সকল সদস্যদের এককভাবে এবং সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করতে হয়। এক্ষেত্রে কতকগুলো নৈতিক মূল্যবোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। যেমন- সততা, সহিষ্ণুতা, সম্প্রীতি, সেবা, সত্যবাদিতা, দয়া প্রভৃতি।
হিন্দুধর্মগ্রন্থে ধর্মের যে দশটি বাহ্য লক্ষণের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো হলো- সহিষ্ণুতা, ক্ষমা, দয়া, চুরি না করা, শুচিতা, ইন্দ্রিয় সংযম, শুদ্ধ বুদ্ধি, জ্ঞান, সত্য এবং ক্রোধহীনতা। এ দশটি লক্ষণের মধ্য দিয়ে ধর্মের স্বরূপ প্রকাশ পায়। যিনি ধার্মিক, তিনি এ লক্ষণগুলো মেনে চলেন।
জীবকে ঈশ্বর জ্ঞান করলে আর কোনো সংকীর্ণতা থাকতে পারে না। কারণ ঈশ্বরকে ভক্তি করা, তার সেবা করা আমাদের ধর্মীয় তথা নৈতিক কর্তব্য। সততা, ভক্তি-শ্রদ্ধা, দয়া-মায়া-স্নেহ প্রভৃতি সূত্রে যদি গোটা পরিবার বাঁধা থাকে তাহলেই পারিবারিক জীবন নৈতিকতা মন্ডিত হয়।
মাদক বলতে এমন কিছু জিনিসকে বোঝায়, যা আমাদের নেশাগ্রস্ত করে। আমাদের দেহ ও মনের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে। আমাদের শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে অসুস্থ করে তোলে। এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনে।
ধূমপান এক ধরনের মাদকাসক্তি। ধূমপান বলতে বোঝায় বিড়ি, সিগারেট, চুরুট, তামাক ইত্যাদিতে বিশেষভাবে আগুন ধরিয়ে সেগুলোর ধূম বা ধোঁয়া পান করা। ধূমপানকে বিজ্ঞানী ও চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বিষপান বলে অভিহিত করেছেন। কারণ বিড়ি- সিগারেট-তামাক বা চুরুটের ধোঁয়ায় থাকে 'নিকোটিন' জাতীয় পদার্থ। যা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে অসুস্থতা ও মৃত্যুর কারণ হয়ে থাকে।
ধূমপানকে বিজ্ঞানী ও চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বিষপান বলে অভিহিত করেছেন। কারণ বিড়ি, সিগারেট, তামাক বা চুরুটের ধোঁয়ায় 'নিকোটনি' জাতীয় পদার্থ থাকে। এ পদার্থ হলো বিষ যা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে মানুষের অসুস্থতা ও মৃত্যুর কারণ হয়। এজন্যই ধূমপানকে বিষপান বলা হয়।
মাদকদ্রব্যের ক্ষতিকর প্রভাব খুবই ভয়াবহ। যা আমাদের দেহ ও মনের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে। শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে অসুস্থ করে তোলে।'এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনে।
মাদক গ্রহণ অধর্ম। মাদক সবসময়ই আসক্তি তৈরি করে। মাদকাসক্তি মাদক গ্রহণকারীর স্বাভাবিক চেতনাকে বিমূঢ় বা নষ্ট করে দেয়। তিনি আর প্রকৃতিস্থ থাকেন না। সুস্থ থাকেন না। এর ফলে অসুস্থ দেহ ও মনে তিনি যে আচরণ করেন তাতে অনৈতিকতা প্রকাশ পায়।
মাদকাসক্তি এমন একটি অভ্যাস বা আসক্তি যা দৈহিক, মানসিক, আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতি সাধন করে। এর ফলে মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটে। বিবেক বুদ্ধি লোপ পায়। ফলে মানুষ নানা অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়ে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেকে অসৎ উপায় অবলম্বন করে থাকে।
চিকিৎসকগণ বলেন, ধূমপানের ফলে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিস, যক্ষ্মা, ফুসফুসের ক্যান্সার, গ্যাস্ট্রিক-আলসার, ক্ষুধামন্দা, হৃদরোগ ও মানসিক অবসাদসহ অনেক ধরনের রোগ হয়। এসব রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির অকাল-মৃত্যুও ঘটে।
ধূমপায়ী ব্যক্তি শুধু নিজেরই ক্ষতি করে না, অন্যদেরও নানাভাবে ক্ষতি করে। ধূমপানের সময় তার চারপাশের শিশু, নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-যুবক সকলেই ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর একেই পরোক্ষ ধূমপান বলা হয়, যা অধূমপায়ীদের জন্য সাংঘাতিক ক্ষতিকর।
হিন্দুধর্মে সকল প্রকার নেশাকেই পাপ বলা হয়েছে শুধু তাই নয়। নেশাগ্রস্তদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাকেও মহাপাপ বলা হয়েছে। কারণ মানবদেহে ঈশ্বর পরমাত্মারূপে অবস্থান করেন। তাই একে পবিত্র রাখা আমাদের কর্তব্য। কিন্তু নেশার ফলে আমাদের নিজেদের এবং অন্যদের শরীর ও মন অপবিত্র ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে আমাদের চিত্ত সাধনের উপযুক্ত থাকে না।
ধূমপান নামক বদঅভ্যাসটি প্রতিরোধে আমাদের প্রতিজ্ঞা-
'রাখব উঁচু নিজের মান,
করব নাকো ধূমপান।
মনে রাখি কথাখান,
ধূমপানে বিষপান।
ধূমপানকে না বলব,
নীতিধর্ম মেনে চলব।'
রন্তিদেব একনাগাড়ে আট চল্লিশ দিন অনাহারে ছিলেন।
'মনুসংহিতা' গ্রন্থ অনুসারে মানুষের ধর্মের পাঁচটি বিশেষ লক্ষণ রয়েছে।
কোনটা ভালো কাজ আর কোনটা মন্দ কাজ- তা বিচার করার জ্ঞানকে নীতি বলে।
স্বস্তিকা চিহ্নটি শান্তির প্রতীক।
ন্যায় বিচারের প্রতীকের নাম হচ্ছে 'চক্র'।
দয়ার দ্বারা সমাজের মঙ্গল হয়।
বড়দের প্রতি ছোটদের যে শিষ্টাচার তাকে শ্রদ্ধা বলে।
ছোটদের প্রতি বড়দের যে মমতামাখা আচরণ তার নাম স্নেহ।
কারো কষ্টে মন কাঁদলে, তার কষ্ট দূর করে দিতে ইচ্ছা করলে মনের ভেতর যে ভাবের উদয় হয়, তাই দয়া। দয়ার দ্বারা সমাজের মঙ্গল হয়। দয়ার দ্বারা আমাদের মন কোমল ও সহানুভূতিশীল হয়। দয়া একটি নৈতিক গুণ। তাছাড়া দয়া ধর্মেরও অঙ্গ।
ভক্ত সুখ ও দুঃখকে একইভাবে গ্রহণ করেন। কর্মের ফলের দিকে না তাকিয়ে কেবল কর্তব্যকর্ম করে যান। তিনি সহিষ্ণু। তিনি পরদুঃখকাতর। তিনি পরের সুখে সুখি হন আর পরের দুঃখে দুঃখী হন। তাছাড়া সকল মানুষকেই তিনি আপন ভাবেন।
মাদক বলতে এমন কিছু জিনিসকে বোঝায় যা আমাদের নেশাগ্রস্ত করে। আমাদের দেহ ও মনের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে। আমাদের শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে অসুস্থ করে তোলে। এমনকি, তা আমাদের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে।
আমরা পূর্ববর্তী অধ্যায়সমূহে হিন্দুধর্মের স্বরূপ ও বিশ্বাস, স্রষ্টা ও সৃষ্টিসহ কিছু ধর্মীয় কৃত্য এবং হিন্দু ধর্মের আদর্শের মূর্ত প্রতীক অবতার, মহাপুরুষ ও মহীয়সী নারীদের জীবন চরিত সম্পর্কে জেনেছি। আরও জেনেছি হিন্দুধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান লাভের উৎস হিসেবে কিছু ধর্মগুরুর পরিচয়। ধর্মগ্রন্থে তত্ত্বভিত্তিক আলোচনার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষার দৃষ্টান্ত হিসেবে উপাখ্যান থাকে। সে সকল উপাখ্যানের মধ্য দিয়ে যেভাবে নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা হয়েছে তার পরিচয়ও আমরা পেয়েছি।
এ অধ্যায়ে ধর্ম ও নৈতিকতার ধারণা, নৈতিক মূল্যবোধ গঠনে হিন্দুধর্মের গুরুত্ব, হিন্দুধর্মের কতিপয় মূল্যবোধ- জীবসেবা, দয়া, ভক্তি বা শ্রদ্ধা, কর্তব্যনিষ্ঠা, ভ্রাতৃপ্রেম সম্পর্কে এবং পরিবারিক ও সামাজিক জীবনে এসব নৈতিক মূল্যবোধ গঠনের উপায় এবং ধূমপান যে একটা অনৈতিক কাজের প্রকার তাও নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
এ অধ্যায় শেষে আমরা-
- ধর্ম ও নৈতিকতার ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারব।
- নৈতিক মূল্যবোধ গঠনে হিন্দুধর্মের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে পারব।
- হিন্দুধর্মের কতিপয় নৈতিক মূল্যবোধ (জীবসেবা, দয়া, ভক্তি বা শ্রদ্ধা কর্তব্যনিষ্ঠা ও ভ্রাতৃপ্রেম) ব্যাখ্যা করতে পারব।
- পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে জীবসেবার অভ্যাস, জীবসেবা, দয়া, ভক্তি বা শ্রদ্ধা, কর্তব্যনিষ্ঠা, ভ্রাতৃপ্রেম প্রভৃতি নৈতিক মূল্যবোধ গঠনের উপায় ব্যাখ্যা করতে পারব।
- ধূমপান অনৈতিক কাজ- একথা ব্যাখ্যা করতে পারব।
- সামাজিক জীবনে নৈতিক আচরণে উদ্বুদ্ধ হব।
- ধূমপান থেকে বিরত থাকব এবং অন্যকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করব।
Related Question
View Allধর্মগ্রন্থের বর্ণনানুযায়ী যা ধারণ করে, তাই ধর্ম। অর্থাৎ যে বিশেষ গুণ, যা আমাদের ধারণ করে, যার অনুশীলন দ্বারা জীবের কল্যাণ হয় এবং নিজের মোক্ষ লাভ হয়, তাই ধর্ম।
নৈতিকতা বলতে বোঝায় ভালো কাজ ও মন্দ কাজের পার্থক্য বুঝে ভালো কাজ করার এবং মন্দ কাজ না করার মানসিকতা। নৈতিকতা একটি চারিত্রিক গুণ। নৈতিকতা একটি মূল্যবোধ।
কর্তব্যনিষ্ঠা মানুষের একটি নৈতিক গুণ। সবাইকেই কিছু না কিছু কর্ম বা কাজ করতে হয়। কৃতকগুলো অবশ্য পালনীয় কর্ম রয়েছে যেটিকে বলা হয় কর্তব্য। এ কর্তব্য পালন করা আমাদের প্রত্যেকের উচিত। এটিই করতে হবে নিষ্ঠার সাথে, শ্রদ্ধার সাথে। তবেই কাজটি সম্পূর্ণভাবে করা সম্ভব হবে, এটিই হলো কর্তব্যনিষ্ঠা; যেমন- বীরবল তার কর্তব্যনিষ্ঠার জন্য নিজের পুত্রকে পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছিলেন।
পূজনীয় শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তির প্রতি আমাদের প্রাণের যে টান বা অনুরাগ তার নাম ভক্তি। এ শব্দটি আমরা বিভিন্ন জায়গায়, কথায় প্রয়োগ করি; যেমন- মায়ের প্রতি যে ভক্তি, তার নাম মাতৃভক্তি। এ রকম পিতৃভক্তি, গুরুভক্তি ঈশ্বরভক্তি ইত্যাদি। ভগবানের প্রতি ঐকান্তিক ভালোবাসাও ভক্তি।
আমরা জানি, যা ধারণ করে, তাকে ধর্ম বলে। অন্যভাবে বলা যায়, যা আমাদের ধারণ করে, যার অনুশীলন দ্বারা জীবের কল্যাণ হয়-এবং নিজের মোক্ষলাভ হয়, তার নাম ধর্ম। মানুষের ধর্ম মনুষ্যত্ব, ঠিক যেভাবে আগুনের ধর্ম দহন করা।
'মনুসংহিতা' নায়ক হিন্দুধর্ম গ্রন্থে বলা হয়েছে-মানুষের ধর্মের বা মনুষ্যত্বের পাঁচটি বিশেষ লক্ষণ রয়েছে। যথা- অহিংসা, চুরি না করা, সংযমী হওয়া, দেহ ও মনে শুচি বা পবিত্র থাকা সৎপথে থাকা।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!