বুদ্ধ, বুদ্ধের শিষ্য-প্রশিষ্য, উপাসক-উপাসিকা, রাজন্যবর্গ এবং পণ্ডিত ভিক্ষুদের স্মৃতিবিজড়িত অনেক স্থান, বিহার এবং চৈত্য আছে। যেগুলো বৌদ্ধ ঐতিহ্য এবং দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিচিত। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে এসব ঐতিহ্য এবং দর্শনীয় স্থানসমূহ ছড়িয়ে আছে। তারমধ্যে অনেকগুলোই ভারতে অবস্থিত। এ অধ্যায়ে আমরা নালন্দা, রাজগৃহ, শ্রাবস্তী, তক্ষশীলা প্রভৃতি বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে পড়ব।
এ অধ্যায় শেষে আমরা -
- ঐতিহাসিক বৌদ্ধ তীর্থ ও দর্শনীয় স্থানসমূহের বর্ণনা দিতে পারব।
- বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও স্থানসমূহ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে পারব।
- বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থানসমূহের ধর্মীয় গুরুত্ব বিশ্লেষণ করতে পারব।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
অরুণা মুৎসুদ্দী একজন বুদ্ধ অনুরাগী ব্যক্তি। তিনি মনে করেন, বুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক স্থানসমূহকে সংরক্ষণ করা সকলের একান্ত কর্তব্য। এগুলোর মৌলিক গুরুত্ব অনেক।
সিদ্ধার্থ গৌতম ছয় বছর কঠোর সাধনা করে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে বুদ্ধত্ব লাভ করেন। বুদ্ধত্ব লাভ করে তিনি সর্বপ্রাণীর দুঃখমুক্তি ও কল্যাণের জন্য সুদীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছর ধর্ম প্রচার করেন। ধর্ম প্রচারের জন্য তিনি অনেক স্থানে গমন করেন। তাঁর নির্দেশে তাঁর শিষ্য-প্রশিষ্যরাও নানা স্থানে বুদ্ধবাণী ছড়িয়ে দেন। বুদ্ধ এবং তাঁর শিষ্য-প্রশিষ্যদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিহার, চৈত্য, সংঘারাম, স্তম্ভ, স্তূপ, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি। কালক্রমে তাঁদের স্মৃতিবিজড়িত এসব স্থান বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থানের মর্যাদা লাভ করে। বৌদ্ধদের নিকট এসব স্থান তীর্থস্থান হিসেবে শ্রদ্ধা লাভ করে। তীর্থস্থান ভ্রমণে পুণ্য হয়। তাই বৌদ্ধরা শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য এসব স্থান ভ্রমণ করেন। ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশে এরূপ অনেক বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থান আছে। ভারতে অবস্থিত বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থান সমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো লুম্বিনী, বুদ্ধগয়া, সারনাথ, কুশিনারা, রাজগৃহ, শ্রাবস্তী, বৈশালী, নালন্দা, বিক্রমশীলা, কপিলাবস্তু, সাঁচীস্তূপ, অজন্তা, ইলোরা, উদয়গিরি, রত্নগিরি ইত্যাদি। পাকিস্তানে অবস্থিত স্থানসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো: পুরুষপুর (পেশোয়ার) ও তক্ষশীলা। আফগানিস্তানে অবস্থিত স্থানসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: গান্ধার ও বামিয়ান। বাংলাদেশে অবস্থিত দর্শনীয় স্থানসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ময়নামতির শালবন বিহার, আনন্দবিহার, ত্রিরত্ন মূড়া বিহার, কোটিলা মুড়া বিহার, রূপবান মুড়া বিহার, পাহাড়পুরের সোমপুর বিহার, ভাসু বিহার, হলুদ বিহার, মহাস্থানগড় ইত্যাদি।
ওপরে বর্ণিত স্থানগুলোর অনেক স্থানে বুদ্ধ এবং তাঁর শিষ্য-প্রশিষ্যগণ বসবাস করতেন। ধ্যান-সমাধি করতেন। বর্ষাবাস যাপন করতেন। ধর্মোপদেশ দান করতেন। ধর্ম-দর্শন চর্চা করতেন। তাঁদের ধর্মদেশনা শুনে অনেক লোক লোভ-দ্বেষ-মোহ ক্ষয় করে দুঃখ হতে মুক্তি লাভ করেছেন। নির্বাণ সুখ উপভোগ করেছেন। আবার অনেক স্থানে বুদ্ধ বা তাঁর প্রধান শিষ্যগণ গমন করেননি। কিন্তু বুদ্ধের ধর্ম-দর্শন চর্চার কেন্দ্র হিসেবে সেগুলোও প্রসিদ্ধি লাভকরে। তাই এসব স্থানের ধর্মীয় গুরুত্ব অপরিসীম।
এসব স্থান পরিভ্রমণ করলে বুদ্ধের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানা যায়। ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক জ্ঞান বৃদ্ধি পায়। মনে ধর্মীয় ভাব জাগ্রত হয়। ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনযাপনে উৎসাহ সৃষ্টি হয়। জনহিতকর এবং কুশলকর্ম সম্পাদনে মন উদ্বুদ্ধ হয়। ধর্মচর্চায় প্রেরণা লাভ করা যায়। মন পবিত্র হয়। কলুষমুক্ত হয়। তৃষ্ণা, লোভ-দ্বেষ-মোহ প্রভৃতি ক্ষয় হয়। ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগ বাড়ে। দেশপ্রেম সৃষ্টি হয়। তাই তীর্থ ও দর্শনীয় স্থানসমূহ দর্শনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
পরবর্তী পাঠে আমরা চারটি বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে জানব।
অনুশীলনমূলক কাজ |
নালন্দা ভারতের বিহার রাজ্যের পাটনা জেলার অন্তর্গত ছিল। বর্তমানে নালন্দা একটি স্বতন্ত্র জেলা। গৌতম বুদ্ধ অনেকবার নালন্দায় এসেছিলেন। তিনি এখানে শ্রেষ্ঠীপুত্র পাবারিকের আম বাগানে অবস্থানকালে তাঁর শিষ্যদের ধর্ম দেশনা করেছেন। এখানে অনেক ধনী ব্যক্তি বসবাস করতেন। কয়েকজন ধার্মিক ও ধনী ব্যক্তি ভূসম্পত্তি ক্রয় করে বুদ্ধকে দান করেন। নালন্দা ছিল একটি উন্নত ও সমৃদ্ধিশালী মহানগরী।
নালন্দা নামের উৎপত্তি নিয়ে অনেক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। তার মধ্যে দুটি ব্যাখ্যা প্রধান। একটি হলো, অতীতকালে এখানে বোধিসত্ত্ব নামে এক ব্যক্তি রাজত্ব করতেন। তিনি কখনো কাউকে 'নঅলদা' অর্থাৎ 'আমি দেব না' একথা বলতে পারতেন না। সে কারণে এ স্থানের নাম হয় নালন্দা। আরেকটি ব্যাখ্যা হলো, স্থানীয় এক আম বাগানের মধ্যস্থলে একটি পুকুর ছিল। সেখানে নালন্দা নামক এক নাগরাজ বাস করতেন। তার নাম অনুসারে এ জায়গার নাম হয় নালন্দা।
জানা যায় গৌতম বুদ্ধের অগ্রশ্রাবক সারিপুত্রের জন্ম হয়েছিল এই নালন্দায়। পরবর্তীকালে সম্রাট অশোক অগ্রশ্রাবকের স্মরণে এখানে একটি সুবৃহৎ সংঘারাম নির্মাণ করেছিলেন। সেটি নালন্দা মহাবিহার নামে খ্যাত হয়। খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতকে বিখ্যাত বৌদ্ধ পন্ডিত ও দার্শনিক নাগার্জুন নালন্দা মহাবিহারের অধ্যক্ষ ছিলেন। বিহারটিকে কেন্দ্র করে পরবর্তীকালে গড়ে উঠে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। অনুমান করা হয়, খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতকের পর নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পূর্বে ছোট ছোট বিহার, চৈত্য, স্তূপ ইত্যাদি নির্মিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে এ সকল স্থাপনার সমন্বয়ে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠেছিল জগৎ বিখ্যাত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়।

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসস্তূপ
ইতিহাস পাঠে জানা যায়, কনৌজের রাজা হর্ষবর্ধন ব্যয়ভার নির্বাহের জন্য এখানকার গ্রামের সমুদয় কর নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করেছিলেন। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে নালন্দায় আসেন। তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সপ্তম শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত অবস্থান করেন এবং জ্ঞানার্জনের জন্য অধিকাংশ সময় ব্যয় করেন। বাংলার কৃতী সন্তান মহাপণ্ডিত ভিক্ষু শীলভদ্র তখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ছিলেন। বাংলার শান্তরক্ষিত ও অতীশ দীপঙ্করও একসময় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ছিলেন।
বৌদ্ধধর্ম-দর্শন চর্চার প্রাণকেন্দ্র ছিল নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়।
ঐতিহাসিকদের বর্ণনা অনুসারে এখানে 'ধর্মগঞ্জ' নামে একটি বিরাট পাঠাগার ছিল। পাঠাগারে ছিল মূল্যবান অনেক পান্ডুলিপি ও গ্রন্থ। বাংলার পাল রাজাদের আমলে নালন্দার খ্যাতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। তাঁরা বিহারের ব্যয় ও শিক্ষা কেন্দ্রের সমৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বহু অর্থ ও জমি দান করেন। রাজা ধর্মপাল সবচেয়ে বেশি পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তখনকার দিনে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়া গৌরবের বিষয় ছিল। এ বিদ্যাপীঠের পাঠ্যক্রমের উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল বৌদ্ধ, বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্য বিষয়ক সাহিত্য, দর্শন, অলঙ্কার শাস্ত্র, ব্যাকরণ শাস্ত্র, জ্যোতিষ শাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা প্রভৃতি। এ ছাড়া সাধারণ জ্ঞানের নানা বিষয়ও ছিল। এ পাঠ্যক্রমের অনুসারী ছাত্ররা নিয়মানুবর্তীতা, শিষ্টাচার, গভীর পান্ডিত্য ও আদর্শগত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। তাঁরা দেশ বিদেশে যথেষ্ট সুনাম ও প্রশংসা অর্জন করেছিলেন।
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই অবয়ব আর নেই। সব কিছু আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে সে ধ্বংসাবশেষের নিদর্শনগুলো সংরক্ষিত আছে। ভারতের বিহার রাজ্যের সরকার বৌদ্ধশাস্ত্র অধ্যয়ন ও গবেষণার জন্য বর্তমানে 'নব নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়' নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছে। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপরেখা অনুসরণ করে এটি নির্মিত হয়েছে।
অনুশীলনমূলক কাজ |
রাজগৃহ ভারতের বিহার রাজ্যের পাটনা জেলায় অবস্থিত। এটি ছিল মগধ রাজ্যের রাজধানী। প্রাচীনকালে এটি বসুমতী, কুশাগ্রপুর, গিরিবজ্র ইত্যাদি নামে পরিচিত ছিল। বর্তমানে এটি রাজগীর নামে খ্যাত। চারদিকে পাহাড়বেষ্টিত স্থানটি দেখতে অতি মনোরম।
গৌতম বুদ্ধ রাজগৃহে ধর্মপ্রচার করতে এসেছিলেন। তখন মগধ রাজ্যের রাজা ছিলেন বিম্বিসার। বুদ্ধের ধর্মদেশনা শ্রবণ করে রাজা বিম্বিসার বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হন। রাজা বিম্বিসার এবং তাঁর পুত্র অজাতশত্রুর সময়কালে এ অঞ্চলে বৌদ্ধধর্ম যথেষ্ট প্রভাব ও প্রতিপত্তি লাভ করেছিল।
রাজা বিম্বিসার বুদ্ধ ও তাঁর শিষ্যদের বসবাসের জন্য 'বেলুবনারাম' বা সংক্ষেপে বেণুবন বিহার দান করেন। এটি বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে প্রথম বিহার দান। বুদ্ধ এ বিহারে অবস্থানকালে সারিপুত্র ও মৌদগল্যায়ন সংঘে যোগদান করেছিলেন। রাজা বিম্বিসারের অনুরোধে বুদ্ধ এখানে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রথম উপোসথ পালনের অনুমতি প্রদান করেন। ভগবান বুদ্ধ বেণুবন বিহারে সাত বর্ষাবাস অতিবাহিত করেন। রাজগৃহে ছিল জীবকের বিশাল আম বাগান। জীবক ছিলেন চিকিৎসক এবং বুদ্ধের পরম ভক্ত। জীবক তাঁর আম বাগানটি বুদ্ধ ও তাঁর শিষ্যদের দান করেন। এই আমবাগানে যে বিহারটি গড়ে ওঠে তার নাম ছিল 'জীবকারাম বিহার"। বিহারে অবস্থানকালে বুদ্ধ রাজা অজাতশত্রুকে উদ্দেশ্য করে 'শ্রামণ্যফল সূত্র' দেশনা করেন।
এখানে ছোট-বড় বেশ কয়েকটি গুহা আছে। তার মধ্যে 'সপ্তপর্ণী' গুহা অন্যতম। বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ প্রাপ্তির তিন মাস পর মহাকশ্যপ স্থবির রাজা অজাতত্ত্বর পৃষ্ঠপোষকতায় সপ্তপর্ণী গুহায় প্রথম বৌদ্ধ সঙ্গীতির অধিবেশন আহ্বান করেন। এ সঙ্গীতিতে উপালি স্থবির 'বিনয়' এবং আনন্দ স্থবির 'ধর্ম' ব্যাখ্যা করেন।

সপ্তপর্ণী গুহা
প্রথম সঙ্গীতি অনুষ্ঠানের পর মৌর্য সম্রাট অশোক এখানে একটি 'স্তম্ভ' প্রতিষ্ঠা করেন। স্তম্ভের শীর্ষে ছিল হস্তীর প্রস্তর ভাস্কর্য। অশোক এখানে একটি স্তূপও নির্মাণ করেন বলে জানা যায়।
রাজগৃহ ভগবান বুদ্ধের জীবনের অন্যতম স্মৃতিবিজড়িত স্থান। তাই রাজগৃহ বৌদ্ধদের কাছে অতি পবিত্র তীর্থভূমি।
অনুশীলনমূলক কাজ |
শ্রাবস্তী প্রাচীন কোশল রাজ্যের রাজধানী ছিল। বুদ্ধের সময়কালে কোশল রাজ্যের রাজা ছিলেন প্রসেনজিৎ। তিনি বুদ্ধের পরম ভক্ত ছিলেন। বৌদ্ধধর্মের প্রচার-প্রসারে তাঁর অনেক অবদান রয়েছে। তিনি রাজাকারাম বিহার নির্মাণ করে বুদ্ধকে দান করেছিলেন। রাজা প্রসেনজিৎ বিহারটি রানি মল্লিকাদেবীর অনুরোধে নির্মাণ করেছিলেন। এটি 'মল্লিকারাম' নামেও পরিচিত ছিল। শ্রাবস্তীর বর্তমান নাম সাহেত-মাহেত। এটি বর্তমানে উত্তর ভারতের গোণ্ডা জেলায় অবস্থিত।
প্রাচীনকালে শ্রাবস্তী উত্তর ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ জনপদ এবং ব্যবসা বাণিজ্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ছিল। এখানে অনেক শ্রেষ্ঠী (ধনী ব্যক্তি) বাস করতেন। শ্রেষ্ঠী সুদত্ত বুদ্ধের সময়কালে শ্রাবস্তীর শ্রেষ্ঠ ধনী ছিলেন। তিনি বুদ্ধকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করতেন। বুদ্ধের বসবাসের জন্য তিনি শ্রাবস্তীতে বিখ্যাত জেতবন বিহার নির্মাণ করেন। জেতবন বিহার নির্মাণের জন্য জায়গাটি মনোনীত করেছিলেন বুদ্ধের অগ্রশ্রাবক সারিপুত্র।
এটি ছিল জেত রাজকুমারের উদ্যান। এটি বিক্রয় করতে রাজি না হলে বুদ্ধভক্ত শ্রেষ্ঠী সুদত্ত জমির আয়তনের সমপরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা ছড়িয়ে দিয়ে স্থানটি ক্রয় করেন এবং সেখানে জেতবন বিহার নির্মাণ করেন। এ বিহারে ভিক্ষুদের বসবাসের জন্য শয়ন কক্ষ, প্রার্থনা কক্ষ, রান্নাঘর, স্নানঘর, শৌচাগার, পুকুর, কূপ ও অন্যান্য ব্যবস্থাদি ছিল। জেত রাজকুমার বিহারের তোরণ নির্মাণ করে দেন। পরবর্তীকালে তোরণের পাশে সম্রাট অশোক উঁচু স্তম্ভ নির্মাণ করেন। শ্রেষ্ঠী সুদত্ত ছিলেন দানবীর। সমগ্র ভারতবর্ষে তাঁর দানকার্যের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি অনাথের পিন্ড দাতা ছিলেন বলে 'অনাথপিণ্ডিক' নামে খ্যাত হন। জেতবন বিহারের চারদিকে প্রচুর গাছপালা ছিল। পরিবেশ ছিল ধ্যান সাধনার অনুকূল। তাই বুদ্ধ এই বিহার খুব পছন্দ করতেন। তিনি এখানে উনিশ বর্ষাবাস পালন করেন। দস্যু অঙ্গুলিমালকে বুদ্ধ জেতবন বিহারে দীক্ষা দান করেছিলেন।
কালের গর্ভে জেতবন বিহারটি হারিয়ে যায়। পঞ্চম শতকের প্রথম দিকে পরিব্রাজক ফা-হিয়েন যখন শ্রাবস্তীতে এসেছিলেন তখন তিনি ধ্বংসপ্রায় বিহারটি দেখতে পান। সপ্তম শতকের দিকে পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ শ্রাবস্তীতে এসেছিলেন। তখন তিনি বিহারের ধ্বংসপ্রাপ্ত ভিত্তিভূমি ছাড়া কিছুই দেখেননি। ভারত সরকার ১৯৯১ সালে এ স্থানে খননকার্য পরিচালনা করে অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন উদ্ধার করেন।

শ্রাবস্তী
মিগার মাতা বিশাখা শ্রাবস্তীতে 'পূর্বারাম বিহার' নির্মাণ করে বুদ্ধকে দান করেছিলেন। এ বিহারটি ছিল দ্বিতল বিশিষ্ট। বুদ্ধ শ্রাবস্তীতে বসবাস করে অনেক ধর্মোপদেশ দান করেছেন। তিনি এখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেশনা করেছেন যা ত্রিপিটকে পাওয়া যায়। শ্রাবস্তীতে বুদ্ধের সবচেয়ে বেশি অনুসারী ছিলেন। শ্রাবস্তীতে বুদ্ধের জীবন ও কর্মের অনেক স্মৃতি বিজড়িত আছে। তাই এ স্থান বৌদ্ধদের কাছে অতি পবিত্র তীর্থ ও দর্শনীয় স্থান।
অনুশীলনমূলক কাজ |
তক্ষশীলা পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডি শহরের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে অবস্থিত। এটি ছিল গান্ধার রাজ্যের রাজধানী। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে রাজকুমার অশোক পিতা সম্রাট বিন্দুসারের প্রতিনিধি হয়ে তক্ষশীলা শাসন করতেন। এখানে তিনি অনেক সংঘারাম নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর সময়ে এখানে অনেক স্তূপ ও স্তম্ভও নির্মাণ করা হয়েছিল।
তক্ষশীলা ছিল তখন জ্ঞান ও বিজ্ঞান চর্চার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। অনেক জাতক কাহিনিতে শিক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে তক্ষশীলার উল্লেখ পাওয়া যায়। বৌদ্ধযুগে তক্ষশীলায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। কোশলরাজ প্রসেনজিৎ, লিচ্ছবি প্রধান মহালি, মল্লরাজপুত্র বন্ধুল এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। আরও জানা যায়, অবন্তীর ধর্মপাল, অঙ্গুলিমাল, চিকিৎসক জীবক, কাশীভরদ্বাজ এবং যশোদত্তের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন।

তক্ষশীলা
দেশ বিদেশ থেকে বহু শিক্ষার্থী এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের জন্য আসতেন। এখানে ত্রিবেদসহ অষ্টাদশ বিদ্যা শিক্ষা দেওয়া হতো। এ অষ্টাদশ বিদ্যার মধ্যে ধনুর্বিদ্যা ও ভেষজবিদ্যা ছিল অন্যতম। খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতকে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ যখন তক্ষশীলায় আসেন তখন এর চতুর্দিকের পরিধি ছিল প্রায় চারশ মাইল। তিনি এখানে অনেকগুলো সংঘারাম দেখতে পেয়েছিলেন। তখন সেগুলোর প্রায়ই ছিল জনশূন্য ও ধ্বংসপ্রাপ্ত। তবে কিছু সংঘারামে তিনি অল্পসংখ্যক মহাযানী বৌদ্ধ ভিক্ষু দেখতে পান। 'হুন' জাতির আক্রমণে এ নগরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
খননকাজের ফলে এখানে বৌদ্ধযুগের বহু স্তূপ ও বিহারের নিদর্শন পাওয়া গেছে। প্রাচীনকালের অনেক মুদ্রাও পাওয়া গেছে। পাকিস্তান সরকার এগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
অনুশীলনমূলক কাজ |
দর্শনীয় স্থানসমূহ দেশের অতীত গৌরবের স্বাক্ষর বহন করে। এগুলো বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে। এ ছাড়া এগুলোর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় রাজস্বও আয় হয়। তাই এগুলো মহামূল্যবান রাষ্ট্রীয় সম্পদ। ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থানসমূহ সংরক্ষণ করার দায়িত্ব সকলের। নানা কারণে এসব স্থানের ক্ষতি হতে পারে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: প্রাকৃতিক দুর্যোগ, চোর বা ডাকাত কর্তৃক লুণ্ঠন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দর্শনার্থীর উচ্ছৃঙ্খল আচরণ, পশু-পাখির মল ত্যাগ এবং কীটপতঙ্গের আক্রমণ প্রভৃতি। এসব বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা আবশ্যক। বিশেষ করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিয়মিত যত্ন নেওয়া, সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রাখা, পশু-পাখির প্রবেশ রোধ, দর্শনীয় স্থানের নিয়ম-নীতি মেনে চলা, পবিত্রতা রক্ষা করা, মমত্ববোধ এবং ভক্তি-শ্রদ্ধা প্রদর্শনই পারে ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থানসমূহকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে। এভাবে এসব গুরুত্বপূর্ণ স্থান সংরক্ষণের প্রতি সকলের যত্নশীল হওয়া উচিত।
অনুশীলনমূলক কাজ |
শূন্যস্থান পূরণ কর
১. তীর্থস্থান ভ্রমণে _______ হয়।
২. এসব স্থান পরিভ্রমণ করলে বুদ্ধের জীবন ও ______ সম্পর্কে জানা যায়।
৩. বৌদ্ধ ধর্ম-দর্শন চর্চার _____ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়।
৪. রাজগৃহে ছিল জীবকের বিশাল _______ ।
৫. সপ্তম শতকের দিকে পরিব্রাজক ______ শ্রাবস্তীতে এসেছিলেন।
মিলকরণ
| বাম | ডান |
| ১. দর্শনীয় স্থানসমূহ দেশের অতীত গৌরবের | রাজধানী ছিল |
| ২. উপালি স্থবির 'বিনয়' এবং আনন্দ স্থবির | মহানগরী |
| ৩. শ্রাবস্তী প্রাচীন কোশল রাজ্যের | স্বাক্ষর বহন করে |
| ৪. তক্ষশীলা ছিল তখন জ্ঞান ও বিজ্ঞান চর্চার | 'ধর্ম' ব্যাখ্যা করেন |
| ৫. নালন্দা ছিল একটি উন্নত ও সমৃদ্ধশালী | প্রাণকেন্দ্র |
সংক্ষিপ্ত-উত্তর প্রশ্ন
১. দর্শনীয় স্থান দর্শনে কী লাভ হয়?
২. নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে উল্লেখযোগ্য বিষয় কী কী ছিল?
৩. শ্রেষ্ঠী সুদত্ত কেন অনাথপিণ্ডিক নামে খ্যাত হন?
৪. তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন উল্লেখযোগ্য শিক্ষার্থীর নাম লেখ।
বর্ণনামূলক প্রশ্ন
১. বৌদ্ধধর্মে তীর্থস্থান সমূহের ধর্মীয় গুরুত্ব বর্ণনা কর।
২. বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও প্রসারে রাজা বিম্বিসারের ভূমিকা ব্যাখ্যা কর।
৩. নালন্দা নামের উৎপত্তি কীভাবে হয় তা বর্ণনা কর।
বহুনির্বাচনি প্রশ্ন
১. গৌতম বুদ্ধ কত বছর ধর্ম প্রচার করেছিলেন?
ক. ৩৫ বছর
খ. ৪৫ বছর
গ. ৫০ বছর
ঘ. ৬৫ বছর
২. তীর্থস্থান ভ্রমণের মাধ্যমে
i. বিনোদনে আগ্রহ বৃদ্ধি পায়
ii. ধর্মীয় ও নৈতিক জীবন গঠন করা যায়
iii. ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক জ্ঞান অর্জিত হয়
নিচের কোনটি সঠিক?
ক. i
খ. i ও ii
গ. ii ও iii
ঘ. i, ii ও iii
নিচের উদ্দীপকটি পড় ৩ ও ৪ নম্বর প্রশ্নের উত্তর দাও:
দীপ্ত তাঁর বাবার সাথে একসময় একটি প্রসিদ্ধ তীর্থস্থানে বেড়াতে যান। সেখানে তার বাবা দীপ্তকে প্রাচীন স্কুল কলেজের ভগ্নাবশেষ দেখান এবং বিখ্যাত জ্ঞানী-গুণী ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করেন। তিনি আরও বলেন, কোনো এক সময় 'তুন' জাতির আক্রমণে এ নগরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
৩. উদ্দীপকে বর্ণিত তীর্থস্থানটি কোনটির ইঙ্গিত বহন করে?
ক. রাজগৃহ
খ. তক্ষশীলা
গ. শ্রাবস্তী
ঘ. সারনাথ
৪. উক্ত তীর্থস্থান ভ্রমণের মাধ্যমে দীপ্তের শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে -
i. প্রাচীন ইতিহাস অনুসন্ধান করা
ii. প্রাচীন জ্ঞান-চর্চা সম্পর্কে অবহিত হওয়া
iii. বৌদ্ধ শিল্পকলা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা।
নিচের কোনটি সঠিক?
ক. i
খ. i ও ii
গ. ii ও iii
ঘ. i, ii ও iii
সৃজনশীল প্রশ্ন
১। গ্রীষ্মের ছুটিতে প্রীতম তার দাদুর সঙ্গে একটি প্রসিদ্ধ তীর্থস্থান দেখতে যায়। তাঁরা তীর্থস্থানের ভিতরে একটা বাগান দেখতে পান। ভিক্ষুদের বসবাসের জন্য শয়নকক্ষ, স্নানঘর, প্রার্থনাকক্ষ ইত্যাদিও নজরে পড়ে। এ ছাড়া আরও দেখতে পান সম্রাট অশোকের একটি উঁচু স্তম্ভ। উক্ত বিহারের সামগ্রীক পরিবেশ ছিল ধর্মীয় ধ্যান-ধারণার অনুকূলে। তা সত্ত্বেও তীর্থস্থানটি ধবংসপ্রায় দেখে প্রীতমের মনে অনুশোচনা হয়। এতে প্রীতমের দাদু বলেন এসব তীর্থস্থান রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং এগুলোর সংরক্ষণের দায়িত্ব সকলের।
ক. সম্রাট অশোক নির্মিত স্তম্ভের মধ্যে শীর্ষ স্তম্ভ কোনটি?
খ. তীর্থস্থান ভ্রমণে পুণ্য হয় কথাটি ব্যাখ্যা কর?
গ. প্রীতমের বর্ণনার মধ্যে কোন তীর্থস্থানের চিত্র ফুটে উঠেছে? ব্যাখ্যা কর।
ঘ. প্রীতমের দাদু কেন তীর্থস্থানগুলোর সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন? পাঠ্যপুস্তকের আলোকে মূল্যায়ন কর।
২। শিক্ষক অমল বড়ুয়া কয়েকজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে ভারতে শিক্ষা সফরে গেলেন। তাঁরা প্রথমে এমন একটি প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় দর্শন করলেন যাতে বুদ্ধ, বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্য বিষয়ক সাহিত্য, দর্শন, ব্যাকরণ শাস্ত্র প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষাদান করা হতো। এমন কি শিক্ষাক্রম অনুসারে এখানকার শিক্ষার্থীরা নিয়মানুবর্তীতা, শিষ্টাচার ও পান্ডিত্য অর্জন করে দেশে-বিদেশে প্রচুর সুনাম অর্জন করেছিলেন। দ্বিতীয় দিনে তারা প্রথম সঙ্গীতি অনুষ্ঠানের স্থানটি দর্শন করেন এবং কী কারণে সঙ্গীতি হয়েছে তা জানতে পারলেন।
ক. তক্ষশীলা কোন রাজ্যের রাজধানী?
খ. শ্রেষ্ঠী সুদত্তকে 'অনাথপিণ্ডিক' নামে ডাকা হয় কেন?
গ. শিক্ষার্থীদের প্রথম দিনের দর্শনীয় স্থান কোনটি? পাঠ্যপুস্তকের আলোকে ব্যাখ্যা কর।
ঘ. শিক্ষার্থীদের দ্বিতীয় দিনের দর্শনীয় স্থানটি রাজগৃহের পরিচয় বহন করে-ব্যাখ্যা কর।
Read more