দর্শনীয় স্থান দর্শনের মধ্য দিয়ে বুদ্ধের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানা যায়। ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক জ্ঞান বৃদ্ধি পায়। মনে ধর্মীয় ভাব জাগ্রত হয়। ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগ বাড়ে, দেশপ্রেম সৃষ্টি হয়। তাই দর্শনীয় স্থানসমূহ দর্শনে অনেক লাড় হয়।
বৌদ্ধধর্ম দর্শন চর্চার প্রাণকেন্দ্র ছিল নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়া গৌরবের বিষয় ছিল। এ বিদ্যাপীঠের পাঠ্যক্রমের উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল যথাক্রমে বৌদ্ধ, বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্য বিষয়ক সাহিত্য, দর্শন, অলঙ্কার শাস্ত্র, ব্যাকরণ শাস্ত্র, জ্যোতিষ শাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা প্রভৃতি।
শ্রেষ্ঠী সুদত্ত ছিলেন দানবীর। সমগ্র ভারতবর্ষে তাঁর দানকার্যের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি অনাথের পিন্ডদাতা ছিলেন বলে 'অনাথপিণ্ডিক' নামে খ্যাত হন।
বৌদ্ধযুগে তক্ষশীলায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। তক্ষশীলার উল্লেখযোগ্য ছাত্র হচ্ছেন কোশলরাজ প্রসেনজিং, লিচ্ছবি প্রধান মহালি, মল্লরাজপুত্র বন্ধুল, অবন্তীর ধর্মপাল, অঙ্গুলিমাল, চিকিৎসক জীবক, কাশীভরদ্বাজ এবং যশোদত্তের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তক্ষশীল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন।
সিদ্ধার্থ গৌতম ছয় বছর কঠোর সাধনা করে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে বুদ্ধত্ব লাভ করেন। এরপর সর্বপ্রাণীর দুঃখমুক্তি ও কল্যাণের জন্য সুদীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছর ধর্ম প্রচার করেন বিভিন্ন স্থানে। তাঁর নির্দেশে তাঁর শিষ্য-প্রশিষ্যরা ধর্ম প্রচার করেন। যেগুলোকে কেন্দ্র করে নানা বিহার, স্তূপ, চৈত্য, সংঘারাম গড়ে উঠেছে। এগুলোই বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থান।
তীর্থ ও দর্শনীয় স্থান ভ্রমণের ফলে মনে ধর্মীয়ভাব জাগ্রত হয়। মন পবিত্র ও কলুষমুক্ত হয়। ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক জ্ঞান বৃদ্ধি পায়। মনের উদারতা বাড়ে। তৃষ্ণা-লোভ-দ্বেষ-মোহ প্রভৃতি ক্ষয় হয়। দেশপ্রেম সৃষ্টি হয়। নৈতিক জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ হওয়া যায়। তাই এসব স্থান ভ্রমণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
নালন্দা নামের উৎপত্তির দুটি প্রধান ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। একটি হলো, অতীতে বোধিসত্ত্ব নামে এক রাজন কখনো কাউকে 'নঅল্যদা' অর্থাৎ 'আমি দেব না' বলতে পারতেন না। সেই থেকে এ স্থানের নাম নালন্দা। দ্বিতীয়টি, স্থানীয় এক আম বাগানের পুকুরে নালন্দা নামক নাগরাজ্য বাস করত। তার নামানুসারে নাম হয় নালন্দা।
বৌদ্ধধর্ম-দর্শন চর্চার প্রাণকেন্দ্র ছিল নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিদ্যাপীঠের পাঠ্যক্রমের উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল বৌদ্ধ, বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্য বিষয়ক সাহিত্য, দর্শন, অলঙ্কার শাস্ত্র, ব্যাকরণ শাস্ত্র, জ্যোতিষ শাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা প্রভৃতি। এছাড়াও সাধারণ জ্ঞানের নানা বিষয়ও পাঠ্যের অন্তর্গত ছিল।
জাতক কাহিনিতে শিক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে তক্ষশীলের উল্লেখ পাওয়া যায়। তক্ষশীলা ছিল তখন জ্ঞান ও বিজ্ঞান চর্চার প্রাণকেন্দ্র। দেশ-বিদেশ থেকে বহু শিক্ষার্থী এখানে অধ্যয়নের জন্য আসতেন। এখানে ত্রিবেদসহ অষ্টাদশ বিদ্যাশিক্ষা দেওয়া হতো। এ. অষ্টাদশ বিদ্যার মধ্যে ধনুবিদ্যা ও ভৈষজবিদ্যা অন্যতম ছিল।
'জেতবন' ছিল শ্রাবস্তীতে। এটি ছিল জেত রাজকুমারের উদ্যান। তিনি বিক্রয় করতে রাজি না হলে বুদ্ধভক্ত শ্রেষ্ঠী সুদত্ত জমির আয়তনের সমপরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা ছড়িয়ে দিয়ে স্থানটি ক্রয় করেন। তিনি সমপরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে বুদ্ধ ও ভিক্ষুদের বসবাসের জন্য জেতবন বিহার নির্মাণ করে দেন।
বিম্বিসার ছিলেন মগধের রাজা। তাঁর রাজধানী ছিল রাজগৃহ। একবার গৌতম বুদ্ধ রাজগৃহে ধর্ম প্রচার করতে আসেন। তখন গৌতম বুদ্ধের ধর্মদেশনা শ্রবণ করে রাজা মুগ্ধ হন এবং বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। রাজা বিম্বিসার এবং তাঁর পুত্র অজাতশত্রুর সময়কালে এ অঞ্চলে বৌদ্ধধর্ম সর্বাধিক প্রভাব ও প্রতিপত্তি লাভ করে।
ভগবান বুদ্ধ এবং তাঁর শিষ্য-প্রশিষ্যদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোই বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও তীর্থস্থান। এগুলো পবিত্র স্থানও বটে। ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, এবং বাংলাদেশে এরূপ অনেক বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থান রয়েছে। যেমন- লুম্বিনী, সারনাথ, বুদ্ধগয়া, রাজগৃহ, শ্রাবস্তী, পুরুষপুর, তক্ষশীলা, গান্ধার, শালবন বিহার, সোমপুর বিহার, মহাস্থানগড় প্রভৃতি।
দর্শনীয় স্থানসমূহ আমাদের ঐতিহ্য ও জাতীয় সম্পদ। তবে বিভিন্ন কারণে এগুলো ধ্বংস বা নষ্ট হতে পারে। যেমন- সংরক্ষণের অভাব, অযত্ন, নদীভাঙন, বন্যা, ঝড়-বৃষ্টি, তুফান, বায়ুদূষণ, কীটপতঙ্গের উপদ্রব, পশুপাখির মলত্যাগ, অজ্ঞ মানুষের অহেতুক কৌতূহল, লুটেরাদের দৌরাত্ম্য, যুদ্ধবিগ্রহ, দাঙ্গা প্রভৃতি কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
দর্শনীয় স্থানসমূহ দেশের অতীত গৌরবের স্বাক্ষর বহন করে। তাই এসব সংরক্ষণের জন্য বিশেষ সতকর্তা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা আবশ্যক। বিশেষ করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিয়মিত যত্ন নেওয়া, সীমানাপ্রাচীর দিয়ে ঘিরে রাখা পশুপাখির প্রবেশ রোধ, নিয়মনীতি মেনে চলা, পবিত্রতা রক্ষা তথা সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সংরক্ষণ করা সম্ভব।
তীর্থ ও দর্শনীয় স্থানগুলো পরিভ্রমণ করলে বুদ্ধের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানা যায়। ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক জ্ঞান বৃদ্ধি পায়, মনে ধর্মীয় ভাব'জাগ্রত হয়, ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনযাপনে উৎসাহ সৃষ্টি হয়। জনহিতকর এবং কুশলকর্ম সম্পাদনে মন উদ্বুদ্ধ হয়, ধর্মচর্চায় প্রেরণা লাভ করা যায়, মন পবিত্র হয়, কলুষমুক্ত হয়। তৃষ্ণা, লোভ-দ্বেষ, মোহ প্রভৃতি ক্ষয় হয়, ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগ বাড়ে, দেশপ্রেম সৃষ্টি হয়। তাই তীর্থ ও দর্শনীয় স্থানসমূহ দর্শনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠেছিল জগদ্বিখ্যাত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিদ্যাপীঠের পাঠক্রমের উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল বৌদ্ধ, বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্য বিষয়ক সাহিত্য, দর্শন, অলংকার শাস্ত্র, ব্যাকরণ শাস্ত্র, জ্যোতিষ শাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা প্রভৃতি। এছাড়া সাধারণ জ্ঞানের নানা বিষয়ও ছিল। আর এ পাঠক্রমের অনুসারী ছাত্ররা নিয়মানুবর্তিতা, শিষ্টাচার, গভীর পান্ডিত্য ও আদর্শগত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। তাঁরা দেশ-বিদেশে যথেষ্ট সুনাম ও প্রশংসা অর্জন করেছিলেন। তাই নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়কে বৌদ্ধ ধর্ম-দর্শন চর্চার প্রাণকেন্দ্র বলা হয়।
বুদ্ধ, বুদ্ধের শিষ্য-প্রশিষ্য, উপাসক-উপাসিকা, রাজন্যবর্গ এবং পণ্ডিত ভিক্ষুদের স্মৃতিবিজড়িত অনেক স্থান, বিহার এবং চৈত্য আছে। যেগুলো বৌদ্ধ ঐতিহ্য এবং দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিচিত। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে এসব ঐতিহ্য এবং দর্শনীয় স্থানসমূহ ছড়িয়ে আছে। তারমধ্যে অনেকগুলোই ভারতে অবস্থিত। এ অধ্যায়ে আমরা নালন্দা, রাজগৃহ, শ্রাবস্তী, তক্ষশীলা প্রভৃতি বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে পড়ব।
এ অধ্যায় শেষে আমরা -
- ঐতিহাসিক বৌদ্ধ তীর্থ ও দর্শনীয় স্থানসমূহের বর্ণনা দিতে পারব।
- বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও স্থানসমূহ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে পারব।
- বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থানসমূহের ধর্মীয় গুরুত্ব বিশ্লেষণ করতে পারব।
Related Question
View Allসম্রাট অশোক নির্মিত স্তম্ভের মধ্যে শীর্ষ স্তন্ড হলো হস্তীর প্রস্তর ভাস্কর্য।
বৌদ্ধধর্মের অনুসারীদের কাছে বুদ্ধ এবং তাঁর শিষ্যদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহ তীর্থস্থান হিসেবে শ্রদ্ধা লাভ করে। তীর্থস্থান ভ্রমণে পুণ্য হয়। তাই বৌদ্ধরা শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য এসব স্থান ভ্রমণ করেন। ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশে এরূপ অনেক বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থান আছে।
প্রীতমের বর্ণনায় জেতবন বিহার তীর্থস্থানের চিত্র ফুটে উঠেছে।
যেটি বুদ্ধের সময়কালে শ্রাবস্তীর শ্রেষ্ঠ ধনী শ্রেষ্ঠী সুদত্ত বুদ্ধের বসবাসের জন্য নির্মাণ করেন। এটি জেত রাজকুমারের উদ্যান। এটি বিক্রয় করতে রাজি না হওয়ায় বুদ্ধভক্ত শ্রেষ্ঠী সুদত্ত জমির আয়তনের সমপরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা ছড়িয়ে স্থানটি ক্রয় করেন এবং সেখানে জেতবন বিহার নির্মাণ করেন। এ বিহারে ভিক্ষুদের বসবাসের জন্য শয়ন কক্ষ, প্রার্থনা কক্ষ, রান্নাঘর, স্নানঘর, শৌচাগার, পুকুর, কূপ ও অন্যান্য ব্যবস্থাদি ছিল। জেত রাজকুমার বিহারের তোরণ নির্মাণ করেছেন। পরবর্তী সময়ে তোরণের পাশে সম্রাট অশোক উঁচু স্তম্ভ নির্মাণ করেন। জেতবন বিহারের চারদিকে প্রচুর গাছপালা ছিল। পরিবেশ ছিল ধ্যান সাধনার অনুকূল। তাই বুদ্ধ এ বিহার খুব পছন্দ করতেন। তিনি এখানে উনিশ বর্ষাবাস পালন করেন। কালের গর্ভে জেতবন বিহারটি হারিয়ে যায়।
বুদ্ধ ও তাঁর শিষ্য-প্রশিষ্যদের স্মৃতি বিজড়িত দর্শনীয় স্থানকে তীর্থস্থান বলে। যা কোনো ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পদ নয়; বরং তীর্থস্থানগুলো রাষ্ট্রীয় সম্পদ। যার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব শুধুমাত্র সরকারের নয়। প্রত্যেক মানুষেরই এ দর্শনীয় স্থানগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করার দায়িত্ব রয়েছে। তীর্থস্থানগুলো আমাদের হারিয়ে যাওয়া গৌরবের উজ্জ্বলতম স্বাক্ষর বহন করে। তীর্থস্থান দর্শনে পুণ্য অর্জিত হয়। মনের কলুষতা দূর হয়। দেশপ্রেম জাগ্রত হয়। ধর্মীয় অনুভব জাগ্রত হয়। আমাদের নতুন প্রজন্ম ঐতিহাসিক তীর্থস্থানসমূহ দর্শন করে নিজেদের মনে হারানো গৌরব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হবে। আলোচ্য কারণে প্রীতমের দাদা তীর্থস্থানগুলো সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন।
তক্ষশীলা হচ্ছে গান্ধার রাজ্যের রাজধানী।
শ্রাবস্তীর শ্রেষ্ঠ ধনী এবং শ্রেষ্ঠ দানবীর শ্রেষ্ঠী সুদত্তকে 'অনাথপিণ্ডিক' নামে ডাকার যথার্থ কারণ হচ্ছে তিনি অনাথের পিন্ড দাতা ছিলেন বলে তাঁকে এ নামে ডাকা হতো। বুদ্ধের সময়কালে ভারতবর্ষে তাঁর দাদার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!