হিন্দুধর্ম ও নৈতিক মূল্যবোধ (অষ্টম অধ্যায়)

হিন্দুধর্ম শিক্ষা - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

682

আমরা পূর্ববর্তী অধ্যায়সমূহে হিন্দুধর্মের স্বরূপ ও বিশ্বাস, স্রষ্টা ও সৃষ্টিসহ কিছু ধর্মীয় কৃত্য এবং হিন্দু ধর্মের আদর্শের মূর্ত প্রতীক অবতার, মহাপুরুষ ও মহীয়সী নারীদের জীবন চরিত সম্পর্কে জেনেছি। আরও জেনেছি হিন্দুধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান লাভের উৎস হিসেবে কিছু ধর্মগুরুর পরিচয়। ধর্মগ্রন্থে তত্ত্বভিত্তিক আলোচনার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষার দৃষ্টান্ত হিসেবে উপাখ্যান থাকে। সে সকল উপাখ্যানের মধ্য দিয়ে যেভাবে নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা হয়েছে তার পরিচয়ও আমরা পেয়েছি।
এ অধ্যায়ে ধর্ম ও নৈতিকতার ধারণা, নৈতিক মূল্যবোধ গঠনে হিন্দুধর্মের গুরুত্ব, হিন্দুধর্মের কতিপয় মূল্যবোধ- জীবসেবা, দয়া, ভক্তি বা শ্রদ্ধা, কর্তব্যনিষ্ঠা, ভ্রাতৃপ্রেম সম্পর্কে এবং পরিবারিক ও সামাজিক জীবনে এসব নৈতিক মূল্যবোধ গঠনের উপায় এবং ধূমপান যে একটা অনৈতিক কাজের প্রকার তাও নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

এ অধ্যায় শেষে আমরা-

  • ধর্ম ও নৈতিকতার ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারব।
  • নৈতিক মূল্যবোধ গঠনে হিন্দুধর্মের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে পারব।
  • হিন্দুধর্মের কতিপয় নৈতিক মূল্যবোধ (জীবসেবা, দয়া, ভক্তি বা শ্রদ্ধা কর্তব্যনিষ্ঠা ও ভ্রাতৃপ্রেম) ব্যাখ্যা করতে পারব।
  • পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে জীবসেবার অভ্যাস, জীবসেবা, দয়া, ভক্তি বা শ্রদ্ধা, কর্তব্যনিষ্ঠা, ভ্রাতৃপ্রেম প্রভৃতি নৈতিক মূল্যবোধ গঠনের উপায় ব্যাখ্যা করতে পারব।
  • ধূমপান অনৈতিক কাজ- একথা ব্যাখ্যা করতে পারব।
  • সামাজিক জীবনে নৈতিক আচরণে উদ্বুদ্ধ হব।
  • ধূমপান থেকে বিরত থাকব এবং অন্যকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করব।

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

ধর্ম
আমরা জানি যা ধারণ করে, তাকে ধর্ম বলে। মানুষ, পশুপাখি, গাছপালা, সমুদ্র-নদী, পাহাড়-পর্বত- মরুভূমি- সবকিছুকে ধর্ম ধারণ করে আছে। আবার ধর্ম শব্দটির একটি অর্থ ন্যায়বিচার ও জীবনাচরণের বিধি-বিধান। আমাদের ধর্ম মেনে চলতে হবে- এ কথার অর্থ হলো আমাকে জীবনাচরণের ক্ষেত্রে বিধিবিধান মেনে চলতে হবে। ন্যায়বিচার করতে হবে। অন্যদিকে ধর্ম হলো কোনো জীব বা বস্তুর গুণ বা বিশেষ বৈশিষ্ট্য। যেমন- আগুনের ধর্ম দহন করা। মানুষেরও নিজস্ব ধর্ম রয়েছে। তার নাম মনুষ্যত্ব বা মানবতা। এছাড়া যা থেকে মোক্ষলাভ হয়, তার নামও ধর্ম।
সুতরাং বলা যায়- যে বিশেষ গুণ, যা আমাদের ধারণ করে, যার অনুশীলন দ্বারা জীবের কল্যাণ হয় এবং নিজের মোক্ষলাভ হয়, তার নাম ধর্ম।
'মনুসংহিতা' নামক গ্রন্থে বলা হয়েছে- মানুষের ধর্মের বা মনুষ্যত্বের পাঁচটি বিশেষ লক্ষণ রয়েছে। যেমন- অহিংসা, চুরি না করা, সংযমী হওয়া, দেহ ও মনে শুচি বা পবিত্র পরিচ্ছন্ন থাকা এবং সৎপথে থাকা।

একক কাজ:

  • ধর্মশব্দটির বিভিন্ন অর্থের একটি তালিকা প্রস্তুত কর।
  • ধর্মের পাঁচটি লক্ষণের নাম লেখ।

নৈতিকতা
যে-কাজ করলে মঙ্গল হয়, কারও কোনো ক্ষতি হয় না, সে কাজ হচ্ছে ভালো কাজ। যেমন, আমার যোগাসন করি। এতে আমাদের শরীর ও মনের উপকার হয়। আমাদের মঙ্গল হয়, কিন্তু অন্য কারও ক্ষতি হয় না। এটা ভালো কাজ।
আবার আমি অন্যের সঙ্গে সম্প্রীতির সম্পর্ক স্থাপন করলাম। সম্প্রীতির ভাব বজায় রেখে সমাজে চললাম। তা হলে কী হবে? তাহলে আমার এবং আমার পাশাপাশি সমাজের সকল মানুষের মঙ্গল হবে। এটা ভালো কাজ। অন্যদিকে মিথ্যা কথা বললে চরিত্র নষ্ট হয়, পাপ হয়। এতে অন্যের অমঙ্গল হয়। সুতরাং মিথ্যা কথা বলা মন্দ কাজ এবং মহাপাপ। আমরা এটা করব না।
কোনটা ভালো কাজ আর কোনটা মন্দ কাজ তা বিচার করার জ্ঞানকে বলে 'নীতি'। আর 'নৈতিকতা' বলতে বোঝায় ভালো কাজ ও মন্দ কাজের পার্থক্য বুঝে ভালো কাজ করার এবং মন্দ কাজ না করার মানসিকতা। নৈতিকতা একটি চারিত্রিক গুণ। নৈতিকতা একটি মূল্যবোধ।

দলীয় কাজ: শিক্ষক শিক্ষার্থীদের দুটি দলে ভাগ করে দেবেন। একটি দল একটি নৈতিক গুণের কথা বলবে। অন্যদল আরেকটি বলবে। এরকম পাঁচবার চলবে। প্রতিবারের জন্য ১ পয়েন্ট। যারা বেশি পয়েন্ট পাবে, তারা বিজয়ী হবে।

নতুন শব্দ: দহন, সম্প্রীতি, উদ্বুদ্ধ, মূল্যবোধ, অনুশাসন, নৈতিকতা।

Content added By

নৈতিক মূল্যবোধ গঠনে ধর্মের অত্যন্ত গুরুত্ব রয়েছে। ধর্ম সত্য ও ন্যায়ের কথা বলে। মানুষের মঙ্গলের কথা বলে। নৈতিক মূল্যবোধও সেই একই কথা বলে।

হিন্দুধর্মের শিক্ষায়, উপদেশে ও অনুশাসনে নৈতিক মূল্যবোধের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, ঈশ্বর আত্মারূপে জীবের মধ্যে অবস্থান করেন। তাই জীবের সেবা করলে ঈশ্বরের সেবা করা হয়। জীবকে কষ্ট দিলে ঈশ্বরকে কষ্ট দেওয়া হয়। এ জীবসেবা হিন্দুধর্মের অঙ্গ, হিন্দুধর্মের শিক্ষা। আবার জীবসেবা একটি নৈতিক গুণ। একটি নৈতিক মূল্যবোধ।
অহিংসা, চুরি না করা, সংযমী হওয়া, শুচিতা বা দেহ-মনের পবিত্রতা এবং সৎপথে থাকা- ধর্মের এ পাঁচটি লক্ষণের মধ্য দিয়ে সুষ্পষ্ট ভাবেই নৈতিক মূল্যবোধের প্রকাশ ঘটেছে।
হিন্দুধর্মতত্ত্ব নৈতিক মূল্যবোধ অর্জনের সহায়ক। রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থে প্রদত্ত ধর্মীয় উপাখ্যান সমূহ নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার উদাহরণ রূপে ব্যবহৃত হয়েছে।
হিন্দুধর্মের উপদেশ-অনুশাসন মেনে চললে এবং ধর্মীয় উপাখ্যান সমূহের দৃষ্টান্ত থেকে শিক্ষা নিয়ে জীবনে প্রয়োগ করলে জীবন হবে ধর্মীয় চেতনায় দীপ্ত এবং নৈতিক শিক্ষায় উজ্জ্বল। আর সে উজ্জ্বলতায় সমাজ হবে উদ্ভাসিত।

হিন্দুধর্মের নানা প্রতীকে, পূজার উপকরণেও রয়েছে নৈতিকতার প্রতীকী প্রকাশ। দুর্গাপূজার সময় সর্বতোভদ্রমন্ডল অঙ্কণে, হলুদ, আবির, বেলপাতাগুড়ো প্রভৃতি রঙ ব্যবহার করে সৌন্দর্য সৃষ্টি করা হয়। এর মধ্য দিয়ে প্রকাশ ঘটে শিল্পচেতনার। 'স্বস্তিকা' চিহ্ন শান্তির প্রতীক। 'চক্র' ন্যায় বিচারের প্রতীক। অন্যায়কে ধ্বংস করে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করতে হলে সাহসের প্রয়োজন। চক্র সাহসের চিহ্ন। শঙ্খ মঙ্গলের প্রতীক। একসঙ্গে শঙ্খধ্বনির মধ্য দিয়ে আহ্বান জানানো হয় তোমরা এসো, এক হও, এক হয়ে মাঙ্গলিক কাজে অংশ নাও।

একক কাজ: নৈতিক মূল্যবোধ গঠনে হিন্দুধর্মের পাঁচটি প্রভাব লেখ।

নতুন শব্দ: শুচিতা, প্রদত্ত, জাগ্রত, দীপ্ত, উদ্ভাসিত

Content added By

আমরা কিছু কাজ করি, নিজের মঙ্গলের জন্যে বা নিজের আনন্দের জন্যে। আবার আমরা এমন কিছু কাজ করি যাতে অন্যের মঙ্গল হয়, অন্যের আনন্দ হয়। অন্যের মঙ্গল বা অন্যের আনন্দের জন্য যে কাজ করা হয় তার নাম 'সেবা'।

সেবা নানা ভাবে করা যায়। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ল, আমরা তার শুশ্রূষা করলাম। একে বলতে পারি রোগীর সেবা। বাড়িতে অতিথি আসলেন, তার যত্ন করলাম। একে বলা হয় অতিথি সেবা। সেবার একটি অর্থ উপাসনা করা, তাকে বলে ঠাকুর সেবা।
বাড়িতে গুরুজন কেউ এলে মা বলেন 'সেবা দে'। এখানে সেবা মানে প্রণাম করা, শ্রদ্ধা জানানো। কেউ না খেয়ে আছে, তাকে খেতে দেওয়াকেও বলা হয় সেবা। আমরা যে আহার গ্রহণ করি, তাকেও বলা হয় সেবা। জীবের মঙ্গলের জন্য আমরা যে কাজ করি, তার নাম জীব সেবা। সমাজের মঙ্গল হয় এমন কাজকে বলা হয় সমাজ সেবা।

আবার হিন্দু ধর্মতত্ত্বে এ সেবা কথাটি খুবই গভীর অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। হিন্দু ধর্মের একটি বিশ্বাস এই যে ঈশ্বর আত্মারূপে জীবের মধ্যে অবস্থান করেন। তাই আমরা যে খাদ্য গ্রহণ করি, তার দ্বারা আমাদের ভেতর আত্মারূপে যে ঈশ্বর বাস করেন, তাঁর সেবা করি। জীব সেবার মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের সেবা করা হয়ে যায়। জীবসেবা যেমন ধর্মের দিক থেকে আচরণীয়, তেমনি নৈতিকতার দিক থেকেও পালনীয় গুণ।
আমরা ধর্মীয় উপাখ্যান থেকে জেনেছি, পুরাকালে রন্তিদেব অযাচক ব্রত পালনের সময় আটচল্লিশ দিন অভুক্ত থাকার পর খাদ্য পেয়েছিলেন। কিন্তু নিজে অভুক্ত থেকে ক্ষুধার্তদের সেবা করেছিলেন।
কেবল এ উপাখ্যানই নয়। হিন্দু ধর্মগ্রন্থে জীবসেবার এমন অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে।
নতুন শব্দ: শুশ্রূষা, উপাসনা, আচরণীয়, অযাচক ব্রত।

Content added By

কারও কষ্ট দেখলে মন কাঁদে। তার কষ্ট দূর করে দিতে ইচ্ছা হয়। মনের এ ভাবকে বলা হয় দয়া।

দয়া একটি নৈতিক গুণ। সমাজের জন্য একটি প্রয়োজনীয় প্রবৃত্তি হচ্ছে দয়া। দয়া করা হয় কাকে? যে ক্ষুধায় কষ্ট পাচ্ছে, তাকে খাদ্য দিয়ে আমরা দয়া করি।
আমরা জানি, জীবের মধ্যে আত্মারূপে ঈশ্বর অবস্থান করেন। তাই জীবকে দয়া করলে, জীবের দুঃখ দূর করলে, ঈশ্বর সন্তুষ্ট হন। ঈশ্বর নিজেই দরিদ্ররূপে ঘুরে বেড়ান দয়া পাবেন বলে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়:

'জগতে দরিদ্ররূপে ফিরি দয়া তরে,
গৃহহীনে গৃহ দিলে আমি থাকি ঘরে।'

শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু দয়াকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেছেন। ভগবানের নামে রুচি, জীবের প্রতি দয়া এবং বৈষ্ণবরূপে মানুষের সেবা করাকে তিনি সনাতন ধর্ম অর্থাৎ হিন্দুধর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে তার শিক্ষা হচ্ছে:

'নামে রুচি জীবে দয়া বৈষ্ণব সেবন।
ইহা হৈতে ধর্ম আর নাহি সনাতন।।'

মোটকথা, দয়ার প্রবৃত্তির দ্বারা আমাদের মন কোমল ও সহানুভূতিশীল হয়। দয়ার দ্বারা সমাজের মঙ্গল হয়। শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীচৈতন্য, রাজা হরিশ্চন্দ্র, মহাবীর কর্ণ প্রমুখ দয়ার বহু দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আমরাও আমাদের জীবনে ও সমাজে দয়ার আদর্শের প্রতিফলন ঘটাব।

একক কাজ: নিজের বা অন্যের জীবন থেকে জীবসেবা ও দয়ার দুটি করে ঘটনা উল্লেখ কর।

নতুন শব্দ: প্রবৃত্তি, রুচি, সহানুভূতিশীল, প্রতিফলন।

Content added By

ভক্তি বা শ্রদ্ধা একটি নৈতিক গুণ এবং তা ধর্মেরও অঙ্গ।
আমরা মা-বাবাকে শ্রদ্ধা করি। শিক্ষকদের শ্রদ্ধা করি। যারা আমাদের গুরুজন তাঁদের আমরা শ্রদ্ধা করি। আর গুরুজনেরা আমাদের স্নেহ করেন।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, বড়দের প্রতি ছোটদের যে শিষ্টাচার তাকে বলে শ্রদ্ধা। ছোটদের প্রতি বড়দের যে মমতামাখা আচরণ, তার নাম স্নেহ।
শ্রদ্ধা ও ভক্তি সমার্থক। তবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটু পার্থক্য আছে। ভক্তি হচ্ছে ভক্তির পাত্রের প্রতি চরম অনুরাগ। শ্রদ্ধা যখন গভীর হয়, তখন তাকে বলে ভক্তি।

আমরা ঈশ্বরকে ভক্তি করি। কারণ তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন। তিনি আমাদের পালন করেন। তিনি নানাভাবে আমাদের মঙ্গল করেন। ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি দুভাবে প্রকাশ করা যায়।
এক. সরাসরি ঈশ্বরের নাম জপ, নাম কীর্তন ইত্যাদি মাধ্যমে।
দুই. আমাদের মা-বাবা-শিক্ষকসহ গুরুজনদের ভক্তি করার মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের প্রতি ভক্তির প্রকাশ ঘটে।
আমরা দেব-দেবীদের বিশেষ গুণ ও শক্তি অর্জনের জন্যে তাঁদের ভক্তি করি। পূজার মধ্য দিয়ে দেবতাদের প্রতি আমাদের ভক্তি প্রকাশ পায়।

আমরা জানি, ঈশ্বর যখন ভক্তকে কৃপা করেন, তখন তাঁকে ভগবান বলে। ভক্ত যেমন ভগবানকে ভক্তি করেন, তেমনি ভগবানও ভক্তকে দেখে রাখেন। তাই তো বলা হয়, 'ভক্তের ভগবান' কিংবা 'ভক্তের বোঝা ভগবান বহন করেন।'
ভক্ত সুখ ও দুঃখকে একইভাবে গ্রহণ করেন। কর্মের ফলের দিকে না তাকিয়ে কেবল কর্তব্যকর্ম করে যান। তিনি সহিষ্ণু, পরদুঃখকাতর। পরের সুখে সুখী হন। অন্যের দুঃখে দুঃখী হন। কেউ তাঁর পর নয়। সকল মানুষকে তিনি আপন ভাবেন।
তিনি নিজে ও তাঁর সকল কাজ ঈশ্বরে সমর্পণ করেন। অর্থাৎ তাঁর সকল কাজ ঈশ্বরের কাজ। তিনি শুধু কাজটি সম্পাদন করছেন।
ভক্তের এই ফলের আশা না করে কর্তব্য পালন করে যাওয়া, সুখ ও দুঃখকে সমানভাবে গ্রহণ করা, পরোপকার, সহিষ্ণুতা, অহিংসা প্রভৃতি নৈতিক গুণগুলো যে মূল্যবোধ সৃষ্টি করে, তা ব্যক্তি ও সমাজের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। ভক্তিতে ব্যক্তির মুক্তি আর সমাজেরও মঙ্গল।

ধর্মীয় উপাখ্যানে প্রহ্লাদ, ধ্রুব, অর্জুন, রাজা রন্তিদেব প্রমুখের ভক্তির কাহিনী উজ্জ্বল হয়ে আছে।
আবার দীন দরিদ্র ব্রাহ্মণ থেকে শুরু করে শবর শ্রেণির এক কন্যা শবরীর ভক্তির উপাখ্যান দেদীপ্যমান হয়ে রয়েছে।

একক কাজ : তুমি তোমার মা-বাবা ও গুরুজনদের প্রতি কীভাবে ভক্তি প্রদর্শন কর।

নতুন শব্দ: শিষ্টাচার, সমার্থক, অনুরাগ, জপ, সহিষ্ণু, পরদুঃখকাতরতা, সমর্পণ, দেদীপ্যমান

Content added By

আমরা আমাদের পরিবারে ও সমাজে নানা রকমের কাজ করি। আমাদের মধ্যে যারা শিক্ষার্থী, তাদের কাজ কী? এর উত্তর হবে ভালো করে লেখাপড়া করা এবং জ্ঞান অর্জন করা। যাঁরা চাকরি করেন, তাঁদের নিজেদের কাজ যত্নের সঙ্গে করতে হয়। সমাজেও মানুষকে নির্দিষ্ট কর্তব্য পালন করতে হয়। সে কর্তব্য পালনে কেউ অবহেলা করলে গোটা সমাজেরই ক্ষতি হয়।
আমরা নিশ্চয়ই লেভেলক্রসিং দেখেছি। রেল লাইন আর সড়ক যেখানে একে অন্যকে ভেদ করে চলে গেছে, সেই জায়গাটাকে বলে লেভেলক্রসিং।
ট্রেন আসার আগেই ঠিক সময় রেল লাইন ভেদ করে যাওয়া সড়কটি দুপাশ থেকে প্রতিবন্ধক দন্ড ফেলে বন্ধ করে দিতে হয়। এ জন্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারী আছেন। তিনি ট্রেন আসার ঠিক আগে প্রতিবন্ধক ফেলে সড়ক পথ বন্ধ করলেন না। তা হলে কী হবে? সড়ক দিয়ে গাড়ি চলতে থাকবে, লোকজন চলতে থাকবে। ট্রেনও এসে পড়বে।
তাতে ঘটবে দুর্ঘটনা। তাই লেভেলক্রসিং- এ প্রতিবন্ধকতা ফেলার এবং ওঠানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারীর কর্তব্যনিষ্ঠার ওপর যানবাহন ও জনগণের চলাচলের নিরাপত্তা নির্ভর করে।
একথা জীবন ও সমাজের সকল ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সুতরাং আমরা কর্তব্যনিষ্ঠার আদর্শ অনুসরণ করে চলব। এর দ্বারা আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিজীবন সুন্দর হবে এবং সমাজে থাকবে শৃঙ্খলা ও শান্তি। জীবন ও সমাজ হবে আনন্দময়।
আরুণির কর্তব্যনিষ্ঠার উপাখ্যানটি আমরা পড়েছি। সেই যে ধৌম্যের শিষ্য আরুণি। তিনি গুরুর আদেশে ক্ষেতের আল বেঁধে বর্ষার জল আটকাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু জল আটকানোর জন্য আল বাঁধতে না পেরে নিজেই আল হয়ে ক্ষেতের পাশে শুয়েছিলেন।
আরুণির এ কর্তব্যনিষ্ঠার উপাখ্যান ধর্মগ্রন্থে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। আর আমাদের যেন ডেকে বলছে, 'তোমরাও আরুণির মতো কর্তব্যনিষ্ঠ হও।'

একক কাজ: ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে কর্তব্যনিষ্ঠার প্রভাব লিখ।

নতুন শব্দ: লেভেলক্রসিং, প্রতিবন্ধক, আল।

Content added By

কাজল আর সজল। দুই ভাই। দুজনে খুব মিল। কাজলের খুশিতে সজল খুশি হয়। সজলের খুশিতে কাজল খুশি হয়। আবার কাজল কষ্ট পেলে সজল কষ্ট পায়। সজল কষ্ট পেলে কাজল কষ্ট পায়। এই যে কাজল ও সজলের একের প্রতি অন্যের ভালোবাসা বা মমতা, একেই বলে ভ্রাতৃপ্রেম।
আমাদের পরিবারে ও সমাজে ভ্রাতৃপ্রেম খুবই দরকারি একটি নৈতিক গুণ। যে সকল নৈতিক গুণের জন্যে পরিবার শান্তিপূর্ণ ও আনন্দময় থাকে, সেগুলোর মধ্যে ভ্রাতৃপ্রেম একটি। আর প্রতিটি পরিবার শান্তিপূর্ণ থাকলে গোটা সমাজও শান্তিপূর্ণ থাকবে।
আমরা জানি, রামায়ণে রাম-সীতা যখন চৌদ্দ বছরের জন্য বনে যান, তখন লক্ষণও রাজ প্রাসাদের ভোগ বিলাস ত্যাগ করে রামের সঙ্গে বনে যান। ভ্রাতৃপ্রেমের কী অপূর্ব দৃষ্টান্ত। একইভাবে ভরত রাজ্য শাসনের ভার পেয়েও রামকে ফিরিয়ে আনতে যান। রাম ফিরলেন না। ভরত তাঁর পাদুকা সিংহাসনে রেখে নিচে বসে রাজ্য শাসন করতে লাগলেন। আমরা জানি, রাম ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে ভরত রাজ্যভার ফিরিয়ে দিলেন। তাই ভরতের ভ্রাতৃপ্রেম উজ্জ্বল হয়ে আছে।
লক্ষণ আর ভরতের এ ভ্রাতৃপ্রেম রামায়ণে উজ্জ্বল হয়ে আছে। তাঁদের এ ভ্রাতৃপ্রেমের দৃষ্টান্ত আমরাও অনুসরণ করব। তাহলে আমাদের পরিবার ও সমাজ শান্তিপূর্ণ ও আনন্দময় হবে।

Content added By

'শৃঙ্খলাবোধ' নৈতিক মূল্যবোধ গঠনের অন্যতম উপায়। ঈশ্বর জীব ও জগৎ সৃষ্টি করেছেন। ঈশ্বরের সৃষ্টির মধ্যে একটা শৃঙ্খলা রয়েছে। তেমনি আমরাও আমাদের জীবনে আনব শৃঙ্খলাবোধ। ঈশ্বরের শৃঙ্খলাবোধের প্রকাশ ঘটেছে তাঁর সৃষ্টিকর্মে। আমরাও আমাদের নিজেদের জীবনে ও আচরণে শৃঙ্খলা বোধের প্রকাশ ঘটাব।
পারিবারিক জীবনে একটি পরিবারের সদস্যগণ পরস্পরের সঙ্গে নানা ভাবে জড়িত। তাই নিজের অধিকার ভোগ করার সঙ্গে পরিবারের অন্যান্য সদস্যের প্রতি আমাদের কর্তব্য রয়েছে। এ সত্য আমরা যেন ভুলে না যাই।
সমাজের ক্ষেত্রেও সমাজের সকল সদস্যের এককভাবে এবং সম্মিলিত ভাবে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হয়। আর তা করতে গিয়েই কতগুলো নৈতিক মূল্যবোধের উদ্ভব ঘটেছে। যেমন- সততা, সহিষ্ণুতা, সম্প্রীতি, সেবা, সৌহার্দ্য, একতা, সত্যবাদিতা, জীবসেবা, দয়া, কর্তব্যনিষ্ঠা প্রভৃতি নৈতিক মূল্যবোধ।

ধর্মও সকল নৈতিক মূল্যবোধকে তার উপদেশ ও অনুশাসনে পরিণত করেছে। হিন্দুধর্মগ্রন্থে ধর্মের যে দশটি বাহ্য লক্ষণের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে অহিংসা, সত্যবাদিতা, অক্রোধ বা রাগ না করা, ধীশক্তি, বিদ্যা, সংযম ইত্যাদি। যিনি ধার্মিক, তিনি এগুলো পালন করেন। আর এভাবেই নৈতিক মূল্যবোধ পরিণত হয় ধর্মীয় অনুশাসনে। আবার ধর্মীয় অনুশাসন থেকে তৈরি হয় নৈতিক মূল্যবোধ।
নিজের মুক্তি বা মোক্ষলাভ এবং জগতের কল্যাণ- এই হচ্ছে হিন্দু ধর্মের একটি মূল কথা।
জীবকে ঈশ্বর জ্ঞান করলে আর কোনো সংকীর্ণতা থাকতে পারে না। কারণ ঈশ্বরকে ভক্তি করা, তার সেবা করা আমাদের ধর্মীয় তথা নৈতিক কর্তব্য। সততা, ভক্তি-শ্রদ্ধা, দয়া-মায়া-স্নেহ প্রভৃতি সূত্রে যদি গোটা পরিবার বাঁধা থাকে, তাহলে পারিবারিক জীবন নৈতিকতায় মণ্ডিত হবেই।
সমাজ জীবনের ক্ষেত্রেও এ কথা সত্য। সমাজ ও জীবনকে সত্য, সুন্দর ও শান্তি মন্ডিত করা নৈতিকতার লক্ষ্য। ধর্মও তাই। সুতরাং ধর্মীয় অনুশাসন ও নৈতিকতা অনুসরণ এবং অনুশীলন করে আমরা পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নৈতিক মূল্যবোধ গঠন করতে পারি।

দলগত কাজ: নৈতিক মূল্যবোধ গঠনের উপায় লিখে একটি পোস্টার তৈরি কর।

নতুন শব্দ: ধীশক্তি, সৌহার্দ্য, সংকীর্ণতা, মণ্ডিত।

Content added By

আমরা এতক্ষণ কিছু নৈতিক মূল্যবোধ সম্পর্কে আলোচনা করেছি। এখন একটি অনৈতিক কাজ সম্পর্কে আলোচনা করছি। এসো, আমরা ভালোর পাশাপাশি মন্দকেও চিনে রাখি। আলোর বিপরীতে যেমন থাকে অন্ধকার, তেমনি নৈতিকতার বিপরীতে লুকিয়ে থাকে অনৈতিক কাজের হাতছানি।
ধূমপানের কথাই ধরা যাক। আমাদের চারপাশে এতো লোক ধূমপান করে যে, আমাদের মনেই হয় না কাজটি খুবই অনৈতিক। ধূমপানের কথায় উঠে আসে মাদকাসক্তি প্রসঙ্গ। মাদক বলতে এমন কিছু জিনিসকে বোঝায় যা আমাদের নেশাগ্রস্ত করে।
আমাদের দেহ ও মনের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে। আমাদের শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে অসুস্থ করে তোলে। এমনকি মাদকসেবী মারা পর্যন্ত যায়। ধূমপানও এক ধরনের মাদকাসক্তি। ধূমপান বলতে বোঝায় বিড়ি, সিগারেট, চুরুট, তামাক ইত্যাদিতে বিশেষভাবে আগুন ধরিয়ে সেগুলোর ধূম বা ধোঁয়া পান করা।

ধূমপানকে বিজ্ঞানী ও চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বিষপান বলে অভিহিত করেছেন। কারণ বিড়ি সিগারেট তামাক বা চুরুটের ধোঁয়ায় থাকে 'নিকোটিন' জাতীয় পদার্থ। এ পদার্থ বিষ। এ বিষ মানুষের শরীরে প্রবেশ করে মানুষের অসুস্থতা এবং মৃত্যুর কারণ হয়। ধূমপানের মধ্য দিয়ে নিকোটিন জাতীয় বিষ শরীরে প্রবেশ করে। তাতে শরীর ও মনের খুবই ক্ষতি হয়। চিকিৎসকগণ বলেন, ধূমপানের ফলে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিস, যক্ষ্মা, ফুসফুসের ক্যানসার, গ্যাসট্রিক-আলসার, ক্ষুধামন্দা, হৃদরোগ ও মানসিক অবসাদসহ অনেক ধরনের রোগ হয়।
এসব রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির অকালমৃত্যুও ঘটে। অন্যদিকে ধূমপায়ী ব্যক্তি শুধু নিজেরই ক্ষতি করে না, অন্যদেরও নানাভাবে ক্ষতি করে। ধূমপানের সময় তার চারপাশের শিশু, নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-যুবক সকলেই ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একে পরোক্ষ ধূমপান বলা হয়, যা অধূমপায়ীদের জন্য সাংঘাতিক ক্ষতিকর।
ধূমপান একটি বদভ্যাস। একটি দুর্বার ও ক্ষতিকর নেশা। হিন্দুধর্মে সকল প্রকার নেশাকেই শুধু নয়, নেশাগ্রস্তের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাকেও মহাপাপ বলা হয়েছে। তাছাড়া এ দেহ ঈশ্বরের অধিষ্ঠান। একে পবিত্র রাখব। এমন কিছু করব না যাতে নিজের কিংবা অন্যের শরীর ও মনের ক্ষতি হয়।

এসো, আমরা প্রতিজ্ঞা করি:

'রাখব উঁচু নিজের মান,
করব নাকো ধূমপান।
মনে রাখি কথাখান,
ধূমপানে বিষ পান।
ধূমপানকে না বলব,
নীতিধর্ম মেনে চলব।'

দলীয় কাজঃ ধুমপানের ক্ষতিকর দিকগুলো লিখে একটি পোস্টার তৈরি কর।

নতুন শব্দ : চুরুট, নিকোটিন, নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিস, সংস্পর্শ, দুর্বার।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...