আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পর্যন্ত তিন মাস ভিক্ষুরা বর্ষাবাসব্রত পালন করেন। এসময় তারা বিহারে অবস্থান করেন। বর্ষাকালে বিহারে বাস করে এ ব্রত বা অধিষ্ঠান পালন করা হয় বলে এটিকে বর্ষাব্রত বলে।
বর্ষাব্রত পালনকালে ভিক্ষুদের শাস্ত্র অধ্যয়ন, ধ্যান সমাধি চর্চা, ধর্মালোচনা এবং ধর্ম শ্রবণ করে বিশুদ্ধ জীবনযাপন করতে হয়। বর্ষাব্রত পালনকালে প্রতি পূর্ণিমা, অমাবস্যা ও অষ্টমী তিথিতে ভিক্ষুদের পাতিমো আবৃত্তি করতে হয়।
উপোসথ ভিক্ষু ও গৃহী উভয়ের পালনীয় একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান। বৌদ্ধরা পূর্ণিমা, অমাবস্যা এবং অষ্টমী তিথিতে উপোসথ পালন করেন। ধর্মময় উৎকৃষ্ট জীবন গঠনের জন্য বুদ্ধ উপোসথের প্রবর্তন করেছিলেন।
বৌদ্ধ সম্প্রদায় বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। যার প্রতিটি স্বতন্ত্র ইতিহাস ও পটভূমি রয়েছে। এসব আচার-অনুষ্ঠান পালনের মাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতি জাগ্রত হয়। পারস্পরিক ভাব বিনিময় হয়। সৌভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয়। নৈতিক ও মানবিক জীবন গঠিত হয়। আত্মসংযম ও বিনম্র হওয়া যায়। তাই ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন গুরুত্বপূর্ণ।
বর্ষাকালে অর্থাৎ আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস ভিক্ষুরা বিহারে অবস্থান করে ধর্মালোচনা, ধর্মশ্রবণ, ধর্ম-বিনয়, ধ্যান-সমাধি চর্চা এবং অধ্যয়ন করে সময় অতিবাহিত করে থাকেন। বর্ষাকালে বিহারে বাস করে এই ব্রত অনুষ্ঠান পালন করা হয় বলে এটিকে বর্ষাবাস ব্রত বলে। বর্ষাবাস বুদ্ধ প্রবর্তিত বিধিবিধানেরই অংশ।
বর্ষা ঋতুর তিন মাস আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত ভিক্ষুরা বিহারে অবস্থান করে ধর্মালোচনা, ধর্ম-শ্রবণ, ধ্যান-সমাধি, বিদ্যাচর্চা করে অতিবাহিত করেন এবং এই বর্ষাবাসব্রতকালে ভিক্ষুসংঘ কায়িক, রাচনিক এবং মানসিক পরিশুদ্ধতা অর্জন করে থাকে। তাই বর্ষাবাসব্রতকে আত্মশুদ্ধির অধিষ্ঠানও বলা হয়ে থাকে।
বর্ষাবাসব্রত ভিক্ষুদের অবশ্য পালনীয় কর্ম। এ সময় ভিক্ষুদের অনেক কর্মের মধ্যে দুটি হলো-
১. বর্ষাবাসব্রতকালে প্রতি পূর্ণিমা, অমাবস্যা ও অষ্টমী তিথিতে ভিক্ষুদের পাতিমোক্স আবৃত্তি করতে হয়।
২. বর্ষাবাসব্রতকালে ভিক্ষুগণ ছোট-বড় ভেদাভেদ ভুলে নিজের দোষ-ত্রুটি স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করে। ফলে অহংকার দূরীভূত হয়।
'উপোসথ' শব্দটি 'উপবাস' শব্দ থেকে উদ্ভুত। বৌদ্ধরা পূর্ণিমা, অমাবস্যা এবং অষ্টমী তিথিতে উপবাস থেকে ধর্মালোচনা, শ্রবণ, ধ্যান-সমাধি প্রভৃতি পালনের মাধ্যমে যে ব্রত পালন করে তাকে উপোসথ বলে। উপোসথ পালনে ধর্মানুভূতি জাগ্রত হয়। কায়-মন-'বাক্য ও পঞ্চেন্দ্রিয় সংযত হয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান।
বৌদ্ধধর্মে উপোসথব্রতে বৌদ্ধরা উপবাস পালন করলেও উপোসথ অর্থ কেবল উপবাস বা খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ হতে বিরত থাকা নয়। উপোসথের সাথে ধমানুশীলন, শীল পালন, ধ্যান-সমাধি চর্চা, পাতিমোক্স আবৃত্তি, ধর্ম দেশনা প্রভৃতি পালন করে থাকে। শ্রদ্ধাচিত্তে দান করে থাকেন। তাই উপোসথ শুধু উপবাস থাকা নয়।
আর্য' শব্দের অর্থ শ্রেষ্ঠ। আর্য উপোসথকেই শ্রেষ্ঠ উপোসথ বলা হয়েছে। বুদ্ধ এই মহান উপোসথ ব্রতই প্রবর্তন করেছিলেন। এই উপোসথ গ্রহণকারীগণ উপোসথ গ্রহণ করে জাগতিক সুখভোগের চিন্তা, ত্যাগ করেন। তারা বুদ্ধানুভূতি, ধর্মানুস্মৃতি, শীলানুস্মৃতি ও মৈত্রীভাবনায় রত থেকে উপোসথব্রত পালন করেন। তাই এটি শ্রেষ্ঠ উপোসথ।
যে উপোসথ গ্রহণকারী ধর্মচিন্তা বাদ দিয়ে খাদ্য, ভোজ্য, অভাব-অনটন বিষয়ে চিন্তা করে তাকে গোপালক উপোসথ গ্রহণকারী বলে। রাখাল যেমন পরের গরু নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত থাকে, তেমনি এরাও তাদের করণীয় কর্ম না করে অসার ও অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে আলাপ করে সময় নষ্ট করে। তাই এই উপোসথকে নিম্নস্তরের বলা হয়েছে।
'কঠিন' ও 'চীবর' দুটি শব্দের পৃথক গুরুত্ব রয়েছে। এখানে চীবর হলো 'ভিক্ষুদের পরিধেয় কাপড়'। ভিক্ষুসংঘ 'কম্মবাচা' পাঠের মাধ্যমে ধর্মীয় রীতিতে চীবরকে পরিশুদ্ধ করেন বলে একে বলা হয় কঠিন চীবর। সেজন্য উপাসক-উপাসিকরা চীবর দান করলেও তা কঠিন হয় না। দানানুষ্ঠানের মধ্যে এটি অন্যতম।
বৌদ্ধধর্মে সকল বিষয়ে একই কথা বলা মন্ত্র তিনবার উচ্চারণের বিধান রয়েছে। এত করে মনের সংশয় দূর হয়। করণীয় বিষয়ে একাগ্রতা বাড়ে। যে কাজ করা হয় তার প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা জন্মে ও ফললাভ সম্ভব হয়। অর্থাৎ করণীয় কার্যে ভক্তি-শ্রদ্ধা ও মনোসংযোগ সুদৃঢ় করার জন্য এক কথা তিনবার উচ্চারণ করা হয়।
বুদ্ধ কঠিন চীবর দানকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দান বলেছিলেন। নিচে দুটি সুফল দেওয়া হলো-
১. কোনো দাতা অন্যান্য দানীয় বস্তু একশ বছর দান করলেও তার ফল একখানি কঠিন চীবর দানের ষোলো ভাগের একভাগ হয় না।
২. কঠিন চীবর দানের ফলে সকল প্রকার ধন-সম্পদ, সুক্তি, স্বর্গ এবং অমৃতপদ লাভ করা যায়।
বর্ষাবাস বৌদ্ধদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আচার বা অনুষ্ঠান। ভগবান বুদ্ধ সংঘ প্রতিষ্ঠার পর সুষ্ঠুভাবে সংঘ পরিচালনার নিমিত্তে বিভিন্ন নিয়মকানুন প্রবর্তন করেন এবং বর্ষাবাস বুদ্ধ প্রবর্তিত বিধিবিধানেরই অংশ। আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা, পর্যন্ত তিন মাস ভিক্ষুরা বর্ষাবাস পালন করেন। এসময় তাঁরা বিহারে অবস্থান করে ধর্মালোচনা, ধর্ম শ্রবণ, ধর্ম বিনয় ও ধ্যান সমাধি চর্চা এবং অধ্যয়ন করে বর্ষাবাসব্রত পালন করে থাকেন।
বর্ষাবাস পালনকালে ভিক্ষুদের তিন মাস যেকোনো একটি বিহারে অবস্থান করে বর্ষাবাস উদ্যাপন করতে হয়। তখন তারা অধ্যয়ন, ধ্যান সাধনা ও ধর্মচর্চা করে দিন কাটান এবং কোনো কারণ ছাড়া বর্ষাবাসের সময় নিজ বিহার ছাড়া অন্য কোথাও রাত্রি যাপন করা যাবে না। কিন্তু বন্যজন্তু, সাপ, চোর-ডাকাতের উপদ্রব, বিহারের দায়ক-দায়িকারা বিবাদগ্রস্ত এবং তর্কপ্রিয় হলে আগুন, পানি, বন্যা, ঝড় প্রভৃতি কারণে বর্ষাবাসের স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হলে বর্ষাবাসের স্থান পরিবর্তন করা যাবে।
বন্যজন্তু, সাপ, চোর-ডাকাতের উপদ্রব, বিহারে দায়ক-দায়িকারা বিবাদগ্রস্ত এবং তর্কপ্রিয় হলে আগুন, পানি, বন্যা, ঝড় প্রভৃতি কারণে বর্ষাবাসের স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হলে বর্ষাবাসের পরিবর্তন করা যাবে।
বর্ষাবাসব্রতধারী ভিক্ষুদের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য দান করা গৃহীদের কর্তব্য। ভিক্ষুদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলোকে একত্রে চতুপ্রত্যয় বলা হয়। বর্ষাবাসব্রতের সময় গৃহীরা ভিক্ষুদের চতুপ্রত্যয় দান করেন। গৃহীরা ধর্মসভায় যোগদান করে ধর্মলোচনা শ্রবণ করবেন।
বৌদ্ধ সম্প্রদায় বিভিন্ন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। প্রত্যেকটি অনুষ্ঠানের স্বতন্ত্র ইতিহাস ও পটভূমি রয়েছে। এসব আচার অনুষ্ঠান বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও দর্শনের সাথে সম্পৃক্ত। ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে এ অনুষ্ঠানগুলো পালন করা হয়। নানামুখী আয়োজনে কিছু কিছু আচার-অনুষ্ঠান উৎসবের রূপ ধারণ করে। এসব আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতি জাগ্রত হয়। ধর্মীয় মতবাদগুলো বুঝতে সহজ হয়। পারস্পরিক ভাব-বিনিময় হয়। সৌভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয়। নৈতিক ও মানবিক জীবন গঠিত হয়। আত্মসংযম এবং বিনম্র হওয়া যায়। বর্ষাবাস, উপোসথ এবং কঠিন চীবরদান প্রভৃতি অনুষ্ঠান বৌদ্ধদের ধর্মীয় সংস্কৃতির অনন্য উৎস। এসব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ভিক্ষু এবং গৃহী বৌদ্ধদের মধ্যে সম্পর্কের সেতুবন্ধন রচনা করে। এ অধ্যায়ে আমরা তিনটি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব সম্পর্কে পড়ব।
এ অধ্যায় শেষে আমরা -
- পটভূমিসহ বর্ষাবাসব্রত ব্যাখ্যা করতে পারব।
- বর্ষাবাসব্রতকালীন ভিক্ষু ও গৃহীদের করণীয় বিষয় বর্ণনা করতে পারব।
- উপোসথের প্রকারভেদ ও উপোসথ পালনের নিয়মাবলি বর্ণনা করতে পারব।
- কঠিন চীবরদানের সুফল উল্লেখপূর্বক কঠিন চীবরদান সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে পারব।
Related Question
View Allতিন মাস ধরে বর্ষাবাস পালন করা হয়।
বর্ষাবাস বৌদ্ধদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আচার বা অনুষ্ঠান। বর্ষাবাস পালন বৃদ্ধ প্রবর্তিত বিধিবিধানেরই অংশ। তিন মাস যে কোনো একটি বিহারে অবস্থান করে ভিক্ষুদের এ বর্ষাবাসব্রত উদ্যাপন করতে হয়। বর্ষাবাসব্রত পালনের মাধ্যমে ভিক্ষুদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হয়।
উদ্দীপকের ঘটনাটি বৌদ্ধধর্মের বর্ষাবাসব্রত আচার-অনুষ্ঠানের অন্তর্ভুক্ত। বোধিমিত্র ভিক্ষুর আচরণে বর্ষাবাসব্রত অনুষ্ঠানের চিত্র ফুটে উঠেছে।
ভিক্ষুসঙ্ঘ গঠন করার পর বুদ্ধ তাঁর বাণী চারদিকে ছড়িয়ে দিতে ভিক্ষুদের নির্দেশ দেন। ভিক্ষুরা লোকালয়ে গিয়ে ধর্ম প্রচার ও দেশনা করতেন। বর্ষাকালে ভিক্ষুরা বিভিন্ন ধরনের অসুবিধায় পড়তেন। এজন্য বুদ্ধ ভিক্ষুদের বর্ষার তিন মাস বিহারে অবস্থান করে ধর্মালোচনা, ধর্ম শ্রবণ, ধ্যান সমাধি করে সময় অতিবাহিত করার নির্দেশ দেন। তবে বর্ষাবাসব্রত পালনকালে অসুস্থ ভিক্ষু-ভিক্ষুণী, শ্রমণ এবং রুগ্ন দায়ক-দায়িকা দেখার জন্য বিহারের বাইরে যাওয়া যেতে পারে।
সুতরাং উপরিউক্ত আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, বোধিমিত্র ভিক্ষুর আচার-আচরণে বর্ষাবাসব্রত পালনের চিত্রটি ফুটে উঠেছে।
উদ্দীপকের বোধিমিত্র ভিক্ষুর বিহার ত্যাগের ঘটনাটি বর্ষাবাসব্রত বিধানের লঙ্ঘন বলা যায় না। বর্ষাবাসব্রত বিধান লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়মনীতি আছে।
তিন মাস যেকোনো একটি বিহারে অবস্থান করে ভিক্ষুদের বর্ষাবাসব্রত উদ্যাপন করতে হয়। বর্ষাবাসব্রত পালনকালে ভিক্ষুরা ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন, ধ্যান সাধনা, ধর্মচর্চা, ধর্মশ্রবণ ও বিদ্যাচর্চা করে সময় পার করে। কোনো জরুরি কাজে নিজ বিহার থেকে অন্য জায়গায় যেতে হলে সন্ধ্যার আগে বর্ষাবাস উদ্যাপনকারী ভিক্ষুকে নিজ বিহারে ফিরতে হয়। তবে 'কিছু কারণে বর্ষাবাসের সময় নিজ বিহার ছাড়াও অন্যত্র রাত্রিযাপন করা যায়। যেমন-অসুস্থ ভিক্ষু-ভিক্ষুণী, শ্রমণ এবং রুগ্ন দায়-দায়িকা দেখার জন্য। উদ্দীপকে বোধিমিত্র ভিক্ষুর গুরু ভন্তে গুরুত্বর অসুস্থ হলে তাকে সেবাযত্নের জন্য সে বিহারের বাইরে অবস্থান করে। তবে চারদিন পর আবার বিহারে ফিরে আসে।
সুতরাং বলা যায়, বোধিমিত্র ভিক্ষুর বিহারের বাইরে রাতযাপনের ঘটনাটি বর্ষাবাসব্রত বিধানের লঙ্ঘন নয়।
বর্ষাবাসব্রত পালনের ভিত্তিতে ভিক্ষুদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হয়।
উপোসথ ভিক্ষু এবং গৃহী উভয়ের পালনীয় ধর্মীয় অনুষ্ঠান। বৌদ্ধরা পূর্ণিমা, অমাবস্যা এবং অষ্টমী তিথিতে উপোসথ পালন করেন। ধর্মময় উৎকৃষ্ট জীবন গঠনের জন্য বুদ্ধ উপোসথের প্রবর্তন করেছিলেন। উপোসথ পালনে ধর্মানুভূতি জাগ্রত হয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!